1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Friday, October 9, 2026

বক্তিয়ারের স্বপ্ন

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)


বক্তিয়ারের স্বপ্ন

 ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল

দূরের চাষজমির ওপরে সবে সকালের সূর্য উঠেছে। সুলতান ঘুম থেকে উঠে নিজের ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে বারান্দায় এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে। “সুলতান” ভাবতে অবশ্য ওনার নিজের হাসিই পায়। তামাম হিন্দুস্তানের সুলতান তো একজনইঃ মহম্মদ ঘোরি। উনি অবশ্য দিল্লিতে থাকেন না। উনি হিন্দুস্তান শাসন করেন সেই হিন্দুকুশের ঘোর রাজ্য থেকে। আবার কখনও লাহোর থেকে। দিল্লিতে থাকেন ওনার বিশ্বস্ত ক্রীতদাস কুতুবুদ্দিন আইবক। কিন্তু দিল্লি থেকে বহু দূরের দেশ এই গৌড়। এখানে থাকলে মনেই হয় না যে দিল্লির সুলতানের কোনও প্রভাব এখানে আছে। কোথায় সেই দিল্লির কেল্লা আর হাতি ঘোড়ার দাপাদাপি; আর কোথায় এই শস্যশ্যামলা নদীর দেশ। সুলতানের মুদ্রা ব্যবহার করে বাজারে জিনিস কেনার সময় একমাত্র বোঝা যায় যে, দিল্লির একজন শাসক রয়েছেন।

আজ প্রায় দু বছর হল বক্তিয়ার খিলজি এই গৌড় দখল করে রাজত্ব করছেন। সেই কবে আউধের নবাবের একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে জীবন শুরু করেছিলেন বক্তিয়ার। তারপর কয়েক বছরের মধ্যেই কিছুটা নিজের পুরুষকারের দৌলতে আর কিছুটা ভাগ্যের জোরে দেশের এই পূর্ব দিকটা উনি দখল করে ফেলেছেন। এরও পূব দিকে আরও ভূখণ্ড রয়েছে। কিন্তু সেদিকে ঘন জঙ্গল, হিংস্র পাহাড়ি জাতি আর দুর্গম গিরিপ্রান্তরের দুর্লঙ্ঘ্য বাধা। বক্তিয়ার শুনেছেন যে সেই জঙ্গলে নাকি নরমাংসভোজী কিছু আদিম গোষ্ঠীও বাস করে। যদিও সেই কথা সত্যি, না বার বার চেষ্টা করেও সেই পাহাড়ে যুদ্ধজয়ে ব্যর্থ এদেশীয় লোকেদের গুজব, সেটা তিনি জানেন না। তবে, মাঝে মাঝে যে দু একজন পূর্বের পাহাড়ের আদিবাসী হাতির দাঁত বা সাপের বিষ বিক্রি করতে গৌড়ে আসে, তাদের দেখে সেরকম ভয়ঙ্কর কিছু মনে হয়নি।

বারান্দার বাইরে একটা বিশাল আম গাছ। তাতে একটা দোয়েল পাখি বসে ডাকছে। সেইদিকে তাকিয়ে আপন মনেই হেসে ফেললেন বক্তিয়ার খিলজি। একদিন তাঁর চেহারার জন্য দিল্লিতে কোনও সেনাবাহিনীর দলে তাঁর জায়গা হয়নি। মনে আছে, কুতুবুদ্দিন আইবকের একজন সেনাপতি তাঁকে দেখে হেসে বলেছিলেন, “তুই ওই আস্তাবলে গিয়ে ঘোড়াদের মালিশ কর। তরবারি তুলে যুদ্ধ করতে গেলে তুই উল্টে পড়ে যাবি রে লিকপিকে সেপাই। যা ভাগ!” সেই সেনাপতি ছিল তুর্কী। এদিকের বেশিরভাগ লোককেই সে মানুষ জ্ঞান করত না। তার ওপর বক্তিয়ার আবার খলজি। তুর্কীরা এমনিতেই খলজিদের অসভ্য বর্বর ভাবে।

আজকে সেই সেনাপতিটাকে পেলে তার বুকে নিজের তরবারির ধার একবার পরখ করে দেখতেন বক্তিয়ার। সে তুর্কী হলে তিনিও আফগান। সেই অপমান তিনি ভোলেন নি। নিজের দেশ হলে, এরকম কথা যদি কেউ বলত, তাহলে কথা শেষ হওয়ার আগেই তার মাথা ঘাড় থেকে নেমে যেত। এই সেনাপতি যার অধীনে, সেই কুতুবুদ্দিন লোকটাকেও একদম পছন্দ করেন না তিনি। লোকটা ক্রীতদাস। কিন্তু হাবভাব একদম বাদশার মত। এখন মহম্মদ ঘোরি শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করছেন ঠিকই। কিন্তু এর পর এই কুতুবুদ্দিন যদি দিল্লির তখত দখল করে, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এখনই তার হাবভাব বাদশার মত, লক্ষ লক্ষ মুদ্রা দান করেন বিভিন্ন জায়গায়। তাঁর একটা নামই হয়ে গেছে “লাখ বক্স”। বক্তিয়ার আর যাই করুন, একজন ক্রীতদাসের অধীনে থাকবেন না। উনি লড়াই করবেন। অবশ্য এই কুতুবুদ্দিন দিল্লিতে থাকবেন না অন্য কোথাও, সেটা এখন বলা মুশকিল। লোকটা প্রায়ই লাহোরে গিয়ে ফারসী কবিদের সাথে মুশায়েরা করে।

এইসব ভাবছেন, এই সময়ে পেছন থেকে একজনের গলার স্বরে চটক ভাঙল। আলি মর্দান এসেছে। আলি মর্দান তাদের খলজি গোষ্ঠীরই একজন যোদ্ধা। সেই গরমশির থেকে ওরা সবাই একসাথে হিন্দুস্থানে এসেছিলেন কাজের খোঁজে। কাজ মানে ভাড়াটে সৈন্য হিসাবে যে চাকরি দেবে, তাঁর হয়ে লড়াই করা। ওদের সেই গ্রামে লেখাপড়া কেউ শেখে না। দরকারও পড়ে না। হাতে তরবারি ধরতে জানলে আর শত্রুর গর্দান নিতে জানলেই সবার, মানে ছেলেদের জীবন চলে যায়। এই বক্তিয়ার, এই আলি মর্দান, এরা সবাই সেই গরমশিরের খলজি গোষ্ঠীর লোক। ছোট থেকেই তরবারি আর তীরধনুক এদের খেলার সাথী। সেই গজনীর মাহমুদ যখন ভারত আক্রমণ করেছিলেন, তখনও এই আফগান গোষ্ঠীর লোকেরা তাঁর সেনাদলে লড়াই করেছিল। আজ আবার যখন ঘোরির সুলতান দিল্লি-লাহোর দখল করেছেন, তখনও এইসব আফগান পাহাড়ি যোদ্ধারাই ভরসা।

“কী ব্যাপার মর্দান? এত সকালে?” ঘুরে প্রশ্ন করলেন বক্তিয়ার। আলি মর্দান খিলজি বারান্দার সূর্যঘড়ির দিকে ইশারা করে বলল, “নমাজ কী হয়ে গেছে আপনার?”

এই সূর্যঘড়ি নিয়েই যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন বক্তিয়ার। কারণ দিনে পাঁচবার নমাজ পড়তে হয়। এই ঘড়ি ছাড়া সময় ঠিক রাখা যায় না। এদেশে এসে উনি দেখেছেন যে, এখানে প্রহর নামক একটি মাপের সাহায্যে সময়ের হিসেব রাখা হয়। কিন্তু ওনার নমাজের সময়ের সাথে প্রহর মিলবে না। তাই এই একটি ঘড়ি সবসময় ওনার সঙ্গেই থাকে। ওনার কাকা ছিলেন একজন বিখ্যাত বীর। তরাইতে পৃথ্বীরাজ চৌহানের সাথেও যুদ্ধ করেছিলেন। সেই কাকার উপহার এই ঘড়ি। উনি স্মিত হেসে মাথা নেড়ে বললেন, “সে সবে আমার দেরি হয় না।“

আলি একটু হেসে বলল, “সেটা আমি জানি। আপনার সাথে আমার কিছু পরামর্শ আছে। নমাজ যখন হয়ে গেছে, তাহলে শুভ কাজে আর দেরি নয়। চলুন মন্ত্রণা কক্ষে যাওয়া যাক।“

একজন দাসী ইতিমধ্যে একথালা ফল নিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে। সেই থালা থেকে দুটি আমের টুকরো তুলে নিয়ে বক্তিয়ার মন্ত্রণাকক্ষের দিকে পা বাড়ালেন। এই একটি ফল, আম। সেই আফগান দেশে এরকম সুস্বাদু ফল অভাবনীয়। আখরোট, খেজুর, বাদাম—ইত্যাদি উনি অনেক খেয়েছেন সেখানে। কিন্তু এই গৌড়ে এসে একবার রসালো আমের স্বাদ পেয়ে যাওয়ার পর আর ওইসব ফল ভালো লাগেই না। দুঃখের বিষয় হল, এই আম বছরের মধ্যে মাত্র এক-দুই মাস ভালোভাবে পাওয়া যায়।

ঘর থেকে বেরোতে গিয়েও একবার থমকে দাঁড়িয়ে পাশের কুলুঙ্গি থেকে একটা ভোজালি তুলে নিয়ে নিজের পোশাকের ভেতরে রেখে দিলেন বক্তিয়ার। এই খলজিরা বহু দূর দেশ থেকে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করতে এই হিন্দুস্তানে এসেছে। এরা জানে যে, একজন পুরুষের জীবনের মূল্য তাঁর অস্ত্রের আগায় লেখা থাকে। ফলে নিরস্ত্র অবস্থায় কোনও জায়গাতেই উনি যান না। এদিকে আড়চোখে বক্তিয়ারের এই ভোজালি নেওয়াটা লক্ষ্য করল আলি মর্দান। এবং সে মুচকি হেসে নিজের পোশাকের ভেতরে লুকানো ছোরাটা একবার চট করে হাত বুলিয়ে নিল। আলি মর্দানও একজন খিলজি। অস্ত্র ছাড়া সে নিজেও এক পা চলে না। এই অস্ত্র তাকে বহুবার বাঁচিয়েছে, সে মানুষের থেকে হোক, বা শ্বাপদের থাবা থেকে।

---

মন্ত্রণা কক্ষে এসে বসতেই একজন অমাত্য এসে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বলল, “গৌড়ের অধিপতি ইখতিয়ার আল দিন মহম্মদ বিন বক্তিয়ার খিলজিকে ভৃত্যের সালাম।“

এই একটা ব্যাপার বক্তিয়ারের খুব বাজে লাগে। ওনারা যে গোষ্ঠীর মানুষ, তাঁর নাম হল খলজি। কিন্তু হিন্দুস্তানে এসে এটা মুখে মুখে উচ্চারণে হয়ে গেছে খিলজি। এই উচ্চারণ শুনলেই হাসি পায়। তাছাড়া বক্তিয়ার চিরকাল ছিলেন অধীনস্থ সৈনিক। এখন লক্ষ্মণ সেনকে হারিয়ে হঠাৎ করেই এই বিশাল ভূখণ্ডের অধিপতি হয়ে উনি বনে গেছেন রাজা। কিন্তু এই যে চারপাশের সবাই কথায় কথায় ওনাকে এক বিশাল নাম ধরে অতিরিক্ত সম্মান দিয়ে সম্বোধন করে, এতে ওনার বেশ অস্বস্তি হয়। তবে এদেশে এটাই দস্তুর।

এই অমাত্য ওনাকে সালাম করে একটা পেটিকা ওনার হাতে উপঢৌকন হিসাবে তুলে দিল। একটা কাঠের বাক্স। সেটা খুলতেই এক অপূর্ব সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘর জুড়ে। ভেতরে একটা কারুকাজ করা কাঠের পাত্রে একটা কালো নরম দ্রব্য। সেটা থেকেই এই মনমাতানো সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এরকম সুগন্ধ বক্তিয়ার আগে কখনও উপভোগ করেন নি। ওনার মনে হচ্ছিল যেন কোরানে বর্ণিত সেই জন্নত ওনার চারপাশে এসে উপস্থিত হয়েছে। উনি অবাক হয়ে বললেন, “এই অপূর্ব দ্রব্যের নাম কী?”

সেই অমাত্য আলি মর্দানের দিকে তাকাল। আলি বক্তিয়ারের দিকে তাকিয়ে বলল, “বন্ধু, এটার জন্যই তোমাকে এই কক্ষে ডাকা। তাছাড়া আরেকটি ব্যাপারও আছে।“ বলে সেই অমাত্যকে হাত নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলল। বক্তিয়ার সেই দ্রব্য একটু হাতে নিয়ে নিজের পোশাকে লাগালেন।

অমাত্য বেরিয়ে যেতেই একজন খোজা প্রহরী এসে দ্বারের বাইরে বর্শা হাতে দাঁড়াল। এই খোজা প্রহরীরা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ক্রীতদাস। এখন যে এসে দাঁড়িয়েছে, তার নাম মালিক। তাকে বক্তিয়ার পেয়েছিলেন গজনীর এক ক্রীতদাস বাজারে। পুরো রাজদরবারের মধ্যে এরাই বোধহয় একমাত্র লোক, যাদের বক্তিয়ার চোখ বন্ধ করে ভরসা করেন। প্রভুভক্ত কুকুরের থেকেও এই খোজারা বেশি বিশ্বাসী। প্রভুর কথায় এরা চোখ খুলে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতে পারে।

আলি মর্দান ততক্ষণে কথা বলতে শুরু করেছে।

“বন্ধু, একটা প্রস্তাব আছে।“ আলি আর বক্তিয়ার বহুদিন একসাথে যুদ্ধ করেছেন। এক শিবিরে রাত কাটিয়েছেন। এখন বক্তিয়ার গৌড়ের নবাব। কিন্তু অন্তরালে আলি এখনও ওকে “বন্ধু” বলেই সম্বোধন করে। যদিও দরবারসভায় সেটা হয় না। সেখানে বক্তিয়ার রাজা আর আলি তাঁর অধীনস্থ প্রজা। সুতরাং অন্য সব সভাসদের মত আলি মর্দানও সেখানে বক্তিয়ারকে “নবাব হুজুর” বলেই সম্বোধন করে। অবশ্য দরবার সবে কিছুদিন হল শুরু হয়েছে। এখানে একটা বড় সমস্যা হল ভাষা।

বক্তিয়ার এবং তাঁর সঙ্গীরা সব এসেছেন আফগান দেশ থেকে। মোটামুটি সবাই অশিক্ষিত। এরা জানেন কিছুটা ফারসী আর কিছুটা নিজেদের পাহাড়ি গোষ্ঠীর ভাষা। যুদ্ধ করতে তো আর ভাষা লাগে না। কিন্তু এখন শাসক বনে যাওয়ার পর রনহুঙ্কার দিয়ে তো দৈনন্দিন কাজ চালানো যাবে না। ওনাদের ভাষা এদেশে কেউ বোঝে না! এখানে কী একটা অদ্ভুত ভাষা চলে---বাংলা নামে। বক্তিয়ার কিছুই বোঝেন না। ফলে দরবার করাই মুশকিল। কয়েকজন স্থানীয় বণিক কিছুটা দোভাষীর কাজ চালাচ্ছে। কিন্তু তাতে ভালো কাজ হচ্ছে না। বক্তিয়ার ভাবছেন স্থানীয় কিছু লোকের সাহায্যে এখানকার ভাষা শিখবেন। সংস্কৃত বলে একটা ভাষায় যে এদেশের বেশিরভাগ পুঁথি এককালে লেখা হত, সেটা বক্তিয়ার শুনেছেন। কিন্তু সে ভাষা মাত্র কয়েকজনই পড়তে পারে। সেটা দিয়ে হবে না। বরং এর আগের সেনরাজারা যে বাংলা বলে নতুন ভাষাটা চালু করেছিলেন, সেটা অনেক সোজা বলে মনে হয়।

আসার পথে নালন্দায় এক বিশাল বৌদ্ধ বিহার ছিল। সেটা দুর্গ ভেবে বক্তিয়ার সেটা আক্রমণ করেছিলেন। তারপর ঢুকে দেখলেন সেখানে হাজার হাজার ন্যাড়া মাথা সন্ন্যাসী, কোনও রক্ষী নেই। বক্তিয়ার তখন সৈন্য সংগ্রহের জন্য ধনরত্ন খুঁজছিলেন। উনি বারবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের ধনরত্ন যা আছে, সেটার হদিশ আমাকে দিয়ে দাও।“ কেউ ওনার কথাই বুঝতে পারল না। নিজেদের মধ্যে কি একটা অদ্ভুত ভাষায় চেঁচামেচি করতে লাগল। শেষে রেগে উনি সেই বিহারের গ্রন্থাগারে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ওনার নিজের দেশে এরকম গ্রন্থাগার কোনদিন কেউ দেখেনি। এতগুলো লোক যুদ্ধ না করে কেন সারাদিন বসে বসে পুঁথি পড়ত, সেটা বক্তিয়ার বুঝতেও চাননি। দু একটা পুঁথি হাতে তুলে দেখেছিলেন। কিন্তু এক বর্ণও উনি বা ওনার সঙ্গীসাথিরা বুঝতে পারেনি। কিন্তু মুশকিল হল, ওনাদের এই কীর্তির কথা চাউর হতেই সমস্ত বৌদ্ধ বিহার খালি করে সবাই উত্তরে বা পূর্বে পালিয়ে গেছে। এইসব বিহারেই অধ্যাপক বা কথকরা থাকতেন। ফলে, এই দেশে এখন শিক্ষিত লোক পাওয়াই মুশকিল।

এখনও সেই সমস্যা চলছে। এই গৌড়ে বাণিজ্যের প্রচুর সুযোগ। কিন্তু ভাষা না জানলে তো হবে না। উনি শুনেছেন এই গৌড়ের দক্ষিণে নাকি দুটি বন্দর আছে, যেখান থেকে নিয়মিত পণ্যবাহী জাহাজ সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উদ্দেশে যাত্রা করে। কিন্তু ভাষা না জানায় সেই ব্যবসার হালহকিকত উনি বুঝতেই পারছেন না। খিলজি পল্টনের সাথে কয়েকজন মৌলবি আছে, যারা একটু লেখাপড়া জানে। তাদের একজন বক্তিয়ারকে বলেছে যে, এই দেশের লোকেদের পুঁথি নাকি বাম থেকে ডাইনে লেখা হয়। অথচ, বক্তিয়ার এতদিন জানতেন যে, পুথিতে সবসময় লেখা হয় ডান থেকে বামে।  

আলি মর্দান বলে চলে, “বন্ধু। এই যে সুগন্ধ দেখলে, এর নাম কস্তুরি। একে বলা হয় পৃথিবীর সবথেকে দুর্মূল্য বস্তু। এর এক বিন্দু ঘরে থাকলে নাকি একশো বছর সেই ঘরে কোনও বদবু প্রবেশ করে না। এর বাণিজ্যিক মূল্য বুঝতে পারছ তো?”

“বাণিজ্য? কিভাবে?”

“দিল্লির দরবারে সুগন্ধের কতটা কদর, সেটা নিশ্চয়ই তুমি জানো। তুমি আমি দুজনেই কর্মের খোঁজে দিল্লিতে ছিলাম। নিশ্চয়ই মনে আছে যে কত দূর থেকে সুগন্ধী ফুল, আতর ইত্যাদি নিয়ে আসা হয়? দিল্লির বাদশার সব কাজেই সুগন্ধের প্রয়োজন। যদি আমরা এই গৌড় থেকে এই সুগন্ধ দিল্লি এবং সুলতানের দেশ, ঘোরিতে রপ্তানি করতে পারি, তাহলে কী হবে বুঝতে পারছ? তুমি তামাম হিন্দুস্তানের সবথেকে ধনী নবাব হয়ে যাবে! তুর্কী সুলতানেরা এই বস্তু পেলে লুফে নেবে। সারা পৃথিবীর বণিক নেমে আসবে এই লখনৌটিতে।”

বক্তিয়ার ভেবে বললেন, “কিন্তু রপ্তানি? কিভাবে? এখান থেকে দিল্লির পথে বিস্তীর্ণ অরণ্য। বহু দূরের পথ। এটা আমাদের দেশের মত মরুভূমি নয় যে উটে করে চালান দেবে। এদের কিছু হাতি আছে জানি। কিন্তু সেই হাতি দিয়ে কী বাণিজ্য হবে?”

“ঘোড়া? ঘোড়ায় হবে না?”

“আমাদের ওদিকের মত বেগবান অশ্ব এদিকে নেই আলি। এখানকার ঘোড়া খুব একটা তেজি নয়। আরবী অশ্ব আমাদের রয়েছে। কিন্তু সেই অশ্ব সৈন্যদের কাজে লাগে। বা রাজকার্যে নানা জায়গায় পাঠাতে হয়। সেই অশ্ব বাণিজ্যের কাজে লাগানো যাবে না। আমাদের আর অতিরিক্ত অশ্ব কোথায়? এদেশি অশ্ব যা দেখেছি, সেরকম কাজের নয়। ওই অশ্বে করে বাণিজ্য করতে গেলে দস্যুদলের হাতে মৃত্যু অনিবার্য।”

আলি মর্দানের চোখ এবার চকচক করে উঠল। সে বলল, “সেটাই তো বলতে তোমায় ডাকা। আমি আমার গুপ্তচরদের ছড়িয়ে রেখেছি। তারা খবর এনেছে যে এই গৌড় সাম্রাজ্যের সাথে উত্তরের এক রহস্যময় রাজ্যের বাণিজ্যপথ চালু আছে শত শত বছর ধরে। এই রাজ্যের উত্তরে রয়েছে বিশাল পর্বতশ্রেণী। তাঁর উত্তরে নাকি এক রহস্যময় বরফে ঢাকা দেশ আছে। মঙ্গোলদের নাম শুনেছ তো? সেই মঙ্গোলদের একজন নতুন নেতা হয়েছে, চেঙ্গিজ। চেঙ্গিজ খানের অধীনস্থ রাজার দেশ এই বরফপ্রান্তর। সেখান থেকে নাকি দারুণ সব তেজি ঘোড়া এখানে আসে। এই যে লক্ষ্মণ সেন, আজকে বুড়ো হয়েছিলেন বলে তুমি এত সহজে ওনাকে হারিয়ে দিলে। উনি এক সময়ে সেই সুদূর কাশী নামক বিখ্যাত শহরও দখল করেছিলেন এই ঘোড়ার সাহায্যে।“

কাশীর নাম বক্তিয়ার শুনেছেন। কিছুদিন সেখানে উনি ছিলেনও।

চেঙ্গিজ খানের নাম শুনেই বক্তিয়ারের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। এই মঙ্গোল দস্যুর নাম কিছুটা ভেসে ভেসে এত দূরেও এসেছে। এই দস্যুর নাকি মাটিতে পা পড়ে না। এর ঘোড়া নাকি আকাশে উড়ে চলে। এ নাকি অদৃশ্য হয়ে যুদ্ধ করতে পারে। এরকম নানা গল্প আফগান দেশে ঘুরে বেড়ায়। ওখান থেকে কোনও নতুন ক্রীতদাস এলে এইসব গল্প শোনা যায়। চেঙ্গিজ খানের নামে হাত কাঁপে না, এরকম যোদ্ধা পৃথিবীতে নেই। বক্তিয়ার বললেন, “ওরে বাবা। না না। ওই পিশাচের সঙ্গে আমি যুদ্ধ করব না। ও তো একশো ক্রোশ দূর থেকে শত্রুকে বধ করতে পারে।“

“আরে যুদ্ধ করতে কে বলছে? আমরা করব বাণিজ্য। এই যে বরফের দেশ, এর নাম তিব্বত। এটা চেঙ্গিজ খানের নিজস্ব রাজত্ব নয়। ওনার এক মনসবদার এই রাজ্যের অধিপতি। এখান থেকে শত শত বছর ধরে এই সুগন্ধ, যার নাম কস্তুরি, এদেশে আসছে। এছাড়া আমাদের দেশের মত ঘোড়া রয়েছে এদের। সেসবও নাকি রপ্তানি হয়। ভেবে দেখো বন্ধু। যদি এদিক থেকে ঘোড়া আমরা জোগাড় করতে পারি, তাহলে আমাদের সৈন্যদলের চেহারা কী দাঁড়াবে? শুধু এই গৌড় নয়, তুমি দিল্লিও আক্রমণ করতে পারবে। আরব দেশ থেকে যা ঘোড়া এদিকে আসে, প্রায় সবই দিল্লির সুলতানের আস্তাবলে ঢুকে যায়। সেই ঘোড়া বুড়ো না হলে সুলতান কাউকে দেন না। এরকম তেজি ঘোড়া যদি তিব্বত থেকে তুমি আনতে পারো, তাহলে কেল্লাফতে হবে। এরকম ঘোড়া এদেশে কারুর নেই। তোমার সাথে যুদ্ধে কেউ দাঁড়াতেই পারবে না। আজকে কুতুবুদ্দিন চুপ করে আছে। কিন্তু কালকে যদি মহম্মদ ঘোরির এন্তেকাল হয়, তখন কি সে তোমাকে ছেড়ে দেবে ভেবেছ? সে তার তুর্কী সেনা পাঠাবেই।“

বক্তিয়ার চুপ করে ভাবলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “ঠিক আছে। আমি ভেবে বলছি। সামনেই বর্ষা। এদেশে এসে যেরকম বৃষ্টি দেখছি, সেরকম আমাদের দেশে ছিল না। এই বর্ষায় যুদ্ধ হবে না, বাণিজ্যও হবে না। বর্ষার পরে ভেবে দেখব।“

আলি উঠে পড়ল। উনি যখন বেরিয়ে যাচ্ছেন, তখন বক্তিয়ার তাকে ডেকে বললেন, “আলি, একটা কথা। আমরা অনেকদিন সহযোদ্ধা ঠিকই। কিন্তু আমাকে আর তুমি বন্ধু বলে ডেকো না। আমাদের সম্পর্ক যেরকম ছিল সেরকমই থাকবে। কিন্তু তুমি আমাকে নবাব বলেই সম্বোধন কর এরপর থেকে। নইলে লোকে খারাপ ভাববে।“

হেসে বেরিয়ে গেল আলি মর্দান। যাওয়ার সময়ে বলল,”নবাব, আমাদের সাথে যা ঘোড়া এসেছিল, অনেকগুলোই কিন্তু মরে গেছে। আজকে চারিদিক শান্ত। কিন্তু যে কোনদিন অন্য শত্রু আক্রমণ করতে পারে। আপনি যে এখানে শাসক হয়েছেন, সেটা দিল্লি দরবারের অনেকেই সুনজরে দেখে না। তাদের কেউ আবার আক্রমণ করতে পারে।“

খোজা প্রহরী মাথা নিচু করে পারস্য কায়দায় অভিবাদন জানাল। এদেশে আলি দেখেছে দুই হাত জোড় করে বুকের সামনে ধরে কেমন একটা অদ্ভুত কায়দায় অভিবাদন জানায়। এরা বলে “প্রণাম”। কিন্তু ওনাদের দরবারে সেই পারস্যের শাহের দরবারের কায়দাই চলে।

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আলি দাঁতে দাঁত ঘষে নিজের মনে বলল, “সেদিনের দু পয়সার ভাড়াটে সৈন্য। আমরা একসাথে লড়াই করেছি। আজকে তুমি এই দেশের শাসক হয়ে নিজেকে অতিমানব ভাবতে শুরু করেছ। লক্ষ্মণ সেনকে তুমি একা হারাতে পারতে? যদি আমরা সবাই তোমার সাথে না থাকতাম? সেদিনের সেই ১৮ জন অশ্বারোহীর মধ্যে আমিও ছিলাম নদীয়ায়। দাঁড়াও। মজা দেখাচ্ছি। তুমি খলজি হলে আমিও খলজি। তোমার সেই গুমর আমি শেষ করবই। অসভ্য বর্বর শয়তান একটা। এই গৌড়ের মাটিতেই আমি তোমাকে কবর দেব।“ এই বলে নিজের পোশাকের ভেতরের অস্ত্রটা একবার চেপে ধরে দ্রুতপায়ে নিজের ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল আলি মর্দান।

---

বক্তিয়ার এদিকে দেরি না করে সেনাপতি মহম্মদ শিরানকে ডেকে পাঠালেন। শিরান এসে সালাম করে দাঁড়াল। বক্তিয়ার বললেন, “ শিরান, তিব্বত সম্পর্কে কী জানো?”

শিরান অবাক হয়ে বললেন, “ওই দেশ নিয়ে হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন নবাব?”

“আমি ভাবছি সেই দেশে একটি অভিযান করব। তুমি কী নাম শুনেছ? পথ চেন?“

মহম্মদ শিরান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “নাম তো শুনেছি হুজুর। বৌদ্ধ বিহারগুলি আমরা ধ্বংস করার পর যে সব বৌদ্ধ সন্ন্যাসী পালিয়ে গিয়েছিলেন, তারা নাকি এখন সেখানেই আশ্রয় নিয়েছেন। সে বড় দুর্গম দেশ। নবাবের যদি সেটাই ইচ্ছে হয়, তাহলে তাই হবে। আমি কি সৈন্য প্রস্তুত করব?”

বক্তিয়ার একটু কৌতুকভরে তাঁর অনিচ্ছুক মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার কি কিছু বলার আছে?”

শিরান মাথা নিচু করে বললেন, “নবাব হুজুর। আমি আপনার চাকর। আপনি যা বলবেন, সেটা পালন করাই আমার কাজ। এখানে আমার আপত্তির প্রশ্ন ওঠে না।“

“তাও। তুমি তিব্বত নিয়ে কিছু বলতে চাও? নির্ভয়ে বল।”

“হুজুর। সে বড় ভয়ঙ্কর দেশ। সেখানে পাহাড়ের ওপর বরফ। সেই বরফের ভেতরে জ্বিন পরীর দল থাকে। সেখানে নাকি লামারা হাওয়ায় ভেসে বেড়ান। সেখানে নাকি ভয়ঙ্কর সব দানব আর পিশাচ পাহাড়ের গিরিপথ পাহারা দেয়। কোনও মানুষ সেখানে গিয়ে আজ অবধি যুদ্ধে জিততে পারেনি।“

“ছিঃ শিরান। তুমিও তো একজন খলজি বংশের সৈন্য। তুমি এদেশের ভিতু লোকেদের মত কথা বলছ কেন? এদেশে এসে অবধি দেখছি এখানকার লোক সবাই নানারকম ভূত প্রেত, সংস্কারে বিশ্বাস করে। এখানে থেকে তোমারও সেই হাওয়া লাগল নাকি? এরকম কাপুরুষের মত কথা বললে আমি তোমাকে আর আমার সেনাপতি রাখতে পারব না। খিলজি বংশের পুরুষ তুমি। এ কী কথা? যাও, সৈন্য প্রস্তুত কর। বর্ষার পরেই আমাদের অভিযান শুরু হবে। আমি চাই এই লখনৌটিতে একদিন তিব্বতের রাজা এসে মাথা নিচু করে ভেট দিয়ে যাবে। আমরা খলজি। মরুসিংহের সাথে লড়াই করে আমরা পথ চলি। আর তুমি ওই পাহাড়ে থাকা কিছু ইঁদুরের ভয়ে কাঁপছ? লজ্জা করে না?”

শিরান আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।

---

ইতিমধ্যে আলি মর্দান একদিন একজন স্থানীয় ব্যক্তিকে নিয়ে এলেন বক্তিয়ারের কাছে। “নবাব, এর নাম আলি মেচ। আমাদের নতুন বন্ধু।“

আলি মেচের চেহারা পাহাড়ি জাতির মত। ছোট ছোট চোখ, একটু খর্বকায়। সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ফারসীতে বলল, “পৃথিবীর অধীশ্বর নবাব বক্তিয়ার খিলজিকে দাসের সালাম।“

এরকম সম্বোধন শুনলে যে কেউ খুশি হয়ে যাবে। বক্তিয়ার জিজ্ঞাসু চোখে আলি মর্দানের দিকে তাকাতেই সে বলল, “আলি মেচ এই গৌড়ের উত্তরে যে পাহাড় রয়েছে, সেখানকার অধিবাসী। নিজের প্রায় পাঁচশো অনুচরের সাথে আলি মেচ সম্প্রতি আমাদের দলে এসেছে। এরা মেচ উপজাতির লোক। তুষারচিতা বা সরীসৃপের মতোই পাহাড়ি পথঘাট চেনে। আর তীর ধনুক চালাতেও এদের জুড়ি নেই। আপনি এর কথা শুনুন নবাব।“

আলি মেচ বলল, “নবাব হুজুর, জনাব আলি আমাকে আপনার তিব্বতের অভিযানের কথা বলেছেন। আমি এবং আমার অনুচরেরা আপনাকে নিয়ে যেতে প্রস্তুত।“

“রাস্তা কেমন? কতদিন লাগতে পারে?”

“হুজুর, রাস্তা অতি দুর্গম। চেনা না থাকলে জঙ্গলে পথ হারাবেই। জঙ্গলে রয়েছে হিংস্র পশু। রয়েছে অজস্র গোলকধাঁধা। গভীর খাদ, আকাশ অবধি উঠে যাওয়া খাড়াই। কিন্তু চিন্তা নেই। আমাদের জন্ম থেকেই এই পাহাড়ে বাস। তিব্বতের বনিকেরা যাওয়া আসার পথে আমাদের গ্রামেই বিশ্রাম নেয়। আমাদের অনেক লোক ওদের কুলির কাজ করে। পথ আমরা চিনি। আপনাদের মত মানুষ আগে এইদিকে আসেন নি। আপনারাই প্রথম এই হিমালয়ে তুর্কীস্থানের প্রতিনিধি হয়ে পা রাখবেন।“

বক্তিয়ার আর বললেন না যে, খলজিরা তুর্কী নয়। এরা আফগান দেশের এক পাহাড়ি জাতি। তুর্কীরা বরং এদের নিচু চোখেই দেখে। দিল্লিতে যখন কাজ খুঁজছিলেন, তখন তুর্কী সৈন্যরা এদের নিয়ে হাসাহাসি করত।

বক্তিয়ার হেসে বললেন, “তাহলে আর দেরি কেন? যত শীঘ্র সম্ভব আমরা যাত্রা শুরু করব। আমি আমার সমস্ত ঘোড়সওয়ার সেনাকে নিয়েই যাব। এই গৌড়ে যা অবস্থা দেখছি, তাতে কিছু রক্ষী রাজধানীতে রেখে গেলেই যথেষ্ট। এখানকার লোক আমার অবর্তমানে বিদ্রোহ করবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া আলি মর্দান, শিরান, এরা তো থাকবেই গৌড়ে পাহারা দেওয়ার জন্য। তিব্বত দখল করে, সেই বিখ্যাত পাহাড়ি ঘোড়ার দল নিয়ে আমি ফিরে আসব।“

আলি মেচ কি একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আলি মর্দান চোখ টিপে তাকে নিষেধ করলেন।

বক্তিয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আলি মর্দান ফিসফিস করে বলল, “নবাবের কথার ওপর কথা বলছ কেন? প্রাণের মায়া নেই নাকি?”

আলি মেচ ব্যাকুল স্বরে বলল, “কিন্তু আলি ভাই, ওই জঙ্গল, পাহাড়ের পথে এই আরবী ঘোড়া নিয়ে গেলে তো মৃত্যু অনিবার্য। ওখানে তো ঘোড়সওয়ার নিয়ে যাওয়া যায় না। ওখানে যুদ্ধের নিয়ম তো অন্য।“

“তুমি চুপ করে থাক। নবাব যেমন খুশি হলে তোমাকে ইনাম দেবেন, সেরকম যদি ওনার অভিযান নিয়ে বিরুদ্ধ কিছু বল, তাহলে তোমার গর্দান নিতেও ওনার আটকাবে না। তোমার কাজ পথ দেখিয়ে দেওয়া, সেটা তুমি করবে। নবাব বক্তিয়ারের ইচ্ছে হয়েছে উনি তিব্বতে যুদ্ধ করতে যাবেন, তুমি সেই অভীপ্সায় বাধা দিলে তাঁর ক্রোধের শিকার হবে। এখন যাও।“

---

দেখতে দেখতে শুরু হয়ে গেল বক্তিয়ার খিলজির তিব্বত অভিযান। দেবকোট বলে একটা জায়গা থেকে শুরু হল অভিযান। ঠিক হল যে আলি মর্দান সেখানেই থাকবে। নবাবের অবর্তমানে যদি পূর্ব থেকে কেউ আক্রমণ করে, তাহলে আলি মর্দান দেবকোট থেকে সেটা সামলাবে।

বেশিরভাগ সেনাই আফগান। স্থানীয় লোক কিছু আছে ঠিকই। কিন্তু তারা পেছনের সারিতে। সামনে সব তুর্ক-আফগান সৈন্য। আলি মেচ একটা গাধায় চড়ে সামনে এগিয়ে চলল, তাঁর সাথে তাঁর বেশ কিছু অনুচর। কেউ গাধায়, কেউ খচ্চরে। সবাই খর্বকায়, পরনে মামুলি সুতির পোশাক। ওদের সাথে খাদ্য আর অন্যান্য রসদ। আর পেছনে বক্তিয়ারের নেতৃত্বে দশ হাজার সেনা। আরবী ঘোড়ার খুরের শব্দে চারিদিক প্রকম্পিত করে এগিয়ে চলল সেনাদল।

যতই উত্তরে এগিয়ে চললেন তারা, ততই বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল। নদীয়া বা লখনৌটিতে যেরকম শস্যপূর্ণ মাঠের গালিচা, এদিকে সেরকম নয়। সবচেয়ে বড় কথা, এদিকে নদী অনেক বেশি। এবং সেগুলো বেশ খরস্রোতা। নদীয়ার সেই নদীর মত শান্ত নয়। এক একটা নদী পেরোতে বহুক্ষণ সময় লাগে। যে আরবী ঘোড়া দুস্তর মরুভূমি বা রুক্ষ প্রান্তরে হাওয়ার বেগে চলে, সেই ঘোড়াই এই পাহাড়ি নদী দেখলে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। চলতে চায় না। প্রায় জোর করে টেনে টেনে তাদের জলে নামাতে হয়।

প্রায় দুই সপ্তাহ পরে ওরা এসে হাজির হলেন এক গহন জঙ্গলে। এখানে বাঁশের ঝাড়ই বেশি। বক্তিয়ার এর আগে সেনরাজাদের সাথে যুদ্ধের সময়ে জঙ্গল পেরিয়েই নবদ্বীপ আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু সেই জঙ্গল তুর্কী অসির ফলায় ছিন্নভিন্ন করতে সময় লাগেনি। কিন্তু এই বাঁশের বন তরবারি বা ভোজালিতে বাগ মানে না। আলি মেচ এবং তার দলের লোকেরা কুঠার দিয়ে সেই বাঁশের ঝাড় কেটে কেটে পথ বানায়। তারপর একটু করে অগ্রসর হতে হয়। তরবারি দিয়ে সেই বাঁশের কাণ্ডে আঘাত করলেও কিছু হয় না। আলি মেচ বলেছে যে, এই জায়গার নাম নাকি কামরূপ।

কিছুদিন পর জঙ্গলের মধ্যে একটা বেশ বড় পরিষ্কার জায়গায় এসে উপস্থিত হল সবাই। তখন বক্তিয়ারের একজন সেনাপতি এসে বলল, “নবাব, আমাদের সেনানীর মধ্যে অনেকেই জ্বরে কাতর। ওই দূরে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে। সেখানে বৈদ্য আছে কিনা দেখবেন?”

সত্যি। এই কামরূপের জঙ্গলে প্রবেশ করেই জ্বর শুরু হয়েছে। বক্তিয়ার নিজে এখনও সুস্থ। কিন্তু তার সেনাদলের অনেকেই জ্বরে বেশ কাতর। অনেকে মারাও গেছে এর মধ্যে। বক্তিয়ার বললেন, “ঠিক আছে, একজন দূত পাঠাও ওই গ্রামে।“

আলি মেচ বলল, “আমি যাচ্ছি হুজুর। ওদের ভাষা আমি ছাড়া কেউ বুঝব না। আমি দেখছি।“

কিছুক্ষণ পরে আলি মেচ এসে জানাল, “হুজুর, ওটা গ্রাম নয়। মৃগয়া শিবির। কামরূপের মহারাজা ওখানে উপস্থিত আছেন। উনি মৃগয়ায় এসেছেন এখন। ওনার সাথে বৈদ্য আছে। তিনি আসছেন।“

বক্তিয়ার বললেন, “কামরূপের রাজা? তাঁকেও আসতে বল এখানে। এই নাও, দশটি লক্ষ্মী মুদ্রা। এটা নজরানা দিয়ে ওনাকে এই শিবিরে আমন্ত্রন জানাও।“

মহম্মদ ঘোরি সম্প্রতি এই লক্ষ্মী মুদ্রা চালু করেছেন। ভারতের প্রাচীন এক দেবীর ছবি দেওয়া এই স্বর্ণমুদ্রাই এখন হিন্দুস্তানে চলে।

---

কিছু পরে আলি মেচের সাথে কামরূপের মহারাজা এসে উপস্থিত হলেন। সাধারণ চেহারা। মাথায় পাগড়ি। অভিজ্ঞ যোদ্ধার চোখ দিয়ে তাকে জরিপ করে বক্তিয়ার বুঝলেন যে ওই হাতের লাঠিটা ছাড়া কামরূপরাজের অঙ্গে আর কোনও অস্ত্র নেই। উনি অবাক হলেন না। এদেশে এসে উনি আগেও দেখেছেন যে, এখানকার লোক খুব সহজে অন্যকে বিশ্বাস করে। ওঁর নিজের দেশ, হেলমন্দে কোনও রাজা কেন, কোনও গ্রামের সরপঞ্চও অস্ত্র না নিয়ে কোনও আলোচনাসভায় যান না! কিন্তু এখানে রাজারাও নিরস্ত্র অবস্থায় চলাফেরা করেন। লক্ষ্মণ সেনকে আক্রমণের পর নবদ্বীপের সেই প্রাসাদ তছনছ করার সময়ে বক্তিয়ার অবাক হয়ে দেখেছিলেন যে, সেই প্রাসাদে প্রায় কোনও অস্ত্রই ছিল না। বৃদ্ধ রাজা নাকি শেষ জীবনের বাণপ্রস্থ সেখানে কাটাচ্ছিলেন। যাই হোক। রাজা তো! তিনি যে প্রাসাদে থাকছেন, সেখানে যথেষ্ট অস্ত্র থাকবে না? বক্তিয়ার অবাক হয়েই ভেবেছিলেন, এই লক্ষ্মণ সেন নাকি কাশী অবধি  জয় করে বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক। সেই লোক কিভাবে অস্ত্র ছাড়া অধিষ্ঠান করেন, সেটা বক্তিয়ারের কল্পনার অতীত।

কামরূপরাজ একটি ঝুড়িতে কয়েক রকম ফল, হরিণের মাংস এবং কিছু সুগন্ধী কাঠ দিয়ে বক্তিয়ারকে অভিবাদন জানালেন। বক্তিয়ার কামরূপরাজকে সরাসরি বললেন, “আমি তিব্বতে অভিযানে যাচ্ছি। আপনি আমার সঙ্গে চলুন। যা লুঠ করব, তার অর্ধেক আপনি নেবেন। আপনি আপনার সেনাবাহিনী এবং অস্ত্র নিয়ে আমাদের সাথে আসুন।“

আলি মেচ অনুবাদ করে কামরূপরাজকে বলল কথাটা। শুনে কামরূপরাজ বক্তিয়ারের দিকে নিস্পলক তাকিয়ে রইলেন। ওনার মুখ বেশ লাল হয়ে উঠল। তারপর তিনি নিচু স্বরে কিছু বলেই নিজের শিবিরের দিকে হাঁটা লাগালেন। আলি ভয়ে ভয়ে বলল, “রাজামশাই বলেছেন যে তিব্বতের বণিকেরা আমাদের বন্ধু। শত শত বছর ধরে আমাদের মধ্যে বাণিজ্য চলছে। উনি ওদের দেশ আক্রমণ করবেন না। এবং উনি আপনাকেও ফিরে যেতে বলেছেন।“

বক্তিয়ার শুনেই লাফিয়ে উঠলেন। এই জঙ্গলের বানরের এত সাহস? গৌড়ের অধিপতিকে এভাবে অপমান? উনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “আক্রমণ কর্‌ ওই শিবির। সমস্ত জ্বালিয়ে দে। আর রাজার মুণ্ডটা কেটে আমার কাছে নিয়ে আয়।“

বক্তিয়ারের সেনা ঘোড়ায় উঠে আক্রমণ করল। কিন্তু কামরূপরাজের শিবির ছিল একটা বাঁশবনের পেছনে। বাঁশবন ভেদ করে সেখানে যেতে যেতেই রাজা তার সমস্ত লোকজনসহ গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেলেন। যে কয়েকজন শিবির রক্ষার জন্য সেখানে ছিল, এই আফগান সেনার স্রোতে ভেসেই গেল। বক্তিয়ারের সেনা সেই খালি শিবিরে আগুন লাগিয়ে আর স্তূপীকৃত খাবার রসদ লুঠ করেই ফিরে গেল। একবার ওরা সেই গভীর জঙ্গলের দিকে এগোতে গিয়েছিল। কিন্তু গাছের ফাঁক দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ওদের দিকে ছুটে এল। সামনের কয়েকজনের বর্ম ভেদ করে সেই তীর রক্তের স্রোত বইয়ে দিল। আলি মেচ চীৎকার করে বলল, “ওদিকে যাবেন না। বিষাক্ত তীর ছুঁড়ছে। মরে না গেলেও পঙ্গু হয়ে যাবেন।“

রাগে ওরা জঙ্গলের সেই অংশেও আগুন লাগিয়ে দিল। কিন্তু কামরূপরাজকে আর দেখা গেল না। যে কয়েকজনের গায়ে বিষাক্ত তীর লেগেছিল, তারা অবশ হাত পা নিয়ে কোনরকমে হামাগুড়ি দিয়ে পালাতে লাগল।

---

দিনে দিনে পথ বন্ধুর হয়ে উঠছে। ঠাণ্ডাও সেরকম। বক্তিয়ারের ঘোড়সওয়ার সেনারা আর চলতে পারে না। তার ওপর রয়েছে মশা নামক একরকম পোকার উপদ্রব। এই কামরূপের জঙ্গলে এই পোকা দিনে রাতে সবসময় ছেঁকে ধরে। বাঘের আক্রমণেও বেশ কিছু প্রাণ গেছে। সেনাদের অনেকেই আর যেতে চাইছে না। মহম্মদ বেগ বলে একজন সেনাপতি তো বিদ্রোহই ঘোষণা করেছিলেন। একদিন বিকেলে একটা পাহাড়ি নদী পেরোতে গিয়ে মহম্মদ বেগের জোয়ান ছেলে জলের তোড়ে ভেসে গেল সবার সামনে। ছেলের দুঃখে মহম্মদ বেগ বর্শা নিয়ে বক্তিয়ারের দিকে ছুঁড়তে যাচ্ছিলেন। আলি মেচ ঠিক সময়ে তার বুকে ভোজালি ঢুকিয়ে না দিলে সেদিন বিপদ হতেই পারত। দশ হাজার সেনা নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন বোধহয় তিন হাজারে এসে ঠেকেছে।

আরেকটা বিপদ হল, পথে কোনও রসদ পাওয়া যায় না। এর আগে বক্তিয়ার যেখানেই আক্রমণ করেছেন, সেখানে পথের দুপাশে অজস্র গ্রাম। এদেশের পবিত্র নদী, গঙ্গার দুপাশের সেইসব গ্রামে খাবারের অভাব নেই। রসদ সংগ্রহ করতে করতেই তারা এগিয়েছেন। কিন্তু এই জঙ্গলে খাবার কোথায়? হরিণ শিকার কিছু করেছেন। কিন্তু এত মানুষের জন্য সেটা পর্যাপ্ত নয়। দুএকটা গ্রাম পাওয়া গেছে। কিন্তু সেখানে সেরকম খাবার পাওয়া যায়নি। অনেক সেনা নিজেদের ঘোড়া মেরে খেয়েছে। আলি মেচের সাথের লোকজন জঙ্গলের বুনো শুয়োর মেরে খেয়েছে। কিন্তু বক্তিয়ারের ধর্মে সেই মাংস হারাম। ফলে তিনি এবং তাঁর আফগান সেনারা কোনরকমে খাবার জোগাড় করে দিন কাটাচ্ছেন। এদিকের জঙ্গলে সেরকম সুস্বাদু ফলও নেই। কয়েকটা ফলের গাছ ছিল। কিন্তু তার একটার ফল মুখে দিয়েই অনেকের বমি শুরু হল।

অবশেষে ওরা এসে উপস্থিত হলেন এক উষর প্রান্তরে। চারিদিকে কালো কালো পাহাড়। রাতে তো বটেই, দিনের বেলাও বরফ ঝরে পড়ছে আকাশ থেকে। গাছপালা প্রায় নেই। কয়েকটা উঁচু উঁচু গাছ। তার পাতা ছুঁচের মত। কোনও ছায়া নেই। দূরে পাহাড়ের ওপর কয়েকটা বাড়ি দেখা যায়। কিন্তু সেই পাহাড়ে ওঠা সম্ভব নয়। ঘোড়া নিয়ে চলতে গিয়ে অনেকেই পাহাড়ের খাদে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। বক্তিয়ারের নিজেরও হাতের তিনটে আঙুল কালো হয়ে গেছে। আলি মেচ বলেছে, এটা নাকি ঠাণ্ডার ফল। ও একটা গাছের ডাল চিবিয়ে সেই কালো আঙ্গুলে বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু বক্তিয়ার কোনও সার পাচ্ছেন না আঙুলে।

একদিন রাতে শিবির ফেলে বক্তিয়ার আলিকে ডেকে পাঠালেন। “আর কতদূর? যে দশ হাজার সেনা ছিল, তার তো চার ভাগের এক ভাগও আর নেই!”

“হুজুর, এটা হল চুম্বি উপত্যকা। এটা তিব্বতের সীমানার ঠিক বাইরে। এরপর কয়েকটা গিরিপথ পেরিয়ে আমরা মূল তিব্বতে প্রবেশ করব। তারপর সেই কস্তুরির এলাকা শুরু হবে।“

“খাবার তো আর নেই।“

“হুজুর, একটু কষ্ট করুন। মূল তিব্বতে প্রবেশ করলে চমরী গাই এর মত অনেক প্রাণী পাবেন। এখানে আর কয়েক দিন।“

পরদিন থেকে রাস্তায় শুধু বরফ। দিনের বেলা চোখ ঝলসে যায়। রাতে হাত পা জমে যায়। আরবী ঘোড়া আর চলতে পারে না। শেষে সবাই ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে চলতে লাগল। জনমানুষের দেখা নেই। একটা পাহাড়ের ঢালে কয়েকঘর বাড়ি দেখা গেল। খিদের জ্বালায় বক্তিয়ারের কয়েকজন সৈন্য সেই পাহাড় বেয়েই উঠে সেইসব বাড়িতে হানা দিয়েছিল। কিন্তু সেইসব বাড়িতে ছিল একটা অদ্ভুত কালো রঙের ছোট ছোট পাতা। মাখন দিয়ে সেটাই মিশিয়ে নাকি সেইসব লোক খায়। সেই পাতা মুখে দিয়েই আফগান সেনারা থু থু করে ফেলে দিয়েছে। এইসব পাহাড়ি লোক ওদের বিষাক্ত গাছ খাইয়ে দিচ্ছে মনে করে কয়েকজনকে মেরেও ফেলেছে। কিন্তু খাবার পাওয়া যায় নি। একরকম পাহাড়ি ছাগল আছে। কিন্তু তাদের ধরতে গেলে তারা সটান খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে যায়। ওই খুর নিয়ে কিভাবে যে খাড়া পাহাড়ে এরা ওঠে, সেটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না।

মাখন মেশানো সেই খাবার বক্তিয়ারের কাছে নিয়ে এসেছিল একজন সৈন্য। বক্তিয়ার দেখে নাক কুঁচকে বললেন, “এটি কী? মাখনের মধ্যে এরকম কালো কালো কী এগুলো?”

আলি মেচ কাছেই ছিল। বলল, “হুজুর এই পাতার নাম চা। তিব্বত থেকে আসে। আমাদের দেশে কেউ খায় না। কিন্তু এই তিব্বতে এরা মাখনের সাথে এই চা পাতা মিশিয়ে খেয়েই দিন কাটায়।“ বক্তিয়ার একবার একটু মুখে দিয়েই ফেলে দিলেন। একদমই ভালো লাগেনি তাঁর। আলি মেচ বলল, “হুজুর, এখন কয়েকদিন এ ছাড়া আর খাবার নেই। সঙ্গের মাংস সব শেষ। এখানে কোনও ফল বা সবজি পাওয়া যায় না। এই মাখন দিয়ে চা পাতা ছাড়া আর কিছু পাবেন না।“

সেদিন রাতে শিবিরে ঢুকে সবাই কোনরকমে ঢাকাঢুকি দিয়ে বসে রইল। এই ঠাণ্ডায় ঘুম আসে না। এই ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা সেই তুর্কী আফগান সেনারা কোনদিন দেখেইনি। এখানে গাছপালাও নেই, যে কাঠ কেটে আগুন জ্বালবে। শেষে কয়েকজন সেনা আর থাকতে না পেরে নিজেদের তাঁবুর কাপড় ছিঁড়ে আগুন লাগিয়ে একটু হাত পা গরম করার চেষ্টা করতে লাগল। সেই দেখে আরও কয়েকজন সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। এরপরেই শুরু হল মারামারি। ওইটুকু আগুন। একদম কাছে না দাঁড়ালে কোনও গরম আসেই না। কিন্তু কজন আর সেখানে জায়গা পাবে। ঠেলাঠেলি করতে গিয়ে একজন হুমড়ি খেয়ে আগুনের ওপরেই পড়ে গেল। ব্যাস। অমনি মারামারি বেঁধে গেল। খোলা তরবারি নিয়ে তেড়ে এল অনেকে। বক্তিয়ার দূরে বসে দেখছিলেন। কিন্তু তাঁর হাত পা প্রায় জমে যাচ্ছে ঠাণ্ডায়। উনি আর উঠে এই বিবাদ মেটানোর মত শক্তি পেলেন না। লোকের পায়ের চাপে আগুন নিভে গিয়েছিল। তাঁর মধ্যেই মারামারি, অস্ত্রের ঝনঝনানির শব্দ চলতে থাকল।

---

পরদিন সকালে আলি মেচ তাড়াতাড়ি সবাইকে তুলে দিল। বলল, “এরপর রোদ বেড়ে গেলে বরফে চোখ ঝলসে যাবে। সূর্য মাথার ওপরে ওঠার আগেই যতটা সম্ভব এগিয়ে যেতে হবে। মধ্যদিনে কোনও গুহায় আশ্রয় নিতে হয়। সেই সময়ে এই বরফের মধ্যে হাঁটতে গেলে চোখ খারাপ হয়ে যাবে।“

যে যে পারল, উঠে চলা শুরু করল। খাবার প্রায় শিবিরে আর কিছুই নেই। বক্তিয়ার হেঁটে যাওয়ার সময়ে দেখলেন আগের দিনের সেই মারামারির জায়গায় রক্ত শুকিয়ে বরফ লাল হয়ে আছে। চারপাশে দশ বারো জনের মৃতদেহ ছড়ানো। অবশ্য তাঁরা দুরন্ত আফগান যোদ্ধা। মৃতদেহ দেখে ভাবালুতা বা বিকার, কোনটাই তাদের হয় না। সবাই তার পাশ দিয়েই হেঁটে চলে গেল। বেশিরভাগ ঘোড়া এতদিনে হয় মরে গেছে। যে কটা বেঁচে ছিল, তারাও আর পাহাড়ি পথে উঠতে চায় না। একজন সেনা নিজের ঘোড়াকে অনেকবার ঠেলা মেরেও ওঠাতে না পেরে হঠাৎ প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে ঘোড়ার গলায় তরবারি বসিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে সেই সেনা এবং চারপাশের লোকের পোশাক ভিজে গেল রক্তে।

বক্তিয়ার সেদিকে তাকিয়ে বললেন, “ঘোড়াটার মাংস কেটে সঙ্গে নিয়ে চল। পথে কাজে লাগবে। আর তো কিছুই নেই।“ ইতিমধ্যে আলি মেচ বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। বক্তিয়ার সেদিকেই পা বাড়ালেন।

---

বিপদটা এল ঘণ্টাখানেক পরেই। রাস্তার একদিকে গভীর খাদ। অন্যদিকে পাথর আর বরফ। পা টিপে টিপে চলতে হয়। সঙ্গের চামড়ার জুতো বরফে পিছলে যায়। কিন্তু জুতো থেকে পা বার করে হাঁটতে গেলেই মুহূর্তে আঙ্গুলে সার থাকে না। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আঙুল কালো হতে শুরু করে। একটা সংকীর্ণ গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে সবাই। আলি মেচ দূরে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ওই সামনের পাহাড়ের পিছনেই মূল তিব্বত রাজ্য শুরু।“ হঠাৎ পেছন থেকে একটা প্রচণ্ড জোরে শব্দ শোনা গেল।

বক্তিয়ার চমকে উঠে পিছন ফিরে দেখলেন একটা বড় পাথর ওপর থেকে গড়িয়ে পড়েছে পশ্চাতের লোকের ওপর। উনি কিছু বোঝার আগেই আলি মেচ চীৎকার করে উঠল, “পালাও পালাও। কেউ এখানে দাঁড়িও না।“ সে হাত ধরে বক্তিয়ারকে টেনে সামনের দিকে ছুটে চলল। কিছুক্ষণ পর একটা বড় পাথরের নীচে এসে তবে সে থামল। পাথরটা পাহাড়ের গা থেকে একটা বড় চাতালের মত সামনে বেরিয়ে আছে।

বক্তিয়ার বলল, “কী হল? আমাকে এভাবে নিয়ে এলে কেন?”

আলি কোনও কথা না বলে সেই গিরিখাতের দিকে ইশারা করল। বক্তিয়ার তাকিয়ে দেখলেন পাহাড় থেকে রাশি রাশি বরফ নেমে এসে সেই জায়গাটা পুরো ঢেকে দিয়েছে। আলি বলল, “হুজুর পাহাড় থেকে যখন পাথর গড়িয়ে পড়ে, তখন সে তো একা আসে না। সঙ্গে বরফের এক বিশাল পরিমাণ অংশও গড়িয়ে নামে। ওখানে থাকলে পাথরে চাপা না পড়লেও বরফে মৃত্যু অনিবার্য ছিল।“  

বক্তিয়ারের সাথে থাকা লোকেদের কেউ কেউ ছুটে এসে সেই পাথরের চাতালের  নিচেই আশ্রয় নিল। কিছুক্ষণ পর যখন সব শব্দ থেমে গেছে, তখন ওরা ফিরে চললেন অকুস্থল দেখতে। কাছে গিয়ে বোঝা গেল যে, পাথরটা খুব বড় নয়। কিন্তু অনেক উচ্চতা থেকে পড়েছে বলে অভিঘাত হয়েছে বেশি। কতজন যে নীচে চাপা পড়ে গেছে, সেটা আর বোঝার উপায় নেই। বরফের রাশি চারিদিকে। তার মধ্যে এদিক ওদিক একটা আঙুল, একটা চুলের গোছা ইত্যাদি বেরিয়ে আছে। এরা কেউ বেঁচে আছে কিনা, বলা মুশকিল। আর তাদের উদ্ধার করার মত কোনও হাতিয়ারও নেই কারুর সাথে।

বক্তিয়ার বললেন, “পেছনে অনেকেই আটকে আছে। তাঁরা কী করবে এবার?”

আলি বলল, “আপনি বিশ্রাম নিন হুজুর। আমি দেখছি।“

বলেই সে পাহাড়ি ছাগলের মত পথের পাশের পাথরের খাড়াই বেয়ে উঠতে শুরু করল। কোনও দড়ি, গাঁইতি কিছুই নেই। শুধু হাতের ওপর ভর করেই আলি এই পাথরের দেওয়ালে অনেকটা উঠে গেল। কিছুটা ওপরে একটা ছোট বারান্দার মতন সমান পাথর ছিল। তার ওপর দাঁড়িয়ে পথের পিছন দিকে চাইল আলি। তারপর মুখের সামনে হাত দিকে একটা চীৎকার করল। খুব জোরে যে করেছিল চীৎকার, তা নয়। কিন্তু আলির কথা শেষ হতেই চারিদিকের পাহাড় থেকে সেই কথা প্রতিধ্বনি হয়ে শতগুণ বেড়ে ছড়িয়ে পড়ল। এই বিশেষ ভাবে কথা বলে প্রতিধ্বনি তৈরি করার কৌশল এই পাহাড়ি লোকেদের করায়ত্ত।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শোনা গেল পাল্টা শব্দ। সেই পাথর আর বরফের স্তূপের পেছনে যারা আটকে ছিল, তারা জবাব দিয়েছে। আলি আবার চিৎকার করে তাদের কি বলল। তারপর সেই পাথরের বারান্দার মত ঝোলা অংশটা টপকে সে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আলির সহকারী, আর একজন মেচ জাতির লোক সামনেই ছিল। সে বক্তিয়ারকে বলল, “চিন্তা করবেন না। আলি ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে। চলুন, আপনি বিশ্রাম করুন।“

---

প্রায় যখন সন্ধ্যে নামে নামে, তখন পেছনের লোকেরা এদিকে এসে উপস্থিত হল। সোজা আর কোনও পথ ছিল না। আলি অনেক খুঁজে পাথরের গায়ে একটা খাঁজ আবিষ্কার করেছে। সেখান দিয়েই অতি সাবধানে সেনারা একে একে এদিকে এসেছে। ঘোড়া যে কটা বা ছিল, তাদের আর এদিকে আনা যায়নি। তাদের লাগাম খুলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যদি নিজেরা ঘাস বা গাছ খুঁজে খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে, তো থাকুক। আর না হলে হয় এই প্রাণহীন প্রান্তরে সমাধি, নইলে তুষার চিতার খাদ্য হতে হবে।

মোটামুটি সবাই আসার পর সেদিনের মত শিবির এখানেই ফেলা হল। যখন সবাই ঘোড়ার মাংস পুড়িয়ে খাওয়ার আয়োজন করছে, তখন আলি মেচ এসে বলল, “হুজুর, আপনার সাথে কিছু কথা আছে।“

এই বলে বক্তিয়ারকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে সে বলল, “হুজুর, ওপর থেকে পাথরটা আমি দেখেছি। এই পাথর এমনি এমনি গড়িয়ে পড়েনি। কেউ ঠেলে ফেলে দিয়েছে।“

“মানে?!”

“হুজুর, ওপর থেকে দেখলে আপনিও বুঝতে পারতেন। পাথরটার গায়ে স্পষ্ট কুঠারের দাগ। কেউ বা কারা ওটা পাহাড় থেকে কেটে আমাদের ওপর ঠেলে ফেলেছে।“

“মানে সেই তিব্বতিরা?”

“মনে তো হয়। আর তো কোনও শত্রু এখানে নেই। পথে যে সব পাহাড়ি গ্রাম আমরা লুঠ করেছি, সেখানে কেউ ছিল না। সবাই পালিয়ে গিয়েছিল বা আমাদের তরবারির সামনে ভূমিশয্যা নিয়েছিল। যারা পালিয়েছিল, তারাই মনে হয় ওই পাহাড়ের মাথায় জড়ো হয়ে এইসব করছে।“

বক্তিয়ার চেঁচিয়ে বললেন, “এই শোনো সবাই। আজকে রাতে শিবির পাহারায় যারা থাকবে, তারা সামনে নয়, ওপরের দিকে লক্ষ্য রাখবে। শত্রু আমাদের সামনে নয়। ওই পাহাড়ের মাথায়। ওপর থেকে কোনও শব্দ শুনলেই সবাইকে জাগিয়ে দেবে।“

সবাই সভয়ে ওপরের দিকে তাকাল। মেঘে ঢাকা পাহাড়ের মাথায় কিছুই দেখা যায় না। সেখানে শত্রু যদি থাকেও, সে এদের অস্ত্রের নাগালের অনেক বাইরে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ এসে চারিদিক ঢেকে দিল। চার হাত দূরের মানুষও চোখে পড়ে না। পাহাড়ের মাথা তো দূরের কথা। আর সেই সাথে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া।

---

পরদিন সকালে উঠে আকাশ একদম মেঘে ঢাকা। গুঁড়ো গুঁড়ো বরফ আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে। কালকে সেই বরফের ধ্বস থেকে বাঁচতে ছোটাছুটির সময়ে অনেকের জামাকাপড় ছিঁড়ে গিয়েছিল। তারা এবার সেই ঠাণ্ডায় হি হি করে কাঁপতে থাকল।  

আলি মেচ চিৎকার করে বললেন, “এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। এভাবে বসে থাকলে সবাই ঠাণ্ডায় মরে যাবেন। সবাই উঠে পড়ুন।“

বক্তিয়ার বললেন, “দাঁড়াও। আগে নমাজ পড়ে নিই।“

কিন্তু মেঘের জন্য আকাশ এমন অন্ধকার যে, সূর্য ঘড়ি কাজ করছেই না। পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ একদম মুখের সামনেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। বক্তিয়ারের সেনানীর সাথে কয়েকজন মৌলবি ছিলেন। তার মধ্যে একজন বললেন, আমাকে সূর্যঘড়িটা দাও। ওই পাহাড়ের মাথায় উঠে আমি সময় দেখে বলছি। এদিকটা বেশি অন্ধকার।

আলি মেচ আর সেই মৌলবি পাহাড় বেয়ে উঠে ঘড়িটা একটা সমতল জায়গায় রাখলেন। তারপর সময় দেখে ইশারা করতেই সমস্ত সেনা একসাথে নমাজের জন্য প্রস্তুতি শুরু করল। আলি মেচ তীক্ষ্ণ চোখে চারিদিকে দেখতে থাকল।

নমাজের পর সবাই আবার চড়াই বেয়ে ওঠা শুরু করল। এবার দুদিকেই খাড়া পাহাড়। সেই পাহাড়ে মনে হয় হাজার বছরের শ্যাওলা জমে আছে। সবুজের চিহ্নমাত্র নেই। এক জায়গায় ডানদিকে পাহাড় শেষ হয়ে একটা বিস্তীর্ণ সমতল প্রান্তর। তার ওপর বরফে মরা সূর্যের আলো চকচক করছে। অদ্ভুত এক প্রাণহীন পরিবেশ। এদিক ওদিক কিছু পশুর কঙ্কাল মাটি থেকে অর্ধেক বেরিয়ে আছে।

হঠাৎ দলের মধ্যে কয়েকজন “ওই দেখো, চমরী গাই!” বলে হাতের বর্শা বাগিয়ে সেই প্রান্তরের এক দিকে দৌড়তে শুরু করল। বক্তিয়ার সেদিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলেন না। চমরী গাই? কোথায়? কিন্তু সেই কয়েকজন কারুর কথা না শুনে সেই বরফের ওপর দৌড়তে দৌড়তে সামনের দিকে এগোতে লাগল।

হঠাৎ কড়াৎ করে একটা শব্দ হল। আর সেই কয়েকজন মুহূর্তের মধ্যে মাটির নীচে অদৃশ্য হয়ে গেল। তাদের পেছনে থাকা আরও কয়েকজন এই ঘটনা দেখে তাদের দিকেই ছুটে যাচ্ছিল। আলি মেচের দলের লোকেরা তাদের বাধা দিল।

আলি মেচ এসে বলল, “ওদিকে বরফের স্তর খুব পাতলা। নিচেই হয় গুপ্ত সরোবর, আর নইলে পাথরের গভীর খাদ। ওই বরফ ভেঙ্গে নীচে পড়লে মৃত্যু অনিবার্য।“

বক্তিয়ার বললেন, “ওই লোকগুলোর মাথা খারাপ হল নাকি? ওরা ওভাবে দৌড়ে গেল কেন?”

“হুজুর। এই বরফের মরুভূমিতেও মরীচিকা দেখা যায়। আপনাদের রেগিস্তানে আমি শুনেছি মরীচিকা দেখে অনেকেই বালির পাহাড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। এটাও সেরকম। তিব্বতি বণিকেরা একে বলে পাহাড়ের দেবতার লীলা। এই মরীচিকা দেখেই ওরা নাকি বুঝতে পারে পথে কোনও বিপদ আছে কিনা।“

ঠিক এই সময়ে সেনাদলের পেছন থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল। একজন সেনা দৌড়ে এসে বক্তিয়ারকে বলল, “নবাব। সর্বনাশ হয়েছে। পেছনে থেকে কেউ তীর ছুঁড়ছে। আমাদের কয়েকজন নিহত।“

পেছনের পাথরের দেওয়ালে কাউকে দেখা গেল না। কিন্তু সেদিক থেকেই ছুটে আসছে ছোট ছোট তীক্ষ্ণ শর। বক্তিয়ারের চোখের সামনেই আরও কয়েকজন লুটিয়ে পড়ল। বাকি সেনারা দিশেহারা হয়ে দৌড়নো শুরু করল।

বক্তিয়ার তাদের সাথেই সেই চড়াই পথ বেয়ে কোনোক্রমে উঠতে লাগলেন। পা পিছলে যাচ্ছে। সঙ্গের অস্ত্র তো কোথায় ছিটকে গেছে কেউ জানে না। তারা গিয়ে একটা বড় পাথরের পেছনে আশ্রয় নিলেন। কয়েকজন সেনা দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে সেই বরফের প্রান্তরের দিকেই ছুটেছিল। তারা একে একে সেই বরফ ভেঙ্গে নীচে তলিয়ে গেল। চারিদিকের শীতল কালো পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল তাদের মৃত্যুচিৎকার। তারপরেই সব চুপ।

আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, বিপক্ষের কেউ কিন্তু দেখা দিল না। তীরগুলো হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল। আর কোনও শব্দ নেই। আলি মেচ বলল, “এখানে আর নয়। সামনে একটা বণিকদের ব্যবহার করা পাথরের গুহা আছে। সেখানে গিয়ে আমরা থামব। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথেই আরেকবার বিপদ ঘটল। একটা সরু পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এক এক করে হেঁটে যাচ্ছে সবাই। আলি মেচের কিছু লোক আর কিছু আফগান সেনা সামনে। বক্তিয়ার একটা পায়ে আর সার পাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে পা টা দেহ থেকে আলাদা হয়ে গেছে। তাই তিনি একটু পিছিয়ে আছেন। এই সময়ে আবার চিৎকার। দেখা গেল সেই সামনের লোকেরা পিঁপড়ের মত পাহাড়ের গা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। রাস্তার মাটি পাথর ধসে গেছে।

---

আর যাওয়ার রাস্তা নেই। সেদিনের মত রাত কাটল সেখানেই। খোলা আকাশের নীচে। ভোরের দিকে আবার বৃষ্টি নামল। প্রত্যেকে পা থেকে মাথা অবধি একদম চুপচুপে ভিজে গেল।

ভোরের আলো ফুটতেই বক্তিয়ার বললেন, “আর নয়। আমরা ফিরে যাব।“

আলি মেচ বলল, “হুজুর, আগের রাস্তা তো বন্ধ। আর সেই তিব্বতি শয়তানগুলো হয়ত সেখানে আমাদের অপেক্ষায় বসে আছে। অন্য পথ আমি জানি। সেদিক দিয়েই আমরা ফিরে যাব।“

---

আরও প্রায় এক সপ্তাহ পর বক্তিয়ার আর সামান্য কয়েকজন সেনা ধুঁকতে ধুঁকতে এসে উপস্থিত হলেন এক পাহাড়ি নদীর ধারে। উলটোদিকে এক ঘন বাঁশবন। সেদিকে দেখিয়ে আলি মেচ বলল, “হুজুর। আর ভয় নেই। হিমালয়ের সীমান্ত শেষ। ওই দেখুন কামরূপ রাজ্যের সীমানা। এই নদী পেরলেই আমরা আবার আমাদের চেনা ভূমিতে পৌঁছে যাব।

কিন্তু এই নদী পেরনো হবে কিভাবে? প্রচণ্ড খরস্রোতা নদী। এ তো পায়ে হেঁটে বা সাঁতার কেটে পেরনো মানে অনিবার্য মৃত্যু।

এই সময়ে আলি মেচ বলল, “ওই যে, একটা সেতু আছে।“

সত্যিই একটু দূরে একটা পাথরের সেতু আছে নদীর ওপর দিয়ে। ওই পারে সেই সেতুর শেষে একটা সুন্দর রাস্তাও আছে। বক্তিয়ার অবাক হয়ে বললেন, “এখানে এরকম সেতু কে বানাল? আর এত ভালো রাস্তাও বা কিসের?”

“হুজুর, এই কামরূপ রাজ্যের সাথে হিমালয়ের অনেক রাজ্যের নিয়মিত বাণিজ্য চলে। কাঠ, বাঁশ, খাদ্য ইত্যাদি চালান হয়। এই সেতু সেইজন্যই করা।“

সবাই সেই সেতুর সামনে উপস্থিত হতেই আলি মেচের দলের একজন লোক হাত দেখিয়ে সবাইকে দাঁড় করাল। সে একা একা সেই সেতুর ওপর কিছুটা হেঁটে গিয়ে আবার ফিরে এল। এসে আলি মেচকে কানে কানে কি যেন বলল।

এই লোকটি মাঝবয়সী। আলি মেচের বিশ্বস্ত অনুচরদের একজন। এর আরেকটা গুণ হল, এ একাধারে বৈদ্য এবং গুণিন। এর আগে কামরূপের জঙ্গলে সাপে কামড়ানোর পর এই গুণিন বেশ কিছু সেনার প্রাণ বাঁচিয়েছে। তাছাড়া তিব্বতে সেই বরফে হাত পা জমে গেলে এর ওষুধেই অনেকে রক্ষা পেয়েছে। প্রায় নেড়া প্রান্তর থেকেও এই লোকটি ওষধি গুল্ম খুঁজে আনে।

তার কথা শুনে আলি মেচ বক্তিয়ারকে এসে বলল, “হুজুর, গুণিন বলছে এই সেতু নিরাপদ নয়।"

"মানে?"

"হুজুর, সেতুর ওপরে কিছু লক্ষণ দেখে ও বিপদের গন্ধ পাচ্ছে।“

“কিন্তু উপায় কী? আর কি কোনও পথ আছে?”

“সে তো জানি না হুজুর। তাহলে এই নদীর পাড় ধরে আমাদের এখন চলতে হবে। যদি দ্বিতীয় কোনও সেতু পাই, তাহলে সেখানে----”

তার কথা শেষ হবার আগেই বক্তিয়ার বললেন, “সেতুটা বেশ শক্তপোক্ত মনে হচ্ছে। এতে আর কি বিপদ হবে?”

আলি মেচ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই পেছনের জঙ্গল থেকে একটা গম্ভীর হুঙ্কার শোনা গেল। অনেকটা বাঘের ডাকের মত। সেটা শুনেই অনেকে পড়িমরি করে সেই সেতুর ওপর উঠে পড়ল। সেই গুণিন হাত তুলে কী একটা চিৎকার করল, কিন্তু সেই ভিড়ের কেউ সেই কথা শুনলই না। যখন এই ভিড়টা সেতুর প্রায় মাঝামাঝি, তখন মড়মড় করে একটা শব্দ হল। মনে হল যেন ধরিত্রী একটু নড়ে উঠলেন; আর তারপরেই সেতুর তিনটে থাম ভেঙ্গে সমস্ত লোক সুদ্ধ সেই সেতু তলিয়ে গেল নদীর জলরাশির মধ্যে।

আলি মেচ ভীত গলায় বক্তিয়ারকে বলল, “আর দেরি নয়। এই নদীর জলের ভিতর দিয়েই যেতে হবে। কামরূপের লোকেরা নিশ্চয়ই সেতুর থাম কেটে রেখেছিল। সেতুর ওপর মানুষের পায়ের চাপ পড়তেই ভেঙ্গে পড়েছে।“ ইতিমধ্যে আবার শোনা গেল সেই বাঘের গর্জন।

এবার প্রাণের মায়া ত্যাগ করে বাকি সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন নদীতে। প্রবল জলের টান। কিছু বোঝার আগেই অনেকে ভেসে গেল জলের তোড়ে।

আলি মেচ এক হাতে একটা বাঁশ নিয়ে অন্য হাতে শক্ত করে বক্তিয়ারের হাত ধরে জলের মধ্যে হাঁটতে লাগল। নদীর মাঝে মাঝেই ঘূর্ণি। সেখানে পা পড়লেই মৃত্যু। আলি মেচের সতর্ক চোখ সেইসব মৃত্যুফাঁদ এড়িয়ে, মসৃণ পাথরের ওপর টিপে টিপে পা ফেলে, বক্তিয়ারকে নিয়ে চলল অপর পাড়ের দিকে। অন্য সেনারা যে যেমন পারল সেই জলের মধ্যে দিয়ে অপর পাড়ের দিকে এগোতে থাকল। কেউ সেই পিচ্ছল পাথরে আছাড় খেয়ে জলের তোড়ে ভেসেই গেল। কিন্তু চোখের সামনে ভেসে যেতে দেখেও কেউ কাউকে বাঁচানোর অবস্থায় ছিল না।

সিক্ত বসনে, দুর্বল শরীরে অবশেষে বক্তিয়ার এবং তার সঙ্গের কিছু লোকজন এসে পৌঁছলেন নদীর অপর প্রান্তে সেই বাঁশবনে। কারুর দেহেই আর শক্তি নেই। কেউ পা ভেঙ্গেছে, কেউ মাথা ফাটিয়েছে।

এই সময়ে দেখা গেল নদীর অপর পাড়ে বেশ কিছু লোক এসে দাঁড়িয়েছে। একজনকে বক্তিয়ার চিনতে পারলেনঃ কামরূপরাজ। তার হাতে তীরধনুক। সঙ্গে অস্ত্রে সজ্জিত আরও অনেক সৈন্য। বেশ কিছু সৈন্যের হাতে একটা শিঙ্গার মত বস্তু।

আলি মেচ বলল, “হুজুর, ওই যে শিঙ্গার মত জিনিসটা দেখছেন, ওটা দিয়েই ওরা বাঘের ডাকের আওয়াজ নকল করে আমাদের নদীতে নামিয়েছে। এই কৌশল এই কামরূপের কয়েকজন শিল্পীই জানেন। জঙ্গলে যুদ্ধের সময়ে এই শিঙ্গা ব্যবহার করেই এরা শত্রুপক্ষকে ভয় দেখায়। এই গুপ্তবিদ্যা কামরূপ ছাড়া কোথাও নেই।“

কামরূপরাজ চিৎকার করে কী একটা বলে তারপর সগর্বে আবার পেছন ফিরে চলে গেলেন। আলি মেচ সেই কথার অনুবাদ না করলেও সেই উক্তির মধ্যে যে তাচ্ছিল্য, ক্রোধ এবং ব্যঙ্গ মিশে আছে, সেটা বুঝতে বক্তিয়ারের কোনও অসুবিধা হল না।

---

আবার সেই দেবকোট। কিছুদিন আগে এখান থেকেই আরবী ঘোড়ায় করে দশ হাজার আফগান সেনা রওনা হয়েছিল তিব্বতের উদ্দেশ্যে। আজকে সন্ধ্যার অন্ধকারে ফিরে এলেন সত্তর কি আশি জন। বেশিরভাগের হয় হাতের নয় পায়ের আঙুল তিব্বতের ঠাণ্ডায় পচে খসে পড়েছে। কামরূপের জঙ্গলে মশার কামড়ে অনেকেই জ্বরে আক্রান্ত। বক্তিয়ার নিজেও অসুস্থ। একটা হাত কাজ করছে না। তিব্বতের সেই ঠাণ্ডায় যে নিঃশ্বাসের কষ্ট শুরু হয়েছে, সেটা এখনও কমেনি।

আলি মর্দান দেবকোটে অবস্থান করছিল। গুপ্তচর তাকে আগেই খবর দিয়েছিল যে নবাব আসছেন। শহরে ঢোকার পথের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল আলি। বক্তিয়ার পা ঘষে ঘষে আসতেই আলি বলল, “গৌড়ের নবাবকে স্বাগত। আপনার বিশ্রামক্ষেত্র প্রস্তুত। আসুন নবাব। আপনার ঘোড়া নেই?”

বক্তিয়ার বললেন, “সমস্ত ঘোড়া তিব্বতের সেই বরফের মরুভূমিতে রয়ে গেছে।“

“চিন্তা নেই নবাব। আপনি চলুন। আপনার শুশ্রূষা করার জন্য দাস দাসীর দল প্রস্তুত।“

---

গভীর রাত। বক্তিয়ার খিলজি দেবকোটের একটা প্রাসাদে জ্বরে অচেতন। এতদিন ওই আলি মেচের দলের বদ্যির দেওয়া পাতা, গুল্ম ইত্যাদি খেয়ে কোনরকমে তিনি তিব্বত থেকে এখানে ফিরেছেন। কিন্তু সেই বৈদ্য এখন আসার পথে অন্য দিকে চলে গেছে। ওষুধও আর নেই। আগে এই সব অঞ্চলে চিকিৎসার কাজ করতেন বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারের শ্রমণ এবং অধ্যাপকেরা। কিন্তু তুর্কী আক্রমণের পর বেশিরভাগ বৌদ্ধ হয় মৃত, নইলে পলাতক। এখন এখানে আর চিকিৎসক কেউ নেই। দিল্লির দিকে কিছু হাকিম আফগান দেশ বা পারস্য থেকে এসে ব্যবসা শুরু করেছেন। কিন্তু এই দিকে এখনও সেরকম কেউ নেই।

খোজা প্রহরীরাই নবাবের সেবা করছেন। এইদিকে একটি পাহাড়ি নদী আছে, যার জল অত্যন্ত সুশীতল। সেই জল এনে নবাবের সারা দেহ মুছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বক্তিয়ারের হাতের দুটি আঙুল কালো হয়ে মাংস খসে খসে পড়ছে। ওনার কোনও হুঁশ নেই। শিয়রের কাছে একটি ঘৃতের প্রদীপ জ্বলছে। পুরো ঘরটায় একটা কটু গন্ধ।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলেন আলি মর্দান ও আলি মেচ।

মেচ বলল, “নবাবের আর জ্ঞান ফেরার বোধহয় আশা নেই।“

“নাহ। মুখে একটা নীল আভা এসে গেছে। এটা মৃত্যুর পূর্ব লক্ষণ।“

আলি মেচ বলল, “কী করবেন? সবাইকে তো জানাতে হবে।“

আলি মর্দান কিছু একটা ভাবছিল। ও আলি মেচকে বলল, “পাশের ঘরে চল। কথা আছে।“

পাশের ঘরটিতে কোনও জানালা নেই। দুজনে ঘরে ঢুকে ভারী কালো কাঠের দরজা বন্ধ করে দিল।

আলি মর্দান বলল, “নবাব যে তিব্বতে গিয়ে বিশ্রীভাবে হেরে এসেছেন, সেই কথা জানাজানি হলে আমাদের সবার বিপদ। প্রচুর শত্রু চারিদিকে। দিল্লির কিছু কিছু সভাসদ ইতিমধ্যে কুতুবকে বলছেন আমাদের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য। এই অর্ধমৃত নবাবকে দেখে যদি গুপ্তচরেরা সেই কথা দিল্লিতে জানায়, তাহলে সমূহ বিপদ।“

আলি মেচ চুপ করে রইলেন। আলি মর্দান আবার বলল, “তুমি সবে আমাদের দলে এসেছ। যদি এই খিলজিরা কালকে হেরে যায়, তোমার অবস্থা কী হবে বুঝতে পারছ তো?”

আলি মেচ মাথা নাড়লেন।

মর্দান আবার বলল, “কোনও লোক কি বক্তিয়ারকে এই অবস্থায় দেখেছে?”

“না মনে হয়। আমরা এখানে এসেছি সন্ধ্যার অন্ধকারে।“

“খুব ভালো কথা।“

কিছুক্ষণ পর আলি মেচ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটা মাঝারি পুঁটুলি। সেটা নিয়ে দ্রুত পায়ে সেই প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। মূল তোরণদ্বারের কাছে একটা মশাল জ্বলছিল। সেই মশালের নীচে দাঁড়িয়ে একবার পুঁটুলি খুললেন আলি। ভেতরের লক্ষ্মী মুদ্রা ঝলমল করে উঠল। একটা বাঁকা হাসি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পুঁটুলির মুখ বেঁধে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন আলি মেচ।

---

আলি মর্দান এসে দাঁড়াল বক্তিয়ারের রোগশয্যার সামনে। অচেতন নবাব। নিঃশ্বাস এক একবার জোরে পড়ছে, আর তারপরেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। আলি একবার বিড় বিড় করে বলল, “কী বন্ধু? নবাব হওয়ার সাধ ছিল। মিটেছে তো? তিব্বতের লোকেরা তোমার অহঙ্কার চূর্ণ করে দিয়েছে।“

আস্তে আস্তে সেই বিছানার পাশ থেকে একটা বালিশ তুলে নিল আলি।

কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আলি মর্দান। যাওয়ার সময়ে সেই খোজা প্রহরীকে বলে গেল, “নবাব এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। কেউ যেন বিরক্ত না করে। কাউকে এই ঘরে ঢুকতে দেবে না।“

আলি মর্দান চলে যাওয়ার পর চারিদিক নিস্তব্ধ। রাত্রি তৃতীয় প্রহরে দাস দাসীরাও নিজেদের মহলে নিদ্রামগ্ন।

সেই খোজা প্রহরী, মালিক, আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকে বক্তিয়ারের শয্যার সামনে এসে দাঁড়াল। চুপ করে তাকিয়ে দেখল তার প্রভুর প্রাণহীন মুখের দিকে। নিবু নিবু প্রদীপের আলোয় দেখা গেল প্রহরীর গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল।  

---

এক সপ্তাহ পরে লখনৌটিতে প্রাসাদের বাইরে এক সভা হচ্ছে। বক্তা আলি মর্দান। সে বলছিল, “আমাদের মহান নবাব, মহম্মদ বক্তিয়ার খিলজি তিব্বতে গিয়ে গৌড়ের জয়ধ্বজা উড়িয়ে এসেছেন। উনি একজন প্রকৃত বীরের মতোই নিজের সাহস এবং শক্তির বলে শত্রুকে সম্পূর্ণ পরাভূত করে হিমালয়ের পর্বতশিখরে নিজের জয়ের নিশান পুঁতে দিয়েছেন। একজন প্রকৃত বীরের মতোই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেছেন। এটাই একজন আফগান বীরের জীবনের সবথেকে বড় সাফল্য। একজন খিলজি হিসাবে তিনি এই দূর দেশে যে সাফল্যের পতাকা উড়িয়ে গেলেন, সেই পতাকার ভার এবার বইবেন আরেকজন খিলজি বংশের বীরঃ মহম্মদ শিরান খিলজি।“

শিরান রাজবেশে পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে উঠে এল মঞ্চে। তার মাথায় একজন মৌলবি শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দিল। কিছু আরবি মন্ত্র উচ্চারণ করল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আফগান যোদ্ধারা চিৎকার করে অভিবাদন জানাল।

কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল কিছু স্থানীয় লোক। এদের ভাষা তারা কিছুই বুঝল না। কিন্তু সেটা না বুঝলেও রাজার অভিষেকের অনুষ্ঠান দেখলেই বোঝা যায়। একজন নতুন রাজা হয়েছে দেখে তারাও সহর্ষে অভিবাদন জানাল।

No comments:

Post a Comment