![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
রিকশাওয়ালা
উজ্জ্বল সামন্ত
এই রিক্সা যাবে?
মহিম: হ্যাঁ ,বাবু যাবো!
পাঁচ মাথার মোড়ে নামবো। বড় নার্সিংহোমটার সামনে, কত নেবে?
মহিম: ও আপনি যা ভাল বোঝেন দেবেন।
অরুণাভ: আজকেই এসব হতে হল।
মহিম: হ্যাঁ বাবু! সকাল থেকে রোজগার পাতি হয়নি। লোকজন রাস্তায় নেই বললেই চলে।
অরুনাভ: সেই রাত্রি ১০ টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি। অদিতিকে নার্সিংহোমে ভর্তি করতে হবে। ও সন্তান সম্ভবা।
মহিম: হ্যাঁ বাবু দেখে বুঝতে পারছি। আপনার স্ত্রী তো উনি! যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।
অরুনাভ: ঠিক আছে, তুমি তাড়াতাড়ি চলো। অদিতির লেবার পেন উঠেছে।
গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু ড্রাইভার টা নেই। বন্ধের জন্য আসতে পারেনি, কোন যানবাহন চলছে না রাস্তায়। অরুনাভর ড্রাইভিং টা শেখা হয়নি। জানাশোনা ট্রাভেল অপারেটর কে ফোন করেও কোন গাড়ি পাওয়া গেল না।
Bad luck . আজকেই বাংলা বন্ধ টা ডাকতে হলো।
মহিম: বাবু আমি রিক্সা নামিয়ে দিচ্ছি।
আপনি উনাকে ধরে আস্তে আস্তে উঠিয়ে দিন। যদি আপনি কিছু না মনে করেন আমি ওনার একটা হাত ধরছি।
অরুণাভ: আপনি ওর বাবার বয়সী হবেন। ধরুন , ধন্যবাদ।
অরুনাভ ও মহিম ধরাধরি করে অদিতিকে টানা রিকশায় তুললো।
মহিম কপালের ঘামটা, গলায় জড়ানো গামছায় মুছে নিলো। সন্ধ্যার বৃষ্টি ছাড়িয়েছে কিন্তু আবহাওয়ার গুমোট ভাব রয়েছে।
রিক্সাওয়ালা গতি বাড়িয়ে চলতে লাগলো।
অরুনাভ: অদিতির কপালে ঘাম মুছিয়ে দিয়ে। চিন্তা করো না সোনা! এইতো আর একটুখানি পথ, এসেই গিয়েছি। একটু ধৈর্য ধরো।
আজ হঠাৎ বন্ধ ডেকেছে রাজনৈতিক দল। ইস! কি অবস্হা। চারিদিকে ভাঙচুর, দোকান পাট সব বন্ধ। সরকারি বাসে ও আগুন লাগিয়ে দিয়েছে খবরে দেখলাম। কার্ফু ই জারির মতো অবস্থা । রাজ্যটার অবস্হার পরিবর্তন আর হলো না।
মহিম: অরুনাভর কথায় কান্ না দিয়ে, টানা রিক্সাটা নিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত যাওয়া যায়, চলতে লাগলো।
১০ মিনিট পর ওরা এসে পৌঁছল একটি নামী বেসরকারি নার্সিংহোমে। ! হ্যাঁ, এখানেই থামো।
অরুনাভ: তাড়াতাড়ি নেমে অদিতিকে নামাতে যাবে, মহিন এর দিকে তাকায়।
মহিম: অবাক হয়ে অরুনাভর মুখের দিকে তাকিয়ে।
অরুণাভ: চাচা একটু ধরবে? ওকে নামিয়ে নিই। কোনভাবে দুজনে ধরে।
কেউ আছেন? তাড়াতাড়ি আসুন স্ট্রেচার নিয়ে।
কোন সাড়া না পেয়ে, অজ্ঞতা বাইরে থাকা স্ট্রেচার অদিতি কে তুলে
রিসেপশনে ছুটে গেল অরুণাভ।
মহিম: স্ট্রেচার ধরে আছে আর বলছে বেটি একটু সবুর কর। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কয়েক মুহূর্ত পর দু-চারজন ওয়ার্ড বয় এসে অদিকে ভেতরে নিয়ে গেল।
ডাক্তার এসে গেছেন। রোগীকে প্রাথমিক পরীক্ষা করে বলেন। উনাকে এখনই ওটি রুমে নিয়ে যান।
মহিম ও অরুনাভ ওটির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
অরুনাভ: অনেক ধন্যবাদ চাচা। এই নাও ১০০ টাকা।
মহিম: আরে , বাবু অত ভাড়া নয়। ৫০ টাকা দিলেই হবে।
অরুণাভ: চাচা, আজ তুমি যা উপকার করলে আমি কোনদিন ভুলবো না। তুমি ১০০ টাকাই রাখো, ছেলে মেয়ের জন্য মিষ্টি কিনে নিয়ে যাবে।
মহিন: ডুকরে কেঁদে উঠলো। বাবু, আমার একটি ছেলে ছিল বছর দশেক। একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। পরিবার বলতে আমি আর আমার অসুস্থ স্ত্রী।
অরুণাভ: ওহঃ কিছু মনে করো না।
আমি ও অনাথ , চাচা। কে বাবা-মা জানিনা। মিশনারির বাইরে বারান্দায় ছিলাম, তখন সদ্যোজাত শিশু। মিশনারির ফাদার ই আমাকে মানুষ করেন। পড়াশোনা ওই মিশনারি স্কুলে। পরে ফাদারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমি স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করি। তার পর একটা কোম্পানিতে চাকরি পাই। পাঁচ মাথার মোড়ে একটি ফ্ল্যাটে থাকি। অদিতির সঙ্গে আমার প্রেম করে বিবাহ এই দু বছর হলো।
মহিম: আজকের রোজগার আমার হয়ে গেছে। আমি কিছুক্ষণ থাকবো, বাবু?
অরুনাভ: ঠিক আছে চাচা, থাকো। কিন্তু বাবু বলবেন না। আমার নাম অরুণাভ। আমাকে নাম ধরেই ডাকবেন। এই মুহূর্তে আমার পাশে কেউ থাকলে ভরসা পাবো।
দুজনে আলাপচারিতায় কিছু সময় অতিক্রান্ত হলো। ও টি র আলো জ্বলে উঠলো। কয়েক মিনিট পর নার্স এসে জানালো।
নার্স: পেসেন্টের স্বামীকে আছেন?
অরুনাভ: সিস্টার, আমি।
সিস্টার: ও নেগেটিভ ব্লাড লাগবে। যত শিগ্রই সম্ভব জোগাড়ের চেষ্টা করুন। আমাদের স্টকে নেই। ব্লাড ব্যাংক কে ফোন করা হয়েছিলো। ওনারা জানিয়েছেন এখনই ও নেগেটিভ রক্ত পাওয়া সম্ভব নয়।
অরুনাভ : চিন্তায় মুখ ফ্যাকাস হয়ে গেল। আমার রক্তে গ্রুপের সঙ্গে ব্লাড গ্রুপ মিলল না। তাহলে উপায়? অফিসে ফোন করলো! অফিসের ডেটাবেসের যদি কারো ও নেগেটিভ ব্লাড থাকে।
রিসেপশনিস্ট : জানালো স্যার, আমি সিস্টেম চেক করে দেখছি ।
কিছুক্ষণ পর অরুণাভর মোবাইলে ফোন এলো: স্যার, আমাদের ডেটাবেসে ও নেগেটিভ ব্লাড এর কোন এমপ্লয়ি নেই।
অরুনাভ: ফোন কেটে দিয়ে কেঁদেই ফেলল।
হাত জোড় করে, হে ঈশ্বর আমার স্ত্রী, অনাগত পুত্রকে রক্ষা করো, প্রভু।
মহিম: অরুণাভর কাঁধে হাত রেখে সান্তনা দিয়ে বলল, কেঁদোনা, বেটা। একবার আমার রক্তটা পরীক্ষা করে দেখা যায় কি!
অরুনাভ: তোমার ব্লাড গ্রুপ জানো, চাচা?
মহিম রহমান: না, বেটা, কোনদিন তো পরীক্ষা করা হয়নি। আমরা গরীব মানুষ। ছোটখাটো রোগ হলে সরকারি হেল্প সেন্টার বা হাসপাতালে যাই।
অরুণাভ: রিসেপশনে দৌড়ে যায়, সঙ্গে মহিম রহমান।
একজন সিস্টারকে ডেকে বলে, আপনি, এনার রক্ত পরীক্ষা করে দেখুন।
ও নেগেটিভ ব্লাড লাগবে, ওটি থেকে জানিয়েছে । আমার পরিচিত তেমন কেউ নেই যার রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ও নেগেটিভ রক্ত মেলে। এত রাত্রে কাকে পাবো? বুঝতে পারছি না।
সিস্টার: পরনে ছেঁড়া গেঞ্জি, রঙচটা লুঙ্গি পড়ে , বয়স ৬০ এর রোগা বৃদ্ধের এর দিকে তাকিয়ে! জিজ্ঞাসা করলো: ইনি রক্ত দেবেন?
অরুণাভ: হ্যাঁ, রক্তের গ্রুপের পরীক্ষা করুন। নার্স মহিমকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর এসে অরুণাভ কে ডেকে বলল, মিস্টার ঘোষ: ঈশ্বর আপনার সঙ্গে আছেন। ওনার রক্ত ও নেগেটিভ। আপাতত ২ ইউনিট রক্ত লাগবে, ওটি থেকে জানিয়েছে। উনি রাজি থাকলে আমি এখনই ব্যবস্থা করছি।
মহিম: ও আমার বেটির মতন। আমার শরীরের সবটুকু রক্তের প্রয়োজন হলে আমি দিয়ে দেব।
অরুনাভ: মহিম এর জরাজীর্ণ হাত দুটো ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়বে, এমন সময় মহিম অরুনাভর হাত দুটো ধরে বললো, তুমি বৌমার কাছে থাকো। আমি আসছি রক্ত দিয়ে।
সিস্টার ওকে নিয়ে চলে গেল ভেতরে।
অদিতির ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন হতো ও নেগেটিভ রক্ত পাওয়া না গেলে ।
আধঘন্টা হয়ে গেল, ওটির আলো জ্বলছে, নিভছে কই!
মহিন ইতিমধ্যে অরুণাভর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
মহিম: বেটা চিন্তা কোরো না। আল্লাহ মালিক! ওর দয়ার সব ঠিক হয়ে যাবে।
কয়েক মুহূর্ত পর ওটির আলো নিভে গেল।
ডাক্তারবাবু হাসিমুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
ডাক্তার: মিস্টার ঘোষ, মিষ্টি মুখ করাবেন না! আপনার পুত্র হয়েছে। মা ও শিশু দুজনেই সুস্থ আছে। একটু পরে ওদের কেবিনে দেওয়া হবে। আপনি তখন দেখা করতে পারবেন।
মহিম: চোখে আনন্দাশ্রু নিয়ে আল্লাহকে ডাকছে।
অরুণাভ: মহিম চাচাকে বুকে জড়িয়ে ধরে , চাচা আমি ঈশ্বরকে চোখে দেখিনি। তুমিই আমার কাছে এসোছে পরম করুনাময় ঈশ্বরের কৃপায়।
না হলে এই সংকট অবস্থায় , আমি একা কী করতাম? চাচা, তোমার এই ঋণ আমি শোধ করবো কি করে?
মহিম: ২ বোতল রক্ত দিয়েছি মাত্র। তবে যদি ঋণ মনে করে শোধ করতে চাও , তাহলে লাতি ও বেটিকে নিয়ে এই গরিবের ঘরে একবার এসো।
অরুণাভ: নিশ্চয়ই চাচা, তোমার ঠিকানায় আমরা তিনজন ঠিক পৌঁছে যাবো শ্রীঘ্রই!
মহিম: আল্লাহ মালিক! আমি অপেক্ষায় থাকবো বেটা।
মহিম: তাহলে আসি বেটা?
অরুণাভ: সে কি চাচা! নাতির মুখ দেখবে না?
মহিম: চোখের জল মুছে, এতটা সম্মান কেউ কোনদিন দেয়নি বেটা! এই রিক্সাওয়ালা, এই রিক্সা বলেই ডেকেছে যাত্রীরা।
দীর্ঘ কুড়ি বছর বহু কিছু দেখেছি। বহু মানুষ, সমাজ। কিন্তু তুমি অন্যরকম।
অরুনাভ: আমিও কিন্তু প্রথমে, এই রিকশা বলেই ডেকেছিলাম, চাচা! তোমার সঙ্গে এই দু ঘন্টায় মনে হয়নি যে তুমি অপরিচিত। আজ তোমার উদার মানসিকতা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। একজন সামান্য রিক্সাওয়ালা অর্ধশিক্ষিত হয়েও যে মানবিকতা বা মনুষ্যত্বের পরিচয় দিয়েছো তার জন্য আমি নতজানু থাকবো, তোমার কাছে।
মহিম রহমান: কি যে বলো বেটা, এই পৃথিবীতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকবো যা আমার নসিবে লেখা আছে। সময় শেষ হলে ই ৩ ফুট বাই ৩ ফুট গর্তে চলে যাবো। এই দেহ মাটিতে মিশে যাবে।
মহিম ঠিক আছে বেটা : আসি।
একমাস পরই দুর্গাপুজো। অরুনাভ চাচা ও চাচীর জন্য নতুন জামা কাপড় নিয়ে ওদের ওই বস্তিতে হাজির হয়।
অরুনাভ ওর স্ত্রী ও পুত্র কে দেখে মহিম আনন্দে আপ্লুত।
অরুনাভ: মহিমের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে যায়!
মহিম: আরে ,বেটা কি করছো। আমার পা নোংরা। তোমার জায়গা আমার পায়ে নয়, আমার পরাণে। এই বলে মহিম চাচা অরুণাভ কে বুকে টেনে নিয়ে আলিঙ্গন করে।



খুব ভালো লাগলো গল্পটা পড়ে।
ReplyDelete