![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা চিন্তা
বিপুল কুমার মৈত্র
স্বামীজীর শিক্ষা চিন্তা পর্যালোচনা করতে গেলে তাঁর সামাজিক ধ্যান ধারণার ভিত্তিতেই করতে হয়।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা - যাকে পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থাই বলা চলে- বেশি দিনের পুরানো নয়। এ ব্যবস্থার গোড়ার দিকে শিক্ষকের ভূমিকা ছিল প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয়তা ও সামর্থ্য নির্ধারণ করে তাকে ভবিষ্যৎ জীবনের উপযোগী করে তোলা।
তবে একই ব্যবস্থা ভুক্ত বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে সকলের একই ধরনের বোধোদয়ের প্রচেষ্টার সূত্রপাত মধ্যযুগের শেষভাগে কিমিয়াশাস্ত্রের ( alchemy) মধ্যেই নিহিত। এবং এই ব্যবস্থার পথিকৃৎ হিসেবে সতেরো শতকের মারইভিয়ার বিশপ জন অ্যামোস কামেনিয়াসের নামোল্লেখ করতে হয়। তিনি তাঁর " Magna Didactica " -য় কীভাবে শেখানো উচিত তা বিশদে আলোচনা করেন।তিনিই প্রথম শিক্ষার্থীর শিখনকালকে ৪ টি পর্যায়ে বিভক্ত করেন।০-৬ বছর, ৬-১২ বছর, ১২-১৮ বছর এবং ১৮-২৪ বছর। কামেনিয়াস চেয়েছিলেন শিক্ষার মাধ্যম মানুষের সত্তার উদগতি ঘটিয়ে তাকে উন্নত করতে।
কামেনিয়াস তাঁর লক্ষ্য সাধনে পরিপূর্ণ সমর্থ না হলেও শিল্পবিপ্লব এক অদৃশ্য নতুন পণ্যের উদ্ভাবন সম্ভব করে। এরই নাম জনশিক্ষা- mass education। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল বৈজ্ঞানিক ভাবনা দ্বারা নব মানবগোষ্ঠী গড়ে তোলা। কিন্তু প্রয়োগ ও প্রক্রিয়া কারণে এই শিক্ষা ব্যবস্থায় সমাজের মূল্যবোধ- যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কবলিত হয়ে মানুষকে দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করল। জীবনবোধের প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমেই এই শৃঙ্খল ছিন্ন করা সম্ভব।
স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা চিন্তা এই উদ্দেশ্যের অভিমুখেই প্রসারিত।
পশ্চাৎপট :- এই সামাজিক ধ্যান ধারণার মধ্যে তাঁর বর্ণচক্রতত্ত্ব সর্বাগ্রে উল্লেখ্য। স্বামীজীর ' Theory of Cycles' অনুসারে, "... এই জগৎ তরঙ্গায়িত চক্রাকারে চলিতেছে। তরঙ্গ একবার উঠিল, সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছিল, তারপর পড়িল, কিছুকালের জন্য যেন কোনো গহ্বরে পড়িয়া রহিল, আবার প্রবল তরঙ্গাকার ধারণ করিয়া উঠিবে।
এইরূপে তরঙ্গের উত্থানের পর উত্থান ও পতনের পর পতন চলিতে থাকিবে। সমগ্র ব্রক্ষ্মান্ড বা সমষ্টি সম্বন্ধে যাহা সত্য, উহার প্রত্যেক অংশ বা ব্যষ্টি সম্বন্ধেও তাহা সত্য। মনুষ্য সমাজের সকল ব্যাপার এইরূপে তরঙ্গ গতিতেই চলিতে থাকে, বিভিন্ন জাতির ইতিহাসও এই সত্যেরই সাক্ষ্য দিয়া থাকে।
মানব জীবনে এই চিরন্তন চক্র চার অঙ্কের এক নাটক সৃষ্টি করে। এই চার অঙ্ক হল - ব্রাক্ষ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।
" প্রথম পর্যায়ে সমাজ নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয় ব্রাক্ষ্মণ দ্বারা। ব্রাক্ষ্মণ আদর্শ চ্যুত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষত্রিয় শাসন। আবার ক্ষাত্র ধর্ম চ্যুত ক্ষত্রিয় দের অপসারণ করে তাদের স্থানাধিকার করে বৈশ্যগণ। বৈশ্য শাসন শোষণেরই নামান্তর। সুতরাং একদিন এরও ঘটে অবসান। তবেই সমগ্র সমাজে প্রবর্তিত হয় শূদ্র বর্ণের আধিপত্য। "
এই সমাজ বিবর্তন নাটকের শেষ অঙ্ক এখনও অবশ্য অভিনীত হয়নি। তবে স্বামী বিবেকানন্দ এর এমন চিত্র বর্ণনা করেছেন যেন তিনি এর শেষ মহড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
স্বামীজী এর মধ্য দিয়ে দেখেছেন সমাজ বিবর্তনের ধারা - যে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমাজ বিকশিত হয়ে উঠে। স্বামীজী চেয়েছিলেন পরম উদ্দেশ্য মূলক ( Telcogical process) পদ্ধতি কে ত্বরান্বিত করা যাতে সমাজ এই মুক্তি মন্ত্রের সন্ধান পায়।
সমাজসংস্কার ও শিক্ষা :-
স্বামীজী প্রধানত সমাজ সংস্কারের উপর জোর দিয়েছিলেন। ' সংস্কার ' বলতে স্বামীজী ভিতর থেকে সম্প্রসারণের কথা বলেছিলেন, উপরে উপরে কিছু রদবদল নয়।
সামগ্রিকভাবে এই সংস্কারকার্য শিক্ষা ব্যবস্থার উপরিই নির্ভরশীল। শিক্ষা এবং ধর্মের সমন্বয় করে স্বামীজী বর্ণনা দিয়েছেন :- " শিক্ষা হচ্ছে, মানুষের ভিতর যে পূর্ণতা প্রথম থেকেই বিদ্যমান, তারই প্রকাশ।"
"ধর্ম হচ্ছে, মানুষের ভিতর যে ব্রক্ষ্মত্ব প্রথম থেকেই বিদ্যমান, তারই প্রকাশ। "
কিন্তু স্বামীজী সুস্পষ্টভাবেই বুঝেছিলেন যে, শিক্ষার এই ধারণা জনসাধারণ ঠিক উপলব্ধি করতে পারবেনা।
এই কারণে স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষার একটি সংজ্ঞাই নির্দেশ করেছেন :- " যে অনুশীলন দ্বারা ইচ্ছাশক্তির প্রবাহ ও অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রণাধিনে আসে ও ফলপ্রসূ হয় তাকেই বলা হয় শিক্ষা। "
স্বামীজীর শিক্ষার এই সংজ্ঞা থেকে কতগুলি উপাদানের সন্ধান পাওয়া যায়।
প্রথমত, শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে থাকা সুপ্ত ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ ঘটানো, যার মধ্য দিয়ে মানুষ গড়ে উঠবে। ধর্মের উদ্দেশ্যও একই।
দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাশক্তির প্রবাহ ও অভিব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষা হল অনুশীলন, যার দ্বারা মানুষের অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী - উভয় প্রকৃতিরই সমন্বয়সাধন সম্ভব।
এ বিষয়ে স্বামীজীর একটি বক্তব্য উল্লেখ্য : " যে বিদ্যার উন্মেষে ইতর- সাধারণ কে জীবনসংগ্রামে সমর্থ করতে পারা যায় না যাতে মানুষের চরিত্রবল, পরার্থতৎপরতা, সিংহ সাহসিকতা এনে দেয় না, সে কি আবার শিক্ষা? "
কিন্তু ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে এই চূড়ান্ত সমন্বয়সাধন স্বামীজীর কাছে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়নি। তাই তিনি 'জনশিক্ষা ' - কেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর সমর্থনে একখানি পত্রে তিনি লিখেছিলেন, " যে জাতির মধ্যে জনসাধারণের ভিতর বিদ্যাবুদ্ধি যত্ন পরিমাণে প্রচারিত, সে জাতি তত পরিমাণে উন্নত।
ভারতবর্ষের যে সর্বনাশ হইয়াছে, তাহার মূল কারণ এটি - রাজশাসন ও দন্তবলে দেশের সমগ্র বিদ্যাবুদ্ধি এক মুষ্টিমেয় লোকের মধ্যে আবদ্ধ করা। যদি পুনরায় আমাদিগকে উঠিতে হয়, তাহা হইলে ঐ পথ ধরিয়া অর্থাৎ সাধারণের মধ্যে বিদ্যার প্রচার করিয়া। "
শিক্ষার উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি :-
স্বামীজীর মতে প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য হল মানুষ গড়া। তাঁর মতে তাই " যে শিক্ষা আমাদের পক্ষে প্রয়োজনীয় তা মানুষ-গঠনকারী, চরিত্র-গঠনকারী, ধ্যান ধারণার সমন্বয় না হয়ে পারে না। "
গ্রীকদের আদর্শ ছিল, " সুন্দর দেহাভ্যন্তরে একটি সুন্দর মন। "
স্বামী বিবেকানন্দ এর সঙ্গে একটি তৃতীয় উপাদান- মানুষের আত্মা যোগ করেছেন এবং তাঁর পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থায় তাকেই প্রাইমেসি প্রদান করেছেন।
এরফলে একটি ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টির সুযোগ থাকছে যে, আধ্যাত্মিক সম্প্রসারণ স্বামীজীর কল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য।
কিন্তু স্বামীজীর অন্তরে সর্বদাই কাজ করত যে বুভুক্ষু মানুষকে ধর্ম শিক্ষা দেওয়া তাদের অপমান করারই সামিল। স্বামীজীকে যে চিন্তাটি বিশেষভাবে আচ্ছন্ন করেছিল তা হল কী করে মানুষের মধ্যে অন্ন সংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান বিতরণ করা যায়। "
এরজন্য প্রয়োজন- man making education। মানুষ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে গড়ে উঠলে তার মধ্যে সমাজ চেতনা দানা বাঁধতে বাধ্য।
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাবান। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এর মাধ্যমে সমাজের material base শক্ত করে গেঁথে ' অভাব থেকে মুক্তি '-র ব্যবস্থা করা সম্ভব।
সুতরাং, চিন্তনের ক্ষেত্রে স্বামীজী নির্দেশিত শিক্ষা ব্যবস্থায়, বিজ্ঞানের স্থান ধর্মেরও ঊর্ধ্বে। কারণ উদরপূর্তি হলেই তবে ধর্ম সাধনের কথা চিন্তা করা যেতে পারে।
কিন্তু খাদ্যাভাব মেটার পরই মানুষের মননে ভোগবাসনা সৃষ্টি হতে পারে।
এই জন্যই তিনি আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
পরিশেষে শিক্ষা সম্বন্ধে স্বামীজীর নির্দেশ হল: " প্রকৃতি থেকেই শিক্ষা লাভ কর। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ফলে এই পরিদৃশ্যমান জগতের পশ্চাতে পশ্চাতে চিরন্তন সত্তার সঙ্গে সাক্ষাৎকার সম্ভব হয়। "
স্বামীজীর মতে, এই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা।
তাঁর এই বক্তব্য থেকে সহজেই অনুমেয় বিদ্যায়তন সমূহের পারিপার্শ্বিক কাঠামো গঠনের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন, যা এখনও সমানভাবে প্রযোজ্য।
শিক্ষার বাহন :- স্বামীজী মাতৃভাষাকেই জনশিক্ষার বাহন বলেছেন। তবে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার অনুশীলনের জন্য ইংরেজি ভাষা চর্চার সুপারিশ করেছিলেন। আবার আমাদের প্রাচীন গ্রন্থভুক্ত বিষয়গুলিকে আয়ত্ত করার জন্য তিনি সংস্কৃত শিক্ষারও নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, " সংস্কৃত শব্দের ঝঙ্কারই জাতিকে মর্যাদা ও শক্তি সামর্থ্য প্রদান করবে। "
" ত্রি-ভাষা সূত্র " - এর নির্দেশ কার্যত স্বামীজী তাঁর শিক্ষা ভাবনার মধ্যে এভাবে রেখেছেন।
নারীশিক্ষা:- নারীশিক্ষা ব্যবস্থায় স্বামীজী পুরুষ দের থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র পথের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়-
প্রথমত, নারীকুলের সমস্যা অনেকটা ভিন্ন প্রকৃতির।
দ্বিতীয়ত, গৃহস্থালীর উৎকর্ষ বহু পরিমাণে নারীদের উপর নির্ভরশীল।
সমাজে নারীদের সমস্যা সমাধানে ' স্বাবলম্বন ও পারস্পরিক সহায়তা '( self help and mutual aid) একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এরজন্য নারীদের পক্ষে যা প্রয়োজন তা হল নারীকে নারী করে গড়ার শিক্ষা, যে শিক্ষা তাদের মধ্যে নির্ভীকতা এবং স্বাবলম্বনের ভাব গড়ে তুলবে।
স্বামীজী অনুভব করেছিলেন সুশৃঙ্খলিত গৃহস্থালীর পক্ষে এর উপর আরও কিছু প্রয়োজন। সুতরাং, তিনি শিক্ষা সূচির তালিকায় যোগ করেছেন রন্ধনবিদ্যা, সূচী শিল্প, গাহর্স্থ্য বিজ্ঞান ইত্যাদি।
এই প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে স্ত্রীশিক্ষা সম্বন্ধে স্বামীজীর এই সকল নির্দেশ যখন ঘোষিত হয়েছিল, তারপূর্বে বা তখনও গাহর্স্থ্য বিজ্ঞান নারীশিক্ষার বিশেষ পাঠক্রমভুক্ত হয়নি।
মূল্যায়ণ :- স্বামীজী পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে পক্ষে বা বিপক্ষে অনেক কথা বলার পরিসর নিশ্চিতভাবেই আছে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে স্বামীজী তাঁর পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা শুরু থেকেই বিশ্বজনীন ভাবে প্রবর্তনের সুপারিশ করেননি।
তিনি যা চেয়েছিলেন তা হল পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক সৃষ্টি করতে, যে শিক্ষক - সমাজ সম্প্রসারণ- সেবার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিমাণে সামাজিক শিক্ষার প্রসার সম্ভব করবেন।
সুতরাং ভগিনী ক্রিস্টিন যথার্থই উক্তি করেছেন যে, স্বামীজী পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা হল নতুন সমাজের জন্য নতুন শিক্ষক গোষ্ঠী সৃষ্টির প্রচেষ্টা মাত্র।
স্বামীজী আশা পোষণ করতেন যে, একবার আন্দোলনের সূচনা করা সম্ভব হলে তার পরবর্তী পর্যায় সমূহের কাজ আপনা থেকেই সম্পাদিত হবে।
এ হল আদর্শের উদ্ভবে বিশ্বাস।
সূত্র:- স্বামীজীর বানী ও রচনা।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment