![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
একটি মৃত্যুর কাহিনী
অন্তরা চ্যাটার্জী
যাঁর মৃত্যুর কাহিনীটি লিখতে চলেছি,তাঁর জীবন ছিল সাধারণ, কিন্তু বর্ণময়।আমার বাবা।এ বছর তাঁর মৃত্যুর দশ বছর পূর্ণ হবে।তাঁর জীবনের কাহিনী ছেড়ে কেন তাঁর মৃত্যুর কাহিনী লিখছি,তার প্রধান কারণ হলো তাঁর মৃত্যু আমার জীবনদর্শন বদলে দিয়েছে।বদলে দিয়েছে আমার মনোজগত,বদলে দিয়েছে আমার পৃথিবীকে ও নিজেকে দেখার চোখ,বদলে দিয়েছে আমার উপলব্ধি।
আমার বাবা,অমিয় মুখোপাধ্যায়,মানুষটা ছিলো একটা পুরোদস্তুর শিল্পী মানুষ।কবিতা,গানবাজনা, নাটক,সিনেমা এবং তার আবৃত্তির ছাত্রছাত্রী আর তার পরিবারের ভালোবাসার মানুষজন এর বাইরে কিছু বুঝতো না।ইস্টার্ণ রেলওয়েতে চাকরি করতো,সেটা নেহাতই অর্থোপার্জনের জন্যই।কোনদিন প্রমোশন নেয় নি,অফিসে কাজ ও দায়িত্ব বাড়লে শিল্পচর্চার ক্ষতি হবে বলে।টাকাপয়সা জমানো?এল আই সি?মেডিক্লেম?ধুস!কোনমতে পাইকপাড়ায় নিজের একটা ছোট ফ্ল্যাট করেছিলো অবশ্য।পরে আমি বাবা মাকে হাতিবাগানে আমার শ্বশুরবাড়ির কাছাকাছি নিয়ে আসি।
নাঃ, জীবনের কথাই বলে চলেছি কিন্তু বলতে বসেছি মৃত্যুর কথা বা বলা ভালো মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে জীবনের কথা।
২০০৫ সালে বাবার ক্যান্সার ধরা পড়ে।ঠিক যে রোগটাকে বাবা সবথেকে বেশি ভয় পেতো, আমিও পেতাম,সেটাই।কিন্তু পরপর দুটো সার্জারি করে বাবাকে ক্যান্সারমুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।কিন্তু আমি,বাবা সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতাম।জানতাম,যে সুপারফাস্ট ট্রেনটায় চড়ে বসেছি,সেটায় একটা টাইমবোমা ফিট করা আছে।যেকোন দিন ফাটবে।ফাটলো সেটা।২০১৫ সালে।এই দশ বছর বাবা দিব্যি ছিলো, তার আবৃত্তির ক্লাস,অনুষ্ঠান,মা কে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া,লেখালেখি এই সব কিছু নিয়ে।২০১৫ সালে আমি আমার বর ছেলেকে নিয়ে ইউরোপ ঘুরে এসেছি।আমিও দিব্যি ছিলাম।কিন্তু একেই premonition বলে কি না জানিনা।মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অন্ধকার ছেয়ে থাকতো।এমনকি তার ছায়া আমার চোখে মুখেও পড়েছিলো, সেটা ধরা পড়েছিলো বন্ধু সহকর্মীদের চোখে। ২০০৫ এর নভেম্বর মাসে গোয়া বেড়াতে গিয়ে বাবার নাক থেকে কিছুটা রক্তপাত হয়।ধরা পড়ে ম্যালিগন্যান্ট নেজাল পলিপ,যেটার সার্জারি করেই বাবাকে ভালো করা হয়।আর ২০১৫ র নভেম্বর মাসের এক রাত্রে বাবা ফোন করে আমায় বলল,"আমার কাশির সঙ্গে রক্ত উঠলো রে,সেবার পেরেছিলি,এবার আর পারবি না।"
চোখের সামনে আমার ঘরটা দুলে উঠলো,বাইরের সব অন্ধকারটা মনের এতদিনকার অন্ধকারের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে আমাকে গিলে নিলো।আমি বুঝলাম, কাল থেকে আমার জীবনযাপন বদলে যাবে,কাঁকড়াবিছের ল্যাজে থাকা হুলের তীব্র বিষ নিমেষে মিশে গেলো আমার রক্তেও।
এরপর শুরু হলো আমার দুঃস্বপ্নের জীবন।শ্বশুরবাড়ি ফেলে বাবা মায়ের কাছে গিয়ে থাকতে লাগলাম।ছেলের তখন আই সি এস সি পরীক্ষা সামনে।ও বেচারী আমায় ছাড়া থাকতে পারে না।এদিকে বাবাকে নিয়ে রোজ হসপিটালে ছোটা।রেডিওথেরাপি, এম আর আই, স্ক্যান...এক এক দিন একেকটা পর্ব।সেসবের বিস্তারিত তথ্য দিতে চাই না।কিন্তু এই প্রসঙ্গে বলতে চাই বাবার তীব্র বেঁচে থাকতে চাওয়ার কথা।এইখানে একটা অদ্ভূত গল্প বলি।প্রথমবারের অসুস্থতার সময় আমি বাবার জন্য হাতে একটা জোডিয়াক রিং ধারণ করেছিলাম আর মনে মনে প্রার্থনা করেছিলাম বাবার ক্যান্সারজনিত রিস্ক যেন যতটা সম্ভব কম হয়।বাবার প্রথম অপারেশনটা এত ভালো হয়েছিলো যে ৭২ বছর বয়সেও বাবা আরো দশ বছরের ক্যান্সারমুক্ত জীবন পেয়েছিলো।তারপর থেকেই বাবার ওই আংটিটার ওপর খুব বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল,মনে করতো আংটি খুললেই আবার অসুস্থ হয়ে পড়বে।আমিও খুলতাম না আংটিটা।এইবারে কি হয়েছে, আংটির তলায় আঙুলে দগদগে ঘা হয়ে গেছে।মা ফিসফিস করে বললো আংটিটা একরাতের জন্য খুলে ওষুধ লাগিয়ে পরদিন সকালে পড়ে নিতে।বাবা কোত্থেকে শুনতে পেয়ে প্রায় আর্তনাদ করে উঠে বললো,"না না,খুলিস না,খুলিস না।"
আমি এই আংটি খুলেছিলাম কবে জানতে চান?যেদিন মায়ের মুখ থেকে শুনলাম,"তোর বাবা মুক্তি পেলেই ভালো"।সেদিন আংটিটা খুলে ঠাকুরের সিংহাসনে রেখে দিলাম।সেদিন ছিলো এক বুধবার।তার ঠিক পরের বুধবার রাতে বাবা চলে যায়।ততদিন পর্যন্ত আঙুলে আংটির তলা দিয়ে ওষুধ লাগিয়ে লাগিয়ে থাকতাম।তারপরের সপ্তাহের মধ্যেই ঠাকুরের বাসী ফুলমালার সঙ্গে কোথায় চলে গেলো সেই আংটি!!
যাক,প্রসঙ্গে ফিরি।বাবার ওই বাঁচার ইচ্ছে দেখে,মনে হতো যেমন করে পারি বাবাকে বাঁচিয়ে রাখি।আর বাবাকে কষ্ট পেতে দেখলে আমার মনে হতো বাবাকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলি।বাবা দারুণ সুন্দর দেখতে ছিলো।অনেকটা আগেকার দিনের ফিল্মস্টার প্রদীপকুমারের বা বিশ্বজিৎ এর মতো।হসপিটালে বাবাকে নিয়ে যেতাম যখন অনেকে আমাকেই পেশেন্ট ভাবতো,আমার চেহারাও হয়ে গিয়েছিল সেরকমই। সেই বাবাকে যখন দেখলাম রোগা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ, তপ্ত সোনার মতো গায়ের রঙে কালি পড়ছে, বাবা সিঁড়ি উঠতে,ঘরের মধ্যে হাঁটতে,এমনকি কথা বলতে গেলেও হাঁপিয়ে যাচ্ছে, আমার মনে হতো বাবাকে আর বাঁচতে হবে না।বাঁচার মতো বাঁচা যদি মানুষ বাঁচতে না পারে,কি হবে তার বেঁচে?বিখ্যাত বাংলাদেশী ছবি "ডুব" এ ইরফান খানের মুখে একটা সংলাপ ছিলো,"মানুষের মৃত্যু তখনই হয় যখন সেই মানুষের আর পৃথিবীকে দরকার হয় না, বা পৃথিবীর সেই মানুষকে।"সংলাপটা আমার বড় সত্য মনে হয়।
কান্না..........
চোখ ছাপিয়ে উপচে পড়ে লবনাক্ত, উষ্ণ জল...সবসময়...দাঁত মাজতে মাজতে, পূজো করতে করতে,ক্লাস নেওয়ার আগে ও পরে স্কুলের করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে,রান্না করতে করতে,বাসন ধুতে ধুতে....মানুষের চোখের মধ্যে, বুকের মধ্যে এত জল থাকে!!!বাবার তখন রেডিওথেরাপি চলছে,খেতে গিয়ে গলায় বুকে কষ্ট,আমার গলা দিয়ে ভাত নামতো না,চোখ দিয়ে জল নামতো।ট্রেনের জানলায় বসে মুক্ত নীল আকাশ আর সবুজ মাঠ দেখতে দেখতে মনে হতো বাবা আর কোনদিনও এসব দেখতে পারবে না।বিধাননগরের ওভারব্রিজ পেরিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় যখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসতো মনে হতো একটা বিশাল অক্টোপাস পৃথিবী জুড়ে,আমার মন জুড়ে,বিষাদের বিষাক্ত কালি ছিটিয়ে উধাও হয়েছে।বাবার আবৃত্তির ক্লাস বন্ধ।বাবা স্নান করতে করতে তবু আস্তে আস্তে কবিতা বলে,গান গায়।আমার চোখ ফেটে জল আসে।কবিতা শুনতে চায় আমার কাছে।A Small Pain in My Chest কবিতাটা শোনাতে বাবা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো একদিন।আমি আপসে মরি,কেন ওই সৈনিকের মৃত্যুর কবিতাটাই পড়ে শোনাতে গেলাম বাবাকে?আসলে আমায় তখন মৃত্যুচেতনা গ্রাস করেছে।জীবনের কোন মানে পাই না আর।বন্ধুদের হাসতে বা কথা বলতে দেখলে মনে হতো মানুষ কেন হাসে,কথা বলে আদৌ?এই তো একটা কয়েন হাতে নিয়ে ঘুরছি আমরা,যার এক পিঠে জীবন আর অন্য পিঠে মৃত্যু।এর জন্য বেঁচে থাকার, ভালো থাকার এত আয়োজন?
কোন একটা কথা হয়তো ডাক্তারবাবুকে ফোন করে জেনে নিলেও হয়ে যায়।কিন্তু প্রয়োজন না থাকলেও হসপিটালে চলে যাই আমি।ওখানকার ক্যান্সার ওয়ার্ডে বসে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে বসে থাকতে বেশি ভালো লাগে,বন্ধুদের বা সহকর্মীদের থেকেও,ওখানেই অন্য রুগীদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয় যাক,আমার মতো যন্ত্রণায় অনেকেই ভুগছে।কত ছোট শিশুরোগী!!তাদের মায়েদের কিন্তু পরিপাটি সাজপোশাক,ঠোঁটে লিপস্টিক, সহজ,স্বাভাবিক আচরণ।হয়তো ডাক্তারবাবুরাই মায়েদের বলেছেন এরকমই উজ্জ্বল, সহজ থাকতে,যাতে শিশুটি ভালো থাকে। স্বামীর কেমো চলছে,কিন্তু কঠিন মুখে রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে গেম খেলতে দেখেছি স্ত্রীকে।এমনকি ক্যান্সার ওয়ার্ডে সেলফি তুলতেও দেখেছি অনেককে।এঁদের দেখে কিন্তু আমার মনের জোর কিছুটা হলেও বাড়তো।মনে মনে,জোরে জোরে বলতাম,Death,be not proud....
কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়?????
তবু মানুষ হৃদয় খোঁড়ে।স্মৃতির কবরে যে সেসব ফুলগুলো এখনো টাটকা তাজা!মনে পড়ে প্রচন্ড অসুস্থতার মধ্যেও বাবা রসিকতা করতো নানারকম।টিভিতে ফিল্মি নাচ গান দেখতে দেখতে বলতো,"জামাকাপড় পড়ে নাচ গান দেশ থেকে উঠে গেল রে!"শীতে বাবা খুব কষ্ট পেতো,বলতো ,"ঠান্ডা আর বাড়লে আমি থানায় গিয়ে সারেন্ডার করবো।"একদিন রেডিওথেরাপি আর এম আর আই র একই ডেট।বাড়ি ফেরার পথে বলল,"তোরা আর খরচ করে আমার শ্রাদ্ধ করিস না।আজই আমার শ্রাদ্ধ হয়ে গেল।"
তবু রেডিওথেরাপির পর এবং হোমিওপ্যাথির ডাক্তার নির্মল সরকারের ওষুধ খেয়ে বাবা কিন্তু বেশ খানিকটা সামলে গেল।আমার মনটায় স্বস্তি ফিরে এলো,বাবার কাছ থেকে শ্বশুরবাড়ি চলে এলাম।বাবার কাছে থাকার সময় আমি রাতে আলো নেভাতাম না,পাছে ঘুমিয়ে পড়ি।সেই সন্ধ্যায় বাবা ফোন করে বলল,"তুই চলে গেলি, এতদিন পরে আজ আলো নিভে গেল।"(ক্রমশঃ)
শুনেছিলাম সমুদ্রের গভীরে একধরণের মাছ থাকে(স্টারজেন ফিস,সম্ভবত),তারা জন্মের পর থেকে সমুদ্রের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়ায়,কিন্তু মরার সময় ঠিক পথ চিনে ফিরে আসে তার জন্মস্থানে।
আমাদের দেশের বাড়ি বহরমপুর,মুর্শিদাবাদে।বাবা যতদিন পর্যন্ত ঠাকুমা বেঁচে ছিলো নিয়মিত যেত।ওখানেই আমার কাকু পিসিরা আছে।কিন্তু পরে অতদূর আর যেতে পারতো না।কাকু,পিসিরা এসে বাবাকে দেখে যেত।
একদিন রাতে বাবা হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে উঠে হাতে একটা বালিশ সুটকেসের মতো করে ধরে মা কে ডেকে তুলে আলমারি থেকে জামাকাপড় বার করে দিতে বললো,জানালো বহরমপুর যাবে ভোরের ট্রেন ধরে,ওখানে তার মা, বাবা,ভাই,বোনদের কাছে যাবে।যাবেই।আর থাকবে না কলকাতার বাড়িতে।অতি কষ্টে সারারাত বুঝিয়ে,শেষে একটা ঘুমের বড়ি খাইয়ে বাবাকে সামলালো মা।পরদিন মা যখন সভয়ে, সবিস্তারে এ ঘটনা আমাকে জানাল, আমার মনের মধ্যে ঢং ঢং করে বেজে উঠলো মৃত্যুঘন্টা, যা ইতিমধ্যেই বেজে গেছে বাবার মনে।জীবনসমুদ্রের স্রোতে স্রোতে ভেসে ভেসে ঘুরে ঘুরে আজ সেই মাছ ফিরতে চাইছে যেখানে জন্মেছিল,সেই আদি,প্রিয় জন্মস্থানে।
এর কিছু পরেই বাবা কোমায় চলে গেলো, সারাজীবনের মতো ডুব দিলো অচৈতন্যে।
বাবা অচৈতন্যে হারিয়ে যাওয়ার পর আমি উদগ্রভাবে অপেক্ষা করছিলাম বাবার মুক্তির জন্য।ওই রোগক্লান্ত,সুন্দর কিন্তু জীর্ণ দেহটাকে "বাবা" বলে ডাকলেও তো আর সাড়া দেবে না।তার আর পৃথিবীকে দরকার নেই,পৃথিবীর যদি তাকে দরকার থেকেও থাকে,তাতে কিছু এসে যায় না আর।এখন শুধু অপেক্ষার পালা।সেই পালার শেষ দিনে বাবার বন্ধ চোখ শূন্য দৃষ্টি নিয়ে খুলে গেলো, মুখ হাঁ, নাভিশ্বাস উঠছে।সে কি নিদারুণ যন্ত্রণাময় রাত।বুকের প্রতিটা পাঁজর ব্যথায় টনটন করছে।কিন্তু চোখে একফোঁটা জল নেই,শুধু এক খরখরে,শুকনো জ্বালা।বাবার পাশে রাত তিনটে অবধি চেয়ারে বসে থাকলাম আমি,বাবার আয়া।মা বাবার পাশেই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল।পাশের ঘরে শুয়ে আমার কর্তা।রাত তিনটে কুড়ি।বাবার বুক ওঠানামা করছে প্রবল বেগে।আয়ামাসি উঠে আমায় একটু শুতে বললো আর নিজে চেয়ারে বসলো।ঠিক পাঁচ মিনিট পর বলল,"বৌদি,ওঠো।"উঠে দেখি বাবা নিস্পন্দ।ভোর হলো।বাবার মুখ থেকে কষ্টের ছাপ মুছে গিয়ে এক অপূর্ব জ্যোতি বেরোতে লাগলো,প্রতি ঘন্টায় বাবা যেন আরো সুন্দরকান্তি হয়ে উঠতে লাগলো।যেন শায়িত যীশুখ্রিস্ট।ক্রমে লোকজন আত্মীয়স্বজনের ভিড় বাড়তে লাগলো।আমি আর একটুও কাঁদলাম না,সব কান্না আগেই কেঁদে নিয়েছি যে!
ইলেকট্রিক চুল্লিতে বাবাকে যাতে না দেওয়া হয়, বাবা অনেক আগে জানিয়েছিল।নিমতলা ঘাটে সেদিন রাজার মত বাবা একা দাহ হলো।অবিশ্বাস্যভাবে সেদিন ছিল না কোন মৃতদেহের ভিড়। বিকেল চারটে র সময় জন্ম থেকে দেখতে থাকা,এতদিন ধরে তিলে তিলে শেষ হতে থাকা আমার প্রাণাধিক প্রিয় সেই শরীরের ভষ্মাবশেষ গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিয়ে মনে মনে বললাম,
"বলো শান্তি,বলো শান্তি,দেহ সনে সব ক্লান্তি পুড়ে হোক ছাই।"
বাবার প্রয়াণের সঙ্গে জড়িত একটি অদ্ভূত ঘটনা, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে নি,সেটির উল্লেখ না করে পারছি না।
বাবা সুস্থ থাকতেই বলে গিয়েছিল চলে গেলে পর ছবির সামনে যেন এক কাপ সুবাসিত চা রাখা হয়। ভালো চায়ের খুব নেশা ছিলো বাবার।কোমা অবস্থাতেও বাবাকে আধ কাপ চা আর আধখানা বিস্কুট খাওয়ানো হতো।
কিন্তু যে মঠে বাবার পারলৌকিক কাজ করা হলো, সেখানে বৈষ্ণবমতে চা মাদকদ্রব্য হিসাবে নিষিদ্ধ।তাই ওই মঠেরই এক বন্ধু ও প্রাক্তন সহকর্মী,লিপিকা,বললো বাড়িতে বাবার কোন ছবির সামনে চা দিয়ে,আসল ছবি,যেটা রেখে কাজ হবে সেটা নিয়ে মঠে চলে আসতে।ঘটনাচক্রে দেবাশীষ এর এক বন্ধু আগের দিনই দার্জিলিং থেকে খুব ভালো চা ওকে এনে দিয়েছিল।সেই চা এক কাপ বানিয়ে দুটো বিস্কুট দিয়ে বাড়িতে বাবার একটা ছবির সামনে রেখে আমরা মঠে চলে গেলাম।খুব শান্তিতে বাবার কাজ হয়ে গেলো।দুপুরে বাড়ি ফিরে দেখি বাবার ছবির সামনে কাপের চা অর্ধেক আর দুটো বিস্কুটের মধ্যে নিচের বিস্কুটটা আধখানা ভাঙা,ঠিক আঙুলের চাপে দু আধখানা করে ভাঙলে যেরকম হয় সেরকম ভাবে।ভাবলাম গরমে চা উবে গেছে,আর বিস্কুট হয়তো ইঁদুরে খেয়েছে, যদিও ইঁদুরে খেলে ওপর থেকে খুবলে খেতো, গুঁড়োও পড়ে থাকতো মেঝেতে।যাই হোক,রাত সাড়ে ন'টার সময় আবার ঐরকম ভাবে চা আর দুটো বিস্কুট বাবার ছবির সামনে রাখা হলো,কারণ অনেক সময় বাবা ঘুরে টুরে এসে ওই সময়েই চা খেতে চাইতো।সে রাতে সারাদিন ধকলের চোটে শরীরে একরাশ ক্লান্তি,আর মনের মধ্যে অতল শূন্যতা নিয়ে একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়লাম।পাশেই টেবিলে বাবার ছবি,চা বিস্কুটসহ।
সকালে উঠেই দেখি আবার চায়ের কাপে অর্ধেক চা,আর ঠিক সকালের মতই নিচের বিস্কুটটা নিখুঁতভাবে আধখানা করে ভাঙা!!!!!!
মনে পড়লো শেক্সপিয়র এর হ্যামলেট নাটকের সেই অমোঘ উক্তি,"There are more things in heaven and earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy."

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment