![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
ছাতা
দেবদাস কুন্ডু
আপনার ছাতা হারিয়েছে? আমাদের কাছে আসুন। নতুন ছাতা পাবেন। বিনামূল্যে।
অনিশ্চয় রায় কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে থম দিয়ে বসে রইলেন। তিনি রবিবারের বিজ্ঞাপনের পাতা দেখেন। কত মানুষ কতো রকম বিজ্ঞাপন দেন। একদিন একটা বিজ্ঞাপনে তার চোখ আটকে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপনটা ছিল এইরকম:আমাকে শিশু সাহিত্য পড়ে শোনাতে হবে। আমার যেন হাসি পায়। ডাক্তার বলেছেন, হাসতে হবে আপনাকে। না হাসলেন আপনি মরে যাবেন। যোগাযোগ সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা। মোবাইল নম্বর…..
আর একদিন একটা বিজ্ঞাপনে চমকে উঠেছিলেন অনিশ্চয় রায়। বিজ্ঞাপনটা ছিল এই রকম:আমার নাম রবি বনিক। বয়স তিরিশ। আমর বাবা মা নেই, বন্ধু নেই। আমি একজন বন্ধু চাইছি। যিনি আমাকে হুইল চেয়ারে করে বিকেলে পার্কে নিয়ে যাবেন। আমার সংগে গল্প করবেন। রাতে আমার সংগে ডিনার করবেন। রাত ন’টায় চলে যাবেন। আশ্চর্য বিজ্ঞাপন। তিনি ভাবেন। আর একদিন একটা বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল এই রকম:আমার বয়স আশি। আমর ছেলেরা বিদেশে থাকে। আমর কোন মেয়ে নেই। সম্প্রতি একটা দূর্ঘটনায় আমার দু’টো পা বাদ গেছে। সকালে সংবাদপএ পাঠ করে শোনাতে হবে। বিকেলে কথামৃত। কোনদিন গীতা বা উপনিষদ পাঠ করবেন। বিনিময়ে দশ হাজার টাকা। এও তো এক আশ্চর্য বিজ্ঞাপন। মাহিনা, বেতন না লিখে, লিখেছেন বিনিময়। আর এক রবিবার দেখলেন একটা বিজ্ঞাপন – আমার স্ত্রী মারা গেছেন। অথচ আমি বিশ্বাস করি না যে, আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। আমি অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। কোন উপকার হয়নি। কেউ যদি আমাকে সাহায্য করেন। ঠিকানা…………
অনিশ্চয় রায় আশ্চর্য হন, ‘মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়?’বইটা স্পীড পোষ্টে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের বিজ্ঞাপনটার মতো কোন বিজ্ঞাপন এর আগে চোখে পড়েনি। জীবনে কে না ছাতা হারিয়েছে? সবাইকে ছাতা দেবে? তাও বিনামূল্যে? ব্যাপারটা ধাপ্পাবাজি নয় তো? অনিশ্চয় রায় গিন্নীকে ব্যাপারটা বললেন। গিন্নী শুনে বললেন, ‘’তুমি তো কম ছাতা হারাওনি। তুমি তাড়াতাড়ি চলে যাও। মনে হচ্ছে অনেক লাইন পড়বে। দেখ পাও কিনা?” কথাটা মিথ্যে নয়। অনিশ্চয় ভাবলেন, যখন যেখানে গেছেন একটা অনিশ্চয়তা নিয়ে গেছেন। তার রোগটা সারবে তো? ঔষুধটা সে পাবো তো? রেলের রিজারভেশন কনফার্ম হবে তো? তার নাম অনিশ্চয় রেখেছিল দাদু। তা একদিন দাদুকে চেপে ধরলেন, ‘জগতে এতো নাম থাকতে তুমি আর কোন নাম পেলে না? আমার নাম অনিশ্চয় রাখলে? কেন?”
দাদু এতটুকু না রেগে বলেছিলেন, ‘দেখ দাদুভাই, এই পৃথিবীতে কিছুই নিশ্চিত না। এই যে আজ তুমি এতো মানুষ দেখেছো। কাল এই মানুষ গুলো নাও থাকতে পারে। এই যে বাড়িটায় তুমি থাকো, কাল দেখলে বাড়িটা ভেঙে মাটির সংগে মিশে গেছে। জীবনও তাই। আজ আছে, কাল নেই। এই সত্যটা মানুষ ভুলে থাকতে চায়। তাই তোমার নাম দিয়েছি অনিশ্চয়।তুমি সারাক্ষণ এই সত্যটা স্মরন করবে, আমি অনিশ্চয়। তখন সে ক্লাস নাইনে পড়ে। দাদুর মুখ থেকে নামের অর্থ বুঝে আর দাদুর ওপর তার রাগ হয় নি। কিন্তু সব কিছু নিয়ে তার অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
উ রি বাপ! এ তো বিশাল লিইন। গিন্নী ঠিকই বলেছেন। ব্যাংকে এতো লাইন হয় না। খিচুরি ভোগে এতো লাইন হয় না। সামান্য একটা ছাতা। তার জন্য এতো লাইন? তাও দোকান খুলতে এখনও এক ঘন্টা দেরি। দশটায় দোকান খুলবে। অজগর সাপের মতো দীর্ঘ লাইন এঁকে বেঁকে চলে গেছে মহাত্মা গান্ধী রোড পার করে ইসলামিয়া হাসপাতালের কাছে। সে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে মূহূতের মধ্যে তার পিছনে ছয় জন দাঁড়িয়ে গেল। কতো সকালে লোক গুলো এসেছে? কাকে জিগ্যেস করবে? তবু দু’একজনকে জিগ্যেস করলেন। তারা কেই ভোর চারটে, কেউ ভোর পাঁচটায়, কেউ ছয়টায়, কেউ সাতটায় এসেছে। কেন? বিনা মূল্যে ছাতা দেবে বলে? না, না, তাদেরকে দেখে মনে হচ্ছে না, তারা এতো গরীব যে, একটা ছাতা কিনতে পারবে না। এই যে তিনি এসেছেন, তিনি তো ব্যাংকে চাকরি করেন, তবু কেন এসেছেন? তিনি কি একটা ছাতা কিনতে পারেন না? আসলে দেখতে চাইছেন, কে এই মহান মানুষ, যিনি লোককে বিনা পয়সায় ছাতা দেবেন। সে দাতা কর্ণটি কে? নাতি ছাতা দেয় দাদুর মৃতদেহের পাশে। আগে জমিদারের মাথায় বড় ছাতা ধরতো। এখন জমিদার নেই। ছাতা নেই। টাকা খরচ করে এই রকম একটা বিজ্ঞাপন। অনেকটা স্পেস জুরে। বেশ বড় বড লেটার। কত টাকা লেগেছে? অনেক টাকা। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে তিনি ছাএ পড়াবেন বলে একটা ছোট্ট বিজ্ঞাপন দিতে গিয়েছিলেন, তখনই লেগেছিল তিনশো টাকা। এখন পাএপাত্রী বিজ্ঞাপন দিতে লাগে পাঁচ হাজার টাকা। এই বিজ্ঞাপনটা দিতে পঁচিশ থেকে তিরিশ হাজার টাকা লেগেছে। সেই বিরল ব্যাক্তিটিকে একবার দেখতে ইচ্ছে হয় না? কিন্তু যা দীর্ঘ লাইন। সে ছাতা পাবে তো? আবার সেই অনিশ্চয়তা।
হঠাৎ ঝম ঝম শব্দে বৃষ্টি নামলো। লাইন গেল ভেঙে। সবাই এদিক ওদিক ছুটে নিয়েছে আশ্রয়।
বিনা পয়সায় ছাতা নিতে এসেছিস। সংগে ছাতা আনবি না? বর্ষা কাল, যখন তখন বৃষ্টি আসতে পারে।কি বোকার রে এরা। পর মূহুর্তে তার মনে হলো, সংগে যে তিনি ছাতা এনেছেন, সেটা দেখে যদি বলে, আপনার ছাতা হারিয়েছে কোথায়? ঐ তো আপনার সংগে আছে ছাতা। আপনি ছাতা পাবেন না। এতো মহা ভুল হয়ে গেল। এখন সে কি করে? বৃষ্টির পর লাইন ছোট হয়ে গেছে। এবার নিশ্চয় ছাতা পাওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো সংগের ছাতাটা সে কি করে? একে তাকে বলছে। লাইনের কেউ নিতে চাইছে না। কেন পুরনো রঙ ওঠা ছাতা নেবে। যেখানে নতুন ছাতার জন্য লাইন দিয়েছে, সেখানে কেউ পুরনো ছাতা নেয়? রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসেছিল একটা ভিখিরি। তাকে ছাতাটা দান করলেন। যাক বাবা এবার মুক্তি। লাইন এগোচ্ছে। সেও এগোচ্ছেন। একটা আশ্চর্য জিনিস চোখে পড়ল তার। কাউন্টার থেকে ফিরে আসা লোকগুলির কারো হাতে নতুন ছাতা নেই। তারা বির্মষ মুখ করে চলে যাচ্ছেন। অনিশ্চয় রায় একজনকে ডাকলেন। লোকটি তার কাছে এসে দাঁড়ালো। তিনি বললেন, ‘আপনাকে ছাতা দিলো না কেন?
লোকটা বলল, ‘একবারই ছাতা হারিয়েছি। প্রচন্ড ঝড় জলে ছাতা উড়ে গেছে। একে নাকি ছাতা হারানো বলে না। ‘অনিশ্চয় মনে মনে বলল, কথাটা তো ঠিক। ঝড় জলে উড়ে যাওয়া আর হারানো এক জিনিস হলো না। দেবে কেন ছাতা?
আরো একজনকে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে কেন ছাতা দিলো না? লোকটা বলল, ‘আমি তো টিচার ছিলাম। ছাতার বাট দিয়ে অনেক ছাএকে মেরেছি। ছাতা হারিয়েছি দুটো। কিন্তু ঐ যে ছাতার বাট দিয়ে ছাএদের প্রহার করেছি , তাই আমাকে দেব না। তা আমি বললাম, এসব কথা তো বিঞ্জাপনে লেখে নি। তখন বলল, শর্তাবলি পড়েন নি? আমি বললাম, না। তখন বলল, শর্তাবলি পড়ে আসবেন। আপনি শর্তাবলি পড়ে এসেছেন তো? অনিশ্চয় রায় বললেন, না। আমি শর্তাবলি পড়িনি।লোকটা বলল, দেখছি অনেকেই শর্তাবলি পড়ে নি। ‘
অনিশ্চয় রায় বললেন, ‘আপনার কাছে কাগজটা আছে? ‘
“আছে। “
‘দিন তো আমায়। শর্তাবলিটা পড়ে নি।‘
লোকটা কাগজটা দিল। কিন্তু হঠাৎ দমকা বাতাসে কাগজটা উড়ে গেল।
‘দিলেন তো আমার কাগজটা নষ্ট করে। বাড়ি গিয়ে শর্তাবলিগুলো পড়তাম।’
‘আর শর্তাবলি পড়ে কি হবে? ‘
‘দেখতাম। কি কি শর্তাবলি লিখেছে। পরের বার সেই মতো প্রস্তূত হয়ে আসতাম। ‘
‘সামনের বছরও দেবে নাকি? ‘
‘কি জানি? ‘
‘আপনাকে কাগজের দামটা দিয়ে দিচ্ছি। ‘
‘না। ষ্টেশনে আমি কিনে নিতে পারবো। ‘
লোকটা চলে গেল।
লাইন এগোচ্ছে। দোকানে ঢুকে গেলেন অনিশ্চয় রায়। ভিতরে আলো ঝলমল করছে। শোকেস ভর্তি ছাতা। কতো রং, বে রং এর ছাতা। কত ডিজাইন করা কাপড়। দেখলে লোভ হচ্ছে।
‘আপনার নাম? কাউন্টারের লোকটা বলল।
‘ অনিশ্চয় রায়।‘
‘কি করেন?’
‘ব্যাংকে চাকরি করি। ‘
‘কোথায় বাড়ি আপনার? ‘
‘হারানপুর।‘
‘আপনি কখনো ছাতা হারিয়েছেন? “
‘কখনো মানে? আমি কুড়িটা ছাতা হারিয়েছি।
“আপনি ছাতা পাবেন না। “
“কেন? “
‘এই নতুন ছাতাটাও আপনি হারাবেন।’
‘পাবো না?’
‘না।’
‘যদি আপনি একটি ছাতা হারাতেন তবে ছাতা পেতেন। যারা দুই বা তার বেশি ছাতা হারিয়েছেন, তাদের আমরা ছাতা দিচ্ছি না। কারন তাদের স্বভাবই ছাতা হারানো। আমরা তাদের স্বভাব পাল্টাতে পারবো না। যারা ছাতার মর্ম বোঝে না, তাদের ছাতা দিচ্ছি না। আপনার যদি ছাতার দরকার থাকে তবে আমাদের দু’নম্বর কাউন্টারে চলে যান। একশো টাকায় ছাতা পেয়ে যাবেন।’ অগ্যতা একশো টাকা দিয়ে নতুন ছাতা কিনে বাইরে এসে বার বার দেখছেন অনিশ্চয় রায়, তখনই চোখে পড়ল তার পিছনে যে ছেলেটি দাঁড়িয়ে ছিল, সে নতুন ছাতা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো। আশ্চর্য, পঁচিশ কি তিরিশ বছর বয়স হবে ছেলেটার। ও কি করে ছাতা পেল? তিনি ডাকলেন। ছেলেটি কাছে এসে বলল, ‘আমাকে ডাকছেন?
‘হ্যাঁ তোমার নাম কি?’
‘অর্পন।’
‘তা তুমি কতো দাম দিয়ে ছাতাটা কিনলে? একশো, না দেড়শো?’
‘আমি তো ছাতা কিনি নি’।
‘তাহলে? এক নম্বর কাউন্টার থেকে দিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি?”” ‘হ্যাঁ করেছে তো?’
‘কি জিগেস করেছিল? ”
‘আমি কখনো ছাতা হারিয়েছি কিনা।’
‘তুমি কি বললে? ’
‘আমি বলেছি, আমি ছাতা ব্যবহার করি না।’
‘তুমি তাহলে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন? ছাতা যখন ব্যবহার করো না, তখন ছাতা হারোনোর প্রশ্ন উঠছে না। তবু তুমি লাইনে দাঁড়ালে?’
‘আমার জেঠা খুব ছাতা হারায়। তিনি অসুস্থ। জেষ্টা বলল, তুই লাইনে দাঁড়িয়ে যা। বলবি আমি একবার ছাতা হারিয়েছি। তখন তোকে ওরা ছাতা দেবে। শর্ভাবলিতে তেমন লেখা আছে। তাই আমি লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু কাউন্টারের কাছে গিয়ে আর মিথ্যে কথা বলতে পারলাম না। সত্যি কথাটাই বললাম, আমি কখনো ছাতা ব্যবহার করিনি।’
‘তবু কেন তোমাকে ছাতা দিল?’
‘ও হ্যা। ওরা বলছিল তুমি ভালো করে ভেবে বলো সত্যি কি কোনদিন ছাতার প্রয়োজন হয়নি তোমার? তখন আমার মনে পড়ল।’
‘কি মনে পড়ল?’
“মনে পড়ল আমার দাদু একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতাল নিয়ে যেতে হবে। এদিকে খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। বাবা বলল, ছাতা নিয়ে রাস্তা থেকে একটা গাড়ি ডেকে নিয়ে আয়। আমি ছাতা মাথায় দিয়ে গাড়ি ডেকে আনলাম। নিয়ে গেলাম হাসপাতালে। ডাক্তার দেখছেন। বাইরে অপেক্ষা করছি। এটা ছোট হাসপাতাল ।যদি তেমন করে বড় হাসপাতালে রেফার করেন ডাক্তার বাবু। তা হলে আবার এই বর্ষার মধ্যে গাড়ি ডেকে আনতে হবে ছাতা মাথায় দিয়ে । শেষ পর্যন্ত তাই করতে হলো। দাদুর খুব খারাপ অবস্থা। এই যায় যায়। আমি বাবা খুব টেনশনে ছিলাম। কিন্তু ছাতাটা কাছ ছাড়া করিনি। এসবই বললাম ওদের। আর ছাতাও আমাকে দিলো।’
অনিশ্চয় রায় বললেন, ‘বুঝেছি। তোমাকে কেন ছাতা দিল। তুমি এবার এসো।’

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment