![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
দারোগা বাড়ির নেমন্তন্ন
কৌশিক সেনগুপ্ত
সকাল থেকেই ভিয়েনের গন্ধে সারা পাড়া মশগুল হয়ে আছে। রাধেশ্যাম বাবু ছিলেন পুলিশের মস্ত অফিসার, সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন। তাঁরই বড় ছেলের বিয়ে গেল পরশু, আজ বৌভাত।
মনটা বেজায় খুশি খুশি ছিল। নেমন্তন্ন আমিও পেয়েছি। রাধেশ্যাম বাবুর ছোট ছেলে ঋজু আমার ক্লাশ মেট ছিল। নেমন্তন্নটা ঋজুর তরফ থেকেই।
নবকান্তকে সে কথা বলতেই দাঁত মুখ খিঁচিয়ে সে যেন মারতে এল আমাকে। বেচারা নেমন্তন্ন পায়নি। মন তো খারাপ হবেই। ঋজু তো ওরও বন্ধু। আসলে নবকান্তর চেহারাটা অনেকটা নেই মানুষদের মত। কোন বিশেষত্ব নেই। ওর আত্মীয়েরাই মাঝে মাঝে ওকে ভুলে যায়। স্কুলে পড়তে ফুটবল টীমে কে কে থাকবে তার লিষ্ট বানাতে বসে নবকান্তর কথা ভুলে যেতেন গেম টীচার। অথচ নবকান্ত খেলত ভালোই।
পুরনো বন্ধুরা একজায়গায় জড়ো হলেই পুরনো দিনের কথা আলোচনা হয়, সেখানে নবকান্তর কথা কেউ তোলে না। আমি দু-একবার তুলেছিলাম, কারণ নবকান্ত থাকে আমার মামার বাড়ির পাড়াতে। বাকিরা কেউ মনেই করতে পারল না যে নবকান্ত বলে কেউ আমাদের সাথে পড়ত।
এহেন নবকান্তকে ঋজু ভুলে যাবে তাতে আর সন্দেহ কি! আমাকে দাবড়ি দিয়ে খানিক কান চুলকে নবকান্ত বলল, যাকগে যাক, ভারি তো নেমন্তন্ন! তা কি খাওয়াচ্ছে শুনি?
আমি উৎসাহের সাথে বর্ণনা দিতে বসলাম। প্রধান মেনু জাফরানি পোলাও আর রেওয়াজি খাসির মাংস। সকালে গিয়ে দেখে এসেছি, ক্যাটারারের লোকেরা মাংসের বড় বড় পিসগুলো ডিম গোলার মধ্যে চুবিয়ে ম্যারিনেট করে রাখছে। এছাড়া বাগদা চিংড়ির মালাইকারি হবে। কাঠি ঢুকিয়ে চিংড়িগুলোকে সোজা রাখা হবে। দই কাতলা। মিষ্টির তো এলাহি আয়োজন। বাগবাজার থেকে ময়রা আনিয়ে ইয়া বড় বড় রসগোল্লা বানানো হচ্ছে, রামপুরহাটের ময়রা বানাচ্ছে বিখ্যাত রসমালাই। জনাই থেকে অর্ডার দেওয়া মনোহরা কালই এসে গিয়েছে। বলতে বলতে আমার জিভ দিয়ে টস টস করে জল ঝরতে লাগল।
নবকান্ত বিশেষ মুখভঙ্গী করে বলল, দ্যাখ, তোর কপালে আজ আর খ্যাঁটন জোটে কিনা!
মানে? জুটবে না কেন? আমি তেড়িয়া হয়ে প্রশ্ন করলাম।
নবকান্ত নির্বিকার মুখে বলল, পুলিশের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিস আগে কোনদিন? যাসনি তো? এই শর্মা গিয়েছিল। চোখের জলে নাকের জলে হয়ে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল।
আমি হাসি চেপে বললাম, তোর দুঃখ বুঝি রে নব। তা আমি তো আর একা যাচ্ছি না। প্রচুর লোককে নেমন্তন্ন করেছেন রাধেশ্যামবাবু। আমাদের ছেলেবেলার অনেক বন্ধুও আসছে। তাদের কারো কপালে আজ খাওয়া নেই বলছিস?
