![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
লক্ষ্মীছাড়ার এই জীবনে
সুদীপ দাশ
জীবনের এক অধ্যায় থেকে অধ্যায়ান্তরে যাওয়ার পথে কত চড়াই উতরাই, কত না ঘাত প্রতিঘাতের খেলা পরতে পরতে। এক একটি অধ্যায় পার করে মনে হল যেন অনেক করেছি, সামনে আবার নতুন নতুন পরীক্ষা এসে হাজির। ছোট বেলায় যখন ইস্কুলের এক মাস্টারমশাই বলতেন, 'এ জীবন পদ্ম পত্রে জল ', তখন তো কিছুই বোধগম্য ছিল না। পরে বুঝলাম টলটলে জলের ফোঁটা পদ্ম পাতা থেকে একবার গড়িয়ে পড়লে জীবনের আর কোন চিহ্নটি রইল না।
সীমাহীন পথপ্রান্তে যখন হোঁচট খেয়ে পড়েছি, আবার হাতড়ে উঠেছি, আবার এগিয়ে চলেছি, তখন শুধু একটি কথাই মনে হয়েছে যে এই পরীক্ষার কোন শেষ নেই। আমাকে পরীক্ষা দিয়ে যেতেই হবে মনে হয় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তাই কি? একটি জীবন শেষ করেও পরীক্ষা শেষ হয়ে যায় না।
জীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসেব বড়ই গোলমেলে, কিছুতেই হিসেব মেলে না। হয়তো কেউ চাইলেন বিরাট ক্ষমতাশালী হতে, হলেন শেষে কোনো দুঁদে নেতার তৃতীয় শ্রেণীর চেলা। হতে চাইলেন ডাক্তার হতে, শেষমেশ হলেন বেসরকারি অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। হতে চাইলেন অফিসের জেনেরাল ম্যানেজার, কিন্তু বিধির লিখনে কনিষ্ঠ এ জি এমেই কর্মজীবনের ইতি হল।
কত ঢাক ঢোল সহযোগে কত না দেবদেবীর আরাধনা করি আমরা,কত শুদ্ধ শুচি , উপোস আপোস --- কিন্তু দেবতা কিন্তু ঠিক করে রেখেছেন কার জন্য কি ধার্য করা আছে। তার বেশি জুটবে না।মায়েদের কাছে কতই না কাতর আবেদন করলাম এযাবৎ, --' ধনং দেহি, যশং দেহি মা।' শুনলেন কোথায়? শুধুই ধনের নির্গমনই হয়ে চলে অবিরাম। কই ? কোন দিন ভুলেও তো একটু উচ্ছিষ্ট অতিরিক্ত ধন এদিকপানে পাচার করেন না? শুধু কি তাই, মাঝে মাঝে বিপথে পড়ে কিছু কিছু খোয়াও যায়।
আমাদের বাড়িতে আগে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো হত বড়মা বড়পিসিমার যুগে। আমার মায়ের জীবনের শেষ পর্যন্তও চলেছে সেই পুজো। কিন্তু মা যে বছর চলে গেলেন,মানে ২০১৪ এ, ঠিক দুর্গা পুজোর আগে আগে, সেই বছরের পর আর ওই লক্ষ্মী পুজো চালিয়ে যাওয়া আমার আর সম্ভব হয়নি। মনে হয় মনের মধ্যে মা লক্ষ্মী আর ডেকে ওঠেনি। আমার মায়ের দিকের ওরা এ দেশীয়, তার ওপর প্রবাসী বাঙালি। তাই মামা বাড়িতে কালীপুজোর দিন অলক্ষ্মীকে বিদেয় দিয়ে দীপান্বিতায় মা লক্ষ্মীর আবাহনের রীতি।
এই সকল প্রকার আবাহনে আমি যে কেন মা লক্ষ্মীর প্রতি আকৃষ্ট হলাম না, তা সত্যিই এক আশ্চর্য হেঁয়ালি। অথচ সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনে ধনলাভের সাধ কারই বা না হয়, একটু যদি আরও স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যেত। কিন্তু ধনদেবী বরাবরের মতোই বিমুখ! তাই সবসময়ই মনে হয় আমি বুঝি এক লক্ষ্মীছাড়া। জীবনের হিসাব কিতাবে তাই ডেবিটের পাল্লা সবসময়ই ভারী।
কিন্তু জগন্নাথ দেব যেন চির ইস্পেশাল! ওর কাছে কোন রাখঢাক নেই। কি সুন্দর রথে তাঁর চলাচল। কখনো তাঁর স্নান যাত্রায় বেশি চান করে জ্বর আসে আমাদেরই মতো, যেন তোমার আমার মতন। কি দারুন পুতুল পুতুল গড়ন! কেমন তিনি আমাদের মতন মাসীর বাড়ি, পিসির বাড়ি বেড়াতে যান ফি বছর।এই দেবতাই রয়েছেন প্রাণের কাছাকাছি।এক বাংলা সিরিয়ালের নায়িকা তো জগুদাদা বলতে অজ্ঞান। জগুদাদাই হলেন মুশকিল আসান!
আমার মেয়ে যখন ছোট্টটি তখন একবার আগের বছরের রথকে সাফসুতরো করে তৈরি করা হল। বেশ রংচঙে মার্বেল কাগজে মোড়ানো হল রথকে। বেশ ঝকঝকে লাগছিল।পরের দিন রথের রশি ধরে টানা হবে, প্রস্তুতি তুঙ্গে।
আমি অফিসে চলে গেছি। এবার আগের বছরের জগন্নাথের মুর্তি দেখতে কেমন ম্যাড়ম্যাড়ে লাগাতে আমার অফিসে ম্যাডামের ফোন এল, --- 'অফিস থেকে ফেরার পথে নতুন জগন্নাথদেবের মুর্তি কিনে এনো, পুরোনো দিয়ে চলবে না।' সত্যিই তো! বাবা জগন্নাথকে কোন দিন আমরা সিরিয়াসলি নিই না।ওই পুরোনোকে সাফসুতরো করে চালাতে চেয়েছিলাম।
তড়িঘড়ি নতুন জগন্নাথের মুর্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।বাবা জগন্নাথকে আমরা কোনদিন সেভাবে ভয় বা ভীতি নিয়ে পুজো করেছি? এ যেন আমার ঘরের আপনজন। একটু নকুল দানাতেই সন্তুষ্ট।
সেই রাতে ঘুমের মধ্যে কেমন আলো আঁধারে স্বপ্নে দেখি যে, আমার নতুন আনা জগন্নাথ কেমন হাসি হাসি মুখে আমার দিকে চেয়ে রয়েছেন। একি! এরকম হয় নাকি? তিনি তো দেখি মিটিমিটি হাসছেন। হয়তোবা মনের ভুল, আমি ঠিক দেখছি তো?
বাবা জগন্নাথ সেই যে মুচকি হাসলেন, তা আজও অমলিন। সেই নতুন জগন্নাথের মুর্তি দিয়ে সেবছর খুব সুন্দর রথযাত্রা পালন হল মেয়ের।
কিন্তু আমার তো সেই লক্ষ্মীছাড়ার জীবন। বারবার ঘুরে ঘুরে আসে জগন্নাথের দশা। দশা না বলে দুর্দশাই বলা উচিত। সেবার পুরী বেড়াতে গিয়ে বাবাজী ঘুন্টিয়া নামের এক পান্ডার পাল্লায় পড়া গেল। সে তো আমার গিন্নী আর কন্যাকে বগলদাবা করে মন্দিরে গর্ভগৃহের পুজো দেবার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। আমার তো ওই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি বিশেষ পছন্দের নয়।তাই আমি মন্দিরে প্রবেশ করলাম না, বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। গিন্নী বারবার করে বললো ওদের সঙ্গে যেতে কিন্তু আমার মাঝে মাঝে কেমন রোখ চেপে যায়। তাই আমি মন্দিরের বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এই বিভিন্ন প্রজাতির মানুষের বিভিন্ন রকমের আচার আচরণ, এই দেখতেই ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেতে পারে। সেদিন ছিল শনিবার,কী ভীষণ ভিড় ছিল সেদিন। ওদের পুজো দিয়ে ফিরতে এক ঘন্টা লেগে গেল। বাবাজী ঘুন্টিয়ার কল্যাণে গিন্নীদের জগন্নাথের দর্শন দারুণ হয়েছিল নাকি।
এবার হল আর এক চিত্তির। আমার সেই রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিলনা। হঠাৎ আধো ঘুমে আধো জাগরণে দেখলাম সেই বাবা জগন্নাথ আবার কেমন অভিমান করে রয়েছেন, একটুও হাসছেন না। মনে হলো বুঝি গোঁসা হয়েছে।এর মধ্যে আমরা তো ভুবনেশ্বরে ফিরে এসেছি, তাই আর পুরীর মন্দিরে যাওয়া হল না। আমার তো মনে খুঁত খুঁত, কি যে করি?
নাহ্, বাবাকে স্তোক দেওয়া গেল। পরের বার ঠিক বাবার দর্শন করেই ফিরবো। কিন্তু সেই পরের বার যে কবে হবে কে জানে?
দিন যায় ,মাস যায়, বছর যায় -- আমার আর পুরীর মন্দিরে আসা হয় না। ভুলেও গেলাম যে একবার যাওয়ার কথা ছিল।
এদিকে হলো কি বরাবরের মতো সেই মা লক্ষ্মীর কোপ আবার আমার উপর ।এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে শেয়ারের বেচা কেনার চক্করে মা লক্ষ্মী রুষ্ট হলেন, আমার কিছু অর্থ গেল রসাতলে। সেই বন্ধু বোঝালো যে,এই সব শেয়ারের লাইনে এরকম কিছু রিস্ক তো নিতেই হয়। তবে সবুরে নিশ্চয়ই মেওয়া ফলবেই। কিন্তু আমার তো মন মানে না। আমি তো বুঝেছি যে এই লক্ষ্মীছাড়ার জীবনে মা লক্ষ্মীর তুষ্ট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কেন যে তিনি আমার এতো পরীক্ষা নেন কে জানে?
আমি তো আবার একটি প্রোগ্রাম করলাম ভুবনেশ্বরে যাওয়ার। হ্যাঁ,মেয়ের কলেজের একটি কাজ রয়েছে।কর্তা গিন্নী সময়মতো পৌঁছে গেলাম ভুবনেশ্বরে। এরপর কিছু দরকারি কাজকর্ম করে একদিনের জন্য পুরী ঘোরার ব্যবস্থা হল। আগের দিন একটু ব্যস্ত ছিলাম সারাদিন, তাই রাতে ঘুমাতে একটু দেরি হল। আধো ঘুমে আধো জাগরণে সেই অদ্বিতীয় স্বপ্নে আবার দেখা দিলো বাবা জগন্নাথ। কি সুন্দর হাসি হাসি মুখ করে রয়েছেন। হ্যাঁ, কাল সকালে ঠিক পুরী পৌঁছে যাব, ঠিক দেখো। কেন এমন হয়? আমার বাবা বলতেন --'তুমি যার কথা বারবার মনে ভাববে, সেই তোমার অবচেতন মনে এসে স্বপ্নে দেখা দেবে।তাই বোধ হয় হয়েছে। কিন্তু আমি তো কখনো বাবা জগন্নাথকে তেমন সিরিয়াসলি নিইনি!
পরদিন সকালে তাড়াতাড়ি একটি গাড়িতে করে পুরীর দিকে রওনা দিলাম। সেদিন ছিল শনিবার, সপ্তাহান্তের বিরাট ভিড় পুরীতে। সারা দক্ষিণ ভারত যেন ভেঙে পড়েছে এই ধর্মস্থানে। দক্ষিণীদের সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। এবার পুরীর কি যেন বিশাল রিনোভেশন চলছে, চারিদিকে শুধুই ভাঙচুর! অনেক দূর থেকে জুতো জমা রেখে বিরাট লাইনে দমবন্ধকর পরিস্থিতি । আমার এই ভীড় দেখে তো জগন্নাথ দর্শন মাথায় উঠলো। গিন্নীকে প্রস্তাব দিলাম যে---- 'এবারের মতন ক্ষ্যামা দাও, আবার কোনদিন আসা যাবে। এবার চল শুধু মন্দির প্রদক্ষিণ করে ফিরে যাই। এই ভিড়ে মনে হয় পদপিষ্ট হয়ে মরতে হবে।'
গিন্নী একটু দ্বিধায় ছিলো , আমি বললাম,-- 'আমার পক্ষে এই ভিড়ে দমবন্ধ হওয়া সম্ভব নয়। রক্ষা কর, বাবা জগন্নাথ! সামনের বার দেখা হবে কেমন?'
এইবারও পুরীতে বাবা জগন্নাথের সেইভাবে দর্শন হল না।আমরা আশেপাশের অন্যান্য মন্দিরগুলো দেখে জগন্নাথ মন্দিরে প্রদক্ষিণ করে বাবা জগন্নাথদেবকে আমার পাপ স্খলন করার প্রার্থনা করে মন্দির ত্যাগ করলাম এ যাত্রায়। কিন্তু মনের খুঁত খুঁত কি যায়? কেমন যেন মন খারাপ হয়ে গেল। আমার কপালে কি জগন্নাথ দেবের দর্শন হবে না?
কলকাতায় ফিরে পাঁচ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। দেখতে দেখতে বছর ঘুরে গেল। এবার বর্ষা যখন যাই যাই করছে তখনই একটা সুযোগ এল রাঁচি বেড়িয়ে আসার। শতাব্দী এক্সপ্রেসে চেপে এক দুপুরে পৌঁছে গেলাম ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচি।
রাঁচিতে গিয়ে বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থানগুলো হল জোনা,সীতা,দশম এবং হুন্ড্রু জলপ্রপাত--- বর্ষার পর যাদের রূপ খোলে। সেই সব সাইড সিইং এর প্রোগ্রাম করা চলছিলো। সীতা আর হুন্ড্রু ফলস্ দেখাও হয়ে গেল সেদিন, পরেরদিন দশম ফলস্ দেখা যাবে।
সেই রাতে ঘুম এসে গেলো তাড়াতাড়ি, সারাদিন যা ধকল গেছে।রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আবার সেই স্বপ্ন! আধো তন্দ্রায় দেখতে পেলাম সেই জগন্নাথ দেব আবার কেমন যেন উঁকি মারছেন দরজার ফাঁক দিয়ে। এ- একি! এখানেও বাবা জগন্নাথ আমাকে ছাড়বেন না! আমি লাফিয়ে উঠলাম, কই কোথাও তো কেউ নেই? গিন্নীকে ঠেলে তুললাম ওই মাঝ রাত্তিরে। ও চমকে উঠে বললো, ---'কি? কি ব্যাপার?
শোনো, আবার বাবা জগন্নাথ উঁকি দিয়েছেন। আমাদের রাঁচিতে আসাটা বোধহয় ঠিক হয় নি। পুরীই যাওয়াই ঠিক হতো।
-- ঠিক আছে,এই কথা। তা আবার মাসদুয়েকের মধ্যে একটা উইকএন্ডে যাওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা তো অন্য জায়গায়?
-- কোথায়?
--- তুমি তো সেই ভিড় দেখে আবার ফিরে আসবে। এযুগের ভারতবর্ষের সব ধর্মস্থানেই এটাই চিত্তির! সব ধর্মস্থান থিক থিক করছে ভক্তদের ভিড়ে বুঝেছ? সেই ব্যাপারে কিছু ভেবেছ? তোমার জগন্নাথদেবের দর্শন পাওয়া মুশকিল!'
হ্যাঁ বুঝেছি। আর একবার ট্রাই করতে তো হবেই, এতবার উনি খবর দিচ্ছেন।'
পরদিন সকালে প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম শহর থেকে কিছুটা দূরে দশম ফলস্ দেখতে। বর্ষার জলে পুষ্ট হয়ে জলপ্রপাত গুলোর খুব রূপ খুলেছে।
আমাদের গাড়ির ড্রাইভার রাতুতে নিয়ে গেল রাঁচির রাজবাড়ি আর স্টেডিয়াম দেখাতে। হঠাৎ দূর থেকে একটা টিলার উপর একটি সুন্দর মন্দির দেখা গেল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, --- ওটা কোন মন্দির?
--- কেন? জানেন না? ওটা তো জগন্নাথ দেবের মন্দির।
অ্যাঁ, বলেন কি?
---- তাহলে তো আমি যাব।
বুঝলাম জগন্নাথদেব আমাদের জন্য এই রাঁচিতেই ঠিক ব্যবস্থা করে রেখেছেন দর্শনের।
খুব সুন্দর জগন্নাথ দর্শন হল ধীরে সুস্থে আর শান্তিতে। কোনো ভিড় নেই। লাড্ডু প্রসাদও মিলল।
মা লক্ষ্মীর দুয়ারে বারবার ঠোক্কর খেতে খেতে আমি সার বুঝেছি যে জগন্নাথদেব অত সহজে বিরূপ হন না।অপার ধৈর্য ওঁর, আমার মতো অর্বাচীনকেও কতো সুযোগ দিলেন।

.png)

No comments:
Post a Comment