1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label মৌমিতা ব্যানার্জ্জী. Show all posts
Showing posts with label মৌমিতা ব্যানার্জ্জী. Show all posts

Wednesday, January 12, 2022

আকাশের সাধ

 

ছবি  : ইন্টারনেট 

আকাশের সাধ 

মৌমিতা ব্যানার্জ্জী


“যে পথে যেতে হবে সে পথে তুমি একা।

 নয়নে আধাঁর  রবে ধেয়ানে আলোকরেখা”...

 

একাই যে যেতে হবে তা মন্টু জানে।সেই কোন ছোটবেলা থেকে একাই তো পথ চলেছে সে।ছোটবেলাতেই বাবা চলে গেলেন।বাবার খুব ইচ্ছা ছিল মন্টু পড়াশোনা করবে অনেক।কিন্ত সেই পেনখাতা ধরবার বয়সে সে সব রেখে কারখানার মেশিন ধরতে হয়েছিল।মেশিন টেনে টেনে একসময় মন্টুর হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল।হাত, পা দুই এতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল যে তার মধ্যে থেকে নরম হাতের সেই মন্টুকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।তারপর মন্টু একটু বড়ো হতেই মা তার বিয়ে দিলো।আর এখন সেই বউ তিন সন্তানের জননী।মন্টু ভাবে আর না।এদের মানুষ করতে হবে।ঠিক বাবা মন্টুকে যেমনটি করতে চেয়েছিলেন।মন্টু তাই মুখবুজে গাধার খাটুনি খেটেছে।কিন্ত কারখানাটাও হটাৎ বন্ধ হয়ে গেল। নায্য পাওনা ইত্যাদি দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে সুমিত, অজয়, কমলরা গলার শির তুলে স্লোগান দিচ্ছিল।হটাৎ করে মালিক কারখানাই বন্ধ করে দিলেন।আর এতগুলো বছর পরে মন্টু দেখল সে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।সবাই বলল নতুন কোন কাজ খুঁজে নিতে।মন্টু ও কয়েকদিন ঘুরেছিল আর তার মধ্যেই বিজনদার একটা কথা ওর ভিতরের মন্টু টাকে একটা ঝাঁকুনি  দিল।স্বাধীন ব্যাবসা করতে বলেছিল বিজনদা।নিজের মতো বাঁঁচবার কথা বলেছিল।একটা নতুন দিশা পেয়েছিল মন্টু।তারপর এই ট্রেনে ট্রেনে জিনিস বিক্রি করবার শুরু।ছোটবেলায় বাবা একটা কথা বলতেন প্রায়ই “মন্টু জানবি কোন কাজ ছোট বা বড়ো হয়না।কাজ আসলে ঠিক বা ভুল হয়।দরকার শুধু সঠিক কাজ সঠিক সময়ে মনোযোগ দিয়ে করা। শুধু কোনো ভুল পথে যাবিনা।"লেখাপড়া করে বড়ো হতে চাওয়া মন্টু যখন কারখানায় ঢুকেছিল তখন ও এই কথাগুলোই ওকে সাহায্য করেছিল।ব্যবসাতেও তাই।  মন্টু তাই মন দিয়ে কাজ করে যায়। কাজই ঈশ্বর,জ্ঞানই ঈশ্বর,সততাই ঈশ্বর।

 

তারপর থেকে রোজ সকালে মন্টু চলে আসে স্টেশনে।হাতে থাকে রুমাল,গামছা,আর ঘরকন্নার টুকিটাকি কাঁচি,ছুরি,নখকাটার।প্রথম এ রাখতো না পরে অবশ্য বাচ্চাদের লজেন্স ও রাখতে শুরু  করেছিল।স্টেশন এ এলেই এক অবাক বিষ্ময়ে মন ভরে যায় ওর।কত লোক,কত রকমের কাজ।সবাই ছুটছে।কোন এক অজানা শক্তি যেন সবাই কে সচল রেখেছে।এদের মধ্যেই কেউ হয়তো  পেয়েছে আপনজন হারানোর ব্যথা,কেউ গলা অবধি দারিদ্র্যতে ডুবে আছে।তবুও হাসছে,কথা বলছে।একখন্ড সচল জীবন। এদের সবার আকাশ হয়তো  এক নয়,আলাদা।কারুর আকাশ  গাঢ় নীল,কারুর কোমল আসমানি, কারুর হয়তো মেঘলা ধূসর। এরপর  একসময় এসে যায় ট্রেন।এঁকেবেঁকে যখন  আসে বেশ মজা লাগে মন্টুর।ট্রেন এ চড়ার কতো শখ ছিল ওর।এখন সে রোজ ট্রেন এ যায়।সবাই ট্রেনে ওঠার জন্য ছুটছে।নামছে যত উঠছে ততো।মন্টু দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।তারপর উঠে পড়ে এক ধারের কামরায়।এরপর ওকে প্রতি স্টেশনে কামরা পাল্টাতে হবে।প্রথম প্রথম বেশ ভয় পেত ।যদি পা পিছলে পড়ে যায়?এখন অবশ্য  অভ্যাস হয়ে গেছে।বেশ দক্ষতার সাথে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এক কামরা থেকে অন্য কামরায় চলে যায়।ট্রেনে উঠেই দেখে চা নিয়ে পলাশ,পাঁপর, চিপস নিয়ে গনেশ দাও হাজির।ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে  হাসে।খদ্দের  নিয়ে ওরা রেসারেসি ও করে আবার একদিন না এলে খোঁজখবর ও নেয়।মন্টু গলাটা এক বিশেষ কায়দায় চেঞ্জ করে নেয়।এএএএএ রুমাআল চায়য়য়,গামছা চায়য়।এটাও বিজন দার কাছে শেখা।সাধারণ ভাবে বলে নাকি জিনিস ফিরি করা যায় না।গলা এমন হতে হবে যাতে সামনের মানুষ যতো ব্যস্তই থাকুক না কেন একবার চোখ তুলে তাকাবেই।ভাগ্য ভালো থাকলে হয়তো বলবে 'দেখি ওই লাল রুমালটা'।তারপর একটু দরাদরি করে কিনে ফেলবে।বিজন দাও চা ফিরি করে তবে ট্রেন এ নয়, বাসে আর বাসস্টান্ডে।বিজন দার একটা পায়ে সমস্যা।ট্রেনে চটজলদি উঠতে নামতে পারেনা।মন্টু কামরার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরতে থাকে।একধারে কতগুলি স্কুলের মেয়ে।মন্টুর ভারি ভালো লাগে।ওর  যদি একটা মেয়ে থাকতো।পরক্ষণেই সামলে নেয়।বৌ এর মুখটা মনে পড়ে।বৌ ভালো কিন্তু অভাবের সংসার।তিনটে ছেলে।ওর বুক এখন মরুভূমি।মন্টু জানে মন্টু মেয়ের কথা বললেও মুখে কিছু বলবেনা কিন্তু তাকাবে।সেই তাকানোতে  ক্ষোভ আছে,অবজ্ঞা আছে,আছে নীরব কান্না।মন্টু সেই তাকানোর জবাব দিতে পারবেনা।কথার ওপর কথা দিয়ে প্রতিবাদ চলে কিন্তু নীরবতার কোনো উত্তর হয় না।পাড়ার রকে যখন সন্ধ্যায় বসে আড্ডা দেয় তখন রাজু,বিল্টু,দিপু ওকে ঘিরে ধরে।রাজু বলে"গুরু তুমি তো লাকি।"এই ইংরেজি শব্দটা কোথা থেকে না জানি শিখে এসেছিল।ওরা সবাই বলে ও খুব লাকি।ওর তিনটেই ছেলে।বিয়ে দেবার ঝামেলা নেই।নিরাপত্তার চিন্তা নেই।মন্টু হাসে।গর্বে বুক ফুলে ওঠে।একটা ব্যাপারে তো মন্টু হেলাফেলার নয়। হ্যাঁ এক একবার বুকটা চিনচিন করে।একটা লাল ফ্রক পরা, লাল ঝুঁটি বাঁধা কার মুখ মনে পড়ে? রুনার কি?অনেক দূর পড়তে চেয়েছিল।বড়ো হতে চেয়েছিল।আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল,আজ আকাশেই মিশে গেছে।পণের দাবি মেনে বোনটার বিয়ে না দিলে হয়তো।এই হয়তো শব্দটা মন্টুকে মাঝে মাঝেই অস্থির করে তোলে।মন্টু ভাবতে চায়না।হটাৎ ঘোর কাটে।গণেশদা ডাকছে।স্টেশন এসে গেছে অন্য কামরায় উঠতে হবে।গণেশদার কাজ এই স্টেশন পর্যন্ত।এরপর পাঁপর,চিপস নিয়ে উঠবে হরিকাকা।ওদের নিজেদের মধ্যে জায়গা ভাগ করা থাকে।মন্টু আরো দুটি স্টেশন যাবে।এই কামরাতে কতকগুলি কলেজের মেয়ে বসে আছে।ওদের মুখের সামনে ফোন।মাঝে মাঝেই হেসে গড়িয়ে পড়ছে।ওদের একজন মন্টুকে দেখে আর একজনকে কিছু বলে।ওদের হাসি ফাজলামোতে মন্টু বেশ একটা শিরশিরে অনূভুতি পায়।তখন মন্টু আরো অনেক অল্পবয়সী।সবে রকে বসে শিসটানা শিখেছে।এরকমই একঝাঁক মেয়ের দল যেত।তাদেরই একজনকে...ওই যে কালো চোখের জাদু বলে...তারপর তো ফুলে সাজানো গাড়িটা চলে গেল।মন্টু কেঁদেছিল।বালিশ আঁকড়ে ধরে...তারপর সে কতকালের কথা।কাজল কালো চোখ এখন অতীত।ভাঙা বাড়ি,ভাঙা স্বপ্ন,উদয়াস্ত খাটুনি এখন অনেক বেশি জ্যান্ত।এই কামরাতে মন্টুর কিছু বিক্রি হয়ে গেল।পরের স্টেশন আসতে এখন ও কিছুটা সময় আছে।দরজা দিয়ে বেশ ঠান্ডা হাওয়া আসছে।মন্টু বুক ভরে হাওয়া নিল।তারপাশে বসে আছে পিলু।পিলু পুরো ট্রেন বসে বসে ভিক্ষা করে।একদিন অবশ্য তাকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেন থেকে নেমে যেতে দেখেছিল।পিলু কে বলতে পিলু হেসেছিল।বঁাচার এটাও এক রাস্তা।একদিন এক পুলিশের সাথে কথা বলতে দেখে অবাক হয়েছিল মন্টু।পুলিশটিও সব জানে দেখা গেল।কারণ তার সামনে পিলুকে সোজা হয়ে হাঁটতে দেখা গেছে।পিলু পরে বলেছিল পুলিশের নানা সময়  নানারকম খবরের দরকার হয়।পিলুর মতোন কিছুজনকে তারা হাতে রাখে।পিলু মন্টুর সাথেও ব্যবস্থা করে দিয়েছে।মন্টুকে দেখে কেন যেন তার ভালো লেগেছিল।এখন মন্টু কান খোলা রাখে।কোনো অপরাধের কথা শুনলে বা কোন গোপন কথা জানলে জানায়।অবশ্য সবকিছুই যে জানাতে হয় বা জানাবার পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয় তেমনটা নয়।মন্টু এই কদিনে বুঝেছে সাধারণ কথার থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে কি কথা হচ্ছে জানবার উৎসাহ বেশি থাকে।

কামরার মধ্যে একটা বাচ্চা ও বাচ্চাটির মা খেলা দেখাচ্ছে।মা ঢোল বাজাচ্ছে আর বাচ্চাটি অদ্ভূত কায়দায় একটা বৃত্তাকার রিঙের মধ্যে খেলা দেখাচ্ছে।খেলা দেখানো হয়ে গেলে বাচ্চাটা টাকা চাইছে।পরের কামরায় মন্টু সকালের সেই গায়ককে পেলো।যে গাইছিল "যে পথে যেতে হবে।" দুজন বৃদ্ধার সাথে বেশ ভাব হয়েছে দেখা গেল।গান শোনাচ্ছে।মন্টুর কাজের শেষ স্টেশন এসে গেছে।নেমে পড়লো।আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে।দুপুরে দুটো খেতে হবে।দেরি করা যাবে না।তারপর আবার বিকালের ট্রেন।লাইনের ধার দিয়ে হাঁটবার সময় একটা অস্পষ্ট শব্দ প্রথমে তার কানে আসে।মনের ভুল ভেবে এগিয়ে চলে সে।কিন্তু না আবার একই শব্দ।জিনিসটার দিকে এবার মনোযোগ দেয়।একটা সাদা কাপড়ে মোড়া বস্তু চোখে পড়ে।অস্পষ্ট শব্দ ওর মধ্যে থেকেই আসছে।স্টেশনে ঘোষণা হয়ে গেছে ওই লাইন দিয়ে ট্রেন আসবে।মন্টু দেরি করলো না।


ট্রেনটা চলে গেল।মন্টুর হাতে লাল টুকটুকে একটা সদ্যজাত মেয়ে।ওঁয়া ওঁয়া ধ্বনিতে জন্মেই তার ওপর হওয়া অবিচারের প্রতিবাদ জানাচ্ছে অথবা অনুযোগ করছে।হয়তো এমন এক মায়ের সন্তান যার ভালোবাসার সাহস আছে কিন্তু শিশুটিকে বাঁচানোর সাহস নেই।এমন বাবার সন্তান যার দায়িত্ব নেওয়ার মন নেই।হয়তো এমন বাবা মায়ের সন্তান যেখানে সব আছে শুধু কন্যাসন্তানের জায়গা নেই।মন্টু মুহুর্তের জন্য জড়িয়ে ধরে শিশুটিকে।কিন্তু মন্টুই বা কী করবে? ও  কিই বা করতে পারে?মন্টু বাচ্চাটাকে নামিয়ে রাখবে বা স্টেশনে কাউকে গিয়ে বলবে?সেটাই তো সহজ উপায়।মন্টু কেন অন্যের বোঝা নেবে?কিন্তু মন্টুর হাতটা যেন পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।ভয়ে ভয়েই বাড়ি ফেরে মন্টু।হাজার চেষ্টাতেও বাচ্চাটাকে ফেলে দিতে পারেনি।বৌয়ের মুখটা মনে পড়ছে।মায়ের মুখটাও।কী বলবে ওরা মন্টুকে?গালি দেবে?পাড়ার আড্ডার রাজু,বিল্টুদের কথাও মনে পড়ে।আর ওরা মন্টুকে লাকি বলবে না।কিন্তু মন্টু যেন পাথর হয়ে গেছে।হঠাৎ বুকটা খালি হয়ে যায়।মা আর সুলতা দাঁড়িয়ে।মন্টু মন্ত্রপড়ার মতো করে বলে সব বৃত্তান্ত।কিন্তু মন্টুকে অবাক করে তার হাত থেকে বাচ্চাটাকে নিয়ে সুলতা ঘরে ঢুকে যায়।মন্টু কাতর ভাবে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে।ভিতরে যেতে সাহস হয়না।

কিছুক্ষণ পরে ঘনঘন শঙখধবনি শুনে ঘরে এসে দেখে এক পরম মমতায় দুধ গরম করে সুলতা খাইয়ে দিচ্ছে আর মা শাঁখ বাজাচ্ছে আবিরাম।শিশুটিও এই পৃথিবীর বিষ্ময়কে দুচোখ ভরে দেখছে।জন্ম নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে অনেক কিছু দেখেছে।চরম অনাদরের পর এই চরম অভ্যর্থনা।তার কান্না থেমে গেছে।বিল্টু,রাজুরা এসে গিয়েছিল।মন্টু মুখ নামিয়ে চলে যাচ্ছিল কিন্তু রাজু এসে পিঠে হাত রেখে হাসিমুখে বললো "গুরু তুমি খুব লাকি"।

অদ্ভুত রহস্যময় এই পৃথিবী।কোথাও ভাঙে কোথাও গড়ে।কারুর আকাশ হয় একটুকরো, কারুর হয়তো থাকে অনন্ত আকাশের সাধ।যোগ্যতা সেখানে বাধা হয় না।ভালোবাসা এক সূতোয় বেঁধে রাখে।মুক্তি খুঁজেও মুক্তি পাওয়া যায় না।মুক্তির থেকেও বড়ো হয়ে ওঠে বন্ধন।এই জগৎ হৃদয়ের টানাপোড়েন দেখে মুচকি হাসে।

  --------------------------- 

হাওড়া
moumitabanerjee005@gmail.com


Tuesday, January 26, 2021

মিনুর শেষকথা

ছবি  : ইন্টারনেট 

 মিনুর শেষকথা
মৌমিতা ব্যানার্জ্জী

       সুবল আজ আবার এসেছে।রান্নাঘরের মেঝেতেই পিঁড়ি পেতে জাঁকিয়ে বসেছে।আগে সেভাবে আসতো না কিন্তু আজকাল ও প্রায়ই আসছে।কেন আসছে তাও মিনুর অজানা নয়।ও এলে মিনুর ভিতরটা এখন কেমন এক অস্বস্তিতে ভরে ওঠে।মিনু চায়না আবার বারণ ও করতে পারে না।সুবল এটা, ওটা বলে আবার সেই কথাই তোলে।মিনু নীরবে ঘরের কাজ করে যায়, উত্তর দেয়না।সুবল চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ স্থির ভাবে বসে থাকে মিনু।অবাক হয়ে ভাবে ওই, ওই যে আমার আত্মজ।অথচ ওতে আর আমাতে কত প্রভেদ।কত মাইলের দূরত্ব।যেনো দুই ভিন গ্রহের বাসিন্দা।এককালে যে আমার সবথেকে কাছের ছিল সে আজ বহুদূরের।মাঝখানে অপরিচয়ের পাহাড়।কবে এই পাহাড় তৈরি হলো?কীভাবেই বা হলো?মিনু জানে না।মিনু চোখ বন্ধ করলে সুবলের শৈশবকাল দেখতে পায়।
রোদ চলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।উঠানে এখন ছায়া পড়েছে।মিনু কতক্ষণ ধরে বসে আছে ও নিজেও জানেনা।এবার উঠতে হবে।এইসময় শিবু আসে।শিবু এমনি সময় বাড়িতে থাকে কম।কিন্তু আজকাল এই সময়টায় ও প্রায়ই আসে।ঘরের মধ্যে খুটুর খুটুর করে।ওদের কী সব দল আছে।শিবুর ঘরটায় পোস্টার, রঙ সব ছড়ানো থাকে।ছড়ানো থাকে পার্টির ঝান্ডা।শিবুরা সারাদিন পার্টির হয়ে খাটে।এইসব দেখলে মিনুর একধরনের বিতৃষ্ণা জাগে।পার্টি শিবুদের থেকে কেড়ে নেয় অনেক কিছু।তাদের সময়,শিক্ষা, পরিশ্রম, পরিবার, রক্ত এমনকি প্রাণ ও।কিন্তু পার্টির বড়ো বড়ো ঘটনাগুলো ঘটে যায় প্রায়শই তাদের অজ্ঞাতসারে।উপরতলায় সব রদবদল হয়ে যায় আর শিবুদের সব পরিশ্রম অতল জলে তলিয়ে যায়।ওই সব রাজার নীতি রাজাদেরই ভালো।মিনু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।এখন শিবুও চাইতে শিখেছে।মুখচোরা ছেলে বলে ছোটবেলায় কতো হাসতো মিনু।ওদের দুই ভাইয়ের লক্ষ্য একটাই জিনিসের ওপর।সবার সব সমস্যার সমাধান ওই একটাই।
‘খেয়ে যাবি তো বাবা।দুটো মুড়ি দেবো?’
‘না।তোমায় ভাবতে হবেনা।‘
‘আমি ভাববো না?তো কে ভাববে শুনি?খেয়ে নে না।তবে দুটো ভাত বসিয়ে দি।আবার সেই কতো রাতে ফিরবি।‘
‘বললাম তো না। এঃ’ একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করে শিবু।ওর কথাবার্তা এখন এমনই।
‘অতো ভালোবাসা দেখাতে হবেনা।এসেছিল তো প্রাণের বড়ো ছেলে।খুব তো হলো সোহাগ।‘
শিবু এখন আর দাদা বলেনা।বলে তোমার বড়ো ছেলে।
‘সোহাগ আবার কী?কী যে বলিস তার ঠিক নেই।‘
‘থাক ন্যাকামি করোনা অসহ্য লাগে।তোমার বড়ো ছেলে আর তার বৌটা কী চিজ জানিনা ভেবেছো?মাখন লাগাতে এসেছে।চাই তো শুধু ওই একটা জিনিস।‘  ‘ছি,ও কি কথার ছিড়ি হয়েছে তোর?‘ শিবু খানিকক্ষণ তেরচা চোখে তাকিয়ে থাকে তারপর  রাগে দুমদুম করে পা ফেলে চলে যায়।
হ্যাঁ তা মিনুও জানে বৈকি।আগে তবু রাখঢাক করে বলতো এখন সরাসরিই বলে।শিবুও বলে।মিনু অধিকাংশ সময়েই চুপ করে থাকে।
‘বৌঠান বাড়ি আছো নাকি গো?’
‘আসুন মাষ্টারমশাই।এবার অনেকদিন পরে এলেন।শরীর ভালো?’
‘আর ভালো।ওই আছি আর কী।শিবু এসেছিল মনে হলো। ‘
‘চলে গেছে?’
‘ওহ। ছেলেটাকে একটু সামলে রেখো।যে পথে যাচ্ছে।‘ মাষ্টারমশাই হতাশ ভাবে দুপাশে মাথা নাড়লেন।মিনু শূণ্য চোখে তাকিয়েই থাকে সামনের দিকে।
‘সেই রায়েদের জমিটার কথা মনে আছে বৌঠান?সেই জমিটা সুবল কিনছে।‘
মিনুর শরীরটা এবার একটু আন্দোলিত হলো।সুবল জমি কিনছে!
‘তুমি জানতে?’
‘না।তবে কিনতেই পারে।এখন ও অনেক কিছুই করছে।আজও এসেছিল।‘
মাষ্টারমশাই হাসলেন।‘ওই প্রেসঘরটার জন্য তো?’মিনু সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে।‘কিন্তু মাষ্টারমশাই ও যে আমি দিতে পারবো না।আপনি তো জানেন।‘মাষ্টারমশাই কোনো জবাব দিলেন না।আর দু একটা কথার পর উঠে পড়লেন।রাত হয়ে গেছে।তাঁকে এখন অনেকটা পথ যেতে হবে।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ।মিনু এখন একা।সুবল জমি কিনছে? একবারও বলেনি তো।অবশ্য ওকে বলবেই বা কেন?ওকে এখন আর কেউ কিছু বলেনা।শিবু মাঝেমধ্যে মারামারি করে বাড়ি আসে।মিনু কিছু বলতে গেলে তেরচা চোখে তাকায়।মিনু তাই চুপ করেই থাকে‌।সুবল আজকাল খুব ঘনঘন আসছে।সুবলের বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতেই থাকা নিয়ে ঠারেঠোরে অনেকে অনেক কথাই বলেছিল।মিনু অবশ্য খারাপ ভাবে নেয়নি।আহা থাকই না।ক্ষতি কিছু নেই।মেয়ে এখানে এসে থাকতো না হয় ছেলে ওখানে গিয়ে থাকবে।আর একটা ভিন্ন  ভাবনাও ছিল।শিবু আর সুবলের সম্পর্ক মোটেই ভালো যাচ্ছে না।ওদের আলাদা আলাদা থাকাই ভালো।
‘মা’। মিনু চমকে ওঠে।শিবু তো এতো তাড়াতাড়ি ফেরেনা কোনোদিন।আজ হঠাৎ?শিবু এসে মিনুর পাশে  বসলো।কতদিন মিনুর পাশে কেউ বসেনি।মিনু শিবুর গায়ের গন্ধ পাচ্ছে।
‘ওই প্রেসঘরটা আমায় দিয়ে দাও না মা।‘শিবু ভণিতা না করেই বলে।‘ওটা পার্টির ঘর হবে।আমার  কতো নাম হবে ওদের কাছে।দেখো তুমি যদি ওটা না দাও আমার মাথা নিচু হয়ে যাবে ।‘ মিনু নির্বাক,নিস্তেজ চোখে তাকিয়ে থাকে।‘আমি পার্টিতে আরো ওপরে উঠতে পারবো।বোঝার চেষ্টা করো।‘শিবুর গলায় ছেলেমানুষি জেদ ঝরে পড়ে।মিনু কোনো কথা বলেনা।‘তুমি দেবেনা তাই না?কিন্তু ওটা তো আমারি প্রাপ্য।বাবার জিনিস ওটা।ওই সুবল,ও তো তোমার নিজের ছেলে নয়।আমি কিছু জানিনা ভেবেছো?দিয়ে দাও ওটা।এখনো এতো আগলে রাখা কীসের?’মিনুর কানে আর কোনো শব্দই যাচ্ছিল না।ও কাঠ হয়ে গিয়েছিল।শিবু কী করে জানলো?ও তো কখনো কাউকে বলেনি।এই খবর শিবু পেল কোথা থেকে?’
রাত এখন অনেক।শিবু সেই যে ঝগড়া করে বেরিয়ে গেল আর ফিরলো না।মিনুর চোখে ঘুম নেই।সেই কতকাল আগের সব কথা আজ না চাইতেও মনে পড়ছে।
‘বেরিয়ে যা বলছি,বেরিয়ে যা।এই বাড়িতে তোদের আর থাকা হবেনা।‘
‘ওরম বলবেন না কাকা।কোথায় যাবো?’
‘তার আমি কী জানি?’
মিনু আর ওর বর অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিল কীভাবে একটার পর একটা জিনিস বাড়ির উঠোনময় ছড়িয়ে পড়ছিল।বাপ,মা মরা মিনুর বরটার কাকার বাড়িই ছিল একমাত্র আশ্রয়। নিরাশ্রয় হওয়ার থেকেও কাকার এই ব্যবহার তাদের নির্বাক করে দিয়েছিল। তারপর কতো কষ্ট করে কতো লড়াই শেষে এই ছোট্ট আশ্রয় আর প্রেসঘর।গ্রামের মধ্যে প্রেস শুনে লোকে খুব হেসেছিল।কিন্তু তারপর এই প্রেস ও বেশ চললো তো।ছেলেরা এলো সরস্বতী পুজোর চাঁদার কাগজ ছাপাতে।স্কুলের পত্রিকা বের করা হলো,বারোয়ারি দুর্গাপুজোর কাগজ ছাপানো হল।পার্টির কাজ ও হলো।মিনুর বর মিথ্যে স্বপ্ন দেখেনি।কিন্তু তাও শেষদিকে আর চলতো না।খরচ চালানোই মুস্কিল হয়ে গিয়েছিল।মানুষটা বেঁচে থাকতে থাকতেই প্রেস বন্ধ হয়ে গেল।এখন আর সেই মানুষটা নেই।কিন্তু তাঁর শেষ ইচ্ছা রয়েই গেছে।
‘মিনু আবার প্রেসঘরটা তো খালিই পড়ে আছে।মেশিনগুলোও একটা একটা করে চলে গেল।ঘরটা তুমি গ্রামের মেয়েদের দেবে?ওরা স্বনির্ভর হবে।হাতের কাজ করবে।ওদের একটা জায়গা হলে ভালো হয়।দেবে?কথা দাও দেবে।‘
মিনু চোখ বোজে।শেষকথাগুলো এখনো কানে বাজে রাবণের চিতার মতো।
পরেরদিন বেলা দশটা নাগাদ সুবল এলো।
‘তুই এতো সকালে?’
‘কেন আসতে নেই?’
‘তাই কি বললাম?হ্যাঁ রে আজ এখানে খাবি?ভাত বসাবো?’ মিনু হঠাৎ উৎসাহিত হয়ে বলতে শুরু করলো।
‘বসাও।’ সুবল একটু ইতস্তত করে।শ্বশুরবাড়ি থেকে রীতিমতো পাখি পড়া করেই শিখিয়ে পাঠিয়েছে।সুবল তবু একটু সময় নেয়। অনেকদিন পর মিনু  খুশি হয়।রোজ রোজ একার জন্য রাঁধতে ভালো লাগে না। ‘কী খাবি বল।বড়ির ঝাল করে দেবো?আমড়ার টক খাবি?আমড়া আছে।তুই তো খেতে ভালোবাসিস।‘
‘সে তোমার যা ইচ্ছা।‘সুবল সংক্ষেপে উত্তর দেয়।আর একটু চুপ করে থেকে সুবল বলে ‘শিবুটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে তাই না?পার্টি পার্টি করেই গেল।তুমি বোঝাতে পারোনা?’ 
‘তুই ও তো বোঝাতে পারিস।‘ ‘আমি!’ ‘কেন নয় কেন?তুই ওর বড়ো ভাই।‘ ‘আমি ওসব বোঝাতে টোঝাতে পারবো না।বড়ো দাদা বলে মানে নাকি?তুমি প্রেসঘরটা ওকে দেবেনা ব্যাস।‘
আবার সেই এক কথা।মিনু থম মেরে যায়।এই কথা বলতেই এসেছিল তবে ।মায়ের সাথে ওর আর কোনো কথা নেই?মিনুর রান্না করা হাত থমকে গেছে সুবল সেটা টের পায়।
‘ওই বললেই তোমার ওই অবস্থা।কাঠ হয়ে যাবেন একেবারে।আমাকে তো দেবেনা জানি।আমি তো তোমার ছেলে নই।আমাকে দেবে কেন?দাও সব শিবুকেই দাও।‘সুবল হনহন করে উঠে চলে গেল।
সুবল ও জানে?ওরা সবাই জানে?মিনুর দুই চোখে উপচে পড়া নদী।জলের টসটস ফোঁটাগুলো মিনু হাত তুলে মোছে না।
‘মিনু ও মিনু এই দেখো কাকে আনলাম।‘
‘ওমা এটা কে গো।আহা দুধের বাছা তো।‘
‘আমার বন্ধু কাজলকে মনে আছে?এ তার ছেলে।কদিন আগে কাজল আর ওর বৌটা তো মরে গেল।তোমায় বলেছিলাম তো।‘গলাটা ধরা ধরা হয়ে যায় মিনুর বরের।‘কাকার কাছেই ছিল ছেলেটা।কাকাটা ভালো নয়।আবার আমার মতোই ভাগ্য হবে?তাই নিয়ে এলাম সঙ্গে করে।ওরাও এক কথায় দিয়ে দিল।যেন বিদায় হলেই বাঁচে।ভালো করিনি?’ 
মানুষটার মুখে অদ্ভূত সারল্য।এই মুখের ওপর বিরোধিতা করা কঠিন।তাও মিনু বলেছিল ‘নিয়ে এলে কিন্তু মানুষ করবে কেমন করে?আমাদের তো নিজেদেরই জোটে না।‘ 
‘ও আবার কেমন কথা।দায়িত্ব নিতে গেলে ‘বোধ’ টাই তো জরুরি।টাকা আসল নয়।আমরা দুটো শাকভাত,ডালভাত খেলে এই বিল্লি বাচ্চাটাও খাবে।তুমি নিজের খোকা হলে একে ভুলে যেওনা শুধু।‘ 
এই তার সুবল। আর তারপর কোলে এলো শিবু।

‘ও সুবলের মা শিগগির এসো।সুবলকে কারা খুব মেরেছে গো।রক্তে ভেসে যাচ্ছে একেবারে’
‘সে কি কেন?’মিনুর বুকটা খালি হয়ে যায়।
‘তা জানিনা।দেখে তোমায় তাই বলতে এলাম।বোধহয় রাতের অন্ধকারে মেরেছে।‘
মিনু বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ে।
‘না না ওতো ভেঙে পড়োনা।এখন সুবল ঠিক আছে।আমি ও পাড়া থেকেই তো এলাম।তুমি যাবে তো চলো নিয়ে যাই।জানো,সবাই বলছে ওরা নাকি শিবুর দলবল।শিবুও নাকি ছিল।‘
মিনুর মুখের দিকে তাকিয়ে পড়শি মহিলা থমকে চুপ করে যান।

মিনু চলে যাচ্ছে।অনেক দূরে।যেখানে ওকে কেউ চিনবে না।ও কাউকে চিনবে না।পিছনে ফেলে রেখে যাচ্ছে ওর পরিচিত জগৎ।ওর সংসার।যাকে ও তিলে তিলে গড়েছিল।মিনু তার শেষকথা জানিয়ে এসেছে।মাষ্টারমশাইকে আইনি ভাবেই দিয়ে এসেছে প্রেসঘরটা।মেয়েদের স্বনির্ভর করার দায়িত্ব উনি নিয়েছেন।এরপর কী হবে মিনু জানেনা।জানতেও চায়না।মনে মনে জানবে কারুর শেষ ইচ্ছা ও রেখেছিল।মিনুর ঘরে গেলে এখন দেখা যাবে দরজার পাশেই ইঁট চাপা দেওয়া মিনুর শেষ চিঠি।কোনো বাহুল্য ছাড়াই লেখা কয়েকটা কথা।

স্নেহের সুবল ও শিবু
                     তোমরা হয়তো ভাবছো তোমাদের মা বড়ো কঠিন।না তা নয়।তোমরা দুজনেই আমার কাছের।আমার সামান্য যা কিছু ছিল তা তোমাদের দুজনকেই দিয়ে গেলাম।জানি প্রেসঘরটা তোমাদের প্রয়োজন ছিল।সুবলের দোকানের জন্য।শিবুর পার্টির জন্য।কিন্তু ওটা তোমাদের বাবার স্মৃতি।ওটা তাঁর জন্যই থাক।তোমরা ভালো থেকো।
                                                  ইতি-তোমাদের মা মৃন্ময়ী
moumitabanerjee005@gmail.com
হাওড়া