1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label মানসী গাঙ্গুলী. Show all posts
Showing posts with label মানসী গাঙ্গুলী. Show all posts

Sunday, September 25, 2022

ঠিকানাঃ- ব্রেকডান্স অ্যাভিনিউ

ছবি : ইন্টারনেট

ঠিকানাঃ- ব্রেকডান্স অ্যাভিনিউ

মানসী গাঙ্গুলী 

 

        ছোট থেকেই বাড়িটা আমার কাছে এক রহস্য। অজানা এক আকর্ষণ বোধ করি বাড়িটার প্রতি। যখনই মামারবাড়ি গেছি ছাদে উঠেছি বাড়িটাকে দেখার জন্য। হ্যাঁ, বাড়িটা আমার মামারবাড়ির পাড়ায়। সমস্ত পাড়া থেকে একটু দূরে যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে রয়েছে ওই পেল্লায় বাড়িখানা। যেন একটা প্রকান্ড পরিত্যক্ত তোরঙ্গের মতো বসানো মাঝখানে। আশপাশে বাড়িঘর নেই, আছে বাড়িসংলগ্ন কাঠা কুড়ি জমি। নানারকম ফলের গাছ রয়েছে সে জমিতে। রয়েছে একটা পুকুর, তার শানবাঁধানো ঘাট। প্রয়োজনে সে পুকুর ব্যবহৃত হয়। মাঝেমাঝে জালও পড়ে সে পুকুরে। তখন বাড়ির পুরুষমানুষেরা তাদের ভাগ বুঝে নিতে সাতসকালে ভিড় করে পুকুরপাড়ে। পানকৌড়ি ডুব দেয় সে পুকুরে টুপটুপ করে। বাগানের গাছের ওপর মাছরাঙা বসে তাকিয়ে থাকে পুকুরের দিকে। কোনও মাছ জলের ওপর দিকে উঠলেই ছোঁ মেরে তুলে নেয় দু'ঠোঁটের মাঝে। বাগানে রয়েছে আম, কাঁঠাল, নারকেল ইত্যাদি ফলের গাছ। একটা স্বর্ণচাঁপা গাছ গরমের দিনে ভরে ওঠে ফুলে, তার সৌরভে সুরভিত করে তোলে বহুদূর পর্যন্ত। নানারকমের পাখি এসে বসে বাগানের গাছে, বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, তা ফুটে বাচ্চা হয়। গাছগুলোয় ফলন প্রচুর। সেসবও পারা হয় ছুটির দিনে, ভাগাভাগি হয়। ফলের সময় পাড়ার দুষ্টু ছেলেরা ভরদুপুরে ঘোরাঘুরি করে বাগানের চারপাশে। টের পেলে বাড়ির কেউ না কেউ গলা খাঁকারি দিলেই দৌড় মারে। অন্যসময় পাকা রাস্তা পেরিয়ে বিশেষ ও বাড়িমুখো হয় না ছেলের দল। মামারবাড়ি অবধি রাস্তাটা পাকা, তারপর ওই বাড়িতে পৌঁছাতে রাস্তাটা খোয়া বিছানো। রিক্সা, সাইকেল, বাইক, আলেকালে কখনও বা গাড়ি ঢুকলে কার্যত ব্রেকডান্স করতে করতে যায়, তাই এদিকের মানুষেরা রসিকতা করে ও বাড়ির ঠিকানাকে বলে 'ব্রেকডান্স অ্যাভিনিউ'।

          ৩০০ বছরের পুরনো বাড়িটায় বাসিন্দারা যেমন বংশলতায় জড়িয়ে আছে, বাড়িটার গা দিয়েও বট অশ্বত্থ গাছেরা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যথেচ্ছ বেড়ে উঠেছে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই ঐরকম একটা পোড়োবাড়িতে মানুষের বাস আছে। সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ বাড়িটা আজ। আগাছা জঙ্গলে ঢাকা দোতলা বাড়িটার দিকে তাকালে দিনের বেলাতেও গা-ছমছম করে। রাতের বেলা সব ঘরে আলো না জ্বললে ভূতেরবাড়ি বলে মনে হবে। খসে পড়েছে দেওয়ালের পলেস্তারা, ভেঙ্গে পড়েছে পুরনো ইঁটের দেওয়াল। বর্ষায় ছাদ ফেটে জল পড়ে কোনো কোনো ঘরে। দাগরাজি করে কোনোরকমে বাসের উপযোগী করা হয়। বলাই বাহুল্য, যার ঘরে জল পড়ে সে-ই সেটুকু মেরামত করে নেয়। কোথাও বা ঝুলছে কড়িকাঠ। একটু একটু করে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এককালের বনেদী বাড়িটা। চব্বিশটা ঘরের অতবড় দোতলা বাড়িটা যিনি করেছিলেন মনে তো হয় তিনি বিত্তবান মানুষ ছিলেন কিন্তু তার বংশের তৃতীয় কী চতুর্থ পুরুষেরা সব কোনোরকমে দিন গুজরান করে চলেছে এই জীর্ণ, ফাটলধরা বাড়িটিতে।

          বাড়িটার এক এক ঘরে এক এক গল্প। কোনও ঘরের মেয়ে মুসলমান ছেলের হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছে। এ বাড়ির দরজা তার জন্য তাই বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো ঘরের কত্তা নিরুদ্দেশ, কোনো ঘরে বা বেকার ছেলে অবসাদে ভোগে। এ সবই স্বাভাবিক এদের কাছে। এক একটা ঘরে এখন যারা রয়েছে এখান থেকে বেরিয়ে নিজের মত মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করার ক্ষমতা বা যোগ্যতা কোনোটাই তাদের নেই। তা নিয়ে তাদের  মাথাব্যথাও নেই তেমন। এরই মধ্যে একজন দু'জনের অবস্থার একটু উন্নতি হওয়ায় নিজের অংশের ঘরটুকুর নবীকরণ করার চেষ্টা করেছে। রঙের পোঁছ পড়েছে তার অংশের দেওয়ালে বেখাপ্পা রকমভাবে। ময়ূরপুচ্ছধারী কাকের মত দেখাচ্ছে সে অংশটুকুকে। কেউ আবার আরেকটু উন্নতি করায় নিজের ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ি ছেড়ে। কোথায় নাকি একটা ফ্ল্যাটও সে কিনেছে কিন্তু নিজের অংশের দাবি টিঁকিয়ে রাখতে পেল্লায় এক তালা ঝুলিয়ে গেছে ঘরে। ভুলেও আর এপথ মাড়ায় না সে। তালা ঝুলছে আরও একটা ঘরে দীর্ঘদিন ধরে। তারা নাকি মুম্বাই চলে গেছে। সেখানে ভালই আছে তারা কিন্তু নিজের অংশের দাবিটুকু বজায় রাখতে তার ঘরেও ঝুলছে তালা। বাড়িটার ঘরগুলোর কোলে বারান্দা। সেখানের মোটা মোটা ছালচামড়া ছাড়ানো থামগুলো এককালীন আভিজাত্যের পরিচায়ক। সেই থামগুলির গা থেকে চাঙড় খসে খসে বিচিত্র ডিজাইন তৈরি করেছে। তাদের গায়ে পেরেক ঠুকে বাড়ির বাসিন্দারা দড়ি টাঙিয়েছে জামাকাপড় শুকাতে। সে জামাকাপড়ের অবস্থাও বলে দেয় বাড়ির বাসিন্দাদের অবস্থা কেমন। সবকিছু নিয়েই বাড়িটায় গিজগিজ করছে দু'পেয়ে, হাত দিয়ে ভাত মেখে খাওয়া প্রাণী সব। পাঁচশরিকের ভাগাভাগিতে বাড়িটার ঘরে ঘরে বাসিন্দাদের মধ্যে এখন আর আত্মীয়তার বালাই নেই। লতায়-পাতায় খোঁজ করেও খোঁজ পাওয়া যায় না। কোন ডালে, আবডালে, কে যে কার সঙ্গে জড়িয়েছিল একসময় তার আর ইয়ত্তা নেই এখন। বাড়িটার চব্বিশটা ঘরে এখন ওরা প্রতিবেশী। অনেকগুলি পরিবারের পদবী এক, আবার বেশ কয়েকটির অন্য অন্য। হয়তো বা বাড়ির কোনও মেয়ে সম্পত্তি পেয়ে আস্তানা গেড়েছিল এ বাড়িতে। সে এখন যারা জীবিত সদস্য ঐ পরিবারের তারা জানেও না। তবু ও বাড়িতে কারও জন্ম হলে শুভ অশৌচ পালন করে কয়েকঘর, যেমন বরাবর চলে এসেছে। আবার মৃত্যু হলেও অশৌচ পালন করে, সম্পর্কে কে হয় না জেনেই। অথচ বাড়িটা যিনি তৈরী করেছিলেন কত সাধ করেই হয়তো করেছিলেন সবাইকে নিয়ে একত্রে একসঙ্গে থাকবেন বলে। তাই সে বাড়িতে নিচের তলায় আছে পেল্লায় এক রান্নাঘর, তার কোণে যজ্ঞিবাড়ির মত বিশাল আকারের এক উনুনের ভগ্নদশা আজও বিদ্যমান। আর পাশে তেমনই পেল্লায় এক খাবারঘর। তার পাশে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা ভাঁড়ার। সে ঘরে রয়েছে বিশাল সাইজের লোহার কড়া কয়েকটা, পেল্লায় সাইজের হাতা, খুন্তি যেগুলো বলে দেয় একান্নবর্তী পরিবারে কতগুলো মানুষের পাত পড়ত রোজ। ইঁদুরেরা সংসার পেতেছে আজ সে ভাঁড়ারে। সারা দিনরাত কিচিরমিচির আওয়াজ সেখানে ঢুকলেই। আর ফাঁকেফোকরে নাদিতে ভর্তি। বাড়ির এক বাসিন্দা কোনও কাজে গ্রামে গিয়ে সস্তায় একবস্তা চাল নিয়ে এসেছিল একবার। ওই ঘরে গুদাম করে রেখেছিল। আগামী কয়েকমাসের দায়ে নিশ্চিন্ত। ওই ভাঁড়ারে যে যার নিজের নিজের সবজিও আলাদা আলাদা ঝুড়িতে করে রেখে দেয়। কত আর ঘরে তুলবে! রান্নার সময় আবার টেনে নামানো, অনেক ঝকমারি। তো বস্তা থেকে কৌটোয় ক'দিনের মত চাল বার করে রেখেছিল বউটি। কৌটোর চাল ফুরালে বস্তা থেকে বার করতে গিয়ে দেখে ধেড়ে ইঁদুরে বস্তা কেটে বড় বড় গর্ত করে তার ভেতর নাদিতে ভর্তি করে রেখেছে। সে চালের বেশিরভাগই ফেলা গেল। বাকিটুকু ঢেলে রাখার মতো জায়গাও তার কাছে নেই। কী ভাগ্যি একটা বাড়তি হাঁড়ি ছিল তার, তাই তার মধ্যে ঢেলে রাখল। বাকি চাল ফেলতে ফেলতে চোখে জল এসে গেল তার। এরপর তো কর্তার কাছে সেকথা বলতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি। "আমি দু'পয়সা সুবিধা হবে বলে সাইকেলে করে সেই কোন মুলুক থেকে টেনে নিয়ে এলুম আর এমন অলক্ষ্মী মেয়েছেলে তা সামলে রাখতে পারল না।" মুখ বুজে বৌটি হজম করল, কোনও প্রতিবাদ করতে পারল না। কেবল হাপুসুটি কাঁদতে লাগল। পাশের ঘরের বউটি তার হয়ে দুটি কথা বলতে গেলে তাকেও দুটো কথা শুনিয়ে ছাড়ে কর্তা। সে আর ওদের মধ্যে থাকে না, চলে যায় সেখান থেকে। ওই রান্নাঘরে এখন আটটা উনুন জ্বলে। বিশাল উঠোনে তোলা উনুনে আগুন ধরিয়ে রান্নাঘরে তুলে নিয়ে গিয়ে রান্না করে তারা। বাকিরা জায়গা না পেয়ে খাবারঘরেই রান্নার ব্যবস্থা করে  নিয়েছে। এরা সবাই গ্যাসেই রান্না করে। রান্না করতে করতে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবও চলে তাদের মধ্যে। এক-আধবাটি তরকারির আদানপ্রদানও চলে কখনোসখনো। অত মানুষের গিজগিজে ভিড়েও গরমের দিনে কখনও বিছে, কখনও কেন্নাই ঘুরেফিরে বেড়ায় ঘরের মেঝে দিয়ে। রান্না করে যে যার রান্না খাবার নিয়ে যায় নিজের নিজের ভাগের দু'একখানা ঘরে। ঘরের কোলে চওড়া দালানটা চলাচলের জন্যই ছিল আগে।  সেখানে এখন কারও জুতোর সেল্ফ,কারও বইয়ের র্যাক, কারো বা জামাকাপড়ের আলমারি স্থান পেয়েছে। একটা ঘরে তো আর সংসার হয় না। ছেলেপুলেরা বড় হয়, কিছু জিনিসপত্র তো বাড়েই। চকমিলানো বাড়িটার মাঝে এখনও রয়েছে ভাঙ্গা জরাজীর্ণ ধানের মড়াই যা সেই ৩০০ বছর ধরে রয়েছে। তার ফোকর দিয়ে বাড়ির বৌ-ঝিয়েরা তাদের মাসিকের নোংরা ন্যাকড়া, ছেঁড়া ন্যাতাকানি, জুতো ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে। এছাড়া না জানি তার ভেতরে হয়তো বা সাপখোপেরা বাসা বেঁধে রেখেছে। সন্ধের পর উঠোনে কোনো আলো জ্বলে না। কোনো ঘর থেকে চিলতে আলো এসে যেটুকু ছিটকে পড়ে তাতে যাতায়াতের সময় কারও চোখে পড়েছে কখনও, কখনও বা সরসর করে আওয়াজ শুনেছে কেউ। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে সাইকেল নিয়ে তারই মধ্যে দিয়ে সাবধানে যাতায়াত করেছে তারা। এসব তাদের গা-সওয়া।

         ইঁদুরের গন্ধে বিড়ালের আনাগোনা সে বাড়িতে। তারা ঘুরে বেড়ায় বাড়ির যত্রতত্র। কারও পোষা নয় তবে খেতে দেয় সবাই। তবু সুযোগ পেলে চুরি করে এরওর ঘরের মাছ খেয়ে নেয়। খাটের তলায় মাঝে মাঝে বাচ্চা দেয় তিন-চারটে। আবার মুখে করে অন্যত্র নিয়ে যায়। কোথায় যে লুকিয়ে ফেলে! নিজের দুধের সন্তানকে হুলো-বেড়ালের হাত থেকে বাঁচাতে মা-বেড়ালের এই লুকোচুরি খেলা। একদিন এক শরিক আবিষ্কার করে তার চৌকির তলায় বাচ্চা চারটে বেড়ালের ধড়, মুন্ডু আলাদা করা। আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে সে ঘরের বউটি। একেই তার বহুবছর বিয়ে হয়েছে তবু বাচ্চা হয় না। পেটে আসে, নিজে থেকেই খসে যায়, ধরে রাখার ক্ষমতা নেই। আবার যদি বা কখনও ধরে রাখতে পারে, পুরোমাস কেটে যাবার পর মরা বাচ্চার জন্ম দেয়। এই নিয়ে খোঁটাও তাকে কম শুনতে হয় না। সে আবার পোয়াতি হয়েছে। বিড়াল-বাচ্চার ধড়মুন্ডু ছেঁড়া দেখে নিজের পেটেরটার ভবিষ্যৎ দেখে সে। পেটে হাত বোলায় আর আতঙ্কে ভেউভেউ করে কাঁদতে থাকে।

           বাড়ির সদর দরজা সারাদিন খোলা থাকে। রাতে সবার শেষে যে ফেরে সে তালা লাগায়। নিচের দালানের হুকে টাঙানো থাকে চাবি। আবার যার সকালে উঠে আগে বেরোবার প্রয়োজন হয় সে ওই তালা খোলে। এভাবেই বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। যেহেতু সারাদিন দরজা হাট করে খোলা থাকে কিছু রাস্তার কুকুরও যখন তখন ঢুকে পড়ে সে বাড়ির উঠোনে। গরমের দিনে তারা ঐ পরিত্যক্ত মড়াইয়ের নিচে আশ্রয় নেয়। বাড়ির অতগুলো মানুষের পাতের এঁটোকাঁটা পড়ে, তা-ই কুকুর-বেড়ালে ভাগাভাগি করে খায়। তা তাদের মন্দ হয় না তাতে। একটা পাড়ায় যতগুলো লোক থাকে, এই একটা বাড়িতেই বোধহয় তার থেকে বেশি মানুষ। বিকালবেলা আবার ঐ উঠোন বাড়ির বাচ্চাদের কলকাকলীতে মুখর হয়ে ওঠে। নিচের তলার ঘরের আনাচে-কানাচে কুনোব্যাঙ গ্যাঙরগ্যাঙ করে তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়। ইঁদুর, বেড়াল, কুকুর, সাপ, ব্যাঙ, আরশোলা, মাকড়সা, টিকটিকি নিয়ে যেন একটা মিনি চিড়িয়াখানা এ বাড়িতে।

           এ বাড়িতে কোনো কলিংবেল নেই। যদিও বাইরের মানুষের আনাগোনা কম, তবু কেউ কখনও এলে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়ে। উঠোন থেকে অমুকদা, তমুকদা বলে নাম ধরে ডাকে। সেই তমুকদা বাড়ি না থাকলে তার পরিবারের কেউ  উপরের বারান্দা থেকে গলা বাড়িয়ে, বা নিচের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে দেয়, "বাড়ি নেই, কী নাম বলুন, এলে বলব তাহলে।"এভাবেই চলছে। ছাদের ওপরের একদার ঠাকুর ঘরখানা এখন ভগ্নপ্রায়। সেখানে আর কেউ প্রবেশ করে না। ভূতপ্রেত থাকলেও থাকতে পারে। প্রত্যেকে নিজের নিজের ঘরের কোণে বা সেলফে এখন ঠাকুরের আসন পেতে নিয়েছে। সন্ধেয় সেখানে সস্তার ধূপকাঠি জ্বলে। তুলসীমঞ্চ একটা আছে উঠোনে, পুবমুখো। নিচের ঘরের কেউ কেউ সেখানে সন্ধেয় প্রদীপ দেয়।

          এইরকম একটা বাড়িতে বাস করার জন্য বাসিন্দাদের মনে কোনো অশান্তি বা অভিযোগ আছে বলে মনে হয় না। গতানুগতিক জীবন বেশ তো চলে যাচ্ছে, তাই এ নিয়ে মাথাব্যাথার কোনও কারণ তাদের নেই। কিন্তু মাথাব্যথা রয়েছে কারো কারো। ও বাড়ির যে শরিক ঘরে তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেছে, ফ্ল্যাট কিনে রয়েছে কিছুদূরে, সে একটি দু'কামরার ফ্ল্যাট কিনেছিল তখন। বড়ছেলে চাকরি পাওয়ায় তার বিয়ের কথা ভাবছে সে। তার একটি তিন-কামরার ফ্ল্যাটের প্রয়োজন হচ্ছে।  ভাবল পৈতৃক বাড়িতে ঘরটি শুধু শুধুই তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে, ওই মান্ধাতার আমলের বাড়িটা ও তার সংলগ্ন কুড়িকাঠা জমি মিলে কলকাতা শহরে দাম মন্দ হবে না। অনেকগুলো ভাগ হলেও তার ভাগেও নেহাত মন্দ টাকা আসবে না। তাই একদিন সে বাড়িতে গিয়ে কয়েকজনের কাছে প্রস্তাব রাখে বাড়িটা প্রোমোটারের হাতে দেবার জন্য। প্রস্তাব ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে। কেউ খুশি কেউ অখুশি। যারা অখুশি তারা বাধ সেধেছিল। কিন্তু প্রকৃতি তাদের এ সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করল। অল্পদিনের মধ্যেই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে বাড়ির একাংশ ভেঙে পড়ল। ঝড়ের তান্ডবে আগেভাগেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল সেই অংশের বাসিন্দারা। হতাহত কেউ হয়নি। গৃহহীন হয়ে নিচের দালানে উদ্বাস্তুর মত বসবাস করছে তারা। বিপদের দিনে বাড়ির সকলে এক পরিবার হয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সকলেই এখন বাড়ি প্রমোটারের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত। প্রমোটারের সঙ্গে মিটিংয়ে বসার আগে জানার দরকার কে কতটা অংশের হকদার। নবতিপর বিনয়বাবু ঐ পরিবারের একমাত্র জীবিত বয়োঃজ্যেষ্ঠ সদস্য। তিনি এখনও শক্তসমর্থ, মানসিকভাবেও যথেষ্ঠ সুস্থ। মুম্বাইতে চলে গিয়েছেন বহুবছর আগে। তাঁর একটি ঘরও ঐ বাড়িতে তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মুম্বাইতে ফ্ল্যাট কিনে সুখে ঘর করছেন তিনি পরিবার নিয়ে কিন্তু এবাড়ির দাবিও তিনি ছাড়েননি। তাই মিটিংয়ের আগে তাঁকে সব জানিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করা হল। তিনি কলকাতা এলেন তাঁর একমাত্র নাতিকে নিয়ে। উঠলেন হোটেলে। বাড়িটা ধূলিসাৎ হয়ে যাবার আগে এলেন একবার শেষ দেখা দেখতে, নাতিকে দেখাতে। নাতি এবাড়ির গল্প শুনেছে দাদুর কাছে,  দেখেনি কখনও। ঘুরে ঘুরে দেখলেন বিনয়বাবু, নাতিকে দেখালেন। ভগ্নপ্রায় বাড়িটার প্রতিটি কোণায় পুরনো জিনিসেরা নিথর দাঁড়িয়ে আছে, এতটুকু নড়চড় হয়নি তাঁর এবাড়ি থেকে চলে যাবার এতদিন পরেও। তাঁর মনে হল বাড়িটা যেন রাজ্যের পুরনো জিনিসের একটা মিউজিয়াম। দেওয়ালে টাঙানো বিশাল পেন্ডুলাম ঘড়িটার খোঁজ নিলে জানতে পারলেন অনেকদিন আগেই সেটি এক ঝড়ের দাপটে দেওয়াল থেকে পড়ে দেহ রেখেছে। তার টুকরোটাকরা আশ্রয় পেয়েছে ছাদের ঠাকুরঘরে। তবে নিচের দালানের দেওয়ালে টাঙানো রঙচটা তৈলচিত্রটা এখনও সেভাবেই রয়ে গেছে। কার ছবি বোঝা দায়, তবু আছে প্রাচীনত্বের দাবি নিয়ে। স্মৃতিরা সব উঁকি দিতে লাগল মনের মাঝে। কাগজ কলম চেয়ে বাড়ির সবার সাহায্যে  তিনি এঁকে দিলেন ফ্যামিলি-ট্রি, যা থেকে বোঝা যাবে কে কতটা অংশের হকদার। বাসিন্দারাও জানতে পারবে কার সঙ্গে কতটা সম্পর্ক তাদের। এরপর প্রমোটারের সঙ্গে মিটিংয়ে যোগ দিলেন তিনি। চলতে থাকল কথা। "প্রয়োজনে আবার আসব", কথা দিয়ে তিনি ফিরে গেলেন। অতগুলো মানুষের থাকার ব্যবস্থা করার দায় প্রমোটারের। চলছে ব্যস্ততা। বিশাল বাড়িটা একদিন ধূলোয় মিশিয়ে গেল। খাঁ খাঁ শূন্যতা। 'ব্রেকডান্স অ্যাভিনিউ'য়ের প্রাচীন বাড়িটিতে এখন নিত্য মালবোঝাই গাড়ির আনাগোনা ব্রেকডান্স করতে করতে। ক্রমে উঠল ঝাঁ চকচকে বহুতল। রাস্তা হল পাকা। নিত্য গাড়ির আনাগোনা। গাড়ি ঢোকে সাঁ করে। এখন মামারবাড়ির ছাদে উঠে সেদিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। সেই মায়াজড়ানো রহস্যময় বাড়িটা আর নেই, কোত্থাও নেই।

...(সমাপ্ত)...

Wednesday, October 6, 2021

সাঁঝতারা

 

ছবি : ইন্টারনেট 

 সাঁঝতারা

মানসী গাঙ্গুলী


       সাঁঝতারায় আজ উৎসব লেগে গেছে, সবাই দারুণ খুশি, দারুণ ব্যস্ত। চারদিক আলো ঝলমল, আনন্দমুখর। আশপাশের মানুষজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে, কি ব্যাপার তারা বুঝতে পারছে না। কখনও কখনও দেখেছে সাঁঝতারাদের একটি তারাকে খসে যেতে, অন্তর্জলি যাত্রা করতে কিন্তু এমন আলো-ঝলমল উৎসব ! কোনো পুজো টুজোও তো নেই আজ !  বাইরে দিয়ে তাকাতে তাকাতে তারা যাচ্ছে কিন্তু বুঝতে কিছুই পারছে না। 

        সাঁঝতারা হল একটি বৃদ্ধাশ্রম। এখানে যাঁরা থাকেন স্বেচ্ছায় এসে থাকেন তাঁদের একাকীত্ব কাটাতে, সমবয়সী সঙ্গী পাবার লোভে। জীবন সায়াহ্নে এসেও তাঁরা প্রত্যেকে সাঁঝতারা বলেই পরিচিত এখানে। কর্তৃপক্ষের মতে তাঁরা প্রকৃতই এক একটি সন্ধ্যা তারা, এক এক করে ফুটে উঠে বৃদ্ধাশ্রমের আকাশটাকে ঝলমলে করে তুলেছেন। এনারা সকলেই শিক্ষিত, কাউকে বাড়ির মানুষ জোর করে এখানে ফেলে দিয়ে যায়নি। এঁরা এখানে আনন্দে, হাসি, গানে খুব ভালো থাকেন। তাঁদের মতে সারাজীবন সংসার, চাকরি সব সামলাতে গিয়ে এত আনন্দে তাঁরা থাকতে পারেননি কখনও, সর্বদাই চাপে থাকতে হয়েছে। আজ তাঁরা চাপমুক্ত। যার যা কোয়ালিটি ছিল পারিপার্শ্বিকতার চাপে চাপা পড়েছিল বা হারিয়েছিল তা আবার চাপা সরিয়ে বেরিয়ে পড়েছে স্বমহিমায়। এখানে এসে আবার চর্চা শুরু করেছেন তাঁরা, কেউ গান, কেউ নাচ, কবিতা আবৃত্তি, আঁকা, অভিনয় এমনকি লেখালেখিও।

       সুমনার ছেলেমেয়ে বিদেশে, এই ৫৬ বছর বয়সে স্বামী মারা যাবার পর বড্ড একা লাগে, যদিও আত্মীয়-স্বজন কাছাকাছি সবাই আছেন কিন্তু যতটুকু সময় বাড়িতে থাকা সে তো একাই, ভালো লাগে না মোটে। ছেলে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাইলেও উনি যেতে চাননি। তারা সারাদিন বাইরে কাজে ব্যস্ত থাকবে, সেই তো একা, রাতে একটু দেখা বই তো নয়। বিদেশ-বিভুঁইয়ে তা তার মোটেই ভাল লাগবে না, তার চেয়ে নিজের দেশই ভাল। মাকে একা রেখে যেতে ছেলেরও খুব খারাপ লেগেছে কিন্তু সে আর কতদিনই বা এদেশে বসে থাকবে চাকরি বাদ দিয়ে। অতঃপর ফিরে যেতেই হয় তাকে। যাবার আগে মাকে প্রচুর বই কিনে দিয়ে গেছে সে। সুমনার বই পড়ার খুব নেশা। বই পড়ার সময় তিনি যেন অন্য জগতে চলে যান। নিজেও টুকটাক লেখালেখি করতেন আগে স্কুল কলেজে পড়ার সময়, তাই বই পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবার লেখালেখি শুরু করেন। নিজেই লেখেন, নিজেই পড়েন। কিন্তু মাঝে মাঝে অবসাদ এসে ঘিরে ধরে। ভাল থাকার চেষ্টা করেন নানাভাবে। গান শোনেন, নাটক দেখতে যান, কখনও বা সিনেমা দেখতে। কিন্তু সে তো আর রোজ নয়। একদিন খবরের কাগজে 'সাঁঝতারা'র বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হলেন তিনি। শহর থেকে একটু দূরে, তাল-তমালের ছায়ায় ঘেরা প্রকৃতির কোলে এই বৃদ্ধাবাসটি দেখতে এলেন তিনি। বেশ একটা গ্রাম্য পরিবেশ। শহরের এত কাছে যে এমন গ্রাম আছে এ তাঁর জানা ছিল না। কিন্তু ঐ গ্রাম্য পরিবেশেই সাঁঝতারার নতুন কনস্ট্রাকশন, বেশ ঝকঝকে তকতকে। প্রত্যেকের একটি করে ঘর, নিজস্ব লাগোয়া বাথরুম, এক টুকরো বারান্দা। প্রতি ঘরে ছোট একটা ফ্রিজ, টিভি, মাইক্রোওভেন, এসি, খাট, আলমারি, পড়ার চেয়ার টেবিল ছাড়া বারান্দায় দুটো বেতের চেয়ারও রয়েছে। বাথরুমে গিজার, ঘরের এক কোণে ওয়াটার পিউরিফায়ার। ঘরটা বেশ বড় সাইজেরই, ১৫/১২মাপের। একজন মানুষের একা থাকার পক্ষে যথেষ্ট। পাশাপাশি ঘরগুলো। অপেক্ষাকৃত ছোট ঘরও রয়েছে কিন্তু সুমনার এটাই পছন্দ। বারান্দা থেকে পাশের বারান্দায় কথা বলা যায়। সব থেকে বড় কথা লিফ্টও আছে। চারতলা বিল্ডিং, সুমনা তিনতলার একটা ঘর পছন্দ করল। হাঁটুতে ব্যথা যদিও, লিফ্ট তো আছে চিন্তা কি ! একটু উঁচু থেকে আকাশ বাতাস যেন বেশি ভাল লাগে। বরাবরই ও প্রকৃতিপ্রেমিক। এখানের আকাশটা যেন নীল বড় বেশি, বলতে ইচ্ছে করে সুনীল আকাশ, গাছেরাও যেন তরতাজা সবুজ, এত সতেজতা শহরে দেখেনি কখনও সুমনা। সবুজের কত বাহার, এক একটা গাছ একেকরকম সবুজ, সেখানে নানারঙের পাখি কিচির মিচির করে গান শোনায়। বারান্দা থেকে দেখা যায় নিচের বাগান, ওয়েল মেইনটেইন্ড, বট গাছের গোড়ায় বাঁধানো বেদি, সেখানে বসে অনেকে গল্প করেন। এছাড়া বাগানে বিভিন্ন জায়গায় বেঞ্চও রয়েছে। সর্বদা মালি কাজ করছে। যদিও কয়েকজন বোর্ডার ডাক্তার আছেন, তাছাড়াও এখানকার নিজস্ব ডাক্তার রয়েছেন। নিচের একটা ঘরে তাঁর চেম্বার রয়েছে, দু'বেলা নিয়ম করে এসে বসেন। এছাড়াও প্রয়োজনে কল দিলে তিনি বা তাঁর জুনিয়ার এসে পড়েন কিছুক্ষণ পরেই। এমন সুব্যবস্থা যেখানে আর চিন্তা না করেই সুমনা মোটামুটি থাকার ব্যবস্থা পাকা করে দিয়ে যান। এ তো তার কাছে পাঁচতারা হোটেলের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। সুমনা সব ছবি তুলে নেন, ছেলেমেয়েকে দেখাতে হবে যে। ঘরের ছবি, বাইরে থেকে বিল্ডিংয়ের ছবি, আশপাশের ছবি,বাগানের ছবি সব তোলেন, মায় পুকুরের ছবি পর্যন্ত। বাড়ি ফিরে ছেলেমেয়ের সঙ্গে কনফারেন্স কল করে তাদের বলার সময় সুমনা খুব আপ্লুত হয়ে পড়েন। মায়ের উচ্ছ্বাস দেখে ছেলেমেয়ে রাজি হয়ে যায়। মা যেখানে ভাল থাকবে, থাকুক সেখানে। ছেলে অনলাইন সব পেমেন্ট করে দিলে সুমনা দুদিন পর নতুন মাস পড়লে সেখানে এসে থাকতে শুরু করেন। মাঝে মাঝে বাড়ি যান, পরিষ্কার করান, গাড়ি নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যান। সুমনা এখন বেশ খুশি। এখানে আলো-হাওয়া, রোদের খেলা সারাদিন। একটা পুকুর আছে, সেখানে হাঁসেরা চড়ে বেড়ায়। ভোরবেলায় এখানে হাঁটতে সুমনার খুব ভালো লাগে।

          কয়েকদিনের মধ্যে কয়েকজন সঙ্গী-সাথীও হল ওর। কিছু সময় তাদের সঙ্গে গল্পগুজবে বেশ কাটে। বাকি সময় ইচ্ছেমত আরামে, আয়েশে, নিশ্চিন্তে কাটান। একা থাকলে একটা টেনশন কাজ করত বাড়িতে, এখানে তা নেই। মনের সুখে পড়েন প্রচুর বই। সঙ্গে কিছু এনেছেন, আর হ্যাঁ, এখানে লাইব্রেরীও একটা আছে, আর বাংলা, ইংরেজি প্রচুর বইও আছে সেখানে। সুমনা পড়েন, আবার লেখাও শুরু করেছেন আজকাল। রোজই কিছু না কিছু লেখেন তিনি, নিজের জীবনের কাহিনী, চেনাজানা, কানেশোনা নানারকম ঘটনাকে আশ্রয় করে তৈরি হয় তাঁর গল্প। জীবনটাও তো তাঁর কম দীর্ঘ নয়, সেইসব অভিজ্ঞতার কথা সাজিয়ে, কখনও গল্প, কখনও মন ফুরফুরে থাকলে কবিতাও লিখতে থাকেন। কখনও ঝড় বৃষ্টির দিনে বারান্দায় বসেন, বৃষ্টি যে বড় প্রিয় তাঁর। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে মাখতে বড় ভাল লাগে। কেটে গেছে এখানে সাতটা মাস, সবার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে, সবাই চেনে ওনাকে। ক্লাবে ক্যারাম খেলেন উনি সঙ্গীদের সঙ্গে, পুরুষ-মহিলা সকলে মিলে। লুডো খেলাও দারুণ জমে। ব্যাডমিন্টনটা কেউ কেউ খেলেন, সুমনা দেখে। ওঁর ইচ্ছে করে খুব, একসময় খেলতেন কিন্তু এখন হাঁটু ব্যথা তাই কেবল দেখা, মাঝে মাঝে র্যাকেট নেন হাতে যদিও কিছুক্ষণের জন্য।

        নতুন একজন বোর্ডার এলেন সাঁঝতারায়।  সৌম্যদর্শন, মোলায়েম গম্ভীর গলার স্বর, গভীর দৃষ্টি, লম্বাচওড়া চেহারা, এককথায় বেশ সুপুরুষ, নাম দ্বৈপায়ন বসু। ভদ্রলোকের স্বভাব খুব মিষ্টি, সকলের সঙ্গেই মেশেন তবে বেশি সময় ঘরেই কাটান। সুমনার সঙ্গে ওনার বেশ আলাপ হয়ে গেছে। ওনার সঙ্গে কথা বলে, গল্প করে সুমনা খুব তৃপ্তি পান, মনে হয় যেন কত চেনা কেউ, আগেও বুঝি কথা হয়েছে কখনও ওনার সঙ্গে। কথায় কথায় উনি জানতে পারেন সুমনা গল্প, কবিতা লেখেন, আর উনি এতে খুব প্রশংসা করেন, দেখতে চান, পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এতদিন সুমনা কাউকে বলেননি লেখালেখির কথা, এখন দ্বৈপায়নবাবুকে বলে ফেলে একটু লজ্জা পান। উনি সুমনার লেখা পড়ার জন্য জোরাজুরি করেন। সুমনা তাঁর ডায়েরীটা পড়তে দিতে বাধ্য হন। লেখা পড়ে তো উনি ভীষণ খুশি, সুমনার পারমিশন নিয়ে কয়েকটি পত্রিকায় লেখা পাঠিয়ে দেন। কিছুদিন পর সে লেখা ছাপা হলে সৌজন্য কপি সাঁঝতারাঁয় এসে পৌঁছায় সুমনার নামে। সুমনা ভীষণ খুশি, আপ্লুত, বলে, "কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব ভেবে পাচ্ছি না। জীবনে কখনও ভাবিনি আমার নিজের লেখা ছেপে বেরোবে, সবাই পড়বে। জীবন সায়াহ্নে এসে এটা আমার বিরাট প্রাপ্তি।" উনি বলেন, "নিজেকে এতদিন প্রকাশ করেননি কেন? এ তো আপনার প্রাপ্য, এত ভাল লেখেন, আপনি কেন নিজেকে লুকিয়ে রাখবেন, জনসমক্ষে আসুন, নিজেকে মেলে ধরুন"। ক্রমে সাঁঝতারার সকল বাসিন্দা জানল সুমনার লেখার কথা, তাই ওর পরের জন্মদিন দারুণভাবে পালন করা হল ওখানে। কেক কাটা, ছবি তোলা, কত হইহই। সুমনা সেসব ছবি ছেলেমেয়েকে পাঠায়। মায়ের জন্মদিনে এত কান্ড হওয়ায় তারা খুব খুশি, তারা যে অনেক দূরে, ইচ্ছে থাকলেও হাত-পা বাঁধা। কিন্তু ছবিগুলো দেখে মেয়ে তো হতবাক, বলে, "মা তুমি চিনতে পারনি দ্বৈপায়নবাবুকে? উনি তো তোমার ফেভারিট লেখক 'নবজাতক'। তুমি তো বরাবর ওনার ফ্যান।" "আমি ওনার লেখা পড়ি, পড়তে ভালোবাসি কিন্তু দেখিনি তো কখনও, চিনব কেমন করে?" বলে সুমনা। মেয়ে বলে, "কিন্তু আমি চিনি ওনাকে। একবার বইমেলায় এক বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম, ওনার হাত দিয়ে তরুণ এক লেখকের বইপ্রকাশ হয়েছিল। মা তুমি কি লাকি, উনি তোমার লেখা পড়েন, প্রশংসা করেন আবার তোমার লেখা ছাপানোর ব্যবস্থা উনিই করলেন।" সুমনা তো রীতিমতো উত্তেজিত, কখন সকাল হবে, দেখা হবে ওনার সঙ্গে। ওখানকার অন্য কোনও আবাসিকও চিনতে পারেনি ওনাকে। আসলে উনি ছদ্মনামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসেন বরাবর। অকৃতদার মানুষটি সারা জীবন লেখাপড়া নিয়ে কাটাতে কাটাতে কবে যে জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছেছেন নিজেই টের পাননি। আজ এই ৬২ বছর বয়সে বড় একা লাগে বাড়িতে, তাই এই সাঁঝতারায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। বেশি সময় তিনি নিজের ঘরে লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সবার অজান্তে।

          পরদিন সুমনা চেপে ধরে তাঁকে, তাঁর বিভিন্ন বইয়ের কথা তোলে। ধরা পড়ে যান নবজাতক তাঁর পাঠিকার কাছে। এরপর চলে তাঁর বিভিন্ন বইয়ের নায়ক নায়িকার চরিত্র বিশ্লেষণ। বই পড়ার সময় সুমনার কিছু কিছু প্রশ্ন জাগত মনে। লেখকের পাশে বসে পরিষ্কার করে নিতে লাগলেন সেসব। প্রিয় লেখককে এত কাছে পেয়ে, তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসতে পেরে সুমনা বেজায় খুশি। তিনি যেন এখন এক কিশোরী কন্যা। দ্বৈপায়নবাবুর অনুরোধে সুমনা তাঁর পরিচয় অন্য কারো কাছে জানায় না। ওঁরা দু'জন এখন অনেকটা সময় একসঙ্গে কাটান সাহিত্য-আলোচনায়, বিভিন্ন লেখকের বিভিন্ন বই নিয়ে নানারকম আলোচনা, কখনও বটগাছের বেদীতে বসে, কখনও পুকুর ধারে ঘুরে ঘুরে ওঁদের আলোচনা চলতে চলতে দু'জন জড়িয়ে পড়েছেন ক্রমশ দু'জনের ব্যক্তিগত ব্যাপারে। দু'জনের জীবনের খুঁটিনাটি সব দু'জনের জানা হয়ে গেছে। সুমনার একদিন একটু জ্বর হওয়ায় উনি ঝট করে উদ্বেগের সঙ্গে ওঁর কপালে হাত রাখেন, "একি? বেশ গরম তো! ভালো টেম্পারেচার রয়েছে।" সঙ্গে করে নিয়ে যান ডাক্তারের চেম্বারে, পরে ঘরে পৌঁছে দেন সঙ্গে করে, গায়ে চাদর চাপা দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এই বয়সেও দ্বৈপায়নবাবুর হাতের স্পর্শে সুমনার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। সুমনা দুর্বল হয়ে পড়ছে ওনার প্রতি, দ্বৈপায়নবাবুকে যেন ওঁর কিছুতেই ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। দু'দিন সুমনার শরীরটা বেশ খারাপ থাকায় ঘর থেকে বের হননি তিনি। দ্বৈপায়নবাবু দুবেলা ওঁর ঘরে এসে, পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে, একটু গল্পগুজব করে তাঁর কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করেছেন। নিজের হাতে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন, পথ্যটাও খাইয়ে দিয়ে গেছেন। বেশ লাগছে সুমনার, বড় আন্তরিকতার স্পর্শ পেলেন দ্বৈপায়নবাবুর কাছে।

          ওনাদের মেলামেশাটা, ঘনিষ্ঠতা ক্রমে সকলের নজরে পড়ে। তবে সবাই এখানে ভদ্রলোক তাই এ নিয়ে কোন গসিপ হয় না। জ্বর ছাড়লে দ্বৈপায়নবাবু সুমনাকে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বার করেন। দুজনে হাঁটছেন তাঁরা বাগান দিয়ে, পুকুর পাড়ে, হাঁসেরা জলে চড়ছে, খানিকবাদে সূর্য অস্ত যাবে, ওরা জল থেকে উঠে যাবে ঘরে। আস্তে আস্তে সূর্যের তেজ ঝিমিয়ে পড়ল, লাল টকটকে অস্তগামী সূর্যের দিকে দুজনে তাকিয়ে প্রণাম করল সেই বিদায়ী দিননাথকে। দ্বৈপায়নবাবু সুমনার হাত দুটি ধরে তাঁকে প্রেম নিবেদন করলেন, "তোমার জন্যই বুঝি অপেক্ষায় ছিলাম আমি, সারাজীবন সংসার করার কথা মনে আসেনি। তুমি আমায় তোমার হৃদয়ে আশ্রয় দাও, ধন্য হব আমি।" সুমনা কিছু বলবে কি! সারাশরীর থরথর করে কাঁপছে তখন তাঁর। সে রাতটা কাটল সুমনার একটা ঘোরের মধ্যে। বুঝতে পারছেন নিজে ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি তাঁর প্রিয় লেখক 'নবজাতকে'র ওপর।

         পরদিন সকালে হাঁটার সময় দেখা হলে মৃদু হাসেন দ্বৈপায়নবাবু। সুমনা যেন লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন, চোখ তুলে তাকাতে পারছেন না তিনি দ্বৈপায়নবাবুর দিকে। যেন এক কিশোরীর লজ্জা তাঁকে ঘিরে ধরেছে। পাশে হাঁটতে হাঁটতে উনি বলেন, "দেবে তো আশ্রয় আমায় সুমনা?" কি বলবেন ভেবে পান় না তিনি, চুপ করে থাকেন। উনি আবার বলেন, "কি আমার উত্তরটা পেলাম না যে"। সুমনা মাথা নিচু করেই ছোট্ট করে সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন। দ্বৈপায়নবাবু একগাল হেসে ওর হাতটা ধরেন, "আমি জানতাম, তুমি আমায় ফেরাবে না, ঠিক রাজী হবে।" এরপর উনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে সুমনার ছেলেমেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের মাকে বিয়ে করার প্রস্তাব রাখেন। জানতে চান তাদের মত। ছেলেমেয়ে একবাক্যে রাজী। মায়ের একাকীত্বের জীবনে তাঁর পরমপ্রিয় মানুষটি যখন ধরা দিয়েছেন, তখন আপত্তি কিসের? 

     আজ সুমনা ও দ্বৈপায়নের বিয়ে। সাঁঝতারা তাই সেজে উঠেছে আলোয়, ফুলে, মালায়। বিদেশ থেকে এসেছে ছেলে, মেয়ে, জামাই, বৌমা। সুমনা সবার সামনে লজ্জা পাচ্ছে কনেবউ সাজতে কিন্তু দ্বৈপায়ন বসু জীবনে প্রথমবার বিয়ে করবেন তাই তিনি টোপর পরে, পুরোহিতের সঙ্গে মন্ত্র পাঠ করে, মালাবদল করেই নবপরিণীতার হাত ধরতে চান।


manasiganguli@gmail.com