1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label জগদীশ গাঙ্গুলি. Show all posts
Showing posts with label জগদীশ গাঙ্গুলি. Show all posts

Sunday, September 21, 2025

আমার পুজো

ছবি : ইন্টারনেট

আমার পুজো

জগদীশ গাঙ্গুলি 

আমাকে কেউ পুজো সমন্ধে লিখতে অনুরোধ করলে বাঙালির শ্রেষ্ঠ শারদীয়া উৎসব কে তিনটে ভাগে ভাগ করবো, প্রথম ভাগে বয়সীমা জ্ঞান হওয়া আর পুজো সমন্ধে বুঝতে পারা মোটামুটি পাঁচ বছর থেকে পনেরো বছর! এর পর পনেরো থেকে মোটামুটি পয়তিরিশ, এরপরে এখন অব্দি! এই বিন্যাসের কারণ বয়সের সাথে সাথে এই আনন্দ উৎসবের আনন্দর ধরণ, এর রূপ রস গন্ধ ক্রমশঃ পরিবর্তন হয়েছে, তাহলে আমার পুজো নির্ভেজাল সত্যি লেখা দিয়ে শুরু করি!

আমি প্রবাসী বাঙালী, জন্মস্থান  বিহার জামশেদপুর অধুনা ঝাড়খন্ড! বাবা ছিলেন টাটা স্টিল এর কর্মচারী। আমরা টাটার কোয়ার্টার শিদগড়া বলে একটা জায়গায় থাকতাম, টাটাদের কোয়ার্টার এর বিশেষত্ব হচ্ছে এই কোয়ার্টারগুলোর এক এক টা টাইপ ছিলো আর ঐ টাইপ গুলোকে লেখা হতো X টাইপ, XN টাইপ, SL টাইপ, L4 টাইপ, L5আর L6 এরপর সর্বোচ্চ ছিলো KD টাইপ। এই টাইপ দেখে কোয়ার্টার এর চরিত্র বোঝা যেতো, যেমন SL টাইপ মানে একটা বেড রুম, রান্নাঘর, ল্যাট্রিন বাথরুম, L4 মানে দুটো বেড রুম, রান্নাঘর, ল্যাট্রিন বাথরুম, L5 মানে তিনটে বেড রুম, L6 মানে তিনটে বেড রুম, রান্না ঘর এর লাগোয়া আরো একটা স্টোর রুম সাথে ল্যাট্রিন বাথরুম, KD ফ্ল্যাট গুলো ছিলো বাংলো প্যাটার্ন এর, এগুলো টাটার বড় বড় অফিসার্স দের জন্য এলোটেড হতো,  এইসব কোয়ার্টার এর সব গুলোতে একটাই বিশেষত্ব ছিল প্রতিটা কোয়ার্টার এর সামনে একফালি করে বাগান হতো!আমার জন্ম L4 কোয়ার্টার এ। তখন ছিলো যৌথ পরিবার প্রথা, বাবা দেশভাগের পর ভাগ্য অম্বসনে টাটা নগর বা জামশেদপুর যায় আর টাটা স্টিল এ চাকরি পায়! এর পর ওপার থেকে আমার এক কাকু, তিন পিসিমা(এর মধ্যে একজন ছিলো বাল্য বিধবা) আর ঠাকুমা আসে, আমার জ্ঞান যখন হয়েছে ততক্ষনে আমার কাকু TRF( টাটা রবিনশন ফ্রেসার) এ চাকুরী পেয়েছে, কাকুর বিয়ে হয়েছে আর কাকুর তখন দুই মেয়ে, বড়োপিসির  বিয়ে হয়ে গিয়েছে, ভাই বোনদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ছোটো আমার উপর দুই দাদা (এক দাদা 12বছর বয়সেই মারা যায়) তার উপরেও এক দিদি। তখন সব মিলিয়ে বারো জনের যৌথ পরিবার। ছোটো পিসি একটা প্রাইমারি স্কুলের হেড মিস্ট্রেস! দিদি তখন পড়ে ক্লাস নাইন সম্ভবত! দাদা ক্লাস সিক্স, আমি তখন আপার কেজি, আমার খুড়তোতো বোন একজন আমার থেকে এক বছরের বড়, সে ক্লাস ওয়ান, ছোটটি তখনো স্কুল যায়না, ঐ সময় রান্না ঘর, ভিতরের উঠোন টাকেও শেড করে শোয়ার ঘর করা হয়েছিল, রান্না হতো বাইরে। এতো শিবের গাজন পুজো নিয়ে লেখা শুরু করার জন্যে এতো গাওয়া কারণ পাঠক পাঠিকা কে অবগত করানো আমার ছোটবেলায় আর্থ সামাজিক পরিবেশ কেমন ছিলো তা জানানো যার উপর শারদীয়া পুজোর আনন্দ অনেকটাই নির্ভরশীল!

মোটামুটি পাঁচ থেকে পনেরো বছর বয়সে আমার পুজো শুরু হতো পুজোর ঠিক একমাস আগে, টাটাদের যে কোনো কনসার্ন এ বোনাস দেওয়া হতো পুজোর একমাস আগে,আমাদের জামশেদপুর এ বড় বাজার বলতে দুটো প্রথমটা শাকচি বাজার, দ্বিতীয়টা বিস্টুপুর বাজার! টাটার লোকদের ঐ সময় একটা ধারণা ছিলো বিস্টুপুর মানে বড়লোকদের আর শাকচি মানে মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্তদের বাজার(এই ধারণা এখন অব্দি আছে কিনা জানিনা!) বোনাস পাওয়ার আগের দিন বাবা মা কে বলে দিতো পরেরদিন বিকাল চারটায় আমায়, দাদা, দিদি কে নিয়ে শাকচি বাজারে চলে যেতে, সারা রাত আনন্দে ঘুম হতোনা, পরের দিন স্কুল এ গিয়ে আনমনা হয়ে পড়তাম এই চিন্তা করে কখন বাড়ী যাবো তারপর শাকচি বাজার যাবো! মোটামুটি স্কুল থেকে বারোটার সময় ফিরে স্নান, খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম করেই বেলা তিনটের সময় আমরা শাকচির উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম, পথে দাদার সাথে হাল ফ্যাশন এর কি ড্রেস চলছে সেই নিয়ে আলোচনা চলতো! ঠিক বিকাল চারটাতে বাবা সাইকেল নিয়ে অফিস থেকে আসতো, দূর থেকেই বাবাকে দেখে মনটা খুশিতে নেচে উঠতো! বাবা আসার পর সাইকেল এর মালিকানা দাদার হাতে চলে যেতো! প্রথমেই কেনা কাটা শুরু হতো জুতো দিয়ে! মুখোমুখি দুটো দোকান "শ্রী লেদার্স "(এটাই শ্রী লেদার্স এর প্রথম দোকান) উল্টোদিকে "বাটা"! শ্রী লেদার্স এর দাম তুলনামূলক কম থাকার জন্যে (ঐ সময়ে বাবার কাছে সাশ্রয় টাই মুখ্য ছিলো) আমরা শ্রী লেদার্স এ প্রবেশ করতাম, সবার জুতো কেনা হলে ঠাকুমার কাপড় দিয়ে পুজোর বাজার শুরু হতো, এক এক করে পিসিদের, মার, দিদির তারপর সব শেষে আমার আর দাদার(আমার হয়ে দাদাই আমার শার্ট প্যান্ট পছন্দ করতো ) এর সাথেই পুজোর কদিন পাতার জন্যে নতুন চাদর, পর্দার কাপড় কেনা হতো, পর্দা বানাবার দায়িত্ব নিতো মেজো পিসি!  এর মধ্যেই আমার ঘ্যান ঘ্যানানী শুরু হতো জল তেষ্টা পেয়েছে বলে! তখন বোতলজাত জল পাওয়া যেতোনা, জল খাবার জন্যে কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্ট এ ঢুকতে হতো, আমার উদ্যেশ্য জল খাবার নামে ঢুকে জলযোগ করা! বাবা আর মাও সেটা বুঝতো! শাকচি বাজারে ঐ সময়ে একটি গুজরাটি মিষ্টির দোকান ছিলো " ভোলা মহারাজ"(এখনো আছে) ওখানে ঘি এ ভাজা সিঙ্গারা পাওয়া যেতো, ওটা খেয়ে একটা লস্যি খেয়ে বাড়ির পথ ধরতাম।

আমাদের কোয়ার্টার এর ঠিক উল্টোদিকের কোয়ার্টার এ একটি পারিবারিক পুজো হতো, ওটা ছিলো স্বপ্নে পাওয়া পুজো, এখানে মায়ের মুখ হতো কালো, সেটাই নাকি মা স্বপ্নে আদেশ দিয়েছিলেন,  এর প্রতিমা তৈরির জন্যে কলকাতার কুমারটুলি থেকে একমাস আগে মৃৎশিল্পী আসতো, আমি আর আমার মতো কচিকাচার দল সন্ধ্যেবেলা কোনোরকমে একটু পড়াশুনা করে চলে যেতাম মূর্তি বানানো দেখতে, সামনের বাগানের চারদিক কানাত দিয়ে ঘিরে কাঠামোর উপর একটু একটু করে প্রথমে পুয়াল এর আবরণ তারপর মাটি লেপা থেকে চোখের সামনে তিলে তিলে মৃন্ময়ীর রূপে মাকে গড়ে তোলা সবটাই হতো চোখের সামনে, সামনে বসে নিরনিমেষ চোখে আমরা তাকিয়ে দেখতাম! ঐ একমাস আগের থেকেই আমার পুজো শুরু হয়ে যেতো! মহালয়ার আগের দিন বাবা প্রায় পাঁচ প্যাকেট লেরো বিস্কুট নিয়ে আসতো, দিদি রাতে রেডিওর "কলকাতা ক" স্টেশন টিউন করে রেখে দিতো, সারা রাত প্রায় অনিদ্রায় কাটাতাম কখন ভোর হবে! শেষের দিকে হয়তো চোখটা একটু লেগে আসতো, হঠাৎ মার ঠেলা খেয়ে হুড়মুড়িয়ে ঘুম থেকে উঠতাম, ততক্ষনে রেডিওতে চন্ডীপাঠ শুরু হয়ে গিয়েছে, যে রুম এ রেডিও সেখানে সবাই গোল হয়ে বসতো, উল্টোদিকের কোয়ার্টার থেকে চৌধুরী কাকু, তার ছেলে, দুই মেয়ে তারাও আসতো, দিদি এক ডেকচি জল স্টোভ এ বসাতো গরম করার জন্যে(তখনো গ্যাস বা ইলেকট্রিক গাজেট আসিনি, স্টোভ আর কয়লার চুলোই তখন ভরসা) এরপর চা হতো, হাতে হাতে গরম চায়ের কাপ, লেরো বিস্কুট,আমি চা শেষ করেই ছুটতাম সাজি হাতে ফুল তোলার জন্যে! সারা বছর ফুল তুলি বা না তুলি ঐ দিনটা অবশ্যই নির্ধারিত ছিলো ফুল তোলার জন্যে! চোখের সামনে পুব দিক অল্প অল্প করে ফর্সা হচ্ছে, বাতাসে হিমেল পরশ,  শিউলির গন্ধ,,মাঠ ঘাট শিশিরে মাখামাখি! ঘন্টাখানেক ফুলতুলে কোনোরকমে বাড়ী দিয়েই বাড়ির পাশে "অমল সংঘ" ক্লাব এ ছুটতাম ফুটবল খেলার জন্যে, বেলা 9.00নাগাদ ক্লান্ত বিধস্ত হয়ে বাড়ী ফিরে স্নান করে মার হাতে তৈরী পরোটা আর খোসাশুদ্ধ আলুর চচড়ি খেয়ে বিশ্রাম করতাম, সেদিন পড়াশুনার সাথে আড়ি থাকতো!

এর মাঝে একটু একটু করে কালো দূর্গা খ্যাত মার আকার সম্পূর্ণতা পেতো, পঞ্চমীর আগের দিন মাকে ঘাম তেল লাগিয়ে চকচকে করে নতুন কাপড় পড়ানো হতো, হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হতো, চোখ আঁকার সময় কারোর কাছে থাকার অনুমতি থাকতো না, পঞ্চমীর আগের দিন মাকে সম্পূর্ণ সাজিয়ে গুছিয়ে তোলা হতো আর পঞ্চমীর থেকে ঢাকি ভাই এর ঢাকে কাঠি পরে যেতো! কালো দূর্গার মণ্ডপের সামনে একটা ঘুগনি আর ফুচকার দোকান বসতো, তখন চাইনিজ, মোমো বা মুঘলাই খানার চল ছিলোনা বা পাওয়াই যেতোনা এমনকি রোল অব্দি!

