![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
সৌরি ঘটকের শেষ কয়েকটি গল্প : সৃষ্টি ও সংগ্রাম
স্বপন পাঁজা
জীবনের শেষ আটবছর সৌরি ঘটক রিষড়ায় কাটিয়েছেন। তাঁর শেষ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে "রিষড়া সমাচার" পত্রিকার ১৪০৩ বঙ্গাব্দের শারদ-সাহিত্য সংকলনে, শিরোনাম : স্বাধীনতার অর্ধ-শতবর্ষ ও সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম-শতবর্ষ। তাঁর শেষ গল্পটি একই বছরে প্রকাশিত হয়েছে শ্রীরামপুরের 'ঐক্যতান' পত্রিকার শারদ সংখ্যায়।
'রিষড়া সমাচার' প্রথমে 'রিষড়া দর্পণ' নামে প্রকাশিত হয় ১৩৯৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখে। প্রথম থেকেই আমৃত্যু সৌরি ঘটক এই পত্রিকায় সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন।
'রিষড়া দর্পণ'-এর ১৩৯৯ বঙ্গাব্দে প্রথম শারদ-সাহিত্য সংকলনে সৌরি ঘটক একটি অসামান্য ছোটগল্প লেখেন, শিরোনাম : সংগ্রাম। গল্পটির বিষয় :
একটি গ্রামের পাশের নদীর বাঁধে ভাদ্র মাসের বর্ষায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ঝড়-বাদল উপেক্ষা করে গ্রামের সমস্ত হিন্দু মুসলমান গরীব মানুষেরা সারাদিন অভুক্ত থেকেও কঠোর পরিশ্রম করে নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করল, যুদ্ধে জিতল। সারাটা দিন এই অক্লান্ত কর্মকাণ্ডের মধ্যে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল গ্রামীণ সাম্প্রদায়িকতা, রোপিত হল গরীব মানুষদের মধ্যে সংহতির বীজ। ঘটনার বর্ণনা অসামান্য। গরীব মানুষের টুকরো টুকরো কথাবার্তায় গ্রামীণ জীবনের স্পন্দন। 'ভিজে মাটির বস্তা আনতে কেউ পা হড়কে পড়ে গেলে ভোলা শেখ তাকে গালাগাল দিচ্ছে : বাঁদির পুতের নবাবের মত গতর, এক বস্তা মাটি আনতে চারবার পা হড়কাল ছে।' ওধারে চাষি পাড়ার কানাই মোড়ল তার বেঁটে গোল শরীরটা নিয়ে দু'হাত দুলিয়ে লাফাচ্ছে আর চিৎকার করছে : 'মাজায় বল নেই রে শালারা। এ কি শ্বশুর বাড়ির ভোজ খাচ্ছিস না কি বাঁধ আটকাচ্ছিস?'
রাঢ় বাংলার গল্পে একেবারে রাঢ় বাংলারই ভাষা। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের যে সংগ্রাম সেই অতীতে শুরু হয়েছে, তারই এক অন্যেতর অনুবৃত্তি এই গল্পের
ঘটনা। এই গল্পের মানুষগুলি আমাদের চেনা-জানা, ভাষা খুবই সহজ সরল। গল্পের শেষ অনুচ্ছেদটি : 'নদী সমানে গজরাচ্ছে। কিন্তু মানুষ নিশ্চিন্ত। আর কোনও উদ্বেগ নেই তাদের মনে। তারা জানে ওটা গর্জন নয়, ও হল পরাজিতের আর্তনাদ।' একমুখী গতিতে এ গল্প পৌঁছেছে এ রকমেরই এক প্রত্যয়ী উপসংহারে। এ গল্প পড়ার পরেও দীর্ঘকাল ধরে শোনা যাবে - 'নদীর বাঁধে চাষিরা মাটি ফেলছে, ঝুপঝাপ-ঝুপঝাপ।'
১৩৮৯ বঙ্গাব্দের 'কালান্তর' শারদ সংখ্যায় সৌরি ঘটক একটি উজ্জ্বলতর ছোটগল্প লেখেন, যেটি তাঁর প্রয়াণ বছরেই অর্থাৎ ১৪০৪ বঙ্গাব্দের 'রিষড়া সমাচার' শারদ সাহিত্য সংকলনে পুনর্মুদ্রিত হয়, শিরোনাম : একটা গোটা ইলিশ। একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কামনার ছেঁড়া ছেঁড়া কাহিনী এটি। পরিবারের কর্তা কোনো এক প্রেসের কম্পোজিটর, খুবই সামান্য আয়, কোনোরকমে দিন চলে তাঁর পরিবারের। একদিন সেই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করেই গল্পটি বৃত্তায়িত। গরীবের বাড়িতে হঠাৎ একটা গোটা ইলিশ যতটা না আনন্দ আনে, তার চেয়েও বেশি আনে আতঙ্ক। 'ছত্রিশ টাকা' তো দু'সপ্তাহের রেশন, তার জায়াগায় ইলিশ। নিশ্চয়ই তিনি টাকা ধার করেছেন' - অনুমান গৃহকর্ত্রীর। কেন আজ গৃহকর্তা অনর্থক বকাবকি করছেন না, কেন আজ তিনি ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের মারধর করছেন না, ইত্যাদি ইত্যাদি ওই পরিবারের পক্ষে নানা অস্বাভাবিকতা যেন আতঙ্কের গুমোটে ভরে দিয়েছে গোটা পরিবারটিকে। গল্প কথক কিশোরটি জেনেছে : 'আমাদের বিছানা নেই, ছেঁড়া পচা মাদুরে শুই, কারণ আমরা গরীব। আমাদের ঘর ছেঁচা বেড়ার। অন্ধকার। টালির ফুটো ছাদ দিয়ে বর্ষাকালে জল পড়ে। কারণ আমরা গরীব। আমাদের কেউ ভালোবাসে না, কেউ একটা মিষ্টি কথা বলে না, কারণ আমরা গরীব। আমাদের পেটে চব্বিশঘণ্টা খিদে চিন চিন করে, কারণ আমরা গরীব।'
কিন্তু কেন তারা কেন গরীব? সেই বুর্জোয়া সংস্কৃতির শেখানো বুলি, আগের জন্মে পাপ করেছে বলেই তারা এখন গরীব, 'খাঁচায় টিয়া পাখিকে লোক যেমন করে হরেকৃষ্ণ বুলি শেখায়, আমার বাবা তেমনি সকাল থেকে সন্ধ্যা আমাদের শোনায় আমরা গরীব।' গরিবীর হীনমন্যতায় ভোগে এই কিশোরটির মতো তার ছোটো বোন মিনুও। একবারে কি একটা প্রয়োজনে মিনুর মা তার স্বাভাবিক ছেঁড়া ময়লা কাপড় পরে মিনুকে তার ইস্কুলে ডাকতে গিয়েছিল বলে বাড়ি ফিরে মিনুর কি লাফালাফি। ফলে তাকে সেদিন তার বাবার হাতে মার খেয়ে ঢোল হতে হয়েছিল। এরকম পরিস্থিতিতে মেয়েকে শাসন করার সময়েও গৃহকর্তার মর্যাদাবোধ থেকেছে অটুট -'নিজের মা-বাবার পরিচয় দিতে লজ্জা? এই শিখছ স্কুলে? নচ্ছার মেয়ে।' কি অপূর্ব বর্ণনার কাজ এই গল্পে। গরীবের বাড়িতে এসেছে এই প্রথম একটা গোটা ইলিশ। মিনু কলাপাতা আর কচু শাখ কিনে এনেছে। মা মাছটাকে ভালো করে ধুয়ে কলাপাতার ওপর রেখে তার মাথায় সিঁন্দুর পরিয়ে দিয়েছে। ...কলাপাতার সামনে সার দিয়ে উবু হয়ে বসেছে ভাই বোনেরা। আজ ওদের খুব মজা। কেউ এখনও বকুনি কি মার খায়নি। আজ সবার মুখে হাসি আর কথা।
গল্পের শেষে দেখা যায় কাবুলিওয়ালা এসেছে। সে এই গৃহকর্তার কাছ থেকে তার প্রাপ্য দু'মাসের সুদ আদায় না করে যাবে না। গৃহকর্তা ঢুকে পড়েছেন ঘরের তক্তাপোষের নিচে, আরশোলা আর ইঁদুরের রাজত্বে তাঁকে কাটাতে হচ্ছে কিছুক্ষণ। ভীষণ হম্বিতম্বি করে শেষ পর্যন্ত কাবুলিওয়ালা বিদায় নেয়। গোটা পরিবারটিই এতক্ষণ গোটা ইলিশকে ছেড়ে ওই কাবুলিওয়ালার দিকেই মনোনিবেশ করে আতঙ্কিত ছিল। কাবুলিওয়ালা বিদায় নেবার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল কোথা থেকে একটা বিড়াল এসে মাছটাকে নিয়ে পালাচ্ছে। তার আগেই গৃহকর্তা তক্তপোষের তলা থেকে বেরিয়ে এসে ওই কিশোরটির মাথায় বসিয়ে দিয়েছেন আঁশবঁটির বাঁট দিয়ে এক ঘা। কারণ সে এতক্ষণ কাবুলিওয়ালাকে মিথ্যে কথা বলে বিদেয় করতে পারেনি, ফলে রক্ত ঝরছে কিশোরটির মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে। গল্পের শেষাংশে ওই ইলিশ নিয়ে যাওয়া বিড়ালটির পিছনে গোটা পরিবারের ছুটে চলার দৃশ্য – 'আমরা ছুটছি। আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে পাশাপাণি দুটো রক্তের দাগ, একটা মাছের, আর একটা মানুষের।' এই রকমের একটা মানবিক স্পর্শে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে এই গল্প।
১৩৯৫ বঙ্গাব্দে 'কালান্তর' শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত সৌরি ঘটকের 'পণ্য' গল্পটি রাঢ় বাংলার
জোতদার বা বড়চাষিদেল শোষণ অত্যাচারের কাহিনী। বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ পটভূমিতে অসামান্য ছোটো গল্প এটি। কাহিনীটি এরকম : বারহাওড়া লাইনের দাঁইহাট স্টেশনে বর্ষার দিনে ট্রেন থেকে নেমেছে কৃষি-মজুরেরা। কেউ দুমকার সাঁওতালদের দল, কেউ মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর, লালগোলা, ধুলিয়ানের চর অঞ্চলের গরীব মানুষ। চাষের সময়ে এই মজুরদের সওদা করতে আসে অসীম নামের এক জোতদার যুবক। স্টেশনের জি.আর.পি.-দের ঘুস দিয়ে অসীম বিনা টিকিটের এই মুর্শিদাবাদ মানুষদের প্রথমে রেল হাজতে পাঠায়, তারপর তাদের ছাড়িয়ে এনে নগণ্য মজুরীতে তাদের কিনে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে এই অসীম আবার রবীন নামের আর এক জোতদার যুবককে কয়েকজন মুনিষ দিয়ে কিছু টাকা রোজগার করে নেয়। এই গরিব নিরন্ন মানুষেরা যে আজও কৃতদাস-প্রথা অবসানের যুগেও ধনী মানুষদের কাছে 'পণ্য' ছাড়া কিছু নয়, তার উদাহরণ এই গল্পটি। যুগে যুগে শোষণও যে রূপ পাল্টায় এবং অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে এই শোষণ নতুন মাত্রায়, সেই কথাই গল্পকার বলেছেন এই গল্পে। সুচনা থেকে পরিণতি পর্যন্ত এই গল্পে অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলেছে ঘটনাক্রম, পাঠকের কৌতূহল। গল্পটিতে মূল ঘটনাক্রমে পৌঁছানোর আগে লেখক স্টেশনে ট্রেন ধরতে আসা কিছু মানুষের, স্বাভাবিকভাবেই গ্রাম্য মানুষের ছবি এঁকেছেন এবং এই ছবিগুলির মস্তাজেই গ্রাম-বাংলার অর্থনৈতিক চেহারাটা ফুটে উঠেছে। মূল গল্পের ফ্রেম হয়ে গেছে সেই ছবিগুলি। দাঁইহাট স্টেশনে জোতদার অসীম, পরে জোতদার রবীন এসেছে কম মজুরীতে মুনিষ সওদা করতে মোটরবাইক চেপে ও আধুনিক ডিজাইনের পোষাক পরে। গল্পের মূল ঘটনাক্রমে প্রবেশের আগে এবং গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রটির অন্তঃসারশূন্যতা চিনিয়ে দেবার আগে লেখক জেলার সোনার খনি কৃষি জমির বর্ণনা দিয়েছেন এবং একথা পাঠককে বোঝাতে ভোলেননি যে, সেই সোনার ফসল শেষ পর্যন্ত কাদের গোলায় ওঠে। কোনও শক্তিশালী লেখকই এইসব কথা সরাসরি বলেন না, বলেন সংকেতে-ইঙ্গিতে-চিত্রকল্পে, সৌরি ঘটকও ব্যবহার করেছেন সেই পদ্ধতি। লক্ষণীয়, জোতদার অসীম-রবীনের মোটরবাইক চেপে মুনিষ কিনতে আসা। অভিনব উপায়ে শোষণের নতুন পদ্ধতিতে অসীম সওদা করে নিল কিছু নিরন্ন মানুষদের, আবার বৃর্জোয়া কায়দায় তাদের কয়েকজনকে বিক্রি করে দিয়ে বিনা পরিশ্রমে করে নিলো কিছু মুনাফা। বুর্জোয়া টান টান করে রেখেছে পাঠকের কৌতূহল। গল্পটিতে মূল ঘটনাক্রমে পৌঁছানোর আগে লেখক স্টেশনে ট্রেন ধরতে আসা কিছু মানুষের, স্বাভাবিকভাবেই গ্রাম্য মানুষের ছবি এঁকেছেন এবং এই ছবিগুলির মস্তাজেই গ্রাম-বাংলার অর্থনৈতিক চেহারাটা ফুটে উঠেছে। মূল গল্পের ফ্রেম হয়ে গেছে সেই ছবিগুলি। দাঁইহাট স্টেশনে জোতদার অসীম, পরে জোতদার রবীন এসেছে কম মজুরীতে মুনিষ সওদা করতে মোটরবাইক চেপে ও আধুনিক ডিজাইনের পোষাক পরে। গল্পের মূল ঘটনাক্রমে প্রবেশের আগে এবং গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রটির অন্তঃসারশূন্যতা চিনিয়ে দেবার আগে লেখক জেলার সোনার খনি কৃষি জমির বর্ণনা দিয়েছেন এবং একথা পাঠককে বোঝাতে ভোলেননি যে, সেই সোনার ফসল শেষ পর্যন্ত কাদের গোলায় ওঠে। কোনও শক্তিশালী লেখকই এইসব কথা সরাসরি বলেন না, বলেন সংকেতে-ইঙ্গিতে।
বুর্জোয়া সংস্কৃতির প্রভাব যে গ্রামীণ জীবনকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে, তারও বেশ কিছু উদাহরণ এই গল্পে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন এই কথোপকথনটি : অসীম বলল - 'তারপর বিয়ে করেছিস শুনলাম।' রবীন বলল - 'হাঁ। হঠাৎ হয়ে গেল।' -'কাকে? সেইটাকে?' - 'দূর। সেটার সঙ্গে তো বিয়ের আগে ফুর্তি করেছি। এঁটো পাত কি ঘরে নেয়? বিয়ে করেছি টাটকা আনকোরা মাল।' - কি পেলি?'
-'নগদ দশ হাজার। ত্রিশ ভরি সোনা। মোটর সাইকেল। আর এইসব দানপত্তর।'
অসীম তার বন্ধু রবীনকে ঠকিয়ে তার কাছে মুনিষ বিক্রি করে মুনাফা করেও বলে - 'যাব একদিন তোর বউ দেখতে।'
বুর্জোয়ারা শুধুমাত্র শ্রমিক কৃষকদেরই ঠকায় না, ঠকায় তার নিজের শ্রেণিকেও, মানুষ ঠকানোর প্রতিযোগিতায় তারা মেতে থেকে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখে। দাঁইহাট স্টেশনের পটভূমিকায় এই গল্পটিতে লেখক এভাবেই এঁকেছেন গ্রাম বালার মানুষের ইতিকথা।
সৌরি ঘটকের পৈত্রিক বাসস্থান এই দাঁইহাট স্টেশনেরই কাছাকাছি, কাটোয়ার রাঢ় অঞ্চলে। এইসব শোষণের দৃশ্য তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বারবার। তাঁর গল্পেও তাই বারবার ফিরে ফিরে এসেছে এইসব শোষণ বঞ্চনার কাহিনী। অপূর্ব এক চিত্রকল্পে পরিসমাপ্তি ঘটে এই গল্পটির : 'ঠিক' যেন সেই সুদূর অতীতের দাসযুগের স্মৃতি, একদল ক্রীতদাসকে কিনে নিয়ে যাচ্ছে মালিকেরা। তবে সেদিন তাদের পায়ে থাকত লোহার শিকল। চলার সাথে সাথে সেগুলো বাজত ঝম্ ঝম্ করে। তারপর কাল মিশে গেছে মহাকালে। পেরিয়ে গেছে কত শত যুগ যুগান্ত। সভ্যতার কত পতন অভ্যুত্থানের স্মৃতি বুকে নিয়ে পড়ে আছে মৃত ইতিহাস।
এখন শেষ হতে চলেছে বিংশ শতাব্দী। এখন আর বাহ্যত সেই শেকলের অস্তিত্ব নেই। আজ সেই অভাব পূরণের ভার নিয়েছে বৃষ্টি। অঝোর ধারায় সে ঝরে পড়েছে আর সারা মাঠ জুড়ে তার প্রতিধ্বনি বাজছে ঝমঝম্ ঝমঝম্।'
১৩৯৭ বঙ্গাব্দে 'কালান্তর' শারদ সংখ্যায় সৌরি ঘটক লিখেছেন আরও একটি অসামান্য ছোটগল্প :
'একশো জন চোরাকারবারী ও একজন কমিউনিস্ট।' বর্ধমান জেলার কাটোয়া অঞ্চলের 'তে-ভাগা' আন্দোলনের একজন সংগঠক এই সৌরি ঘটককে দীর্ঘকাল কাটাতে হয়েছে মেদিনীপুর জেলে। তখন পশ্চিমবাংলায় প্রফুল্ল সেনের মন্ত্রীসভা। সেই সময়ে ধানকল মালিক ও জোতদার চাষীদের উপর লেভি ধার্য করে সরকার। যারা লেভি দিতে অস্বীকার করে, তাদের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হয় অসংখ্য চোরাকারবারী। মেদিনীপুর জেল ভরে গেল এই চোরাকারবারীতে। এদের সঙ্গে সৌরি ঘটক মিশলেন, পরিচয় পেলেন এদের অন্তঃসারশূন্য-অবিবেকী চরিত্রের। পরবর্তীকালে অবশ্য প্রফুল্ল সেন এদের সঙ্গে সমঝোতা করে নেন। ফলে এদের মুক্তি ঘটে। গল্পে অবশ্য প্রফুল্ল সেনের নাম কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। সৌরি ঘটক একদা আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করেছিলেন এই গল্প নির্মাণের ইতিহাস।
উত্তমপুরুষের কথনে আলোচ্য গল্পে মেদিনীপুর জেলে সেই কমিউনিস্ট বন্দী বাঙালী-অবাঙালী যে শতখানেক চোরাকারবারীর সঙ্গ পেলেন মাস তিনেক, তাদের সকলের আকৃতি আলাদা হলেও প্রকৃতি উনিশ-বিশ একইরকম। এরা জীবনে মুনাফা ছাড়া
কিছু বোঝে না, মুনাফার জন্য সমস্ত জীবনাদর্শ-মূল্যবোধ বিসর্জন দিতেও পিছপা হয় না। জেলখানার সুপার-জেলর-জমাদার-রক্ষী এমনকি ডাক্তারদেরও ঘুঁস দিয়ে ওরা আদায় করে নেয় ওদের অভ্যস্ত জীবনের স্বাচ্ছন্দ, নিয়মিত ওদের জন্যে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার আসে, রাজকীয় খাবার-দাবার, অসুখের ছুতো করে মাঝে মাঝেই ওদের কেউ কেউ দিন কয়েক জেলের বাইরে হাসপাতালে স্ত্রী-সঙ্গ করে কাটিয়ে আসে, টাকা খরচ করে সবই পায় তারা জেলখানাতেও।
এদের চেতনায় সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতা, এরা কাউকে বিশ্বাস করে না, এমন কি নিজের বাড়িতে স্ত্রীকেও নয়। এদের সঙ্গে কমিউনিস্ট বন্দীটি মিশেছেন তাঁর স্বাতন্ত্র বজায় রেখেই, ওরা এই কমিউনিস্ট বন্দীটির সাথে নানা রকমের বোকা-বোকা তর্ক করলেও তাঁর প্রতি ভয়মিশ্রিত সম্ভ্রম না দেখিয়ে পারেনি। দৃশ্যের পর দৃশ্য ফুটিয়ে এই চোরা কারবারীদের মুখ ও মুখোশ এঁকেছেন লেখক এই গল্পে। পরিশেষে বলতে হয়, এটি একটি বিবৃতিমূলক গল্প, প্রথাগত গল্পের ফর্ম এখানে মানা হয়নি, কোনও একক নায়কের গল্পও এটা নয়, একটার পর একটা তুলির টানে এই সমাজের ধ্বস্ নামানোর নায়কদের আঁকা হয়েছে এই গল্পে।
১৩৯৮ বঙ্গাব্দে 'কালান্তর' শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত সৌরি ঘটকের 'আগুন' গল্পটি গ্রাম বাংলার সংহতি চেতনার আরো এক উজ্জ্বলতর গল্প। একটি গ্রামে হঠাৎ আগুন লেগে গরীব মানুষের খোড়ো চাল একটার পর একটা পুড়িয়ে চলেছে। অন্যদিকে গ্রামের গরীব মানুষেরা যুদ্ধ শুরু করেছে আগুনের বিরুদ্ধে। তারা চেষ্টা করছে আগুন নেভাতে। এই আগুন লাগাকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষেরা আজ একজোট হয়ে গেছে। এই আগুনই রোধ করেছে গ্রামের সংঘটিত হতে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। গ্রামের গোয়ালাদের বিরুদ্ধে মাহিষ্য জাতিভুক্ত চাষীদের দীর্ঘকালের ঝগড়া--গোয়ালারা রাতের অন্ধকারে নাকি চাষীদের ক্ষেতের ফসল গরুকে খাইয়ে দেয় প্রায়ই। সেই সূত্রে কয়েকজন চাষী গোয়ালাদের গরু আটক করেছে। সেই আটক গরু ছাড়িয়ে নেওয়া নিয়েই সূত্রপাত হতে চলেছিল একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হঠাৎ আগুন লেগে সৃষ্ট পরিস্থিতিই এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষদের সংঘবদ্ধ করে দিল, তারা একে অন্যের ঘরের আগুন নেভাতে সচেষ্ট হল। শেষ পর্যন্ত তারা নেভাতে পেরেছে। এটাই গল্পের বিষয়বস্তু।
অপূর্ব নির্মাণ এ গল্পের ডিটেলিং, গ্রামের বাস্তব মাটি থেকে তুলে আনা এ গল্পের চরিত্রগুলি, তাদের বোধ-বুদ্ধি-মানসিকতার বিশ্লেষণ। সাবলীল গতিতে এগিয়ে চলা এই গল্পটি শুরু হয় এভাবে।
"আগুন গো--গাঁয়ের লোেক আগুন-- 'চিলের ডাকের মতো, তীক্ষ্ণ আর মৃত্যুর মত শীতল এক কম্পমান নারী কণ্ঠ হঠাৎ গোটা গ্রামের বুক চিরে ভেসে চলে গেল।"
লক্ষ্যণীয়, আগুন লাগার সংবাদটা গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ানো হল একটি নারী কণ্ঠ মারফৎ। আগুন লেগেছে শম্ভু ঘোষের বিধবা স্ত্রী জগমনির খড়ের দোচালা ঘরে। সেই আগুনই ছড়িয়ে পড়েছে গোয়ালাপাড়া ও চাষীপাড়ার সকলের ঘরেই। ইতিমধ্যে গ্রামে সংগঠিত হতে চলেছে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সেটাও তো গ্রামে আগুন লাগারই সমতুল্য, সেই খবরটাই কি লেখক এক গৃহবাসিনী মহিলার মুখ দিয়ে প্রকাশ করালেন এভাবে? আগুন আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা একে অপরের প্রতীক হয়ে যায় এই গল্পে।
লেখকের ডিটেলিং-এ আছে নানা মুক্তোর কাজ। লেখক আগুনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন : 'মহাদেব ঘোষের ঘরখানা জ্বলতে না জ্বলতে ওপাশ দিয়ে কয়েকটা শিখা সরু পথচলা রাস্তাটা যেন ডিঙ্গি মেরে পার এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল চাষী পাড়ার মুকুন্দ বিশ্বাসের চালে। লক্ষ্যণীয়, আগুনের ডিঙ্গি মেরে সরু রাস্তা পার হয়ে যাবার প্রসঙ্গটি। লেখক এই রকম নানা উপমা প্রয়োগে গল্পের কেবলমাত্র চরিত্রগুলিকেই নয়, চরিত্র বিকাশের অনুষঙ্গ বস্তুগুলিতে জীবন্ত করে তুলেছেন।
গল্পটির শেষের দিকে চাষী পাড়ার বৃদ্ধ শিশু-মোড়ল বলে--'এখন চাই ত্রিপল। গাঁয়ের ও আগুন নিভতে পাঁচ-ছ দিন লাগবে। ততোদিন থাকবো কোথায় সব?' গোয়ালা পাড়ার কুঞ্জ ঘোষ বলে--চল, সবাই যাই এস.ডি.ও-র কাছে। শুধু ত্রিপল নয়, চাল-ডালও চাই। নইলে খাবে কি সব। একমুঠো ভিক্ষে দেওয়ার চালও বাঁচেনি কারও।' তারপর : 'সবাই মেনে নিল কথা। নিমেষে এক হয়ে গেল সবাই। তারপর মেয়ে আর শিশুদের পাহারা দেওয়ার জন্য কিছু লোক রেখে দল বেঁধে হাঁটা দিল শহরের পথে।'
এর পরেও আরো চার অনুচ্ছেদ বর্ণনা দিয়ে লেখক সমাপ্তি ঘটিয়েছেন এই গল্পের। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এরপর আর কোনও অনুচ্ছেদ সংযোজনের প্রয়োজন ছিলো না। আসলে লেখক এই গল্পে গ্রাম জীবনের সংহতি চেতনার একটি সামগ্রিকতা দিতে চেয়েছেন, চিরন্তনতার বৃত্তে যুক্ত করতে চেয়েছেন গ্রাম-জীবনের ইতিকথাকে, তাই গল্পে এসেছে শেষের দিকে আরো কয়েকটি অনুচ্ছেদ।
গল্পটি শেষ হচ্ছে এভাবে : 'মাথার ওপর নীল আকাশে চিক চিক করছে তারার ঝাঁক। একটা স্নিগ্ধ হাওয়া বয়ে আসছে দক্ষিণ থেকে, রাতচরা পাখিগুলো চিৎকার করতে করতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, গ্রামে জ্বলন্ত আগুনের শিখাগুলোকে মনে হচ্ছে যেন আলেয়ার হাতছানি, মেয়ে পুরুষ কেউ ঘাসের উপর শুয়ে, কেউ গালে হাত দিয়ে বসে প্রতীক্ষা করছে আগামী সকালের জন্যে, যখন এই ধ্বংসস্তুপের ওপর শুরু হবে এক নতুন জীবন, যে জীবন আগুনে পোড়ে না, ঝড়ে ভাঙে না, যা অপরাজেয়, যুগান্তরে শত ধ্বংস্তুপের ওপর যা বুনে চলে সৃষ্টির জাল'।
'একটু আলোর জন্যে'-সৌরি ঘটকের একটি প্রতিনিধিস্থানীয় ছোটগল্প। 'পরিচয়' পত্রিকার ১৩৮১ বঙ্গাব্দের শারদীয় সংখ্যাতে এটি প্রকাশিত হয়। ১৪০৫ বঙ্গাব্দের (১৯৯৮খ্রি.)' বিষড়া সমাচার' শারদ সাহিত্য সংকলনে এটির পুনর্মুদ্রণ ঘটেছে।
বিড়ি শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে রচিত
এই অসামান্য ছোটগল্পটির কাহিনী এরকম :
মুর্শিদাবাদ জেলার আজিমগঞ্জ লাইনের ছোট্ট মফস্বল গঞ্জ সালারে বড় রাস্তার উপর গলির মুখে চৌকোণা একতলা একটি ছোট্ট ঘরে হারাধন দাস ওরফে হারুর পান-বিড়ির দোকান। তারই মাথাভোর উঁচু ওপরে কাঠের পাটাতন পেড়ে ছাদের নিচে বানানো একটি খুপরিতে বসে বিড়ি বাঁধে ছ'জন শ্রমিক। হারুর এই বিড়ি-ফ্যাক্টরীর মাত্র আড়াই হাত উচ্চতার আট বাই চার হাতের অস্বাস্থ্যকর জায়গায় দিনের বেলাতেও আবছা অন্ধকার ঘরে বসে মাথাপিছু একহাজার বিড়ি বাঁধতে হয় প্রতিদিন ওদের, আর সেই বিড়িই হারুর ছবিওয়ালা লেভেল গায়ে নিয়ে বাজারে 'হারুর বিড়ি' বলে বিক্রি হয়। বিড়ি বাঁধতে বাঁধতে কারিগররা মাঝে মাঝে নিজ নিজ জীবনের কথা বলে, সুখ-দুঃখের ঘটনা বিনিময় করে, সহকর্মীরা হয়ে যায় সহমর্মীও। ওপরের খুপরিতে গগন ঠাকুর বসে পূর্বমুখে, ঠিক ঘুলঘুলির দিকে মুখ করে, পশ্চিমদিকে তার মুখোমুখি বসে অনন্ত বৈরাগী, উত্তরদিকে বসে মাতুমোল্লা আর ভৈরব দাস ওরফে কুঁজো হাবলা, দক্ষিণ দিকে বসে পাগল কীর্তনীয়া আর ত্রৈলোক্য কর্মকার। এরা সকলেই গ্রামের ফেলমারা কৃষক-মধ্যবিত্ত-কারিগর, আজ তারা নিজস্ব জীবিকায় টিকে থাকতে না পেরে বিড়ি শ্রমিকে রূপান্তরিত। ঘরে ওদের নিত্য অভাব, এদের তিনজন তো দারিদ্রের কারণে বিয়েই করতে পারেনি।
এমনিভাবে দিন গড়িয়ে যেতে যেতে খুপরির এই ছ'টি মানুষের মধ্যে গগন ঠাকুর আর হাবলা কুঁজোর মধ্যে একদিন জেগে ওঠে একটা বিরোধের অঙ্কুর। গগন ঠাকুরের যৌবন-চপলতা, বিশেষ করে নানা মেয়েকে চিঠি লেখার গল্প সহ্য করতে পারে না কুঁজো হাবলা। হাবলার কাঁধে কুঁজ নেই, নিত্য অভাব এবং ঠিকমতো খেতে না পাওয়াই তাকে মাত্র তিরিশ বছর বয়সেই মাথা বাঁকিয়ে হাঁটতে বাধ্য করেছে, আর এটাও তার বিয়ে না করতে না পারার আর একটা কারণ। হাবলার সহকর্মীরা, বিশেষতঃ গগন ঠাকুর প্রায়ই তাকে এটা নিয়ে গঞ্জনা দেয়, তাই গগন হয়ে ওঠে তার চক্ষুশূল। এমনিভাবে চলতে চলতে সেবার শীতকালে ঠান্ডা লেগে জ্বরে পড়ে যাওয়ায় গগন ঠাকুর দশ-বারোদিন কাজে আসতে পারেনি। ইতিমধ্যে গগনের বসার জায়গাটিতে অর্থাৎ ঘুলঘুলির দিকে মুখ করে পশ্চিমদিকে বসতে শুরু করেছে কুঁজো হাবলা। গগন কাজে ফিরে এলে সকলের অনুরোধে বিশেষতঃ অনন্ত বৈরাগীর ধমকে হাবলা প্রথম দিন গগনকে জায়গা ছেড়ে দিলেও দ্বিতীয়দিন কিছুতেই ওই জায়গাটা ছেড়ে সিতে রাজি হলো না। তার যুক্তি-জায়গা কারোর কেনা নয় এবং খুপরির মধ্যে কেবল ওই জায়গাতেই একটু আলো আসে বা শীতকালে সেই সূর্যালোকে কিছুটা শরীর গরম করে নেওয়া যায়। অবশেষে গগন ঠাকুর রাগের মাথায় হাবলার কান ধরে হিড় হিড় করে টানতে থাকে, কুঁজো হাবলা কামড়ে দেয় তার হাতে, আর তৎক্ষণাৎ গগন কুলো থেকে কাঁচিটা নিয়ে বসিয়ে দেয় ওর ঘাড়ে। অতঃপর অত রক্ত দেখে 'খুন-খুন' চীৎকার করে নিচে নামে মাতুমোল্লা। মালিক হারুর চিৎকারে লোক জমে যায়, তারা গণ-পিটুনি দেয় গগনকে, তারপর আহত হাবলা সহ পিছমোড়া করে বাঁধা গগনকে নিয়ে যায় থানার দিকে। একটু আলোর জন্যে মানুষ খুন-এই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারে না ক্ষুব্ধ জনতা।
পাঁচটি পরিচ্ছেদে রচিত এই ছোটগল্পটির কাহিনী বুনন, চরিত্রসৃষ্টি, বিশেষতঃ ডিটেলিং-এর কাজ একজন শক্তিশালী লেখক হিসাবে সৌরি ঘটককে চিনিয়ে দেয়। গরীব শোষিত মানুষের প্রতি মমতা, তাদের দৈনন্দিন জীবনের আনন্দ-বেদনার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়া এই লেখককে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যথার্থ উত্তরসূরী বলে বোধ হয়। বিড়ি ফ্যাক্টরীর মালিক মহাজন হারু নিঃস্ব অবস্থা থেকে তিলে তিলে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেও তার কর্মচারীদের উপর শোষণের স্টিম-রোলার চালায়। গল্পের শেষের দিকে তার চীৎকার--'একটু আলোর জন্যে মানুষ খুন ! তাজ্জব কাণ্ড, এমন জানোয়ার আর আছে ব্রহ্মাণ্ডে।' সে না বুঝলেও পাঠকেরা বুঝে যায় যে এই মালিক মহাজনটিরই নির্বুদ্ধিতা এবং তার শোষণের প্রক্রিয়াই এই ঘটনা ঘটতে বাধ্য করেছে। গল্পে সবকটা চরিত্রই জীবন্ত ও প্রাণস্পন্দনময়। ছ'জন বিড়ি-শ্রমিকের জীবনবৃত্ত পাঠকের খুবই চেনা জগৎ থেকে তুলে নেওয়া। পাগল কীর্তনীয়ার গানে যে প্রসঙ্গ এসেছে তা মোটেই অশ্লীল নয়, বরং গ্রাম্যতাযুক্ত। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে খাটতে এইসব মানুষের গ্রামে গঞ্জে সহজ-রিক্রিয়েশন এরকমই। গাঁয়ের মানুষ যেমন অকপটে গ্রামাভাষা ব্যবহার করে, সৌরি ঘটকের অন্যান্য গল্পের মতো এই গল্পটিতেও তেমনি গ্রাম্যভাষার অকপট ব্যবহার। মূলতঃ রাঢ় বাংলার ভাষাই তিনি প্রয়োেগ করেছেন। এই গল্প পড়ার পরেও বেশ কিছুদিন মনে থাকবে সৌরি ঘটকের স্থাপত্য এই অনুচ্ছেদটি : 'আবছা অন্ধকারে ভরা খুপরিতে সেইসময় পরিবেশটা বড় অদ্ভুত হয়ে ওঠে। আবছায়ার মধ্যে ছ'টি লোকের দুলুনি দেখে মনে হয় যেন এটা কোনও প্রেতলোক, ছটি কঙ্কাল এখানে মুখোমুখি বসে দুলছে নীরবে। আর অন্ধকারে ভালো করে দেখবার জন্যে তাদের চোখগুলো শ্বাপদের মতো জ্বল জ্বল করে। মনে হয় বুঝি অমনি জ্বলজ্বলে চোখে তারা ভয় দেখাচ্ছে সংসারকে।'
সৌরি ঘটক তাঁর শেষ গয়টি লিখেছেন প্রয়াণের বছর খানেক আগে অর্থাৎ ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের গোড়ায়। গল্পটি ১৪০৩ বঙ্গাব্দে শ্রীরামপুরের 'ঐক্যতান' পত্রিকার শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। শিরোনাম : 'না মানুষের গল্প।' সৌরি ঘটকের জীবনেরই এক নির্মম অভিজ্ঞতার কাহিনী এই গল্প। লেখক তখন কলকাতার পার্কস্ট্রিটের কাছাকাছি থাকতেন। বস্তির মানুষদের নিদারুণ দারিদ্র, অসামাজিক কাজকর্মের অন্তরালেও তাদের মানবিকতা ও জীবনবোধ এই গল্পে ভাষা পেয়েছে। লেখকের ঘরের কাজ করতেন এক মুসলিম প্রৌঢ় মহিলা। বাজার থেকে গল্পকার যাইই কিনে নিয়ে আনেন, তা চুরি করে সে। অপরাধ স্বীকারও করে অম্লান বদনে। বলে, ঘরে অভাব, তাই চুরি না করে পারে না। ওই প্রৌঢ় মহিলার মেয়ে তরুণী হয়েছে। তাকে শাড়ি-জামা কিনে দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। একদা তরুণী সৌরিদার একটা ছেঁড়া লুঙ্গি চুরি করে। প্রৌঢ়াটি জানায় যে তার মেয়েই সেটা চুরি করেছে, কারণ তার অন্তর্বাস নেই। এই রকমের বস্তি জীবনের কথা লিখেছেন সৌরি ঘটক এই 'না মানুষের গল্প'-তে। নিপুণ বর্ণনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে বস্তিবাসীর অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন। এই গল্প পড়তে পড়তে ল্যাপিয়েরের 'দি সিটি অব জয়' যার বঙ্গানুবাদ 'আনন্দ নগরী', সেই উপন্যাসটি মনে পড়ে। আনন্দনগরী কলকাতার অন্ধকারময় বস্তিতে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে কতো ধরনের নৃশংস অপরাধ, এবং সেইসব অপরাধ সংগঠনের নেপথ্য নায়ক কারা, তারই ইঙ্গিত এই গল্পটিতে দেওয়া হয়েছে। যাদের দিয়ে ঘটানো হচ্ছে এইসব অপরাধ, তারা অত্যাচারিত বঞ্চিত এই সমাজেরই মানুষ। তাদেরও ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে, মান-অপমান বোধ আছে। এইসব মানুষদের লেখক গভীর মমতায় এঁকেছেন এই গল্পে। গল্পটির নামকরণটিও ব্যাঞ্জনাময় : 'না মানুষের গল্প'। চরিত্রগুলিকে তথাকথিত ভদ্রসমাজ 'মানুষ' নাম দিতে চায় না। সৌরি ঘটকও চরিত্রগুলির কোনোটিকেই পুরোপুরি আঁকেননি, এঁকেছেন তাদের প্রত্যেকের মুখের খণ্ডাংশ, ঠিক পিকাসোর ছবির মতো। ছবিগুলি জোড়া দিতে দিলে এই সমাজের অন্ধকারের চেহারাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বল্লম হয়ে উঠেছে তাঁর এই গল্পটি।
কম বড় গল্পকার ছিলেন না সৌরি ঘটক, আমাদের সৌরিদা, পঞ্চাশ দশকের শেষার্ধ থেকে আমৃত্যু তিনি লিখে গেছেন গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-নাটক। তবে তিনি খুব বেশি লেখেননি। সত্তর দশক থেকে তিনি সাংবাদিকতার সাঙ্গে যুক্ত হন। কৃষক আন্দোলন করার মধ্য দিয়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছিলেন। তেভাগা আন্দোলন করেছেন। জেল খেটেছেন বারবার। মোটকথা, সাহিত্যিক জীবনের শুরু যেতে আমৃত্যু তিনি মিশেছেন নানা ধরনের মানুষের সাথে। গভীর নিরীক্ষণে তিনি তাদের মধ্য থেকেই চরিত্র তুলে এনেছেন তাঁর সাহিত্যে, বিশেষতঃ ছোটগল্পে। মোটকথা ড্রইংরুমে বসে তিনি গল্প লেখেননি। সেকারণেই তাঁর ছোটগল্পের চরিত্রগুলো হয় উঠেছে এতো জীবন্ত, এতো মাটির কাছাকাছি। গাঁয়ের মানুষ যেমন অকপটে গ্রাম্য ভাষা ব্যবহার করেন, সৌরি ঘটকের সাহিত্যেও তেমনি গ্রাম্য ভাষার অকপট ব্যবহার। মূলত রাঢ়বাংলার ভাষাই ব্যবহার করেছেন তিনি। এতো বড় সাহিত্যিক সৌরি ঘটক কোনও সরকারি পুরস্কার পাননি, তা পাওয়ার জন্যে কোনোদিন তদ্বিরও করেননি। ব্যাপক অভ্যার্থনাও পাননি কোথাও সাহিত্যিক হিসাবে , প্রচারও পাননি তেমন। এইরকম মাপের একজন সাহিত্যিককে আমরা কিছুদিন কাছে পেয়েছিলাম, তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে পেরেছিলাম, সাহিত্যালোচনায় তাঁর সহজ সরল অথচ ঋজু বক্তব্য আমরা কিছুদিন শুনতে পেয়েছিলাম, তাতে ধন্য হয়েছি আমরা। সৌরিদার বিশেষতঃ ছোটগল্পগুলি নিবিড়ভাবে পড়ে তা থেকে আরো রত্ন আবিষ্কারের দায়িত্ব আমাদের, আমরা নিশ্চিত, তা থেকে মিলবে অনেক 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার', অনেক নতুন 'খণ্ডহর'।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment