![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
উৎসবের অন্তরালে
শ্রাবণী মুখার্জী
একমাস ধরে টানা বৃষ্টিতে ভিজে আকাশের গায়ে যেন খানিক শ্যাওলা জমে গিয়েছিল, আজ সক্কাল সক্কাল সূর্যের হলুদ আলো পড়তেই পৃথিবী জুড়ে বাজলো আলোর বেণু। প্রকৃতি সেজে উঠল নববধূ সাজে। গাছের চারাগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে কচি পাতার গন্ধ দূর থেকে ভেসে আসছে। নাম না জানা কত্ত রকমের ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে চারিধার। মনটা বেশ প্রফুল্ল হয়ে গেছে শ্রেয়ার। আজ বৃহস্পতিবার তার জন্য সম্বন্ধ আসবে, ছেলেটি নাকি ডাক্তার। ছবি দেখে তো ভালোই লাগছে জানে না সে আদতে কেমন হবে। এই সমস্ত চিন্তায় মগ্ন হয়ে বই এর পাতা উল্টাচ্ছে আর জানলা দিয়ে আকাশটাকে দেখছে।চারিদিকে খুশির ঢেউ।
শুধু দালান ঘরেই রোদের ঝিলিক খেলে নি, নোয়াখালি বস্তিতেও রোদের তাপ নামে।
শরৎকাল আস্যে গেল মা, ইবার দুগ্গাপূজা হবেক লায় মা? প্রফুল্ল হয়ে চোখে খুশির ঝিলিকে জিজ্ঞাসা করল খেঁদি তার মা বাতাসীকে।
হ রে, ইবার ঠাঁকরুন নাকি শুনচি লৌকায় আসবেক, তারমানে বেদম বিস্টি হবেক।
কাদায় কাদায় ভরে থাইক্লে কি করে লতুন জামা পর্ব মা?
লতুন জামা হয়ত নাই বা পর্লি ক্যানে কিন্তু যদি বেদম বিষ্টি হয় তাইলে তো মুদের ঘরে জল ঢুকবেক রে.. কি কইরে ঠেকরানকে পূজা করব? কুথায় বসাব? আমি তো সেটাই ভাবছি।
হ সে তো বটেই গ মা।গোটা বিশ্ব যেখানে মা দুগ্গার আসার আয়জন করে সিখানে মুরা ভাইব্যে ভাইব্যে অস্তির।
সন্ধ্যায় রাজধানী থেকে পাত্র পক্ষ আসবে শ্রেয়াকে দেখতে, নানা আয়োজনে আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখে নি শ্রেয়ার বাবা মিঃ সুশীল রায়, যিনি নিস্তারিনী কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।
অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল মান্নান বিশেষ সম্মান দিতেন সুশীল রায়কে তার গাম্ভীর্য ও জ্ঞানের জন্য। মাত্র দুইমাস হলো অবসর নিয়েছেন। মেয়ের বিয়ে দিলেই তার সাংসারিক কাজ ও কর্তব্য থেকে সাময়িক মুক্তি। যদিও সংসারে মুক্তি বলে কোনো জিনিষই নেই। একমাত্র চিরতরে চোখ বন্ধ করলে…..
শুনছো শ্রেয়া কোন শাড়িটা পরবে দেখো তো, এই গোলাপী রঙের না এটা .. বলে হাতে ধরে থাকা তিন চারটে শাড়ির দিকে ইশারা করছে, ভাবের চমক ভেঙে সুশীল বাবু দেখলেন হাতে একগাদা শাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শ্রেয়ার মা শিল্পা দেবী।
এগুলো আমি কি বলব বলোতো? শাড়ির ব্যাপার তো মেয়েরাই ভালো বোঝে।
আমিও বুঝতে পারছি না বলেই তোমার কাছে নিয়ে এলাম, তোমার চোখে যেটা সুন্দর লাগছে সেটা বলো সেটাই পরবে শ্রেয়া। এতো বড়লোক ঘরের ছেলে আসছে একটু ভালো করে না সাজলে তোমার মান থাকবে বলো?
সুশীলবাবু আলতো চোখে একবার শিল্পাকে দেখে নিয়েই তাঁর হাত থেকে একটা শাড়ি ধরে বলল এটা পরতে বলো মামণিকে, যদিও আমাদের মামণি যেটাই পরবে সেটাতেই সুন্দর লাগবে।
ঠিক আছে, আর নজর দিও না, আসলে ও ঠিক তোমার মতোই হয়েছে রূপে লক্ষ্মী গুণে স্বরসতী। জানো পিতৃমুখী কন্যা হয় বড় ধন্যা।
একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে সুশীল বাবু বললেন, হুম _ রূপই তো অনেকসময় সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে যায়।ইংলিশ এ অনার্স করল মাষ্টারডিগ্রী করার সুযোগ দিলাম না,মেয়েটার চাকরি করার খুব ইচ্ছে কিন্তু একমাত্র এই ভয়েই তো তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি, দিনকাল ভালো নয়। বিয়ের পর স্বামীর কাছে থেকে পড়ুক আমি সবরকমের সহযোগিতা করব।
জানলার শার্শীতে চোখ রেখে কনে দেখা আলোয় আকাশটাকে দেখছে শ্রেয়া একমনে একদৃষ্টিতে। একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে আর আকাশকে এই ভাবে দেখা যাবে না, তখন আবার আকাশের অন্যরূপ।
যতক্ষণ পারে দেখে নিক মন ভরে।
আকাশের সাথে শ্রেয়ার খুব ভাব যেন দুটিতে একসাথে জন্মেছে। আকাশ যে তার বড্ড আপন, বাবাকে বলতে পারে নি সেকথা। সেই ক্লাস নাইন থেকে ভালোলাগা ভালোবাসা সবই কিন্তু…
কি রে তুই এখনো জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আছিস রেডি হোস নি কেন? এক্ষুনি সৌরভরা চলে আসবে ফোন করেছিলো।
ভাবুক চোখে তাকিয়ে শ্রেয়া বলল আমি রেডি মা।
সেকি তুই তোর বাবার পছন্দ করা গোলাপি শাড়িটা পরিস নি কেন? ওটা কি তোর পছন্দের নয়?
বাবার কাছে আমি ঋণী মা, তাই বাবার সবকিছুই আমার পছন্দের। তুমি যাও আমি গোলাপি শাড়িটা পরে আসছি এখুনি।
খেঁদি ফুলের মালা বোনে, স্কুল যাওয়ার পথে সেগুলো বিক্রি করে, খেঁদির বাবা শহরে চটকলে কাজ করে। বাতাসীও লোকের ঘরে ঠিকা ঝি’এর কাজ করে। এখন আরো বেশি করে মালা গেঁথে নিতে হবেক, দুগ্গাপূজায় চড়ক বসবেক, মেলা হবেক , মিঠাই কিনতে হবেক। টাকা চাই ত।
উদয়াস্ত পরিশ্রম করে খেঁদির বাবাও মা। খেঁদিকে স্কুলে পাঠায়, বলে তু আমাদেরকে মত মুক্ষু হবি লা, তুকে লিকাপড়া কইরতে হবেক, সেদিন পঞ্চায়েতের দিদি বলছিল খেঁদি গেরামের ইস্কুল পাশ দিলেই আমার কাছে পাঠায় দিবে খেঁদির মা। একটা কাজ আছে। মাসে মাসে বেতল দিবেক। তু লে মালা গেঁথে সময় লস্ট না কইরে লিকাপড়ায় মন দ্যা।
রূপবতী কন্যা ও সুদর্শন পুরুষ পাত্র পাত্রীর তো দেখাশোনার কোনো ব্যাপার নেই, জাষ্ট একটা সৌজন্য সাক্ষাৎ, একটু আমনা সামনা বসে দুটো কথা একটু সময় কাটানো। শ্রেয়া ও সৌরভের বিয়ের দিন ধার্য হলো। পুজোর পরেই বিয়ে হবে নইলে এখন একবছর হবে না। সৌরভকে একটা ট্রেনিং এর জন্য বোম্বে যেতে হবে। তাই বিয়ে সেরে যাওয়াই উচিত মনে করছেন সৌরভের বাবা ডাঃ দীপঙ্কর দত্ত। দুর্গাপূজা থেকে লক্ষ্মীপূজা দেবী পক্ষ তাই সব দিনই শুভ।
কয়েকঘণ্টা বেশ আনন্দে পূর্ণ ‘রায় মেনশন’। শ্রেয়ার চোখ তবুও আকাশ খোঁজে। বিয়ের সামিয়ানায় আকাশ ঢাকা।
মন খুশিতে ভরে উঠতে পারছে না কিন্তু হাসছে, কথা বলছে সবই করছে কিন্তু যেন ছন্দ খুঁজে খুঁজে। হাতড়ে বেড়ায় শব্দগুলো।
সৌরভরা বিদায় নেওয়ার পরই শ্রেয়া দরজা বন্ধ করে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে অঝোরে কেঁদে নিল একপশলা।
চটকল বন্ধ করে দিবেক বলচে লাকি? মুখের ভাত ক্যাইড়ে লিবেক লাকি রে মোধা।
হ সেরকমই শুনচি ত রে শুন আমরা সবাই মিলে একসাথে চল মালিক কে যায়ে বলি, মুদের পরিবার গুলান না খ্যইতে প্যায়ে ময়রে যাবেক। চল ক্যানে মালিকের পায়ে ধর্ব।
মালিক ত ভালো, যত গুন্দুল পাকাইয়চে ওই সালা হারানখুড়া, কিছু উঠতি বয়সের ছোকরাদের কে লিয়ে গুণ্ডা বানয়ছে। যদি মারধর করে তখন কি করবি?
