![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
সম্পর্ক
জগদীশ গাঙ্গুলি
টাটানগর থেকে আহমেদাবাদ
সুপার ফার্স্ট ধরেছি গন্তব্য হাওড়া, মে মাসের তপ্ত গরম, টাটানগর শহরটা মনে
হচ্ছে রোদএর তাপে গলে যাবে, বিয়াল্লিশ ডিগ্রি
তাপমাত্রা চারিদিক এ মনে হচ্ছে একটা জ্বলন্ত আগুনের বলয় পৃথিবীটাকে ঘিরে ধরে রয়েছে,
আমি হঠাৎ করেই দুই দিনের জন্যে
টাটা গিয়েছিলাম একটা জরুরী কাজে, ফেরার সময় একটা চালু
টিকিট কেটে স্টেশন এ প্রবেশ করেই শুনতে পেলাম ঘোষিকা ঘোষণা করছে পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্ম
এ কিছুক্ষণের মধ্যেই আহমেদাবাদ হাওড়া সুপার ফার্স্ট ঢুকছে, ট্রেন ঢুকতে দেখলাম আনরিজার্ভ কোচ প্রায় ফাঁকা
উঠে বসে পরলাম। ট্রেন ছুটছে দেখতে দেখতে আসানবনী, রাখা মাইনস পেরিয়ে গেলো জানলা দিয়ে বাইরে দেখলাম
ধূ ধূ করছে শুধু ফুটিফাটা মাঠ, দূরের আকাশে কয়েকটা
চিল উড়ে বেড়াচ্ছে হঠাৎ আমার সামনে বসা একটি কিশোর কে দেখে তার উপর থেকে দৃষ্টি সরাতে
পারলামনা, ছেলেটার নিষ্পাপ মুখ
আর চোখ আমাকে ভীষন ভাবে আকৃষ্ট করলো, বয়েস খুব বেশী হলে চোদ্দো পনেরো হবে, মাথা ভর্তি একরাশ কোঁকড়া চুল, একটু ঢাঙ্গা আর ভীষন
রোগা শরীরে অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট,ভীত সন্ত্রস্ত চাহুনি,
পরনে একটা মলিন সার্ট আর রংচটা
প্যান্ট, পায়ে একটা তাপ্পি
মারা হাওয়াই চটি। আমি এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়েছিলাম হঠাৎ ও মুখটা তুলে আমায় ওই
ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জা পেয়ে আবার মাথাটা নীচু করে ফেললো। আমি হিন্দিতে ওকে
জিজ্ঞাসা করলাম "কোথায় যাবে"! বলল "ভাগলপুর,"! আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম "কোথা থেকে আসছো!"!
বলল "মহারাষ্ট্রের গণ্ডিয়া থেকে", আমি বললাম "একা"! বলল "হ্যাঁ"!
হঠাৎ কেনো জানি আমার মনে হলো ছেলেটি খুব ক্ষুধার্ত, পেন্ট্রি কার এর একটা লোক ডিম ভাত বিক্রি করছিল
আমি একটা ডিম ভাত কিনে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম, ও প্রবল আপত্তি করলো ওর নাকি পেট ভরা ওর খাবার ইচ্ছে
নেই। আমি একটা ধমক দিয়ে সস্নেহে ওকে বললাম খাবারটা খেতে। ও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে
গোগ্রাসে খেতে শুরু করলো, খেয়ে নেয়ার পর আমি
ওকে আমার জলের বোতলটা বাড়িয়ে দিলাম ঢক ঢক করে বোতলটার প্রায় অর্ধেক জল খেয়ে বোতলটা
আমার হাতে ফেরৎ দিয়ে একটু সলজ্জ হাসলো, কথায় কথায় জানতে পারলাম ও বিহারী ব্রাহ্মণ ওর নাম বিবেক মিশ্র ওর বাড়ী ভাগলপুর
থেকেও আরও পনেরো কিলোমিটার দূরে একটা প্রত্যন্ত গ্রামে, ওর মা যখন মারা যায় তখন ওর বয়স তিন বছর,
এর পরের বছর ওর বাবা আরও একটা
বিয়ে করে আর দ্বিতীয় পক্ষের বিয়ের পর ওর আরও একটা ভাই আর বোন হয় ওর বোন ওকে খুব
ভালবাসে, ওর সৎ মা ওকে দুইচক্ষে
দেখতে পারেনা, সকাল থেকে হাড়ভাঙা
খাটুনি খেটে দুবেলা দুটো খেতে পায় তাও শুধু ডাল আর ভাত। ও বললো "জানো বাবুজি
আজ কতদিন পর ডিম ভাত খেলাম", সৎ বোন মাঝে মধ্যে
লুকিয়ে চুরিয়ে ভালো কিছু রান্না হলে ওকে দিতে চায় কিন্তু সৎ মার বজ্র শাসনে বোনও
আজকাল সাহস পায়না। বাবা গন্ডিয়াতে একটা বিড়ির কারখানায় সামান্য মজদুরি করে,
এবারে বাড়িতে আসার পর ওর
মা ওকে ওর বাবার হাতে দিয়ে বলেছিল এই আপদ তোমার সাথে নিয়ে যাও একে পালন করার দায়িত্ব
আমার না ,বাবা নিরুপায় হয়ে
অনেক বোঝাবার চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে ওকে গন্ডিয়া নিয়ে যায় কিন্তু ওভারসিয়ার
বাবু ওর বাবাকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় এখানে ওর ছেলেকে রাখা চলবেনা অগত্যা ওর বাবা
ওর এক দূর সম্পর্কের কাকার সাথে কথা বলে ওর হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে হাওড়া যাবার একটা
টিকিট করে ওকে ট্রেন এ বসিয়ে দেয় আর বলে দেয় হাওড়া নেমে সন্ধ্যে আটটায় একটা ট্রেন
গয়া এক্সপ্রেস ধরে ও যেনো ভাগলপুর নেমে সেই কাকার বাড়ী চলে যায়, কথা বলতে বলতে দেখলাম ওর চোখের কোন দুটো চিকচিক
করছে, আমারও কেনো জানিনা ওর কথা
শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো চুপ করে বসে রইলাম।
গাড়ি খড়গপুর পেরিয়ে
ছুটে চলেছে, কোলাঘাট স্টেশন এ
দুটো চা আর বিস্কুট নিয়ে ওকে একটা চা আর বিস্কুট খেতে দিলাম, চাটা খেয়ে হঠাৎ ও তার শীর্ণ হাতদুটো দিয়ে আমার
হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো "বাবুজী আমি ওই চাচার বাড়ী যেতে চাইনা তুমি আমাকে
তোমার সাথে তোমার বাড়ী নিয়ে যাবে! তুমি যা যা কাজ বলবে আমি সব করে দেবো আমাকে শুধু
একটু থাকতে আর খেতে দেবে।" আমি কেনো জানিনা মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ওকে
জিজ্ঞাসা করলাম "তোমার বাবার কাছে মোবাইল আছে!" বিবেক জানালো "আছে"!
আমি বললাম "নম্বর জানো"! ও নম্বর বলাতে ওর বাবাকে ফোন করে সব খুলে বললাম,
ওকে যে আমি আমার কাছে রাখতে
চাই জানালাম, এটাও জানালাম ওর বাবা
যখন ইচ্ছে ছেলের কাছে আসতে পারে আর দেখে যেতে পারে, বিবেকের বাবা সব শুনে মনে হয় হাফ ছেড়ে বাঁচলো,
আমায় অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে
ফোনটা কেটে দিলো।
আমি বিবেক কে নিয়ে
বিকালে হাওড়া স্টেশন এ নামলাম একটা ট্যাক্সি ঠিক করে ওকে নিয়ে চড়ে বসলাম,
হাওড়া ব্রিজ এ ওঠার পর ও
অবাক হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে একটা নতুন শহর কে দুচোখ ভরে দেখতে শুরু করলো,
ওর চোখে এখন সেই ভীত সন্ত্রস্ত
ভাবটা আর দেখতে পেলামনা। আমি একা মানুষ, বিয়েথা করিনি, মা, বাবা দুজনেই মারা গেছেন কলকাতায় একটা সংবাদপত্রের
অফিসে এ কাজ করি, যাদবপুরে আমার দুই
কামরার একটা ফ্ল্যাট রয়েছে, একা মানুষ ওই ফ্ল্যাট
টা আমার জন্যে যথেষ্ট। ট্যাক্সি থেকে নেমে বিবেক দেখলাম এক দৃষ্টিতে আমার কমপ্লেক্স
এর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, আমি বললাম "কি
রে পারবিত এখানে থাকতে"! ও শুধু চুপ করে ঘাড় নাড়ালো। সন্ধ্যে বেলায় ওকে নিয়ে
যাদবপুর বাজারে গেলাম, খান চারেক ওর প্যান্ট,
সার্ট আর টুকিটাকি দৈনন্দিন
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে ফেরার সময় মাংস, রুটি কিনে বাড়ী ফিরলাম বাড়ীতে এসে বিবেক বললো
"বাবুজি কি কাজ করতে হবে বলো", আমি হেঁসে বললাম "আগে স্নান করে নে ওটাই এখন তোর কাজ", ও সরল বিশ্বাসে জিজ্ঞাসা করলো "স্নান করাটাও
কি একটা কাজ"! আমি হেঁসে বললাম হ্যাঁ আরও দুটো কাজ আছে এক তোকে বাংলা শিখতে হবে
আর দ্বিতীয় তোকে পড়াশোনা করতে হবে, পড়াশোনার নাম শুনে ওর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, আমি বললাম দেশের বাড়িতে স্কুল এ যে তিস! বিবেক
বললো ও ওখানে এক সরকারি স্কুলে হিন্দি মিডিয়াম এ ক্লাস সেভেন অব্দি পড়েছে। আমি বললাম
"খুব ভালো এবার চল খেয়েদেয়ে শুয়ে পরি, রাত এ বিবেক কিছুতেই আলাদা ঘরে সুলোনা আমার ঘরেই
নীচে একটা সতরঞ্চি পেতে ঘুমিয়ে পরলো।
এর মধ্যে দেখতে দেখতে
এক বছর কেটে গিয়েছে, বিবেক বাংলায় কথা
বলতে শিখে গিয়েছে, আমি ওকে একটা সরকারী
হিন্দি মিডিয়াম স্কুল এ ভর্তি করিয়ে দিয়েছি ক্লাস সেভেনেই, পড়াশোনায় ও খুব ভালো আর ভীষন ভালো রেজাল্ট করে
ও ক্লাস এইট এ উঠেছে, বাড়িতে আমি ওকে বাংলা
লেখা শিখাচ্ছি মাঝে ওর বাবা এসে ওর সাথে দেখা করে গিয়েছে আমার অনুরোধে দুইদিন ছেলের
সাথে কাটিয়ে গিয়েছে, যাওয়ার সময় আমার
হাত দুটো ধরে বারবার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গিয়েছে ওকে এতো ভালো একটা জীবন দেওয়ার জন্যে।
এর মধ্যে দেখতে দেখতে
আরও পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে, বিবেক এখন প্রেসিডেন্সি
তে স্নাতক হওয়ার জন্যে ব্যস্ত, এখন ও ঝরঝরে বাংলা
বলে, লেখে আর বাংলা সাহিত্যর একনিষ্ঠ
পড়ুয়া, মাঝে ওকে নিয়ে দিল্লী,
হরিদ্বার, ঋষিকেশ, নৈনিতাল আর দেরাদুন ঘুরে আসলাম, দিল্লী তে যমুনার ঘাটে দাড়িয়ে যেমন যমুনার মাহাত্ম্য
বোঝালাম, তেমনই হার কি পৌরীর
গঙ্গার ঘাটে দাড়িয়ে গঙ্গার। দিল্লির লাল কিলা, অক্ষর ধাম, পুরোনো কিলা, হুমায়ুন টম্ব, লোটাস টেম্পল, কুতুব মিনার, চিত্তরঞ্জন পার্কের কালীবাড়ি সব ঘুরিয়ে দেখালাম।
একজন বাধ্য শিক্ষার্থীর মতো ও সব দেখলো আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জায়গার ইতিহাস জানলো।
কেম্পটি ফলস দেখে শিশুদের মতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো এর মধ্যেই স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তর
এর জন্যে নিজেকে তৈরী করা শুরু করলো ওটা ভালোমতো শেষ করে একটা রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এ
ও চাকুরিও পেয়ে গেলো, যেদিন চাকরিটা হলো
তার কিছুদিন পর ওকে সঙ্গে নিয়ে আমি ওর বাবার কাছে গিয়ে সেই সুখবর টা ওর বাবাকে দিতেই
ওর বাবার চোখ দিয়ে টপ টপ করে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়লো, বাবার আশীর্বাদ নিয়ে ওর আপত্তি সত্বেও ওকে নিয়ে
ভাগলপুর এ ওর দেশের বাড়িতে গেলাম, বাড়ীর সামনে একজন
শীর্ণকায় ভদ্রমহিলা ঘুঁটে দিচ্ছিল, বিবেক ফিসফিস করে বললো "ওই আমার মা", আমি এগিয়ে যেতে ভদ্রমহিলা চোখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে
আমার দিকে তাকালেন, আমি আমার পরিচয় দিয়ে
বিবেক কে কাছে ডাকলাম, বললাম -"একে
চিনতে পারেন" ! ভদ্রমহিলা অনেকক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে বিবেকের দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ
হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন, আমাকে বললেন
" বাবু জী আমি খুব অন্যায় করেছি এই সোনার ছেলেটাকে কষ্ট দিয়ে আর এর ফলস্বরূপ
মনে হয় আমার ছেলেটাই আমায় ছেড়ে চলে গেলো। বিবেক বললো"মানে কিষাণ কোথায়
"! মহিলা বিবেক কে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো গত দুইবছর আগে ওর কলেরা হয়েছিল
চিকিৎসা করাতে পারিনি দুই দিন পর মারা গেলো আমার চোখের সামনে, বিবেক চুপ করে গেলো, বললো "বাবুজী জানে" ! উনি বললেন"জানে
"! বিবেক স্বগতোক্তি করলো বাবুজি জেনেও আমায় জানালনা! এর মধ্যে দূর থেকে বছর
কুড়ির একটা মেয়ে কাছে এসে দাঁড়ালো দুহাত ভরা বথুয়া শাক, বিবেক বলে উঠলো" মুন্নি "! বিবেক মুন্নি
বলে ডাকতেই মেয়েটা বিবেকের বুকে ভাইয়া বলে
মুখ লুকালো।, বিবেকের সৎ মা আমাদের
ভিতরে নিয়ে উঠোনে একটা খাটিয়া পেতে দিলেন, কিছুক্ষণ পর আমাদের বললেন আপনারা হাতমুখ ধুয়ে আসুন
খাবার তৈরী, আমি শুনে হা হা করে
উঠলাম, কিন্তু উনি শুনলেন না বাধ্য
হয়ে পাশের পুকুরে গিয়ে হাতমুখ ধুলাম, পুকুর পাড়ে মুন্নি একটা গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সেটা এগিয়ে দিলো,
এসে খেতে বসলাম খুব সামান্য
আয়োজন ভাত, কাটা পেঁয়াজ আর অড়হর
ডাল, ক্ষিদে পেয়েছিল, খুব তৃপ্তি করে খেলাম , বিবেক মুন্নি কে বললো বিকালে কোনো কাজ না রাখতে
ওকে নিয়ে সে বাজারে যাবে। দুপুরে ওদের বাড়ীর বাগানে একটা মহুয়া গাছের নীচে খাটিয়া
পেতে একটা ভালো ঘুম দিলাম ঘুম থেকে উঠে দেখলাম মুন্নি আর বিবেক বাজারে চলে গিয়েছে।
আমিও উঠে হাতমুখ ধুয়ে ওদের পাড়া টা ঘুরে সন্ধ্যার সময় ফিরে দেখলাম মুন্নি আর বিবেক
বাজার থেকে ফিরেছে, মুন্নির জন্যে বিবেক
কয়েক প্রস্থ জামা কাপড় কিনে এনেছে ওর মার জন্যে তিনটে শিফনের শাড়ি, প্রসাধনী, মিষ্টি, মুন্নির জন্যে একটা ভালো সেল ফোন আর অনেকটা খাসির
মাংস। বিবেক মাকে বললো "বাবুজি মাংস ভালবাসে ভালো করে রান্না করো, আমরা আজ রাতে থেকে ভোরে বেরিয়ে যাবো" ,
কৃতজ্ঞতায় দেখলাম ওর মার
চোখের কোন দুটো চিকচিক করছে।
সকালে অনেক নিষেধ
করা সত্ত্বেও ওর মা আর মুন্নি আমাদের স্টেশন এ ছাড়তে আসলো ওর মার হাতে একটা পুঁটলি
ছিলো স্টেশন এ ওটা আমার হাতে দিয়ে বললো -"বাবুজি এর মধ্যে কাল রাতের তৈরী করা
কয়েকটা লিট্টি আছে ট্রেন এ খেয়ে নেবেন। আমি কোনো কথা না বলে পুঁটলি টা নিলাম। বিবেক
মাকে প্রণাম করলো, মুন্নি কে বললো"
এখন তোর যখন যা দরকার আমায় ফোন করবি" মুন্নি মাথা নাড়ালো।
ট্রেন হাওড়ার দিকে
ছুটে চলছে, দুইদিকে শুধু সবুজ
ধানের ক্ষেত, মাঝে মাঝে কিছু খেজুর
গাছ। একটা চাওয়ালা আসতে দুটো চা নিয়ে একটা বিবেক কে এগিয়ে দিলাম, বিবেক এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি, চায়ের ভাঁড় টা হাতে নিয়ে এবার বলে উঠলো
"বাবুজি মাকে ক্ষমা করে কি আমি ভূল করেছি! ওর জন্যই আজ আমি ঘর ছাড়া অবশ্য ঘর
না ছাড়লে তোমাকেও তো আমি পেতামনা, আজ আমি যেখানে এসেছি
এর পিছনে শুধু তোমার নিরলস ভালবাসা আর তোমার কর্তব্যবোধ, তুমি আমার জীবনে না আসলে আমিও হয়তো আজ বাঁচার জন্যে
কোনো বিড়ি কোম্পানিতে বা মুটে মজুরের কাজ করতাম! আমি বিবেকের মাথায় হাত রেখে বললাম"তুমি
যা করেছো একদম সঠিক কাজ করেছ, ক্ষমা করাই মানুষের
পরম ধর্ম আর একটা কথা তোমাকে আমিও না পেলে নিজের এতো ভালো লক্ষ্মী একটা ছেলে কি পেতাম!
সেই সূত্রে তোমার আমার মিলন টা দুইপক্ষের জন্যই লাভজনক তাই না!" বিবেক চুপচাপ
শুনল কোনো কথা বললনা কিছুক্ষণ পরে মৌনতা ভেঙে বললো "জানো বাবুজি মুন্নি ওই গ্রামেরই
একটা ছেলেকে ভালোবাসে, ছেলেটা খুব ভালো এবার
মুন্নি আমার সাথে ওর আলাপ করিয়ে দিয়েছে ও একটা সরকারী স্কুল এ শিক্ষকতা করে কিন্তু
মুশকিল হচ্ছে আমরা জাতে ব্রাহ্মণ আর ওরা রাজপুত, জানিনা এই বিয়ে ওর বাবা মানবে কিনা যদিও ওর বাবাও
উচ্চ শিক্ষিত আর শিক্ষক ছিলো, ছেলের কোনো পণ নিয়ে
দাবিদাওয়া নেই বাবুজি এই বিয়েটা আপনাকেই করাতে হবে, মুন্নির ওখানে বিয়ে হলে ও খুব সুখে থাকবে,
আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম কথা
বলবো বলে।
এর মধ্যে কলকাতার
একটা সংবাদপত্র তে বিবেক এর বিয়ের ব্যাপারে একটা বিজ্ঞাপন দিলাম যেখানে লিখলাম কোনো
দাবীদেওয়া নেই শর্ত একটাই ছেলে তার গ্রামের বাড়িতে বিয়ে করবে কলকাতায় নয়,
বাবা হিসাবে বিবেকের বাবার
নাম দিলাম। বিজ্ঞাপন টা দেখে বিবেক খুব চেঁচামেচি করলো বললো " বাবা হিসাবে তোমার
নামটাই সব জায়গায় দিতে হবে না হলে সে বিয়েই করবেনা"! অনেক বুঝিয়ে ওকে শান্ত
করলাম।
আগামী সপ্তাহে মুন্নির
বিয়ে, বিবেক বিয়ে উপলক্ষে চারদিনের
ছুটি নিয়েছে, বিবেকের বাবাও চারদিন
আগে গ্রামে আসছে। আমি ছেলের বাবাকে অনেক বলে কয়ে রাজী করিয়েছি বিয়ের জন্যে,
শিক্ষিত লোক উনি আমার কথা
রেখেছেন আর মুন্নি কে দেখেও ওদের ভালো লেগেছে। ছেলের বাবা বলেছেন বিয়ে দিতেই হলে সামনে
মাসে একটা শুভ দিন দেখে বিয়ে হবে, ছেলের যেহুতু মা নেই
সে জন্যে উনি বেশী দেরী করবেন না সেই ভাবেই খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে সব জোগাড় যন্ত্র
করতে হয়েছে।
আজ বিয়ে,
সকাল থেকে সবাই ব্যস্ত আমি
অলস ভাবে বসে চা পান করছিলাম হঠাৎ একটি ছেলে এসে জানালো ছেলের বাবা আমায় ডেকেছে দরকার
আছে, ওর বাইকেই আমি যেতে পারি, আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে একরাশ শঙ্কা নিয়ে ছেলের
বাড়ী গেলাম , ছেলের বাবা আমায়
সাদরে বরণ করে উপরে ওর বেড রুম এ নিয়ে বসালেন, উনার বাড়িতেও বিয়ে উপলক্ষে সবাই ব্যস্ত। উনি ছেলেটিকে
বললেন দু কাপ চা পাঠিয়ে দিতে আমাকে বসার জন্যে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন, শরীর স্বাস্থ্যর খবর জিজ্ঞাসা করার পর হঠাৎ উনি
আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন দাদা আমি জানি বিবেক এর জন্যে আপনি কি করেছেন,
বাঙ্গালী সংস্কৃতি,
তাদের মেধা আর বাঙালির মনন
কে আমি শ্রদ্ধা করি, বিবেকের জন্যে আপনি
যা করেছেন স্বয়ং ওর নিজের বাবাও তা পারতোনা আপনার কাছে আমার একটাই অনুরোধ রাখবো আশা
করছি আশাহত করবেন না, মুন্নির বিয়ের পর
নিশ্চয়ই বিবেকের বিয়ে আপনি দেবেন আমার ছোটো ভাইয়ের একটা মেয়ে আছে, একটাই মেয়ে শিক্ষিতা, দেখতে শুনতেও খারাপ নয় আমার ইচ্ছে ওকে আপনাদের
বাড়ীর গৃহবধূ হিসাবে বিবেকের সাথে বিয়ে দিন আমি জানি আপনি বললে ও না করবেনা তার আগে
মেয়েটিকে একবার দেখুন,এই বলে উনি
"রানী বেটি, ও রানী বেটি"
বলে কাউকে ডাকলেন, কিছুক্ষণ পরে বছর
বাইশ এর একটি মেয়ে ভীরু পায়ে প্রবেশ করলো, দেখতে অপুরুপ সুন্দরী না হলেও একদম ফেলনাও নয়,
মেয়েটির চোখ দুটো খুব মায়াবী,
ও নমস্কার করে দাঁড়িয়ে থাকলো।
আমি ওকে বসতে বললাম, পাত্রী হিসাবে খুবই
ভালো,না করার প্রশ্নই নেই। তাও আমি বললাম "আমার আপত্তি নেই তবে বিবেক
কেও একবার দেখাতে হবে"। কথা বলে ঠিক হলো মুন্নিদের বিয়ের পর্ব মিটে গেলে বিবেক
রানী কে দেখবে তারপর দিনক্ষণ ফাইনাল হবে। মনে মনে ভাবলাম আমারও ইচ্ছে ছিলো বিবেকের
বিয়েটা যাতে ওর গ্রামের বাড়িতেই হয় ওদের আচার রীতি মেনে ভালোই হয়েছে রানী কে পেয়ে।
গোধূলি লগ্নে বিয়ে,
আমি বিকাল থেকে ধোপ দূরস্ত
হয়ে বিয়ের খুঁটিনাটি তদারকিতে ব্যস্ত, বিবেকের মা আর বাবাও আজ খুব তৃপ্ত, আমি এখনও রানীর কথাটা ইচ্ছে করে ওদের বলিনি তবে আমি জানি আমি বললে ওরা কেউ আপত্তি
করবেনা। বরযাত্রী আসছে গ্রামের সবাই উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে বিয়ে দেখার জন্যে আমিও
ধীরে ধীরে সেই ভিড়ে মিশে গেলাম।



এত জটিল জীবনের মাঝে মন ভালো করার গল্প।
ReplyDeleteআপনার গল্পটা পড়ে ভালো লেগেছে যেনে খুব তৃপ্ত হয়েছি, গল্পটা পুরো না হলেও আংশিক সত্যি, স্থান, কাল, চরিত্র এগুলো শুধু কাল্পনিক।
ReplyDelete