1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label দেবেশ মজুমদার. Show all posts
Showing posts with label দেবেশ মজুমদার. Show all posts

Sunday, April 17, 2022

শিউলি

ছবি : ইন্টারনেট

শিউলি

দেবেশ মজুমদার

শিউলি ফুলের গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে। আর ভালো লাগে শিউলি ফুলের ঘ্রাণ। স্কুল যেদিন ছুটি থাকে গাছের নিচে বসে আমি গল্পের বই পড়ি। গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে আমি একদম মায়ের কোলের মত আরাম পাই। গাছটার সাথে আমি কত কথা বলি। বাবা আমাকে আজ খুব বকেছে। আজ ইস্কুলে রিংকির সাথে আমার ঝগড়া হয়েছে। স্কুলে অঙ্কে কম নাম্বার পাওয়ার জন্য আমি খুব দুঃখ পেয়েছি। এবার স্কুলে ফাইনাল পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট হয়েছি। স্কুলের আমার একটা বন্ধু আমাকে প্রপোজ করেছে। আমি জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় চান্স পেয়েছি। কোন ডিপার্টমেন্টে ঢোকা যায়? মেকানিকাল ল্যাব এত কঠিন কেন? বাবা যে ছেলেটার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে কেমন হাবলু ধরনের। এমন অনেক কতশত কথা শিউলি গাছটা জানে! আসলে আমি মায়ের সাথে কথা বলি। শিউলি গাছটার মধ্যে আমি আমার মা’কে খুঁজে পাই।

শিউলি গাছটা আমার মা লাগিয়েছিল। বাড়ির সামনে সদর দরজায় ঠিক পাশে। বাবা বলেছিল সদর দরজার পাশে গাছটা বসিয়েছো দেখবে বসন্তকালে এত পাতা পড়বে যে তুমি ঝাঁট দিয়েও পরিষ্কার রাখতে পারবে না। আর বলেছিল যে শিউলি গাছ কিন্তু বেশ বড় আর ঝোড় মতন হয়। উঠোনে রোদ পড়বে না। তোমার কাপড় আর আচার শুকনো করা যাবে না। এমনি অনেক গভীর সমস্যার কথা বলেছিল বাবা। মা হেসে বলেছিল আমার মেয়ে শিউলি তাই আরেকটা শিউলিকে আনলাম। দেখবে ওরা দুজন মিলে রূপ রস আর গন্ধে আমার ঘর ভরিয়ে রাখবে।

মায়ের মায়া মায়া ফর্সা মুখটা শিশুসুলভ সারল্যে ভরা। ঘন কালো চুলগুলো দেখে কেউ বুঝতো না তাঁর শিউলির মতো এতবড় একটা মেয়ে আছে। অবশ্য তখন আমার নিজেকে যতটা বড় মনে হতো তার চেয়ে এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। শিউলি গাছটার খসখসে বাকলে হাত রেখে আমি ওপরে তাকাই। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ে আমার চোখে মুখে।

“গাছটা কত বড় হয়ে গেছে তাই না বাবা?”, আমি বুঝতে পারি যে আমার পেছনে বাবা এসে দাঁড়িয়েছে। বাবার উপস্থিতিতে একটা সুন্দর গন্ধ পাই আমি। বাবার শরীর থেকে বেরিয়ে আসে সেই গন্ধ তাই চোখে না দেখেও বাবাকে আমি চিনতে পারি।

“গাছের নিচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছ এবার ভেতরে চলো মা। স্নান করে নাও। সবাই অপেক্ষা করছে। দেরি করো না একদম!” বাবার একটানা বলে চলা কথাগুলো আমাকে কেমন যেন ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। গাছের ছালে রাখা আমার মেহেদী পরানো হাত দুটো দেখলাম। শিউলি গাছটাকে ছেড়ে যেতে হবে কালকেই। খুব মন খারাপ করছিল। সেই ক্লাস সেভেনে ক্যানসারে মা মারা যাবার পর থেকে আমার মনে হয় শিউলি গাছটা মা হয়ে আমাকে আদর করে। বিয়ের সাজেই শিউলি গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়াই আমি। গাছটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম। কেন যেন আমার মনে হচ্ছিল আমি মাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। অজস্র শিউলি ফুল পড়ে আছে উঠোনময়। শিউলি ফুলের গন্ধে মাখামাখি হয়ে আছে সারা বাড়ি।  উঠোনে ঝড়ে পড়া একটা শিউলি ফুল হাতে নিয়ে বাবার দিকে তাকালাম আমি। বাবা কি বুঝতে পারে আমি কেনো এত ভালোবাসি গাছটাকে?

সময়টা কেমন যেন ঘোরের মধ্যে কেটে গেল। এখন আমি অন্য বাড়িতে। অচেনা একটা ঘরে বসে আছি আড়ষ্ট হয়ে। আচমকা একটা চেনা সুবাস আমার মাথা এলোমেলো করে দিল। খোলা জানলাটা দিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম একটা শিউলি গাছ। গাছটা দেখে মনে হল, মা আমাকে ছেড়ে যাবে না কোনদিন।

বুক ভরে শিউলির সুবাস নিতে নিতে ঘর থেকে উঠোনে বেরিয়ে এলাম আমি। কী সুন্দর নীল আকাশ। পেঁজা তুলোর পুঞ্জ পুঞ্জ সাদা মেঘের ভেলা সারা নীলাকাশ জুড়ে।

 ...(সমাপ্ত)...

Wednesday, October 6, 2021

বাদল

 


বাদল

দেবেশ মজুমদার

পুলিশ যখন পুরো পাড়াটাই ঘিরে ফেলেছে তখন বাদল হেটো কাপড়-ব্যাপারি বিনয় দত্তের বাড়ির বারান্দায় বসে আছে। তখনও তার সামনে আধখাওয়া মুড়ির বাটি আর দু’তিন চুমুক দেওয়া চায়ের কাপটা বসানো রয়েছে।

বিকেল প্রায় তিনটে বাজে। হাটে যাবার জন্য বিনয় তার কাপড়ের গাঁঠরিটা বাঁধা শেষ করেছে। গ্রামের দিকে হাট সপ্তাহে দুদিন বিকেল থেকে সন্ধে রাত পর্যন্ত বসে। বিনয় সপ্তাহে পাঁচদিন সেসব আলাদা আলাদা হাটের চালাঘরে জামাকাপড়ের অস্থায়ী দোকান দেয়। সেখান থেকে বিভিন্ন গ্রামের হেটোরা মাল কেনে। কিছু কিছু চেনা খদ্দের বাকিতে জামা-কাপড় কেনে।সেই সব খদ্দের প্রতি হাটবারে অল্প অল্প করে টাকা  শোধ দেয়। বাদলও তাই করে। সে শুধু ময়নাতলায় হাটে বিনয়কে টাকা দেয়। ময়নাতলারহাট মঙ্গলবার আর রবিবার বসে। 

গত মঙ্গলবার ময়নাতলার হাটে বাদল যেতে পারেনি। সেজন্য বিনয়কে কোন টাকাও দিতে পারেনি। বাদল কথা দিলে সে কথা রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। সেই টাকা দিতে আজ বুধবার পাঠ পাড়ার বিনয়ের বাড়িতে এসেছে সে। বাদলের কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে বুকপকেট থেকে ছোট নোটবইটা বের করে তাতে লিখে নিতে নিতে বিনয় বলল- ‘এই টাকাটা তো তুমি সামনের রবিবারের হাটেই দিতে পারতে বাদলদা। শুধু শুধু এই কড়া রোদ্দুরে কষ্ট করে আমার বাড়ি পর্যন্ত এতটা আসার কোন দরকার ছিল না।

জবাবে বাদল কিছু একটা বলতে গিয়েও হঠাৎই থেমে যায়। মুড়ির বাটি আর চায়ের কাপ বারান্দায় ফেলে রেখে উঠানে ছিটকে নামে। চাপা সতর্ক গলায় বলে- ‘পুলিশ’! বাদলের কথা শুনে বিনয় খুব হকচকিয়ে গিয়ে বলে-

-‘অ্যাঁ- কীসের পুলিশ! কই? কেন? কোথায়?’  

বাদল ততক্ষণে পরণের ধুতিটা মালকোঁচা মেরে নিয়ে এক লাফে উঠানের জামরুল গাছটায় উঠে পড়ে সেখান থেকে আর এক লাফে বিনয়ের ঘরের চালে উঠে পড়েছে। ঘরের চাল বেয়ে হামগুড়ি দিয়ে খানিক উপরের দিকে উঠে খুব সাবধানে একটু মাথা উঁচু করতেই দেখতে পেল খানিকটা দূর থেকে চারিদিকে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে।

বেশির ভাগ পুলিশের হাতেই বন্দুক। একটু একটু করে পুলিশের বৃত্তটা ছোট হয়ে আসছে। সে যে বিনয়ের বড়িতে আছে সেটা যেভাবেই হোক পুলিশ জেনেই তবে এসেছে। রাতের অন্ধকার হলে আলাদা কথা। কিন্তু দিনের চড়া আলোতে এইরকম সশস্ত্র পুলিশ ছাম্বিং থেকে রেহাই পাওয়া প্রায় অসম্ভব বললেই হয়। বাদল খুব ঘাবড়ে গেল- খুব।

দারোগা হিসেবে দীপঙ্কর ভট্টাচার্য্যর খুব নামডাক।বিশেষ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছে থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের পদ্ধতি ভেবে বের করার ক্ষেত্রে তাঁকে একজন প্রতিভাবান দারোগাই বলা যায়। এ ব্যাপারে তাঁর নানা অবদানের মধ্যে সেরা অবদান হচ্ছে ক্যানভাস-ধোলাই। যদিও সন্দেহভাজন আসামির স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য পুলিশের কম্বল-ধোলাই একটি প্রচলিত এবং বেশ নামী পদ্ধতি, তবে  বড্ড পুরনো হয়ে গেছে। তাছাড়া এই পদ্ধতিটির অসুবিধা হচ্ছে, এতে হাড় ভাঙে না বটে কিন্তু দেহে কালশিটে পড়ে যায়।

দীপঙ্কর বাবু আপন বুদ্ধিবলে এই পদ্ধতিটির মূলগত সংস্কার সাধন করে নিয়েছেন। কোথা থেকে বেশ খানিকটা মোটা ক্যানভাস জোগাড় করে তা দিয়ে সাড়ে চার ফুট বাই সাড়ে সাত ফুট একটা থলে বানিয়ে নিয়েছেন। থালেটার এখানে সেখানে বেশ কয়েকটা ফুটো করা আছে। কোন মানুষ কাউকে থলের ভিতর পুরো ঢুকিয়ে দিলেও সে আরামসে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবে। জিনিসটা খুব কাজের। ক্যানভাস ধোলাইতে হাড় তো ভাঙেই না, কোন কালশিটেও পড়ে না। অথচ ভীষণ যন্ত্রণা হয়।

দীপঙ্কর দারোগার ক্যনভাস ধোলাইয়ের এত নাম ছড়িয়েছে যে সন্দেহভাজন ব্যাক্তিকে থানায় ধরে নিয়ে এসে তার মাথার দিক দিয়ে থলেটা শুধু ঢাকা দিয়ে দিলেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গড়গড় করে স্বীকারোক্তি বেরিয়ে আসতে থাকে। এমন কী মাঝে মধ্যে নিরপরাধ ব্যাক্তিও ক্যানভাস ধোলাই অল্প খেয়েই অপরাধের দায় স্বীকার করে নিয়েছে। নিজের এই দুর্দান্ত কৃতিত্বের জন্য তিনি হয়তো পুলিশপদক পেয়ে যেতে পারেন বলে দীপঙ্কর দারোগা বেশ আশাবাদী।

দীপঙ্কর বাবুর খুব ইচ্ছা আছে বাদলকে একবার ক্যানভাসের থলেটায় ঢোকাবার। কিন্তু নানা চেষ্টা সত্ত্বেও বাদল বরাবরই পুলিশের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে থেকে যাচ্ছে। এদিকে গত তিন মাসে পর পর দুটো ডাকাতি হয়ে গেছে দীপঙ্করের থানার এলাকায়। কিন্তু দুটো কেসেরই সেভাবে কিনারা কিছু হয়নি। অনেক চেষ্টায় ওই ডাকাতির সঙ্গে জড়িত জনাদুয়েককে ধরা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ক্যানভাস ধোলাইয়ের পরও বিশেষ কিছুই জানা যায়নি।

তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তারা ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তারা দুজন কেউ কাউকে চেনে না। দলের প্রত্যেকের মাথা মুখ ঢাকা ছিল এবং কেউ কারো আসল নাম বা পরিচয় জানেই না। নেতৃত্বে একজন ছিল বটে কিন্তু তারও মাথা মুখ অন্যান্যদের মত ঢাকা ছিল। ডাকাতি দুটোর ধরণধারণ দেখে দীপঙ্কর বাবুর মনে হয়েছে দুটো ডাকাতিরই নেতৃত্বে বাদল থাকলেও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে দলের সকলের পরিচয় সম্ভবতঃ জানে একমাত্র বাদল। সেজন্য বাদলকে ধরার জন্য দীপঙ্কর একেবারে মরণপণ করে লেগেছিল।

এক মক্কেলের খরচে আজকে থানায় দুপুরের পর বেশ মোটাসোটা লাঞ্চ হয়েছিল। বড় দারোগার জন্য স্বাভাবিক ভাবে স্পেশাল ব্যবস্থা হয়েছিল। লাঞ্চের পর একটু বিশ্রামের জন্য থানার লাগোয়া তাঁর কোয়ার্টারে গিয়ে দীপঙ্কর সবে একটু কাত হবার কথা ভাবছিলেন। এমন সময় সোর্স মারফত খবর এল, বাদল কিছুক্ষণ আগে হেটো কাপড়-ব্যাপারি বিনয় দত্তের বাড়িতে ঢুকেছে।

বিশ্রাম মাথায় উঠলো। থানায় পুরো ফোর্স ঝেঁটিয়ে নিয়ে তৎক্ষণাৎ ঝড়ের বেগে বেরিয়ে পড়লেন এবং মিনিট কুড়ি পঁচিশের মধ্যে সেখানে পৌঁছে গিয়ে এলাকাটা ঘিরে ফেললেন দীপঙ্কর। নিজে থাকলেন পুলিশী বৃত্তের পরিধি বরাবর এ জায়গায়। গ্রামের প্রধান রাস্তার মাঝ বরাবর খোলা পিস্তল হাতে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। আজ যেভাবেই হোক বাদলকে ধরতেই হবে। এদিকে অবশ্য দুটো মস্ত বড় সুবিধার কথা আগে থেকেই তাঁর জানা ছিল যে বাদল নিজে কোন রকম আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না এবং সে মোটের উপর খুন জখম এড়িয়ে চলে, অন্তত এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে সে রকম কোন অভিযোগ ওঠেনি। সেজন্য ধরে নেওয়া যায় আজ বাদল পালাতে পারবে না।

থানার বড় দারোগাবাবু বলে কথা। একজন গ্রামবাসী খাতির করে একটা চেয়ার এনে রাস্তায় পেতে দিল তাঁকে বসার জন্য। আর পাঁচটা দারোগার মত দীপঙ্করের চেহারাটিও ভাল রকম হৃষ্ট-পুষ্ট। বিশেষ করে মধ্যপ্রদেশ বেশ ভারাক্রান্ত। লোকদেখানো সামান্য আপত্তি করে তিনি বসেই পড়লেন চেয়ারটায়। তবে গুলিভরা পিস্তলটা হাতে করে উঁচিয়ে রাখলেন।

বাদল ডাকাত বটে তবে গরিব ছা-পোষা এবং একটু বিরল প্রকৃতির ডাকাত। এমন কী সে পেশাদার ডাকাতও নয়। তাকে দেখলে ডাকাত বলে মনেই হয় না। রোগাটে আর ক্ষয়াটে চেহারা। বর্ষা আর শীতের মরসুমে তাকে ক্ষেতমজুরের কাজ করতেও দেখা যায়। কোন কারণে নিরুপায় হয়ে পড়লে তখন ডাকাতিতে নামে। তবে ডাকাতির অর্থের বেশির ভাগটাই অকাতরে ব্যয় করে ফেলে দলের লোকেদের নানা সমস্যা ও প্রয়োজনে। ভাগ-বাঁটোয়ারার পর সবশেষে যেটুকু পড়ে থাকে তাতেই কোন মতে নিজেরটা চালিয়ে নেয় বাদল। সেজন্য তার দলের লোকেরা তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। বাদলের নেতৃত্বে কোন ডাকাতির কেসে কোনভাবে কেউ ধরা পড়লে পুলিশের হাজার নির্যাতনেও বাদলের নাম কখনও মুখে আনতো না।

গ্রামের লোকেদের সঙ্গে বাদলের সম্পর্ক বেশ ভালো। যে কোন বিপদে আপদে তারা বাদলকে পাশে পায়। তাছাড়া বাদলের কারণে একটা বড় নিরপত্তা ছিল গ্রামবাসীদের। বাদল সেই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ার জন্য সেখানে এখনও পর্যন্ত কখনও ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি বা ভবিষ্যতেও যে ঘটবে না এটা সবাই বোঝে।

আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার, বাদলের কাছ থেকে ঘুষ না পেলেও পুলিশের কিছুলোকও শুধুমাত্র মানবিক কারণে তার প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল ছিল। বাদলকে এতকাল যাবৎ কিছুতেই পুলিশ ধরতে না পারার সেটাও ছিল একটা কারণ। তবে আজকের কথা আলাদা। দীপঙ্কর সশরীরে এখানে হাজির আছেন। আজ বাদল সত্যিই বড় ভয়ানক বিপদের মধ্যে পড়ে গেছে। এই বিপদ থেকে আজ কোনভাবে বেরিয়ে যেতে পারা প্রায় অসম্ভব বললেই হয়।

বিনয়ের ঘরের চালের উপর থেকে পুরো পরিস্থিতি নজর করে বাদল বুঝলো নীচে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। তা করতে গেলেই সে ধরা পড়ে যাবে। তার চেয়ে আরো বড় কথা দৌড়ে পালাতে গেলে সে গুলি খেয়ে যেতে পারে। তা না করে একবাড়ির চাল থেকে অন্য বাড়ির চালায় লাফিয়ে লাফিয়ে এলাকার একদম বাইরে চলে যাবার চেষ্টা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করল। কিন্তু কাজটা ভীষণ কঠিন। যত কঠিনই হোক এটাই করবে বলে ভাবলো বাদল। এখানে অনেকেই তাকে বাড়ির ভিতর এখন গোপন আশ্রয় দিতে রাজি হবে। কিন্তু পুলিশ প্রত্যেক বাড়িতেই ধরে ধরে তল্লাশি চালাচ্ছে। কোনভাবে সে ধরা পড়ে গেলেই পুলিশ সেই আশ্রয়দাতাকেও গ্রেপ্তার করবে। বাদল কিছুতেই সেটা হতে দেবে না।

খুব সাবধানে এগিয়ে যেতে লাগলো সে। বেশি সময় কিন্তু সে পাবে না। পুলিশী ঘেরাও ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। তিনটি বাড়ি পেরিয়ে নিমাই দাসের বাড়ির চালায় এসে পড়লো বাদল। নিতান্ত গ্রাম্য এলাকা বলে পাড়ার অধিকাংশ বাড়ির ছাউনি খড়ের বা টালির বা অ্যাসবেসটসের। নিমাই দাসের টালির চাল বেশ উঁচুমত করা। সেখান থেকে গণেশ কামারের খড়ের নীচু চালায় লাফিয়ে চলে যেতে গিয়ে একজন কনস্টেবলের নজরে এসে গেল সে। তৎক্ষণাৎ কনস্টেবলটি চেঁচিয়ে উঠলো গগনভেদী আওয়াজে-

-‘হুঁশিয়ার! আসামী উপরে উঠেছে! বাড়ির চালায় লাফিয়ে পালাবার চেষ্টা করেছ’।  

দারোগা দীপঙ্কর সে চিৎকার শুনতে পেলেন। তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে পিস্তল বাগিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন।–

-‘খুব সাবধান সবাই! আসামী যেন কোনভাবেই পালতে না পারে’।

বাদল ততক্ষণে বুঝে গেছে যে বাড়ির চালায় লাফিয়ে সে এখান থেকে কিছুতেই পালাতে পারবে না। সবারই নজর প্রধানতঃ উপরের দিকেই থাকবে। অর্থাৎ নীচের বা উপরের দুদিকের পথই তার কাছে বন্ধ। এক মুহূর্ত ভেবেই সে ঘুরে গিয়ে নিমাই দাসের টালির সেই উঁচু চালায় আবার লাফিয়ে উঠল। যেদিক থেকে দারোগার চিৎকার ভেসে এসেছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল গ্রামের চওড়া রাস্তাটার মাঝ বরাবর দারোগা পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সেজন্য সেদিকটায় আর কোন পুলিশের লোক নেই।

আবার উঁচু চালায় উঠার ফলে কয়েকজন পুলিশের লোক তাকে ফের দেখতে পেয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একটা সম্মিলিত চিৎকার শোনা গেল, ‘ওই যে আসামী’!

দীপঙ্কর বুঝলেন আজ আর বাদলের রেহাই নেই। এত পুলিশ আর সেইসঙ্গে তাঁকে দেখে ব্যাটা বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারে গুলিয়ে ফেলেছে। একবার এক বাড়ির চালায় উপর আবার তাকে দেখতে পাওয়া সত্বেও সেই একই বাড়ির চালার উপর আবার তাকে দেখা গিয়েছে। প্রবল উৎসাহে তিনি গর্জন করে উঠলেন- ‘সবাই সাবধান! জ্যান্ত অথবা মরা যেভাবেই হোক আজ বাদলকে চাই! দরকার হলে গুলি করেও ওকে নামাও’।

ডাকাতি করতে গিয়ে অনেক সময় গভীর সংকটজনক অবস্থায় পলকের মধ্যে তাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে হয়। এবারেও বাদল তাই করলো। তার ধারণা ছিল পুলিশের অল্প কয়েকজন মাত্র তাকে চেনে। আর এই দারোগার সঙ্গে এ পর্যন্ত কখনো তার দেখা হয়নি, এই দুটো ব্যাপার মাথায় রেখে মরিয়া বাদল এবারের ভীষণ সংকট বাঁচার জন্য একটা শেষ চেষ্টা করে দেখবে বলে এক ভীষণ দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো।

বাদল এবার চালের নীচের দিকে সরে এল। তারপর প্রহরারত পুলিশদের দৃষ্টিসীমা সাবধান এড়িয়ে উল্টোদিকেই ঘুরলো। ওইভাবে চালার একদম নীচের দিক থেকে পর পর তিন চারটে বাড়ি পেরিয়ে গিয়ে সে যেখানটায় লাফিয়ে মাটিতে নেমে পড়লো সেখানটায় একটা নর্দমা রয়েছে। দুপাশের দুটো বাড়ির পিছনের দিকের দেওয়াল। মাঝখান দিয়ে কাঁচা নর্দমাটা বয়ে গেছে। নর্দমার দুই কিনারায় পা রেখে খুব সাবধানে জলকাদা এড়িয়ে সে এগোতে লাগলো। কিন্তু এই নর্দমাটা সামনে এগিয়ে বড় রাস্তার নর্দমায় গিয়ে পড়েছে।

বড় রাস্তার একটু আগে গিয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়লো। মালকোঁচা মার ধূতিটাকে আবার হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঝুলিয়ে স্বাভাবিক করে নিল। কোমরে বাঁধা গামছা খুলে নিয়ে গায়ে চাদরের মতো করে জরিয়ে নিল। তারপর খুব শান্ত ভাবে বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।

দীপঙ্কর খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। এখন যা পরিস্থিতি তাতে যে কোন সময় বাদল ধরা পড়ে যাবে। দু’একবার শূন্যে পিস্তল চালিয়ে বাদলকে বিভ্রান্ত করবার বা ভয় দেখাবার কথা ভাবলেন। কিন্তু তাতে তল্লাশিরত কনস্টেবলদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে ভেবে সেটা আর করলেন না। তাঁর কাছাকাছি কোন কৌতুহলী ভিড় জমতে দেননি। তবুও তাঁর পিছন দিকে খানিকটা দূরে বেশ কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। খানিকটা ইচ্ছা করেই তাদের আর হটিয়ে দেননি। বাদলকে তিনি না চিনলেও এরা সবাই বাদলকে ভালোমত চেনে এবং চিনিয়েও দিতে পারবে। তাছাড়া অফিসিয়ালি সনাক্তকরণে’র জন্য সাক্ষী হিসেবে এদের দরকার হবে। ছোটখাটো সেই জমায়েতটার দিকে একবার বিরক্তির দৃষ্টিপাত করে তিনি আবার সামনের আর দুপাশের দিকে সতর্কভাবে লক্ষ্য করতে লাগলেন।

একজন রোগাটে খাটো চেহারার লোক বড় রাস্তা ধরে ধীর শান্ত পায়ে এদিকেই এগিয়ে আসছিল। ময়লাটে ধুতিপরা, গায়ে গামছা জড়ানো লোকটাকে এই সময়ে ওই রকম গদাইলস্করী চালে হেঁটে আসতে দেখে দীপঙ্কর খুব বিরক্ত হলেন। এই উজবুকটা এখন তো যে কোন সময় গুলির মুখে পড়ে যেতে পারে। আর সেই লোকটাকে দেখে দারোগার পিছনের জমায়েতটার দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হল।

বাদল এখন সোজা এগিয়ে আসছে বড় দারোগার দিকে। পাড়ার সবাই বুঝতে পারলো আজকের সশস্ত্র পুলিশ ছাম্বিং থেকে পার পাবার কোন উপায় নেই বুঝে আর ভয়ঙ্কর ক্যানভাস ধোলাইয়ের ভয়ে সে নিরুপায় হয়ে নিজেই আগেভাগে ধরা দিতে আসছে। বাদল এগিয়ে এসে সম্মানজনক দুরত্বে দাঁড়িয়ে পড়ে দুহাত জুড়ে কপালে ঠেকিয়ে সামনে একটু ঝুঁকে পড়ে দারোগাকে বললে- নমস্কার বড়োবাবু’।

নমস্কার আদৌ গ্রাহ্য না করে দীপঙ্কর তার দিকে কটমট কর তাকিয়ে বললেন, -‘অ্যাই, তোর বাড়ি কোথায়? এদিকে যাচ্ছিস কোথায়?’

-‘আজ্ঞে বাড়োবাবু আমার বাড়ি বোয়ারপু্রে। যাবো কুয়ারপুর আমার মাসিশাউড়ির বাড়িতে। তার নাকি খুব পেট ছেড়েছে। ভোররাত থেকে নাকি আট দশ বার...’

-‘ফালতু কথা ছাড়্‌। তুই বাদলকে চিনিস কিনা বল্‌?’

- ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বাদলকে চিনবো না কেন’?

-অ্যাঁ!বাদলকে চিনিস তুই? তাকে দেখলে ঠিকমতো চিনিয়ে দিতে পারবি?’

-‘তা পারবো না? একগাল হাসে লোকটা,-বাদল তো আমার ভাইপো। সে তো কেলাস টু’তে পড়ে’।

-‘ধোর্‌ ব্যাটা গাড়োল! ডাকাত- বাদল ডাকাতকে চিনিস্‌ কী না বল্‌?’

-‘ডাকাত! ওরে বাবা, তাকে চিনি না তো। আমি তো থাকি না এখেনে। বর্ধমানে থেকে সেখানে রিশকা চালাই। তিন চার মাস অন্তর আসি। কালি রাত্তিরে বাড়ি এসেছি। আজ সকালে উঠে এই গুরুতর বিত্তান্ত শুনেই...’

-‘ফালতু না বকে এখুনি কেটে পড় এখান থেকে। এখানে যে কোন সময় গুলি চলতে পারে’।

-‘ওরে বাবা! তাহলে তো- তাহলে যাই বড়োবাবু। নমস্কার...’।

আবার দারোগাকে সবিনয় যথাবিহিত আনত একটি নমস্কার জানিয়ে লোকটি খুব ঘাবড়ে যাবার মত মুখ করে এবার তাড়াতাড়ি কুয়ারপুরের দিকে হাঁটতে লাগলো।

তার চলে যাওয়া দেখে দারোগার খানিক ওপাশে দঁড়িয়ে থাকা জমায়েতের লোকজন তাদের বুকের মধ্যে আটকে থাকা শ্বাসগুলো এবার ভালোভাবে আর ঠিকমতো ছাড়তে লাগলো।  

সমাপ্ত

dmajumdarbu@gmail.com
পূর্ব বর্ধমান

Wednesday, March 31, 2021

প্রতিশোধ

 

ছবি  : ইন্টারনেট 
প্রতিশোধ
দেবেশ মজুমদার


বিগড়ে যাওয়া লিফটটার সামনে থেকে সরে এল আকাশ। হতাশ চোখে তাকিয়ে রইল সিড়ির দিকে। এখন এটা বেয়ে চারতলায় উঠতে হবে ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসছিল। সারাদিনের অফিসের ধকলে শ্রান্ত পাদুটোকে টেনে নিতে বেশ পরিশ্রম হচ্ছে আকাশের। দোতলা পর্যন্ত উঠতেই হাঁপিয়ে উঠল। যেন অনন্তকাল পর নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাড়াল আকাশ। ও কলিংবেল চাপবে, হিয়া এসে দরজা খুলবে, এই ধৈর্যটুকুও হলনা আকাশের। ওর কাছে বাড়তি চাবি আছে, ওটা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।

‘হিয়া, হিয়া,’ হাক ছাড়ল আকাশ। কোনো সাড়া নেই।

কী ব্যাপার? কোথায় গেল মেয়েটা? অন্যান্য দিন তো ও ঘরে ঢুকতেই ছুটে আসে। ভাবতে ভাবতে বেড রুমের দিকে উঁকি দিল আকাশ। উঁহু, কোথাও নেই। বাইরে গেছে বোধহয়। সেলফোনটা বের করে ডায়াল করল হিয়ার নাম্বারে।

আপনার ডায়াল করা নাম্বারটিতে এই মূহুর্তে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছেনা, অনুগ্রহ করে একটু পরে আবার ডায়াল করুন। পর পর কয়েকবার একঘেয়ে কথাগুলো শুনতে শুনতে মেজাজটাই বিগড়ে গেল আকাশের। খানিকটা ভয়ও করছিল। হিয়া তো কখনো একা বাইরে যায়না। দোকান টোকানেও যাতে না যেতে হয় সেজন্য আকাশ একটা দোকানে বলে রেখেছে, ফোন করলেই প্রয়োজনীয় জিনিসটা দিয়ে যায় ওরা। তাছাড়া কলকাতা শহরে কোনো আত্মীয় স্বজনও নেই হিয়ার। তার ওপর মোবাইলটাও বন্ধ। তাহলে?

মাত্র একমাস আগে ওদের বিয়ে হয়েছে। আকাশের বাবা মা দুজনেই গ্রামে থাকে। আকাশ  নিজের ব্যবসা আছে। বেশ বড় ব্যবসাটা। আয়ও যথেষ্ঠ ভাল। প্রতিমাসে মোটা অংকের টাকা পাঠায় বাবা-মা’র কাছে।

আর হিয়া? আকাশের পারিবারিক অবস্থা যতটাই ভাল হিয়ার পারিবারিক অবস্থা ততটাই খারাপ। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে সৎমায়ের কাছে বড় হওয়া মেয়ে হিয়া। জন্মের সময় ওর নিজের মা মারা যান। এরপর বাবা আরেকটা বিয়ে করে হিয়াকে মানুষ করার জন্য।

এর আগেও একটা বিয়ে ঠিক হয়েছিল হিয়ার। বিয়ের কয়েকদিন আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায় পাত্র। এরপর হিয়াকে ‘অপয়া’ বিশেষনে ভূষিত করে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ওর বিয়ে পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করে দেয়ার ব্যাবস্থা করা হয়।

তারপর আকাশ যখন ওর অফিসের এক কর্মচারীর পিড়াপিড়িতে হিয়াকে দেখার জন্য ওদের বাড়িতে আসে তখনই এধরনের কিছু মানুষ নিজ দায়িত্বে আকাশ  কানে কথাগুলো পৌঁছে দেয়। তবে এধরনের স্টুপিড কথাবার্তা কখনোই কানে তোলে না আকাশ। হিয়াকে দেখার সাথে সাথেই আকাশের পছন্দ হয়ে যায়। একসপ্তাহের মধ্যে ওদের বিয়ে হয়ে যায়। পরবর্তী একটা মাস স্বপ্নের মত কেটে গেল। 

২

প্রায় আধঘন্টার বেশি হয়ে গেছে এখনও কোন খবর নেই হিয়ার। ফোনটা এখন পর্যন্ত বন্ধ। ঝগড়া ঝাটিও তো ওদের মধ্যে হয়নি যার কারণে রাগ করে কোথাও চলে যাবার প্রয়োজন পড়তে পারে হিয়ার। আচমকা বেডরুমে এসে জিনিসটা চোখে পড়ল আকাশের। একটা ভাঁজ করা কাগজ। পেপার ওয়েটটা সরিয়ে কাগজটা হাতে নিল আকাশ। হিয়ার হাতে লেখা বেশ বড় একটা চিঠি। কী এমন ঘটল যার জন্য এতবড় চিঠি লিখতে হবে, ঠিক মাথায় ঢুকলনা আকাশের। চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল আকাশ।

প্রথম লাইনটা পড়ার সাথে সাথেই চমকে উঠল আকাশ। চিঠির প্রথমেই লেখা, “বিক্রমকে মনে পড়ে? তোমার প্রিয় বন্ধু বিক্রম?” হ্যাঁ, বিক্রমকে ওর মনে আছে, খুব ভালভাবেই মনে আছে, এবং বাকি জীবন ওকে ভোলার কোন সুযোগই নেই আকাশের। বিক্রম  এবং আকাশের  বন্ধুত্ব ছিল প্রগাঢ়, অন্তত একটা পর্যায় পর্যন্ত।

ওদের পরিচয় স্কুলের প্রথম দিন থেকেই। এরপর বন্ধুত্ব। একটু একটু করে সেই বন্ধুত্বের ব্যাপ্তি কলেজ ছাড়িয়ে উনিভার্সিটির গন্ডিতে গিয়ে ঠেকে। একসাথেই পড়াশোনা শেষ করে ওরা। পারিবারিক দিক দিয়ে দুজনের পরিবারই ছিল মোটামুটি সচ্ছল। ওদের আগে থেকেই প্ল্যান ছিল ওরা ব্যবসা করবে। সুতরাং পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দুজনের পুঁজি এক করে একটা ব্যবসা দাড় করায়। এক্সপোর্ট -ইমপোর্টের ব্যবসা। ব্যবসায় ভালই লাভ হচ্ছিল। দুজনেই কলকাতায় ফ্ল্যাট কেনে, গাড়িও হয়। চলছিল ভালই। 

আকাশও ধীরে ধীরে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে মধ্যেবিত্ত পরিবারের ছেলে আকাশের হাতে প্রচুর টাকা এসে যাওয়ায় ড্রিংকস, বার, জুয়ার মত ব্যাপারগুলোতে বড্ড বেশি জড়িয়ে পড়ছিল ও। তবে বিক্রম  সবসময়ই এগুলো থেকে দুরে থেকেছে। ও আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল আকাশকে পথে আনবার। লাভ হয়নি।

মাত্র তিনমাস আগে একটা রোড এক্সিডেন্টে মারা যায় বিক্রম। ঝারখণ্ডে একটা কাজে গিয়েছিল ওরা দু’বন্ধু। ফেরার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটা গাছের সাথে গাড়ির প্রচন্ডে সংঘর্ষে নিহত হয় বিক্রম। স্পট ডেড। ড্রাইভ করছিল আকাশ। বড়ধরনের কোনো ক্ষতি না হলেও বেশ ইনজিয়র্ড হয় আকাশও।

হিয়া কিভাবে বিক্রমের কথা জানল? বিক্রমের মৃত্যুর পরই তো আকাশ আর হিয়ার পরিচয়।

চিঠির বাকিটা পড়তে শুরু করল আকাশ।

অবাক হচ্ছ তাইনা? বিক্রম কে আমি কিভাবে চিনলাম কিংবা তোমাদের বন্ধুত্বের খবরই বা আমি কিভাবে জানলাম? তুমি বোধহয় জেনেছ, আমার এর আগেও একটা বিয়ে ঠিক হয়েছিল, বিয়ের কয়েকদিন আগে আমার হবু বর রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। হ্যাঁ, বিক্রমই ছিল আমার সেই হবু বর। ও মারা যাবার দিন পনের আগে আমাদের এনগেজমেন্ট হয়। বিক্রমের সাথে আমার পরিচয় মাত্র পনের দিনের হলেও ওই পনেরটা দিনের জন্য আমি হাজার বছর অপেক্ষা করতে পারব।

জন্মের সময় আমার নিজের মা মারা যান। এরপর বড় হয়েছি অনেক কষ্টে। সৎমা বাবার কান ভারী করে করে আমার প্রতি তাঁর মন বিষিয়ে তুলেছিলেন। আমাকে দেখতে পারেনা আমাদের বাড়ির কেউই। আজীবন ভালবাসা থেকে বঞ্চিত আমি ওই পনেরদিনে পেয়ে গিয়েছিলাম ভালবাসার এক অফুরন্ত আধার।

ওই ক’দিনে বিক্রম  চারবার কলকাতা থেকে ছুটে আসে বর্ধমানে আমাদের বাড়িতে। মা’কে বলে আমাকে নিয়ে বের হত। গল্প করতাম আমরা, দেখতাম স্বপ্ন। অদ্ভুত রঙিন ছিল আমাদের সেই স্বপ্নগুলো। ভালবাসা নিয়ে এত গল্প, কবিতা, গান কেন রচিত হয়েছে, আমি একটু একটু করে বুঝতে শুরু করলাম। মনে হত, বেচেঁ থাকাটা তাহলে এত আনন্দের!

বিক্রমের কাছেই তোমার সম্পর্কে জানি আমি। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বাইরে বিক্রমের একটা আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল একটাই, আকাশ। সারাদিন তোমার কথা। আমি একদিন ওকে দুষ্টুমি করে বলেছিলাম, ‘এতদিন জানতাম, মেয়েরা মেয়েদের সতীন হয়, এখন দেখছি তোমার এই বন্ধুই আমার সতীন হবে’।

তোমার সাথে আমার দেখা হবার অনেক আগেই তোমাকে আমি চিনতাম। বিক্রমের মানিব্যাগে তোমার একটা ছবি ছিল, দেখেছি। বিক্রমের সান্নিধ্যে যখন জীবনের একটা অর্থ খুঁজে পেতে চাইছি ঠিক তখনই চলে গেল ও। উহুঁ, ভুল বললাম ,চলে যায়নি, তুমি ওকে সরিয়ে দিয়েছ। 

এপর্যন্ত এসে থামল আকাশ। পরিষ্কার বুঝতে পারছে এসি’র শীতল হাওয়াও কপালে জমে ওঠা ঘামের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারছেনা। এটা কী লিখেছে হিয়া ? চরম সত্যটা তাহলে জেনে ফেলেছে ও!

৩

বিক্রম আর আকাশ যখন ব্যবসা শুরু করে, তখনই ওদের মাঝে একটা চুক্তি হয়। ওদের দুজনের কেউ যদি মারা যায় তবে পুরো ব্যবসার মালিক হয়ে যাবে অপরজন। আর একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকা প্রতিমাসে মৃতের পরিবার পাবে। আকাশ ততদিনে রঙিন জলে গলা পর্যন্ত ডুবে গেছে। জুয়া খেলেও প্রচুর দেনা হয়ে গেছে। কিন্তু বিক্রম হিসাবের বাইরে একটা পয়সাও দিতনা আকাশকে। পাওনাদারদের চাপে আকাশ যখন দিশেহারা ঠিক তখনই ভয়ঙ্কর প্ল্যানটা মাথায় খেলে যায় ওর।

বিক্রমের একটা অভ্যাস ছিল, নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করত। কাউকে ড্রাইভিং সীটে বসতে দিতনা, এমনকি আকাশকেও। অন্য কারো গাড়িতে উঠলেও সম্ভব হলে নিজেই ড্রাইভ করত। এবং খুবই সতর্কতার সাথে গাড়ি চালাত বিক্রম। হয়ত এব্যাপারে কোনো ভীতি কাজ করত ওর মধ্যে।

সেদিন ওরা দুজন ব্যবসার কাজে ঝাড়খণ্ডে যাওয়ার পর ফেরার পথে এরকরকম জোর করেই আকাশ ড্রাইভিং সীটে বসে পড়ে। প্রথমে অনেক বাধা দিলেও একপর্যায়ে আকাশকে চাবিটা দিয়ে দেয় বিক্রম। কিছুদুর আসার পরই প্ল্যান অনুযায়ী কাজ শুরু করে আকাশ। প্রায় একশ কুড়ি কিলোমিটার বেগে গাড়িটাকে ছুটিয়ে দেয় বড় একটা গাছের দিকে। এমনভাবে, যেন গাছের সঙ্গে গাড়ির বা দিকটার প্রচন্ড সংঘর্ষ ঘটে। বিক্রম  সামনের বা দিকটাতেই বসেছিল। সংঘর্ষের ফলে ওর মাথা ড্যাশবোর্ডের সঙ্গে মারাত্মকভাবে ঠুকে যায়। মাথা ফেঁটে গিয়ে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে বিক্রমের।

পুরো ব্যাপারটার মধ্যে আকাশেরও প্রচুর ঝুঁকির উপাদান ছিল। আকাশ গুরুতর আহত হলেও হিসেবের সামান্য গড়মিলেই মারা যেতে পারত আকাশও। কিন্তু প্ল্যানটা ফুলপ্রুফ করতে এর বিকল্প ছিলনা।

৪

বিক্রম  মারা যাবার পর পুরো ব্যবসার একচ্ছত্র মালিক বনে যায় আকাশ। কেউ এতটুকু সন্দেহ করেনি। কিন্তু হিয়া ব্যাপারটা জানল কিভাবে? চিঠিটা আবার পড়তে শুরু করল আকাশ।

ভেবেছিলে পরম বন্ধুকে খুন করে বেঁচে যাবে? তুমি হয়ত ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারোনি তোমার নীচ মানসিকতা বিক্রম  আগেই টের পেয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাওয়া মানুষ অনেক কিছু বুঝতে পারে, যদিও নিয়তির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া তখন আর কিছুই করার থাকেনা। বিক্রম  মারা যাবার দু’দিন আগে ওর সাথে আমার শেষ দেখা হয়। সেদিন একেবারেই অন্যরকম দেখেছিলাম ওকে। একপর্যায়ে আমাকে আমাকে এমন একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, ওর খুব কাছের একজন ওর ক্ষতি করতে চাইছে। তখন আমল দিইনি কথাটাকে। কিন্তু ওর মৃত্যু আবার সবকিছু গোড়া থেকে ভাবতে বাধ্য করে আমাকে। জানতে পারি সেদিন তুমিই গাড়িটা ড্রাইভ করছিলে, অথচ আমি জানি বিক্রম  কোনোভাবেই অন্যের হাতে নিজের গাড়ির চাবি তুলে দেবেনা। নিজেই সবসময় ড্রাইভ করে। কিন্তু কী ঘটল? তুমি যেদিন ড্রাইভ করলে অ্যাক্সিডেন্টটা সেদিনই হল। এতটা কাকতালীয় ঘটনা সাধারণত ঘটেনা। বিক্রমের বলা সেই কথাগুলো মুহূর্তেই অর্থবহ হয়ে ধরা দেয় আমার কাছে। ব্যাস দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে কোনো সমস্যাই হয়নি। এরপর বিক্রমের মৃত্যুতে তুমি পুরো ব্যবসার মালিক বনে যাওয়ার পরও কি আর সামান্য সন্দেহটুকুও থাকে?

ওর মৃত্যু আমার জন্য কতবড় আঘাত, সেটা ব্যাখ্যা করার মত ক্ষমতা আমাকে দেয়া হয়নি।ধনী জামাইকে হারিয়ে মা বাবার অবস্থা তখন তথৈবচ। তাদের সমস্ত রাগ আমার ওপর জমা হল। সব দোষ যেন আমারই। অত্যাচারের মাত্রাও বেড়ে গেল কয়েকগুণ।

এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মেয়েরই একমাত্র পছন্দ আত্মহত্যা। আমিও সে পথটাই বেছে নিতে চেয়েছিলাম। তখনই মনে হল আমি আত্মহত্যা করলে কার কী লাভ? না বিক্রমের আত্মা শান্তি পাবে, না আমার প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নেয়া হবে, না তোমার অপরাধের শাস্তি দেয়া হবে। প্রমাণ ছাড়া আমি একা একটা মেয়ে কিভাবে তোমার মত মানুষের সাথে আইনী লড়াইয়ে নামব ? তাই বলে ছেড়ে দেব তোমাকে? বন্ধুকে খুন করেও পার পেয়ে গিয়ে তার সম্পদ ভোগ করে যাবে আজীবন?

ঠিক করলাম তোমাকে শাস্তি আমিই দেব, তবে কষ্টটা হবে ভয়ঙ্কর, একটু একটু করে।

বিক্রমের সাথে আমার এনগেজমেন্ট হয়েছিল তোমাদের অফিসের একজন কর্মচারীর মাধ্যমে। তিনি আমাদের বাড়ির পাশেই থাকেন। আমাকে খুব স্নেহ করেন। বিক্রমের মৃত্যুর পর একদিন তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, তোমাকে যেন একদিন আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমার বিশ্বাস ছিল আমাকে দেখলে তোমার পছন্দ হবেই। হলও তাই। বিয়ে হয়ে গেল আমাদের।

বিয়ের পর একটা মাস তোমাকে ভালবাসার অভিনয় করে গেলাম। যখন বুঝতে পারলাম তুমি আমার প্রেমে পুরোপুরি মজে গেছ তখন বুঝলাম আমার কাজ শেষ। আমি চলে যাচ্ছি। এখন তুমি তোমার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করতে পারবে ভালবাসার মানুষকে হারিয়ে ফেললে কতটা শুন্য মনে হয় নিজেকে। যে শুন্যতায় তুমি আমায় ডুবিয়েছিলে আজ আমি তোমাকে সেই শুন্যতা উপহার দিলাম। আমার প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেছে।

চিঠিটা পড়ে আকাশের সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে ওর। এই চিঠিটা পড়ার আগ পর্যন্ত বিক্রমের মৃত্যুর জন্য কোনো অপরাধবোধ কাজ করেনি ওর মধ্যে। কিন্তু হিয়ার লেখা প্রতিটা শব্দ ওকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ও একজন কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার ছাড়া আর কিছুইনা। অমানুষ মনে হচ্ছে নিজেকে ওর। সেই সঙ্গে এটাও উপলব্ধি করতে পারছে, হিয়াকে ও কতটা ভালবেসে ফেলেছিল। বিয়ের পর আকাশ সব খারাপ অভ্যাসগুলো আস্তে আস্তে ছাড়তে শুরু করেছিল, শুধু হিয়ার প্রতি ওর ভালবাসাকে সম্বল করে। সেই হিয়া . . .না, উপযুক্ত প্রতিশোধই নিতে পেরেছে মেয়েটা। 

dmajumdarbu@gmail.com
পূর্ব বর্ধমান

Tuesday, January 26, 2021

আউট অফ সিলেবাস


ছবি  : ইন্টারনেট 

আউট অফ সিলেবাস
দেবেশ মজুমদার 
১

      দুপুরের কাঠফাঁটা রোদে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছু দূর গিয়ে থামলেন অজয়বাবু। আমোদপুর গ্রামের তিনি এখন উদয়পল্লী উচ্চ বিদ্যালয়ের অঙ্কের শিক্ষক। কালো ব্ল্যাকবোর্ড আর সাদা চক হাতে এলে অঙ্কের যে কোন জটিল সমস্যাই তিনি সমাধান করে ফেলেন  নিমেষেই। তার হাত ধরেই মফস্বল শহর বর্ধমানের অনেক ছেলে-মেয়েই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তখন জয়েন্ট পড়াতেন। শহরের বুকে ছাত্র দরদী স্যার বললে, অলিগলি বলত, বর্ধমান রামকৃষ্ণ সারদাপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়ের অঙ্কের স্যার, অজয়বাবুই একমাত্র। এরপর বুকের বাইপাস সার্জারি হওয়ার পর ঘন্টার পর ঘন্টা বাস জার্নিটা একটু রিস্কের হয়ে গেল। বদলি হয়ে গেলেন, নিজের গ্রামের পাশের স্কুলেই। স্কুলটা তো যথেষ্ট দূরেই ছিল, মূল শহরের কেন্দ্র পেরিয়ে, আরো তিন কিলোমিটার। ওই স্কুলে দীর্ঘ তিরিশ বছরের চাকরি জীবনের মায়া ছেড়ে আসা বড় বেদনার ছিল। রামকৃষ্ণ সারদাপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা আজকেও বারবার মনে পড়ছিল অজয়বাবুর। মাঝারি উচ্চতার খেজুর গাছে ঘেরা পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের ঘন বনভূমির দিকে তাকালেন। প্রাণে সতেজ অক্সিজেন নিয়ে, আবার হাঁটতে শুরু করলেন। বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল, সকালের অপমানগুলো। অনলাইন ক্লাস করাতে পারছেন না অজয়বাবু, মোবাইলের সঠিক ব্যবহার সেভাবে শেখা হয়নি। ছেলে যদিও গত রাতে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু বেমালুম ভুলে গেছেন তিনি। ছেলে বাইরে চাকরি করে, সকালে বেরিয়ে যায়। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। ঘরে একমাত্র আছে, বিরাশি বছরের চলনে অক্ষম বিধবা মা। প্রানবন্ত কালে একটাই প্রেম এসেছিল জীবনে, মিতালী সেন। অবশ্য সে বিশ্বাস ভেঙে চলে গিয়েছিল। তারপর সুমনাকে বিয়ে। অতিসাধ্য নিরুপায় এক শরীরী সংসার যাপন। গত দু বছর আগে, সেও নিশ্চিন্ত হয়েছে, বুড়ো টার জ্বালা থেকে। 

     এখন মিতালী তিন সন্তানের মা, কলকাতাতে বিরাট বাড়ির শৌখিন রানী। নায়িকা হওয়ার শখ ছিল, শুনেছে ছেলেরই মুখে। ছোটখাটো শর্ট ফিল্মে নামডাক আছে ওনার। খোঁজখবর এখনো রাখেন অজয়বাবু। তার প্রিয় নায়িকা বলে কথা। ছেলে যে, ওর স্বামীর আন্ডারে কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে এ’গ্রেড সিনিয়র সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছে। অবশ্য সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছেলেকে কিছু জানাননি।

      হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে উঠেছেন বুঝলেন। ঢালু মোড়ামের পথ পেরিয়ে এসে, পিচের রাস্তা ধরেই উপলের বাড়ি। মোবাইল সম্পর্কে ভালো জ্ঞান আছে ওর। অতএব শিখে নিতেই এত দূর আসা। বিকেলের ক্লাসটা মিস করা যাবে না, এভাবে ছাত্র ছাত্রীরা, নিরাশ হয়ে যাচ্ছে। কথা টুকু ভাবতেই মনে মনে হাসলেন। সকালে অপমানিত হয়েছেন, মোবাইল বিষয়ে দক্ষ না হওয়ার দরুন!

উপলকে ছোট থেকে পড়িয়েছিলেন, আশা করা যায়, স্যারকে ফেরাবে না। উপলের বাড়িতে পোঁছে কলিংবেল বাজালেন অজয়বাবু। দুবার রিং- হওয়ার পর একজন ঘাড় বাড়িয়ে বলল, কাকে চাই ?

“আমি উপলের অঙ্কের স্যার, অজয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ওকে বলুন চিনতে পারবে”।

“বাইরেই দাঁড়ান, আসছি”।

মিনিট পাঁচেকের রোদে তেতে উঠেছে শরীর, বছর আটান্নর অজয়বাবুর। মেয়েটি বাড়ির পরিচারিকা বুঝতে অসুবিধা হয় না। গেট খুলে দিয়ে বলল, ' বসুন ', দাদাবাবু আসছেন।

“আচ্ছা…” বলে, পকেট থেকে রুমাল বের করে, মুখে কপালে, গলায় ঘাড়ে বুলিয়ে নিলেন। উপলের বাড়িটা বেশ সাজানো গোছানো। একটা সময় বাবা মৎস্যজীবী  ছিল। টালির বাড়ি ছিল উপলদের। তালপাতার পাখা বিক্রি করে মা কিনে আনত, ঘরের চাল-ডাল। বাবা জোগাড় করত বাকি সব। উপল পড়াশোনায় ভালো ছিল। অজয় ওকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছে। আজ সব হয়েছে ওর। গ্যাজুয়েট হওয়ার পর অজয়বাবুই সুপারিশ করে বিডিও অফিসের কাজটা জুটিয়ে দিয়েছিলেন! সামনে এসে বসল, উপল। ঠোঁটে সিগারেট। জ্বালিয়ে নিল। তারপর এক টান মেরে বলল, “বলুন স্যার হঠাৎ কি ভেবে উপলের কাছে আসা ?”

“ভালো আছিস ?”

“হ্যাঁ, চলছে...”।

“বউমা ভালো ?”

“হ্যাঁ, ভালো”।

“বলছি, একটু মোবাইলে কি করে ক্লাস নিতে হয়, কিভাবে অপারেট করতে হয় শিখিয়ে দিবি ?

ভ্রু কুঁচকে উপল বলল, “বয়স হয়ে গেছে স্যার, এখন এসব শেখার প্রয়োজন আছে কি ?”

“ছাত্র-ছাত্রী পড়াই তো,তাই আর কি !”

"বেশ দেখুন, এদিকে আসুন, দেখাই”।

অজয়বাবুর হাসি ফুটল মুখে, ব্যস্ত হয়ে বললেন , “দে দে শিখিয়ে দে দেখি”।

২

বেশ কিছুক্ষণ বোঝানোর মধ্যেই ভিতরের ঘর থেকে ডাক এলো, “কই গো শুনছ ? ফোন এসেছে তোমার”।

বোঝানো থামিয়ে উপল বলল, “স্যার আপনি বসুন আমি আসছি”।

অজয়বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন , “বেশ যা”।

অজয়  অভ্যাস করছিলেন , একটু আগে কিভাবে উপল  ওনাকে শেখালো সব, করতে করতে ফোনের অপারেটিং সিস্টেমে কোনো একটি অপশন ফোর্স ফুলি স্টপ করে দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ফোন অফ হয়ে গেল।

অনেক চেষ্টা করলেও খুললই না! উপলের  ঘরের পর্দা হওয়ায় দুলছে, ফাঁকফোকর দিয়ে চেয়ারে বসে বসে উঁকি দিচ্ছিল অজয়বাবু। বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর উপল বেরিয়ে এসে বলল, “স্যার, আপনি কালকে বিকালের দিকে আসুন, আমাকে একটু বেরোতে হবে”।

অজয়বাবুর মুখ শুকিয়ে এলো, “ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললেন , এটা বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ, একটু দেখে দিবি ? শিখতে না হয় কাল আসব”।

উপল একটু ভেবে বলল, “আপনি কালকেই আসুন, আমি দেখছি”। অজয়বাবু চুপ থেকে ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করলেন, পেটে খিদে নামক বস্তুটা বেয়াদপি শুরু করেছে। পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলেন। চলার পথে মাধবীলতায় মোড়া, গ্রিলের অংশটা দেখে মনে পড়ল, বৃষ্টিলেখার এইখানেই বিয়ে হয়েছে। ওর স্বামীর মূল শহরের বুকে, ইলেকট্রনিক্সের দোকান আছে। একসময় ব্যাচের তুখোড় ছাত্রী ছিল, বৃষ্টিলেখা। অঙ্ক অনার্স নিয়ে বর্ধমান বিবেকানন্দ মহাবিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর মিষ্টি আর একটা হালকা গোলাপি রঙের জামার ছিট, উপহার হিসেবে এনেছিল।  সেদিন সেটা গ্রহণ করার পর অজয়বাবু বলেছিলেন , “পরের বার মিষ্টিটা যেন তোর টাকায় পাই, মনে থাকবে ?” বৃষ্টিলেখা হেসে উঠে বলেছিল, “নিশ্চয়ই  স্যার, আপনি আমায় এত সাহায্য করেছেন, পা ভেঙে গিয়েছিল, ব্যাচে যেতে পারিনি, আপনি বাড়ি এসে পড়িয়ে দিয়েছিলেন, আমার সব মনে আছে”।

অজয়বাবু হালকা হাসলেন  এসব ভেবে! বিয়েতেই শেষ দেখেছিলেন  এমনকি, বৌভাত অবধিও মনে ছিল স্যারকে ডাকার কথা, তারপর মেয়েটা হাইস্কুলে চাকরি পেল, অথচ, স্যারকে নিজের টাকায় মিষ্টি খাওয়ালো না! তবুও একবার গেটের সামনে থেকে  আওয়াজ দিলন  অজয়বাবু। উপরের বেরিয়ে আসা ব্যালকনি থেকে বেগুনি রঙের চুড়িদার পড়া বৃষ্টিলেখা উঁকি দিয়ে বলল, “কে?”

“ বৃষ্টিরে! আমি আমি! তোর স্যার রে! অঙ্কের স্যার। বর্ধমানে ব্যাচ ছিল, পড়তে যেতিস, খেয়াল নেই ?”

বৃষ্টিলেখা একটু ভেবে বলল, “দাঁড়ান আসছি”।

দরজায় পুরোনো স্যারকে দেখে, ঢক করে একটা প্রণাম করে বলল, “অনেকদিন পর দেখলাম তাই একটু চিনতে অসুবিধা হয়েছিল। কিছু মনে করবেন না স্যার।”

“ না রে ঠিক আছে। হ্যাঁ, কেমন আছিস মা ?”

“ভালোই। ভিতরে আসুন”।

অজয়বাবু গেটের ভিতরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, সবুজে ঘেরা বাগান দুপাশে। বেনামি ফুলের বাহারে সেজে উঠেছে, পাঁচিলের ধার গুলো। পাখির ডাক শোনা গেল, ভিতরে ঢোকার আগে।

“বসুন স্যার! এত রোদে, হঠাৎ আজ এইদিকে এলেন যে!”

“আর বলিস না, এসব স্কুল কলেজ  বন্ধ হয়ে গিয়ে আমার চিন্তা আরো বেড়েছে। একেই তো অঙ্কে এত কাঁচা ছেলেমেয়ে গুলো, তার মধ্যে এখন আবার অনলাইন ক্লাস। ফোনে এসব কিভাবে কি করব, সেই জন্য এসেছিলাম উপলের কাছে”।

বৃষ্টিলেখা একটু হেসে বলল, “ওহ আচ্ছা। শরীর ভালো তো ?”

“হ্যাঁ... ভালো। ওই একটু”, কথা শেষ না হতেই, বৃষ্টিলেখা  বলল, “শরবতটা খেয়ে নিন। বাড়ি যাবেন তো নাকি এবার ?”

অজয়বাবু খেয়ে নিলেন তখুনি শরবতটা। তারপর বললেন , “হ্যাঁ, যাব, এবার উঠি”।

“বেশ, আসুন। পরে সময় করে আসবেন”। বৃষ্টিলেখা যেন একটু অপ্রস্তুত, ঠিক আতিথেয়তা করার মানসিকতা আর নেই। অজয়বাবু বেরিয়ে চলে আসছিলেন, পিছু ফিরে বললেন, “ফোনটা অফ হয়ে গেছে, একটু দেখে দিবি কি হয়েছে ?”

বৃষ্টিলেখা হাতে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখল, “তারপর বলল, চার্জ নেই মনে হয়। বাড়িতে গিয়ে চার্জ দিয়ে দিন”।

“আমি ফুল চার্জ দিয়েই এনেছিলাম। নতুন ফোন”।

“তাহলে আপনি পারলে একটু দোকানে দেখিয়ে নিন”।

অজয়বাবু আবার পকেটে ফোনটা ভরে, হাঁটা দিলেন। পেটের খিদে এখন ঝিমিয়েছে একটু, ধীরে ধীরে হেঁটে বাড়ি ঢুকলেন  অজয়বাবু। খেয়ে নিয়ে হাত-পা টান করে শুলেন। শরীরটা দিনদিন আর সায় দিচ্ছে না, ওজন কমে গেছে। শীর্ণ শরীর নিয়েই এখনো ছেলেমেয়েদের জন্য খেটে যাচ্ছেন। গণিতের প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে সাহায্য করে যাচ্ছেন। অথচ আজ লেন্সটা জুম-ইন-জুম আউট করতে না পারার জন্য কত কি কটূ কথা শুনতে হল!

অজয়বাবু চোখ বুজে শুয়েছিলেন, বাইরে থেকে ডাক এলো রাজুর।

“ও মাস্টারকাকু, যাবেন নাকি দোকান ? দুপুরে বললেন যে, বিকালে আসতে”।

অজয়বাবু উঠে এলেন, তারপর বললেন, “পাঁচ মিনিট দাঁড়া, আমি আসছি। গাড়ি করে যাবি তো?”

“হ্যাঁ, আসুন আসুন জলদি আসুন” ।

অজয়বাবুর ভীষন মনখারাপ, ছাত্র-ছাত্রীদের আজও ক্লাস নেওয়া গেল না। ফোনটা হাতে নিয়ে পকেটে ভরলেন, তারপর বেরিয়ে পড়লেন, একটা ব্যাগের ভিতরে ছাতা নিয়ে।

রাজু  অজয়বাবুকে শহরের মোবাইলের দোকানটার সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল, মাস্টারকাকু আমি মায়ের জন্য ওষুধগুলো কিনে আসছি, ততক্ষনে কাজ সেরে আপনি এইখানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন, বুঝলেন ?”

“বেশ বেশ, হেলমেট ঠিক করে পড়ে নে, বাবা”।

অজয়বাবু এবার দোকানে ঢুকলেন। নিয়ম করে এখন দোকান খুলছে শহরে সে বিষয়ে রাজু  আগেই বলেছিল। এবার দূর থেকে একজন হঠাৎ ডেকে উঠে বলল, “স্যার ? স্যার ? কেমন আছেন স্যার ?”

অজয়বাবু চশমার ঘষা অংশতে দেখতে চেষ্টা করলেন , মেয়েটা কে ?

“কে তুই ?”

“স্যার আমি মৌমিতা ! মনে আছে ?”

“মৌমিতা ? ওহ হ্যাঁ, ব্যাচের যাকে খুব বকাবকি করতাম, একদম পড়াশোনা করতিস না। তাই তো ?

“হ্যাঁ স্যার”, লজ্জা পেল মৌমিতা।

“ক্লাস এইট থেকে টেন অবধি, অঙ্কতে কখনও পঞ্চাশের বেশি তুলতে পারিস নি বলে তোকে কত বকেছি বল”।

“হ্যাঁ স্যার, আপনি তো কাকাকে ডেকে সব বলে দিলেন, আর আসা হল না ব্যাচে। কাকার ইচ্ছে ছিল, সাইন্স নিয়ে পড়ব, সেটা হল না বলে, আর পড়ালো না”।

“মনে পড়েছে সব এখন জলের মত পরিষ্কার। তা এখন এখানে কাজ করিস নাকি?”

“হ্যাঁ স্যার, কাকা তিন বছর হল মারা গেছেন, কাকিমা, ছোট বোনের  দায়িত্ব আমায় নিতেই হল”।

“সে কি, কি হয়েছিল কাকার ?”

“সেরিব্রাল”।

“ভালো করেছিস মা। বোন কে ভালো করে মানুষ কর”।

মৌমিতা এবার জিজ্ঞেস করল, “স্যার, এখানে কি জন্য এসেছেন ?” 

অজয়বাবু বিস্তারিত সব খুলে  বললেন।

মৌমিতা বলল, “একটু বিলটা দিন স্যার!”

“এই রে, বিল আনতে তো মনে নেই মা!”

মৌমিতাকে অন্য ডেস্কে বসে থাকা ছেলেটা বলল, “তাহলে হবে না। পরশু আসতে বলো”।

মৌমিতার অপারগ মুখের দিকে তাকিয়ে অজয়বাবু বলল, “বেশ পরে আবার আসব। আসলে ছেলেটা কিনে নিয়ে গিয়েছিল তো, আমি বিলটার ব্যাপারে জানিনা”।

মৌমিতা দোকানের বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, “আপনি ফোনটা আমায় দিয়ে যান স্যার, আমি কি হয়েছে দেখে আপনার বাড়ি দিয়ে আসব। কালকেই”।

“কত লাগবে?”

“ কিছু লাগবে না স্যার, নতুন ফোন একবছরের ওয়ারেন্টি আছে। কোন পয়সা লাগবে না”।

অজয়বাবুর মুখে হাসি ফুটল, মৌমিতা র মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ভালো থাক মা!” 

৩

মৌমিতার আওয়াজ পেয়ে অজয়বাবু এগিয়ে এলেন, ভাতের ফ্যান ঝরাতে দিয়েছেন সদ্য। ঘরটা বিশেষ সাজানো নয়। চারিদিকে জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে পড়ে আছ।  মৌমিতা  চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলল, “স্যার অনেকদিন আগে এসেছিলাম একবার, ত্রিকোণমিতি বুঝতে। মনে আছে?”

“সব মনে আছে। তোর কাকা এনেছিল তোকে। আর আমি বলেছিলাম গবেট তুই একটা”।

মৌমিতা হেসে উঠে বলল, “আমি কোনোকালেই আপনার প্রিয় ছাত্রী ছিলাম না। তাই না? কিন্তু আপনি আমার প্রিয় স্যার, সারাজীবন থাকবেন...”।

অজয়বাবুর স্মৃতি বড্ড প্রখর হচ্ছে। মেয়েটা পিছিয়ে ছিল। সবার থেকে, সবাই যেখানে নাম ছড়িয়ে দিচ্ছিল অজয়বাবুর, সেখানে এই মেয়েটা, নাম ডুবিয়ে দিচ্ছিল। পুরোনো কথা মনে আসতেই অজয়বাবু বললেন , “যাক তবু ঘেন্নার পাত্রকে মনে রেখেছিস”।

“এরকম বলবেন না স্যার। আপনিই তো প্রথম যিনি আমায় হাতে ধরে শেখাতে চেষ্টা করেছিলেন। আপনার সাহায্য নিয়েই সাহস করে মাধ্যমিক দিয়েছিলাম। বাকিদের মত হয়ত এতটা কাছের হতে পারিনি কিন্তু আপনি আমার সবচেয়ে প্রিয় স্যার "। কথার শেষদিকে এসে ফোনটা বের করে বলল, "এই নিন স্যার। ফোন ঠিক হয়ে গেছে”।

“তাই ? দেখি দে দে”। অজয়বাবুর মুখে শ্বেত মধুর হাসি দেখে মৌমিতা  বলল, “আপনি আগের মত গম্ভীর নন আর তাই না ?”

অজয়বাবু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “বয়সের জোর নেই মা আর। থাইরয়েড ধরা পড়েছে। ক্রমশ শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে, সুগার ধরা পড়েছে, তিনমাস আগে। বাঁ চোখের অপারেশন করতে হবে, ছানি পড়ছে। হাঁটুর যন্ত্রনায় এক একরাত ঘুম হয় না”।

বাড়ির ভিতরে, শেষ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, অজয়বাবুর ছেলে, অনমিত্র। এক নজরে মৌমিতাকে দেখে বলল, "কে ইনি ?”

“বাবু, এই তো মৌমিতা। আমার পুরোন ছাত্রী। তোকে বলেছিলাম না, যে দোকান থেকে তুই কিনেছিলি ফোনটা ওখানেই আমি গিয়েছিলাম; সারানোর জন্য ? ও ওখানেই কাজ করে”।

মৌমিতা  হাত জোড় করে নমস্কার করে। অনমিত্র  ফ্রিজ থেকে জল বের করে খেয়ে নেয় তারপর ঢেকুর তুলে বলে, “এখন এভাবে কারোর বাড়ি যাওয়া আসা ঠিক নয়। চেষ্টা করবেন, বাইরে থেকে দিয়ে যাওয়ার”।

মৌমিতা এমন আচরণ প্রত্যাশা করেনি। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিল। অজয়বাবু বললেন , “আহ অমন বলতে নেই, ও তো সবই প্রটেকশন নিয়ে এসেছে”।

“তবুও..”।

“বাবু এবার একটু শিখিয়ে দে”।

অনমিত্র, কানে হেডফোন গুঁজে নিয়ে বলল, "এখন সময় নেই, রাতের দিকে দেখছি”।

মৌমিতা শান্ত হয়ে বলল, “স্যার আমি শিখিয়ে দেব ?”

“পারবি রে ? পুরোনো ছাত্র-ছাত্রীরাও এড়িয়ে যাচ্ছে, শেখাচ্ছে না। একটু সময় লাগবে তো বল শিখতে ?”

অজয়বাবুর হতাশ দুহাতের মুঠো চেপে ধরে মৌমিতা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল, “মন খারাপ করবেন না স্যার, আমি রোজ সন্ধ্যেবেলা আসব, দোকান থাকুক না থাকুক। যতদিন না আপনি শিখে ফেলেন, আধুনিক মোবাইলের সমস্ত খুঁটিনাটি”।

অজয়বাবু মুচকি হেসে বলেন, অঙ্কতে ভীষন কাঁচা ছিলি বলেই, ব্যাচ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, তবুও আমাকে শেখাবি ?”

“শেখাবো স্যার। কোথাও যেতে হবে না আপনাকে”।

এরপর মৌমিতা  প্রায়ই আসত অজয় বাবুর কাছে। আড়ালে থেকে ক্লাস করানোর সময়, সমস্ত অপারেটিং বুঝিয়ে দিয়ে যেত। সময় নিয়ে শিখিয়ে দিয়েছিল, কিভাবে পিডিএফ ডাউনলোড করতে হয়। কোন সাইট ভালো, কোনটার  হ্যাকিং পসিবিলিটি বেশি। শিখিয়েছিল, গুগল মিটে কিভাবে অনলাইন ক্লাস নিতে হয়, ছাত্রছাত্রীদের মেইলে কিভাবে, উত্তর দিতে হয়, ও প্রশ্ন পাঠাতে হয়। এছাড়াও কেবলমাত্র বুড়ো আঙুলের নিপুণ কৌশলে কি করে টাইপ করতে হয়, তাও দেখিয়ে দিয়েছিল। প্রতিদিন অভ্যেস করাতো এসে।

অজয়বাবু চাপা আফসোস নিয়ে বলতেন , “ফিরতে রাত হলে কাকী বকে?”

প্রশ্ন এড়িয়ে যেত মৌমিতা। অন্য প্রসঙ্গ আনত। তখনই তিনি বুঝতে পারতেন, ঝড় সামলেই আসে মেয়েটা।

যেদিন হাত উঁচিয়ে অজয়বাবু থামিয়ে দিলেন মৌমিতাকে, সেদিন মৌমিতা  যুদ্ধ জয়ের হাসি হাসল। কারণ এখন ওর প্রিয় স্যার নিজেই সব গুছিয়ে করে নিতে পারবে । থামস আপ দেখিয়ে সাহস দেয় অজয়বাবুকে। দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখে, সাইকেল করে আসা যাওয়া করতে করতে আজ দেড় মাস হয়ে গেল। মৌমিতা যাওয়ার সময় প্রণাম করে বলল, “কিছু অসুবিধা হলে ডাকবেন স্যার”।

“কিছুই নিলি না, উপকারের বদলে”।

“দেবেন কিছু ?” আবার হাঁটু গেড়ে বসল মৌমিতা , প্রিয় স্যারের হাঁটুর কাছে।

“বল, কি লাগবে মা!”

ব্যাচে আপনি আমার সাথে কথাই বলেননি সেরকম। একবার টিচার্সডেতে আপনাকে প্রথমবার প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিলাম, মনে আছে ?

“আছে”।

“জানতে চেয়েছিলাম, আপনার প্রিয় ছাত্রী কে? প্রশ্নটা শুনে অনেকেই হেসেছিল। অবশ্য আমি হাসির খোরাক ছিলাম। এটা ঠিক। যে ব্যাচে সবার শেষে বসে থাকতাম, স্যারও ডাকেননি কখনো, সে ছাত্রী হাসির খোরাকই”।

বাঁ চোখের আল বেয়ে গড়িয়ে আসা জল মুছে দিয়ে অজয়বাবু বললেন, “প্রিয় ছাত্রী” ?

কথা শেষ না হতেই অনমিত্র এসে বলল, বাবা এখুনি চলো, পাশেরবাড়ির  শিখা জেঠিমার খিঁচুনি উঠেছে আবার।

তড়িঘড়ি ছুটল, অজয়বাবু। প্রিয় স্যারের কাছে, সর্বদা অবজ্ঞার ছাত্রী, আজ মর্যাদা পেয়ে যেন চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। চুপচাপ নীরবে চলে গেল, শেষবারের মত, একাকী।

৪

এদিকে অজয় বাবু ফোন করে আর পায় না মৌমিতাকে। এ কটা দিনে একেবারে যেন মেয়ে হয়ে উঠেছিল, সে। চায়ের বাসন টুকু অবধি ধুয়ে মেজে দিয়ে যেত। বয়স্ক মাকে, মশারি টাঙিয়ে দিত। এখন সন্ধ্যে হলেই কেমন একটা একাকীত্ব নেমে আসে, বয়সের উঠোনে। সুপারি গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদ আলো ঢেলে যায়, বেনামি ফুলের উপর। বেলি ফুলের উপর, নয়নতারার উপর…অযত্নে বেড়ে উঠেছে কিছু গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, যাতায়াতের পথে। তাদেরও আলো দিয়েছে চাঁদ! কাঁঠাল, আম, পেঁপে গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে। ইদানিং শিউলির সুবাস আসে বেশ। শরৎ উঁকি দিচ্ছে, শিউলির গন্ধে। এই নিয়ে মন ভুলিয়ে রাখলেও, রাতে হঠাৎ হঠাৎ বুকে বড্ড চাপ লাগে। হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া মেয়েটার জন্য। মানুষ হারাতে হারাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও, চিরকাল হারিয়ে যাবে সবাই, এ মানিয়ে নিতে অক্ষম সে। একটা বিন্দুমাত্র পাওয়ার কিছু বস্তু পেলে মৌমাছির মৌচাকের মত আগলে রাখতে চায়। অজয়বাবুর সব ছিল, হারাবার সময়ও সব হারিয়েছে, কেবল হারায়নি, মৌমিতা ।

মৌমিতার  ফোনে কোনোভাবেই রিং হচ্ছে না। অন্য কোনো নম্বর নেই, তাই ভোর হতেই বেরিয়ে পড়লেন  অজয়বাবু। সঙ্গী ওই বহুকাল অব্যবহৃত সাইকেলটা।

মৌমিতা  যেখানে কাজ করে, সেই দোকানের কাছে বেলা অবধি বসে রইলেন  অজয়বাবু। দোকান খোলার সময় তিনি জানতে চাইলেন, “মৌমিতা  কাজে আসে?”

ছেলেটা পানের পিক পাশে ফেলে বলল, “না আসে না। শরীর খারাপ। কিছু দরকার?”

“ঠিকানা জানো ?”

“ওই তো, তারামা মেডিকেল হলের পিছনে যে কটা টালির বাড়ি আছে, তার মধ্যে একটা বাড়ি”। ছেলেটা দায়সারা উত্তর দিয়ে চলে গেল। অজয়বাবু সাইকেল চালিয়ে আবার গেলেন। কলোনির মত ছোট্ট এলাকাতে ছোট্ট ঘর, মৌমিতার কাকিমার।

“কি চাই?”

“মৌমিতা আছে ঘরে?”

“ আপনি ওই অঙ্কের স্যার”?

“মৌমিতা  বলেছে বুঝি?”

“হ্যাঁ”।

ওর কাকিমা এটা শুনে কি বলতে যেন ঘরে ঢুকে পড়ল। আবার বেরিয়ে এলো। পর্দা টেনে দিল, অন্য ঘরের।

মৌমিতার কাকিমা হলুদ চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “বসুন”। অজয়বাবু চারদিক তাকিয়ে দেখল, জিনিসপত্র মিলিয়ে মোট ঘরটা ভীষণ ঘিঞ্জি। পাপোশের চারদিক ছিঁড়ে গেছে। মেঝের সিমেন্ট ভেঙে গেছে ইতিউতি।  স্টিলের বাসন পড়ে যাওয়ার আওয়াজ এলো, বন্ধ ঘর থেকে। মৌমিতার কাকিমাকে ছুটে যেতে দেখলেন , অজয়বাবুর আর বসা হল না, চেয়ারে। ছুটে এসে দেখেন, বিছানা থেকে একরকম ঝুলে গেছে, মেয়েটা। নিচে নীল রঙের ছোট গামলা রাখা, তাতে বমি করার চেষ্টা করে চলেছে সে নিরন্তর। নাকে মাস্ক পরে, হাত গ্লাভস পরে, ওর কাকিমা বুক মালিশ করে দিচ্ছে। অজয়বাবু থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন , "ওর কি হয়েছে ?"

মেয়েটার সাড়া নেই। থেকে থেকে সাঁই সাঁই শব্দ উঠে আসছে, বাধাপ্রাপ্ত নিঃশ্বাসের। অজয়বাবু ছুটে এসে মাথাটা ধরলেন  মৌমিতার। ওর কাকিমা হাত ছিটকে দূরে সরিয়ে বলল, “করোনা হয়েছে মৌমিতার। কেন ধরলেন? মরবেন না কি?”

“তাহলে ওকে এভাবে বদ্ধ ভাবে কেন রেখেছেন?” অজয় বাবু মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন, প্রশ্নটা করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন।

“কি করব? যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা হচ্ছে সেখানে বেড ফাঁকা নেই, দুদিন ধরে বসে ছিলাম গিয়ে, কেউ নেয়নি। বাড়ি নিয়ে চলে এসেছি। প্রাইভেট নার্সিংহোমে কেউ নেবে না, নিলেও যা টাকা লাগবে আমার নেই”।

অজয়বাবু দু’চোখের পাতা মেলাতে পারছিলেন না, মৌমিতার করুণ অবস্থা দেখে। মেয়েটা বালিশের সাথে ক্রমাগত লড়াই করে চলেছে….নিশ্বাস ওর সায় দিচ্ছে না। অজয় বাবু তড়িঘড়ি ফোন করলেন, জনা কয়েক, পরিচিতদের। প্রত্যেকের থেকেই একটা অমানবিক উত্তর এলো, করোনা পেশেন্ট এডমিট নেব না। হাসপাতাল যান। ফ্রি তে সবই পাবেন। পুলিশকে জানান, কাজের কাজ হবে। ওর কাকিমা উঠে এসে একটা কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলল, “এই নার্সিংহোমে ভর্তি নেবে। পাশের বাড়ির মেয়েটা আমায় কার্ড দিয়েছিল। ও চলে গেছে, ডিউটিতে। কিন্তু আমি টাকার ভয়ে পারিনি যেতে”। অজয়বাবু একমুহূর্ত নষ্ট না করে এম্বুলেন্স ডাকলেন, ওই নার্সিংহোমের। তারা সুরক্ষার বিধি মেনেই, তুলে নিয়ে গেল মৌমিতাকে।

অজয়বাবুকে শেষ একবার চোখে দেখে নিল, মৌমিতা।

এরপর যখন মৌমিতার   জ্ঞান এসেছে, তখন দুদিন পেরিয়ে গেছে। ভালো রেসপন্স করছে মৌমিতা। একজন নার্স এগিয়ে এসে জানতে চাইল, কষ্ট হচ্ছে কিনা, ঘাড় নেড়ে না বলল মৌমিতা।  প্লাস্টিক বন্দী একটা ছোট্ট ঘর, বাইরে সাদা প্লাস্টিক মোড়া জীবন ছুটছে, জীবন বাঁচাতে। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল, বর্গক্ষেত্র আকারের কাঁচ থেকে অজয় স্যার উঁকি দিচ্ছেন। হাত নেড়ে বোঝালো সব ঠিক আছে। উঁকি দিল কাকিমাও।

বালিশে মাথা ফেলে নিস্তর জীবনের পথে যাত্রী মৌমিতা হেসে উঠল। একজন নার্স, অক্সিজেন পাইপ চেক করতে এসে, এই দৃশ্য দেখে বলল, “ভর্তির দিন থেকে উনি আছেন, কোথাও যাননি। ভীষণ ভালোবাসেন উনি”।

মৌমিতা দু’চোখ বুজে নেয়। আলতো স্বরে প্রশ্ন করে জানতে চায়, ওদের রিপোর্ট হয়েছে কিনা, নার্স জানায়, “হয়েছে, নেগেটিভ এসেছে!”

ফেসশিল্ড এবং সাদা প্লাস্টিক পরিহিত  একজন এগিয়ে এসে বিল ধরিয়ে বলল, বিকালের মধ্যে পে করে দেবেন। “পেশেন্ট এখন নরম্যাল তবুও অবজারভেশনে রেখেছি”।

মৌমিতার কাকিমার হাত থেকে বিলের অঙ্কের   রসিদ নিয়ে অজয়বাবু বেরিয়ে আসেন । মাস্ক খোলেন মুখ থেকে, এখন রাস্তা প্রায় ফাঁকা, ধুলো পিচের মারকুটে খেলার সময় চলে গেছে। বিছিয়ে আছে, শুকনো পাতা, ঝরা ফুল, দানা পাঁপড়ি! এখন একটা এটিএম দরকার।

অজয়বাবু বুঝতে পারলেন এতদিন তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের যা শিখিয়ে এসেছেন সব সিলেবাস ভিত্তিক। আর সিলেবাস ভিত্তিক পড়াশোনা দিয়ে কখনও ভালো খারাপের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। জীবনে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মানবিকতা, সততা, গুরুজনদের প্রতি সম্মান, এই সব আউট অফ সিলেবাসের বিষয়গুলি শেখার মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে ওঠে।  

একটু একটু করে অজয়বাবুর প্রায়শ্চিত্তর ওজন হালকা হচ্ছে, মৌমিতা বাড়ি ফিরলে, অজয়বাবু বলবেন ওনার প্রিয় ছাত্রীর নাম…।

সমাপ্ত

dmajumdarbu@gmail.com
পূর্ব বর্ধমান