তেমন হলে মুরাও মাইরব, সুদু কি মাইর খাবক ? সামনে দুগ্গাপুজা, ইখন কাজ বন্দ হ্যলে, ছ্যালাপুলার জইন্য লতুন জামা কাপড় কিনবক কি ক্যরে বল?
হ রে ভাই, মুইও তো তাই ভাবচি। দুগ্গাপূজায় সবার ঘরে কত্ত রকমের খাবার হয়, কত্ত আনন্দ করে, আর মুদের কাজ ট চল্যে গ্যালে কুন মুখে দাড়াইব পরিব্যারের কাছে বল।
বিয়ের বাজার, গয়না সব কিছু ঠিকঠাক মিলিয়ে নিল আর মাত্র কয়েকটা দিন পরই শ্রেয়া শ্বশুর বাড়িতে চলে যাবে। রেশন দোকানের জিনিষ গুলো কাল সকালে দিয়ে যাবে বুঝলে? মিলিয়ে নিও ফর্দ দেখে। প্যান্ডেল বাঁধা শুরু হবে ষষ্ঠীর দিন থেকে। শ্রেয়া নিজেকে প্রস্তুত করে নিল ডাক্তার গিন্নী হিসেবে। আকাশ ছোঁয়া শান্ত হাওয়া সব সময়ই তার সঙ্গেই থাকুক। পৃথিবীর যেই প্রান্তেই যাও না কেন আকাশ তোমার সঙ্গে থাকবে।
আইজ দ্বুদিন হল্য, তুর বাপ,ট বিছানা থেক্কি উঠতেই ল্যারচে , একবার কাত্যায়নি ধন্তরীকে ডাক্যে আন যা।
উয়াকে দিয়্যা কাজ হইবেক লাই মা, চল ক্যানে হাইসপাতাল্য্যে যাই , উখনে ভাইল্য ডাগতার বাবু আইচেন,
দুর খেপি, ক্যাত্তানি মা স্বয়ং ঈশ্বর । ইকটু পা ধ্যয়া জল প্যাটে পড়লেই…
ধন্তরী এসে নাক মুখ চোখ পেট ডানহাত বামহাত সব টিপাটিপি করে কাত্যায়নীমা বললেন “মনে হইচ্যে বিশাকে (ডাইনে) ডাঁওনে খ্যয়েচে, হা ভাল (দেখ )_ডান হাতের কনুই এর উপরে ক্যামন নীল চাগড়া দাগ। ই ডাঁওন বেশ শক্তপোক্ত, চিবায়ে খায়েছে। সাইরতে সাতদিন সময় লাগবেক, নাও সাইরতে পারেক।
ই মা, ইমন ক্যানে বলিস? পা জোইড়েক ছাড়বক লাই মা, ঠিক কইরে দ্যান, কুচু খায় লায় আজ দ্বুউদিন হল্যা। জ্বরে বেঁহুশ হইয়ে আচে,সাতদিনে তো মানুষটা মইরে জাবেক মা।
কিছু করার লাই রে বাতাসী, তুর মরদকে ডাঁওনে খায়েচে, জ্বর এখন ছাড়বেক লাই, ইবার ত বমি শুরু হবেক, তাইরপর খিঁচুনি হবেক।
উ মা, ডর দিখাস না মা, যা করার কর ক্যানে।
হা ভাল (দেখ) মায়ের পুজোর এই, বেইলপাতা ও জবাফুল’ট ব্যাইট্যে গোটা গায়ে মাখায়ে দ্যা। আর এই শিকড়ট ব্যাইট্যে খাউয়ে দ্যা নিয়ম করে প্রত্যদিন তিনবার কইরে খাওইয়াবি।
শুনছো শিল্পা একটা বিরাট দুঃসংবাদ _আজ ইনকলে রুগি দেখে ফেরার পথে বিরাট অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে সৌরভের, এখন আই সি ইউ তে আছে, বাহাত্তর ঘণ্টা না পেরোলে কিছু বলতে পারছেন না ডাক্তারবাবুরা। মেডিকেল টিম বসেছে।
সেকি বিয়ের সব জোগাড় হয়ে গেছে। কার্ড বিতরণ হয়ে গেছে।
আগে তো ছেলেটা সুস্থ হোক শিল্পা, বিয়ে নিয়ে এখন ভেবো না। ঠাকুরের কাছে প্রার্থণা করো যেন ছেলেটা সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে আসে।
নিশ্চয় কারোর নজর লেগেছে আমার শ্রেয়ার উপরে।
আমার শ্রেয়ার খুশিতে ডাইনে খেয়েছে গো বলে কাঁদতে শুরু করল মর্ডান শিল্পাদেবী।
আহঃ কি বলতে কি বলছ? এসব নজর টজর বলে কিচ্ছু হয় না শিল্পা। দুর্ঘটনা ইস দুর্ঘটনা।
রাতে জ্বরের ঘোরে বিশু ভুল বকতে শুরু করলো হু দ্যাখ খেন্দি ছাগলের বাচ্চাট ক্যামন ধোঁকায় পড়ে আচে, একটুকুনও দুদ পাচ্চে লাই, দে টুকুন বাইন্ধে ওয়ার মায়ের কাইছে।
হুই বাপ তুই ইমন ক্যানে করচিস
তুর কিচু হবেক লাই বাপ, আমি তুকে মৈরত্যে দিবক লাই।
পরদিন আলো ফোটার আগেই খেন্দী রিক্সা ডেকে জোর করে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গেল, মায়ের হাজারও বারণ সত্ত্বেও।
মা- ইসব ডাঁওন বইল্যে কুচু হয় লা, আমাদের ইশকুলে দিদিমনিরা বইলেচ্চ্যে। ইগুলান হল্যা কু-সইন্সকার। আমরা ইশকুলে পইড়চি, জ্ঞানগম্য হৈচ্যে তবু কি মালুশ হইত্যে লারব? আমরা মালুস হইব মা, আঁধাইরে থাইকব না গ
তুমি দেকো বাপ দুদিন পরেই হাইট্যে হাইট্যে ঘরে আসবেক, মাইঠে জাভেক কাজ কইরতে।
হাসপাতালের সিস্টার বলল বাতাসি কে আছেন?
হামি আচি দিদি, মোর মোরদট কেমন আইচে ?
পেশেন্ট ভালো আছেন, শুনুন_ উনি কোথাও হয়ত পড়ে গিয়েছিলেন, ডানহাতে ফ্র্যাকচার আছে। একটা ছোট্ট অপারেশন করতে হবে। ব্লাড জমে গেছে ভেতরে । অনেক দেরি করে এনেছেন, আর একদিন দেরি হলেই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। আপনারা এই কাগজে সই করে দিন।
ক্যানে দিদি সৈ ক্যানে?
অপারেশন করতে হলে এই সই করতে হবে।
দিদি মুর মরদ ট বাঁচবেক ত?
নার্স কোনো উত্তর না দিয়ে কাগজ নিয়ে চলে গেল।
হাসপাতালের পাশে দুর্গামন্দিরে সপ্তমীর বাজনা বেজে উঠল, মায়ের ‘নবপত্তিকা’ স্নান হচ্ছে। পুজোর অন্তরালে কতো কি চলে শুধু মা দুর্গাই জানেন।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment