![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
শুভ বিজয়া
অনন্যা মিত্র
মহাষষ্ঠীর সকাল। রায়বাড়ির উঠোনে ঢাকের আওয়াজে বোল উঠেছে, অথচ কেমন যেন প্রাণহীন সেই বোল, ঠিক হৃদয়গ্রাহী হচ্ছে না। বাড়ির দুই ভাই অরিন্দম আর অমিত, তিন বছর ধরে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না। পৈতৃক বাড়ির ভাগাভাগি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে।
গৃহকর্ত্রী সুনন্দাদেবী প্রতি বছরই দুর্গাপুজো করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, "মা দুর্গা এলে সংসারের সবকিছু শুভ হয়। অশুভ বিনাশ হয়, ঝড়ঝঞ্ঝা কেটে যায়।" কিন্তু এবারের পুজোয় তাঁর চোখেও শুধু শূন্যতা। তিন তিনটে বছর অতিক্রম হয়ে গেল, অথচ এখনো দুই ভাইয়ের মিল হলো না।
বড় বউমা বলল, "মা, এর পরের বছর থেকে ওরা এলে আমরা থাকব না।"
ছোট বউমার উত্তর, "আমরাও কারও দয়া ভরসাআর ওপর নির্ভর করে থাকি না। কে আসবে না আসবে সেটা তাদের ব্যাপার। "
মাঝখানে দাঁড়িয়ে বারো বছরের নাতনি তিতির আর দশ বছরের নাতি তাতাই বুঝতে পারে না, ঠাকুরের সামনে সবাই এত ভক্তি দেখায়, অথচ নিজেদের মানুষগুলোকেই ক্ষমা করতে পারে না কেন। “সবাইকে ভালো রেখ মা” , বলে যে মা আর কাকিমা করজোড়ে মা দুর্গার কাছে মাথা নত করে প্রণাম করেন , তাহলে কার ভালোর জন্য প্রার্থনা করেন ? সবাই বলতে কি পরিবারের বাকিজনেরা নন ? এরকম কত প্রশ্ন ভিড় করে আসে মনে, ঠাম্মাকে জিজ্ঞেস করে ওরা দেখেছে, ঠাম্মা কোন উত্তর দিতে পারেন না, শুধু চোখের জল মোছেন।
অষ্টমীর অঞ্জলির সময় হঠাৎ সুনন্দা দেবী মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। সবাই ছুটে এল। ডাক্তার বললেন, "চিন্তার কিছু নেই। তবে ওঁর মানসিক চাপ খুব বেশি।"
চোখ খুলেই তিনি ফিসফিস করে বললেন, "তোরা যদি একসঙ্গে না থাকিস... আমার দুর্গাপুজো অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।" কথাগুলো শুনেও যেন কেউ শুনলো না। মতবিরোধ মুছে দুহাত বাড়িয়ে কেউ কারোর দিকে এগোলো না। দুই ভাইয়ের মধ্যে মতভেদ ব্যবধান দ্বিগুণ দূরত্বে বজায় রইলো।
দশমীর সকাল।
প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে সিঁদুরখেলা চলছে। তিতির চুপচাপ ঠাকুরের পায়ের সিঁদুর নিয়ে প্রথমে কাকার কপালে দিল, তারপর বাবার কপালে।
দু'জনেই চমকে উঠলেন। তাতাই প্রণাম করে বাবা আর জেঠুকে । জেঠু হাত বাড়িয়ে তাতাইকে বুকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও যেন হাত নামিয়ে নিলেন। তিতির কাঁদতে কাঁদতে বলল, "মা দুর্গা তো প্রতিবছর বাবার বাড়ি আসে। কেউ কি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, কৈলাস আর বাপের বাড়ির মধ্যে তোমার জমি কোনটা? তাহলে তোমরা কেন জিজ্ঞেস করো?"
সবাই নির্বাক, নিরুত্তর, চারদিকে নিস্তব্ধতা।
অমিত ধীরে ধীরে দাদার দিকে তাকাল। গলার কাছটা দলা পাকিয়ে উঠছে। তিন বছরের জমে থাকা রাগ দুঃখ দ্বেষ আচমকা ভারী হয়ে উঠল, চোখের জল বর্ষিত হতে লাগল।
অরিন্দম এগিয়ে এসে বলল, " ভাই রে , মামলা জিতলেও আমরা যদি মা-কে হারাই, সে জয় কিসের?"
অমিত আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দাদা ভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। সুনন্দা দেবীর দুচোখ বেয়ে নেমে এল আনন্দাশ্রুর ধারা।
নিরঞ্জনের সময় প্রতিমা গঙ্গায় ভাসছিল। তিতির তাতাই দেখল, মা দুর্গার মুখ উজ্জ্বল , একটা মৃদু হাসির রেখা যেন দেখা যাচ্ছে। ঢেউয়ের মধ্যেও মায়ের সিঁদুরের ঔজ্জ্বল্য দেখা যাচ্ছে। সেই উজ্জ্বলতা বাবা আর কাকার কপালে লেগে থাকা সেই লাল সিঁদুরের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে , সিঁদুরের বিন্দু জ্বলজ্বল করছে, যেন আজ নতুন এক সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করছে।
সেদিন রায়বাড়িতে দেবী দুর্গা নন বিদায় হয়েছিল অহংবোধ, স্বার্থপরতা, মনের মলিনতা।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment