![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
সাতদিন পর দুর্গাপূজা
শিবানী কুন্ডু খাঁ
কাশফুল নদীকূলে আলপথে । আকাশ নির্মেঘ । দেরি নেই জগজ্জননী মা'র আগমনের । বছরভর প্রতীক্ষা ।
সবার ।
এ'বছর পূজোতে যা করতে পারি নি যা পেলাম না আগামীর আগমনী উৎসবে তা পাবো সেই আশায় দশমীর সন্ধ্যেতে মাকে প্রণাম করে বুক বেঁধে চলি পথ ।
গত বছরের কথা মনে পড়ল । একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল । চাপা দিতে গিয়েও পারলাম না । কোদালটা মাটিতে নামিয়ে রাখলাম ।
'কি,গো পল্টুর মা , খবর কী ?'
বড্ড খনখনে গলা ।
মনে মনে বললাম রনিতা বৌদির এই এক স্বভাব। খোঁচা মেরে ঘায়ের জ্বালা বাড়িয়ে দেয়।
এই যে একটুখানি সাফসুতরো করবো বৌদি, মা আসবে বলে কথা।
রমেশবাবুর ক্ষেত থেকে একঝুড়ি মাটি আনা হয়েছে ।দুয়োরটা লেপা হবে । খড়িমাটি ভেজানো আছে ।
ঘরটুকুর দেওয়াল ধোঁওয়ায় কালচে হয়ে আছে ।খড়িমাটেতেই রঙ করা হবে । সঙ্গে একটু আলপনা দেওয়ার ভাবনাও আছে।
বাইরের মাঝে দাঁড়িয়ে গলার সুর চড়ায় রনিতা বৌদি ।
'হ্যাঁ গো ববিতা , ক'টা পূঁজি এখন ?'
প্রশ্নের ধরন বুঝতে সময় লাগে নি ।
তবু শান্তভাবে জিজ্ঞাসা - কিসের গো ?
'কাজের গো - কাজের ।'
ঠিকেদারী ঝি আমি । গোটা ছয়েক বাড়িতে কাজ চলছিল বেশ দক্ষতার সঙ্গেই । কিন্তু চাকরি বিভ্রাট। চাকরি বিভ্রাটের মধ্যে পড়ে হারাতে হল ক'টাকার চাকরিও ।
বুবানবাবুর বউ কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেছিল -'আর পারবো না বৌদি । টানা জটিল ।
কিছু মনে করো না ।'
দু'জনেই চুপ থাকি খানিকক্ষণ।
পরে বুবানবাবুর বউ ভারী গলায় সজল চোখে আবারও বলে - ' দাদাবাবুর চাকরিটা তো গেল ।কোথায় থাকা হয় এরপর কে জানে ! '
বুবান বাবুর বৌয়ের দিকে তাকিয়েই মুখটা নামিয়ে নিয়েছিলাম সঙ্গে সঙ্গে ।
হলামই বা কাজের মেয়ে । মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেছল ।
হাজার হোক করে তো খাচ্ছিল । দাদাবাবুটা যে ভালো মানুষ অন্য কিছু করে যে স্বচ্ছন্দে খেতে পারবে মনে হয় না ।
একটা শ্বাস পড়লো সজোরে ।
রামুর মাও জবাব দিয়েছে। সপ্তাহখানেক আগে । 'তোকে ছাড়াতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে রে ববি , তুই পরিবারেরই একজন হয়ে গেছলি । তাছাড়া হাজারটা টাকা তোর কাজেও লাগছিল । কাজ চলে যাওয়ার যন্ত্রণাটা তো আমি বুঝছি রে ।'
রামুর মা আর কোন কথা বলতে পারে নি ।
ধীর গলায় নীরবতা ভেঙ্গে বলেছিলাম - ' কাজ না করলেও আমি আসবো দিদি ।রামুর জন্যই আসব ।রামুটার উপর কেমন যে একটা মায়া পড়ে গেছে গো ।
দীপবাবু তো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন । এত বড় ধাক্কা সামলাবেন কীভাবে ? লোন করে গাঁয়ের সম্পত্তি বেচে শহরে দালান বানিয়েছিলেন । "এবার কি হবে কি করব ' বলতে বলতেই সেন্সলেস হয়ে অসুস্থ । তিন তিনটে কাজ হারাতে হলো আমাকেও ।
মনটা নতুন করে ব্যথিয়ে উঠলো ।
রনিতা বৌদির কথার ঝাঁজে নয় , নিজের তিন তিনটে কাজ হারানোর দুঃখে নয় ; এতগুলো অসহায় মুখ মনে পড়ে গেল নতুন করে ।রামুর সেই আধো আধো আদুরে কথাই মনে পড়ছে। রামুরা তো চলে যাবে সেই নিজেদের গাঁয়ে । হয়তো দেখা হবে না কোনদিনই ।
রনিতাবৌদির কর্কশ কথা ' কি-গো ববিতা , বাক্য সরছে না যে ? কি ভাবছো ? সামনে পূজো আর এসব কী ঘটে গেল ! '
সম্বিত ফিরে পেলাম ।
সত্যি গো ,করে খাচ্ছিল মানুষগুলো। কী সব গ্রুপ সি -গ্রুপ ডি-র চাকরি । গেল তো গেল - চলেই গেল ।
রনিতা বৌদি হাত নেড়ে ঝংকার দিয়ে অনেক কথা বলে চলল । কিছু বুঝলাম কিছু বুঝলাম না।
'কেনা চাকরি -লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে কেনা চাকরি -তার নিশ্চয়তা কিছু থাকে না আসলে।
ভানুপদ দাদার কথাও পাড়লো ।ওদের জামাইয়ের চাকরিটাও তো গেছে।
রনিতাবৌদির মুখে মৃদু হাসির ছাপ ।
ভানুপদ দাদা লোকটা তো সুবিধের নয় একেবারে । সবকিছুতেই টাকা কামানো অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে । চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা ,লোন মঞ্জুর হলে টাকা ,বাড়ি তৈরি করলে টাকা , ছোট দোকান বসাবে তার টাকা । একেবারে মাথা খারাপ করা অবস্থা। এইটাতে ফেঁসে গেছে লোকটা । নিজের জামাইও গর্তে পড়েছে ।
গলা নীচু করে বললাম রামুর মা বলছিল- কী সব প্রতিবাদ আন্দোলনের কথা ।
রনিতা বৌদি হঠাৎ কেমন অন্যরকম হয়ে গেল । চোয়াল শক্ত হলো তার।
'হ্যাঁ , সন্ধ্যা ছ'টায় । যা সব চলছে নারী নির্যাতন চাকরি চুরি আরো কত কিছু ।
আর আমরা সবাই শীতঘুমে ।
মাইকের আওয়াজ ভেসে এলো -অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠুন । সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলনের সামিল হন সকলে ।
ন্যায় কোথায় !
রনিতা বৌদি বলল ন্যায়ের লড়াইয়ে সেই সুদীপ ভাই নাকি আসবে গো ।
সুদীপ ভাই বলে এলাকার সবাই চেনে ছেলেটাকে। কোথায় বাড়ি কে জানে !
করোনার সময় মানুষের পাশে থেকে বিখ্যাত হয়ে গেছে। চারদিকে তখন ভয়ংকর থমথমে পরিবেশ । ছোঁয়াছুঁয়ির কত বাছবিচার ।কত মানুষ মরল । পাড়ায় পাড়ায় কান্না ভয় । লকডাউন কতকিছু ।ভয়াবহ সেই সব দিনের স্মৃতি আজ ফিকে কিন্তু ছেলেটার ওই মুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে স্মৃতির মণিকোঠায় ।ভয় নেই ভাবনা নেই শুধু সেবা দিয়েছে । মানুষের পাশে থেকে সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্নভাবে ।কার ওষুধ লাগবে কার অ্যাম্বুলেন্স কার দুটো তরিতরকারী মাছ মাংস বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হাসিমুখে সেই সব ব্যবস্থা করে সমাধান করেছে - পৌঁছে দিয়েছে নির্ভয়ে ।
তাই !আসবে সত্যি !
'তাইতো বলছে সকলে ।'
কিন্তু -নীরব হলাম আমি ।
' কী কিন্তু - বল । "
যাব আর কী করে ? পরের সপ্তাহে দুর্গাপূজা ছেলেটার জন্য কিছু কিনে দিতে না পারলে বড্ড খারাপ লাগবে ।
বিনুদিদির মা ডেকেছে । ওর বৃদ্ধা মাকে চিকিৎসার জন্য নার্সিংহোমে নিয়ে যাবে । সেখানেই দেখভালের জন্য নাইট ডিউটি করতে হবে। বিকেল চারটেতে জয়েন দেবো।
'অশেষদা ? '
থাকবে বাপ ব্যাটাতে ।
অসুস্থ স্বামীর কাছে ক্লাস ফোরে পড়া বাচ্চাকে কোন ভরসায় রেখে যাবে গো ববিতা ?'
গরিবের ভরসা একমাত্র ভগবান । তাছাড়া হাতে হাতে পাঁচশো টাকা রোজগার - মন্দ কী ?
দিনচারেক উপরি ডিউটিতে সারা বছরের লালিত স্বপ্নটুকু পূর্ণ করতে হবে । গত বছর বোস দালানে দুর্গাপূজার দিন ক'টাতে মায়ের অন্নভোগ খেয়ে কেটেছিল। এ বছরও নিশ্চয়ই মিলবে প্রসাদ । তবে ভীমপুরের ঠাকুরদর্শনে যাবার জন্য পল্টুর নতুন জামা প্যান্ট চাওয়ার আকুতিটা আজও মনে নাড়া দেয় ভীষণভাবে ।
বিলু মদন সবাই নতুন প্যান্ট শার্ট পরে ওকে ডাকতে এসেছিল নবমীর দিন । বাড়িময় 'পল্টু' ডাকে তোলপাড় ।
সাড়াশব্দ নেই ।
সাড়া না দেওয়ার কারণটা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছিলাম। এক বুক অভিমান - প্যান্ট না পাওয়ার এক ভীষণ নীরব দুঃখ জমেছিল তার মনে ।
যতই হোক ছোট্ট তো - দুঃখ জয়ের ও তো কিছু বোঝে না ।
নবমীর দিন সকালেই বলেছিল - ' তাহলে প্যান্টটা কিনে দিলে না মা ?"
বাবুরামের দোকানে প্যান্টটা ইস্ত্রি করে এনেছি বাবা , নতুনের মতই লাগবে।
"নতুন তো নয় । বিলু মদন সৌরভরা সবাই নতুন পরে ভীমপুর যাবে মা ।'
তুইও যাস । ফুচকা খাবি । দশ বিশ টাকা সঙ্গে নিবি।
আর কোন কথা বলেনি পল্টু । আর তারপরেই বিকেলে ওদের দলবল আসতে দেখে লুকিয়ে গেছল বাচ্চুদের ঘরের পাশের গলিতে।
পল্টুর না পাওয়ার বেদনামাখা সেই মুখটা আজও নিরালায় চোখে জল এনে দেয়। গতবছর ওর আবদার মেটানো একটু সহজেই ছিল । বলেছিলাম - একসঙ্গে প্যান্টশার্ট দেবো। টাকা ক'টা জমিয়েও রেখেছিলাম । কিন্তু ওর বাবার আকস্মিক এত বড় অসুস্থতাই সব ডামাডোল করে দিয়েছিল ।ওষুধের দাম তো কম নয় ।রক্ত জল করে উপার্জন করা টাকা ক'টা সব বেরিয়ে গেল বানের জলের মত । ধারদেনার মুখেও পড়তে হলো ।তাই একটা জামা কোনমতে কিনে দিয়ে ইস্ত্রি করা পুরানো প্যান্ট দিয়েই চালিয়ে নেওয়ার ভাবনাটাই পাকা করে নিয়েছিলাম ।
এবছর তো কাজের বাজারে ধ্বস নেমেছে ।কাজ হারাতে হয়েছে তিন তিনটে ।এদিকে তাকে কিছু না দিয়ে থাকি কি করে ? এজন্য এক রাত নয় সপ্তাহভর রাত জেগে দেখভাল করব বিনুদিদির মা'র মাকে ।
রাতে ঘুম হচ্ছে না কদিন। কিভাবে ম্যানেজ হবে সবদিক । চার চারটি দিন বলে কথা !
আবার ছোট ভাই বুধন আসবে বলেছে বউ নিয়ে। তারও একটা বাড়তি খরচ ।মাথা ঠিক রাখা ভার । চেন্নাইয়ে শ্রমিকের কাজ করে ।দু 'বছর পর আসবে ।
রনিতা বৌদি আর দাঁড়াতে চাইল না । সুদীপ ভাই আসছে সিংহ গর্জনে অন্যায়কারীর শাস্তি দাবী করবে - দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়নের ডাক দেবে ।পাশের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কলেজ পড়ুয়া লীলা বলল - ' এ লড়াই কঠিন লড়াই কিন্তু লড়তে হবে ।'
রনিতা বৌদি খনখনে গলায় জবাব দিল - ' সে আরো বলতে । সবাই বলছে গো কঠিনতম লড়াই ।'
' ঠিক । সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির এই পোকা বাসা বেঁধে নিয়েছে কিনা । ও বাসা ভেঙে ফেলতে হবে তো কঠিন কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ।' ফোন বেজে উঠল আমার ।
বিনুদিদির মা'র ফোন । কাতর গলায় বলল - 'এখনি বেরিয়ে পড় ববিতা , মাকে নিয়ে নার্সিংহোমে যাওয়ার তোড়জোড় চলছে। '
গলা নামিয়ে বললাম - আজকের দিনটা যদি নিজেরা একটু ম্যানেজ করে নিতে পারো দেখো না ।
'তা হয় না ববিতা তোমাকেই চাই । সব বুকিং হয়ে গেছে ।'
কিন্তু সুদীপ ভাই আসছে - চোখের দেখা দেখে একটু ঋণ শোধ করে নিতাম ।
আর কথা বলেনি বিনুদিদির মা ।
মানুষের আবেগকে মর্যাদা দিতে হয় কখনো কখনো । তাই কিছু সময় স্থির থেকে বলল , 'বেশ যেও , সুদীপ ভাইয়ের সভায় । তারপর রাত দশটার দিকে হলেও এসে জয়েন দিও ।বুবুনকে পাঠাবো ।তোমাকে নিয়ে আসবে ।'
বিনুদিদির মাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোট করতে চাইলাম না । সবই দুর্গা মা"র কৃপা বলেই মনে হল ।
এই ভয়ংকর অসময়ের বাজারে পাঁচশো টাকাটা কম !
পল্টুর মুখের হাসি ওটা !



No comments:
Post a Comment