আমি কিছুই বলছি না। আমার সাথে যা হয়েছিল, শুনতে চাস তো বলতে পারি।
সোজা হয়ে বসে বললাম, নিশ্চই শুনব। বল তুই।
নবকান্ত গুছিয়ে বসে বলতে শুরু করল, মাধ্যমিক পরীক্ষার পর টানা ছুটিতে গিয়েছি মালদায় মামার বাড়িতে। গরমকাল। গিয়ে দেখি গাছ ভর্তি আম ফলে আছে। তখনও পাকেনি অবিশ্যি। তাতে কি? বিটনুনের পুটুলি নিয়ে দিনরাত গাছে উঠেই বসে থাকি। চার বেলা দিদিমার হাতে ভালোমন্দ খাচ্ছি, দিন কাটছে মন্দ নয়।
একদিন মামাদের প্রতিবেশী নকুড়বাবু বাড়িশুদ্ধ সবাইকে নেমন্তন্ন করতে এলেন। জানালেন, গিন্নী বাপের বাড়ি গিয়েছেন কিছুদিনের জন্য। বাড়িতে শুধু নকুড়বাবু আর তাঁর তিনছেলে রয়েছে। ছেলেরা বায়না করেছে আজ মাটন দো পেঁয়াজা খাবে। কলেজ লাইফ থেকে নকুড়বাবুর রকমারি রান্না করার খুব সখ। বই দেখে অনেক রান্না শিখে ফেলেছেন। তা ভাবলেন মাটন দো পেঁয়াজা রাঁধবেনই যখন, প্রতিবেশী দু চারজনকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ানো যাক।
নকুড়বাবু পুলিশের মস্ত দারোগা। নাকের নিচে চওড়া গোঁফজোড়া ঠোটদুটোকে আগাগোড়া এমন ঢেকে রেখে দিয়েছে, যে তিনি হাসছেন না দাঁত খিচোচ্ছেন বোঝবার যো নেই। উর্দি পরে বাইক ভটভটিয়ে যখন ডিউটিতে যান, দেখে মনে হয়, হ্যাঁ, দোর্দণ্ডপ্রতাপ একজন দারোগা যাচ্ছেন বটে। উনি যে রান্নায় পটু, সেকথা জানতাম না।
নকুড়বাবুর কথায় দাদু বললেন, এমন দিনে নেমন্তন্ন করলে নকুড়, বলতেও খুব খারাপ লাগছে, আমরা একটু পরেই বেরিয়ে যাচ্ছি। বাড়িশুদ্ধ সবাই।
দাদুর কথা শুনে আমি তো হাঁ। বাজার থেকে আজ জোড়া ইলিশ মাছ এসেছে দেখেছি। সকালে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দাদু নিজের মুখে দিদিমাকে বলেছেন ইলিশের দুরকম পদ হবে। সর্ষে ভাপা আর বেগুন দিয়ে ঝোল। এঁরা যে কোথাও বেরোবেন, সে কথা তো শুনিনি।
নকুড়বাবু কাঁচুমাচু মুখে বললেন, কি এমন দরকার পড়ল কাকা?
দাদু বললেন আর বোল না। আমার শ্যালক হরিদাস জল ভর্তি বালতি হাতে ছাদে উঠছিল ফুলগাছে জল দেবে বলে। সিঁড়িতে পা হড়কে…
আহা হা হা কি কান্ড! বলি ঈশ্বরের কৃপায় টিঁকে আছেন তো?
তা আছে। তবে এখনি হাসপাতালে ছুটতে হবে আমাদের।
নেমন্তন্ন হাতছাড়া হয়ে যায় দেখে আমি বলে উঠলাম, তাহলে আমি বাড়ি থাকি দাদু? সবাই চলে গেলে বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাবে সেটা কি ঠিক?
দাদু কট্মট করে আমার দিকে তাকালেন। নকুড়বাবু একগাল হেসে বললেন এই তো, একজনকে তবু পেলাম। একে তো আগে দেখিনি! আপনাদের আত্মীয় বুঝি?
দাদু বললেন, সে কি নকুড়! ও যে আমার নাতি! মাস তিনেক আগেই তো নব এসেছিল বাপ মায়ের সাথে। তুমি দেখেছিলে ওকে। পুলিশের চোখ তো একবার যাকে দ্যাখে, তাকে ভোলে না!
নকুড়বাবু মাথা চুলকে বললেন, দেখেছি! কি আশ্চর্য! তা ভুলে যাবার মতই চেহারা। এই বলে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি হেসে বললেন যাক গে, তুমি তাহলে অবশ্য যেও কিন্তু। এই বলে আমার ঘাড় চাপড়ে নকুড়বাবু বিদায় নিলেন।
দাদু বললেন, হতভাগা করলি কি?
ছোটমামা বললেন, যেমন কর্ম তেমনি ফল। আজ আমরা সবাই রেস্তোরাঁয় জমিয়ে খাবার খাবো। যাস তুই নকুড় দারোগার বাড়ি মাটন দো পেঁয়াজা খেতে।
আমি বললাম, তোমরা এমন করছ কেন? ভদ্রলোক কত করে বললেন। তবে কি ওঁর হাতের রান্না খুব খারাপ?
ছোটমাসী বললেন, মোটেই না। নকুড়কাকার হাতের রান্না যে কোন প্রথম শ্রেণির হোটেলের বাবুর্চির রান্না কে হার মানাবে। একটু পরেই গোটা পাড়া ম ম করবে রান্নার সুঘ্রাণে। টের পাবি।
তাহলে?
কেউই কিছু ভেঙে বলল না আমাকে।
আধঘন্টার মধ্যে সকলে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেল। যাবার আগে দিদিমা দুঃখ দুঃখ মুখ করে বললেন, রান্নাঘরে বাটি চাপা ইলিশ মাছ ভাজা রেখে গেলুম দাদুভাই। যতগুলো পারিস খেয়ে নিস। হাঁড়িতে ভাত আছে, নেমন্তন্ন বাড়িতে খেয়ে পেট না ভরলে ওই ভাত ঘি মাখিয়ে খাস। আমি ওবেলা এসে যা রাঁধার রাঁধবো।
মনে মনে ভাবলাম বয়ে গেছে আমার ঘি মাখা ভাত খেতে। আমি যাব নেমন্তন্ন বাড়ি আর আধপেটা খেয়ে ফিরবো? সে শর্মা আমি নই। বরং আমাকে নেমন্তন্ন করেছেন বলে রীতিমতো পস্তাবেন নকুড় দারোগা। খেতে যাবার ঢের দেরী। ততক্ষণ গোটা কতক ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়া যেতে পারে। তখনও কি আর ছাই বুঝেছি সেদিন কি হতে চলেছে!
আমি অধৈর্য হয়ে বললাম, কি হয়েছিল রে? দরজা জানলা বন্ধ করে তোকে খুব পিটিয়েছিল দারোগা?
নবকান্ত দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, কেন রে হতভাগা, খামোকা পেটাতে যাবেন কেন? আমি চোর না ডাকাত? নেমন্তন্ন করে কেউ পেটায়?
এই বলে গুম হয়ে থেকে তারপর বলল, বেলা বারোটা অবধি গোটা পাঁচেক ইলিশ মাছ ভাজা খেয়ে তখন খিদেটা বেশ জমে উঠেছে। নাকে আসছে মন পাগল করা মাংস রান্নার গন্ধ। বুঝতেই পারছি এ আর কিছু না, নকুড় দারোগা জমিয়ে মাটন দো পেঁয়াজা রাঁধছেন। নামী রেস্তোরাঁর পাশ দিয়ে গেলে ওইরকম গন্ধ নাকে আসে। তখন মনে হয় জয় মা বলে ঢুকে পড়ি রেস্তোরাঁয়। বেলা একটার একটু আগে গেলাম নকুড়বাবুর বাড়ি। গিয়ে দেখি গেটের সামনে একটাও জুতো নেই। তার মানে কেউ তখনও এসেই পৌছয়নি। মনটা দমে গেল। ভাবলাম আমিই কি তাড়াতাড়ি চলে এলাম? ছি ছি উনি হয়ত আমাকে হ্যাংলা ভাববেন।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব ভাবছি, এমন সময় বাড়িত ভেতর থেকে নকুড়বাবুর উচ্ছাস ভরা গলা ভেসে এল। এই যে বাবা নব, এসো এসো লজ্জা কি?
দরজা খুলে মধুর সুরে আপ্যায়ন করলেন নকুড়বাবু। আমিও ভেতরে ঢুকলাম। নকুড়বাবুর পরণে লুঙ্গি আর কাঁধে গামছা। হাতে মশলার দাগ। একগাল হেসে বললেন, এই মাত্র রান্না কমপ্লিট হল। তুমি ভেতরে বসো। ভাইদের সঙ্গে গল্প করো। আমি টুক করে স্নানটা সেরে আসছি।
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আর কেউ আসেনি স্যর?
নকুড়বাবু বিরস বদনে বললেন, বেছে বেছে আজই পাড়াশুদ্ধ লোকের কাজ পড়ে গেল। কারো দূর সম্পর্কের ভায়েরার হাত ভেঙেছে, কারো খুড় শ্বশুর খাবি খাচ্ছেন। তা যাই হোক, তুমি তো এসেছ। গল্প করো, আমি এই এলাম বলে।
মনের মধ্যে বেজায় একটা সন্দেহ হতে লাগল। তবু তখন আর কি করার আছে! ঘরে ঢুকে দেখি তিনটে ছেলে বসে আছে। দুজন আবার যমজ। বয়স তেরো চোদ্দ হবে। আর একজন তাদের চাইতে একটু ছোট। এরাই নকুড়বাবু তিনছেলে। আলাপ জমানোর উদ্দেশ্যে ছোটটার দিকে তাকিয়ে আমি হেসে বললাম, নাম কি তোমার?
আমার কথার জবাব না দিয়ে সে এগিয়ে এসে আমার কানের জরুলে আঙুল রেখে বলল, ইয়ে আসলি হ্যায় কেয়া?
আমি তাজ্জব হয়ে ভাবলাম জরুল আবার আসল হবে না তো কি নকল হবে?
উত্তর না পেয়ে সে আবার বলল, কেয়া? নেহি সমঝা?
যমজ দুজনের একজন বলল, ও হিন্দি মিডিয়ামে পড়ে। বাড়িতেও সব কথা হিন্দিতেই বলে।
আমি কাষ্ঠ হাসি হেসে বললাম, তাই বুঝি? এই বলে ছোটটার দিকে তাকিয়ে বললাম ইয়ে ভগবান কা দান হ্যায়।
ভাবলাম আমার হিন্দি শুনে সে হয়ত সন্তুষ্ট হবে। ও বাবা, সে বলল, নেহী নেহী। এ নকলি হ্যায়। দেখু ক্যায়া? এই বলে কথা নেই বার্তা নেই, সাঁই করে একটা থাপ্পড় হাকড়ালো আমার কান লক্ষ করে। ভাগ্যিস সতর্ক ছিলাম, সময়মতো মাথা সরিয়ে বাঁচলাম। থাপ্পড়টা ফসকাতে জ্বলজ্বলে চোখে ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল। বড় দুটো হি হি করে হেসে উঠল। ওর মতলব ভালো নয় বুঝে বাপরে বলে আমি ততক্ষনে উঠে পড়েছি চেয়ার ছেড়ে। কি সাংঘাতিক বিচ্ছু ছেলে! ওদের মন ঘোরাবার জন্য বললাম তোমরা গল্প শুনতে ভালোবাসো?
যমজ দুটোর একজন বলল, কি গল্প? ডাকুর গল্প?
না না, ওসব ভালো নয়। আজ তোমাদের বেজায় হাসির একটা গল্প শোনাবো। এই বলে শুরু করলাম একটা হাসির গল্প। তবে একটানা গল্প বলা যাচ্ছিল না। আমি এক লাইন করে বলছি, আর যমজ দুজনের একজন সেই লাইন আবার হিন্দিতে তর্জমা করে ছোট ভাইকে বোঝাচ্ছে। ভীষণ বিরক্ত লাগছিল। ওভাবে গল্প জমে? তবুও ওরা তাতেই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। খানিক পরেই নকুড়বাবু এসে হাজির। পায়জামা পাঞ্জাবি পরে চুল পরিপাটি করে আঁচড়ে এসেছেন। হাসিমুখে বললেন, বাহ, এসেই দিব্যি জমিয়ে দিয়েছ দেখছি। চলো খেয়ে নেওয়া যাক।
যমজ দুজনের একজন বলল, খেয়ে এসে বাকিটা শুনবো কিন্তু।
ডাইনিং হলে ঢুকলাম। লম্বাটে টেবিলের একপ্রান্তে বসলেন নকুড়বাবু। ওঁর ছেলেরা টেবিলের দুদিকে সারি দিয়ে বসল। আমি বসলাম নকুড়বাবুর মুখোমুখি টেবিলের উল্টোদিকে। শিরিঙ্গে চেহারার একজন লোক পরিবেশন করতে এল। সকলের প্লেটে গরম ভাত পরিবেশন করার পর মাংসের বাটি হাতে সে ঢুকতেই প্রাণকাড়া গন্ধে নাক জুড়িয়ে গেল। খিদেটাও জানান দিল ভয়ানক। প্লেটের ভাত ভেঙে রেডি হয়ে বসলাম। মেনু স্রেফ ভাত আর মাংস।
যমজ দুজনের একজন বলল, শিলুদা মাংস দাও। জলদী।
শিলুদা নামক লোকটা তাড়াতাড়ি হাতা ভরা মাংস ঢেলে দিল তার পাতে। অমনি আর একজন যমজ বলে উঠল, আরে আজ তো আমার থেকে শুরু করার কথা। শিলুদার কিচ্ছু মনে থাকে না।
হ্যাঁ এই যে তোমাকেও দি। দ্বিতীয়জনকে দিতে না দিতেই ছোটটা নাকে কেঁদে বলল, মুঝে দো, মুঝে দো।
শিলুদা হাত বাড়িয়ে তার পাতে মাংসের হাতা উপুড় করল। নকুড়বাবু গলা খাঁকারি দিলেন। শিলুদা থরথর করে কেঁপে উঠে তাড়াতাড়ি তিন-চার হাতা মাংস ঢেলে দিল নকুড়বাবুর পাতে। আমি তো হাঁ। কি ভয়ানক স্পীডে মুখ চলছে চারজনের! নকুড়বাবুর পাতে মাংস দিতে দিতে ততক্ষণে প্রথমজনের পাত খালি হয়ে গিয়েছিল। চীৎকার করে সে বলে উঠল, শিলুদা ভাত আর মাংস!
এই যে দি।
শিলুদা আমাকে মাংস দাও। নলি দেখে দাও।
এই নাও।
মুঝে আউর দো, মুঝে আউর দো।
নাও, খাও ছোট সাহেব।
ঝাড়া দশ মিনিট শুধু এই চলল। একজনকে দিতে না দিতেই আর একজনের পাত ফর্সা হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশন করতে করতে চোখে নিশ্চয়ই সরষেফুল দেখছিল শিলুদা। আমি সেই থেকে শুকনো ভাত সামনে নিয়ে বসেই আছি, কারো সেদিকে খেয়াল নেই। দেখতে দেখতে মাংসের বাটি খালি হয়ে এল। শেষে কাইগুলো হাতা দিয়ে কাচাতে কাচাতে ছোটটার পাতে দিয়ে দিল শিলুদা।
পরিতৃপ্তির একটা ঢেঁকুর তুলে নকুড়বাবু এতক্ষণে আমার পাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, একি! তুমি তো দেখছি শুরুই করোনি। শিলু, ওকে মাংস দিলি না?
শিলুদা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, ওনাকে তো আমি দেখিই নি। তাছাড়া আর মাংস নেই বাবু।
নেই মানে? অত মাংস সব শেষ?
শিলুদা মিনমিন করে কি বলল বোঝা গেল না। নকুড়বাবু চোখদুটো লাল টকটকে হয়ে এল। চওড়া গোঁফজোড়া ঝগড়াটে হুলো বেড়ালের ল্যাজের রোঁয়ার মত সোজা হয়ে তিরতির করে কাঁপতে লাগল। চোখ দুটো বনবন করে ঘুরতে শুরু করল। নিমেষে শান্ত বিনয়ী মানুষটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল জাঁদরেল এক পুলিশের মুখ। তাই দেখে আমার বুকের ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম খাবো না। আমার শরীর টা কেমন করছে। আমি বাড়ি যাব।
তিনভাই চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমার হাত ধরে টানাটানি করতে করতে বলল, বাড়ি যাবে কিরকম? আমাদের বাকি গল্পটা কে বলবে?
কোনমতে ওদের হাত ছাড়িয়ে এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলাম। দিদিমা যে ভাত রেঁধে রেখে গিয়েছিলেন, রান্নাঘরে বসে গাওয়া ঘি মাখিয়ে গোটা চারেক ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে গোগ্রাসে তাই গিললাম। সঙ্গে গোটাকতক কাঁচা লংকা চটকে নিয়েছিলাম। দরদর করে চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। সে জল দুঃখের না কাঁচা লংকার ঝালের বলতে পারি না। সেদিন সেই ভাজা মাছ ভাত কি অমৃতই যে লেগেছিল, তোকে বলে বোঝাতে পারব না।
বিকেলে সবাই বাড়ি ফিরে এল। আমার মুখে সব শুনে মামা মাসীদের সে কি হাসি। দাদু বললেন, ওই ভয়েতেই আমরা সটকেছিলাম। তবে তোর কপালে একেবারে কিছুই জুটবে না এতটাও ভাবিনি। ঠিক হয়েছে, ওরকম নেই মানুষ হয়ে থাকলে আর কি হবে! তবে চিন্তা করিস না নব। তোর ভাগের মাংস তুই ঠিক পাবি। আসলে খেতে বসলে ওদের কারো মাথার ঠিক থাকে না। নইলে নকুড় দারোগা লোক খারাপ নয়।
বললে বিশ্বাস করবি না, সন্ধ্যে আটটার সময় শিলুদা এল। সঙ্গে নিয়ে এসেছে প্রকান্ড জামবাটি ভর্তি রান্না করা মাংস। কি খোলতাই রূপ তার! তেমনি খুসবু। বলল, সকালের ঘটনায় বাবু খুব লজ্জা পেয়েছেন। এবেলা আবার বাজার থেকে মাংস কিনে রেঁধে পাঠালেন। বলে পাঠালেন নবদাদাবাবু যেন সবটা খেয়ে নেন।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment