1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

বাঙালির দু্র্গা

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

বাঙালির দু্র্গা

চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী

আজ শারদীয় ষষ্ঠী।দুর্গা পূজার আজ বোধন ।সাধারণত ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেল গাছের নিচে বোধন হয়।মন্দিরের কোনায় বেলগাছের ডাল রেখে সেখানেও বোধন করা হয়।পরের দিন মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকাকে স্নান করিয়েএনে নতুন বস্ত্র পরিয়ে দেবীদুর্গার ঘট স্থাপন করা হয়।এরপর দেবীর আবাহনের পরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে যথাবিহীত পূজা শুরু হয়।a

দেবী দুর্গার নামাবলী

দেবী দুর্গা একাধিক নামে পরিচিত।অনেক ভক্তের কাছে তিনি দুর্গতি হারিনী।পুরাণ অনুসারে দেবী দুর্গম নামে এক অসুরকে বধ করেছিলেন,তাই তিনি দুর্গা।তিনি মহাদেবের ঘরনী তাই মহাদেবী।দুর্গ রক্ষা করেন তাই তিনি দুর্গা।কোনো কোনো পুরাণে দুর্গাকে বলা হয়েছে আদ্যাশক্তি মহামায়া।ভক্তদের কাছে যিনি দুর্গা তিনিই ঊমা,তিনিই গৌরী  আবার তিনিই পার্বতী।দুর্গতিনাশনী দুর্গাকে বন্দনা করে বলা হয়, “অপর্ণা অভয়া অন্নপূর্ণা জয়া মহেশ্বরী মহামায়া।“ একই সঙ্গে দেবী দুর্গা মাতৃ রূপিনী,শক্তি রূপিনী,ভক্তি রূপিনী,শান্তিরূপিনী এবং মহিষাসুর মর্দিনী।

দেবী মাহাত্ম্য এবং দেবী ভাগবত পুরাণে দুর্গাকে আদ্যাশক্তি ও ব্রহ্ম বলে বর্ণনা করা হয়েছে।ঋগ্বেদে দেবীর উল্লেখ থাকলেও সরাসরি দুর্গার কোনো উল্লেখ নাই।তবে প্রাচীন গ্রন্থ মহাভারত ও রামায়ণে দুর্গার উল্লেখ আছে।

অনেক পন্ডিতের মতে দুর্গা শক্তির দেবী তাই শাক্তের আরাধ্যা।তাদের মতে রামায়ণ মহাভারতে দেবীর নাম গুপ্তযুগে সংযোজিত হয়েছে। শক্তি শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নাম। যথা,শৈলপুত্রী,ব্রহ্মচারিনী,চন্দ্রঘন্টা, কুষ্মান্ডা,স্কন্দমাতা,কাত্যায়নী,কালরাত্রি,মহাগৌরী ওসিদ্ধিদাত্রী।একারণে দুর্গাকে নবদুর্গা বলা হয়।

মূর্তিপূজার ইতিহাস

প্রাগৈতিহাসিক বিবরণ অনুসারে মূর্তপূজা চালু হয়েছিল প্রাচীন মিশর,গ্রিস,ব্যাবিলন ও ভারতে। অনেকের মতে মূর্তিপূজা চালু হয়েছে প্রাচীন ভারতে।তবে বৈদিক ভারতে মূর্তিপূজা ছিল না।কারণ বেদে সরাসরি মূর্তিপূজারকথা বলা হয়নি।ব্রাহ্মণ এবং উপনিষদেও বিগ্রহ পূজার কথা বলা হয়নি। হয়তো ভারতে এসে স্থানীয় মানুষদের পূজা পার্বণ দেখে বিষ্ণু,শিব,শক্তি প্রভৃতি দেবতার পুজার প্রচলন হয়েছিল আর্য সমাজে।মৌর্য যুগে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে অপরাজিতা বা দুর্গা, অপ্রতিহত বা বিষ্ণু, বৈজয়ন্ত বা ইন্দ্র,এবং শিবের মন্দির নির্মানের নির্দেশ পাওয়া যায়।

ঋগ্বেদে দেবতার সৎখ্যয় তারতম্য দেখা যায়।এক ঋকে তেত্রিশ জন আবার অন্য একটি ঋকে তিন হাজার তিনশ উনচল্লিশ জনের কথা বলা আছে।তবে সংখ্যাটি তেত্রিশ কোটি নয়।সময়ান্তরে অনেক দেবতা গুরুত্ব হারিয়েছেন অনেকে আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছেন।এই সংযুক্তির কারণ আর্য ও অনার্য সভ্যতার সংমিশ্রন।

শিব ও দুর্গার বিস্তার ক্ষেত্র

আর্যেদের ভারতে আগমনের অনেক আগেই সিন্ধু সভ্যতার অঞ্চলে অর্থাৎ ভারতের পঞ্চিমাঞ্চলে শিবের পুজা চালু ছিল।ঐ অঞ্চলে আর্যদের বিস্তারের সাথে সাথে শিবের বিস্তার ভূমির বদল ঘটে। ভারতের পূর্বাঞ্চলে এসে শিবের সঙ্গে দুর্গা ও কালীর মিলন ঘটে।

অনার্য শিবের আর্য সন্মান

কৈলাসকে বলা হয় শিবের বাসস্থান।এই স্থানকে কেন্দ্র করেই শিবের সংসার।আর্য রাজা দক্ষের কন্যা সতী স্বেচ্ছায় শিবের ঘরনী হয়ে কৈলাসে এসেছিলেন।এতে অসন্তষ্ট হয়ে রাজা দক্ষ শিবহীন যজ্ঞের আয়োজন করে। আমন্ত্রন না পেয়েও সতী পিত্রালয়ে যেতে চাইলে শিব আপত্তি করেন।সতী শিবের  নির্দেশ অমান্য করে বাপের বাড়ি যান।সেখানে বাবার মুখে পতির নিন্দা শুনে সহ্য করতে না পেরে সতী দেহত্যাগ করেন।এখবর জেনে ক্রোধিত শিব দক্ষের যজ্ঞ পন্ড করে তার মস্তক চ্ছেদন করেন। তারপর মৃত সতীর দেহ স্কন্ধে নিয়ে তান্ডব নৃত্য শুরু করেন।এতে জগৎ ধ্বংসের মুখে উপনীত হলে দেবতাদের অনুরোধে নারায়ণ তাঁর সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহ খন্ড খন্ড করে ছড়িয়ে দিলে শিব শান্ত হন।আর্য দেবতারা বাধ্য হয়ে শিবকে কেবল মাত্র তাদের শ্রেষ্ঠ দেবতা ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর সাথে সমানাসনে প্রতিষ্ঠা করেন তাই নয় তাঁকে দেবাদিদেব মহাদেব বা মহেশ্বর হিসাবে স্বীকৃতি দেন। এভাবেই অনার্য শিব আর্য দেবতাদের মধ্যে স্থান লাভ করেন।

দুর্গা পুজার প্রাচীনত্ব

দুর্গা পুজার প্রাচীনত্ব নিয়ে নানা মত আছে।মহিষাসুরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্র্র্র্রহ্মা তাকে বর দেন কেবল মাত্র মহিলার হাতেই তার মৃত্যু হবে। এই বর লাভ করে মহিষাসুর নিজেকে অমর বলে ধরে নিয়ে সসৈন্যে দেবলোকে আক্রমণ চালিয়ে তাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করলে দেবতারা ব্রহ্মা ওবিষ্ণুকে নিয়ে মহাদেবের কাছে উপস্থিত হয়ে তাদের দুর্দশার কথা বলেন।ক্রোধিত শিবের দেহ থেকে বহির্গত শক্তিপুঞ্জ ব্রহ্মা ও বিষ্ণু সহ অন্যান্য দেবতাদের তেজপুঞ্জের সঙ্গে মিলিত হয়ে উৎপন্ন হয় এক অসামান্যা সুন্দরী দশভূজা তেজস্বিনী নারী প্রতিমা ।দেবতাদের দেওয়া অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দেবী হন দশপ্রহরণ ধারিনী দেবী দুর্গা।হিমালয়ে কাছ থেকে পাওয়া সিংহের পৃষ্ঠ আরোহন করে রণরঙ্গিনী দুর্গা মহিষাসুরের সঙ্গে ভয়ানক যুদ্ধে লিপ্ত হন।অবশেষে মহিষরূপী অসুর দেবীর ত্র্রিশূলে বিদ্ধ হয়ে প্রাণ ত্যাগ করে।এই অসুরকে হত্যা করে দেবীর নাম হয় মহিষাসুর মর্দিনী।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খননের সময় মহিষাসুর মর্দিনী দুর্গার বেশকিছু মূর্তি পাওয়া গেছে।মূর্তিগলো বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।মূর্তিগুলো খ্রিষ্টিয় সপ্তম শতাব্দীর পরবর্তী সময়ের বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

মহিষাসুর মর্দিনীর পুজা

পুরাণের কাহিনী অনুসারে সুরথ নামে একজন রাজা মর্ত্যে  প্রথম মহিষাসুর মর্দিনী দুর্গার পুজা করেছিলেন। যুদ্ধে নিজের রাজত্ব হারিয়ে সুরথ বনে আসেন।সেখানে সামাধী নামে পরিবার থেকে বিতাড়িত এক বৈশ্যের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।দুজনেই ঋষি মেধার আশ্রমে এসে তার কাছে নিজেদের দুর্ভোগের কথা বললে ঋষি তাদের নদীর তীরে বসে কঠোর তপস্যা করতে পরামর্শ দেন। তাদের কঠোর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী আবির্ভূত হয়ে তাদের আশীর্বাদ করেন। দেবীর বরে সমাধীর সংসারে শান্তি ফিরে আসে।সুরথ রাজ্যপুনরুদ্ধার করেন।রাজ্য লাভ করে সুরথ বসন্তকালে মহিষমর্দিনী দুর্গার পুজা করেন।

কোন কোন রামায়ণে কথিত আছে রাবণকে পরাজিত করবার জন্য  রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার পুজা করেছিলেন।এই কারণে এই পুজাকে বলা হয় অকাল বোধন।বাংলায় বিভিন্ন কালে বিভিন্ন নামে দেবী দুর্গার পুজা হয়।বসন্ত কালের দুর্গা হলেন বাসন্তী, শরৎকালে শারদীয়া দুর্গা এবং হেমন্তে দেবী কাত্যায়নী।

প্রাপ্ত তথ্যানুসারে দুর্গা পুজার বিধান সম্বলিত পুঁথি লিখেছেন পন্ডিত রঘুনন্দন ১৫০০ থেকে ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে।তাহেরপুরের জমিদার কংসনারায়ণ বঙ্গদেশে ষোড়শ শতাব্দিতে প্রথম দুর্গা পুজা চালু করেন।

দুর্গাপুজার রীতিনীতি

বাঙালির দুর্গাপুজায় আর্য ও অনার্য রীতির অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।অনার্য রীতি হল নবপত্রিকা রূপে বনদুর্গার উপস্থিতি।নব পত্রিকাকে সাধারণভাবে কলাবৌ বলা হয়।আসলে একটি কলা গাছের কান্ডের সঙ্গে কচু,মানকচু,হরিদ্রা,জয়ন্তী,জোড়া বিল্ব ফল,ডালিম,মানকচু,অশোক ও ধানের শীষ বেধে একটি লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে ঘোমটা দিয়ে বৌ সাজিয়ে গণেশের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।অনেকে একে ভুল করে গণেশের বৌ বলে।আসনে তিনি হলেন শষ্যের দেবী।অনার্য মতে তিনিই মূল পূজ্য দেবী। এাড়া দেবীর বোধন হয় বেলগাছের নিচে কিম্বা বেলের ডালের নিচে,এটিও অনার্য রীতির নিদর্শন।

ষষ্ঠীতে বোধনের পরে সপ্তমী তিথিতে কলাবৌকে স্নান করিয়ে এনে প্রতিমার সামনে ঘট স্থাপন করে বৈদিক ব্রাহ্মণ্য মতে দেবীর পুজা করা হয়।সম্ভবত দুর্গা পুজায় চন্ডীপাঠ এসেছে মহাযান বৌদ্ধদের তান্ত্রিক আচার থেকে।চন্ডী হলেন দেবী দুর্গার রণরঙ্গিনী রূপের প্রতীক।

যে বিষয়টি বিশেষ উল্লেখযোগ্য তাহল, বাংলায় দুর্গাপুজা শুরু হয়েছিল রাজা ও জমিদার বাড়িতে অর্থাৎ ধনিক ও বণিক পরিবারের মন্ডপে ,তারপর দেবী হলেন বারোয়ারী, এখন তিনি হয়েছেন সার্বজনীন।দেবী হয়েও দুর্গা বাঙালির কাছে ঘরের মেয়ে।বিবাহিতা মেয়েরা যেমন পুত্রকন্যাদের নিয়ে পিত্রালয়ে আসে,দুর্গাও তেমনি সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি আসেন।তাই এখন মন্ডপে মন্ডপে দেখা যায় শিল্পীদের মনগড়া থীমের প্রতিমা।পুজার শাস্ত্রীয় দিক গৌণ হয়ে মূখ্য হয়েছে আনুসঙ্গ।এখন দুর্গাপুজার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে উৎসবের আড়ম্বরতা।


No comments:

Post a Comment