1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

কাগজ

 ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

 কাগজ

সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত 

মাত্র কঘন্টার জার্নি৷জানলা ধারের সীট৷ব্যস আর পায় কে৷ 

ফুরফুরে হাওয়া খেতে খেতে চলেছি৷উল্টোদিকে বসেছে বিল্টু,আমার এ আসাইনমেন্টের ফটোগ্রাফার৷বারবার বলছে ও রাজীবদা একদান হয়ে যাক..একদান মাত্র৷কান দিচ্ছি না৷ব্যাটা দাবার পাগল৷সারা রাত জেগে দাবা খেলে৷বয়ে গেছে আমার এখন ওসবে৷ শরতের ঝরঝরে ওয়েদারে প্রকৃতি দেখতে দেখতে যাব৷কলকাতা বর্ধমান রুটের জানলার বাইরের দৃশ্য এখনও লা জবাব৷আঁচ পরেনি এতদিনেও৷

কাগজ ..কাগজ শব্দে তন্ময়তা ভাঙলো৷আরে বাস,সকালের বেরনোর তাড়াহুড়োয় কাগজ পড়া হয়নি,এমনকি সেটা নিতেও ভুলে গেছি! স্টেশনেও কেনা হয়নি৷যাকগে,ভালো হল..

বললাম দাও একটা বাংলা৷কত?

' আজকে ফ্রী বাবু,এই নিন৷এই যে..

ব্যাটাদের সেলস প্রমোশন৷ভালোই হল৷হাত বাড়িয়ে নেবার পর পড়তে লেগে গেলাম৷কাগজওলাও চলে গেল৷

একমিনিটও হয় নি,শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল৷আরে বাপ৷ এ কি খবর? কি কান্ড রে বাবা৷কি সর্বনাশ৷

প্রথম পাতায় হেডলাইন, বারাণসীর সাধুই কি নানাসাহেব? তলায় লেখা..অতি সম্প্রতি বারণসীর অধুনা লঙ্কায় যে সাধূর আবির্ভাব হয়েছে বলে আমরা গত উণিশে মার্চ,দোসরা চৈত্র যে প্রতিবেদন লিখিয়াছিলাম তাহাতে এক নূতন মাত্রা যোগ হইয়াছে!কাশীর কালেক্টর সাহেব নর্মান ওয়েস সিপাহী বিদ্রোহের সময় কানপুরের মহাফেজখানায় কর্তব্যরত ছিলেন ৷সে সময়ে পেশোয়া নানাসাহেবের সাথে তাহার সবিশেষ বন্ধুত্ব..

প্রথম পেজের তলায় 'কলিকাতার ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের বিবরণ'৷তার একপাশে 'ঠগীরাজ কি সত্যিই নির্মূল?'৷এ কি কান্ড৷

মাথাটা ঘুরে গেল৷চট করে কাগজের নামটা পড়ে নিলাম৷ বড় বড় কালো অক্ষরে লেখা 'হিন্দু গেজেট'৷তারিখ ইং সাতাশে মার্চ ১৮৬৭৷বাং পনেরোই চৈত্র ১২৭৪৷

ইয়ার্কি? নাকি ভিন্টেজ এডিশন বার করেছে  বিজ্ঞাপন হিসাবে৷চাঁ করে উঠে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক দেখলাম৷কাগজওলা হাওয়া৷চেহারাটাও তো দেখিনি ছাই৷

ওই তো ঝালমুড়িওয়ালা ঝাঁকা নিয়ে ঠোঙা নাড়াচ্ছে৷কামরাভর্তি লোক যে যার কাজে ব্যস্ত৷এই তো বিল্টু অনলাইন দাবা খেলছে৷ সব ঠিক রয়েছে আর আমি দেড়শো বছর আগের কাগজ পড়ছি?

বসে পড়ে অনুভব করলাম ঘামছি৷হলদেটে কাগজ৷ছোপ ধরা অক্ষর৷ফন্ট পুরোনো৷আমাদের খবরের কাগজের অফিসে কিছু দেড়শো দুশো বছরের পুরনো কাগজের জেরক্স কপি আর প্রিন্টআউট রয়েছে৷এ যেন হুবহু সেরকম৷কি দিয়ে গেল আমায়?কি হচ্ছে এসব?ভূতুড়ে কান্ড নাকি?

চট করে বাকি পাতাগুলো উল্টে গেলাম৷সব পুরনো খবর৷'লেপ্টেনান্ট গবর্নরের জিলা পরিদর্শনে অসন্তোষ' বাবু নবকুমার কর্তৃক হিন্দু মেলার সূচনার ঘোষণা,জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অকুন্ঠ সমর্থন' ,' বিদ্যাসাগরের মহানূভবতা'৷ দ্রুত চোখ বুলিয়ে আবার প্রথম পাতায় এলাম৷ কোন ভুল নেই তারিখে৷সেই ২৭শে মার্চ ১৮৬৭৷

হঠাৎ কি মনে হল,কোথায় যেন জগদীশ্বরের মন্দিরের কথা পড়লাম না? চার না পাঁচ নম্বর পাতায়? সে কি! সেখানেই তো যাচ্ছি৷

হার্টবীট মনে হয় তুফানের গতি নিয়েছে৷পাতা উল্টোতে লাগলাম উন্মাদের মতো৷এই তো তিনের পাতা৷এই যে মাঝামাঝি..

'বাবু সুখরঞ্জন শীল সম্প্রতি লক্ষাধিক ব্যয়ে বর্ধমানের কাটোয়ায় জগদীশ্বর মহাদেবের একটি সুবিশাল মন্দির বানিয়েছেন৷মন্দিরটি আয়তনে প্রায় দক্ষিনেশ্বরের ভবতারিনী মন্দিরের সমকক্ষ৷নাটমন্দির ও পান্হনিবাস অতি উচ্চমানের৷মন্দিরটির চূড়োয় রৌপ্যকলস,তাতে রোদ লাগিয়া প্রতি প্রত্যুষে..

পাশে খুব কাছে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে৷কাগজওয়ালা৷বগলে কাগজের বান্ডিল৷চমকে উঠে তাকালাম৷

'সুধীবাবু চিনলে?'

চেনামুখ!কিন্তু কে?

'অত পুণ্য করনি যে গতবারের কথা স্মরণ থাকবে৷ যাকগে,কথা কটা বলে চলে যাই..'

মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল 'পন্ডিত? সুরেন পন্ডিত না?'

'বাঃ এই তো চিনেছ৷তা চিনবে নাই বা কেন? এক স্কুল,এক হিন্দু কলেজ..

আমি শুনছি৷প্রাণপণ আরো মনে করার চেষ্টা করছি৷

'এক গুরু..তার পা  ছুঁয়ে এক শপথ..

জগৎসংসার দুলছে ট্রেণের সাথে৷

'আমি স্কলারশিপ পেলুম৷বিদ্যাসাগর মশাই মেডেল দিলেন৷বুকে জড়িয়ে ধরলেন৷বললেন আমার উত্তরসুরী এসে গেচে৷ সেই হল তোমার হিংসের শুরু...

কিছু মনে পড়ছে না যদিও তবু সব শুনছি৷কামরার বাকি লোক শুনলে শুনুক৷কিছু যায় আসে না৷

'বললাম গুরুদেব ও কথা বলবেন না৷এখনো তো কত কাজ বাকি,আপনার পথে চলা বাকি..একটি কাজের অনুমতি চাইছি৷'

'তুমি গুরু দুজনেই তাকালে৷বললাম এই সুধী প্রখ্যাত শীলবাড়ির ছেলে৷ওর ছোটবোন সম্প্রতি বিধবা হয়ে পিত্রালয়ে ফিরেচে৷দুজনেই আমরা দুজনকে অতি অল্পবয়েস থেকে চিনি৷ তাকে অনেক বোঝানোর পরে সে আমায় পুনর্বিবাহ করতে রাজী হয়েচে৷এখন আপনার আশীর্ব্বাদ...

'গুরু পুনরায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন৷তখনি তোমার মুখ দেখে আমার বুক কেঁপে উঠলো৷বাইরে ডেকে বললুম হ্যাঁরে সুধী,তোর বুঝি আপত্তি? তুমি বললে তা কেন? এত পন্ডিত মেধাবীর ঘরে বোন যাবে আপত্তি কিসের বলতো৷এই বলে জড়িয়ে ধরলে৷

তখন কি আর বুঝেছি? কদিন বাদে বল্লে চল সুরো,আমাদের কুলদেবতার আশীর্বাদ নিবি চল৷গ্রামদেশের বাড়ীও ঘোরা হবে৷বহুকাল যাইনি৷সেখানে বুড়ী খুড়ীমা আচে ভিটে আগলে৷আমি রাজী হয়ে গেলাম৷ তারপর..

আর শুনতে চাই না৷সব মনে পড়ে গেছে৷

'সেখানে গিয়ে..

'তুই ভেবেছিলি কি? হ্যাঁ? জাতে উঠে গেচিস?' এই প্রথম মুখ খুললাম৷

সুরেন তাকিয়ে আছে৷সেই সুরো৷লম্বা চওড়া৷মোষের মতো স্বাস্থ্য৷ঝকঝকে দাঁতে প্রাণখোলা হাসি৷বিনু..বিনোদিনী ওকে চাইতো আমি বুঝেইছিলাম৷বিনুর বিয়ের আগে থেকেই৷

'দুটো পাশ দিয়েছিস,জলপানি পেয়েছিস তাতেই শীলবাড়ির যোগ্য হয়ে গেচিস?আমাদের চাকরবাকরেরা তোর চেয়ে দামী কামিজপিরান গায়ে দেয়..তুই..

'তাই সুধীবাবু তুমি লেঠেল দিয়ে আমার মাথা ফাঁক করে দিলে৷একবিন্দু রক্ত জিব দিয়ে চেটে পৌরুষ দেকালে আর ওই মন্দিরের ভিত খোঁড়া যেখানে হচ্ছিল সেখানে...

'বেশ করেচি৷আমারও গলা চড়লো৷' বাবা সুখরঞ্জন শীল বেঁচে তখনো৷বললে খোকন অসুবিদে কিচু হবে না৷সেপাই বিদ্রোহ সদ্য গেচে৷এখন সন্দেহ হলেও সাহেবরা মন্দিরের ভিত খুঁড়তে সাহস করবে না৷সেই ওয়াল্টার সায়েবকে দিয়ে তো মন্দির উদ্বোধন করেচিলাম৷বিদ্যাসাগর মশাই যদিও সন্দেহ করেছিলেন৷আর কখনো কথা বলেননি..

ট্রেণ ঢুকছে বর্ধমান৷সুরেন হাত বাড়িয়ে বললে 'দে কাগজ দে৷ আমার বাড়িতে এই কাগজই তো পাঠিয়েছিলি! বলেছিলি..খুড়ীমা আসবেন..আমিও তো আপনার ছেলে..নয় কি?'

কাগজ প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে সুরেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল৷

ট্রেণ ঢুকছে বর্ধমানে৷এখান থেকে গাড়ীতে বাকিটা৷ শীলদের বাড়ি থেকে গাড়ি পাঠাবে বলেছে৷জগদীশ্বরের মন্দিরের দেড়শো বছর পূর্তি ৷দেশবিদেশ থেকে লোক আসছে৷গভর্নর উদ্বোধন করবেন৷বিরাট মেলা হবে৷নাট্টোৎসব,সেমিনার আরো কি কি..

বিল্টু হাসছে৷বলল 'খুব ঘুমোলি৷আর কি বকবক করলি ঘুমের ঘোরে৷

মনটা একটু খারাপ লাগছিল সত্যি সব মনে পড়ে গিয়ে৷ বিনুটা পাগল হয়ে ওই মন্দির চত্বরে বসে থাকতো৷আর বাবাকে দেখলে পালিয়ে যেত৷আমাকে তো সহ্য করতে পারতো না৷বিড়বিড় করে অভিশাপ দিত৷

কত বছর হয়ে গেল সে সবের৷




No comments:

Post a Comment