1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

বৃষ্টির বারান্দায় দাঁড়িয়ে

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

বৃষ্টির বারান্দায় দাঁড়িয়ে

প্রবীর কুমার চৌধুরী 

কয়েকদিন ধরেই দাবদাহ যেন শহরের শিরায় শিরায় জমে থাকা এক অদৃশ্য জ্বর। দুপুরগুলো আগুনের মতো, বাতাসে প্রাণ নেই, গাছের পাতাও যেন নড়তে ভুলে গেছে। রাস্তায় বেরোলে মনে হয়, সূর্য শুধু মাথার ওপর নয়, মানুষের বুকের ভেতরেও আগুন ঢেলে দিচ্ছে। 
এই দমবন্ধ করা গরমের মধ্যেই গতকাল বিকেলে একটু নিজের দায়িত্ব বোধেই ছুটে গিয়েছিলাম নন্দনে। মাসিক কাব্যতরী-র প্রথম প্রকাশের উদ্বোধন ছিল। সাহিত্য, কবিতা, প্রিয় মুখ - সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন বাস্তবের ক্লান্তি থেকে একটু দূরে সরে থাকার সুযোগ।
কিন্তু প্রকৃতি যেন মানুষের কোনো আয়োজনের ধার ধারে না। যখন আমি অবনিন্দ্র  সভাঘরের দরজায় তখনি হঠাৎ ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমে এল।  আমাকে পৌঁছাতে হবে বাংলা একাডেমিতে। বৃষ্টির ফোঁটা খুব বেশি ছিল না, অথচ গরম এত প্রবল যে শরীরের ঘাম আর বৃষ্টির জল মিশে একাকার হয়ে গেল। গায়ের পাঞ্জাবি ভিজে সপসপে। সেই ভেজা কাপড়ের অস্বস্তির মধ্যেও এক অদ্ভুত ভালোলাগা ছিল। মনে হচ্ছিল, এই সামান্য বৃষ্টিই যেন দীর্ঘ দাবদাহের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষুদ্র প্রতিবাদ।
রাতে বাড়ি ফিরে দেখি, মা আগের মতোই নির্বাক চুপচাপ শুয়ে আছেন। বয়স তাঁর শরীরকে ধীরে ধীরে পরাজিত করছে। ডাক্তার বলেন, এ বয়সে এমন হয়। আত্মীয়রা বলেন, বয়সজনিত দুর্বলতা। কিন্তু মন কি কখনও  কোন যুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে? মা তো শুধু একজন মানুষ নন; তিনি আমার সমগ্র শৈশব, আমার প্রথম আশ্রয়, আমার প্রথম উচ্চারিত ভাষার শব্দ।
আজও ঘুম থেকে উঠে প্রথম প্রশ্ন করি,
 - "মা, চা খেয়েছ?"
দুপুরে বলি,
 -  "মা, আজ স্নান কোরো না, শরীরটা ভালো নেই।"
বিকেলে বলি,
-  "একটু হাঁটো না মা , সারাক্ষণ বসে থেকো না।"
রাতে শুতে যাওয়ার আগে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু একবার দেখি - 
"ওমা, শুয়েছ?"
এই সামান্য কথাগুলোই হয়তো আমার সারাদিনের সবচেয়ে মূল্যবান উচ্চারণ। পৃথিবীতে অনেক সম্পর্ক আসে, অনেক সম্পর্ক হারিয়েও যায়,  কিন্তু "মা" শব্দটির কোনো বিকল্প নেই। যত বড়ই হই, যতই বয়স বাড়ুক, এই একটি ডাকের মধ্যেই আমি আবার ছোট হয়ে যাই।
আজ দুপুরে কাজ কর্ম সেরে খাওয়া দেওয়ার পর আয়ম্য-র অসমাপ্ত বইটি নিয়ে ঘড়িয়েছি, আমার মন কেমনের এই দুপুরে আচমকাই আকাশ কালো হয়ে এল। তারপর যেন একসঙ্গে হাজার হাজার ঢাক বাজতে শুরু করল। বিদ্যুতের ঝলকানি চোখ ধাঁধিয়ে দিল। বজ্রপাতের শব্দে শুধু জানালার কাচ কেঁপে উঠল না, বুকের ভেতর পর্যন্ত যেন কেঁপে উঠল। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে এল। আমাদের বাংলার ঘরে ঘরে এখনও এই রীতি বেঁচে আছে - বজ্রপাতের সময় শঙ্খ বাজানো। সেই শব্দে  যেমন ভয়ও থাকে,তেমনি আবার আশীর্বাদেরও এক অদৃশ্য সুর লুকিয়ে থাকে।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বুঝতেই পারিনি।
ঘুম ভেঙে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই দেখি, বাড়ির সামনের রাস্তায় এক হাঁটু জল। বৃষ্টির জল ধীরে ধীরে নালার দিকে বয়ে যাচ্ছে। কোথাও কাগজের টুকরো ভাসছে, কোথাও শুকনো পাতা, কোথাও ছোট ছোট ঢেউ।
হঠাৎ মনে হলো, এই দৃশ্য তো আমি আগে বহুবার দেখেছি।
চোখের সামনে ভেসে উঠল আমার ছেলেবেলা।
সেই পেছনে ফেলে আসা বৃষ্টির সময়গুলোই  ছিল উৎসব। মা পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে নৌকা বানিয়ে দিতেন। আমি আর পাড়ার শিশুকালের  ( যে মুখগুলো  আজ স্মৃতি পাতা থেকে মুছে গেছে )  বন্ধুরা সেই কাগজের নৌকাগুলো জলে ভাসিয়ে দিতাম। কার নৌকা কত দূর যাবে, তা নিয়ে কী ভীষণ প্রতিযোগিতা!
আবার যখন এই বৃষ্টির দিনেই বৃষ্টির জলে ভিজে কাদামাখা হয়ে বাড়ি ফিরলে মায়ের মুখে বকুনি থাকত, কিন্তু সেই বকুনির ভেতরেও মমতার উষ্ণতা ছিল। গামছা দিয়ে মাথা মুছে দিয়ে মুড়ি আর গরম আলুভাজা খেতে দিতেন।
আজ বুঝি, সেই সুখ ছিল দরিদ্র, কিন্তু অপার।
তখন খেলনা কম ছিল, স্বপ্ন বেশি ছিল।
অভাব ছিল, অথচ অভিমান ছিল না।
সন্ধ্যা নামলে বলবের  উগ্র হলুদ আলোয় আলোয় পড়াশোনা, তারপর দিদার মুখের গল্প। বাইরে বৃষ্টি,বরাহনগরের তাঁতিপাড়ার ভাড়া বাড়ির টিনের চালের উপর  টং-টং ট শব্দ, আর ভেতরে নিরাপদ অনটনের এক সংসার।
কখন যে সেই দিনগুলো ফুরিয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি।
যৌবন এল ঝড়ের মতো। কত স্বপ্ন, কত দৌড়, কত সংগ্রাম! মনে হয়েছিল, পৃথিবীকে জয় করব। সাহিত্যকে ভালোবেসেছিলাম। শব্দের ভেতরে আশ্রয় খুঁজেছিলাম। সংসারের দায়, চাকরি, দায়িত্ব - সবকিছুর মাঝেও কলমকে ছাড়তে পারিনি। কত রাত জেগে লিখেছি, কত প্রত্যাখ্যান সহ্য করেছি, কত অবহেলা পেয়েছি! তবু মনে হয়েছে, লেখা ছাড়া আমার বেঁচে থাকা অসম্পূর্ণ।
তারপর একদিন আমার জীবনে এল আর-একটি আশ্চর্য সম্বোধন - "বাবা"।
আমার একমাত্র কন্যাসন্তান প্রথম যখন আমাকে "বাবা" বলে ডাকল, মনে হয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত সম্মান যেন এক মুহূর্তে আমার বুকের মধ্যে এসে বসেছে। সেই ছোট্ট আঙুল ধরে হাঁটা শেখানো, প্রথম স্কুলে যাওয়া, প্রথম অসুখে রাত জেগে বসে থাকা - সব যেন গতকালের ঘটনা।
সময়ের কী আশ্চর্য গতি!
যে শিশু একদিন আমার হাত ধরে হাঁটত, আজ সে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। এটাই তো নিয়ম। নদী যেমন সাগরের দিকে যায়, সন্তানও একদিন নিজের আকাশ খুঁজে নেয়।
আর আমি?
আমি আবার ফিরে এসেছি সেই প্রথম সম্পর্কের কাছে - আমার মায়ের কাছে।
জীবনের বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হয়েছে।
যে মা একদিন  পরীক্ষার রাতে আমার পাশে বসে থাকতেন, আমার জ্বরের রাতে কপালে জলপট্টি দিতেন, আজ তাঁর ওষুধের সময় আমি মনে করিয়ে দিই। জলের গ্লাস আর ওষুধ তুলে দিই। যে মা আমাকে খাইয়ে না দিয়ে নিজে খেতেন না, আজ আমি  তাকে স্নান করিয়ে তাঁর থালায় ভাত তুলে দিই। যে মা আমার স্কুলব্যাগ গুছিয়ে দিতেন, আজ আমি তাঁর চশমা, ওষুধ, জামাকাপড় - সব গুছিয়ে রাখি।
সময় মানুষকে কত নিঃশব্দে বদলে দেয়!
আমরা বুঝতেই পারি না, কখন সন্তানের হাত থেকে দায়িত্ব এসে সন্তানের কাঁধেই চেপে বসে।
আজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে জমে থাকা বৃষ্টির জল দেখি, আর মনে হয়-জীবনও তো এমনই। কোথাও আনন্দ জমে থাকে, কোথাও দুঃখ, কোথাও অপূর্ণতা, কোথাও অশেষ ভালোবাসা। জল যেমন একসময় শুকিয়ে যায়, তেমনি সুখ-দুঃখও স্থায়ী নয়। কিন্তু স্মৃতি শুকোয় না।
স্মৃতিরও নিজস্ব এক ঋতু আছে।
কখনও এক পশলা বৃষ্টি তাকে জাগিয়ে তোলে, কখনও মায়ের একটি কাশি, কখনও মেয়ের একটি ফোন, কখনও কোনো পুরোনো গানের সুর...।
আজ বয়সের এই প্রান্তে এসে বুঝতে শিখেছি, মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, যশ নয়, প্রতিষ্ঠাও নয় - কিছু মুখ, কিছু ডাক, কিছু নির্ভরতা।
যে মানুষটির জন্য এখনও উদ্বেগে বুক কেঁপে ওঠে, তিনি আমার গর্ভধারিণী, মা।
যে মানুষটি আমাকে বাবা বলে ডাকে, সে আমার কন্যা।
এই দুই সম্বোধনের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে আমার সমগ্র জীবন।
একদিকে অতীত, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ।
আমি যেন মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক সেতু।
বৃষ্টির জল ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। আকাশের কালো মেঘও একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশে ম্লান আলো ফুটেছে। মনে হলো, প্রকৃতি যেন বলছে-প্রতিটি ঝড়েরও শেষ আছে।
কিন্তু মানুষের ভেতরের ঝড়?সেই ঝড় থামে না।
মাকে নিয়ে ভয়, নিজের বার্ধক্যের আভাস, হারিয়ে যাওয়া দিনের দীর্ঘশ্বাস, আর আগামী দিনের অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে বুকের ভেতর এক অনন্ত বর্ষাকাল বয়ে চলে।
তবু মানুষ বাঁচে।
কারণ বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি কিছু লাগে না।
একটি মায়ের স্নেহভরা দৃষ্টি, একটি সন্তানের বিশ্বাস, কয়েকটি অমূল্য স্মৃতি, আর বৃষ্টিভেজা একটি বিকেল-এই'টুকুই মানুষকে আবার নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
আজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হলো, সময় আসলে আমাদের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেয় না। সে শুধু ভূমিকা বদলে দেয়। যে শিশু একদিন মায়ের আঙুল আঁকড়ে পথ চলেছিল, সে-ই একদিন মায়ের হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে সাহায্য করে। এ যেন জীবনের সবচেয়ে নিঃশব্দ, অথচ সবচেয়ে গভীর কবিতা।
বৃষ্টি থেমে গেছে। জমে থাকা জলে আকাশের ভাঙা নীল মুখ দেখা যাচ্ছে। আমি ধীরে ধীরে ঘরের দিকে ফিরে যাই। দরজার কাছে এসে আবার নিঃশব্দে ডেকে উঠি-
"মা... ঘুমিয়ে পড়েছ?"
এই একটি ডাকেই যেন আমার সমস্ত জীবন, সমস্ত সাহিত্য, সমস্ত সুখ-দুঃখ, সমস্ত অর্জন ও সমস্ত অপূর্ণতা এসে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। যতদিন এই ডাক উচ্চারণ করতে পারব, ততদিনই মনে হবে-জীবন এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। এখনও কোথাও না কোথাও, বৃষ্টির জলে ভেসে চলেছে আমার ছেলেবেলার সেই কাগজের নৌকাটি।


No comments:

Post a Comment