![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
পতিতালয়ের মাটি
শুভব্রত ব্যানার্জী
ভবদেব পুরের পতিতালয়ের সামনে প্রচণ্ড ভিড়। আশেপাশের লোকজন কৌতুহল নিরসনের জন্যে জড় হতে শুরু করলে সেই ভিড় বাড়তে বাড়তে ফটক পেরিয়ে প্রধান রাস্তা পর্যন্ত চলে আসায় রাস্তায় ব্যাপক জানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বাকিদের মতো কৌতুহলী হয়ে আমিও বাস থেকে নেমে গেলাম। কাছাকাছি গিয়ে জানতে পারলাম ভবদেব পুর পতিতাদের সংগঠন 'দুর্বার সমিতি' আন্দোলন শুরু করেছে, মা দুর্গার প্রতিমা গড়তে এবার থেকে তারা নাকি আর মাটি দেবে না। তাই প্রতিমা তৈরির কুম্ভকার ও পারিবারিক পুজোর পুরোহিত এবং উদ্যোক্তাদের সাথে তাদের প্রথমে আলোচনা থেকে পরে বচসা শুরু হয়। কিন্তু তাতে সুবিধা হবে না বুঝতে পেরে যাঁরা মাটি নিতে এসেছেন তাঁরা অনুনয় বিনয় করতে শুরু করেন। তাতেও বরফ গলে না, ফলে ভিড় বাড়তে থাকে এবং সেখান থেকেই জানজট শুরু হয়েছে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম আমার এক বন্ধুর বাবা হারাধন চ্যাটার্জির মতো সাত্ত্বিক ও জ্ঞানী লোকও সেখানে রয়েছেন তাঁদের পারিবারিক দুর্গা পুজোর প্রতিমা তৈরির মাটির জন্যে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যখন বুঝলাম যে সেই জানজট ছাড়ার নয় তখন হেঁটেই বাড়ি ফেরা মনস্থ করলাম।
সন্ধ্যা বেলা হারাধন কাকুর কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম- কাকু, মাটি সমস্যার সমাধান হলো?
কাকু বিরস বদনে বলেন- না।
- আচ্ছা কাকু, দুর্গা প্রতিমা গড়তে পতিতালয়ের মাটি লাগে কেন?
তিনি বলেন- দুর্গা পূজা হলো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। এই সময় মা কৈলাস থেকে মর্তে আসেন। পতিতা মানে হচ্ছে যারা আচারে, ব্যবহারে এবং কর্মে সমাজে পতিত হয়েছে। আমরা পতিতাদের অপবিত্র ভেবে দূরে সরিয়ে রাখি। কিন্তু মা তো মা-ই, তাঁর কাছে সব সন্তান সমান। সমাজের এই অস্পৃশ্যদেরও মা আপন করে নেন। শাস্ত্রে বর্ণিত আছে যে, মা দুর্গার প্রতিমা তৈরির জন্যে চারটি উপকরণ খুব প্রয়োজন- গঙ্গার পলিমাটি, গোমূত্র, গোবর ও পতিতালয়ের মাটি। আগে পুরো প্রতিমাই এই পতিতালয়ের মাটি দিয়ে তৈরি হতো, এখন সাধারণ মাটি বা পলি মাটির সাথে এই পতিতালয়ের মাটি ও অন্যান্য দুটি উপকরণ মিশিয়ে মূর্তি তৈরি করা হয়।
আমি বললাম- কিন্তু পতিতালয়ের মতো অপবিত্র জায়গার মাটিই কেন দরকার হয়?
কাকু হেসে বললেন- শাস্ত্রের এক মতে উল্লিখিত আছে, যে পুরুষেরা পতিতালয়ে যায় তারা তাদের জীবনের সঞ্চিত সব পুণ্য পতিতালয়ে ত্যাগ করে পাপ বহন করে নিয়ে আসে। তাই সেই মাটি পুণ্য মাটি। আবার অন্য মতে পতিতারাই সমাজকে কলুষমুক্ত করে পবিত্র রাখে তাই তদের ব্যবহৃত মাটি খুব পবিত্র। সেই কারণেই মা দুর্গার প্রতিমা তৈরিতে পতিতালয়ের মাটি একটি আবশ্যিক উপকরণ। এই মাটি সংগ্রহ করে বৈদিক মন্ত্র পড়ে বাকি উপকরণগুলো মিশিয়ে মূর্তি তৈরি করা হয়। এই মাটি মেশানো না থাকলে সেই মূর্তি সঠিক ভাবে তৈরি হয় না। মোটকথা মূর্তি তৈরির আগে তাদের আশীর্বাদ চায়-ই চায় তা না হলে সেই পুজো সফল হয় না। দুর্গা পুজোয় মায়ের যে নয়টি রূপের পুজো হয় সেখানে নবম রূপে মা তাদের প্রতিনিধি হিসেবেই পুজো গ্রহণ করেন।
- তাহলে সমাজ তাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে কেন?
- সেখানেই তো তাদের প্রতিবাদ, আর তাদের দাবি অযৌক্তিক কিছু তো নয়।
- তাদের দাবি কি?
- পতিতাদের মধ্যে একজনের নাম শেফালী। সে লেখাপড়া জানা মেয়ে। তাদের জীবন যাতে তার মেয়ের জীবনে কোনো কালো ছায়া না ফেলে তার জন্যে সে বছর চারেক আগে শহরের একটা বোর্ডিং স্কুলে তার মেয়েকে ভর্তি করে দিয়েছিল।
- সেটা তো খুব ভালো কথা।
- এতোদিন সব ঠিকঠাক চলছিল। এখন ঐ বোর্ডিং স্কুলে যে নতুন প্রিন্সিপাল ম্যাম এসেছেন, তিনি ওই মেয়েটিকে স্কুল থেকে বের করে দিয়েছেন।
- তার অপরাধ?
- ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের সাথে পতিতার মেয়ে পড়লে তাদেরও চরিত্র নাকি নষ্ট হয়ে যাবে।
- সেটা কোনো কথা হলো! ওই মেয়েটির মধ্যে কি তেমন কিছু লক্ষণ দেখা গেছে?
- সে বছর নয়ের এক নিষ্পাপ শিশু।
- তাহলে বের করে দিলেন কেন?
- সেটাই তো এদের রাগ আর তাই নিয়েই আন্দোলন। সমাজ যখন তাদের অপবিত্র ভাবছে, অস্পৃশ্য ভাবছে তখন সমাজের সবচেয়ে পবিত্র কাজে তাদের মতো অপবিত্র মেয়েদের থাকার জায়গার অপবিত্র মাটি তারা আর দেবে না।
- যাই বলুন কাকু, আমার মনে হয় তাদের অভিমান হওয়া স্বাভাবিক এবং তাদের দাবিও যুক্তিযুক্ত। শেষ পর্যন্ত কি ফয়সালা হলো?
- আগামীকাল সকালে শেফালী নামের ওই মেয়েটি ও তার মেয়েকে নিয়ে 'দুর্বার সমিতি'-র কিছু সদস্য এবং আমাদের কয়েকজন প্রতিনিধি ওই বোর্ডিং স্কুলের প্রিন্সিপাল ম্যাম এবং পরিচালক সমিতির সদস্যদের সাথে আলোচনায় বসবে। দেখাযাক তারপর কি হয়।
- আপনি কি সেই আলোচনা সভায় যাবেন?
- হ্যাঁ, যাব। আমাকেই মাটি চাওয়া কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।- বলেই কাকু হো হো করে হাসতে লাগলেন।
আমি তাঁর হাত ধরে বললাম - কাকু, আমি কি কাল আপনার সাথে যেতে পারি?
- তোর অফিস?
- ছুটি নেব। কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে ঐ আলোচনা সভায় আমার যাওয়া উচিত, গেলে পুজো সংখ্যায় লেখার জন্যে আমি একটা ভালো বিষয় পাব।
- তবে চল।
পরদিন সকালে খুব তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে কাকুর কাছে চলে যাই এবং কাকুর সাথে ওই আলোচনা সভার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। আমরা যখন ওখানে গিয়ে হাজির হলাম তখন স্কুল চত্বর লোকে লোকারণ্য। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে আবার কেউ বা নিছক মজা নেবার জন্যে সেখানে উপস্থিত। পরিচালক সমিতির সদস্যরা উপস্থিত হলেও প্রিন্সিপাল ম্যাম তখনও উপস্থিত হতে পারেননি স্কুলের কিছু কাজ বাকি থাকায়। 'দুর্বার সমিতি'-র সদস্যদের মধ্যে কেউ একজন বলে- শেফালী তুই তোর মেয়েকে নিয়ে বাইরে যা, দরকার হলে ডাকব। তোর মেয়ের সামনে এইসব আলোচনা না হওয়াই ভালো। খানিকক্ষণ পর প্রিন্সিপাল ম্যাম সভায় এসে উপস্থিত হলেন এবং উপস্থিত হয়ে বলেন- আপনারা কেন এসেছেন সেটা জানি কিন্তু আমি অপারগ। ওই মেয়েটির সংস্পর্শে আমি আমার বাকি ছাত্রছাত্রীদের জীবন নষ্ট করতে পারব না।
পরিচালক সমিতির সদস্যদের জিজ্ঞেস করলে সভার সভাপতি বলেন- আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দেখাশোনা করি তবে স্কুলের ব্যাপারে প্রিন্সিপাল ম্যাম সব। তাঁর কাজে বাধা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
আমি কিছু বলার আগেই কাকু প্রিন্সিপাল ম্যামকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করেন - আপনি কি করে জানলেন যে মেয়েটি পতিতার মেয়ে? আপনাদের রেজিস্টারে কি লেখা আছে?
প্রিন্সিপাল ম্যাম রাগত স্বরে বলেন- না। সেটা কোথাও লেখা থাকে না।
- তাহলে কি আপনি তাকে চেনেন?
- আমার একটা স্ট্যাটাস আছে, ওইসব বাজে মেয়েদের আমি চিনতে যাব কেন?
- রেজিস্টারে লেখা নেই, আপনি তাকে চেনেন না তাহলে আপনি কি করে জানলেন যে শেফালী পতিতা?
- রেজিস্টারে লেখা আছে ও সিঙ্গেল মাদার।
- সিঙ্গেল মাদার যে কেউ যে কোনো কারণেই হতে পারে। ডিভোর্স হবার পর কেউ স্বামীর নাম ব্যবহার না করে নিজের পরিচয়েই সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করতে পারে, সে-ও সেক্ষেত্রে সিঙ্গেল মাদার। তাঁর সন্তানকেও কি আপনি স্কুল থেকে বের করে দেবেন? আবার বিয়ের আগে ভালবাসার ফলে কোনো মেয়ের পেটে বাচ্চা চলে আসার পর কোনো কারণে তাদের বিয়ে হলো না। কিন্তু সেই মেয়েটি তার ভালবাসার চিহ্ন সেই সন্তানটিকে জন্ম দিয়ে তার নিজের পরিচয়ে বড় করতে লাগল, সে-ও সিঙ্গেল মাদার। তার সন্তানকেও কি আপনি স্কুল থেকে বের করে দেবেন?
প্রিন্সিপাল ম্যাম কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে আমতা আমতা করে বলেন- সব ব্যাপার এক নয়।
- তাহলে আপনিই বলুন কোনটা কি ব্যাপার।
প্রিন্সিপাল ম্যামকে চুপ করে থাকতে দেখে কাকু একজনকে বলেন- রাকা তুমি বাইরে গিয়ে শেফালীকে পাঠিয়ে দাও আর তার মেয়েকে নিয়ে তুমি বাইরে থেকো।
শেফালী রুমে ঢুকে প্রিন্সিপাল ম্যাম দেখেই বলে- তুমি মানে আপনি! তাই আমার মেয়েকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন?
পরিচালক সমিতির সভাপতি বলেন- তুমি এঁকে চেনো?
শেফালী মুচকি হেসে বলে- খুব চিনি এবং উনিও আমাকে খুব ভালো করে চেনেন। কি ম্যাডাম বলব কিভাবে আমাদের পরিচয়?
শেফালীর কথা শুনে প্রিন্সিপাল ম্যামকে দেখে মনে হলো কেউ যেন জোঁকের মুখে নুন ছিটিয়ে দিয়েছে। তিনি মুখ নীচু করে বসে থাকেন।
সভাপতি বলেন- তুমি বলো।
- কারো ব্যক্তিগত গোপন কথা বলতে আমার রুচিতে বাঁধে তাতে উনি যতই আমাদের পতিতা বলে ছোট করতে চান। উনি সমাজের অনেক উঁচু তলার লোক, তাঁর একটা সম্মান আছে। তিনি আমাকে অসম্মান করলেও আমি তাঁকে অসম্মান করতে পারব না।
শেফালীর কথা শুনে প্রিন্সিপাল ম্যাম কেঁদে ফেলেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বলেন- জেদের বসে হটকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার উচিত হয়নি। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি, আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। শেফালীর মেয়ে দিশা এই স্কুলেই পড়বে।
প্রিন্সিপাল ম্যামের কথা শুনে যুদ্ধ জয়ের আনন্দে 'দুর্বার সমিতি'-র সবাই শেফালীকে জড়িয়ে ধরে।
সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম কিন্তু প্রিন্সিপাল ম্যামের এমন ব্যবহারের গোপন কারণটা জানার জন্যে মন উশখুশ করতে লাগল।
-----০-----



No comments:
Post a Comment