পঞ্চমীর থেকে পুজো পরিক্রমা শুরু হতো,  নতুন কাপড় পড়ে হেঁটে হেঁটে বন্ধুরা মিলে ঠাকুর দেখতে বেড়াতাম, আমাদের আশেপাশে মোটামুটি পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার দূরত্ব হেঁটেই ঘুরতাম! এগ্রিকো, টেলকো, গোলমুড়ি, বার্মামাইনস, বাড়িডি, কাশিদীহ, বারোদুয়ারী, আমবাগান এসব জায়গার পুজো হেঁটেই ঘুরতাম, পথে কখনো পচিশ পয়সার হাফ প্লেট ঘুগনি বা সত্তর পয়সায় একটা দোসা, বা পঞ্চাশ পয়সার চাট ইত্যাদি খেতাম, তখন 5টা ফুচকার দাম ছিলো পচিশ পয়সা, একটা কাঠি আইস ক্রিম পাঁচ পয়সা,  কাপ আইস ক্রিম যারা খেত তাদের আমরা ঈর্ষার চোখে দেখতাম। পঞ্চমী, ষষ্টি ঠাকুর দেখে সপ্তমীর সকাল থেকে কালো দূর্গার পুজোতে গিয়ে বসতাম, ওখানে তিনদিন দুপুরের ভোগ(অষ্টমীর দুপুরে গরম ভাত আর বলির পাঁঠার মাংস, তখন তিনদিনই পাঁঠা বলি হতো ) খেতাম, সন্ধ্যায় ধুনুচি নাচ এর সাথে বিখ্যাত সব পুজোর গান আশা, লতা, কিশোর, মান্না বা আরো শিল্পীর কণ্ঠে সে এক স্বর্গীয় পরিবেশ মনে হতো!  নবমীর রাতে মনটা খুব খারাপ হয়ে যেতো কেমন একটা শূন্যতা গ্রাস করতো যেই চিন্তা করতাম কাল বিসর্জন! বিসর্জনের সকালে ঘুম ভাঙতো গুড় জালের গন্ধে, তারসাথে কুঁচো নিমকি ভাজার গন্ধ, ঘুম থেকে উঠেই বাইরে এসে দেখতাম মা, কাকিমা, ঠাকুমা পিসিরা সবাই ব্যাস্ত মুড়ি, চিড়ার মোয়া, নারকোলের নাড়ু, তক্তি, কুচো নিমকি তৈরী করতে, একদিকে বড় একটা গামলায় কাবুলি মটর ভেজানো যা দিয়ে ঘুগনি হবে, একটু বেলা করে বাবা আমাকে নিয়ে বাজার যেতো, বাজার থেকে মটন কিমা নেওয়া হতো ঘুগনীর জন্যে, এর সাথে আনুসাঙ্গিক বাজার করে বাবার সাথে বাড়ী ফিরতাম, ঐ দিন বাবার ছুটি থাকতো, ততক্ষনে মা আর কাকিমা সিঁদুর খেলে বাড়ী ফিরত, দুপুরে তাড়াতাড়ি স্নান খাওয়া সেরে মেইন রাস্তায় আর সবার সাথে গিয়ে দাঁড়াতাম, ঐ রাস্তা ধরে একটার পর একটা প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্যে সুবর্ণরেখা নদীর দিকে এগিয়ে চলতো, খুব ইচ্ছে হতো ঐ মিছিলে পা মিলিয়ে সুবর্ণরেখা যাওযার কিন্তু বাবা মার বুকুনির ভয়ে সাহস হতোনা, আমার কিছু অবাঙালি আমার থেকে বয়সে একটু বড় যারা ওরা যেতো আর সন্ধ্যে বেলায় ওদের কাছে বসে গোগ্রাসে নদীর পারে বিসর্জনের গল্প শুনতাম, এর পর শান্তি জল আসতো, শান্তি জল নিয়ে নতুন প্যান্ট শার্ট পড়ে বড়োদের প্রণাম করে পাড়ায় বেড়াতাম দশমী সারতে, ঐ সময় দশমী চলতো প্রায় কালী পুজো অব্দি, যার জন্যে মাঝে মধ্যেই বাড়িতে কুচো নিমকি, মোয়া ইত্যাদি বানানো হতো কিন্তু তার জন্যে মা ঠাকুমাদের কখনো বিরক্ত বা অভিযোগ করতে শুনিনি!এইসমকার দুটো ঘটনা আমার খুব মনে আছে,  দুটোই নবমীর রাতে, প্রথমটা নবমীর দিন রাতে একটা পুজো প্যান্ডেল এ যাত্রাপালা হবে, তখন খুব যাত্রার চল ছিলো, কলকাতা থেকে বড় বড় যাত্রাদল যেতো পালা করতে, বাবা যাত্রা দেখতে খুব ভালোবাসতো, বাবা যাবে বলে বেড়াতে যাবে আমার দাদা বায়না ধরলো তাকেও নিয়ে যেতে হবে, অনেকক্ষন ঘ্যানঘ্যান করার পর বাবা নিয়ে যেতে রাজী হয়, আমাদের কোয়ার্টার থেকে যেখানে পালা হবে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে! ফাঁকা মাঠে যাত্রার আয়োজন করা হয়েছে, নিশুল্ক প্রবেশ, বাবা দাদাকে একটা জায়গায় বসিয়ে বললো " এখানে বসে থাকো আমি এখুনি আসছি " পালা শুরু হতে তখনো মিনিট পনেরো বাকি, তো বাবা দাদাকে বসিয়ে রেখে পান খেতে একটা পান দোকানে গেলো, কিছুক্ষন পরে এসে দেখে দাদা নেই, বাবার যাত্রা দেখা মাথায় উঠলো,  চারদিকে খোঁজ করেও দাদাকে পাওয়া গেলোনা, বাবা ভয়ে ভয়ে বাড়ী এসে দরজার কড়া নাড়তে মা দরজা খুলে জিজ্ঞাসা করলো " একি তুমি একা, বাবু (দাদার ডাক নাম) কোথায় "! বাবা আমতা আমতা করে কিছু অজুহাত দিতেই যাচ্ছিলো তখনই দেখলো দাদা খাটে শুয়ে ঘুমাচ্ছে, বাবা হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে দাদার কান ধরে উঠিয়ে বসালো, এবার মা বলে উঠলো" তোমার জ্ঞান গম্মি নেই! একটা বাচ্ছা ছেলেকে রাত বারোটায় একা বসিয়ে চলে গিয়েছিলে"! এই নিয়ে মা বাবার ঐ রাতে চাপান উতার শুরু হলো! আসলে বাবা দাদাকে বসিয়ে যাওযার কিছুক্ষন পরেই দাদার মনে হতে থাকে যদি বাবা না আসে, ভুলে যায়! ঐ ভয় থেকে দাদা ওখান থেকে বেড়িয়ে ছুটতে ছুটতে বাড়ী চলে আসে। দ্বিতীয়টা আমাদের কোয়ার্টার এর থেকে কিছু দূরে " বিহারি ক্লাব " বলে একটা ক্লাব ছিলো ফি বছর ওরা পুজো করতো আর নবমীর দিন রাতে ক্লাবের মাঠে নিশুল্ক সিনেমা দেখানো হতো আমরা বলতাম ফকোটিয়া সিনেমা। সেবার সিনেমা চলছে, বইটার নাম ছিলো "সবন ভাদো" নিশ্চল হয়ে সিনেমায় ডুবে গিয়েছি, হঠাৎ সামনের দিকে শিদগড়া বাজার সেই দিকটায় দেখছি আকাশের রং একটু একটু করে লাল হচ্ছে, হঠাৎ তার মধ্যে কেউ চিৎকার করে ওঠে "আগ লাগালবা"!ব্যাস সব মিলিয়ে কয়েকশো লোক ওদিকে দৌড়াই, গিয়ে দেখি বীভৎস আগুন লেগে একের পর এক দোকান ছারখার হয়ে যাচ্ছে, এরমধ্যেও কিছু লোক দোকান লুঠতে বাস্ত্য! আমরাও কিছু বন্ধু একটা পানের দোকানের থেকে কোনোরকমে কিছু লজেন্স আর বিস্কুট বার করি, এরমধ্যে পুলিশ আর দমকল চলে আসে, পুলিশ পুরো জায়গা জুড়ে ব্যারিকেড করে আর দমকল আগুন নেভায়! ভোর রা নাগাদ আগুন নেভে, দোকান মালিকদের হাহাকার, কান্নার মাঝে ভোর বেলা আমরা বাড়ী ফিরে আসি!

এরপর ক্লাস এইট পড়াকালীন বাবা L5 কোয়ার্টার নিয়ে চলে আসে এগ্রিকোতে, তখন বন্ধু বান্ধবের সংখ্যা আরো বেড়েছে, এগ্রিকোর পুজো মণ্ডপে আমার থেকে কিছু সিনিয়র দাদারা আমার বন্ধু এবং দাদাসম, ওদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, ওখানে পুজোর তিনদিন ভোগ(আমরা বলতাম মালসা ভোগ, মাটির হাড়িতে খিচুড়ি, লাবড়া, চাটনি আর পায়েস দেওয়া হতো!) বিতরণের দায়িত্বে আমরা কজন থাকতাম, সকালে টাকা দিয়ে রশিদ কাটতে হতো আর বেলা এগোরোটা থেকে ভোগ বিতরণ শুরু হতো, রশিদ দেখিয়ে ভোগ নিতে হতো!  ভোগ এর সবচেয়ে বেশী চাহিদা থাকতো অষ্টমীর দিন। সারাদিন মণ্ডপে কাটিয়ে সন্ধ্যে বেলায় সব বন্ধুরা মিলে মণ্ডপেই আড্ডা মারতাম আর নবমীর রাতে স্কুটার নিয়ে বেড়ানো হতো, একটা স্কুটার এ দুই জন! সারারাত জামশেদপুর চষে ঠাকুর দেখা হতো! এই প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা মনে পরে গেলো, তখন ক্লাস টেন, সেবার জামশেদপুর এ পেট্রল এর প্রচন্ড আকাল, পুজোর ঠিক আগে ট্যাংকার ধর্মঘটের জন্যে, পাম্প এ পাম্প এ বিশাল তেল নেওয়ার লাইন! সে বছর দাদা একটা নতুন স্কুটার নিয়েছিল "অলউইন পুষ্পক", ঐ স্কুটার এই আমার বাইক আর স্কুটার চালানো শেখার হাতে খড়ি! তো আমিও পঞ্চমীর দিন লাইন দিয়ে তিন লিটার তেল ভরালাম, নবমীর দিন রাত এ ঘুরতে বেড়াবো বলে। তখন প্রায় রাত দশটা! দাদাকে ম্যানেজ করে আমার এক বন্ধু(যদিও বয়সে আমার চেয়ে 10বছরের প্রায় বড় ছিলো, আজ বছর তিনেক আগে মারা গিয়েছে যার একটা স্কুটার রিপেয়ার এর গ্যারেজ ছিলো আর ওটাই আমাদের আড্ডা স্থল ছিলো)বাবলুদার ওখানে গেলাম, চারটে স্কুটার আমার দাদারটা, একটা বাজাজ চেতক আর দুটো লামব্রেটা, রুট প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করে বেড়াতে যাবো, হঠাৎ ডাবু বলে এক বন্ধু বললো "ওর গাড়ী রিসার্ভ এ আছে, ওর বাড়িতে পাঁচ লিটার পেট্রল মজুত আছে, আমরা আগে ওখানে যাই ও তেল টা ভরেই বেড়িয়ে পরবে, এই শুনে আরো এক বন্ধু কাজল বললো, ডাবু আমাকেও এক লিটার দিস, আমার গাড়িতেও তেল কম আছে, আমি ভাবলাম এই সুযোগ আমি কেনো হাতছাড়া করি! আমিও বললাম ডাবু আমার দাদা কত তেল ভরেছে আর খরচ হয়েছে জানিনা আমাকেও এক লিটার দিস! ঠিক হলো ডাবু নিজের গাড়িতে দুই লিটার তেল ভরবে বাকি এক লিটার করে আমরা নেবো! তখন রাত্রি প্রায় সাড়ে দশটা, ডাবুর বাড়ির উল্টোদিকে একটা মাঠ ছিলো সেখানে আমরা দাঁড়ালাম, ডাবু বাড়ির ভিতর গিয়ে একটা পাঁচ লিটার তেলের জার এনে নিজের স্কুটার এ দুই লিটার ভরলো আর বাকিটা আমরা ভাগ করে আমাদের স্কুটার এ ঢেলে গন্তব্য স্থির হলো সর্ব প্রথম গোলমুড়ির "উৎকল ক্লাব" দিয়ে,সেইমতে আমরা স্কুটার স্টার্ট করে বেড়ালাম! হঠাৎ দেখলাম সামনে ডাবুর স্কুটার বন্ধ হয়ে গেল, ডাবু আমাদের বললো  " মনে হচ্ছে প্লাগ এ ময়লা এসেছে, পরিষ্কার করছি ততক্ষন আমরা যেনো পুজো মণ্ডপে গিয়ে দাড়াই ও প্লাগ পরিষ্কার করেই আসছে! ওর কথামতো একটু এগোতে আমার স্কুটারও ভুর ভুর করে নক করতে করতে দাঁড়িয়ে পড়লো, এরপর আরো দুটো! এটা দেখে বাবলুদা বললো " এটা কি করে সম্ভব যে চারটে স্কুটার ই একসাথে বন্ধ হয়ে যাবে! হঠাৎ বাবলুদার কি মনে হলো ও আমার স্কুটার এর ঢাকনা খুলে তেলের পাইপ টা খুলে আঙুলে একটু তেল নিয়ে গন্ধ সুঙে ডাবু কে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো, পেট্রল এর জায়গায় ঐ জারে অন্য কিছু ছিলনাতো! এটা শুনে ডাবু মাথা চাপড়ে বসে পড়লো! কি ব্যাপার! যা জানলাম, ডাবুর রান্নাঘরে একটা জারে ছিলো পেট্রল আর একটাতে ছিলো সর্ষের তেল(ঐ সময় পেট্রল থেকে সর্ষের তেলের দাম অনেকটাই বেশী ছিলো!) ডাবু তাড়াহুড়োতে ভুল করে পেট্রল এর জায়গায় সর্ষের তেল এর জার টা নিয়ে এসেছে যা আমরা প্রত্যেকে স্কুটার এ ঢেলেছি! সবাই এবার ডাবু কে গালিগালাজ শুরু করলো, আমাদের ঘোরা মাথায় উঠলো, পাশের একটা মাঠে স্কুটার গুলো পার্ক করিয়ে তেলের পাইপ খুলে দেওয়া হলো আর এইভাবে ট্যাংকের তেল ড্রেন আউট করে পরের দিন গ্যাস কাটার এর দোকানে স্কুটার নিয়ে ট্যাংক কেটে, সাইলেনসার কেটে সব পেট্রল দিয়ে ক্লিন করে লাগানো হলো, আমাদের ভাগ্য প্রত্যেকের ভালো যে কারোর স্কুটার এর ইঞ্জিন সিজ করেনি, এরপর প্রায় মাসখানেক স্কুটার চালালে সাইলেনসার পাইপ দিয়ে পোড়া সরসো তেলের গন্ধ বেড়াতো!

এরপর শুরু হলো কলেজ জীবন, এর মধ্যে বাবা টাটার থেকে রিটায়ারড করেছে, পুজোর আনন্দ সামান্য হলেও ফিকে হয়ে গিয়েছে কারণ পকেট এ টান ধরেছে। পকেট খরচ চালাবার জন্যে দিনে একটা ইনডেন এর ডিলার এর কাছে চাকরি ধরেছি আর সন্ধ্যে বেলায় পড়াশুনা চালিয়ে যেতে একটা সান্ধ্য কলেজ এ ভর্তি হয়েছি। কেনো জানিনা জীবন যুদ্ধ শুরু করার পর সেই একই শিউলির গন্ধ, ঢাকের আওয়াজ, সেই পুজোর কোলাহল, উন্মাদনা আর আগের মতো আকৃষ্ট করতোনা,সাথে সাথে এটাও বুঝতে পারছি কোথায় যেনো তখন আর এখন এর মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরী হয়ে গিয়েছে! এরপর বিবাহের সুবাদে প্রথম প্রথম বছর দুই শ্বশুর বাড়ির সবাইকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেড়ালেও সেই ছোটবেলার পুজো, তিনদিনের ছয় টাকার হাত খরচা, কালো দূর্গা পূজার(কালের নিয়মে যা বহুদিন পূর্বে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।)সেই নির্মল আনন্দ, মহালয়ার সেই লেরো বিস্কুট, চা, শিউলির সুবাস এখনো মন কে ভারাক্রান্ত করে! ধীরে ধীরে পুজোর এই উন্মাদনা, উচ্ছাস জীবন থেকে হারাতে হারাতে এমন হয়েছে এখন পুজোর ঐ তিনদিন পালিয়ে এমন জায়গায় চলে যাই যেখানে স্মশানের স্তব্ধতা, সভ্যতার ছোঁয়া খুব একটা প্রকট হয়নি, অনারাম্বর একটা দুটো সেই পুজো যেখানে আন্তরিকতা আছে, তালপাতার থালা বা মাটির হাড়িতে খিচুড়ি ভোগ আছে কোনো চাকচিক্য নেই, জৌলুস নেই, থিমের ছোঁয়া নেই!এখন যেটা পুজো মানেই আড়ম্বর, কর্পোরেটের ছোঁয়া, থিম এইসবের আড়ালে আসল পুজোটাই যাচ্ছে! এখনকার বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে শাপলা চেনেনা, মালসা কি জানেনা, পুজোর সময় ফোটা ছাতিম গাছ বা তার ফুল চেনেনা হয়তো ব্যার্থতা আমাদেরই যারা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কে এগুলো শেখাতে উৎসাহ বোধ করিনি!

...(সমাপ্ত)...


Wednesday, October 2, 2024

দুঃসপ্নের হাভেলি

ছবি  : ইন্টারনেট

দুঃসপ্নের হাভেলি

জগদীশ গাঙ্গুলি

সুধী পাঠক যেটা লিখতে যাচ্ছি সেটা বিশ্বাস করা না করা আপনাদের ইচ্ছে, বিশ্বাস করলে ভালো না করলেও দয়া করে সমালোচনা করে আঘাত করবেন না। কথাতেই আছে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর!

সালটা ১৯৯৮ এর শীতকাল, আমার বয়স তখন একতিরিশ বছর রাজস্থানে বিশেষ ভাবে সক্ষম বাচ্ছাদের একটা স্কুলে চাকরি পেলাম, স্কুলটা ছিল নাওয়ালগড় বলে একটা জায়গায়, নাওয়ালগড় এর থেকে মোটামুটি তিরিশ কিলোমিটার উত্তরে সদর শহর ঝুনঝুনু আর দক্ষিণে সিকার বলে একটি জায়গা, এখানে শীতকালে যেমন তীব্র শীত, গ্রীস্ম কালে আবার তেমন গরম! ভোর ছটায় বাস থেকে নামলাম, তখনো সূর্যের আলো ফোটেনি, ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে, কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিলো, অচেনা শহর, অচেনা ভাষা, ওখানকার ভাষা শেখাবাটি ভাষা, কিছুই বুঝছিনা, যাই হোক একটা অটোকে স্কুল এর নামটা বলাতে চিনতে পারলো আর আমায় নিয়ে রওনা দিলো। রাস্তার দুইধারে শুধু দেখলাম বড় বড় রাজস্থানি ব্যাবসাদারদের তৈরী করা বড়োবড়ো হাভেলি , পোদ্দার, ডালমিয়া, গোয়েঙ্কা ইত্যাদি বড় বড় শিল্পপতিদের হাভেলি যেখানে তারা কেউ থাকেনা, কেয়ারটেকার দেখাশোনা করে, চারিদিকে শুধু বালি আর বালি,  কিছু চাষবাস দেখলাম হচ্ছে!:রাস্তার দুই ধারে ময়ূর ঘুরছে, অটোওয়ালা ঠিক ঐ স্কুল এর সামনে নামিয়ে আমায় চলে গেলো, অসহ্য শীত, মনে হচ্ছে হাড় ফুঁড়ে ঢুকে যাবে, দাঁড়িয়ে ভাবছি কি করবো সেই সময় দূর থেকে একজন কে এগিয়ে আসতে দেখলাম, সে কাছে এসে আমার নাম জিজ্ঞাসা করলো, নাম বললাম। সে বললো "আমার নাম মনোজ, আমি এখানকার পিওন, ম্যানেজার বাবু আপনায় নিতে আমায় পাঠিয়েছে "! মনোজ এই বলে আমার ব্যাগ টা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো পিছনে পিছনে আমি ওকে অনুসরণ করলাম!

ম্যানেজার এর নাম রোহিত, আমায় সে সাদরে অভর্থনা করে ভিতরে নিয়ে বসালো, গরম চা এনে দিলো, বললো "আজ আর খাবার দাবার তৈরির হ্যাপ্পা করবেন না আমার সাথে লাঞ্চ করে আমার এখানেই আজ থাকুন, কাল থেকে আপনার নতুন ডেরা দেখিয়ে দেবো "! আমি মাথা নাড়লাম।

পরের দিন স্কুলে গিয়ে নতুন সবার সাথে পরিচয় হলো, দুজন বাদে সবাই স্থানীয়, দুইজনের মধ্যে একজন বিহার থেকে এসেছে তার নাম নিরঞ্জন রায়, বিহারী, অন্যজন রাধেশ্যাম বিকানের থেকে এসেছে, ম্যানেজার রোহিত ঐ দুজনকে বললো আজ থেকে ইনিও তোমাদের সাথে থাকবে বিকালে ছুটির পর একে নিয়ে যেও। নিরঞ্জন আর রাধেশ্যাম দুইজনেই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।

বিকালে যথারীতি ওরা আমায় নিয়ে নতুন ডেরায় চললো, একটা বিরাট হাভেলি, এটা প্রায় দুশো বছরের পুরোনো, এখনকার বংশধরেরা মুম্বাই তে ব্যবসা করেন, ইনারা আমাদের স্কুল কে এটা ব্যবহারের জন্যে দিয়েছেন, আমাদের এখানে বাইরের যতো স্টাফ আসবে সবাইকে এখানে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে! প্রত্যেকের জন্যে একটা করে রুম বরাদ্দ, বাথরুম ছেলেদের, মেয়েদের আলাদা কিন্তু কমন, বিশাল বিশাল চারটে রান্না ঘর। হ্যাভলিটা দোতলা, এর দুটো ভাগ একটা বাহির মহল আর একটা অন্দর মহল, দুটো পার্ট কে সংযুক্ত করে রেখেছে ছোট্ট সরু একফালি প্যাসেজ, যেটায় মাথা নিচু করে হাটতে  হয়, বাথরুম গুলো ম্যানেজমেন্ট থেকে নতুন করা হয়েছে যা সবগুলোই অন্দর মহলে, সারা হাভেলিতে একটা প্রাচীন অদ্ভুত গন্ধ! নিরঞ্জন আমায় বললো-" তুমি আজ নতুন এসেছো, আমি আর রাধেশ্যাম দুজনেই আলাদা রান্না করে খাই, আজ বরঞ্চ তুমি আমার সাথে খাও কাল থেকে জিনিষপত্র এনে নিজে রান্না করে খেও "! আমি সম্মত হয়ে হাত মুখ ধোয়ার জন্যে ভিতর মহলের বাথরুম এর দিকে এগালাম, অন্দর মহলে যেহুতু কেউ থাকেনা তাই কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার শুধু বাথরুম এ আলোর ব্যাবস্থা আছে। প্যাসেজ এ পা দেওয়া মাত্র আমার মনে হলো আমায় কেউ অনুসরণ করছে, পিছনে পায়ের শব্দ! সভয়ে পিছনে চাইলাম কিন্তু কাউকে দেখলামনা, আবার যেই চলা শুরু করেছি আবার একই জিনিস! কোনোরকমে নমো নমো করে বাথরুম সেরে ফিরে আসলাম, একবার ভাবলাম নিরঞ্জনদের ব্যাপারটা বলি কিন্তু ওরা হাঁসাহাঁসি করবে বলে আর কিছু বললামনা, চেপে গেলাম!

এর মধ্যে রাধেশ্যাম আর নিরঞ্জনের সাথে আরো হৃদতা বাড়লো, একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম সারাদিন কিছু নেই, বিকালে হাভেলি তে ঢোকার পরেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়, মনে হয় আড়াল থেকে  সর্বক্ষণ কেউ দেখছে, অনুসরণ করছে আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম রাধেশ্যাম বা নিরঞ্জনের মধ্যে কেউ একজন বাথরুম গেলে সাথে আরো একজন যায়, এর চার পাঁচদিন পরের ঘটনা, আমরা নাইট শো সিনেমা যাবো, আমি আর নিরঞ্জন তৈরী হয়ে রাধেশ্যাম এর রুম এ প্রবেশ করলাম, ও আমাদের সামনে পরনের লুঙ্গি খুলে ভাঁজ করে রেখে  প্যান্ট পড়ে শার্ট গায়ে দিয়ে বেড়ালো! সিনেমা দেখে ফিরে সদ্য রুমে ঢুকে পোশাক পাল্টাচ্ছি, রাধেশ্যাম চিৎকার করে ডাকলো " গাঙ্গুলী, নিরঞ্জন তাড়াতাড়ি এসো " দৌড়ে গিয়ে দেখলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য, মেঝের মধ্যে ছড়ানো ছেটানো বিছানা মায় ওর ছাড়া লুঙ্গি, গেঞ্জি অব্দি! ও বললো " বেড়াবার সময় তোমরা দেখলে আমি সব পাটপাট করে ভাঁজ করে বিছানায় রেখে গিয়েছি, এসে এই দৃশ্য দেখছি "! কিভাবে সম্ভব যেখানে বাইরে থেকে দরজা লক করা, দেউড়ি গেট (মেইন গেট) লক করা, তবে কে ঢুকে এমন করবে! এটা দেখার পর আমিও আমার অভিজ্ঞতা সেদিন ওদের বললাম, শুনে ওরা বললো "আমরা এটা জানি যার জন্যে সন্ধ্যার পর একা একা আমরা বাথরুম এ যাইনা আর তুমিও যেওনা "! সেদিন রাতে নিরঞ্জন আমার রুমে শুতে আসলো, সেদিন ও বললো রাতে নাকি ওর রুমে কেউ পায়চারি করে আর সেটা এক না একাধিকবার!

রাতে বাহির মহলেই আমরা ছোটো একটা অস্থায়ী  বাথরুম করলাম, একদিন রাতে আমি বাথরুম গিয়েছি, হঠাৎ মনে হলো আমার দরজার সামনে রাধেশ্যাম দাঁড়িয়ে, সামনে যেতে স্যাট করে মনে হলো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো, পরের দিন সকালে ওকে জিজ্ঞাসা করাতে ও বললো সে সারারাত রুমেই ছিলো বাইরে বেড়াইনি।

সমস্যাটা ঘোরোতোর হলো উপরের একতলার তিন মহিলা কর্মচারীকে তিনটে রুম খুলে দেওয়াতে, এই তিনজনই দিল্লির থেকে এসেছিলেন, আরো দুইজন পুরুষ কর্ম্মচারিও এসেছেন, একজন মুম্বাই আর একজন বিহার থেকে, আমি রাধেশ্যাম আর নিরঞ্জন ঠিক করে নিয়েছিলাম নতুন আগতদের আমরা আগ বাড়িয়ে কিছু বলবোনা, কপাল খারাপ হলে ওরা নিজেরাই অনুভব করবে। এর মধ্যে গ্রীস্ম এসেছে আমরা পাঁচ পুরুষ মানুষ ছাদের উপর বিছানা পেতে শুতে শুরু করেছি, একদিন রাতে  আমার রুমে বসে আমি বই পড়ছি, বাকিরা ছাদে শুতে গেছে, আমিও যাবো যাবো করছি, হঠাৎ অস্বাভাবিক গলায়  এক মহিলার চিৎকারে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে  চুরমার হয়ে গেলো, আমি দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি তিন মহিলা কর্মচারীর একজনকে আর এক মহিলা যার নাম কিরণ জাপটে ধরে আছে। চিৎকার শুনে বাকি পুরুষরাও উপর থেকে নিচে  নেমে এসেছে, পাণ্ডে ম্যাডামও (ইনি তৃতীয় মহিলা যিনি দিল্লি থেকে এসেছেন) বেরিয়ে এসেছেন। কিরণ বললো -" ও নিজের রুমের সামনে পায়চারি করছিলো আর গুপ্তা ম্যাডাম(যাকে কিরণ জাপটে ধরে ছিল)সকালের মেলে যাওয়া কাপড় তুলছিলেন, হঠাৎ কিরণ দেখে গুপ্তা ম্যাডাম চিৎকার করে  দৌড়ে নিচে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলো তখন কিরণ দ্রুততার সাথে উনাকে জাপটে ধরে "! গুপ্তা ম্যাডামের চোখে মুখে অসম্ভব ভীতির ছাপ, শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে, কাউকে যেনো চিনতে পারছেনা, অনেক কষ্টে উনাকে স্বাভাবিক করার পর উনি বললেন " উনি যখন শুকনো কাপড় তুলছিলেন উনার মনে হলো উনাকে হঠাৎ পিছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরলো, উনি ভাবলেন কিরণ বুঝি ইয়ার্কি করে জড়িয়ে ধরেছে, উনি ছাড়তে বলাতে আরো জোরে জড়িয়ে ধরলো, ব্যাথা লাগায় উনি পিছন ফিরে দেখেন একজন পুরুষ মুখভর্তি দাড়ি, বলিষ্ঠ চেহারা পরনে একটি লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি  পরিহিত  উনাকে জড়িয়ে ধরে আছে এরপর উনি অসম্ভব ভীত হয়ে দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে ঝাঁপ মারতে যান, এইসময় মুম্বাই থেকে যে ছেলেটি  এসেছে বিশেন, সে বলে ওঠে তার রুমেও রোজ সে ফিশফিশ করে  শেখাবাটি  ভাষায়  পুরুষ আর মহিলার কণ্ঠে  কথা শোনে, আমরা হাসাহাসি করবো বলে সে এতদিন চেপে রেখেছিলো, সেদিন সারারাত বিনিদ্র কাটিয়ে আমরা ঠিক করি পরের দিন ম্যানেজামেন্ট কে সব জানানো হবে।

  পরের দিন রোহিত কে সব বলাতে উনি হেঁসে গড়িয়ে পড়লেন! আমরা অ্যাডামেন্ট অন্য জায়গায় থাকার ব্যবস্থা না হলে চাকরি করবোনা, প্রাণ আগে। রোহিত  উনিবিংশ শতাব্দীতে কিভাবে এসব আমরা বিশ্বাস করি সেই নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন!  তারপরেও আমরা সিরিয়াস দেখে অনুরোধ করলেন আর কিছুদিন থাকতে, উনি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন বলে। এর পর আমরা বিকালের আলো থাকতে থাকতে কোনোরকম দুটো রান্না করে খেয়ে রাতটা একটা ধর্মশালাতে  কাটানো শুরু করলাম। রান্নার দায়িত্বে রোজ দুইজন করে থাকতো বাকিরা উঠানের মাঝে খাঁটিয়া বিছিয়ে বসে গল্প করতাম! একদিন এমন দুইজন রান্না করছে আর বাকী আমরা বসে গল্প করছি হটাৎ দেখি আমার রুমে সেই গুপ্তা ম্যাডাম বর্ণিত অবিকল সেই লোকটা কিছু খুঁজতে খুঁজতে ঢুকছে, ভয়ে আমার দমবন্ধ হয়ে আসলো আমি চিৎকার করে কিছু বলতে চাইলাম গলা দিয়ে স্বর বেড়ালোনা, পাণ্ডে ম্যাডাম  আমার মুখোমুখি বসেছিল আমার মুখের অভিবাক্তি দেখে বললো "গাঙ্গুলি কি হয়েছে "! অনেক সাহস নিয়ে বললাম "আমার রুমে কেউ ঢুকেছে " সবাই দৌড়ে দেখতে যাবো  ওদিকে রান্নাঘর থেকে রাধেশ্যাম চিৎকার করে বললো " ওখানে কে দাঁড়িয়ে "! আমরা গিয়ে রাধেশ্যাম কে জিজ্ঞাসা করলাম " কি হয়েছে "! সে বললো অবিকল ঐ লোকটা রান্নাঘরের বাইরে  দাঁড়িয়ে ছিলো যার কথা গুপ্তা ম্যাম বলেছিলো "! যেখানে আমার রুম থেকে রান্না ঘর প্রায় হেঁটে গেলে তিন মিনিটের পথ, এতো তাড়াতাড়ি একই লোক আমার কামরা থেকে ওখানে যেতে পারেনা! খাওয়াদাওয়া শিকায় উঠলো সবাই মিলে ধর্মশালায় রওনা দিলাম।

পরের দিন জয়পুর থেকে কর্তৃপক্ষ এক নামকরা তান্ত্রিক কে নিয়ে আসালো, তখনকার দিনে তার ফিস চার হাজার টাকা সাথে দুইজন চেলা, উনি এসে সব সরোজমিনে দেখে জানালেন ওখানে অতৃপ্ত প্রেত আত্মার অস্তিত্ব আছে কিন্তু উনি তিন দিনের যজ্ঞ করে সব শুদ্ধ করে দিলে আর কোনো কিছু গোলমাল হবেনা  যথারীতি তার পরের দিন থেকে যজ্ঞ শুরু হলো, তৃতীয় দিন আমরা সবাই সন্ধ্যের সময় যজ্ঞ দেখতে গেলাম, তান্ত্রিক মশাই হোম কুন্ড জ্বালিয়ে মন্ত্র পাঠ করছেন তাকে ঘিরে আমরা সবাই বসে! হঠাৎ এই সময় ছাদে একসাথে তিরিশ চল্লিশজন মানুষ দৌড়ালে যেমন আওয়াজ হয় সেরকম আওয়াজ শুরু হলো! তান্ত্রিক মশাইও চোখ খুলে উপর পানে চাইলেন! এরপর কোনোরকমে যজ্ঞ শেষ করে আমাদের ঘটিতে জল আর আম পল্লব দিয়ে সব রুমে ছেটাতে বললেন! আমার আর রাধেশ্যাম এর উপর সেই দায়িত্ব পড়লো! আমরা একেকটা রুমের সামনে দাড়াই আর নমো নমো করে জল ছিটাই! এই করে আর দুটো রুম বাকি হঠাৎ দেখি সেই দাড়িওয়ালা লোকটা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে, পরিমরি করে দৌড়ে আমরা বাইরে এসে দেখি সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে এমনকি সেই তান্ত্রিক অব্দি! সবাই ঐ ভাবে আমাদের আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করে কি হয়েছে! আমরা সব খুলে বলি, অতঃপর তান্ত্রিক মশাই বলেন " আনঅফিসিয়ালি আমি তোমাদের এখানে থাকতে বারণ করবো কারণ এই হাভেলি টা সত্যি গন্ডগোলের"! এর পর অত কিম! সবাই এক এক করে নাওয়ালগার কে বিদায় জানাতে শুরু করলাম।

...(সমাপ্ত)...

Saturday, October 21, 2023

উদ্বাস্তু

ছবি : ইন্টারনেট


উদ্বাস্তু

জগদীশ গাঙ্গুলি

"ওরে দাশু, দাশু রে শুনলাম নাকি আমাদের এই ভিটে মাটি ছেড়ে কলকিতা না কি যেনো নাম ওহ মনে পরসে আন্দিয়া না কি ঐখানে যাইতে হইবো"! শীতের অলস সকাল, দুইধারে বেগুন আর মুলোর ক্ষেত যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ, বাংলাদেশের কুয়াকাটা গ্রাম, সময়টা উন্নিশো ছেচল্লিশ সালের ডিসেম্বর এর একটা শীতের সকাল, প্রশ্নকর্তা কালিদাসীর বড় সন্তান হচ্ছে দাশু যার ভালো নাম জ্যোতি গাঙ্গুলি, কলিদাসীর তিন মেয়ে আর দুই ছেলের মধ্যে এই দাশু হচ্ছে সবচেয়ে বড়, তারপর পরপর তিন মেয়ের পর ছোটো পুত্র ননী বা ননী মাধব গাঙ্গুলি। দাশু এখন দশম ক্লাস এর ছাত্র, পড়াশুনায় বরাবর মেধাবী। কালী দাসীর স্বামী, দাসুর বাবা যজমানি করতেন বছর খানেক হলো মারা গেছেন, কিছু চাষবাসের জমিজমা করে গেছেন, কালী দাসী শক্ত হাতে হাল ধরে গ্রামের রফিক কে দিয়ে সেই জমিতে চাষবাস করান যার একটা ভাগ রফিক পায়। চাষবাস থেকে হাটে গিয়ে ফসল বিক্রি সবই রফিক করে থাকে। এইভাবেই কষ্টে সৃষ্টে কালী দাসী পাঁচ ছেলে মেয়েকে নিয়ে বেঁচে আছেন। মার কথা শুনে দাশু কিছুক্ষন চুপ করে থাকলো তারপর আস্তে আস্তে বললো - " মুসলিম লীগ আর হিন্দু মহাসভা চাইছে সাহেব দের সরিয়ে দেশ কে দুটো ভাগে ভাগ করতে যার দুটো টুকরো হবে ভারত আর পাকিস্থান। কালীদাসী কিছু বুঝলেন কিনা দাশু বুঝতে পারলনা শুধু দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে বলে উঠলো - " দুগ্গা, দুগ্গা"!

দুদিন পর রফিক মিয়া সকালে বাড়িতে এসেছিলো, কালীদাসী চা আর মুড়ি খেতে দিলেন, রফিক মুড়ি চিবোতে চিবোতে বললো - "বউঠান আমাগো এখনকার ভাবগতিক ঠিক ঠেকতেচেনা, কাল রাইতে আমাগো ছোটো মসজিদ এ মিটিং ছিলো ওখানে আমাগো গ্রামের মাত্তবর গফুর মিয়া কইতেছিল - "এই দেশখান আমাগো এইবার দেশ ভাগ হইলে এই হিন্দু দের এওখানে থাকবার কোনো অধিকার নাই এদের এইবার তারণ দিতে হইবো"! কালীদাসী গালে হাত দিয়ে রফিকের কথা শুনছিল, বললো "ও রফিক আমাগোর বাপ ঠাকুরদার জন্ম কম্য তো সব হাইখানে, আমরা তবে জামুটা কই!"  এর উত্তর রফিকের কাছে নেই, সে চুপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকলো।

এর মধ্যে কালিদাসী আশেপাশের আর কয়েক ঘর যে হিন্দু পরিবার আছে তাদের সাথে কথা বলে বাস্তবিক পরিস্থতিটা কি বোঝার চেষ্টা করেও কিছু বুঝে উঠতে পারলনা সমসময় এখন একটা ভয় ভীত পরিবেশ, যে সব মুসলমান ভাই বোনেরা এতদিন ধরে এই হিন্দু পরিবার গুলোর সুখ দুঃখের সাথী ছিলো তারাও আজকাল কেমন যেনো এদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করলো, কথাবার্তাও খুব একটা দরকার না হলে আর বলতনা, এর মধ্যে রফিক এসে একদিন কালিদাসী কে বললো -"মা ঠাকুরণ আর বোধ হয় আপনাগো কাজ আমি করতে পারুম না আমার গেতি গুষ্ঠি আমারে না করতাছে হিন্দু বাড়ি কাজের জন্যে"। কালীদাসী চুপ করে থাকলেন চোখের কোন দুটি ঝাপসা হয়ে আসলো, রফিকেরও কি তা হলনা!নাহলে রফিক কোনো রকমে মুখটা পিছন করে দৌড়ে পালাবে কেনো!

গ্রামে মুসলিম লীগ বলে নাকি এক নতুন পার্টি এসেছে,এরা জায়গায় জায়গায় সভা করছে আর বলে বেড়াচ্ছে হিন্দুদের এসব স্থানে কোনো জায়গা নেই, তাদের এই ভিটে মাটি ছেড়ে চলে যেতে হবে, অনেক হিন্দু বনেদি পরিবার যাদের সামর্থ্য আছে তারা জলের দরে ভিটে মাটি মুসলমান দের  বিক্রি করে কলিকাতা না এমনি একটা কোনো জায়গায় চলে যাচ্ছে, যাওয়ার সময় বাড়ির মহিলাদের সে কি কান্না! কতো স্মৃতি, মূহুর্ত, ভালোলাগা, ভালোবাসা,পুকুর ভরা মাছ, নিজেদের হাতে লাগানো চারা পেয়ারা, আম, জাম, কাঠাল,তাল যেগুলো আজ মহীরুহতে পরিণত হয়েছে, গোলা ভরা ধান, গোয়ালের গরু বাছুর, হাস,পায়রা সব ছেড়ে আজ চলে যেতে হচ্ছে, যেখানে যাবে অপরিচিত জায়গা, অপিরিচিত পরিবেশ, নতুন লোকজন পারবেতো সব কিছু মানিয়ে আবার নতুন ভাবে সব শুরু করতে! তাও এরা যেতে পারছে আর যারা পারছেনা, সামর্থ্য নেই তারা মনে মনে ক্ষ্মীন একটা আশা জিয়ে রেখেছে আগামী দিনে আবার সব আগের মত ঠিক হয়ে যাবে! আবার তারা এখানে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে! কিন্তু হায়রে মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক!

দাশুর মনমেজাজ খুব খারাপ ও বুঝতে পারছে একটা ঝড় এগিয়ে আসছে যা সব লন্ডভন্ড করে দেবে, ছোটো ছোটো অবুঝ  ভাইবোনগুলোকে ,মাকে নিয়ে কি করবে সে বুঝতে পারছেনা! এর মধ্যে কানা ঘুষয় শুনলো একজন ব্রিটিশ বিচারপতি স্যার সেরিল রেডক্লিফ নাকি নাম তাকে দায়িত্ব দাওয়া হয়েছে বাংলা বিভক্ত করার বাউন্ডারি কমিশনের, যার ম্যাপ করার কোনো প্রতিষ্ঠানিক বিদ্যা নেই, যে  না বাংলা ভাষা বোঝে,  না বাংলার সংস্কৃতি বোঝে, বাঙালির মনন বোঝে, বাংলার আনন্দ বেদনা যে কিছুই বোঝেনা, এর হাতে কোটি কোটি বাঙালির ভবিষ্যত ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কোটি কোটি বাঙালির জীবন যার হাতে অনিশ্চিত! মুর্শিদাবাদ, সিলেটের মানুষ আজ বিভ্রান্ত, ১৯৪৭এর এপ্রিল মাসেও বোঝা যায়নি দেশ ভাগ হবে কিন্তু এই স্যার সেরীল এর কাজকর্মে এবার দেশ ভাগের ছবিটা একটু একটু করে পরিষ্কার হতে শুরু করে। রাতের অন্ধকার চিরে শত শত মুসলিম এবার পথে নেমে আল্লাহ আকবর হুঙ্কার দিয়ে হিন্দুদের ঘর বাড়িতে আগুন লাগানো শুরু করে, বহুদিনের চেনা জানা জাহাঙ্গীর, আবুল, লতিফ,আসিফ,মকবুলরা চোখের সামনে কেমন পাল্টে যায়, শয়ে শয়ে হিন্দু প্রাণ বাঁচাতে ভিটে মাটি ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে রাস্তায় নেমে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে একটু আশ্রয়ের জন্যে দৌড়া দৌড়ি শুরু করে, এর মধ্যে কারোর মাথায় লাঠির আঘাত পরে, সারা শরীর রক্তে ভেসে যায় তার মধ্যেও তারা দৌড়ায়, কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে স্থির হয়ে যায়, কেউ কোনো ঝোপ ঝাড় দেখে তার মধ্যে ঢুকে ভয়ে কাঁপতে থাকে, চোখের সামনে কতজন তাদের মা, বোন দের নির্মম ভাবে ধর্ষণ হতে দেখে। দাশু তার চার বোন,ছোটো ভাই আর মাকে নিয়ে রফিক চাচার বাড়িতে আশ্রয় নেয়, চোখের সামনে তাদের সাধের ভিটে, তুলসিতলা,সামনের উঠোন টা ধূলিসাৎ হতে দেখে,একদলা কান্নার মত কিছু একটা গোঙানির মতো গলা দিয়ে বেড়াতে চায়, রফিক চাচা বলে - " দাশু এক কাম কর সবাইরে লইয়া তুই বেড়াতে পারবিনা, তোরে, ননী আর মা ঠাকুরন কে যেমন কইরা হোক আমি রাতের অন্ধকারে গোয়ালন্দ ঘাট অব্দি লইয়া যামু তারপর ওপারে রানাঘাট এ শুনছি হিন্দুদের থাকার জন্যে একটা ক্যাম্প করা হইছে ওই অব্দি আমি তোদের ছাইড়া আসুম আর এই মাইয়া কডা এই গরীব চাচার ভিটায় আমার জিম্মায় থাক পরিস্থিতি একটু সাবভিক হইলে তারপর এগুলারে লইয়া ছাইড়া আসুম"! রফিক চাচার কথায় দাশু কোনো উত্তর দিলনা,দাশু শুধু ভাবছে এরপর কাল থেকে কি হবে!কি খাবে, কোথায় থাকবে! ভাইবোন গুলোর কি হবে! সন্ধ্যার পর দাশু, ননী আর কালীদাসী তৈরী হলো, কালিদাসী একটা পুঁটলিতে যতটা হয় চিরে মুড়ি আর গুর নিয়ে নেন, রফিক কালী দাসীর হাতে পঞ্চাশ টা টাকা জোর করে গুঁজে দেন, কালীদাসীর চোখ ভিজে ওঠে, রফিক কে প্রাণভরে আশীর্বাদ করেন। রফিক বলে ওঠে - " মা ঠাকুরন আর দেরী করা সমচিন হইবনা এবার চলেন"। রফিক হাতে একটা দা নিয়ে দরজা খোলে, বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার, একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে, কালীদাসী কে রফিক একটা বোরখা পড়িয়ে দেয়। দত্তদের মাঠের পাশ দিয়ে, সোনা দীঘি কে পিছনে রেখে দাশুর স্কুল এর পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে তারা এগোতে থাকে, দাশু শেষ বারের মত স্কুলটা দেখে নেয়।l বুকের ভেতরে একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। পথে

রফিক মিয়া ছিলো বলে কেউ কোনো সন্দেহ করেনি। যেতে যেতে দাশু পথের দুধারে হিন্দুদের বাড়িঘর দেখে শিউরে ওঠে। রাতের অন্ধকারে প্রতিটি বাড়ি যেনো এক একটা মৃত্যুপুরী।কোনো বাড়ি ঠিকঠাক অক্ষত নেই, একটা ঝড় যেনো সব লন্ডভন্ড করে গিয়েছে।

কুয়াকাটা গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে মেন রাস্তায় দাশুরা যখন উঠলো দেখলো কাতারে কাতারে লোক গোয়ালন্দ ফেরি ঘাটের দিকে বিধ্বস্ত শ্রান্ত হয়ে দেহটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কোথায় যাবে, কি তাদের ঠিকানা কেউ জানেনা, ননীর ছোটো শরীর এর মধ্যই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, পথের একপাশে বসে সবাই একটু চিরে গুর খেয়ে নেয়, জল খায়, রফিক মিয়া ননিকে কাঁধে উঠিয়ে নেয়। আবার চলা শুরু। ভোরের আকাশ যখন ধীরে ধীরে লাল বর্ণ ধারণ করছে সেই সময় তারা গোয়ালন্দ ফেরি ঘাটে পৌঁছায়, চারদিকে শুধু মাথা আর মাথা। রফিক মিয়া তাদের ঘাটে বসিয়ে চারটে টিকিট কেটে আনে, দাশু শোনে তাদের ফেরিতে করে ওপারে যেতে হবে, তারপর ট্রেন ধরে রানাঘাট বলে একটা জায়গায় নামতে হবে, সেখান থেকে আরো  সবার সাথে উদ্বাস্তু ক্যাম্প এ গিয়ে উঠতে হবে, তাদের ওখানে পৌঁছে রফিক মিয়া ফিরে আসবে। কালীদাসী অস্ফুটে শুধু একবার বলে ওঠে " রফিক রে এবার আর মনসা পুজোটা করা হইলো নারে"! রফিক মিয়ার মুখে স্বজন হারাবার বিষাদের ছায়া। ফেরিতে গাদাগাদি করে উঠে ওপার পারে নেমে দাশুরা শেষবারের মতন ওপারটা দেখে নেয়, এই হয়তো তাদের শেষবার নিজের দেশটাকে দেখে নেওয়া। রফিক কালীদাসী কে আশ্বস্ত করে তার প্রাণ থাকতে কালীদাসীর মেয়েদের চিন্তা করতে হবেনা। তারা একটু থিতু হলে রফিক নিজে তাদের এপারে দিয়ে যাবে। দাশু ভেবে পায়না ওপারে কিভাবে তারা থিতু হবে! ফেরি থেকে নেমে ভোরের আলোয় তারা স্টেশন এর দিকে হাটা দেয়, আজ থেকে তাদের নতুন পরিচয় "উদ্বাস্তু"। পথে আসতে আসতে কানে আসছিল  পনেরো আগস্ট ইন্ডিয়া পাকিস্তান নামে দুটো স্বাধীন দেশ জন্ম নেবে আর তাদের ভিটে মাটি সব থাকা সত্বেও সব হারিয়ে তারা উদ্বাস্তুর তকমা ধারণ করে এই অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়াবে, তাদের জন্যে কারোর কোনো চিন্তা নেই, কারোর কোনো ভাবনা নেই, কেউ জানেনা এই অভিশপ্ত জীবনের শেষ কোথায়!

...(সমাপ্ত)...