![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
ধ্রুপদী আপসহীন সাহিত্য সমালোচক কবি মোহিতলাল মজুমদার
তৈমুর খান
বাংলা সাহিত্যাকাশে রোমান্টিক আবেগের বিপরীতে ধ্রুপদী শৃঙ্খলা, মননশীলতা এবং ঋদ্ধ গদ্যরীতির যে শক্তিশালী ধারা প্রবর্তিত হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী ছিলেন কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার। রবীন্দ্রোত্তর যুগে তাঁর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বাংলা কবিতা ও সমালোচনা সাহিত্যে তিনি এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব।
১৮৮৮ সালের ২৬ অক্টোবর (কার্তিক ১২৯৫ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার বিখ্যাত স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি.এ. এবং পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন।
জীবনের একটি বড় সময় তিনি অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘকাল তিনি ঢাকার কুর্মিটোলা হাইস্কুলে এবং পরবর্তীতে কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মোহিতলাল মজুমদার মূলত কবি হলেও সমালোচক হিসেবেই তিনি বাংলা সাহিত্যে সর্বাধিক স্থায়ী ও প্রাবন্ধিক আসন লাভ করেছেন। তাঁর লেখনীতে একদিকে যেমন কাব্যের সুকুমার বৃত্তি প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে তেমনই যুক্তিনিষ্ঠ মনন ও কঠোর অনুশাসনের পরিচয় মিলেছে।
১. কাব্যসাহিত্য
মোহিতলালের কবিতায় রোমান্টিক ভাবালুতার চেয়ে ধ্রুপদী ভাবগাম্ভীর্য, ইন্দ্রিয়চেতনা এবং আত্মানুসন্ধান বেশি স্পষ্ট। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:
দেবেন্দ্র-মঙ্গল (১৯১২)
স্বপ্নের পাসরী (১৯২২)
স্মরগরল (১৯৩৬)
বেদনা-বসন্ত (১৯৪৮)
বিস্মরণী (১৯৫০)
তাঁর কাব্যে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাব এবং রূপ ও রসের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। বিশেষ করে মানবজীবনের দ্বান্দ্বিক রূপ, প্রেম ও সুন্দরের পঙ্কিলতা ও পবিত্রতা তাঁর কবিতায় নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
মোহিতলাল মজুমদারের সাহিত্যকর্মের বিশাল পরিধি, রোমান্টিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে জীবনের ধ্রুপদী কাঠিন্য, দেহজ প্রেম ও জীবনের গূঢ় বেদনার প্রকাশ বেশি লক্ষ করা যায় বেশি। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলি থেকে কিছু পংক্তি:
'স্বপ্নের পাসরী' কাব্য থেকে:
"ফুল যদি ঝরে যায়, কাঁটা কেন তবে রয়?—"
কিংবা—
"প্রাণের বসন্ত আজ বিদায় লয়েছে দূরে—"
'স্মরগরল' কাব্য থেকে (ইন্দ্রিয়চেতনা ও ধ্রুপদী ভাবগাম্ভীর্য):
"আজি এ বসন্ত রাতে মনে পড়ে সে কোন্ অতীত—"
অথবা প্রেম ও সৌন্দর্যের দ্বান্দ্বিক রূপ ফুটিয়ে তোলার পংক্তি:
"তৃষার্ত এ মন মোর, ফুরায়ে এসেছে তেল,
কে নিভাবে এই বুক জ্বলে ওঠা দাবানল?"
'দেবেন্দ্র-মঙ্গল' কাব্যগ্রন্থটি ছিল আত্মীয় ও কবি দেবেন্দ্রনাথ সেনের প্রশস্তিমূলক ১৬টি সনেটের সঙ্কলন।
২. সমালোচক ও প্রাবন্ধিক
বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে মোহিতলাল মজুমদার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন। বিচারমূলক ও রূচিগঠনকারী সমালোচক হিসেবে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর সমালোচনা ছিল তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক, ঋজু এবং অনেক সময় আক্রমণাত্মক। তবে সাহিত্যের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও সত্যকে উন্মোচন করায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। তিনি বেশকিছু গ্রন্থ সম্পাদনা করেন।
প্রবন্ধগ্রন্থ (সম্পাদনা)
আধুনিক বাংলা সাহিত্য (১৯৩৬)
সাহিত্যকথা (১৯৩৮)
বিবিধ কথা (১৯৪১)
বিচিত্র কথা (১৯৪১)
সাহিত্য বিতান (১৯৪২)
বাঙলা কবিতার ছন্দ (১৯৪৫)
বাঙলার নবযুগ (১৯৪৫)
জয়তু নেতাজী (১৯৪৬)
কবি শ্রীমধুসূদন (১৯৪৭)
সাহিত্য বিচার (১৯৪৭)
মোহিতলাল মজুমদারের গদ্যশৈলী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, ওজস্বী এবং সংস্কৃত শব্দসম্ভারসমৃদ্ধ। তাঁর গদ্যে এক ধরনের গুরুগম্ভীর আভিজাত্য ও ঋজুতা লক্ষ করা যায়, যা সমকালীন গদ্যধারার মধ্যে আলাদাভাবে নজর কাড়ে। বিশেষ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নে মোহিতলালের অবদান অতুলনীয়। বঙ্কিমসাহিত্যের তিনি একনিষ্ঠ অনুরাগী ও ব্যাখ্যাকার ছিলেন। আপসহীন বিচারবুদ্ধিতে দীপ্ত তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ও সমালোচনা গ্রন্থ থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ:
'আধুনিক বাংলা সাহিত্য' গ্রন্থ থেকে (সাহিত্য ও রূচি প্রসঙ্গে):
"সাহিত্য কেবল মনোরঞ্জনের সামগ্রী নহে, তাহা মানুষের আত্মাকে পরিশীলিত ও সংযত করিবার এক মহত্তর উপায়। বর্তমান যুগে সাহিত্যের নামে যে উচ্ছৃঙ্খলতা ও ভাবালুতা প্রবেশ করিয়াছে, তাহা জাতির রুচিকে পঙ্কিল করিতেছে।"
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ও সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে:
"বঙ্কিমচন্দ্রের ঔপন্যাসিক প্রতিভা কেবল একটি জাতির ইতিহাস বা সমাজকে চিত্রিত করে নাই, তিনি বাঙালির মৃতপ্রায় আত্মাকে পুনরুজ্জীবিত করিয়া এক নতুন ধর্মে ও কর্মে দীক্ষা দিয়াছিলেন। বঙ্কিম-সাহিত্যের মূল সুরটি হইল—জাতীয় জীবনের আত্মপ্রতিষ্ঠা ও সংযমের সাধনা।"
৩. নজরুলের সঙ্গে সম্পর্ক একটি বিয়োগান্ত অধ্যায়
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং রক্ষণশীল ধ্রুপদী সমালোচক মোহিতলাল মজুমদারের মধ্যকার সম্পর্ক ও তার অবনতি এক অত্যন্ত নাটকীয় ও বিয়োগান্তক অধ্যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে মোহিতলাল নজরুলকে সাহিত্যের আসরে স্বাগত জানালেও, পরবর্তীকালে মতাদর্শগত দূরত্ব, পারিপার্শ্বিক ভুল বোঝাবুঝি এবং তীব্র সাহিত্যিক বিরোধিতার জেরে তা চরম আকার ধারণ করেছিল। এই বিরোধ ও প্যারোডি রচনার ঘটনা বহুদূর গড়িয়েছিল, যার মূল পর্যায়গুলো নিম্নরূপ:
১৯২১ সালে নজরুলের 'খেয়া-পারের তরণী' ও 'বাদল প্রাতের শরাব' কবিতা পড়ে মোহিতলাল মুগ্ধ হন এবং 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় চিঠি লিখে ও বাংলা সাহিত্যসমাজে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। নজরুলও তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং তাঁদের মধ্যে একধরনের গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু ১৯২২ সালে নজরুলের ঐতিহাসিক 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশের পর মোহিতলালের মনে একধরনের ক্ষোভ ও ঈর্ষার জন্ম হয়। মোহিতলালের ধারণা হয়েছিল যে, তাঁর নিজের লেখা 'আমি' নামক প্রবন্ধ বা চিন্তার ধরন থেকেই নজরুল 'বিদ্রোহী' কবিতার ভাব ও বাক্যগঠন ধার করেছেন, অথচ গুরু হিসেবে তাঁকে কোনো স্বীকৃতি দেননি। এই সুপ্ত অভিমান থেকেই তাঁদের সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে।
নজরুলের জনপ্রিয়তাকে লঘু করতে এবং তাঁর নতুন জীবনধারা ও কাব্যরীতির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাতে সেকালের ব্যঙ্গপত্রিকা 'শনিবারের চিঠি' মুখ্য ভূমিকা নেয়। এই পত্রিকার সঙ্গে মোহিতলাল মজুমদার ও সজনীকান্ত দাসেরা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। নজরুলের 'বিদ্রোহী' ও অন্যান্য জনপ্রিয় কবিতার অনুকরণে একের পর এক নির্মম ও বিদ্রূপাত্মক প্যারোডি প্রকাশিত হতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে সজনীকান্ত দাসের কামস্কাট্কীয় ছন্দে রচিত 'আমি ব্যাং' নামক প্যারোডিটি (যেখানে মূল কবিতার 'আমি চিরদুর্দান্ত, রক্তপিপাসু শান্ত...' ঢঙে ব্যাঙের জীবনকে হাস্যকরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল)। কিছুটা অংশ পড়া যাক :
“আমি চিরদুর্দান্ত, রক্তপিপাসু শান্ত!
আমি পঙ্কশায়ী, আমি বর্ষার রাত্রে ক্লান্ত!
আমি জলে ডাঙায় বেড়াই লাফায়ে,
ভয়ে ভেককুল ওঠে যে কাঁপায়ে...
আমি বর্ষার গানে মাতিয়া উঠি,
যত পচা পাতা ডালের কুঁটি
মর্দিয়া চূর্ণ করি গো আমি!"
'শনিবারের চিঠি'তে প্রকাশিত এসব কুৎসিত ও তীর্যক প্যারোডি এবং ধারাবাহিক নজরুল-বিরোধিতার পেছনে খোদ তাত্ত্বিক গুরু মোহিতলাল মজুমদারের হাত রয়েছে বলেই নজরুল তীব্রভাবে বিশ্বাস করেন। নিজের পরম শ্রদ্ধেয় গুরুর তরফ থেকে এমন আক্রমণ নজরুলকে মানসিকভাবে ভীষণ আঘাত করে।
এই চরম ক্ষোভ থেকে নজরুল ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত ও ক্ষোভের আগুন ঝরানো কবিতা—'সর্বনাশের ঘণ্টা'। সেটির শেষ দুটি পংক্তিতে তিনি সরাসরি মোহিতলালকে লক্ষ্য করে লিখেছিলেন:
“যত বিদ্রূপই করো গুরু তুমি জানো এ সত্য-বাণী,
কারুর পা চেটে মরিব না, কোনো প্রভু পেটে লাথি হানি
ফাটাবে না পিলে; মরিৰ যেদিন মরিব বীরের মতো,
ধরা-মা' বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাম্বত।
আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস-
ততদিন গুরু সকলের সাথে করে নাও পরিহাস !”
নজরুলের এই কবিতার মাধ্যমে গুরুকে প্রকাশ্য আক্রমণ করার পর বিরোধ আরও ঘনীভূত হয়। অথচ ঐতিহাসিক সত্য হলো, যে প্যারোডিটি নিয়ে এত কাণ্ড (যেমন 'আমি ব্যাঙ'), সেটি মোহিতলাল নিজে লেখেননি, লিখেছিলেন সজনীকান্ত দাস। কিন্তু গুরু-শিষ্যের ভুল বোঝাবুঝি চরমে পৌঁছে যাওয়ায় তা আর থামানো যায়নি।
নজরুলের ওই কবিতার জবাবে মোহিতলাল মজুমদারও 'শনিবারের চিঠি'তে 'দ্রোণ-গুরু' নামক একটি কড়া প্রতি-কবিতা লিখে প্রকাশ করেন। সেখানে মহাভারতের দ্রোণাচার্য ও একলব্যের পৌরাণিক প্রসঙ্গ টেনে এনে নজরুলকে 'আত্মপূজার ভণ্ড পূজারী' ও অকৃতজ্ঞ বলে কটাক্ষ করা হয়:
“গুরু ভার্গব দিল যা তুহারে! – ওরে মিথ্যার রাজা!
আত্মপূজার ভণ্ড পূজারী! যাত্রার বীর সাজা
ঘুচিবে তোমার,…”
এই দ্বন্দ্ব কেবল কবিতায় বা প্যারোডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা দুই ভিন্ন সাহিত্যধারার (রোমান্টিক-বিদ্রোহী ধারা বনাম ধ্রুপদী-রক্ষণশীল ধারা) মধ্যকার স্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। 'শনিবারের চিঠি'র পাতায় দীর্ঘদিন ধরে নজরুল ও তাঁর অনুসারী 'কল্লোল গোষ্ঠী'র বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও প্যারোডি লেখার যে নিষ্ঠুর ধারা মোহিতলালের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থনে বজায় রাখা হয়েছিল, তা বাংলা সাহিত্যকে যেমন কিছু তীক্ষ্ণ রচনার সঙ্গে পরিচিত করেছিল, তেমনই দুই প্রতিভাবান সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে চিরতরে তিক্ত ও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মোহিতলাল মজুমদারকে রক্ষণশীল ও প্রথানুগ সমালোচক হিসেবে দেখা হলেও, সাহিত্যের মানদণ্ড রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল অতন্দ্র প্রহরীর মতো। সাহিত্যের উৎকর্ষ, ধ্রুপদী আদর্শ এবং ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। রোমান্টিক যুগের আবেগসর্বস্বতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি সাহিত্যকে মনন ও যুক্তির আলোয় বিচার করার পথ প্রশস্ত করেছিলেন।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment