![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
হাক্সটার
সুকমল ঘোষ
-হুজুর, একটা নিবেদন ছিল।
-হাঁ, বুলো; আগে তুমার নামট বুলো ! এ্যাই হাবলা, উয়ার নামট লিখে লে। কুথ থেকে আসেছে, সিটোও লিখবি।
-আজ্ঞে,আমি সেরিবা আর উ সেরিবান বটে। বুধা যুগ থিকে এয়েছি। বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি….। স্টিং কিং স্টোফু; এট্টু লিবেন নাকি! দম্যে খেতে।
-এ্যাই দফাদার,উকে একটা পিচম্যানের ছাপ্পা লাগায় আউট করে দে। আর কতগুলান রইছে ! হাবলা বললে –
-হুজুর, লাইন রইছে। সব ত্যাড়া বাঁকা নাম বুলছে। এক একজনে এক একটা সাল বুলছে। কুথা থিকে এইছে; কিছু বুঝা যেছে নাই। কুনো কথা বুঝা যেছে নাই। খটমট নাম বটে।
-অ, তাল্যে সাজেগুজেই আসেছে। বেশ করিছে; তা, তুমি টুকুস করি তুমার ফোনটা বাইরে গি লাগাও; কেহ যেন দেখতি না পায়। অধিকারী বাবুকে একটা মিস কল দে দাও। আর সবকটা গেটের ধারে দুইটা করে বুলডোজার লাগাতে বইলে দেবা বুঝলা। আর দু’তিনটা দল ঠিক করগা; কেত্তনের দল। নাচানাচি করতি বলবা উদের; রাম রাম করতি বুলবা, দেখবা বেশি যেন না করে, ত্যাখুন মরা মরা হইয়ে যাবে। অন্দরের গোল যেন বাহিরে না যায়কো, বুঝলা। লাও, সবকটারে লিয়ে আস। এক্কেরে নাইন্টিন ফিফটি টু থিকে টু জিরো টু সিক্স তক্কো ঢুকা দিখি।
একে একে লাইন দিয়ে একজনের কাঁধের ওপর আর একজন হাত রেখে হুজুরের কাছে প্রবেশ করে; হুকু হাক্সটার প্যাকা পেডলার চপলা চ্যাপম্যান পচা পিচম্যান মানু ম্যান্তেরাস কমলি ক্যামেলাস অমল এ্যাম্বুলেটর শ্যামল সার্সিটর। হুজুর তো হাঁ। কি নাম বুলছে র্যা; বাপের জম্মে এমন নাম শুনে নাই। একটু কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করেন –
-হ্যাঁ গা, তুমরা কি সক্কলে এক ঠাঁয়ের!নাকি ইদিক উদিক থিকে লাদ কুড়োয় লিয়ে আসেছ! এট্টু, বেত্তান্ত বল দিকি।
হুকু আর হাক্সটার একসাথে জিজ্ঞেস করে –
-আজ্ঞে, প্রথমে যে কথাটা জিজ্ঞেস করতে চাই – আপনি কি ১৯৫২-র হকার উচ্ছেদের পার্টি নাকি ১৯৬০,অপারেশন হকার! ১৯৮৭-১৯৮৮ … এক মিটার বাই এক মিটার!
-আমরা ৭১৫ প্লাস ফিলিপিন্স, কম্বোডিয়া, লাওস,ভিয়েতনাম, লন্ডন, জার্মান প্লাস গোটা দুনিয়ার।
-হুজুর,আমরা“নীল আকাশের নীচে”“বেঙ্গল হকার্স ইউনিয়ন”“ডাব্বাওয়ালা”“নাসভি(NASVI)”;নাইন্টিন ফিফটি টু থেকে দু হাজার ছাব্বিশ, বুলডোজারের মুখোমুখি।এ্যাই-চায় গরম,এ্যাই- গরমা গরম সামোশা, এ্যাই – টক ঝাল মিষ্টি,একবার চুষলেই টুক টুক করে বাড়ি,এ্যাই – টাইম পাস মামফ্লি ভাজা,…. ডট ডট ডট ডট ডট ডট…..……।
এ্যাই হাবলা,অধিকারীবাবুকে মিসকলটা দিলি!আর ভালো করি দ্যাখ,উয়াদের লগে ডিম রইছে কিনা। অর্ডার অর্ডার;আদালত চত্বরে ডিম্বফলের লুফালুফি চলবেক নাই, টমেটো ছুঁড়া চলবেক নাই, লাদ লিয়ে আসা চলবেক নাই।
হাবলা তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে প্রত্যেকের পকেট হাতড়ায়। নিশ্চিন্ত হয়, নাহ; ডিম কিংবা টমেটো বা গোবরের পোঁটলা, কোনোটাই নাই। কয়েকজনের হাতে বেশ তাগড়াই দেশি মোরগ আর কিছু সাদা পায়রা,পেয়ারার ঝুড়ি, লজেন্সের প্যাকেট,একজন গানওয়ালা, বংশীবাদক, হজমিওয়ালা। হাবলা হুজুরকে বলে –
-আজ্ঞে না হুজুর,এমন কিছু নাইকো;ইয়ারা ছোঁড়া পার্টি লয়। ইয়াদের কাছে বেশ ভালো ভালো মালপত্তর রইছে;একদম খাঁটি দিশি মাল।
-অহ, যাকগো;একটা ফাঁড়া কাটল। তা, মুরগা আর কবুতর লিয়ে ক্যা ইদের ঢুকতে দিলে রে! দ্যাশে কি আইন বলি কিছু নেইকো!
পেছনে বসেছিলেন প্রকাশবাবু, সৃষ্টি আর শতধর ঘোষ। প্রকাশবাবু উঠে দাঁড়ালেন –
-হুজুর, এই হক কথাটাই তো বলতে চাইছি; দেশে কি আইন বলে কিছু নেই! কেন পঁচাত্তর বছরেও এদের জন্যে কোনো আইন হলো না; শ্রম দিয়ে বেঁচে থাকার আইন। আপনার বুলডোজারগুলো কেন ধর্মতলা মেট্রোগলি চাঁদনিচক খিদিরপুর গড়িয়া বড়বাজার, বেনাচিতি বাজার, দুর্গাপুর বাজারে যায়না!
-এ্যাই হাবলা ক্যাবলা ভ্যাবলা পটলা; উরা কুন দ্যাশের র্যা! তুরা মিসকলটা করলি!
সবকটা মোরগ একসঙ্গে ডেকে উঠলো – কোঁক কোঁক কোঁক কোঁক......। সমস্ত সাদা পায়রাগুলো একসঙ্গে ডানা ঝাপটে ডেকে উঠলো – বক বকম, বক বকম, বক বকম। সব মানুষগুলো একসঙ্গে হাতে একটাই লেখা প্ল্যাকার্ডগুলো তুলে ধরল – হক হক হক হক……।
-আমাদের হক চাই;বেঁচে থাকার হক । আর দশটা মানুষের মতো;পৃথিবীর আর সব মানুষের সাথে হকারদের বেঁচে থাকার হক।
গোটা চত্বর- মোরগের,পায়রার,মানুষের;সব শব্দগুলো যেন একটাই শব্দের প্রতিধ্বনি তৈরি করে ছড়িয়ে গেল বাইরে,দূরে – আরো বহুদূরে…… দিশা থেকে বিদিশায়..... হক… হক …হক… হক…; বেঁচে থাকার প্রকৃত হক; একটা শিরদাঁড়া সোজা করা শাল গাছের মতো …একটা পাখির মতো… দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকা; নিশ্চিন্তে,রাতে একটা ছাদের তলায় ঘুমোতে যাওয়া, ভোরের সূর্য দেখা মানুষের মতো………।।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment