1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

খোকা

ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

খোকা

শাশ্বত বোস

এই ঠিকানা বদল হওয়া শীতের অবেলায়, সেই কবেকার পুরোনো একটা বোটকা গন্ধ ভেসে আসছে, ঘরের অভুক্ত অন্ধকার কোণাটা থেকে। ঠিক এমন গন্ধ হয়তো পাওয়া যায়, বহুকাল বন্ধ হয়ে পরে থাকা মহাফেজখানায়! ঠিক এমন একটা যত্ন করে তুলে রাখা সুখ দুঃখের অনুভূতি মাখা গন্ধ, ইদানীঙ কোর্টের এই এজলাসেও পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে অনিলাভ। গিজগিজে লোকজন ঠাসা ঘরটায় বহু যুগের ওপারে জন্ম নেওয়া ঝুলকালির মাঝে, পিটোপিটি বেড়ে ওঠা অতি পুরোনো ও পরিত্যক্ত আলমারিটার পাল্লা দুটো, আব্দালির হাতের হ্যাঁচকা টানে খুলে গেলেই, ওর চোখের সামনে হয়তো ভেসে ওঠে, স্মৃতির অতল হাতড়ে উঠে আসা এক বাক্স চিঠির যৌবন! এর সাথেই হয়তো অনিবার্যভাবে ভেসে আসা উচিত ছিল, শুকোতে দেওয়া মশলার গন্ধ, গলমরিচ-লবঙ্গ-ধোনে আর কোসুরি মেথির ভগ্নাংশের সুবাস। কিন্তু না! প্রতিবারই খুব সতর্কভাবেই সেটা হয়না। আপনমনে পুরোনোদিনের ঘটনাগুলো নিয়ে ওলটপালট করতে করতে অনিলাভর মনে পড়ে, জন্ম-মৃত্যু-বিরাগ-বিভাজন এসব নিয়েই ঝড় উঠেছিল ওর জীবনে, কোন এক তপ্ত বৈশাখে। মধ্যে তিরিশের কোঠায় পৌঁছে, অযুত ঘন্টা মিনিট সেকেন্ডের ভাঁজে ভাঁজে ওর এই সাদামাটা জীবন কেমনভাবে পাল্টে পাল্টে গেছে, খসে পড়েছে পুরোনো বাকল, সেসব আর মনে করে বলতে পারেনা অনিলাভ। ঠিক যেমন মনে করতে পারেনা, থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের মাঝে বি-বাহ নামক অন্তঃসারহীন বেঁচে থাকায় প্রবেশ করে ট্রেন্ডিং বা হ্যাপেনিং হয়ে গেছিল ও ঠিক কোন বৈশাখের কত তারিখে! মনে করতে না পেরে বরং ভুলে যাবার চেষ্টা করে আর ঠিক তখনই একটা শুকিয়ে যাওয়া মালা আর দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের বাইরে ফুরিয়ে যাওয়া ধূপ আর আতরের সুবাস গায়ে মেখে, অক্ষর শব্দের কারুকাজহীন সম্পূর্ণ নিরাকার সত্ত্বার মাঝে ফুটে ওঠে একটা যান্ত্রিক সত্য.. সাত বছর ধরে প্রেমপর্ব চালানোর পর একরকম বন্ধুদের পাল্লায় পরেই কোন এক নষ্ট হয়ে যাওয়া বিকেলবেলায় সাত পাঁকে বাঁধা পড়েছিল ওরা দুজনে!

কেস নম্বর ৫০০৮/২০১৬, মিস্টার অনিলাভ চ্যাটার্জী ভার্সেস মিসেস রোহিনী চ্যাটার্জী! সাম্প্রতিককালে মহামান্য আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে খুবই ঘোলাটে উত্তর দিয়েছে অনিলাভ, ওর নিজের বিয়ের তারিখ সম্পর্কে! কখনো বলেছে উনিশে এপ্রিল! কখনো বলেছে পনেরো! কখনো বা সতেরো! এসব নিয়ে ওর নিজের উকিলই ওর ওপর যথেষ্ট বিরক্ত! দীর্ঘ্যকালীন অলস মুহূর্তগুলোর মতন নিঃস্পন্দ বাতাস আর নিঃশেষিত প্রাণহীন একটা দৈহিক এবং মানসিক সম্পর্কের অনুষঙ্গকে বুকে করে বোটকা গন্ধটা এখন ভেসে আসছে আবার। এই হলটা কলেজ পাড়ার নামীদামী হলগুলোর মধ্যে একটা। এর আগে অনেকবার ডাক পেয়েও এখানে আসেনি অনিলাভ। বেশ কয়েকবার ওদের শিক্ষক সংগঠনের অনুষ্ঠান হয়েছে এখানে, অনিলাভ আসেনি। একটু আধটু লেখালেখির বদ অভ্যাস আছে ওর। সেই সূত্রেও আরো আগেই আসতে পারতো এখানে, না অনিলাভ আসেনি। আসলে ছোট থেকে একটু বেশীই আড়াল পছন্দ করে ও! কিন্তু আজ হঠাৎ ও এসেছে এখানে। আসলে আজ যে পত্রিকাটির মোড়ক উন্মোচন হওয়ার কথা এখানে, সেটির লিটল ম্যাগাজিন জগতে বেশ নাম আছে। না, সেজন্য নয়। এর সম্পাদক হয়তো আর চার পাঁচ জনের থেকে একটু বেশীই আন্তরিক! কেমন বার কয়েক ফোন করে বলেছেন, “অনিলাভবাবু আপনাকে বিশেষ ভাবে এক্সপেক্ট করছি! আপনার মত গুণী লেখককে আজ বড় দরকার সাহিত্যের এই সার্বিক অবনমনের যুগে। বুঝলেন না!” যেখানে লেখক পাঠক সম্পর্কের ভেতরের বিশ্বাস-শ্রদ্ধা-সৌজন্য বিষয়গুলো ক্রমশঃ একটা চার কোণা বন্ধ ঘরের দেওয়ালে, গাঢ় রঙের নিশ্বাস ফেলতে থাকা অন্ধকারের উৎসমুখে পরিণত হয়েছে, তখন ভদ্রলোকের কথাগুলোতেই কি হালকা রঙের গোলাপি আভা খুঁজে পেয়েছিল অনিলাভ? নাহ সেটাও বোধহয় আসল কারণ নয়! সম্প্রতি ওর ইস্কুল মাস্টারির সিকিউরড চাকরীটা চলে গেছে আদালতের পেনের একটি খোঁচায়! যোগ্য-অযোগ্য, হলে ফাঁকা খাতা জমা করা দাগি, পুড়িয়ে ফেলা ও.এম.আর, এসপ্লানেডে যোগ্য চাকরী প্রার্থীদের টানা অবস্থান -বিক্ষোভ কর্মসূচী, মধ্যরাতে রাজপথে পুলিশের লাঠিচার্জ সমস্ত টানটান চিত্রনাট্যের শেষে পুরো ২০১৬ প্যানেলটাই বাতিল হয়ে গেছে! নিজের স্কুলেই শিক্ষকতার চাকরিটা পেয়েছিল অনিলাভ। এই কলেজ পাড়ার কাছেই হিন্দু স্কুল। এখানেই এন.কে.পি, পি.কে.ডি এর পাশে বসে এক একদিন শুধু আবেগেই ভেসে গেছে ও! যে টিচার্স রুমে ছোটবেলায় নীল ডাউন হয়ে থাকতো অনিলাভ, সুপ্রতিম আর অয়নাংশুরা, সেই ঘরে বসেই ছুটির পর হাফ ইয়ার্লির খাতা দেখেছে অনিলাভ দিনের পর দিন! এ যেন একটা প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ বয়ে নিয়ে এসেছে ওর কশেরুকায়! এই স্কুল, এই ঘরবাড়ি ওর কতদিনের চেনা! তবু চাকরিটা পাবার পর সব যেন আবার নতুন লাগতো ওর কাছে। নতুন ঘর, নতুন দেওয়াল, নতুন রং, নতুন ঠিকানা! ঘরটা যেন শুধু ওর ফিরে আসার অপেক্ষাতেই বেঁচেছিল এতদিন! এখন সারাদিনে কটা টিউশনি করা আর বাকিটা সময় টো টো করে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর তেমন কোন কাজ নেই ওর হাতে! তাই আজ এখানে এসেছে হয়তো! কিন্তু সেটাও বোধহয় সঠিক কারণ নয়! তাহলে?

হলের ভেতর এখন একজন চোখে ঝাপসা কাঁচওয়ালা লেখিকা, ঠিক পায়রার মত সমকোণে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখছেন। এর মধ্যেই বেশ কয়েকবার অনিলাভর সাথেও চোখাচুখি হয়ে গেছে। পরিচিত কবিমহল আশেপাশে নিজেদের মধ্যে আড্ডায় মগ্ন। বহুদিনের পুরোনো এই ঘরটার দেওয়ালে টাঙানো লম্বা লম্বা ফ্রেমে বাঁধানো ছবির গা বেয়ে ঝুলতে থাকা টিকটিকির দল, অগুনতি জন্ম মৃত্যুর টানাপোড়েন পেরিয়ে তীব্র রাগ-দুঃখ-হতাশা-ঈর্ষা-নৃশংসতা বুকে নিয়ে ট্রাপিজের খেলা দেখিয়ে চলেছে, নতুন নতুন দর্শকের খোঁজে! শীর্ণকায় এক সম্পাদিকা ইতিমধ্যেই হাতে ট্যাবলয়েড পত্রিকার বান্ডিল দুলিয়ে, দিব্যি ফেরি করা শুরু করে দিয়েছেন। চুপচাপ পাশে এসে বসে, হাতে নিজের কাগজটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে, শুকনো হাসি বিলিয়ে বলছেন, “পঁচিশ টাকা, দেব?” এটাই তো লিটল ম্যাগাজিনের অকৃত্রিম মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি! বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে গেলেই সেটা দিব্যি টের পাওয়া যায়! এতে কোন খেদ নেই বরং আছে সংগ্রাম, সাহচর্য আর সক্ষমতা খুঁজে নেবার প্রচ্ছন্ন অহংকার! অনিলাভর ঠিক বাম দিকের সারিতে, অ্যাবসোলিউট পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল করে বসে আছে যে মেয়েটি, পোশাক আশাক দেখলে মনে হয় সে সুশিক্ষিতা, আধুনিকা। লেখিকা তো বটেই! পরনে জিন্স-টপ, গলায় একটা স্কার্ফ মতন এদের দেখলেই হতো মনে হওয়া উচিৎ বাংলা সাহিত্য এগোচ্ছে! অন্তত বহিরঙ্গে তো বটেই! কিন্তু আচমকাই অনিলাভর ব্যক্তিগত পরিসরে পুষে রাখা ইস্কুলমাস্টারির এটিকেট সেন্সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, মেয়েটি পায়ের চটিদুটো খুলে নিয়ে বেঞ্চের উপর পা তুলে বসলো। ঠিক যেমনটি রাতের দিকের ফাঁকা বনগাঁ লোকাল বা রানাঘাট শিয়ালদাহ লেডিস লেডিস লোকালে মেয়েরা করে আর কি! বেঞ্চগুলো সেই ব্রিটিশ আমলের পুরোনো, অর্ধেক ধুলো পরে আছে। এই চত্ত্বরের স্কুল কলেজ সভাঘরে এরকম পিঠতোলা হাতল দেওয়া বেঞ্চিই চোখে পরে সচরাচর। এই যে মেয়েটি নিঃসংকোচে পা তুলে দিল বেঞ্চের উপরে, এতে সেই শুরুর দিন থেকে চেতনাহীন একান্নবর্তী বিলাসিতার মতন সার দিয়ে পড়ে থাকতে থাকতে, এই এন্টিক বেঞ্চকুলের বুকের ভিতর দ্বিধাহীন উল্লাসে স্পর্ধায় জন্ম নিয়েছে যে অমোঘ কৌলীন্য, ভেতরে ভেতরে সাবকনশাসে এরা বয়ে নিয়ে চলেছে যে শীতল জাত্যাভিমান, তাতে সজোরে আঘাত করাই কি হল না! আর কিছুক্ষন পরেই হয়তো আজকের এই সাহিত্য অনুষ্ঠানে, নিজ ভূমিকা পালন শুরু করবেন মেয়েটি। ধরা যাক তার নাম দেওয়া গেল ‘মধুমিতা কবিতা’! তার ধূসর রঙের জামার ওপর এখন তেরছা করে পড়েছে যে কাঁচা হলুদ রঙের রোদ, টুপ কুয়াশার মতন আবছা দুটো চোখে খেলা করে যাচ্ছে যে সিঁড়ি ভাঙা সময়, লাগাম ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া বলগা হরিণীর মতন হালকা বন্ধনীর পনিটেলে, যেরকম খেলা করে যাচ্ছে বদতমিজ বেশরম ঋতুর অজাচারের বাদামী ছায়া, তাতে এই সময়ে ওকে দেখে খুব বেশী করে এই নামটাই মনে আসছে অনিলাভর! অবশ্য নামে কিই বা আসে যায়! উপস্থিত কবিদের এক এক করে নাম ডাকা হবে, কবিতাপাঠের পর তাদের গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দেবেন মধুমিতা। যদিও সে পর্ব শুরু হতে এখনো বেশ খানিকটা দেরী আছে। সবাই প্রায় উপস্থিত। তবু যেন কারো জন্য অপেক্ষা করা চলছে। বহু প্রতীক্ষিত যেন সেই উপস্থিতি! আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, কোন এক প্রখ্যাত সম্পাদিকা, এককালের প্রখ্যাত লেখিকা! এক সময় বহু বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকা এবং লিটল ম্যাগাজিনের সূচী আলো করে তাঁর নাম থাকতো। এখন নতুন প্রকাশনা সংস্থা খুলে দিব্য নাম কিনেছেন। সরু-লম্বা-মোটা-খাটো-মাঝারি সব ধারার, সব মাপের লেখকের প্রায় নয়নের মণি এখন সেই প্রকাশনা সংস্থা! যেমনটা ছিলেন একসময় তার মালকিন! মুখে তাঁর সর্বদা নতুনের জয়গান লেগে আছে। ফেসবুকের ট্যাগলাইন এঁদের, ‘আমরা নুতন যৌবনেরই দূত’! দিক-দেশ-শূন্য ভুলিয়ে একটা ক্ষীণ ধারার হাওয়া ওঠে এ সময়! সব হাওয়ার বুকেই নতুন কিংবা পুরোনো, উগ্র কিংবা গা-সওয়া একটা গন্ধ লেগে থাকে! লেগে থাকে একটা স্পর্শ! সে হাওয়াটা বেনামী হতে পারে কিংবা কোনো অতিথি অভ্যাগতের গায়ের চামড়া ছুঁয়ে, এতোল বেতল রসাতলে জমা করে আসা, ধূলি ধূসরিত উঠোন কিংবা ছাদকে একটা কুঁচকে যাওয়া দৃষ্টি দিয়ে, বহু অপেক্ষার কোন দৃশ্যকে জীবন্ত করে তোলে কখনো সখনো! এবার হয়তো তিনি এলেন! ভারী শরীর, সুললিত বক্ষদেশ, সুপ্রশস্ত নিতম্ব! খুব ধীর পায়ে, রাজসিক চালে একটা এক্স.এল সাইজের ডেনিম জিন্স আর শার্ট পরে, অনিলাভর ঠিক পাশ দিয়ে হেটে বেরিয়ে গেলেন তিনি মঞ্চের দিকে। ভদ্রমহিলার মুখের সাইড প্রোফাইল, অনিলাভর মুখের খুব কাছ থেকে দূর হয়ে গেল মুহূর্তে! আচ্ছা! কবি সাহিত্যিক মানেই কি নারী শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গের মোহমায়া তাঁকে প্রলুব্ধ করে? দৃশ্যের নৈঋতে নারীর বিশেষ বিশেষ জননাঙ্গ কি শুধুই তাঁর কাছে মুখরিত শব্দের উৎসমুখ? তাতে কি কখনো কাম এসে ঠাঁই পায়না? কখনো কি তার চোখে জেগে থাকা দৃশ্যে ঠাসা হয়ে থাকেনা বাসনার গঠনপ্রক্রিয়া? স্বয়ং বিধির কাছেও হয়তো এ প্রশ্ন সাক্ষাৎ পাজল কিউবেরই নামান্তর! সারাদিনের ধুলো-বালি-জট আর মানুষের অবিরাম অবাঞ্ছিত ধাক্কাধাক্কির পর মগজের গোপন ঘরটিকে বন্ধ করে ভিতরকার মানুষগুলো বাইরে বেরিয়ে আসে হয়তো, কিন্তু সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না! মঞ্চে তাঁকে উঠতে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন একালের এক খ্যাতনামা সাহিত্যিক। মিনিমাম অগ্রিম পাঁচ হাজারের কমে যিনি পত্রিকায় লেখা দেন না! সঞ্চালক এতক্ষণ নিজের খ্যানখ্যানে গলা দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করছিলেন, তাড়াতাড়ি বলা থামিয়ে মাইক গুঁজে দিলেন তাঁর হাতে। আসলে ব্রম্ভময়ীর মতো ফুরিয়ে আসা এই বিকেলে তিনিই তো একমাত্র আকর্ষণ!

“আমি রাস্তায় একটু অসুবিধেয় পড়েছিলাম, তাই আসতে দেরী হল। মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। শুধু সেই অসুবিধের কারণেই তাড়াহুড়ো করে এই বিজাতীয় পোশাকে সাহিত্য অনুষ্ঠানে আসা! নইলে এরকমটা করিনা সচরাচর!”

ভদ্রমহিলার মধ্যবয়সী নাভিদেশ থেকে বেরিয়ে আসা কিছুটা থলথলে চর্বি, পেটের কাছে আঁটসাঁট হয়ে কামড়ে থাকা শার্টটার, দুটো বোতাম খুলে দিয়েছে। সাহিত্য অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট কোনো ইউনিফর্ম হয়কি! বাম পাশের সারি থেকে আধুনিকা মধুমিতা, ‘বিজাতীয় পোশাক’ কথাটা শুনে মুখটা একটু বাঁকাল যেন! বকবকম পায়রা এরই মধ্যে আবার ঘাড় ঘোরাচ্ছেন! ঘোরাচ্ছেন ঘোরাচ্ছেন, ঘোরাতে ঘোরাতে, গোল চশমার দৃষ্টি আবার এসে লক হয়ে গেছে অনিলাভর মুখে! আশে পাশে অন্যান্য পত্রিকার সৌজন্য সংখ্যা বিতরণ চলছে নিজের নিজের মতো করে। ততক্ষণে প্রধান অতিথি তথা নয়নমণি প্রকাশিকা হাতে মাইক ধরে বলে চলেছেন, “কল্লোলিনী পত্রিকার এই সংখ্যাটি এঁরা উৎসর্গ করেছেন, মহানায়ক শ্রী উত্তম কুমারকে। এবছর ওঁর জন্মশতবর্ষ! নিছক পরমায়ুর হিসাব নিকাশের বাইরে গিয়ে উনি চিরকালীন হয়ে গেছেন!” উত্তম কুমার, এই একটা নামেই দিক শূন্যপুরের দিক থেকে আলগোছে অনিলাভর কাছে ভেসে আসে, কিছু সুস্পষ্ট হাওয়া সংকেত! যেন ওর শিরায় শিরায় জাগে ভৈরবী সুর! প্রেম-আবেগ-মূল্যবোধ এই অভিব্যক্তিগুলো, পাড় ভেঙে পরস্পরের সাথে মিশে যায়, একটা নৈর্ব্যক্তিক ফ্যান্টাসির নবজন্ম হয় ওই একটা নামে! ‘মহানায়ক’! সেই চোখ, সেই হাসি, এলোমেলো চুল, ধুতি পাঞ্জাবীতে সুঠাম দাঁড়ানো একটা চেহারা! সবে মিলে অগুনতি জন্ম-মৃত্যুর টানা পোড়েন পেরিয়ে উঠে আসা, অতিরিক্ত আবেগ, অফুরন্ত উড়ে চলা জীবন আর মায়াময় বদ্ধ এক চেতনার জন্ম দেয় ওর ভেতর। সেইসময়টায় ও হয়তো আশপাশের সব কিছু দেখছে, শুনছে, ভাবছে অথচ কোন প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না! শূন্যতার কাছে, সুপ্তির কাছে এক ইন্দ্রিয়ানুগত আত্মসমর্পণ যেন! স্বচক্ষে তাঁকে কোনদিন দেখেনি ও আর কোনওদিন দেখতে পাবার সম্ভাবনাও নেই। তবু হাজার মানুষের ভিড়েও ও মুখ দেখলে পড়ে মায়ের ওমে ফুল হয়ে ফুটে থাকা কোন নবজাতকের মতন, অপার্থিব লাবণ্যে মোড়া একটা ইমেজারি ফুটে ওঠে যেন! যান্ত্রিক রোবটে পরিণত করে ফেলা সম্পূর্ণ অবয়বহীন এই মন্ত্রমুগ্ধতার কথা অনিলাভ জানে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, জাগতিক ধরা ছোঁয়ার বাইরের কোন ব্যক্তি, বস্তু বা কৃত্রিম মেধার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে, নিজের বোধের ওপর নিরবিচ্ছিন্নভাবে নিয়ন্ত্রনহীন হারিয়ে ফেলে যারা, তাদেরই হয়তো ‘প্যারাসোশাল’ বলে! নিছক ‘ফ্যান’ কথাটার সংজ্ঞা পেরিয়ে অন্তহীন অনস্তিত্ত্বের প্রতি প্রাণভরা ভালোবাসার এ এক আধুনিক গালভরা নাম! আসলে অন্যেরা বোঝেনা, মৃত মানুষের সবটুকু তখন তার কাছে আর মৃত নয়! ফাঁকা ঘর পূর্ণতায় মশগুল হয়ে থাকে, জন্ম মৃত্যুর মাঝে পড়ে থাকে, অগাধ, অবাধ, অনন্ত এক অভ্যাস আর জীবনের ব্যাপ্তি!

খুব ছোটবেলা থেকেই সাদাকালো পর্দায় গুরুর ‘প্রেসেন্স’ গোগ্রাসে গিলতো অনিলাভ। শুধু ও একা নয়, ও আর ওর ঠাকুমা মিলে যেন আটকা পরে থাকতো, শেষ বিকেলে খসে আসা তারার মতন, নিত্য প্রয়োজনীয় এক উত্তম মোহিনীজালে! ওর মাও কিছু কম যেতেন না! তবে ওর মায়ের আবার বেশী ভালো লাগতো সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়কে। বাবার আবার প্রিয় ছিলেন স্বরূপ দত্ত। তবু হয়তো ওর ঠাকুমার গা থেকে ভেসে আসা সুগন্ধী তেলের সুবাসে কিংবা ধুতে ধুতে প্রায় ন্যাতা হয়ে যাওয়া পরনের পুরোনো সুতির কাপড়ের শরীরী কোমলতায়, উত্তম নামটাতেই বরাবর একটা সাদামাটা ‘উ’ খুঁজে পেয়েছে অনিলাভ! একটা সিঙ্গারা পাক চুলের ‘উ’! শীতের বিকেলে ফিকে হয়ে আসা ছাতিম ফুলের গন্ধ বুকে করে, রোজ বারান্দায় এসে বসা নাম না জানা সুন্দর পাখিটার মাথায়, জট পাকানো রিলের মতন গজিয়ে ওঠা রংবেরং ঝুঁটিটার মধ্যে, মুখ লোকানো আনকোরা একটা ‘উ’! মনে আছে ‘শ্রেষ্ঠাংশে উত্তমকুমার’, ছবির শুরুর দিকে পর্দায় ভেসে ওঠা এই লেখাটার ভেতর থেকে উঁকি দিত, নিরীহ রোমান্সের সাথে খুনে হাসি মেশানো, শিরোনামহীন কোন আনহোনি খুশবু ছড়ানো, উন্মীলিত এক ‘উ’! শরীরে ও ছায়ায় যে বাকিদের থেকে অনেক বড়! খুউব ছোটবেলায় যখন রবির ঘন হয়ে আসা বিকেলে, টিভিতে গুরুর সিনেমা দিত, বুক খোলা টিভি, সাদা কালো পর্দা, এক ভীষণ দ্যুতি যেন সেখানটা থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে যেত সমস্ত ঘরটায়! সেই দীপ্তিই যেন ফিরতি প্রতিসরণের পথে, চোখ বুজে আঁকা মানচিত্রের মতন লেগে থাকতো, তাঁর আলোমাখা চোখদুটি জুড়ে! ‘প্রচন্ড মানসিক অশান্তির মাঝে পূর্ণতার বোধ এনে দিতে পারে’ এমন ভুবন ভোলানো হাসির সাথে ব্যালান্স রেখে চলা ঈষৎ চাপা গাল দুটো জুড়ে যেন, কার্তিকের ঝরোঝরো আকাশ ভাঙা হিমবৃষ্টি, প্রেম হয়ে এসে লেগে থাকতো ওঁর গোটা চেহারা জুড়ে! সে প্রেম বড় শীতল! শান্ত! স্নিগ্ধ! সে প্রেম টের পেলে বোধহয় ঠান্ডা ঘনায়! চোখ ঢুলে পড়ে! ছায়া নামে! কুয়াশা পাশ কাটিয়ে যায় নীরবে! একটা গোটা দিন শেষ হয়ে যায়, সে প্রেম শেষ হয় না! সেইরকম একটা প্রেমে পড়লে প্রেমিকেরা হঠাৎ গরীব হয়ে যায়! পকেটে আছে অথচ ফোনপে জিপে কিচ্ছু কাজ করছে না, এরকম একটা সময়ে আকাশ থেকে ঝুপ করে নেমে আসা মেঘখণ্ডকে দেখলে মনে হয়, প্রেমিকার চিবুক! সেইরকম একটা ধৈর্য্যশীল প্রেমের আড়াল নিয়ে বাঁচতে বাঁচতে, ভেতরে ভেতরে কবে যেন উত্তমের শ্রেষ্ঠ প্রেয়সী হয়ে উঠেছে অনিলাভ! এ প্রেম এখন শুধু আর নিছক ভক্তের ভালোবাসা নয়! পর্দায় তাঁর রূপে মজে চিরটাকাল শুধু তাঁরই হয়ে থাকতে চাওয়া, ষোড়শীসুলভ মানসিকতায় ডুবে থাকাও নয়! এ প্রেম যেন কৃষ্ণকিশোর অমাবস্যার ভগ্নদশায় বোনা, দামাল অতৃপ্ততার মানসিক নির্বন্ধ! এ প্রেম ফ্যানডমের বিভ্রম উতরিয়ে পার হওয়া, সরল একমাত্রিক ধোঁয়াশায় বোনা, অলৌকিক এক ফ্যান্টাসির মায়াকাহন! এ প্রেমে উত্তম সুচিত্রার ম্যাজিক টাইমিং নেই! নেই উত্তম সাবিত্রীর অভিনয়ের গভীরতা! এমনকি ভবানীপুর-ময়রাষ্ট্রীট-নিউ আলিপুর থেকে সুদূর তোপচাঁচি, সর্বত্র এ প্রেমে হাবুডুবু খেতে হয়, গৌরীদেবী সুপ্রিয়া চৌধুরীর সতীন হবার বাসনায়! সবটাই অবশ্য মনস্তাত্ত্বিক স্তরে! উত্তম শুধু ষ্টার নয় তখন আর! উত্তম মানে তখন এক সুদর্শন শূন্য! নড়ে না! চড়ে না! ঠায় স্থির! মাঝে মধ্যে হাত পা ছোড়ে! যেন গর্ভের সন্তান! নিজের জায়গা করে নিচ্ছে! ঠিক যত ভালোবাসা যায় তাঁকে, বাস্তবের টেবিলে অপ্রাপ্তির থালাটাও চওড়া হয় তত! শুকনো পাতার ঢঙে ঝরে পড়ে সেকেন্ড-মিনিট-ঘন্টা!

রোহিনী কোনোদিনই অনিলাভর এই ভালোবাসার জায়গাটাকে বুঝতে চায়নি। বুঝতে পারেওনি তাই! আমলও দেয়নি! হয়তো ভেবেছে পাগলের প্রলাপ! কি ভীষণ সেকেলে! রোহিনী আসলে গোটা অনিলাভকেই বুঝতে চায়নি কোনোদিন। উত্তমকুমারকে কোনোদিন সামনাসামনি চোখে দেখেনি অনিলাভ। আশি সাল থেকে উনিশটা জুলাই মাস সে নিয়েছে ভূমিষ্ঠ হতে। উত্তমকে মনে মনে ভালোবাসতে হয়তো আরো বছর ছয়েক। সে ভালোবাসা তারপর বাড়তে বাড়তে অনন্তের পথে যাত্রা করেছে উত্তরকাল ধরে। তাই বলে নিজেকে আস্তে আস্তে উত্তমের মতন দেখতে করার চেষ্টা! না একদম করেনি যে তা নয়! কিন্তু হেরে গেছে! নিজেকে নিজের ঈশ্বরের অবয়ব হিসেবে তৈরী করা যায় কি! আবার এই অনিলাভ যখন লিখতে বসে, তখন তো সে নিজেই ঈশ্বর! নিজের বানানো প্যারালাল পৃথিবীটা উত্তমের অভিনয়ের মতোই নিখুঁত হোক, এটাই তো সারা জীবন ধরে চেয়ে এসেছে অনিলাভ। কিন্তু শুধু তো ক্রিয়েটিভ ইনস্টিংক্ট এর প্রশ্ন নয় এটা! উত্তম আসলে ওর কাছে পোশাক বদলে গড়ে ওঠা আরেকটা আশ্রয়! যেমন ছিলেন ওর বাবা!

পাতায় পাতায় ডালে ডালে এসে পড়েছে শেষ বিকেলের রোদ। সেই রোদের জটিলতম রিফ্লেকশন আটকা পড়ে আছে টিমটিমে তারাদের বন্ধনীতে। এই দৃশ্য আর শূন্যতার মাঝামাঝি চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে যে মুখ, লম্বা মতন, উজ্জ্বল সূর্যমুখীর মতন গাঢ় রঙের সেই মুখটিই ওর বাবার। মাঝে মাঝে অনিলাভ ভাবে ওর বাবা বেশ সৎ ছিলেন! কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি করেও কোনোদিন ঘুষ খাননি। আবার হয়তো একটু বেশীই সাবধানী ছিলেন! চট করে কোথাও ঝামেলা জড়াতে তাঁকে দেখেছে বলে ওর মনে পড়ে না। ওর এই লেখালিখির পেছনে ছোট থেকে নিরলস ফুটিংস জুগিয়েছেন যে মানুষটি, তিনি ওর বাবা। প্রথম প্রেম ভেঙে যাবার পর গঙ্গার ঘাটে ও মুড়ি চানাচুর খেয়েছিল যে মানুষটির সাথে বসে, তিনি ওর বাবা। আবার ওর ঠোঁটে হঠাৎ করেই গজিয়ে ওঠা চোরাগোপ্তা বয়ঃসন্ধির অ্যাডভেঞ্চারকে একটা যুৎসই মর্য্যাদা এনে দিতে, ওর হাতে একটা মধ্যম সাইজের সিগারেট গুঁজে দিয়ে, পকেট থেকে জাদু দেশলাই বার করে ওর মুখের সামনে ধরেছিলেন যিনি, তিনিই ওর বাবা। সুপ্রিম কোর্টে ওদের রিভিউ পিটিশন যখন ঝুলছিল, তখন দিনের পর দিন ধর্নামঞ্চ থেকে বাড়ি ফেরার পর ওর শ্রান্ত ধ্বস্ত দুটো কাঁধে, ভরসার হাত রেখেছেন যে ভদ্রলোক, তার পরিচয়, তিনি অনিলাভর বাবা। শেষ রাতের কিনারায় অদৃশ্য সূর্য্যরশ্মিকে সাথে করে এসে দাঁড়ানো, চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ ঘূর্ণির মাঝে রোজকার ঝাল-নুন-হলুদ আর চিনির পাক এর মতো তরঙ্গহীন সেই বটচ্ছায়ার নাম ওর বাবা।

ঠাকুমা বেঁচে থাকতে শেষ দিকে সারাদিন শুধু গোঙাত! গুনগুন করে বয়ে চলা একটানা একটা যন্ত্রনামুখর আর্তনাদ! ঠাকুমা থাকতে থাকতে পুরোন অ্যালবাম থেকে একটা ছবিকে ডেভেলপ করে ওঁকে দেখিয়ে নিতে বলেছিল বাবা। কেন কে জানে! বড় অদ্ভুত স্পৃহা! বাবা নাকি ওর ঠাকুমার গর্ভের চতুর্থ ও শেষ সন্তান। বাকি সবাই গর্ভে থাকতেই মারা গেছে, এমনটাই শুনেছিল ও ঠাকুমার মুখে। রোজ অফিস থেকে ফিরে, মুখ হাত ধুয়ে, ঠাকুমার চুল বাঁধতে বসত বাবা। এসময় ওদের একসাথে দেখলে মনে হত যেন ওরা একে ওপরের আদরের সন্তান! দুটো গ্লাভস, কিছু নোংরা ময়লা কাপড় চোপড়, তাতে অদৃশ্যভাবে কিলবিল করতে থাকা জীবাণুর ক্রমবর্ধমান শক্তি বিস্তার আর অন্ধকার ঘরটার দেওয়ালে দেওয়ালে ঘুরপাক খেতে থাকা, একটা ভীষণ সুগন্ধী তেলের সাথে মিশে ছিল একজন অশীতিপর মানবীর তীব্র জীবনের আকাঙ্খা! ঠাকুমা বলতে অনিলাভর এখন শুধু এটুকুই মনে পড়ে! ছবিটা ও ভালোভাবে বানিয়ে এনেছিল পাড়ার স্টুডিয়ো থেকে। সদ্য বিবাহিত এক ষোড়শী বালিকার ছবি। কোলে করে যে পিত্রালয় থেকে বয়ে এনেছে তার সাধের পুতুল দুটোকে! অ্যালবামের ভাঁজে জমে থাকা ধুলোর চাপে ছবিটা আবছা হয়ে গেছিল। নতুন ভাবে প্রিন্ট করার সময় কপালের মাঝে লাল সিঁদুরের টিপটাকে বড় উজ্জ্বল করে আঁকিয়েছিল অনিলাভ। পুরো ছবিটার মধ্যে ঐখানেই হয়তো ও খুঁজে পেত এক পূর্ণ নারীর আশ্বস্ত শ্রীচিহ্ন!

ছবিটা দেখে, বিশ্রাম নিতে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তের পথিকের মত মুখ করে শূন্যে একটা ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি দিত ওর ঠাকুমা। “গুড়পুকুরের মেলার প্থথম দিনে, যেদিন মনসাতলায় ভাদু গায়ের আসর বসতো”, বলেই চলে যেত নিঃসঙ্গতার কোলে! অনিলাভ পরে জেনেছে সাতক্ষীরায় ভাদ্র সংক্রান্তিতে গুড়পুকুরের মেলা বসে আজও। সে মেলায় মিষ্টি, কাঠের আসবাব এসবের ছবি ও দেখেছে ইউটিউবে কিন্তু বুঝে উঠতে পারেনি কিছুতেই, গুচ্ছমূলের মতো সঞ্চয় করে রাখা স্মৃতির জীবনী হাতড়ে, ঠাকুমা ঠিক কি বোঝতে চাইত! বিবর্ণ অথচ মাখন নরম সেই নির্বাচিত দিনে কি পরিবর্তন এসেছিল ঠাকুমার জীবনে! সেদিন কি ঠাকুমা এসেছিল এই পৃথিবীতে! নাকি তার দুধসাদা অতীতের বাতাসে ভর করে ভারী হয়ে আসা প্রথম গর্ভ খালি হয়ে গেছিল ব্যথামাসের ওই বিশেষ দিনে! জন্মান্তরে ফিরে ফিরে আসা অন্ধকারের মাঝে বহুজন্মের আঁতুড়ে, ক্ষতচিহ্ন এঁকে ফিরে যাওয়া সেই অভিমানী পথিক! সেও কি ছিল ওর ঠাকুমার নিজের হতে চেয়েও না হতে পারা কোন খোকা! ওকে ‘মায়ের ছবি’ বাঁধাই করতে বলে একদিন নিজেই ছবি হয়ে গেল তার ছাপ্পান্ন বছরের, আদরের ‘খোকা’! এক রাতেই সব শেষ! যেন অনেক দিন ধরে হাওয়া-বাতাস-সূর্য্য-তারাকে সঙ্গী করে ঘুমের দিকে হেঁটে যেতে যেতে, দুম করে মানুষটা চলে গেল নিঃসঙ্গতার উপকণ্ঠে! শেষদিকে অফিসে যাওয়ার পার্ট ছিল না যখন আর, তখন দিনের অনেকটা দোতলার বারান্দায় ইজি চেয়ারে শুয়ে কাটিয়ে দিত ওর বাবা। মাঝে মাঝে বিদেশী সাহিত্যের বই পড়ত, কাফকা-আন্তোন চেখভ-সালমান রুশদী! অথচ সারাটা জীবন কোনোদিন তেমনভাবে বাবাকে বই পড়তে দেখেনি অনিলাভ। আসলে হয়তো ভিতরে ভিতরে চাগার দিয়ে ওঠা অলস মুহুর্তগুলোর দোসর হিসেবে, লতানে পুঁই ডগার মতো এলিয়ে বেড়ে চলা একাকীত্ত্বের বোধটাকে, স্বীকৃতি দিতে চাইত না কখনোই। অসম্ভব একটা মানসিক জোর ছিল ওর! আর তা ছিল বলেই বেঁচে ছিল হয়তো! তারপর একদিন যেমন সমুদ্র থেকে সরে যায় ফেনিল সরের মতো চাঁদ জ্যোৎস্না, ঠিক সেরকম একটা বোধ নিয়ে হঠাৎ জীবন থেকে সরে গেল শান্তির দিকে! অনিলাভ দেখলো বেশ ভালোভাবে সরে যেতে পারে ওর বাবা! খুব সতর্কভাবে! ধীরে ধীরে পা ফেলে! শেষের দিকে প্রায়ই বলত, “খোকা, লিখে তুই কিন্তু নাম কিনছিস! আজ রাস্তায় অমুকের সাথে দেখা হয়েছিল। একথা সেকথায় তোর নাম করছিল! তরুণ প্রতিভাবান সাহিত্যিক!” মজা করার অভ্যাস ওর বাবার চিরোটাকালের। তাই কথাগুলোয় বিশেষ আমল দেয়নি অনিলাভ। খুব ছোট থেকে লেখালিখির দিকে একটা ন্যাক থাকলেও পুরোদমে ও আবার লেখালিখি করছে এই বছর তিনেক হল। জীবনে কবিতা লেখেনি ও। কোনোদিনও না। কিন্তু লেখালিখির এই দ্বিতীয় অধ্যায়ে কবিতা দিয়েই শুরু করেছে ও। হয়তো ওর এই মেটামরফোসিস এর জন দায়ী যে সাদামাটা অ্যাবসার্ডিটি, তার বেশ একটা হাইপোথিটিকাল ট্যাগলাইন ও নিজেই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে, ‘একটু পোস্ট মডার্নিজমের খোঁজে!’ সেই জন্যেই এখন ছোট-বড়-মেজ-সেজ সবার জন্যই লেখে ও। বাণিজ্যিক পত্রিকায় লিখে ও সাম্মানিক পেয়েছে। সেই টাকায় আবার ছোট ম্যাগাজিনে নিজের লেখা নিজেই কিনেছে। যারে আধুনিক সাহিত্যের বাজারে ‘শুভেচ্ছামূল্য’ কয়! না কোন অসূয়া রাখেনি ও মনে কখনো। নিজের সৃজনশীলতাকে বাজারে শুধু রোল করে গিয়েছে। থামতে দেয়নি! যবে থেকে স্কুল শিক্ষকতার চাকরীটা নিয়ে টানাটানি তবে থেকেই মন খারাপ হলেই নিয়ম করে লিখতে বসে গেছে। তবু এই তিন বছরে দু দুটো গল্পের বই বাজারে বেরোলেও এখনো অবধি কবিতার বই ও একটাও বার করতে পারেনি! কেন কবিতা কি ওর কাম্য সন্তান নয়! একটি কবিতা রচনা করতে গিয়ে ও কি যথেষ্ট সচেতন থাকে না! কবিতা তো ওর নিজেকে এক্সপ্রেস করার ভঙ্গিটাই বদলে দিয়েছে। কেন গল্প কবিতা ওর যমজ অপত্য হয়েও বাংলা বাজারে আদায় করতে পারেনি সমান সমাদর! অথচ ওর লেখা একেকটা গল্প যেন বাস্তবিকই ওর প্রাণাধিক প্রিয় ‘খোকা’! তবে কবিতাগুলোকে চিরটাকালই এক একটি আদর্শ মেয়ে বলে মনে হয়েছে অনিলাভর। ওর লেখা কবিতার শরীর জুড়ে ও খেলা করে যেতে দেখেছে, ছদ্ম আড়ালের ভঙ্গিমা! একেই বোধহয় শিল্পের ভাষায় ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিসম’ বলে! কবিতাগুলোর আড়ালে এক একটা আস্ত উপন্যাস লুকিয়ে থাকে যেন! দেখা আর না দেখার মাঝে আনাগোনা করে কিছু চিহ্ন! কিছু অক্ষর! যাদের গতিপ্রকৃতি ভীষণভাবেই স্বাধীন! ভীষণভাবেই তারা যেন স্বতন্ত্র! শরীর এর পর শরীর জুড়ে কবিতার নামে সেখানে যে ছবিগুলো চিত্রিত হয়, তাদের আকার আয়তন বা অভিমুখ সবই অনির্দিষ্ট! কোনো নির্দিষ্ট ভাবনার সীমাবদ্ধতায় তাদের ব্যাখ্যা করা যায়না! কিন্তু কোনো গল্পের কথন যদি কবিতায় খুঁজে নেয় তার নির্দিষ্ট আশ্রয়, তাহলেই তাকে কেন ‘কাব্যিক’ বলে দাগিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়! আর কাব্যিক মানেই যেন মেয়েলী! গল্পকে কি পুরুষালী হতেই হবে! অনুভবের আসলে নিজস্ব একটা চলন থাকে। তরলের মতোন। তাকে যে আধারেই ধরা হোক না কেন সে আসলে সেখানেই নিজেকে উজাড় করে দেয়। তবু কেন কেউ ওর কবিতার বই নিজের খরচে করতে চাইলেন না! সেকি শুধু বাজার না পাবার ভয়! আজ এই বিল্ডিঙে ঢোকার মুখটায় একজন দীর্ঘ্যদেহী, সুপুরুষ, ছুঁচলো মতন মুখ ওর দিকে এগিয়ে এসে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি অনিলাভ তো? আপনার লেখা ভালো লাগে! বেশ বলিষ্ঠ কলম! তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠান শেষ করে বেরিয়ে আসুন। আপনার সাথে অনেক পরামর্শ আছে কমরেড!” অনিলাভ জন্মে কোনোদিন পার্টি পলিটিক্স করেনি। চাকরিহারা শিক্ষকদের আন্দোলনেও আজ অবধি কোনো রাজনীতির রং লাগেনি বলেই জানতো ও। ওর বাবা জীবনের শুরুর দিকে গৌরীপুর জুটমিলে কাজ করার সময় সিটু করতো বলে শুনেছিল অনিলাভ। একবার কারখানা লকআউটের সময় উনিয়নের অ্যানটি লবির টার্গেট হয়ে গেছিলেন। রাতে বাড়ি থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছিল। পরে অবশ্য ছেড়ে দেয়। কিন্তু এক রাত লক আপে কাটানোর পর ওর বাবা যেন আমূল বদলে গেছিলেন! পরবর্তীতে সরকারি চাকরি করার সময়ও পার্টি পলিটিক্স থেকে দশ হাত দূরে থাকতেন। খানিকটা ভয় আর জখমের সমান্তরাল মানসিক অবস্থা থেকে ভদ্রলোককে ভালোভাবে দেখার জন্য একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল অনিলাভ। কিন্তু কাউকে আর দেখতে পায়নি। ধীরগতির রবিবাসরীয় বইপাড়ার জীবনে যেন বেমালুম মিলিয়ে গিয়েছেন তিনি ততক্ষণে! একফালি রোদ্দুর এখন ওর মনের ভিতর জমে থাকা কুয়াশা আর আবর্জনা স্তুপের মধ্যে দিয়ে উঁকি মারে ইতিউতি! বাবা তাহলে ঠিকই বলতো! সেদিন ঠাকুমার ছবিটা দিয়ে পাড়ার স্টুডিও থেকে বেরিয়ে আসার সময় হঠাৎ একটা ছবির দিকে চোখ চলে গিয়েছিল অনিলাভর। চোখ গিয়েই দৃষ্টি আঁকড়ে নিয়েছিল মহাবিশ্বের মতন একটা দেহাবয়ব! হাজার মুখের মাঝেও বিশেষ পরিচিতের মতন, মনের গভীর ক্ষতগুলিকে চেপে, প্রতিটি চঞ্চল হাসি আর চাপা দুঃখকে ধীরগতির অভিযোজনে একমাত্রায় নিয়ে এসে, আলিঙ্গনের বিস্মিত আনন্দে, নিমেষে বুকে সৃজনশীলতার আলোড়ন তুলতে পারে শুধু সেই মুখ! গুরু, কেমন যেন অলৌকিক মুহূর্তের বর্ণে-গন্ধে ওকে মাতিয়ে রাখে সবসময়! এই ছবিতেও কেমন আত্মমগ্ন রাজার ভঙ্গিতে সিগারেট ধরাচ্ছেন! পরনে পছন্দের সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি! অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় ছবি থেকে বেরিয়ে এসে, সামনে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করবেন, “কিছু বলবে, খোকা!” তারপরেই ছুঁড়ে দেবেন, সেই উজ্জ্বল স্নিগ্ধ হাসি, যাতে লেগে থাকবে পরিযায়ী আতরের গন্ধ! কানের কাছে অবান্তর মনোলোগের মতন আনমনে খেলা করে যাবে একটা স্মৃতিবিহ্বল কণ্ঠস্বর! “খোকা!” ঠিক এইভাবে হয়তো ঠাকুমা ওর বাবাকে খোকা বলে ডাকতো! ব্রেস্ট ক্যান্সারের ফাইনাল স্টেজে শুয়ে ঠাকুমা শুধু গোঙাত! হাতে গ্লাভস পরে অপারেশনের জায়গাটা পরিষ্কার করতো ওর বাবা। ঠিক দুটো পাহাড়ের মাঝে জন্ম নেওয়া খাদের মতন, খাবলানো বুক! একদিন যে স্তন তাঁর খোকা পান করেছে, সেই জায়গায় এখন শুধু অংকভাঙার শূন্যতা! 

বাবার রিটায়ারমেন্টের পর বেশ কয়েকবার বাবাকে নিয়ে এসপ্লানেড এর সি.জি.এইচ.এস অফিসে এসেছিল অনিলাভ। পুরোনো দিনের বিশাল কারুকাজ খচিত লাল রঙের বিল্ডিং। লিফটের পাশাপাশি দোতলায় ওঠার বিশাল কাঠের সিঁড়ি। সব কিছু জুড়ে বাতাসে মিহি বালির মতো উড়ে বেড়াত সুদূরপ্রসারী এক মায়াময়তার আখ্যান! কাজ ফুরোলে দিনের শেষের ক্লান্ত অবসন্ন পথচারীর মতো ওরা বাপ ব্যাটাতে হাত ধরাধরি করে উল্টোদিকের ট্রাম ডিপোর ভেতর দিয়ে কিছুটা হেঁটে গিয়ে, জারুল কিংবা আমলকি গাছের তলায় একলা পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকা বেঞ্চিগুলোর একটায় গিয়ে বসত ওরা। আকাশ-বাতাস-গাছপালা আর ট্রাম লাইন বেয়ে ওঠা ধোঁয়ার মাঝে জেগে থাকা ওদের শরীরের ওপর দিয়ে যেন ঘুরে বেড়াত এক টুকরো রোদ আর মাঝসমুদ্রে ভেসে পড়তে চাওয়া গেরুয়া রঙের বয়সের ব্যবধান! বাবা ছেলে ওদের দুজনের নিজস্ব ইচ্ছাগুলোকেই যেন সমান ধাক্কা দিত এই ভাসমান বায়বীয় যাপন! বাড়ি ফেরার পথে ডেকার্স লেনের ফুটের বেঞ্চিতে বসে গোগ্রাসে ওরা ফাস্ট ফুড খেত! তারপর ফিরতি অফিস পাড়ার শরীর ছাড়িয়ে ওরা ফিরে আসতো অনুসারী বিবর্তনের পথে! আজ যখন বাবা আর নেই ওর সমসাময়িকের পরিসরে, জীবনের যাবতীয় প্রয়োজনীয় উপাদানে আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় তাঁর শরীরী উপস্থিতি, তখন অনিলাভর মনে হয় ট্রাম ডিপোর ভেতরে পরে থাকা সেই একলা বেঞ্চিতে গিয়ে একবার বসে কিংবা নিজেকে ভাসিয়ে দেয় ডেকার্স লেনের কর্মব্যস্ত জনতার মুখরিত স্রোতে! হয়তো তাতে বাবা হারানোর শোক স্বল্পমেয়াদী হবে! বিষাদ নূন্যতম হবে! আসলে আগামীর প্রারম্ভে, নিশীথ সূর্য্যের দেশে শোক বিষাদ এসব মানে তো দুর্বলতাই!

‘বেদনার শতদলে স্মৃতিরও সুরভি জ্বলে।

নিশীথের মন বিনা সুর জানে না।’

পৃথিবীর সমস্ত ধরণের শোক প্রয়োজনে ফিকে হয়ে যায় আমাদের কাছে। প্রয়োজনে আমরাই হয়তো এড়িয়ে চলি। ভাবের অনুসন্ধান করি! গল্প লিখবো বলে যন্ত্রণাকে মজতে দিই! রোদে ফেলে রেখে শুকিয়ে নিই আগা পাঁচতলা! যেন টুকরো রুটির লোভে ঝাঁপ দিচ্ছি আগুনে! একটি যে কোনো মৃত্যুকে আমরা কতদিন মনে রাখি! সিষ্টেমেটাইসড মেমোরিতে শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে শুধু আমি এবং শুধুই আমি! সেখানে বাকি সব মায়া!

‘স্বল্প আলোর গল্প কথা’ ছেড়ে বর্তমানে ফিরে আসে অনিলাভ। শরীরে তখনও লেগে থাকে অন্তিমস্মৃতির কুয়াশা। স্বচ্ছ অনুভূতিমালায় কেঁপে কেঁপে ওঠে যেন ও! সামনের বেঞ্চ থেকে পায়রা মুখ ঘাড় ঘুরিয়ে আবার দেখছে ওকে। হাতে রাখা দোমড়ানো কবিতার পাতায় মুখ ঢাকে অনিলাভ!

ওপর থেকে বেশ একটা সুস্থ ভরাট দেখতে দাম্পত্যে খোকা থাকাটা কি ভীষণ প্রয়োজন তাই না! রোহিনীও আসলে ওর কাছে একটা খোকা চেয়েছিল! শুধু একটা ছেলে! ফিকে হয়ে আসা প্রতি শীতেই প্রায় নিয়ম করে ওকে বলতো, “ছেলে হলে দেখো নাম রাখবো রঙ্কিন! ফ্রান্সের উত্তরের একটা শহর! বেশ একটা ঐতিহাসিক স্থান! আবার এটা এক ধরণের অস্ত্র! বুঝলে?” 

অনিলাভ শুধু উত্তেজনা মাখা ওর দুচোখে চেয়ে থাকতো অবান্তর কিছু না বলা সংলাপ আর তার সমান্তরালে বেড়ে চলা অর্ধেক পৃথিবী আর উজাড় হতে বসা বসন্তে ঠিকঠাক শব্দ খুঁজে না পাওয়া একটা হাসির নামান্তর নিয়ে। সুখ এবং আনন্দ ঘেরা নীরব অভিব্যক্তি তখন ধীর লয়ে বয়ে চলেছে সেখানে, ভিনদেশী নদীর মতো! ঠিক যেন এক অলীক অপেক্ষার ল্যান্ডস্কেপ! শীতের শুরুতে হঠাৎ করেই যেমন মনে পরে যায় নতুন আলুর কথা, তারপর আস্তে আস্তে শিম পালং ফুলকপিরা আসে, ঠিক তেমনি করে ঝরে যাওয়া পাতার পরিব্রাজক বিকেলগুলোতে একটা নাম না জানা সুন্দর পাখি এসে বসতো অনিলাভদের বাড়ির উঠোনে। বিকেলের সূর্য্য না ঢলে যাওয়া অবধি মাথা উঁচিয়ে সদর্পে ঘোরাফেরা করে বেড়াত, সারা উঠোনময়! তারপর সেখান থেকে উড়ে গিয়ে বসতো ছাদের ঘরের আলসেতে। দিনদুয়েক আগে বাড়ির বাগানে পথ হারিয়ে ফেলা এক প্রজাপতিকে দেখে হঠাৎ সোলেমান চাচার কথা মনে পরে গেল অনিলাভর। ‘সোলেমান শেখ’, আদতে মুর্শিদাবাদের লোক। পেশায় কাঠমিস্ত্রি। বাড়ি বাড়ি এসে অর্ডার ধরে ফার্নিচার বানিয়ে পেট চালাত। দীর্ঘ্য গ্রীষ্মের দুপুরগুলোয় ওদের একতলার ঘরে বসে ঠকঠক শব্দ করে, নিপুণ চোখ আর হাতের খেলায় আদি অকৃত্রিম এক সুর তুলতো লোকটা। অনিলাভ বুঝতে পারতো আশেপাশের সমস্ত শব্দ যেন চাপা পরে যাচ্ছে সেই সুরের পিছনে এক এক করে। রাস্তার মটকা কুলফি গাড়ির ঘন্টার শব্দ, পাশের বাড়ির চাপাদির ওর প্রেমিকের সাথে একেবারে বাড়ির পাঁচিলে ঘেঁষে এসে শরীর জাপ্টে চুমু খাওয়ার শব্দ, দূরের দেবদারু গাছে বসে একটানা ডেকে চলা কোকিলের করুণ শিস, আসবাব তৈরীর শব্দটা যেন এইসবকিছুকে হারিয়ে নতুন কথার জন্ম দিত বারেবারে! নতুন দৃশ্যের জন্ম হত! আর সেই সাথে বদলে যেত আলোর ভূমিকা! নতুন গল্পের বিন্যাস হত এলেবেলে রকমের দুপুর গুলো জুড়ে! ঠিক দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পরে জন্ম নেওয়া চলচ্চিত্রের মতন, স্মৃতির বাকল মোচন হলেও যার দৃশ্যস্থাপনা কখনো হারিয়ে যায়না পুরাতনের গর্ভে! অনিলাভ দেখেছে ঘাত অপঘাতের ভিড়ে এইরকম এলোমেলো হয়ে যাওয়া দুপুরগুলোয়, জাগতিক তুচ্ছ চাওয়া পাওয়ার হিসেব বুঝি ভুলে যেতে হয়! ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে প্রবল একাকীত্ত্বের বোধ জাগে! বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে! বরাবর সোলেমানকে ও দেখেছে কাজের ফাঁকে মাথায় ফেজ দিয়ে মাটিতে বসে নামাজ পড়তে। “সাকিন কোথায়!” এই প্রশ্নের উত্তরে সে ফোকলা দাঁতে শরমী হাসি তুলে এনে বলতো, “বাংলাদেশ!” দেশ ভিটে ফেলে সে শুধু চলে এসেছে এপারে। আসলে ওর ঔরসজাত খোকারা বড় হয়ে কেউ ওকে আর দেখেনি। ঘাড় থেকে নামিয়ে দিতে চেয়েছে। ঠেলে দিয়েছে বিপদসংকুল দেওয়ালের ওপাশে। সোলেমানরা তবু বাঁচে! আত্মসম্মান নিয়েই বাঁচে! কারো সাহায্যের ধার ধারে না হয়তো! মনে মনে শুধু বিড়বিড় করে, “সেরকম কিছুই তো দ্বীনের আমল করা হল না! না ধরে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারলাম! না দ্বীনের কাজে লাগতে পারলাম!” আজও প্রতিটি গতানুগতিক সকালে, চোঁচোঁ রোদে গড়িয়ে যাওয়া কল্পনার খোলসে ঢুকে, ক্যালাইডোস্কোপের নির্বাক চৌকোনা দেওয়ালে ঘটে চলা, হালকা ঋতুর প্রতিসরণের দিকে তাকিয়ে অনিলাভ স্পষ্ট দেখতে পায়, সেগুন কাঠের বাঁক করা পায়াগুলোকে এক এক করে শূন্যে তুলে নিয়েছে সোলেমান! আরেক হাতে সুতোয় বাঁধা লাট্টুর মত যন্ত্রটাকে ধরে ওলন করছে সেগুলোকে! যেন অভিজ্ঞ হাতে নবজাতককে ধরে আছেন ধাইমা! বাটালির নিখুঁত চলনে তাদের গায়ে এক এক করে এঁকে দিচ্ছে নিজের মনে পুষে রাখা সব রাগ-বিদ্রোহ-আপোষ! সেসময় গোটা ঘর জুড়ে ঘন নিঃশ্বাসের মতো সুনির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য প্রস্থের একটা ছায়া পড়তে দেখেছে অনিলাভ! যেন গেলাস ভর্তি জলে কম বেশী ধুলো বালি ময়লা মাখা ঘুম সব কিছু মিশে এক বিচিত্র তরল তৈরী হয়েছে। সব শিশুর ভেতর যেমন তার পিতা ঘুমিয়ে থাকেন, তেমনি সব পিতার ভেতরেও তার শিশুটি ছটফটিয়ে বাঁচে। লোভ আর সংযমের এই সমান্তরাল পৃথিবীতে নিতান্ত পেশাদারী সম্পর্ক থেকেও ওরাই হয়তো ওর আসল খোকা!

বিয়ের পাঁচ বছর পরেও কেন কোনো সন্তান হলো না ওদের! ডেফিসিটটা ঠিক কোন তরফে ছিল! একটা ভালো ফার্টিলিটি ক্লিনিকে গিয়ে থরো মেডিকেল এক্সামিনেশন, হেলথ চেকআপ এসব করলেই ধরা পরে যেত হয়তো। কিন্তু রোহিনী ওকে কোনোদিন এসব ব্যাপারে ইনসিস্টই করেনি! ভেতরে ভেতরে হয়তো গুমরে গিয়েছে শুধু! বিয়ের প্রথম থেকেই রোহিনী যেন এরকমই! আনন্দ-দুঃখ-দ্বেষ-শোক সব কিছুতেই উপর থেকে ওকে ভীষণ অ্যাপাথাই লাগে! ঠিক যেন জড়ভরতের মতো! কেমন যেন নিস্পন্দ! স্থির! প্রতিক্রিয়াহীন নীরব অভিনয়ের অভিব্যক্তি দিচ্ছে যেন! সেই এক্সপ্রেশনের বিপরীতে কতবার ভেবেছে অনিলাভ, জতুগৃহের ‘শতদল দত্ত’ এর মত এলিট এক্সপ্রেশন দেবে! সুখের গল্পের আবহ কেটে যাবে উষ্ণ স্বাচ্ছন্দ্যহীন ছন্দপতনে! সেই মুহূর্তে উল্টো দিকে একটু কেঁপে উঠবে রোহিনী! ওর স্বাভাবিক ভাবনা স্থবির হবে! অমনি একটা একটা নির্বাক অতিষ্ঠ লাগার অভিনয় করবে অনিলাভ। “তুমি তো জিজ্ঞেস করছো না মাধুরী! তুমি তো কৈফিয়ত চাইছো!” তারপর মুখ জুড়ে পৃথিবীর বুকে ঘটে চলা সমস্ত দুঃখ-অন্যায়-অবিচার এর বোধ এনে নীচের দিকে তাকিয়ে সে বলবে, “দিন দিন তুমি যেন আমার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছ! এর থেকে দুঃখের হয়ত আর কিছুই নেই! আজ অফিস থেকে বেরিয়ে কোথায় গিয়েছিলাম জান? ডাক্তারের কাছে নিজেকে একটু পরীক্ষা করিয়ে নিতে গেছিলাম! না! তবু একটু সিওর হয়ে নিলাম!” রোহিনীর দৃষ্টিতে ভেসে চলেছে তখন বেশ কয়েক বছরের অতীত! যেন কোন শীতের সন্ধের শুরুতে বহু ঘরবাড়ি ঝাউবীথি গাছের মাথা ভার করে দেওয়া কোমল আলো, ওর মুখমন্ডল থেকে বেরিয়ে পরিত্যক্ত কোন লেটার বক্সে গিয়ে রেখে আসছে, দেহ মনে স্ব-শরীরী ভাবে বেড়ে ওঠা এক নৈশব্দের ছিনিমিনি! এমনই একটা মুহূর্তের জন্য যেন যুগ যুগ অপেক্ষা করে থেকেছে অনিলাভ, যখন সামনাসামনি দাঁড়ানো মানুষ দুটো বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় যে দৃশ্যটাতে আর অবিশ্বাসের কিছু নেই! কিন্তু এতো গেল পরাবাস্তবের কথা! বাস্তবে কি আদৌ নিজেকে ডাক্তারি পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাতে চেয়েছিল কোনোদিন অনিলাভ! পারতো ও ওই চার দেওয়ালের পর্দার মধ্যে নরম কোমল শহুরে শীত লেগে থাকা সাদা চাদরে শুয়ে নিজের যৌন সক্ষমতার পরিচয় দিতে?

রোহিনী যেদিন প্রথম ওকে বলল যে ও প্রেগনেন্ট এবং সে বাচ্চার বাবা কখনোই অনিলাভ নয়, সেদিন একটুও অবাক হয়নি অনিলাভ। শুধু নিজের মৌনমুখর অন্তর্দেশে অনেকখানি একা হয়ে গেছিল! যেন শান্ত, স্থিরভাবে নিজেকে জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া! সেটা সত্যি সাধনার বিষয়! আসলে নিজের মত করে ভালো থাকার অধিকার তো সকলের আছে। ছোটবেলার সেই খ্যাপাটে আইনদাদুর কথা মনে পরে গেছিল ওর! কথায় কথায় যে শুধু আইনের ধারা আওড়াত! “এই নাও দিলুম তোমায় একটা ফৌজদারী ৪০৭, ৩২৫! সাথে ৩০৭ টাও জুড়ে দিলাম! হুঁহুঁ বাবা নন বেলেবেল! ওহ বটে! এতেও খুশি নও! দাড়াও! তোমায় সাথে করে ২৮৪ টাও দিলাম! হুমম এটা পেটি কেস হয়ে গেলো বটে! আচ্ছা রোশ ভেবে দেখি! আর কি কি ধারায় তোমায় টাইট দেওয়া যায়!”

আদ্যন্ত মানসিক ভারসাম্যহীন একটা মানুষ! যিনি নিজের জীবনের অর্ধেকটাই কাটিয়ে দিয়েছেন, বিভিন্ন মানুষ বা গোষ্ঠীর সাথে মামলা লড়ে! তবে কি ভেতরে ভেতরে রোহিণীর কাছে একটা ফলস ৪৯৮ কিংবা ডোমেস্টিক ভাওলেন্সের কেস খাওয়ার ভয় পেয়েছিল অনিলাভ?

আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এই যে স্থূলদেহী সম্পাদিকা, উপস্থিত সবাই যাঁকে নিয়ে তটস্থ প্রায়, নতুন কবিতার পান্ডুলিপিটা নিয়ে এ দোরে ও দোরে ঘুরতে ঘুরতে এক সন্ধ্যেয় এঁর কাছেও পৌঁছেছিল অনিলাভ। একটা দুটো করে কবিতা পড়তে পড়তে প্রায় একটা গোটা রাত কাবার করে ফেলেছিল। মহিলার বৌবাজার স্ট্রিটের বাড়ির দোতলার বসার ঘরে তখন শুধু তিনি, অনিলাভ আর তিলতিল করে ক্ষয়ে চলা মোমবাতিটা! কবিতাগুলোর গা থেকে যেন আলাদা আলাদা গন্ধ বেরোচ্ছিল সেদিন! তেমনি একটা যোগিনী রঙের সুগন্ধ যেন ঘিরে ধরেছিল মিসেস মজুমদারকেও! উথলে পড়া শরীর, ভরাট মুখ, দুচোখে মায়া কাজলের গুলমোহর! সেই সাথে এই গন্ধগুলো মিশে গিয়ে একটা উদার এবং বিস্তৃত গল্প, যেন এক রাশ নীরবতা হয়ে জমা হচ্ছিল চারপাশের অদৃশ্য ক্যানভাসে! অনিলাভর হাতদুটো ধরে এই মিসেস মজুমদার মুখে ঠিক বাদামী রঙের একাডেমীক একটা ভনিতা এনে বলেছিলেন, “আজ থেকে কবিতাগুলো শুধু আমার! তোমার কবিতারা আমার সন্তান হয়ে বেঁচে থাক!”

ভদ্রমহিলার দুচোখে তখন আগুন আগুন মাদকতা! দুচোখের পাতা ক্রমে ভারী হয়ে আসছে! মোটা চশমার আড়াল থেকে চোখদুটোকে অস্বাভাবিক ছোট লাগছে যেন! চঞ্চল! অস্থির! অথচ গতি নেই সেই দুটো চোখে কি ভীষণ প্রেম দেখেছিল অনিলাভ সেদিন! শুধু প্রেম নয়! হয়তো সে চোখে তখন বাসা বেঁধেছিল নীরব, বাকহীন, নির্লজ্জ্ব কামনা! হয়তো বা সমষ্টির বিপরীতে গিয়ে অচেনা প্রাণের কোন অনুসন্ধান! ভদ্রমহিলা একটু একটু করে ওর দিকে এগিয়ে এসে ঠোঁটে ঠোঁট পুড়ে দিতে চেয়েছিলেন। একটা নির্লিপ্ত চুমু! অনিলাভ আপত্তি করেনি। তবে এ চুম্বন কেমন যেন সুচারু, শুষ্ক, বিকল এক পথযাত্রার মতো! কতটা এগোবে, কতটা পিছোবে, কোথায় থামবে, সবই যেন পূর্ব নির্ধারিত! এমন একটা স্পর্শ হয়তো অনিলাভ চায়নি ঠিক! যেমন চুমু ওকে রোহিনী খেতে চেয়েছিল ফুলশয্যার রাতে, ঠিক যেমন একটা চুমু খেতে ও দেখে ফেলেছিল ও ওর মা বাবাকে, এতো ঠিক সেরকম নয়! শুধু কবিতা শুনেই এতো নিবিড়তা! ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না অনিলাভ। ভদ্রমহিলার শরীরের মেদবর্তীকায় এখন ইচ্ছে করলেই আঙ্গুল চালাতে পারে অনিলাভ। মহিলার শরীরের সুউচ্চ বিশেষ আকর্ষণীয় অংশগুলো এখন ওর পুরো নাগালের ভিতরে। তবু সেখানে হাত দিতে কোথাও যেন একটা কুন্ঠা হচ্ছিল অনিলাভর। আসলে প্রতিটি মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, পছন্দ-অপছন্দের নিজস্ব কিছু প্যারামিটার থাকে বোধহয়! যার কোনো নির্দিষ্ট যৌক্তিকতা নেই! মানুষ হয়তো অযৌক্তিক ভাবেই ভালোবাসে, বিশ্বাস করে, পছন্দ-অপছন্দ তৈরী হয়! মানুষ রেগে যায়! বিশ্বাস করে! দুঃখ পায়! হেসে ফেলে! কথায় কথায় ভদ্রমহিলা বলেছিলেন ওঁর স্বামীর সাথে এখন ওঁর ডিভোর্স কেস চলছে। আজ সাত বছর ওরা কমপ্লিট সেপারেশনে।

আর কয়েকদিনের মধ্যে মিসেস মজুমদারের প্রকাশনী থেকে অনিলাভ চ্যাটার্জীর নতুন কবিতার বই বেরোবে। খুব শিগগির বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে ফেসবুকে। তারপর দেশ, কৃত্তিবাস সহ অন্যান্য প্রথম সারির বাণিজ্যিক পত্রিকায়। এই আশ্বাস নিয়ে সেদিন বেরিয়েছিল অনিলাভ, মিসেস মজুমদারের বাড়ি কাম প্রকাশনীর অফিস থেকে। আজ প্রায় ছ মাস হয়ে গেল, ‘কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখে না!’ নীলাভকে হঠাৎই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক করে দিয়েছেন মিসেস মজুমদার। ফোন নম্বর, হোয়াটস অ্যাপ তো ব্লক করেছেন সেই কোন কালে! সেই রাতের পর কি হলো কে জানে! অনিলাভর জীবন থেকে মহিলা বিলকুল ভ্যানিশ হয়ে গেলেন! কবিতাগুলো কি ওর এতোই পছন্দ হয়েছিল যে, সেগুলোকে না ছাপিয়ে নিজের করে রেখে দিতে চেয়েছিলেন! নাকি...

আর কিছুক্ষনের মধ্যে অনিলাভর নাম ডাকা হবে মঞ্চে! কবিতা পড়বে ও! কবিতা পড়া হয়ে গেলে ওই কমবয়সী আধুনিক কবি মধুমিতা ওর গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দেবেন, হাতে তুলেদেবেন সম্মাননা সনদ। মঞ্চে বসে মিসেস মজুমদার একটু বেশীই উসখুস করছেন না এখন!? দূর থেকে অনিলাভকে ভিড়ের মধ্যে দেখতে পেয়েছেন কি! মুখের সামনে আয়না ধরলে চোখ যদি চোখের ওপর দৃষ্টি স্থির করতে না পারে, কথা ভেঙে যায়, বাক্য জড়িয়ে যায়, আর ঠিক সেইসময় যদি কেউ একটা মিথ্যুক রকমের ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ বলে চিৎকার করে ওঠে, তবে মন মাথায় যেরকম একটা চাপা রকমের অস্থিরতা পেয়ে বসে, ঠিক সেরকম রেখাচিত্র যেন ফুটে উঠছে ভদ্রমহিলার এলোমেলো হয়ে যাওয়া মুখশ্রী জুড়ে! এই দুপুরের কাঁচা হলুদ রং যেন ফোঁটা ফোঁটা জড়ো হচ্ছে সেখানে! ইদানীঙ অনিলাভর মনে ‘গুরু’র সাথে আত্মীয়তা যেন বেড়েই চলেছে বহুমাত্রায়! গুরুর ছবির ওপর অস্থির আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে অনিলাভ ঠিক বুঝতে পারে তাঁর সুঠাম বুকে চেপে রাখা কষ্ট যন্ত্রণাগুলো ফিসফিসিয়ে যেন ওর সাথে ইকিড় মিকিড় খেলছে! আসলে এপারে তাকালে ওরা নিজেদেরই তো দেখে! গত পরশুদিন ভোরে ও স্পষ্ট শুনেছে টেলিফোনের ওপারে গুরুর গলা, “খোকাকে আমি ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি। এখন প্রয়োজন শুধু আরো কিছু টাকা!” অনিলাভ জানে উত্তমকুমার অসম্ভব ভালোবাসতেন নিজ পুত্র গৌতমকে! সিনেমার পর্দায় মহানায়ক হয়ে ওঠার পরও পদস্খলনের যে দুশ্চিন্তা তাঁকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে দিনের পর দিন, তার কোন আঁচ কোনদিন নিজের ছেলের পর আসতে দেবেন না বলে, বিবেকানন্দ রোড আর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের মোড়ে তখনকার কলকাতার টপ মাস্তান ‘ফাটাকেষ্ট’র সাহচর্য্যে গৌতমকে ওষুধের দোকান করে দিয়েছিলেন। ঠিক এইরকম একটা স্বচ্ছল আশ্রয় হয়তো ওর লেখা কবিতাগুলোরও দরকার ছিল! কিন্তু অনিলাভ ওদের পেছনে কখনও টাকা খরচ করতে চায়নি! জন্মদিয়েই খালাস হয়েছে শুধু!

কালচক্রের মন্ত্রগুপ্তির দাপট এড়িয়ে এই গোলাকার পৃথিবীর এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘরের দেওয়ালগুলো ক্রমশঃ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে! শ্বাস নেয়! পরস্পরের দিকে তাকায়! চোখে চোখ রাখে! যে শরীর এই আবহাওয়ায় কোথাও নেই সে শরীর এই ঘরের কোন না কোন কোনা থেকে হঠাৎ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে! এই যেমন ওর আইনদাদু! ইট-সিমেন্ট-বালির দেহ ধরে সদ্য প্লাস্টার করা দেওয়ালের মাঝে উড়ে এসে জুড়ে বসে বলতে থাকেন, “এইবারে দাওতো একটা ৩০২! সাথে দিয়ে দাও আই.পি.সি. ৩৮০ ধারা! বুনো ফুলের গন্ধ, পচা পাতার গন্ধ, ভিনদেশী জ্বর গায়ের ঘামের গন্ধ, মৃত কবিতার গন্ধ, এইসব কিছুকে ছাপিয়ে এজলাসের সেই পুরোনো দস্তাবেজের সাংকেতিক গন্ধটা ভেসে আসতে থাকে ঘরের ভিতর! এই সময়টাতে দাঁড়িয়ে ঘরটা বড় বেশী করে ভার্চুয়াল কোর্টরুমের মত দেখতে হয়ে যায়! ভালোবাসার মালিন্য ধুয়ে মুছে দিয়ে, সেখানে সম্পর্কের ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট’ হয়! মঞ্চের দিকে আর না তাকিয়ে হুড়মুড় হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে, বাইরে বেরিয়ে আসে অনিলাভ। বইয়ের আঁতুড়ঘরে তখন সারিবদ্ধ ব্যবসায়ী শ্রেণীর গুমটিগুলো, যেন সংসার ভাবনার মিনার তুলেছে। ‘দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া!’ দেখার দৃষ্টি সত্য হতেও পারে আবার নাও পারে, এরকম একটা মানসিক দ্বন্দ্ব তুলে সেই লম্বা মুখ, ছিপছিপে চেহারার লোকটা দাঁড়িয়ে আছে দূরে! এই সময়ে দাঁড়িয়ে কোন পুরোনো সম্পর্কের প্রতি আর খেদ জন্মায়না অনিলাভর! শুধু ভেঙে যাওয়া সময়ের খণ্ডচিত্রগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে, সাইকেল চালাতে চালাতে, ভয়ানক যান্ত্রিক নিষাদ তুলে ‘উদাস কোটাল’ গেয়ে যায়,

‘আমার মনটা টানে ঘরের পানে, কোথায় আমার ঘর!

যদি মন ঘরামী বাঁধে সে ঘর, আশার খুঁটি দিয়া।

ভাগ্য যে হয় ঝড়! আমার ভাগ্য যে হয় ঝড়!’

ব্যাকড্রপে রিয়ার প্রোজেকশনে সরে সরে যায় সংসারের সব গিলি গিলি, হোকাস ফোকাস ক্ষণস্থায়ী সত্য! প্রতিটি বিয়ের মরসুমে শহর জুড়ে এই যে এত আলো, কাল পেরোলেই সব খসে পরে পুরোনো ক্যালেন্ডারের পাতার মতন! ফ্যামিলি কোর্টরুমের অন্ধকার ব্ল্যাকহোল হয়ে শুষে নেয় জীবনের সব বাঁধাধরা রূপকথাকে! কাঁধের ঝোলা থেকে পান্ডুলিপিটা বার করে শূন্যের দিকে ছুড়ে দেয় অনিলাভ! পুরো পাড়াটার বুক পেট জুড়ে এখন শুধু বেনামী শব্দ উড়ছে! ঠিক যেমন একটা সঠিক শুক্রাণু, চোরাগোপ্তা ঘোরাফেরা করে ওভামের চারপাশে, সঠিক নিষেকের অপেক্ষায়! ঠিক তখনই হয়তো প্যারামাউন্টের বিশাল শিংওয়ালা ট্যাক্সিডার্মির তলায় বসে, স্লিভলেস প্রেমিকাটি নতুন পটানো ক্লাস মেটের ঘাড় ভাঙছে! আঙ্গুল, হাতে, কাঁধে, উষ্ণ সোহাগী ঠোঁটের ছোঁয়া লাগিয়ে! ফাঁকা রাস্তা জুড়ে রাজত্ত্ব করা খালি বইয়ের ট্রলিভ্যান চালকের মুখে, তখন মহাজাগতিক খিস্তির বিস্ফোরণ! পার্কের ভেতরের লেকের জল, তখন আগামী শীতকালের কথা ভেবে যেন অস্বাভাবিক রকমের চুপ মেরে গেছে! কিছু উঠতি সাঁতারু সে জলে বেশ কিছুটা দাপিয়ে ফেনা তুলতে চাইছে বটে, কিন্তু বিগত লিপির অলস মুহূর্ত মেশা সেই জলস্তরে এখনো গত দীপাবলীর লালচে নীলচে রংমশাল আর ঈশ্বরের চোখে গেঁথে যাওয়া কিছু মানুষের নিবিড় মুহূর্ত কথা, খাবি খেয়ে বেড়াচ্ছে! এই তো সেদিন শহরের ঐতিহ্যমন্ডিত কোন পুজো প্রতিমার ভাসান হয়েছে এই জলে! দূরে ইন্সটিউট হল থেকে ভেসে আসছে গমগমে জ্ঞান প্রসবের ঢং ঢং ঘন্টাধ্বনি! অলীক পরাবাস্তব লিপির মতো অর্ধেক জীবনের গল্প বলা কবিতার পাতারা, নীরব অবহেলায় উড়ে চলে যাচ্ছে নতুন কাহিনীর খোঁজে! অর্ধেক জীবনই তো লেখা হয়নি ওতে! আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে অনিলাভ ভাবে, ওরা কেউ ওর সন্তান নয়! ওর মন মাথা বা যৌনাঙ্গ থেকে ওদের জন্ম হয়নি! বাকিদের দেখাদেখি শুধু লিখেই গেছে ও, সন্তান জন্ম দেবার ক্ষমতাই হয়তো ওর নেই! ওর লেখা কবিতায়, ওর নিজের মেধা-ভাবনা-কথারা, গণিত হয়ে, জীবনের নিটোল ভাস্কর্য্য হয়ে, কোন সুস্থ মানবীর পরিপূর্ণ শরীর হয়ে, স্মৃতিগদ্যে ফিরে আসেনি, ইনহেরিটেন্সের জৈব নিয়ম মেনে! তাহলে! ওরা তো বোঝেইনি ভালোবাসা কাকে বলে! হাতের মুঠো ভরা সুখের বাগধারা আওড়াতে আওড়াতে, স্কুলের সিমেন্ট করা মেঝের ওপর খাড়া নাইন্টি ডিগ্রিতে উলম্বভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, হাই বেঞ্চটার মাথা থেকে লাফ দিয়ে এসে বিলি বাউডেনের মতো করে হাত নেড়ে থার্ড আম্পায়ার দেখায় নীলাব্জ। যেমনটা ও দেখাত বরাবর। কেমন আছে ওরা? ধূসর অপেক্ষা মোড়া ছবির ওপার থেকে এখন ওদের দাম্পত্য সুখ উপভোগ করে অনিলাভ! সুপ্রতীমের বউ হয়তো খুব ঘরোয়া, ভাল রান্না করে, এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে সুখের জীবন ওদের। অয়নাংশুর বৌ হয়তো চাকরি করে। চাকরি করা নিয়ে কি যেন মনোমালিন্য ওদের ভেতর! নীলাব্জ তো বরাবরই খ্যাপা! কোন সে পোড়া কপালি ওর ভাগ্যে জুটলো কে জানে! আলগোছে কিছু গুরুত্ত্বহীন ভাবনারা এখন যেন অনেক গভীর ছাপ ফেলে যায় অনিলাভর ভেতরে জীবনে। বিচিত্র ধরণের কত ভাবনার উৎপত্তি হল, কতরকম মানুষের সান্নিধ্যে এসে, কখনো কাউকে মনে হলো, পুরোটা বুঝেছি! পরক্ষণেই বোঝা গেল হয়তো, কিছুই বুঝিনি! ভাবতে গিয়ে মাথাটা সম্পূর্ণ গুলিয়ে যায় অনিলাভর! চোখের সামনে ভেসে ওঠে, নায়ক ছবির সেই আইকনিক দৃশ্য! অরিন্দম মুখার্জী বুকের গভীরে গজিয়ে ওঠা মাধুর্য্যহীন ভালো-না থাকাগুলোকে, কোন প্রলম্বিত চন্দ্রভূক অমাবস্যার প্রকোপে ঢাকা পরে যাওয়া শুক্লা দ্বাদশীর জ্যোৎস্নার রঙের পুরু মেক আপের আড়ালে ঢেকে ফেলে, বেশ একটা অব্জেক্টিফাইং ভঙ্গিতে নায়িকার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন সেই আলোড়ন ফেলে দেওয়া প্রশ্ন, “কি বুঝলেন!” তার পরেই একটা গভীর ক্লোজ আপ, চোখে ক্লান্তি, সর্বাঙ্গে নিখুঁত মাতলামির অভিনয় আর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি, “কিস্যু বোঝেননি!”



No comments:

Post a Comment