1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label সৌরভ মুখার্জী. Show all posts
Showing posts with label সৌরভ মুখার্জী. Show all posts

Saturday, October 21, 2023

চার্চ নিয়ে চর্চা

ছবি : ইন্টারনেট

চার্চ নিয়ে চর্চা

সৌরভ মুখার্জী

পঁচিশে ডিসেম্বর আমরা চার্চে যাব।

ভুল! কলকাতার লোকেরা বেশিরভাগই যাবে ক্যাথিড্রালে। বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের পাশে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল। লন্ডনের কেউ কেউ যাবে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে। রোমের লোকেরা বেশিরভাগ লাইন দেবে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায়। কেউ কেউ যাবে সিস্টিন চ্যাপেলে। অ্যাবে, চ্যাপেল, ব্যাসিলিকা, ক্যাথিড্রাল সবগুলোকেই আমরা সোজা হিসেবে চার্চ ধরে নিই। বাংলায় বলি গির্জা। কিন্তু এদের প্রত্যেকটার ধরণ আলাদা।

এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন ধরনের গির্জা আছে। যেমন ব্যান্ডেল চার্চ আসলে ব্যাসিলিকা। কলকাতার সেন্ট পলস কিংবা কৃষ্ণনগরের চার্চ ক্যাথিড্রাল। কালিমপংয়ের ডেলোতে গ্রাহামস চার্চ প্রকৃতপক্ষে চ্যাপেল।

ক্যাথিড্রাল হল বিশপের খাস চার্চ। ক্যাথলিক কালচারে বিশপ একজন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগুরু। একজন বিশপের অধীনে অনেকগুলি চার্চ থাকে। প্রত্যেকটি চার্চের দায়িত্বে থাকেন একজন করে প্রিস্ট বা পাদ্রী। একটা বড় এলাকার জন্য একজন করে বিশপ নির্বাচন করা হয়। কয়েকজন বিশপের ওপরে থাকেন আর্চবিশপ। তাঁদের ওপরে কার্ডিন্যাল। সবার ওপরে পোপ।

যেমন কলকাতা এলাকার বর্তমান আর্চবিশপ হলেন টমাস ডিসুজা। বাহাত্তর বছর বয়সী টমাস জন্মসূত্রে কন্নড়, ২০১২ সাল থেকে এই পদ অলংকৃত করছেন। পার্ক স্ট্রিটে আর্চবিশপের জন্য বরাদ্দ সুবিশাল বাড়িতে বসবাস করেন। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই মেদিনীপুর ও উত্তর চব্বিশ পরগনার সমস্ত চার্চ তাঁর আওতাভুক্ত এলাকায় পড়ে। আর্চবিশপের নিজস্ব চার্চ হল বড়বাজারের মোস্ট হোলি রোজারি ক্যাথিড্রাল বা মুরগিহাটা চার্চ। স্বাভাবিকভাবেই এঁর অধীনে আছেন কলকাতার বিশপ। বর্তমানে কলকাতার বিশপ হলেন পরিতোষ ক্যানিং। এঁর খাস চার্চ হচ্ছে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল। অর্থাৎ ক্যাথিড্রাল হল এমন চার্চ যার দায়িত্বে একজন বিশপ বা আর্চবিশপ থাকেন। ক্যাথিড্রালে বিশপ বা আর্চবিশপের আসন থাকা বাধ্যতামূলক।

ব্যাসিলিকা হল এক বিশেষ ধরনের ক্যাথিড্রাল। রোমান বিল্ডিংয়ের মত এদের মাথা গোল, গোম্বুজাকৃতি। আয়তনে বড়। ব্যাসিলিকায় সাধারণতঃ একাধিক আইল বা করিডোর থাকে। অর্থাৎ সাধারণ চার্চে যেমন দুই সারি বেঞ্চের মাঝে একটা করিডোর থাকে, ব্যাসিলিকায় অন্তত তিন সারি বেঞ্চ থাকে। মাঝে যাতায়াত করার জন্য দুই বা ততোধিক আইল বা করিডোর। ক্যাথলিক আইন অনুসারে এইরকম ডিজাইনের ক্যাথিড্রালগুলিকে ব্যাসিলিকার মর্যাদা দেওয়া হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে চারটি প্রধান ব্যাসিলিকা (সবগুলিই রোমে) আর আঠেরোশো ছোট ব্যাসিলিকা আছে।

ভারতে আছে মোট আঠাশটি ব্যাসিলিকা, তার মধ্যে দশটিই কেরালায়। পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র ব্যাসিলিকাটি ব্যান্ডেলে, যাকে আমরা ব্যান্ডেল চার্চ নামে চিনি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চার্চ ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা, বড়দিনে স্বয়ং পোপ এই চার্চের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। 

ভারতবর্ষে খ্রিস্টধর্ম এসেছে খুব তাড়াতাড়ি। যীশুর মৃত্যুর মাত্র বাহান্ন বছরের মধ্যে। যিশুখ্রিস্টের বারোজন প্রধান শিষ্যের মধ্যে একজন টমাস দ্য অ্যাপোস্টিল মালাবার উপকূলে এসে কিছু ইহুদিকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করেন। এই ইহুদিরা যীশুর জন্মের আগে থেকেই ভারতে বসবাস করছিল। টমাসকে হত্যা করা হয় ও চেন্নাইয়ের কাছে মাইলাপুরের সেন্ট টমাস পাহাড়ে সমাধিস্ত করা হয়। প্রায় দেড় হাজার বছর পরে সেখানে চার্চ গড়ে ওঠে, এবং সেটিও একটি ব্যাসিলিকা। নাম স্যান থোম ব্যাসিলিকা। বোঝাই যাচ্ছে নামটি এসেছে সেন্ট টমাস বা থমাস থেকে।

এবার আসি চ্যাপেলের কথায়। চ্যাপেল কিছুটা প্রাইভেট চার্চের মত। কোনো প্রিস্ট বা পাদ্রী না-ও থাকতে পারেন। ধনী ব্যক্তিরা তাঁদের প্রাসাদের একদিকে দৈনন্দিন উপাসনার জন্য চ্যাপেল বানাতেন। চ্যাপেল সাধারণতঃ প্রাসাদ, হাসপাতাল, স্কুল, ফার্মহাউস সংলগ্ন হয়ে থাকে। যাঁরা ভেলোরে চিকিৎসা করাতে গেছেন নিশ্চয়ই দেখেছেন সিএমসি ভেলোর হাসপাতালের ভেতরে একটি ছোট চার্চ আছে, ঐটিও চ্যাপেল। কলকাতা বা উত্তরবঙ্গের কনভেন্ট স্কুলের মধ্যে যে চার্চ থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলি চ্যাপেল।

পৃথিবীর বিখ্যাত চ্যাপেলগুলির মধ্যে রোমের সিস্টিন চ্যাপেল উল্লেখযোগ্য। মাইকেলেঞ্জেলোর আশ্চর্য সৃষ্টি ছবি ও ভাস্কর্য আছে এই চ্যাপেলের সিলিংয়ে। এটি ভ্যাটিকানে পোপের প্রাসাদের সঙ্গে সংলগ্ন। এছাড়া প্যারিসের সেন্ট-চ্যাপেল (সঁ-স্যাপেল) গ্লাস পেইন্টিংয়ের জন্য বিখ্যাত। নিউ ইয়র্কের জন.এফ.কেনেডি এয়ারপোর্টেও যাত্রীসাধারণের জন্য একাধিক চ্যাপেল আছে। 

অ্যাবে হল তুলনামূলক বড় খ্রিস্টান মঠ না উপাসনালয়। অ্যাবেতে ধর্মীয় কাজকর্ম তো হয়ই, সঙ্গে চার্চের আয়ের দিকটিও খুব গুরুত্ব সহকারে জড়িয়ে থাকে, ফলে বেশিরভাগ অ্যাবেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন। অ্যাবেকে অনেকক্ষেত্রে “conventual church” বা প্রচলিত চার্চ আখ্যা দেওয়া হয়। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রত্যেকটি কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। রাজপরিবারের বিয়ে, করোনেশন বা রাজ্যাভিষেক, ব্যাপ্টিজম ইত্যাদি শুধু এখানেই হয়। তাই  লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে লন্ডন দর্শকদের কাছে সব সময় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তাহলে, আসন্ন বড়দিনে শীতের রোদ্দুর গায়ে মেখে কলকাতার লোকেরা ক্যাথিড্রালে যাচ্ছি। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল। আর ব্যান্ডেলের লোকজন যাব ব্যাসিলিকায়। ভুল না হয় যেন!

ঋণস্বীকার : Günther Simmermacher, Southern Cross Catholic magazine

bbc.co.uk

Wikipedia
...(সমাপ্ত)...