1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label ডা. প্রাণেশ মণ্ডল. Show all posts
Showing posts with label ডা. প্রাণেশ মণ্ডল. Show all posts

Saturday, October 21, 2023

বিরিয়ানি


বিরিয়ানি 

প্রাণেশ মণ্ডল

"না, আজ একেবারে বাইরে খেয়েই ঘরে ঢুকবো।" জোর গলায় একরকম বলেই দিলেন গগন বাবু। কেরানীর চাকরী আর মধ্যবিত্ত সংসারের চাপের ফাঁকে ফুরসৎ পেলেন আজ একটু। তাই আজকের দিনটা একটু অন্য ভাবে কাটাতে চাইলেন। স্ত্রী রমলা দেবী কে নিয়ে আজ পুজোর মার্কেটিং করতে বেড়িয়েছেন। সেই ছুঁতোয় আইনক্সে একটা সিনেমাও দেখে ফেললেন। এই মফঃস্বল শহরে সদ্য গজিয়ে ওঠা মাল্টিপ্লেক্সটি ছাড়া বিনোদনের খুব বেশি সুযোগ নেই। অফিস থেকে ফেরার পথে রোজ সদ্য যৌবনে পা দেওয়া ছেলে মেয়েদের শপিংমল বা আইনক্সে ভিড় করতে দেখে তাঁরও ইচ্ছে হয়, কিন্তু সুযোগ হয়ে ওঠেনি এতদিন। তাই আজ সুযোগ যখন মিলেছে, তখন তা পুরোটা উশুল করেই ছাড়তে চান তিনি।

কিন্তু রমলা দেবী পুরো উল্টো। তিনি ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে সংসারের কাজ করতেই বেশি আনন্দ পান। আজ কেনাকাটা করতে বেরোলেও সিনেমা দেখতে একেবারেই রাজী ছিলেন না। গগন বাবুর প্রস্তাব প্রথমেই নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন, "শিং ভেঙে এই বুড়ো বয়সে বাছুরের দলে ভিড় করব? বেশ তো ঘরে আয়েশ করে বসে টিভি মোবাইলে  সিনেমা দেখা যায়!"

"বুড়ো? কত বয়স হল আমাদের? আর মনের কি কোন বয়স হয়?" গগন বাবু জবাব দিলেন।

রমলা দেবী আর কথা বাড়ালেন না। খুব একটা ইচ্ছে না থাকলেও গগন বাবুর সাথে একরকম জোর করেই পা বাড়ালেন। টিকিট কাউন্টারে দু একজন সমবয়সী ও বয়স্ক দম্পতি কে দেখে রমলা দেবী একটু মনে ভরসা পেলেন।

সিনেমা হল থেকে বেরোতে বেশ দেরিই হল সেদিন। দুজনেরই খুব ক্ষিদে পেয়েছে, তবে খাবারের দোকানের অভাব নেই। মাল্টিপ্লেক্সের পাশের রাস্তাটার চেহারা এই কবছরে পুরো পাল্টে গেছে। সারি দিয়ে একের পর এক ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁ। রাস্তা দিয়ে গেলেই সুগন্ধে ক্ষিদে যেনো আরও দশ গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু এখানেও রমলা দেবীর চরম আপত্তি। রেস্তোরাঁ তে খেয়ে নিলে  ক্লান্ত শরীরে বাড়ি গিয়ে রান্নার ঝামেলা আর থাকে না। এই প্রস্তাব পেলে যেকোনো বাড়ির গিন্নি একবারেই লুফে নেবে। কিন্তু ওনার বাইরের খাবার একেবারেই নাপসন্দ। খাদ্য রসিক গগন বাবুর সাথে এ নিয়ে আগে বেশ কয়েকবার ঝামেলা হয়েছে। 

"অত ঝাল মশলা খেলে কি আর পেট ঠিক থাকবে? আর মাংস যে কবেকার তার তো কোনো ঠিকই নেই!"

স্বাস্থ্য সচেতনতার কথা যতই বলুন, স্ত্রীকে কখনোই তাঁর স্বাস্থ্য সচেতক বলে মনে হয় না। শুধু বাইরে খাবারের কথা বললেই যত নীতিবাক্য ফোটে মুখে। দিন দিন যেন  নিয়ম শৃঙ্খলা আরও কড়া হচ্ছে। যে বিরিয়ানির প্রতি গগন বাবুর সেই ছোট থেকে প্রেম, আজ স্ত্রীর সামনে তার নাম উচ্চারণ করতেই ভয় পান। এর জন্য ওনাকে অনেক আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। কিন্তু রমলা দেবী যদি একটু বুঝতেন তাঁর মনের বাসনা!

দূর থেকে ভেসে আসা খাবারের সুগন্ধে গগন বাবুর মন টা কেমন চঞ্চল হয়ে উঠলো। ঠিক করলেন আজ কোনো বাধা মানবেন না, নিজের ইচ্ছেগুলোকে তিনি বাস্তবায়িত করেই ছাড়বেন। মাথায় একটা জেদ চেপে বসলো, আজ না খেয়ে বাড়িই ঢুকবেন না। তাই জোর গলায় ঘোষণা করলেন আজ বাইরে খাবেনই। গগন বাবুর জেদ দেখে রমলা দেবীও থতমত খেয়ে গেলেন। উনিও আশ্চর্যজনক ভাবে আজ খুব বেশি বাধা দিলেন না। শুধু একবার মিনমিন করে বললেন, "দিনে অনেক রান্না করা আছে, সেগুলো নষ্ট হবে।" 

কিন্তু গগন বাবু কে আজ পায় কে? তিনি এরকম কোনো অজুহাতই আজ কানে তুলতে চান না। 

এমনিতেও অনেক রাত হয়ে গেছে। তার ওপর এখন ঝগড়া ঝাটি করলে আরো দেরি হবে, আর বাইরের লোকজনের সামনে সেটা অভদ্রও দেখায়। অগত্যা রমলা দেবীও পা বাড়ালেন। 

গগন বাবু এবার সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে বেশ হিসেব কষে শুরু করলেন। 

"বুঝলে এখানে তন্দুরী আইটেম দারুণ বানায়, আর তন্দুরী চিকেন টা তো এখানে স্পেশাল! আর গলৌতি কাবাব...মুখে দিলেই একদম মিলিয়ে যাবে, এত নরম!"  স্ত্রীকে সোৎসাহে কথাগুলো বলেই রেস্তোরাঁর সিড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন, কিন্তু কিছুটা উঠেই থামতে হল। সামনে দশ বারোজনের বিশাল লাইন। টেবিল ফাঁকা পেতে একঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। দাঁড়ানোর জন্য ঠিকমত জায়গাও নেই। তারওপর জায়গা টা খুব গরম।   পার্সেলের লাইনও বেশ লম্বা। ওদিকেও যথেষ্ট সময় লাগবে। অবস্থা বেগতিক দেখে গগন বাবু অস্ফুটে বলেই ফেললেন, এই গরমে এতখন ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে তিনিই না শেষে তন্দুরী হয়ে যান! 

"না, আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর স্টার্টার খেয়ে লাভ নেই, একেবারে বিরিয়ানিই খাবো। 'বেস্ট বিরিয়ানি'  এখন দারুণ বানাচ্ছে।" বিরক্তি লুকোতে জোর করে মুখে হাসি এনে স্ত্রীকে বলেই ফেললেন গগন বাবু।

দূর থেকেই কিছু একটা গন্ডগোল আন্দাজ করতে পারছিলেন গগন বাবু। কোনোদিন এত ফাঁকা থাকে না 'বেস্ট বিরিয়ানি' এর সামনেটা। আবার ভাবলেন ফাঁকা থাকলে তো ভালই, দাঁড়ানোর ব্যাপার নেই, বেশ রসিয়ে খাওয়া যাবে। কিন্তু ভিতরে গিয়ে বুঝতে পারলেন যেটা আশঙ্কা করেছিলেন, ঠিক সেটাই হয়েছে। 

"আমাদের বিরিয়ানি নটার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। তবে এখন আপনি আমাদের চাইনিজ আইটেম পেয়ে যাবেন, ওটাও আমরা দারুণ বানাই।" রিসেপশনে বসা অল্পবয়সী ছেলেটা বেশ স্মার্টলি বলে দিল গগন বাবুকে। গগন বাবুর স্বপ্নের ফানুস টা হঠাৎ ওড়ার আগেই চুপসে গেল! মর্মাহত গগন বাবুর মুখ দিয়ে শুধু একটা কথাই বের হল, "বেস্ট বিরিয়ানি তে বিরিয়ানিই নেই, আর কী খাবো!"

বিরিয়ানি খাবেন যখন বলেই ফেলেছেন একবার, তখন তিনি বিরিয়ানি ছাড়া অন্য কিছু খাবেনই না আজ। একটু দূরেই একটা পুরনো রেস্তোরাঁ আছে। একসময় কাচ্চি বিরিয়ানির জন্য ওটার খুব নামডাক ছিল। কিন্তু এখন খাবারের মান একটু পড়েছে শুনেছেন। কিন্তু বিরিয়ানি পাওয়া গেলে মন্দ কি? এরকম সাত পাঁচ ভেবে স্ত্রীকে নিয়ে আবার এগোলেন। মুখে শুধু বললেন, "বিরিয়ানির কি অভাব নাকি? কী ভেবেছে এরা... বেস্ট বিরিয়ানি মানেই কি বেস্ট?"

পুরনো হলেও বেশ ছিমছাম রেস্তোরাঁর ভিতর টা। অপেক্ষা করতে হল না, টেবিলও ফাঁকা পেয়ে গেলেন। হাতমুখ ধুয়ে বসতেই ওয়েটার অর্ডার নিতে চলে এলো। গগন বাবু মেনু কার্ড দেখার প্রয়োজনও বোধ করলেন না। সরাসরি বলেই দিলেন দুটো মাটন বিরিয়ানি। 

"সরি স্যার, হবে না।" বিনম্র ভাবে ওয়েটার ছেলেটি বললো।

"ওহ্ মাটন হবে না? তাহলে চিকেন।"

"সরি স্যার, আজ কোনো বিরিয়ানিই হবে না।"

গগন বাবুর মাথায় যেনো বাজ পড়লো। তাও মাথা ঠান্ডা রেখে বলার চেষ্টা করলেন, "কেনো হবে না? রাত হয়ে গেছে বলে? ম্যানেজারকে ডাকুন...ওনার সাথে আমি কথা বলবো।"

কিছুক্ষণের মধ্যে একজন রাশভারী মধ্যবয়ষ্ক ভদ্রলোক গগন বাবুদের দিকে এগিয়ে এলেন। সম্ভবতঃ ইনিই ম্যানেজার। কন্ঠে মাখন মিশিয়ে বললেন, "কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি স্যার?"

"বিরিয়ানি হবে না কেন?"

ম্যানেজার খুব বিনয়ের সাথে বললেন, "স্যার, আমাদের যে ছেলেটি বিরিয়ানি বানাতো, সে হঠাৎ বাড়ি চলে গেছে। তার মা খুব অসুস্থ। আমরা তো কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ করতে পারি না, তাই অন্য কাউকে দিয়ে বিরিয়ানি বানাচ্ছি না। প্লীজ স্যার, কিছু মাইন্ড করবেন না। আপনি অন্য কিছু অর্ডার করুন না... আমাদের কাশ্মীরি পোলাও টা স্যার একবার টেস্ট করে দেখতে পারেন.. আপনি ভুলতেই পারবেন না... আর আমাদের মাটন রোগান জোশ... একদম টপক্লাস! ম্যাডাম কি চিকেন প্রেফার করেন? তাহলে আমাদের স্পেশাল চিকেন..."

শেষের কথাগুলো গগন বাবুর কানে আর পৌঁছাচ্ছিলো না। যতই মাইন্ড করতে বারণ করুন, গগন বাবুর মনের যে এখন কী অবস্থা তা এই ম্যানেজারের ব্যবসায়িক মাথায় তা ঢুকবে না।

প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ক্লান্ত শরীরটাকে নিয়ে অবশেষে বাড়ির কাছাকাছি এসে পৌঁছলেন দুজনে। বড় বড় ব্যাগগুলো এতক্ষন ধরে হাতে ধরে থাকায় ব্যথা হতে শুরু করেছে। পেটেও ক্ষিদেতে ছুঁচোর ডন দিচ্ছে। বিরিয়ানি নেই শুনে রমলা দেবী বলেছিলেন, "এসেই যখন পড়েছেন যা হোক কিছু খেয়ে নিলেই  হয়"। কিন্তু গগন বাবু নাছোড়বান্দা। তিনি খাদ্য বিলাসী। মনের তৃপ্তি যদি না থাকে সে যত সুস্বাদু খাবারই হোক না কেন তাঁর জিভে তা বিস্বাদই লাগবে। তিনিও চট করে হাল ছাড়েন নি। আরও দু তিনটে রেস্তোরাঁতে ঢু মেরেছেন। কিন্তু বেশি রাত হলে যা হয়, কোথাও বললো বড় অর্ডার ছিল সব বিরিয়ানি শেষ হয়ে গেছে, তো কোথাও বললো কারিগর এতো রাতে বিরিয়ানি বানাতে পারবে না। সত্যি, কি নিষ্ঠুর লোক এরা! এদের যত খ্যাতি, যশ, নাম, প্রতিপত্তি সব তো এই গগন বাবুদের মতো ভোজন রসিকদের জন্যই, আর এরাই কিনা গগন বাবুর রসনার কথা একটু ভাবলো না! ওনার মনের বাসনাকে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিতে একটুও কুণ্ঠা বোধ করলো না এরা!

কলকাতায় শুনেছেন এক ফোনে দশ মিনিটে দরজায় বিরিয়ানি এসে হাজির হয়। দিনরাত বাইকে করে খাবার হোম ডেলিভারি করে বেড়ায়। কিন্তু এই মফঃস্বল শহরে সবাই যেন তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়ে। কে শুনবে তাঁর কথা? তিনি তো বিশাল কিছু চান নি, শুধু ভালো বিরিয়ানি খেতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই ইচ্ছারও কেউ মূল্য দিল না। বরং স্ত্রীর সামনে তাঁর মান সম্মান সবাই মিলে ধুলোতে মিশিয়ে দিল।

বাড়ি ফিরে খাবার টেবিলে বসে প্রায় গোগ্রাসে গিলে খেলেন সব খাবার। ক্ষিদে বেশ ভালোই পেয়েছিল। পেটটা ভরতেই মন টা একটু হালকা হল গগন বাবুর। মনে মনে ভাবলেন, "নাহ্, রমলা ঠিকই বলে! খাবার তো পেট ভরানোর জন্যই, পেট ভরে গেলেই হল, অত বিলাসিতার দরকার কি!"

"বিরিয়ানি যে এতরকমের হয়, তা তো আমার জানা ছিল না! ... হ্যাঁ, কলকাতা বিরিয়ানি, যেটা আলু দিয়ে করতে হয়, ওর রেসিপি টাই বল... অ্যা! কতটা লাগবে বললি? আরেকবার বল... আমি লিখে নিচ্ছি..."

রমলার গলাই তো! ফোনে কারও সাথে কথা বলছে মনে হচ্ছে। কিন্তু ও বিরিয়ানির রেসিপি নিয়ে... বিরিয়ানি নিয়ে এত মাথা খারাপ করলে এইসব উল্টোপাল্টা স্বপ্নই তিনি দেখবেন। গগন বাবু পাশ ফিরে শুলেন। কিন্তু আবার ফোন এলো। এবার তাঁর কানের কাছেই মোবাইলটা বাজছে মনে হচ্ছে। না স্বপ্ন না, সত্যিই তাঁর মোবাইলটা বাজছে। অতীন দার ফোন।

"সকাল সকাল একটু বিরক্ত করলাম। বলছি শরীর ঠিক আছে তো, মানে পেট...", বেশ নিচু গলায় অতীন বাবু কথা গুলো বললেন।

"হ্যাঁ, আপনি ভালো আছেন তো?"

"আরে ওই জন্যই তো ফোন করলাম! সকাল থেকে পেট গুড়গুড় করছে, দশ বারোবার তো হয়েই গেলো। কাল 'বেস্ট বিরিয়ানি' এর দিকে তোমাকে যেতে দেখলাম, তাই আর কি..."

গগন বাবু এবার আসল ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারলেন। কিন্তু তিনিও মনখারাপের কথা আর মনে করতে চান না। তাই একটু মিথ্যাই বললেন, "না না আমি তো জুতোর দোকানে গিয়েছিলাম।"

অতীন বাবু হচ্ছেন গগন বাবুর অফিসের সহকর্মী, বয়সে অনেক বড় হলেও একই পাড়ায় বাস। তাই যাওয়া আসার পথে সুখদুঃখের অনেক গল্পই করেন। উনিও গগন বাবুর মতই বিরিয়ানির খুব ভক্ত। কিন্তু ওনার আক্ষেপ একটাই। "ছোটো বেলায় পকেটে পয়সা ছিল না, আর যখন পয়সা হল তখন সুগার কোলেস্টেরোলে ধরলো। বিরিয়ানি আর খেতে পারলাম কই!" অতীন দার মুখে প্রায়ই শুনে আসতেন গগন বাবু। কিন্তু তাও তিনি যে বাড়ির লোকজনদের লুকিয়ে বেশ ভালই বিরিয়ানি সাঁটিয়ে আসেন, তা গগন বাবু ভালো করেই জানেন। আর গতকালও অতীন বাবু যে 'বেস্ট বিরিয়ানি' তে খেতে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি একদম নিঃসংশয়। সত্যি, সবাই এদিক ওদিক করে ঠিক জোগাড় করে ফেলছে, আর তার বেলাতেই শুধু নেই নেই... ঈশ্বরের এ চরম অবিচার!

রবিবার সকাল সকাল ঘুম টা চটকে দিল। বিরক্তি মুখে পাশ ফিরে শুতে যাচ্ছিলেন গগন বাবু। এমন সময় স্ত্রীর ডাক, "আর ঘুমাতে হবে না, ওঠো বাজারে যেতে হবে। লিস্ট করে দিচ্ছি, আর মাংসের দোকানে গিয়ে বড় লেগ পিস গুলো দেখে নেবে। তাড়াতাড়ি যাও, আমি ম্যারিনেট করে রাখবো।"

"ম্যারিনেট?"

"হ্যাঁ, আজ বিজু ফোন করেছিলো। কি সব অরিজিনাল ডকুমেন্টস লাগবে তাই আজ বাড়ি আসছে।"

বিজু ওনাদের একমাত্র ছেলে। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে।

"আরে ও আবার কষ্ট করে আসছে কেন? আমিই না হয় দিয়ে আসতাম।"

"আরে থামো না! ছেলেটা আসতে চাইছে আসুক না, হোস্টেলে ঠিক করে খেতে পারে না, ওই যা রান্না!"

"হোস্টেলের রান্না তো ওরকমই হয়..."

"তাই বলে এত বাজে! এই কদিনে কত রোগা হয়েছে জানো?"

"কেন? তুমি যে বলো খাওয়া টাই জীবনের সব না।"

"সে তো তোমাকে বলি..." 

"বাহ্ রে, নিয়ম কি এক এক জনের জন্য এক এক রকম?"

"সত্যি! তুমি আর বিজু এক হলে? চল্লিশের পর ডাক্তাররাই তো খাওয়া দাওয়া লিমিট করতে বলে... তাছাড়া তুমি চাইছো বিরিয়ানি, আর ওদিকে ছেলেটা যে ভাতই খেতে পারছে না, সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই... কিরকম বাবা তুমি?"

গগন বাবু চুপ করে গেলেন, রবিবারের সাতসকালে এত ঝগড়া ঝাটি পোষায় না। তারপরে যদি শোনেন অতীন বাবু কে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাহলে তো আর রক্ষে নেই! 

রমলা দেবী আবার তাড়া দিয়ে বললেন,"তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও! ছেলেটা একদিনের জন্য আসছে, ভাবছি আজ বিরিয়ানি বানাবো। খেতে বড় ভালোবাসে।"

গগন বাবু নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি স্বপ্ন দেখছেন না তো! মুখ দিয়ে শুধু বের হল, "বিরিয়ানি বানাবে তুমি?"

"হ্যাঁ, কেনো আমি বানাতে পারবো না?"

"না মানে, বানাতে দেখিনি তো কখনও...", আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলেন গগন বাবু।

"আজ মনে হচ্ছে সবাইকে না খেয়েই থাকতে হবে!" মনে মনে বললেও মুখ ফুটে বলার সাহস পেলেন না তিনি। রমলা দেবী এবার বললেন, "আরে, আমার বান্ধবী ময়না আছে না! ও তো দারুণ বিরিয়ানি বানায়, অনেকের মুখেই খুব প্রশংসা শুনেছি। আমি ওকে ফোন করে রেসিপি জেনে নিয়েছি। একদম দম বিরিয়ানি।"

রমলা দেবী সকাল থেকেই বেশ উত্তেজনায় ফুটছেন। সাথে একটা চাপা টেনশন তো ছিলই। তিনি কি পারবেন ছেলে ও স্বামীকে ওদের সবচেয়ে প্রিয় বিরিয়ানি খাওয়াতে? সকাল থেকেই তিনি মনপ্রাণ ঢেলে রেসিপি অনুসারে সব করেছেন। বার কতক ময়না দেবী কে ফোনও করেছেন। এখন তাঁর রেজাল্ট বেরোনোর পালা।

অনেক দিন পর গগন বাবু আজ স্ত্রী ও ছেলেকে একসাথে নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারবেন। বেশ গুছিয়ে বসে অধীর আগ্রহে সেই মাহেন্দ্রক্ষনের অপেক্ষায় আছেন। যদিও একটা উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। অবশেষে এলো সেই মুহূর্ত। সুগন্ধে ভরে গেছে চারিদিক। এখন শুধু স্বাদ গ্রহণের অপেক্ষা। ধোঁয়া ওঠা হাড়ি থেকে বাসমতী রাইসের লম্বা দানা আর বড় একটা লেগ পিস পাতে পড়তেই গগন বাবু আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। মুখে পুরেই চোখ বন্ধ করলেন। এক অনির্বচনীয় পরিতৃপ্তিতে ভরে উঠলো তাঁর মন। অনেক ঝড় ঝাপটা, অপমানের পর এই অতিপ্রতিক্ষিত মুহূর্ত যেন স্বাদ আরও দশ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।  আজ বিরিয়ানি মুখে দিয়ে যে স্বর্গীয় সুখ উপলব্ধি করলেন, তা তিনি আগে কখনও পান নি। 

ছেলে এর মধ্যে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে ফেলেছে, "মা প্রথমবারেই ছক্কা হাঁকিয়েছ। সবকিছুই একদম পারফেক্ট। লেগ পিসটাও খেতে দারুণ হয়েছে, একদম মাখনের মত নরম।" 

এদিকে গগন বাবু কোন কথা না বলেই খেয়ে যাচ্ছেন। রমলা দেবী একটু চিন্তায় পড়লেন, তাহলে কি ওনার পছন্দ হয় নি? অবশেষে খাওয়া শেষ করে একটা বড় ঢেঁকুর তুলে গগন বাবু সগর্বে ঘোষণা করলেন, "আর বাইরের বিরিয়ানি নয়, এবার থেকে আমি বাড়ির বিরিয়ানিই খাবো।"

...(সমাপ্ত)...

Wednesday, October 21, 2020

ডাক্তারের গাফিলতি

ছবি : ইন্টারনেট
ডা. প্রাণেশ মণ্ডল

       "সাপে কেটেছে!" ডাক্তার বাবুর মুখে কথাটা শুনে রতন সত্যিই আকাশ থেকে পড়লো। সাপে যেখানে কামড়ায় খুব জ্বালা যন্ত্রণা করে, রোগী অন্তত বুঝতে পারে কিছু একটা কামড়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তো সেসব কোনো লক্ষণই ছিল না!

পাশ থেকে ওর স্ত্রী বলে উঠলো, "সে কি করে হবে? কেউ তো সাপ দেখতে পায়নি! দাঁত বসার চিহ্নও তো নেই…"

ডাক্তার বাবু বললেন, "সে নেই…তবে কালাচ…আপনারা যাকে ডোমনাচিতি বলেন, ওই সাপে কামড়ালে এরকম হতে পারে। রোগী দুই চোখই খুলতে পারছে না…টোসিস শুরু হয়ে গেছে। এক্ষুনি এ.ভি.এস চালাতে হবে।"

--"সেটা কি?"

--"বিষাক্ত সাপে কামড়ালে যে অ্যান্টি ভেনম ইনজেকশন দিতে হয় সেটা।"

--"সে কি বলছেন? সাপে কেটেছে নাকি সেটাই তো ঠিক করে বোঝা গেল না!"

--"তাহলে আপনারাই তো চিকিৎসা করতে পারতেন! এখানে আনার দরকার কি ছিল?", একটু ঝাঁঝিয়েই বলে উঠলেন ডাক্তার বাবু।

ধমক শুনে রতন কাঁচুমাচু করে বলে উঠলো, "আমি মুখ্যু-সুখ্যু লোক, অত কিছু কি জানি!আপনি যা ভালো মন্দ বোঝেন করেন স্যার।"  

কিন্তু সাপে কাটলে পেটে ব্যথা হয়... এরকম কথা তো রতন কখনও শোনেনি! ছেলেটা বাঁচবে তো? সে আর চাপ নিতে পারছিল না, তার ছোট মাথায় কিছুই যেন ঢুকছিল না। তাই হাসপাতালের বাইরে একটা গাছের নিচে গিয়ে বসল সে।

রতন দিনমজুরি করে ছোট সংসারটা কোনরকমে চালায়। বছর সাতেকের রোহন তার একমাত্র সন্তান। গরমের জন্য মাটির ঘরের খোলা বারান্দায় মাদুর পেতে ঘুমিয়েছিল সে। সারাদিন হাড় ভাঙা খাটুনির পর তাদের সন্ধ্যের দিকেই শুয়ে পড়ার অভ্যেস। অত্যধিক গরম থাকলে খোলা জায়গায় মশারি ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়ে অনেক সময়। সেদিনও রতন ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিয়েছিল বিছানায়, চোখে ঘুম আসতে বেশি সময় নেয় নি। তখন বোধহয় রাত দুটো, তার হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। দেখে রোহন অসহ্য পেটের ব্যথায় কাতরাচ্ছে। ওর স্ত্রী ব্যথার ওষুধ খাওয়ায়, তাতেও কোনো লাভ হয় না। শেষে পাড়ার এক হাতুড়ের বাড়ি নিয়ে যায়। তিনি তিনটে ইনজেকশন দেন। কিন্তু ব্যথা যেন ক্রমশ বাড়তেই থাকে। এদিকে রোগীও ক্রমশ যেন নেতিয়ে পড়ছে। একসময় চোখের পাতা দুটি খোলাও কষ্টকর হয়ে পড়ে রোহনের পক্ষে। খারাপ লক্ষণ দেখে একটা গাড়ি জোগাড় করে যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছাল তারা, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে কেবল।

এমনিতেই অনেক দেরি করে এনেছিল। তারপর এইসব কথাবার্তা...তাঁর মাথাটা একটু গরম হয়ে গিয়েছিল। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান, দুশ্চিন্তায় ওরা হয়তো উল্টোপাল্টা বলে ফেলেছে...এভাবে না বললেই হয়তো ভালো করতেন বলে মনে করলেন ডাক্তার বাবু। যদিও তিনি অসীম ধৈর্য্যের অধিকারী, তাও তো তিনি রক্তমাংসের মানুষ। সারারাত ধরে প্রসূতি মা থেকে শুরু করে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট...সব ধরনের রোগীই দেখতে হয়েছে। তারপর রোগীকে এরকম খারাপ অবস্থায় নিয়ে এসেছে দেখে মাথাটা আর ঠিক রাখতে পারেন নি।

এ.ভি.এস ও যাবতীয় ইনজেকশন দিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে গেলেন ডাক্তার বাবু। কিন্তু এ.ভি.এস পুরোটা শরীরে যাওয়ার আগেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। এইরকম গ্রামীণ হাসপাতালে ভেন্টিলেশন থাকে না। আবার এই অবস্থায় পঞ্চাশ কিমি দূরের সদর হাসপাতালে রেফার করাও মুশকিল...পৌঁছানোর আগে রাস্তাতেই রোগী মারা যেতে পারে।

অ্যাম্বুব্যাগ দিয়ে ম্যানুয়াল ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করেও কিছু করা গেল না। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রোগী ঘন্টা খানেকের মধ্যেই মারা গেল। রোগীর সাথে থাকা রতনের স্ত্রী বুক ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লো। বহু মৃত্যুকে তিনি কাছ থেকে দেখলেও রোহনের জন্য ডাক্তার বাবুর মন সত্যিই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু চিকিৎসায় সাড়া না দিলে তাঁরও তো কিছু করার নেই। তিনিও একজন সাধারণ মানুষ, তাঁর ক্ষমতাও তো সীমিত।

খবর পেয়ে রতনও সেখানে চলে এসেছে। সাথে আরও চার পাঁচজন লোক। সাত বছরের একমাত্র ছেলের হঠাৎ মৃত্যুতে সবাই গভীর শোকে নিমগ্ন। এমন সময় রোগীর চারপাশের ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন চেঁচামেচি শুরু করলেন, "এখানে কোনো চিকিৎসা হয় না। এই ডাক্তারের দোষেই মায়ের কোল খালি হল।"

অনতি দূরেই অন্য রোগী দেখতে তখন ডাক্তার বাবু ব্যস্ত। হাসপাতালের গ্রুপ ডি স্টাফ সমর বাবু ডাক্তার বাবুর কাছে গিয়ে বললেন, "স্যার, আপনি রেস্ট রুমে চলে যান। অবস্থা বেগতিক লাগছে।"

--"কে লোকটা?"

--"প্রদীপ মাস্টার বলেই সবাই চেনে। একসময় মাস্টারি করতো, এখন এখানে ওখানে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়।"

--"রোগী ফেলে রেখে আমি কোথাও যেতে পারব না। আমি তো কিছু ভুল করিনি।"

প্রদীপ মাস্টারের কথা শুনে তাঁর সাথে আসা লোকজন গুলোও এবার হৈচৈ শুরু করে দিল। কেউ পাশে রাখা স্যালাইনের স্ট্যান্ড তুলে মাটিতে আছাড় মারলো।  যেটা অন্য একটা রোগীর বাড়ির লোকের পায়ে গিয়ে লাগলো। অন্য একজন সাজিয়ে রাখা স্যালাইনের বোতল গুলো ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো। বাকিরা সিস্টারের টেবিলে রাখা আপৎকালীন ইনজেকশনের ট্রে  থেকে অ্যাম্পুল, ভায়াল গুলো ভেঙে নষ্ট করতে থাকল। টেবিলে রাখা মোটা মোটা খাতা, যেগুলোতে রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য নথিভুক্ত করা হত, সেগুলোও রেহাই পেল না। টেবিলের ওপরে রাখা কাঁচ ভেঙে টেবিল উল্টে হাসপাতালের স্টাফদের দিকে তেড়ে গেল ওরা। এর মধ্যে প্রদীপ মাস্টার ডাক্তার বাবুর কাছে পৌঁছে গেছেন। ডাক্তার বাবু তখন একমনে ওষুধ প্রেসক্রিপশন করে যাচ্ছেন। হঠাৎ ডাক্তার বাবুর জামার কলার ধরে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দিলেন প্রদীপ বাবু। রোগীর বাড়ির লোক থেকে শুরু করে হাসপাতালের স্টাফ...সবার সামনে এত তাড়াতাড়ি ঘটনাটা ঘটে গেল যে সবাই হতচকিত হয়ে গেল। এতেই থেমে থাকলেন না প্রদীপ বাবু...আরও একটা চড় কষাতে উদ্যত হলেন। কিন্তু তার আগেই সমর বাবু হাতটা চেপে ধরলেন। প্রদীপ মাস্টার চিৎকার করে বলতে লাগলেন, "আপনি ডাক্তার না পিশাচ? একটা দুধের বাচ্চা কে এভাবে মারতে আপনার একটুও হাত কাঁপলো না?"

--"আমি মারলাম কোথায়? রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। যা যা করার দরকার ছিল সবই করেছি আমি।"

--"পেট ব্যথার রোগীকে আপনি সাপের বিষের ইনজেকশন দিলেন! আপনি কি গাঁজা খেয়ে ডাক্তারি করতে এসেছেন? ওই ইনজেকশনের জন্যই একটা নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ গেল!"

কিন্তু প্রত্যুত্তর দেওয়ার আগেই সমর বাবু ও অন্যান্য স্টাফরা ডাক্তার বাবুকে ধরে রেস্ট রুমে নিয়ে চলে গেলেন। প্রদীপ বাবুর সাগরেদরা দরজার পাল্লা, জানালার কাঁচ, অক্সিজেনের নল, টিউব লাইট কিছুই আস্ত রাখলো না।

ওয়ার্ডের সিস্টার এর মধ্যে পাশের পুলিশ ফাঁড়িতে ফোন করে দিয়েছিলেন। খবর পেয়ে পুলিশ ফাঁড়ির হেড কনস্টেবল কোনো রকমে ইউনিফর্ম পড়ে হাসপাতালের দিকে হাঁটা দিয়েছেন। দূর থেকে ওনাকে আসতে দেখে প্রদীপ মাস্টার সবাইকে শান্ত হতে বললেন। তারপর নিজে  পুলিশের কাছে গিয়ে বলেন, "ডাক্তারের গাফিলতিতে এক মায়ের কোল খালি হল। আবেগের বশে বাড়ির লোক মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। আমরা দোষীর কঠোর শাস্তি দাবি করছি।"

আজ জীবনের সবথেকে অপমানজনক দিন তাঁর কাছে। প্রায় কুড়ি বছর ধরে এই হাসপাতালে চাকরি করছেন ডাক্তার বাবু। দিন রাত জেগে নিরলস পরিশ্রম হাসি মুখে মেনে নিয়েছেন। কত ডাক্তার বাবুই তো এলেন, আবার চলেও গেলেন...একমাত্র তিনিই থেকে গেলেন এতগুলো বছর ধরে। এই প্রত্যন্ত গ্রামীণ হাসপাতালের না আছে থাকার জন্য একটা ভদ্রস্থ কোয়ার্টার, না আছে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা, না আছে দোকানপাট বা বিনোদনের জায়গা। এখানকার বেশির ভাগ মানুষই খুব দরিদ্র, শিক্ষিতের হারও খুব কম। রেফার করলে অন্যত্র যাবার সামর্থ্যও নেই এদের। শুধু ওদের মুখ চেয়েই তিনি এতগুলো দিন কাটিয়ে দিয়েছেন। ভালো করেই জানেন তিনি না থাকলে  এই মানুষ গুলোকে হাতুড়ের ভরসাতেই থাকতে হবে। কিন্তু আজ যা হল সেটাকে তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। নতুন আরেকজন চিকিৎসক সম্প্রতি এখানে কাজে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর শরীর অসুস্থ থাকায় আসতে পারেননি। তাই উনিই ওভার ডিউটি করছিলেন। শুধু রোগীর প্রতি ভালোবাসা আর গরীব মানুষগুলোর কথা ভেবে তিনি এই বয়সেও এত পরিশ্রম করতে রাজি হয়েছেন। এতদিনের পরিশ্রম, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বিনিময়ে যে সম্মানজনক জায়গাটা তিনি অর্জন করেছিলেন, আজ এক লহমায় সেখান থেকেই মাটিতে নামিয়ে অপরাধীর আসনে বসানো হল  তাঁকে। ওই থাপ্পড়টা তাঁর গালে মেরেছে, কিন্তু আঘাতটা লেগেছে মনে। বিনা অপরাধে এত বড় অপবাদ মাথায় নিয়ে তাঁকে মাথা নিচু করে রেস্ট রুমে বসে থাকতে হচ্ছে!

হাসপাতাল চত্বরে সেদিন বিশাল হৈ হট্টোগোল...মাইকে প্রচার চলছে। "ডাক্তারের গাফিলতিতে মৃত্যুর শাস্তি চাই"।  একপক্ষ প্রচার করে বাড়ি গেল তো অন্যপক্ষ নেমে পড়ল। কোন পার্টি রোগীর কত আপন...তার প্রতিযোগিতা চলতে থাকল সারাদিন ধরে। এর মধ্যে ওপরমহল থেকেও ডাক্তার বাবুর কাছে বেশ কয়েক বার ফোন এলো পুরো ঘটনার বিবরণ চেয়ে। সবাই আশ্বাস বাণী শুনিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে অনুরোধ করলো। কিন্তু প্রদীপ মাস্টারের দলবল কর্মরত ডাক্তারের গায়ে হাত তুলে, সরকারী জিনিসপত্র নষ্ট করেও সদর্পে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এর মধ্যে একজন চুপিচুপি ডাক্তার বাবুর কাছে টাকার বিনিময়ে রফার প্রস্তাবও নিয়ে এলো। কিন্তু ডাক্তার বাবু একগুয়ে। যেখানে তাঁর কোনো দোষই নেই, সেখানে অন্যায় আবদার তিনি মেনে নেবেন না।

এই মানসিক আঘাত ও অপবাদ তাঁর ওপর এমন প্রভাব ফেলল যে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন তিনি এখান থেকে চলে যাবেন। কাজের দায়িত্বভার কাউকে না বুঝিয়ে তিনি যেতে পারবেন না, তাই নতুন ডাক্তার বাবুর আসা অব্দি অপেক্ষা করতেই হলো। ঝামেলার খবর পেয়ে তিনি রাতের মধ্যেই চলে আসবেন জানালেন। সেদিন সারাদিনের রোগীর চাপও কম ছিল না। লন্ডভন্ড করা ওয়ার্ড ও নির্বিচারে ভাঙচুর করা সরঞ্জাম গুলো আবার কোনরকমে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে তিনি সব রোগীর চিকিৎসা করলেন। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন। ঠিক করলেন পরদিন খুব সকালেই তিনি জিনিসপত্র নিয়ে চিরদিনের জন্য এই হাসপাতালকে বিদায় জানাবেন।

সব মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে শেষবারের মত বিগত কুড়ি বছরের সুখ দুঃখের সাথী এই হাসপাতালটাকে একবার শেষবারের মত চোখের দেখা দেখে গাড়িতে উঠবেন ঠিক করলেন। এমন সময় একটা বাচ্চা মেয়ে ছুটে এলো ওনার কাছে। রিনিকে দেখেই ডাক্তার বাবু চিনতে পারলেন...তাঁর কাছে প্রায়ই ওষুধ নিতে আসে মেয়েটা। রিনি কাঁদতে কাঁদতে বললো, "ডাক্তার বাবু আমার মা কে দেখুন না! মা ছাড়া যে আমাকে দেখার আর কেউ নেই!"

ডাক্তার বাবু দেখলেন একজন মধ্য বয়স্ক মহিলাকে দুজন কোনরকমে রিক্সাভ্যানে চাপিয়ে নিয়ে এসেছে। কাছে গিয়ে জানতে পারলেন ওনার স্বামী সারাদিনই নেশা করে পড়ে থাকে। রিনির মা সারাদিন পরিশ্রম করে সংসারের খরচ জোগান। কিন্তু গত রাতে নেশা করে ওনার স্বামী খুব মারধোর করে ওনাকে। এত অত্যাচার ও কষ্ট সহ্য করতে না পেরে উনি শেষে কীটনাশক খান। ডাক্তার বাবু মোবাইলের টর্চ দিয়ে দেখলেন চোখের তারারন্ধ্র একটা বিন্দুর মত ছোট হয়ে গেছে, মুখ দিয়ে প্রচুর লালা বেরোচ্ছে, কথা বলার শক্তিও নেই। এক মুহূর্ত দেরি করলে এই রোগী বাঁচানো খুব মুশকিল। তিনি রোগী কে ভিতরে নিয়ে যেতে বলে তড়িঘড়ি অ্যাট্রোপিন চালানোর নির্দেশ দিলেন সিস্টার কে।

এতকিছু ঘটনার পরও আরও একটা মরণাপন্ন রোগীকে নিয়ে ডাক্তার বাবু যেভাবে তৎপরতার সাথে চিকিৎসা করে চলেছেন, তা দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। রিনির মা ক্রমশ চিকিৎসায় সাড়া দিতে লাগলেন। আশঙ্কা কেটে যেতেই নতুন ডাক্তার বাবুকে সব বুঝিয়ে তিনি গেটের দিকে পা বাড়ালেন।

গেটের কাছে রতন কে দেখে বেশ অবাক হলেন। কিছু বলার আগেই রতন ওনার পায়ে এসে পড়লো। বললো, "আমাকে ক্ষমা করে দেন ডাক্তার বাবু। আপনি অনেক করেছেন আমার ছেলের জন্য...ওর মা আমাকে সব বলেছে। আপনি সাপে কেটেছে বলছিলেন, ঠিকই বলেছিলেন। আজ একটা বড় ডোমনাচিতি সাপ ধরা পড়েছে।"

--"হ্যাঁ, আমি তো বলেছিলাম...ওই সাপে কামড়ালে জ্বালা যন্ত্রণা থাকে না, রোগী বুঝতেও পারে না বেশিরভাগ সময়। অনেক সময় ঘুমের মধ্যেই রোগী মারা যায়। আর এই সাপের কামড়ে পেট ব্যথা, গলা ব্যথার মত অদ্ভুত উপসর্গ থাকে। তোমাদের আসতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। তাই কিছু করা গেল না।"

কথা গুলো বলেই ডাক্তার বাবু গাড়িতে উঠতে গেলেন। রতন বললো "ডাক্তার বাবু বাড়ি যাচ্ছেন?"

--"হ্যাঁ, আর আসবো না। নতুন ডাক্তার বাবু কে সব বলা আছে, উনিই এখন থেকে দেখবেন তোমাদের।"

--"কিন্তু আপনি কেনো চলে যাচ্ছেন? আপনি চলে গেলে আমাদের কে দেখবে? ওই প্রদীপ মাস্টারের জন্যই এই কান্ড হল! বিশ্বাস করুন... আমি ওনাকে ডাকি নি। উনি সকালে হাঁটতে বেড়িয়ে আমাকে দেখে নিজে থেকেই হাসপাতালে এসে ঝামেলা শুরু করে দিলেন। শুনলাম উনি নতুন পার্টিতে নাম লিখিয়েছেন, সামনের ভোটে টিকিট পাবেন। তাই হাসপাতালে এসে ক্ষমতা জাহির করে গেলেন। এদের জন্য আপনি চলে যাবেন? আপনি চলে গেলে আমরা কোথায় যাবো?"

কথাগুলো শুনে মনটা যেন একটু হালকা হল ডাক্তারবাবুর। যাক কেউ তো বুঝেছে! কিন্তু ওই অপমান এত সহজে তিনি কিভাবে ভুলবেন? নামিয়ে রাখা ভারি ব্যাগটা গাড়িতে তুলতে গেলেন। কিন্তু কিসে যেন বাধা পেলেন। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন রিনি ব্যগটাকে খামচে ধরে আছে। তার দুই গাল  বেয়ে নেমে আসছে অশ্রুধারা! সর্বশক্তি দিয়ে সে ব্যাগ টাকে আটকে রেখেছে। ডাক্তার বাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তোর কি হল রে?"

সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, "আপনি চলে যাবেন না..."

রিনির সাথে আশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীর বাড়ির লোকেরাও কাতর আবেদন জানাতে থাকলো।

ততক্ষনে খবর পেয়ে গ্রামবাসীরাও এসে ভিড় করতে লেগেছে। ভিড়ের মধ্যে প্রায় সব মুখই ডাক্তার বাবুর চেনা। একজন বৃদ্ধা লাঠি হাতে এগিয়ে এসে বললেন, "আমার ছেলে আমাকে দেখে না, তুমি আমাকে দেখে সুস্থ করেছো... তুমিই তো আমার ছেলে! আমাদের লুকিয়ে তুমি চলে যাচ্ছ কেন বাবা? রিনি না ডাকতে গেলে তো আমরা জানতেও পারতাম না!"

একজন মধ্য বয়স্ক ভদ্রলোক এসে বললেন, "আমাদের যখন যা হয়েছে, আপনার কাছে এসেছি... আপনার জন্যই আমার পরিবারের সবাই মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছে। আমরা কি দোষ করলাম যে এত বড় শাস্তি পেতে হবে আমাদের?"

সত্যিই এদের তো কোনো দোষ নেই! এরা সবাই তাঁর পরিবারের লোকের মত। সবার চোখই অশ্রুসিক্ত...সবার মুখেই ফুটে উঠেছে অসহায় আকুতি। কেউই তাঁকে বিদায় দিতে চায় না। এত বুকভরা ভালোবাসা, এত গরীবের চোখের জল, এত মানুষের ভরসা ...এসব কি এতই ঠুনকো, যে প্রদীপ মাস্টারের একটা থাপ্পড়ে সব শেষ হয়ে যাবে!

আবেগ প্রবণ ডাক্তার বাবু বুঝতে পারলেন নিজের অজান্তেই কখন তার দুই চোখের অবাধ্য জল দৃষ্টিকে ঝাপসা করেছে। সেই ঝাপসা দৃষ্টি পথেই দেখলেন একটা গাড়ি এসে থামলো। একজন লোক গাড়ি থেকে নেমে ভিড় ঠেলে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এসেই লোক টা হাত জোড় করে বললো, "বড় ভুল হয়ে গেছে, ক্ষমা করে দিন ডাক্তার বাবু।"

চমকে উঠলেন ডাক্তার বাবু, এ তো প্রদীপ মাস্টার! ততক্ষনে প্রদীপ বাবু তাঁর পায়ে এসে পড়েছেন। গলা তুলে বলতে শুরু করলেন, "কাল যা ঘটেছে, তার পুরো দায় আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। প্লীজ যাবেন না আপনি!"

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন ডাক্তার বাবু…গিরগিটিও তো এত তাড়াতাড়ি রং বদলায় না! প্রদীপ মাস্টার এবার নিচু গলায় ধীরে ধীরে বললেন, "আপনার জনপ্রিয়তার কাছে আমি হেরে গেছি। কিন্তু সামনে ভোট, সেখানে হারলে তো আর চলবে না!"

drmondalpranesh@gmail.com
কলকাতা