![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
বিসর্জন
অভীক দাস
দর্মার দরজায় দুম্ দুম্ আওয়াজ! বাইরে থেকে একদল ছেলে চিৎকার করে উঠলো,"শিবু শিবু,উঠে পড়! রেডিও দাদু শুরু করে দেবে,চারটে বাজতে বাকি নেই!!", বছর ছয়ের শিবু মায়ের কোল ছেড়ে উঠে পড়ে,আধো আধো ঘুম চোখে বাইরে বেরিয়ে এল।কলোনির একদম শেষ প্রান্তে অশতিপর এক বৃদ্ধের বাস! কম করে হলেও কুড়ি বছর আগে কেনা একটা পুরনো জরাজীর্ণ,টেপ জড়ানো ভাঙা রেডিওতে তিনি দিবারাত্র গান শোনেন। বস্তির একমাত্র শিক্ষিত মানুষ যিনি এক সময় একটি অফিসে পিওনের কাজ করতেন। ঝুপড়ির বাচ্চাগুলোকে তিনিই মহালয়া আর চণ্ডীপাঠ সম্বন্ধে বলে বুঝিয়েছেন! দাদু ঠিক প্রতি বছরের মতন ভোর চারটের সময় গাছতলায় বেদীতে রেডিওটা রেখে কলকাতা 'ক' চ্যানেলে চণ্ডীপাঠের অনুষ্ঠান চালিয়ে দিলেন। সেই গুরুগম্ভীর কন্ঠে স্তোত্র পাঠ,কালজয়ী গানগুলো দাদু আর তাকে ঘিরে কচি কাচার দল মন দিয়ে শুনছিল! শেষের দিকে তিন চারটে বাচ্চা ঘুমিয়েও পড়েছিল। শিবু হঠাৎ করে মাঝখানে জিজ্ঞাসা করলো,"দাদু,ওই যে পুজোর মন্ত্রের মতন কি সব বলে গেল ওগুলোর মানে কি?" দাদু বললেন,"ওটা সংস্কৃত ভাষা,আরেকটু বড় হয়ে যা,সব বুঝিয়ে দেব,শুধু এটুকু জান আজ থেকে দেবীপক্ষ শুরু,মানে মা দুগ্গা আজ মর্ত্যে এলেন,আজ ঠাকুরের চক্ষুদান হবে,মানে দুটো চোখ রঙ তুলি দিয়ে মূর্তি বানানোর কাকুরা আঁকবে!! বুঝলি?" ফোকলা দাঁতে হেসে মাথা নাড়ে শিবু!
মহালয়ার অনুষ্ঠান শোনার পর বাড়ি ফিরে এসে শিবু দেখে তার বাবা এর মধ্যেই কাজে চলে গেছে,আবার সেই দুপুরে খেতে আসবে।মা রান্না বসিয়েছে! শিবুকে হাত মুখ ধুয়ে নিতে বলে, মা শিবুর জন্যে খাবার বেড়ে রেখে উনুন নিভিয়ে কাজে বেরিয়ে গেল। প্রায় সাত-আটটা বাড়িতে শিবুর মা ঘর মোছা,বাসন মাজা আর রান্নার কাজ করে। বাসি পাঁউরুটি আর গরম করা চায়ে চুমুক দিতে না দিতে শিবু শুনতে পেল দূরে কোথাও একটা হই হই হচ্ছে,তার সাথে ঢাক,কাঁসর আর ঘণ্টার আওয়াজ।তড়িঘড়ি কোনরকমে খেয়ে বেরিয়ে এক ছুট দিল শিবু! খালধারে ঝুপড়ির শেষ প্রান্তে একটা মোড়ের মাথায় বড় রাস্তা সংলগ্ন উল্টো পাড়ে একটি বনেদী পাড়া,সেখানে পল্লীর বড় মাঠে দুর্গা পূজার প্যান্ডেলে একটা বড় লরিতে প্লাস্টিকে মোড়া মায়ের মূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে! লরিটি ঘিরে পাড়ার ছেলে মেয়েরা ঢাকের তালে নাচ করছে, বাচ্চারা ইতস্ততঃ ছোটাছুটি করছে! শিবু মায়ের মূর্তি দেখার জন্য ছুটে এলেও কাছে যেতে পারলো না! পল্লীর মানুষগুলোর পোশাকের মাঝে শিবু যেন বড় বেমানান।! তার পরনের ছেঁড়া ময়লা গেঞ্জি,ছোট হয়ে যাওয়া প্যান্ট,রবারের ছাল উঠে যাওয়া চপ্পলের বাহ্যিক রূপ যেন কোন এক অদৃশ্য শক্তি দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলো! মাত্র ছয় বছর বয়সেই সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের কাঠামোর ভার তার মনের মাটিতে পুঁতে গেছে।
পঞ্চমীর সকাল থেকে শিবুর মনটা দ্বিগুণ খুশিতে ভরে গেছে! এক,তার বাবা সকালে বলেছে এবারে পুজোয় নতুন জামা প্যান্ট কিনে আনবে শিবুর জন্যে। গত দু-বছর মহামারির জন্যে কারখানার কাজটা হারায় শিবুর বাবা! তারপর এদিক ওদিক এটা সেটা করে শেষ ছয় মাস একটা গ্যারাজে অস্থায়ী ভাবে কাজ করছে। গত দুবছর পুজোয় শিবুর নতুন জামা কাপড় হয় নি! এবারে বাবা বলেছে আজ মাইনে পেলেই নতুন জামা প্যান্ট কিনে আনবে।মনে মনে ঠিক করে বাবার দেওয়া নতুন জমা প্যান্ট পড়েই সে ওই পল্লীর ঠাকুর দেখতে যাবে!এদিকে আরেকটা খুশির খবর হল বছর পাঁচেক পর শিবুর দিদি 'উমা' বাড়ি আসছে! শিবুর তখন দুই বছর বয়স তখন দিদির বিয়ে হয়ে যায় সেই সুদূর মুম্বাইতে! দিদিকে তার মনেই নেই, কেবলই দিদির ছবি দেখেছে,দিদির বর একটা সোনার দোকানে কাজ করে! দু বছর আগে দিদির একটা মেয়েও হয়েছে, ছোট্ট সোনাও আসছে আর সাথে জামাইবাবু। শিবু এখন মামা হয়েছে,তার যে কি আনন্দ,পুজোয় তার নতুন খেলার সাথী আসছে। শিবুর মা অপলক নয়নে উমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে,শিবু আড়াল থেকে দেখেছে তার মাকে উমা দিদির ছবির দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলতে! বিয়ের পর মেয়ে জামাইয়ের প্রথম শিবুদের বাড়ি আসা!!
ষষ্ঠীর সকালে শিবুর মনটা আবারও খারাপ হয়ে গেল।এবারেও তার নতুন জামা হলো না! শিবুর বাবার পুরো মাইনে হয় নি,তার ওপরে দিদি জামাইবাবু আর বাচ্চাটি আসছে,তাদের জন্য নতুন জামা কাপড় আর আগামী দিনগুলোর জন্য খাবার খরচা বাবদ খুব সামান্য টাকা নিজের কাছে রাখতে গিয়ে আর শিবুর জন্য আর কিছু বাঁচে নি! শিবুর মা তাকে বুঝিয়ে বলে,সে যেখানে কাজ করে সেই বাড়ি থেকে পাওয়া এক সেট পুরানো জামা প্যান্ট ভালো করে কেচে শুকিয়ে পরিয়ে দিয়ে ঠাকুর দেখতে যেতে বলে। মা বলে,"দিদি আর ছোট্ট সোনার জন্য এবারে থাক,সামনের বার আমি আর বাবা মিলে তোকে তিন তিনটে জামা প্যান্ট কিনে দেব!" স্যাঁতস্যাঁতে দর্মার শত ছিন্ন ঘরে মানুষ হওয়া শিবু ভালোই বোঝে তাদের অবস্থা! মা বললেও সে জানে তিনটে জামা প্যান্ট মা বাবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়,তবুও সে হাসিমুখে বেরিয়ে গেল পল্লীর মাঠের মণ্ডপের দিকে! রেডিও দাদু বলেছিল ষষ্ঠীতে নাকি মায়ের বোধন হয়।।
"এই দাঁড়া,যাচ্ছিস কোথায়?", শিবুর থেকে দেড় গুণ লম্বা জনা পাঁচেক ছেলে মেয়ে প্যান্ডেলের বাইরে তার পথ আটকালো! "এই তুই ওই খালধারে বস্তিটায় থাকিস না? এখানে কি চাই?" বলে কটমট করে তাকিয়ে একটা রাগী দিদি প্রায় শিবুকে যেন গিলে খেতে এল! পিছন থেকে একজন টিটকারি করে বলে উঠলো,"দেখ আবার হলুদ টি-শার্ট, কার্গো প্যান্ট পরে মাঞ্জা দিয়েছে!" কথাটা শুনে সকলে হেসে উঠলো! আরেকটি মেয়ে হঠাৎ সকলকে থামিয়ে বলে উঠলো,"এই দাঁড়া,এটা তো আমার ভাইয়ের জামা প্যান্ট! ছোটো হয়ে গেছে বলে মা,আমাদের বাড়ি বাসন মাজতে আসা ঝি কে দিয়ে দিয়েছিল। ও! তুই সেই বাসন মজা কাজের মাসির ছেলে?" বলে শিবুর গাল ধরে টেনে ধরলো "ইস! কি নোংরা,এতটুকু সাবান মাখিস না? কে আছিস ভাই স্যানিটাইজারটা এদিকে একটু নিয়ে আয়! এই ছোকরা ভাগ এখান থেকে,এখানে যেন আর না দেখি!" শিবুর মুখটা এবারে কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল! "একটিবার যেতে দাও, ঠাকুরটা দেখেই চলে যাবো,আর আসবো না!!" কথাটা শুনে রাগী দিদিটা প্রায় ধাক্কা দেয় শিবুকে,"এখন পালা,কাউন্সিলর আসবে,পরে আসবি,চল ফোট!!" কিছুক্ষনের মধ্যেই জায়গাটা লোকজনে ভরে উঠলো,সাদা জামা কাপড় পড়া লালবাতি লাগানো গাড়িতে আসা লোকটাকে শিবু চিনতে পারলো,মাস তিনেক আগেই ভোটের আগে শিবুকে কোলে নিয়ে তাদের ঘরের সামনে কত না আদর করেছিল! ভেজা চোখ নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে শিবু প্যান্ডেলের বাইরে থেকে নমস্কার করে ফিরে এল! মায়ের মুখ দেখার সাধ বোধনে তার হলো না পূরণ !! ...
সপ্তমী অষ্টমী নবমী তিনদিনে শিবুর পরিবারে যেন হুলুস্থুল বেঁধে গেল! উমাদের সপ্তমীতে যে ট্রেনে হাওড়া আসার কথা সেই ট্রেনে তারা আসেনি। জামাইয়ের সাথে ফোনে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না।শিবুর বাবা সারাদিন স্টেশনে অপেক্ষা করেছিল যদি অন্য কোন ট্রেনে তারা আসে! আবেগ আর উদ্বেগ নিয়ে অষ্টমীতেও শিবুর বাবা দীর্ঘ সময় স্টেশনে কাটিয়ে দেয়।বাড়িতে উমার মায়ের চোখের জল আর থামে না,কত সাধ করেছিল মেয়ে জামাইকে নিজের হাতে ভালো মন্দ রান্না করে খাওয়াবে,নাতনিকে কোলে নিয়ে আদর করবে,কিন্তু কোথায় কি? শিবু তার মাকে বারবার জিজ্ঞাসা করে,"মা! দিদিরা কখন আসবে?" শিবুর এই ছোট্ট জিজ্ঞাসা পুজোর ঢাকের আনন্দী শব্দ বিষাদের নিনাদ মিলেমিশে একাকার করে দিল! শিবুর বাবা অনেক চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা খুঁজে পেল না! হতাশায় দুশ্চিন্তায় নবমী সন্ধি পুজোর সময় উমার বাবার ডাক পড়লো হাওড়া রেল পুলিশের কাছ থেকে...
"পার্সেল ভ্যানের কামরায় দুটো সাদা চাদরে মোড়া বডি পাওয়া গেছে,সপ্তমীতে মুম্বাই থেকে আসা মেল ট্রেনে। মাল ভর্তি বেঞ্চের নীচে বডি দুটো ছিল তাই কেউ বুঝতে পারে নি,পরে বগি পরিষ্কার করতে গিয়ে ওদের পাওয়া যায়! বাচ্চার ফ্রকের পকেটে একটা আধার কার্ড ছিল! মনে হয় ইচ্ছে করেই কার্ডটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে,সেটা দেখে জানা যায় কার্ডটি ওই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটির,নাম উমা দাস! অনেক খুঁজে আপনাদের খোঁজ পাওয়া গেছে,পোস্টমর্টেম হয়ে গেছে,জলদি আইডেন্টিফাই করে সই সাবুদ করে বডি নিয়ে যাও,বাকি আমরা দেখছি,গন্ধ ছাড়ছে শুরু করেছে অলরেডি!" রেল পুলিশের অফিসারের কথাগুলো উমার বাবার বুকে সরাসরি তীরের মতন এসে বিঁধলো!! মর্গে গিয়ে সাদা কাপড় দুটো সরাতে দেখে মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা উমা আর তার মেয়ের নিথর দেহ! যে মেয়েকে কোলে পিঠে শত যন্ত্রণার মধ্যেও মানুষ করেছিল,সেই মেয়েরই নিথর দেহখানি চিনতে কোন অসুবিধাই হলো না। মায়ের মণ্ডপে সন্ধি পুজো শেষ হলো! ঘণ্টা তিনেক পরে থানা থেকে সাদা কাপড়ে মোড়া উমা সহ সাইকেল ভ্যানে তুলে রওনা হলো শিবুদের বাসার দিকে ...
পল্লীর মাঠে মণ্ডপ ঘিরে তুমুল হই চৈ,তার সাথে ডি জে বাজছে! পাড়ার মা কাকিমারা মাকে বরণ করছে! কিশোর থেকে যুবতী,পৌঢ় থেকে বৃদ্ধা সকলে আজ সিঁদুর খেলায় মত্ত! বাতাসে বিষাদের সুর আর লাল আভার মাঝে একটা সাইকেল ভ্যান এগিয়ে আসছে শিবুদের বস্তির দিকে।কান্নায় ভেঙে পড়ে শিবুর মা,বস্তির সকল মানুষজন ছুটে আসে উমাকে দেখতে! বাতের ব্যাথায় অকেজো পা দুটো নিয়েও রেডিও দাদুও কোনরকমে লাঠি হাতে এসে তার প্রিয় মা উমাকে শেষ দেখা দেখতে আসে! সেই ছোটবেলা থেকে উমাকেও কোলে বসে মহালয়ার দিন চণ্ডীপাঠ শোনাতো দাদু! আজ নিথর উমাদের চাক্ষুষে দাদুর মনে জীবনের শেষ লগ্নের চিত্রপটে যে কালো রঙের ছোপ পড়লো তা বিসর্জনের বিষাদকে হার মানায়! ছোট্ট শিবু জ্ঞানতঃ তার দিদিকে প্রথম চোখে দেখলো,মাথায় ব্যান্ডেজ,চোখ মুখ সাদা ফ্যাকাসে। পাশে শুয়ে থাকা ছোট্ট সোনাকে কোলে তুলে নিয়ে শেষবারের মতন প্রাণ ভরে আদর করে দিল,তার মিষ্টি মুখটি দেখে মনে হচ্ছে স্নেহের পরশ পেয়ে মায়ের কোলে ঘুমু করছে।ওদিকে "বলো দুর্গা মাইকি ... জয় ..." জয়ধ্বনি ভেসে আসছে পল্লীর মাঠ থেকে,মণ্ডপ থেকে ঠাকুর বেরিয়েছে বড় রাস্তায়! মায়ের বিসর্জন যাত্রার ঠিক পিছন পিছন উমার শেষ যাত্রা যেন পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো গঙ্গাপাড়ের উদ্যেশ্যে ...
শিবু হাঁটতে হাঁটতে অশ্রু নয়নে পিছনের সারিতে বাবার হাত ধরে হাঁটতে থাকে।অবশেষে দশমীতে সিঁদুর মাখা মায়ের মুখটা দেখার সৌভাগ্য হলো শিবুর! মনে মনে মাকে সে বলে,"তুই কি রাগ করেছিস মা? তোকে দেখতে যাই নি বলে?? তাই আমার দিদি আর ছোট্ট সোনাকে কেড়ে নিলি? কিন্তু,বিশ্বাস কর! আমি গেছিলাম তোকে দর্শন করতে,কিন্তু,ওই দাদা দিদিরা আমাকে ঢুকতে দেয় নি! তারপর ওদের ভয়ে আর ওদিকে আর যাই নি! আমি জানি,তুই রাগ করেছিস মা! ফিরিয়ে দে মা আমার দিদি আর ছোট্ট সোনাকে তুই ফিরিয়ে দে! "ছোটো শিবুর ওই কাতর প্রার্থনা ঢাক ঢোল আর ডিজের দানবিক স্পিকারের শব্দে মায়ের কান অবধি হয়তো পৌঁছালো না! পড়ন্ত বিকালে গঙ্গাপ্রান্তে উমারা এলো তাদের অন্তিম বিদায় লগ্নে! শ্মশানে আর বিসর্জনের লাইনে দুই মায়েরা যেন সমান্তরালে অপেক্ষমান! শিবুর বাবা উমার যত্ন-আত্তির জন্য রেখে দেওয়া টাকার থেকে দাহ সৎকারের জন্য কুপন কাটতে এগিয়ে গেল শ্মশানের কাউন্টারে!! ...
পুলিশের থেকে শিবুর বাবা খানিক আগেই ফোনে জানতে পারে পঞ্চমীর দিন সকালে উমার সাথে তার জামাইয়ের খুব অশান্তি হয়।মেয়ে হবার পর থেকেই উমার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ক্রমশঃ তার শশুরবাড়িতে বাড়তে থাকে! উমার শাশুড়ি তার ছেলেকে আরেকটা বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকে! শেষে পুজোর সময় অশান্তি চরমে ওঠে,রোজকার মতন মারধর চলতে থাকে পঞ্চমীর দিন সকাল থেকে,জামাই গালিগালাজ করে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় উমাকে,খাটের কোনে বেকায়দায় লেগে কপাল ফেটে রক্তাক্ত হয়,ছোট্ট মেয়েটাকেও রেহাই দেয় নি সে! আছাড় মারে বাচ্চাটাকে মেঝেতে মানুষরূপী অসুরটা! পরে হাসপাতালে টাকা খাইয়ে,লোক দিয়ে লাশ দুটো সরিয়ে নিয়ে চুপিসারে মেল ট্রেনের পার্সেল ভ্যানের কামরায় তুলে বেঞ্চের নীচে লুকিয়ে ফেলে। তারপর থেকেই জামাই আর তার পরিবার ফেরার! শিবুর বাবার সেই ক্ষমতা নেই যে কেস করে বা আইনি লড়াই করে সুদূর মুম্বাই থেকে পুলিশ প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে নর পিচাশটাকে ধরে আনবে বা তার শাস্তির ব্যবস্থা করবে,সবই ভাগ্যের পরিহাস বলে মায়ের হাতে ছেড়ে দিল দিন আনা দিন খাওয়া কন্যাহারা আজকের সমাজের অসংখ্য পিতার মতন এক অসহায় বাবা।জামাই যে দয়া করে মেয়ে আর নাতনিকে বাপের বাড়ি পাঠিয়েছে এই বা কম কিসের!?! ...
পল্লীর মণ্ডপের মায়ের মূর্তি গঙ্গাবক্ষের অন্তরে আস্তে আস্তে নিয়ে যাওয়া হলো,জনা দশেক লোক মায়ের মূর্তিখানি ধরাধরি করে ঘাটে হাঁটু জলে নেমে ধীরে ধীরে জলের মধ্যে আড়াআড়ি ভাবে মায়ের কাঠামোটা জলে ছেড়ে দিল! দেখতে দেখতে কাঠামো সহ মায়ের মুখ একটু একটু করে জলের অতলে বিলীন হতে থাকে! শিবু লক্ষ্য করলো শ্মশানের ওপরে লাগানো চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে।সে ভালোই জানে মা আবার সামনের বছর বাপের বাড়ি আসবে কিন্তু তার দিদি উমা আর কোনোদিনও ইহলোকে ফিরবে না! মনে মনে দুর্গা মাকে শিবু বলে, "সাবধানে যাস মা তোরা! আমার দিদি,ছোট্ট সোনাকে দেখিস,ওরা যেন ভালো থাকে!!"
"শারদ আকাশে শিউলী ফুলের মর্দিত আত্মসমর্পণ,
সমাজে সহস্র উমার বোধনের আগে হয় 'বিসর্জন'।'"

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment