![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলি
সৃজা রায়
আজ রবিবার। সপ্তাহের বাকি ছ-দিন একটা ছোট প্রাইভেট কোম্পানির ফাইলের স্তূপ, কম্পিউটারের স্ক্রিন আর বসের খিটখিটে মেজাজ সহ্য করার পর এই একটা দিন মিমি নিজের মতো করে বাঁচে।
সকাল থেকেই আকাশটা কেমন যেন মেঘলা, মাঝে মাঝে হালকা রোদের উঁকিঝুঁকি। ঘুম ভাঙতেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে মিমি ভাবছিলো, আজ সারাটা দিন ঘরে বসে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা দেখেই কাটিয়ে দেবে, নাকি একটু বেরোবে।
অবশেষে বেলা নয়টা নাগাদ ও ঠিক করলো, না—আজ নিজের সাথেই একটু কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করবে সে। রোজকার চেনা চারদেওয়াল আর একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে চেনা শহরের বাইরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিলো ওর। তখনই হুট করেই মাথায় এলো ব্যান্ডেল চার্চের কথা। গঙ্গার ধারের সেই শান্ত পরিবেশ, চার্চের ভেতরের স্নিগ্ধতা আর মোমবাতির হালকা আলো—মনটা ভালো করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কী-ই বা হতে পারে!
যেই ভাবা, সেই কাজ। চটপট স্নান সেরে, আলমারি থেকে একটা হালকা সুতির কুর্তি গলিয়ে নিলো মিমি। তার মা রান্না করেছিলো গরম ভাত আর আলু পোস্ত, তাই দিয়েই দুপুরের খাওয়াটা সকাল সকাল সেরে নিলো। ঘড়িতে তখন বেলা দশটা। ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিস পুরে নিয়ে মিমি বেরিয়ে পড়লো। আজ ও একাই ঘুরবে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা রিক্সা ডাকলো মিমি। চেনা মফস্বলের রাস্তা দিয়ে রিক্সা এগিয়ে চলেছে স্টেশনের দিকে। কুড়ি মিনিটের মধ্যেই ও পৌঁছে গেলো স্টেশনে। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসতেই দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেলো।
ভাগ্য ভালো, ট্রেনে তেমন ভিড় নেই। জানলার ধারে একটা সিট পেয়ে মিমি বেশ আরাম করেই বসলো। ব্যান্ডেল পৌঁছাতে এখনও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগবে। এই দীর্ঘ পথটা কাটানোর জন্য মিমির সবচেয়ে বড় সঙ্গী ওর প্রিয় গানের প্লে-লিস্ট।
তাই সময় নষ্ট না করে, কানে দুটো হেডফোন গুঁজে দিয়ে, চোখ দুটো বন্ধ করে ও ছেড়ে দিলো কিশোর কুমারের একটা চেনা গান। ট্রেনের দুলুনিতে মনটা তখন ডানা মেলতে শুরু করেছে।
ট্রেন তখন গতি নিয়েছে। দুটো স্টেশন পেরিয়েছে কি পেরোয়নি, আচমকাই মিমির মাথায় হালকা করে একটা চাটি পড়লো। চমকে উঠে চোখ খুললো ও। সামনে তাকাতেই মিমির মুখের কথা আটকে গেলো।
ওর সামনে তখন ট্রেনের সিটের মাঝখানের প্যাসেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার অতি চেনা দুজন মানুষ। তিয়াশা আর পিয়ালী! দুজনেই দাঁত বের করে হাসছে। আর মিমি স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।
চারটে বছর! দীর্ঘ চারটে বছর ধরে যাদের কোনো খোঁজ ছিলো না, যারা সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলো, তারা আজ ওর সামনে দাঁড়িয়ে। মিমি এক ঝটকায় সিট থেকে উঠে দাঁড়ালো। বিস্ময় আর আনন্দের চোটে ও ওই দুটোকেই জাপটে জড়িয়ে ধরলো। কি আনন্দ তিনজনের মুখেই! ট্রেনের কামরার অন্য যাত্রীরা অবাক হয়ে দেখছে এই তিন তরুণীর পাগলামি।
“ আয়, বস, বস। ” মিমি উত্তেজিত গলায় বলতেই দুজনে গিয়ে ওর দু-পাশে চেপে বসলো। বসার জায়গা যেন নিমেষেই ছোট হয়ে গেলো, কিন্তু মনের পরিধিটা এক ধাক্কায় অনেক বড় হয়ে গেলো।
চার বছর আগে কলেজের শেষ দিনটার পর আর কোনো যোগাযোগ ছিলো না তাদের মাঝে। কত অভিমান, কত ব্যস্ততা, আর জীবনের এই ইঁদুরদৌড় তাদের আলাদা করে দিয়েছিলো। কিন্তু আজ, এই চলন্ত ট্রেনের কামরায় যেন সময়ের চাকা উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করলো।
তিয়াশা মিমির কাঁধে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, “ তা ম্যাডাম, কী খবর বলুন আপনার? একা একা কোথায় যাওয়া হচ্ছে? ”
মিমিও হেসে বললো, “ ওই তো, চলছে কোনোমতে... তোদের কী খবর বল? তোরা একসাথে কী করছিস? ”
“ এই তো, এখন একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে ঢুকেছি। খাটুনি প্রচুর, কিন্তু তাও চলে যাচ্ছে। ” (তিয়াশা)
মিমি এবার পিয়ালীর দিকে তাকালো। “ তা... আপনার কী খবর ম্যাডাম? আপনাকে তো বেশ গদগদ দেখাচ্ছে! ”
পিয়ালী কিছুটা লজ্জা পেয়ে, হাতের নোয়াটা আড়াল করার চেষ্টা করে ফিসফিস করে বললো, “ ওয়েল... আমার বিয়ে হয়ে গেছে রে। ”
“ ওরে বেটা! ” মিমি প্রায় চিৎকার করে উঠলো, "আমাদের আগে বিয়ে করেও নিলি? আর একবার ডাকলিও না আমাকে? যাহ, এই তোর বন্ধুত্ব! আমি তো ভাবলাম তুই এখনও সেই কলেজের পিয়ালীর মতোই সিঙ্গল আছিস! ”
তিনজনেই একসাথে জোরে হেসে উঠলো। তাদের হাসির জোরে, এখন ট্রেনে উপস্থিত সকলের নজর তাদের ওপরেই।
পিয়ালী মিমির হাতটা ধরে বললো, “ বিশ্বাস কর মিমি, খুব তাড়াহুড়ো করে বিয়েটা হয়ে গেলো। সম্বন্ধ করে বিয়ে, পাত্রপক্ষ হুট করে দিন ঠিক করলো। আর তোদের সাথে তখন কোনো যোগাযোগই ছিলো না। তিয়াশার সাথেও তো কোনো কন্ট্যাক্ট ছিল না রে। এই তো এক সপ্তাহ আগে ফেসবুকের একটা মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের প্রোফাইল থেকে তিয়াশাকে খুঁজে পেলাম। তারপর আজ দুজনে একটু দেখা করতে বেরোলাম। আর কী ভাগ্য দেখ, ঠিক একই ট্রেনেই তোর সাথেও দেখা হয়ে গেলো! একেই হয়ত বলে নিয়তি। ”
তিয়াশা এবার মিমির মুখের দিকে খুঁটিয়ে তাকিয়ে বললো, “ তা তুই কী করছিস আজকাল? বেশ পাল্টে গেছিস রে আগের থেকে। চোখের নিচে কালি, চুলে সেই পাগলামিটা নেই। একটু গম্ভীর হয়ে গেছিস যেন। ”
মিমি একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে একটা ভেংচি কেটে বললো, “ হুমমম, তা চার বছর সময়টাও তো কম না রে বোন। তোরা এমনভাবে বলছিস যেন তোরা এখনও সেই আগের মতোই আছিস! তুই নিজেই তো কত মোটা হয়ে গেছিস তিয়াশা! ”
মিমির কথায় পিয়ালী আর তিয়াশা দুজনেই হেসে ফেললো। সেই চেনা খুনসুটি, সেই চেনা ভেংচি কাটা—সব যেন এক পলকে ফিরে এলো।
সময়ের দিকে আর কার খেয়াল আছে তখন? ঘড়ির কাঁটা তার নিজের গতিতে ঘুরছে, ট্রেনও ট্র্যাকে আওয়াজ তুলে ছুটে চলেছে তার গন্তব্যের দিকে। আর সাথে এই ট্রেনের কামরার এক কোণায় তিন প্রাণপ্রিয় বান্ধবী তখন একে একে খুলতে শুরু করেছে তাদের পুরোনো স্মৃতির ধুলো জমা বইয়ের পাতাগুলো।
মিমির মনে পড়ে গেলো কলেজের সেই প্রথম দিনের কথা। কলেজের প্রথম দিন, সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ। কাউকেই চেনে না কেউ। সেদিন কাকতালীয়ভাবে ক্লাসরুমের একটা বেঞ্চে এসে বসেছিলো এরা তিনজন।
প্রথম আধ ঘণ্টা কেউ কারও সাথে কথা বলেনি, শুধু আড়চোখে একে অপরকে দেখছিলো। কিন্তু এক ঘণ্টা যেতে না যেতেই, একটা পেন চাওয়া আর প্রফেসরের ক্লাসের বোরিং লেকচার নিয়ে ফিসফিসানি শুরু হতেই বরফ গলে জল। ক্লাস শেষ হতে হতে মনে হলো যেন এরা কত জন্মান্তরের চেনা বান্ধবী!
সেই থেকে শুরু হলো তাদের একসাথে পথ চলা। কলেজের তিনটে বছর মানেই ছিলো এই ত্রিমূর্তির রাজত্ব। রোজ নিয়মমাফিক স্টেশনে নয়তো কলেজের গেটে দেখা করা। একজন যদি কোনোদিন শরীর খারাপের অজুহাতে বা নিছক আলসেমিতে কলেজে না আসতো, তো ব্যস! বাকি দুজনেরও অঘোষিত ছুটি। তাদের বক্তব্য ছিলো— ‘ তিনজন একসাথে না থাকলে নাকি ক্লাসে মনই বসতো না। ’
অথচ সারাদিনে যদি চারটে ক্লাস থাকতো, তবে বড় জোর একটা ক্লাসে তারা খুব কষ্ট করে মন বসাতো। আর বাকি তিনটে ক্লাস? পেছনের বেঞ্চে বসে খাতার পাতায় কখনও কাটাকুটি খেলা, কখনও একে অপরকে নিয়ে কৌতুক করা আর নিচু গলায় অনর্গল গল্প করে কাটিয়ে দেওয়া হতো।
কতদিন তো এমনও হয়েছে, কলেজের একটা কি দুটো ক্লাস করেই এদের পা আর কলেজের ভেতরে টিকতো না। কলেজের কাছাকাছি গঙ্গার ঘাটে গিয়ে তখন ওখানে থাকা মানুষগুলোর বকবক, চেঁচামেচি করে তাদের মাথা খেয়ে ফেলতো।
কখনও একসাথে ক্লাস বাঙ্ক করা, কখনও কলেজের ক্যান্টিনে এক কাপ চা আর চপ-মুড়ি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। বাড়ি ফেরার রাস্তাও যতদূর এক থাকতো, ততদূর একসাথে যাওয়া। ট্রেনে চড়ে একে অপরের কাঁধে মাথা দিয়ে গান শোনা। কলেজের কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান বা সরস্বতী পুজো মানেই ছিলো আগে থেকে প্ল্যান করে একই রঙের শাড়ি পরা। তিনজনে একই রকম নীল বা কালো শাড়ি পরে যখন কলেজের করিডোর দিয়ে একসঙ্গে হেঁটে যেতো, তখন মনে হতো যেন ওরাই ওদের কলেজের আসল রানী।
এমনকি বন্ধুত্বের টানে, বাড়িতে বাবা-মাকে বুঝিয়ে, কান্নাকাটি করে, জোর খাটিয়ে একই টিউশনেও ভর্তি হয়েছিলো তারা, যাতে সপ্তাহে আরও তিনটে দিন একসাথে যাওয়া-আসা করার বাহানা পাওয়া যেতো। সুযোগ পেলেই একসঙ্গে সিনেমা দেখা, বা পুজোয় একসাথে ঠাকুর দেখা—এরকম আরও কত কত স্মৃতি!
আর আজ সেই সোনালী দিনগুলো শুধুই অতীতের পাতায় বন্দি। বর্তমানের এই যান্ত্রিক জীবনে সেই দিনগুলো যেন রূপকথার মতো শোনায়।
গল্পে গল্পে সময় যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেলো। ট্রেন এসে থামলো একটা নির্দিষ্ট স্টেশনে। তিয়াশা আর পিয়ালীর গন্তব্য চলে এসেছে। মন না চাইলেও, নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকা জীবন তাদের টেনে নামালো বাস্তবে। ট্রেন থেকে নামার আগে অবশ্য একে অপরকে নিজের নতুন ফোন নম্বর দিতে কেউ-ই ভুললো না।
তিয়াশা ট্রেন থেমে নেমে যাওয়ার আগের মুহূর্তে মিমির দিকে হাত নাড়িয়ে বললো, “ আজ তবে আসি বন্ধু। ফোনে কথা হবে। আবার একদিন দেখা হবে। এরকমই আড্ডাও দেওয়া হবে। ”
পিয়ালীও হাত নাড়লো। ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করলো। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়াশা আর পিয়ালীর অবয়ব দুটো আস্তে আস্তে ছোট হতে হতে একসময় ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলো।
মিমি আবার একা হয়ে পড়লো। সিটগুলো এখন বড্ড ফাঁকা, বড্ড বেশি চওড়া ঠেকছে তার কাছে। ও ট্রেনের জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করলো। মুহূর্তের মধ্যেই সব নিস্তব্ধ, অথচ এই তো একটু আগেও তাদের বকবকানিতে বোধ হয় পুরো ট্রেন কামরার যাত্রীরা বিরক্ত ছিলো।
বাইরের হাওয়াটা এখন আর ভালো লাগছে না, কেমন যেন একটা শূন্যতা তৈরি করছে বুকের ভেতর। তিয়াশার শেষ কথাগুলো মিমির কানের পর্দায় ধাক্কা খেতে লাগলো— ‘ ফোনে কথা হবে... ফোনে কথা হবে... ’।
এই দুটো শব্দই যেন মিমির বুকে তীরের মতো গিয়ে বিঁধলো। মিমি মনে মনে হাসলো, একটা তাচ্ছিল্যের হাসি। ফোনে কথা হবে? কিন্তু আদেও কি তা হবে?
আমরা আধুনিক হয়েছি, বিজ্ঞানের উন্নতি ঘটিয়েছি। এখন আমাদের পকেটে পকেটে স্মার্টফোন। যোগাযোগ রাখার জন্য কত মাধ্যম—হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার, নরমাল টেক্সট, অডিও কল, ভিডিও কল!
পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে থাকা মানুষের মুখ এক সেকেন্ডে স্ক্রিনে ফুটিয়ে তোলা যায়। কিন্তু তাতে কি আসলেও কোনো লাভ হচ্ছে? যোগাযোগ যত সহজ হয়েছে, মানুষের মনের দূরত্ব যেন ততটাই বেড়ে গেছে। একে অপরের সাথে সম্পর্কের সেই আসল টানটাই তো হারিয়ে যাচ্ছে এই যান্ত্রিকতার ভিড়ে।
মিমির স্পষ্ট মনে আছে, যখন চোখের নিমিষেই কলেজের তিনটে বছর শেষ হয়ে গিয়েছিলো, ফেয়ারওয়েলের দিন তারা তিনজন একে অপরের হাত ধরে কতো কেঁদেছিলো। কথা দিয়েছিলো— ‘ যাই হয়ে যাক, আমরা যোগাযোগে থাকবো একে অপরের সঙ্গে। নিয়মিত কথাও বলবো। প্রতি মাসে অন্তত একবার দেখা করবো। আমাদের এই বন্ধুত্বটা সারাজীবন একই রকম থাকবে। ’
কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন! কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেরোনোর পর পরই জীবনটা বদলে গেলো। একজন ঢুকলো কর্পোরেট দুনিয়ায়, একজন ব্যস্ত হলো সংসারের নতুন সমীকরণে, আর অন্যজন নিজের ক্যারিয়ার গড়ার লড়াইয়ে। মন হয়তো অবচেতনে জানতো, একবার যখন কলেজের গেট পেরিয়ে আমরা বাস্তব দুনিয়ায় পা রাখছি, তখন বন্ধুত্বটা আর আগের মতো থাকবে না।
পুরোনো দিনে যখন ল্যান্ডফোনও সবার বাড়িতে ছিলো না, একটা চিঠির জন্য মানুষকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, তখন মানুষের মাঝে একে অপরের প্রতি কত টান ছিলো! একটা বন্ধুর সাথে দেখা করার জন্য মানুষ মাইলের পর মাইল হেঁটে চলে যেতো না বলে। আর এখন!? এই যে আজ নম্বর নেওয়া হলো, অনেক বছর পর দেখা হলো বলে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছে মনের ভেতর। প্রথম প্রথম হয়তো এক আধটা ফোনও হবে। প্রথম একটা সপ্তাহ হয়তো হোয়াটসঅ্যাপে খুব চ্যাট হবে, আবার পুরোনো সব ছবি শেয়ার হবে।
তারপর? তারপর যত দিন ফুরাবে, এই নতুন নম্বরগুলো কললিস্টের অন্য হাজারটা চেনা-অচেনা নম্বরের সাথে প্রতিযোগিতা করতে করতে হেরে যেতে শুরু করবে। অফিস, বস, ক্লায়েন্ট, বাড়ির পরিচারিকা, বা ব্যাঙ্কের কাস্টমার কেয়ারের নম্বরের ভিড়ে তিয়াশা আর পিয়ালীর নাম দুটো একটু একটু করে কললিস্টের একদম উঁচু স্থান থেকে নিচে নামতে থাকবে। আর একটা সময়ের পর হয়তো নম্বর দুটো চ্যাটবক্সের এত নিচে চলে যাবে যে চেষ্টা করে স্ক্রোল না করলে আর দেখাই যাবে না।
আর ওরাও.... নিজেদের জীবন, নিজেদের সমস্যা, নিজেদের সংসার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে যে ওই নম্বরগুলোর কথা আর ওই মানুষগুলোর কথাও ভুলে যাবে।
না কখনও কখনও হয়তো অফিসের কাজের ফাঁকে, বা কোনো এক বৃষ্টিভেজা অলস সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে পড়বে— ‘ ইস! কতদিন তিয়াশা আর পিয়ালীর সাথে একটুও কথা হয় না। একটা ফোন করতে হবে একদিন। ’
কিন্তু সেই ভাবনাটা শুধু মনের কোণেই থেকে যাবে, কল্পনার সীমানা পেরিয়ে বাস্তবে আর কোনোদিন ওই নম্বর দুটোর ওপর আঙুল ছোঁয়াানো হবে না। আর ওই "পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলি"—যা আজ ট্রেনের কামরায় খনিকের জন্য আলো জ্বেলেছিলো—তা আবারও ধামাচাপা পড়ে যাবে অতীতের ধুলোমাখা পাতায়।
ট্রেনের চাকার আওয়াজটা যেন মিমির এই ভাবনাগুলোকে আরও উস্কে দিচ্ছিলো। ও একটা গভীর, চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। চারপাশের কোলাহলের মাঝেও ও অনুভব করলো এক ভয়ঙ্কর একাকীত্ব।
ব্যান্ডেল স্টেশন আর বেশি দূরে নেই। মিমি তার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলো, চোখ থেকে চশমাটা খুলে একবার মুছে নিলো। এই আধুনিকতার চাদরে ঢাকা নিঃসঙ্গ শহরটার দিকে তাকিয়ে ও নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। ট্রেনটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে শুরু করলো।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment