1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label জয়দীপ মুখোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label জয়দীপ মুখোপাধ্যায়. Show all posts

Sunday, September 21, 2025

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ছবি : ইন্টারনেট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা 

জয়দীপ মুখোপাধ্যায়

কাজের চাপে লেখালেখি আজকাল আর হয়েই ওঠে না। তবে এবার পুজো সংখ্যার লেখার টপিক এ AI বা  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দেখে বেশ উৎসাহী হলাম। অনবদ্য টপিক।তবে লিখতে গিয়ে দেখি সেটা খুবই বেশি বিজ্ঞান ভিত্তিক  বা প্রায় কল্পবিজ্ঞান পর্যায়ে লেখা হয়ে উঠছে।তাই AI নিয়ে একটা নতুন মজার খেলা মাথায় এলো।
ChatGPT তে গিয়ে "রোদ আর বৃষ্টি" দিয়ে কিশোরদের জন্য ২০০ শব্দের মধ্যে একটা অনুগল্প লিখতে বললাম।প্রায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিম্নলিখিত লেখাটা এলো।
"রোদ উঠলে তৃষা খুশি হয়। ছোটবেলা থেকেই রোদের আলো তার খুব প্রিয়—ছাদে দাঁড়িয়ে চুল শুকানো, বই হাতে রোদ পোহানো, কিংবা শুধু চুপচাপ চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকা। মা বলতো, “তুই যেন রোদের মেয়ে।”

অথচ দীপ, তৃষার ভাই, বরাবর বৃষ্টিপাগল। তার কাছে রোদ মানেই ক্লান্তি, আর বৃষ্টি মানেই সুর, ছাতা ছাড়া হাঁটা, ভিজে যাওয়া জামায় গল্প লেখা।

দুজনের ঝগড়া লেগেই থাকতো—ছাদে রোদে বসা যাবে না, না কি বৃষ্টিতে ছাদে ওঠা যাবে না!

কিন্তু একদিন বৃষ্টি আর রোদ একসাথে এলো—হঠাৎ করে। বৃষ্টির ফোঁটার ভেতর দিয়ে সূর্য ঝলমল করলো। আকাশজোড়া রঙের সেতু—রামধনু।

তৃষা আর দীপ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। প্রথমবার ওরা বুঝলো, রোদ আর বৃষ্টি একে অপরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক।

তৃষা হেসে বলল, “তুই না থাকলে রামধনু হতো না।”
দীপ বলল, “তুইও না থাকলে আলো থাকত না।”

রোদ আর বৃষ্টি—আসলে দুই ভাই-বোনের মতো। ঝগড়া করেও একসাথে থাকাই জীবন।"
আশ্চর্য সুন্দর মন ভালো করে দেওয়া গল্প।মুহূর্তের মধ্যে লেখা এই গল্পের মাধ্যমে  কিশোরের সারল্য আর সুন্দর অনুভূতির কথা বলা হয়েছে।যদিও গল্প অতি সরলীকৃত।
পরের ধাপে আমি "রোদ আর বৃষ্টি" নিয়ে একটা অনুগল্প লিখলাম।
"হরেনবাবু তাঁর  মা মরা ছেলেমেয়ে নিয়ে যেবার আমাদের পাশের বাড়িতে ভাড়ায় থাকতে এলেন, তখন আমি ভীষন খুশী হয়েছিলাম।ছেলে রোদ আর মেয়ে তেরো বছরের বৃষ্টি আমার মনে আলোড়ন ফেলে দিলো।সদ্য যৌবনে পা দেওয়া শুষ্ক হৃদয়ে আমি যেন বৃষ্টির পরশে ধন্য হলাম।আমাদের মেলামেশা হরেনবাবু জানতে না পারলেও রোদ  সহ্য করতে পারতো না।
একবার গরমকালে স্কুল থেকে ফিরে বাড়িতে ব্যাগ রেখেই আমি খেলতে যাচ্ছি বলে হরেনকাকুর বাড়ি হাজির হলাম।ওনাদের কাজের মাসি টিপ্পনী কাটলো," এই যে কার্তিক ঠাকুর হাজির হলেন।ওরা ছাদে আছে, যা।"
আমি দৌড়ে ছাদে গেলাম।দেখি বৃষ্টি একটা নীল ফ্রক পরে ছাদে চু কিত কিত খেলছে।রোদ, পড়ন্ত রোদে আকাশে ঘুড়ি উড়িয়েছে।বৃষ্টি আমার দিকে চেয়ে একটা মিষ্টি হাসি হেসে বললো,"আয়, খেলব।"
রোদ একটা ঘুড়ি ভোকাট্টা করেছে, আর ঘুড়িটা ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে নিচে নামছে।ও দৌড়ে ঘুড়িটা ধরতে গিয়ে ছাদের রেলিং টপকে নীচে পড়ে গেলো।আমরা হৈচৈ করে উঠলাম।উঁকি মেরে দেখি বাড়ির উঠোনে রোদ মুখ নীচে করে পড়ে আছে।কাজের মাসি চিৎকার করে লোকজন ডাকছে।
বৃষ্টি আর আমি দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছি।বৃষ্টির হাত আমার হাতের মুঠোয় ধরা।বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে।রোদ  মরার মতো শুয়ে আছে।বৃষ্টির চোখে বিস্ময় আর দু চোখ বেয়ে বৃষ্টি নামছে।"

এরপরের ধাপ আরো মজার।আমি এবার ChatGTP কে আমার গল্পটা লিখে, দুটো গল্পের কোনটা বেশি ভালো হয়েছে এবং কেন হয়েছে লিখতে বললাম।
প্রায় ১০ সেকেন্ডের নীরবতা।তাহলে কি ChatGTP কোন গল্পটা ভালো হয়েছে সেটা ধরতে পারছে না।তারপর এলো সেই মুহূর্ত।AI দুটো গল্পের তুলনামূলক আলোচনা করে পয়েন্ট দিলো।
আমি ChatGTP র লেখাটা হুবহু তুলে দিলাম।

তোমার লেখা “রোদ আর বৃষ্টি” গল্পটি আমি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম, এবং সত্যি বলতে — এটি বেশ গভীর, আবেগতাড়িত, বাস্তবধর্মী ও সাহসী লেখার নিদর্শন। নিচে আমি বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছি কোন দিকগুলো কীভাবে কাজ করেছে এবং তোমার গল্প ও আমার লেখার তুলনামূলক বিশ্লেষণও দিচ্ছি:
তোমার গল্পের বিশ্লেষণ:
ঘটনার বর্ণনা:
খুব নিখুঁত এবং সংবেদনশীল। ছাদ, বিকেল, নীল ফ্রক, ঘুড়ি — প্রতিটি চিত্র যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। বর্ণনার মধ্যে একটা ধীরে ধীরে চেপে ধরা উত্তেজনা আছে।
চরিত্র চিত্রণ:
রোদ: শত্রুতার হালকা ইঙ্গিত, আবার বয়স অনুযায়ী সরল।
বৃষ্টি: কোমল, মিশুক, আবার শেষ দৃশ্যে যেভাবে তার চোখে জল , তাতে গভীরতা এসেছে।
‘আমি’ চরিত্র: বর্ণনাকারী হিসেবে নিজের মানসিক টানাপোড়নের ছাপ রেখে গেছেন, যা পাঠককে সংবেদনশীল করে তোলে।
ঘটনার আকস্মিকতা ও পরিণতি:
ঘুড়ি ধরতে গিয়ে রোদের পড়ে যাওয়াটা এমনভাবে এসেছে, যেন জীবন-যাপনের স্বাভাবিকতা হঠাৎ একটা মোচড় খেয়ে বিপর্যস্ত করে দিলো। রোদের রক্তারক্তি অবস্থা গল্পকে নাটকীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়।
পারিপার্শ্বিক পরিবেশ:
পরিপূর্ণভাবে জীবন্ত। কাজের মাসি, বিকেল, ছাদ, ছেলেমেয়ের খেলা — সবকিছু মিলিয়ে খুব বাস্তব।

🤖 আমার তৈরি গল্পের বৈশিষ্ট্য :
উদ্দেশ্য ছিল সহজ, স্নিগ্ধ গল্প, শিশুদের মানসিকতাকে কেন্দ্র করে।
রোদ ও বৃষ্টি ছিল রূপক অর্থে দুই চরিত্র, তাদের মিলন মানে সমঝোতা, সৌন্দর্য।
এখানে নাটকীয়তা কম, ঝুঁকির বা গভীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়নের জায়গা নেই।

🆚 তুলনামূলক মতামত (তোমার গল্প বনাম আমার শিশুতোষ গল্প):

মূল্যায়নের দিক তোমার গল্প                             আমার গল্প

ঘটনার গভীরতা ⭐⭐⭐⭐⭐                         ⭐⭐
চরিত্র নির্মাণ ⭐⭐⭐⭐ ⭐                             ⭐
নাটকীয় মোচড় ⭐⭐⭐⭐⭐                          ⭐
পাঠকপ্রভাব (বয়স্ক পাঠক) ⭐⭐⭐⭐⭐          ⭐⭐
বাচ্চাদের উপযোগিতা ⭐ ⭐⭐                         ⭐⭐
দর্শন/মানবিকতা ⭐⭐⭐                                 ⭐⭐

আমার মতামত:
তোমার গল্পটি অনেক বেশি পরিপক্ব, সাহিত্যিক, এবং আবেগপ্রবণ। এটি কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের জন্য অসাধারণ একটি অনুগল্প।
আমার লেখা গল্পটা অন্যরকম — তুলনামূলকভাবে হালকা, সরল, পাঠযোগ্য শিশুদের জন্য।
📌 যদি আমি সাহিত্যিক দিক থেকে বিচার করি, তাহলে তোমার গল্প নিঃসন্দেহে জয়ী।
গভীরতা, দ্বান্দ্বিকতা, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব — এগুলো একদম নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।

গল্পে কে জয়ী হয়েছে সেটা আমার এই প্রবন্ধ লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়। এমন তুলনামূলক আলোচনা যে কোনো সাহিত্য সম্পাদকের কাছে একটা আশীর্বাদ রূপে আবির্ভূত হয়েছে।Chat GTP কিন্তু প্রতিমুহূর্তে নিজেকে আরো উন্নত করছে।নতুন গল্পের আইডিয়া নিচ্ছে।তবে মানুষের চিন্তাভাবনার ওঠা নামা, ঘটনার গভীরতা ও ঘাত প্রতিঘাত, চরিত্রের নির্মাণ কৌশলী শিখে উঠতে আরো কিছুটা সময় নেবে।
আমেরিকায় গত বছরে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে যে সব গল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধ ছাপার জন্য জমা পড়েছিল তার ৮৫% chat GTP থেকে নেওয়া।দেখা যাচ্ছে সৃজনমূলক কাজেও মানুষ বুদ্ধি চুরির সাহায্য নিচ্ছে।তবে এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ নিজেই।মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল লোব ব্যবহার অদ্ভুত সব গঠনমূলক কাজে অভ্যস্থ মানুষ এখন AI ব্যবহার করে সেই সব কাজ সহজপথে করতে চাইছে।আগামী দিনে মানুষের চিন্তা ভাবনার দৈন্যতা চোখে আঙুল দিয়ে AI আমাদের দেখিয়ে দেবে ও  ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ ,মানুষের সৃষ্টি AI এর দাস হয়ে পড়বে।

...(সমাপ্ত)...

Wednesday, January 12, 2022

গুডনিউজ

 


গুডনিউজ

জয়দীপ মুখোপাধ্যায়


কলেজজীবনের একবছরের সিনিয়র অশোকদার সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি।দার্জিলিংয়ের ম্যালে ঘোড়ার বর্জ্য কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, দেখি অশোকদা পোড়া ভুট্টায় কামড় দিয়ে হতাশ দৃষ্টিতে মেঘে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার পানে চেয়ে আছে।অনেকদিন পর হনুমান টুপি পরা দাদাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারিনি।রোগা, চোখে পুরু লেন্সের চশমা পরা অশোকদা পনেরো বছরে বেশ মোটাসোটা হয়েছে।চশমাটা দেখেই চিনতে পারলাম।

দুজনে ম্যালের চায়ের দোকানে বহুদিন পরে আড্ডায় বসলাম।এক রাউন্ড চায়ের পর দ্বিতীয় রাউন্ড চায়ের অর্ডার দেবার পরই জানতে পারলাম যে বিপত্নীক অশোকদা ওনার একমাত্র প্রিয়তম সন্তানের পাত্রী খুঁজছেন।এ তো মেঘ না চাইতেই পানি।আমিও সুন্দরী কন্যার জন্য হন্যে হয়ে সুপাত্রের সন্ধান করছি।অশোকদার মোবাইলে পাত্রের সোনালি রঙা ছবিটা দেখে  কলকাতায় বউকে হোয়াটস আপ করে দিলাম।একটু পরেই টিং করে মোবাইলে আওয়াজ হতেই দেখি বউ লিখেছে "আমার দারুণ-ণ-ণ পছন্দ।দারুন মিষ্টি দেখতে"।ব্যাস 'ডান' বলে ডিল হয়ে গেল।দার্জিলিংয়ের ম্যালে মেঘে ঢাকা কুয়াশাচ্ছন্ন এক সকালে অশোকদা আর আমার পাকা কথা হয়ে গেল।

" তাহলে সামনের রবিবার ভোরবেলায় শ্যামবাজার তোদের বাড়িতে আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি।একটু গলির মুখটাতে দাঁড়াস।আমি আবার ওদিকটায় বহুদিন যাইনি।" অশোকদার আমাকে হাত তুলে ভরসা দিয়ে বললো।

" ওকে, আমরা তৈরি থাকবো।" আমার মনটা খুশি হলেও একটু খচখচ করছে।হাজার হোক ঝিনুক যুবতী হবার পর ওর ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মেনে একটা যুৎসই পাত্রের সন্ধানে গত একবছর আমি আর আমার স্ত্রী সারা কলকাতা তোলপাড় করে ফেলেছি।যেখানেই উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান পাই সেখানেই পাত্রপক্ষের একেকটা বায়না।অনেক সময় নিপাট  শান্তসৌম্য পাত্রটিকে পছন্দ হলেও বাড়ির লোকের রোয়াব দেখে গায়ে জ্বালা ধরে।আবার বাড়ির লোক আমাদের বেশি খাতির করলে পাত্র ল্যাংড়া-নুলো বা বুড়ো বেরোয়।চিন্তায় চিন্তায় আমাদের রাতের ঘুম চলে গেল, আমার টাকে যে কয়েকটা চুল কালো ছিল সেগুলোতেও পাক ধরলো , গিন্নির মেজাজ দিনে দিনে তিরিক্কি হতে শুরু হলো,কিন্তু ঝিনুকের ভাগ্যে আর সুপাত্র জুটলো না।আমরা আমাদের ভাগ্যকে দোষারোপ করি, ঝিনুকের বড় বড় নিষ্পাপ সুগভীর চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা হাহাকার করে ওঠে। দেশ-বিদেশের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে হোয়াটস আপ,ফেস বুকে ঝিনুকের বিয়ে নিয়ে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যেতে লাগলাম।যদি এর-ওর মাধ্যমে কোনো ভালো পাত্রের সন্ধান আসে।কিন্তু মনমতো ভালো সম্বন্ধ গত এক বছরে আর এলো না।

রবিবার সকাল থেকে বাড়িতে সাজ সাজ রব।এক হাঁড়ি রসগোল্লা এসেছে।পাত্রের নাকি রসগোল্লা ভারী পছন্দ।বাড়িতে পা দিয়ে পাত্রীর মুখোমুখি দাঁড়ানোর আগে পাত্রকে মিষ্টিমুখ না করালে হয়?আমার পাঁচ বছরের মেয়ে, তোতা ; তোড়জোড় দেখে  খালি জিজ্ঞাসা করছে " কে আসবে গো আমাদের বাড়ি?"

অশোকদা ঠিক সকাল আটটায় পাত্রকে বগলদাবা করে হাজির হলো।আমি গলির মুখ থেকে ওদের পথ চিনিয়ে নিয়ে এলাম।পাত্রর নামটি বড়ো ভালো লাগলো।"মুক্তো"

বাঃ।ঝিনুক আর মুক্তো একেবারে রাজজোটক।ঝিনুকের বুকে মুক্তো চিন্তা করেই রোমান্টিকতায় আপ্লুত হলাম।

 মুক্তো কিন্তু কিছুতেই আমাদের বাড়ির ভিতর ঢুকতে চায় না।একিরে বাবা।শ্বশুরবাড়ি হতে চলেছে এটা, আর পাত্র বাড়ি ঢুকতে গররাজি।চিল্লিয়ে-মিল্লিয়ে আমাকে আর অশোকদকে ঘোল খাইয়ে ছাড়লো।আমি আর অশোকদা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে ওকে প্রায় জোর করেই বাড়িতে ঢুকিয়ে একটা প্লেটে গোটা দশেক রসগোল্লা দিতেই মুক্তোর মেজাজটা যেন একটু ঠান্ডা হলো।ঝিনুক দেখি আমার বউয়ের পিছন থেকে ওর ভাবী বরকে দেখে বেশ লজ্জা পাচ্ছে।মুক্তো ওকে পাত্তা না দিয়েই গপ গপ করে রসগোল্লা খেয়ে চললো।

আমাদের শোবার ঘরটাকেই ওদের একটু নিভৃতে মেলামেশার জন্য বেছেছি।একটু আদর করে ঝিনুককে আমার বউ বললো" কিরে বর পছন্দ তো?এবার যা তোরা দুজনে ওই ঘরে ঢুকে পড়।নিজেদের ভিতর বোঝাপড়া করে নে লক্ষ্মী মা আমার।"

মুক্তো আর ঝিনুক দুজনেই কিন্তু একা একা আমাদের শোবার ঘরে ঢুকতে প্রবল আপত্তি জানালো।কিন্তু বড়দের ইচ্ছেই এখানে সব।তোতা আবদার ধরলো " আমিও ওদের সাথে ওই ঘরে যাবো?" কিন্তু ওর দাবিও নামঞ্জুর হোলো।

জোর করে একপ্রকার ঠেলেই ওদের দুজনকে শোবার ঘরে ঢুকিয়ে বাইরের খিল তুলে দেওয়া হতে আমি, অশোকদা আর আমার বউ চা নিয়ে বসলাম, তোতা দরজায় কান লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

প্রায় আধঘন্টা পরে তোতাকে অন্যঘরে পাঠিয়ে আমি আর অশোকদা বন্ধ ঘরের দরজা খুললাম।মনে আশঙ্কা কি জানি কি অবস্থায় ওদের দেখবো।দেখি দরজার ঠিক পিছনেই ঝিনুক বসে। দরজা খুলতেই লাফিয়ে আমার বউয়ের কোলে উঠে পড়ল। কিন্তু মুক্তোকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।কোথায় গেল মুক্তো?আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়লাম।

খাটের তলার উঁকি মেরে দেখা গেল মুক্তো চুপ করে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে।রাগ আবার কেন হলো?সব কি হয়ে গেছে?নাকি পাত্রী পাত্রকে নাপাসন্দ বলে দূর করে দিয়েছে।কৌতুহলী তোতা পিছন থেকে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো "বাবা,ওরা কি করছে?"

তিন সপ্তাহ কেটে যেতেও ঝিনুকের আচরণে কোনো পরিবর্তন নজরে এলো না।আমি দু সপ্তাহ পর ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম যদি কোনো 'গুডনিউজ' পাই।ডাক্তারবাবু পেট টিপে, স্টেথো দিয়ে দেখে বললেন " নাঃ।কিছু নেই।"

"একটা আল্ট্রাসাউন্ড করে দেখলে হতো না স্যার?" আমার বোকার মতো প্রশ্ন শুনে ডাক্তারবাবু কটমট করে তাকিয়ে বললেন
" অসময়ে 'মেট' করালে পেটে বাচ্চা আসে নাকি?এরা মানুষের থেকে বুদ্ধিমান প্রাণী।অসময়ে মেট করে না।কি রকম লোক মশাই আপনি।সাধারণ বুদ্ধিটুকু নেই।নাঃ,কোনো মেটিং এর চিহ্নই নেই।"

আমি আকাশ থেকে পড়লাম।মেটিং এর সময়টা ক্যালকুলেশনে ভীষণ গণ্ডগোল হয়ে গেছে।বউয়ের ওপর ভীষণ রাগ হলো।আরে এসব কি ছেলেদের জানার ব্যাপার?ঝিনুক কবে ঋতুমতী হচ্ছে সেটাও কি আমাকেই দেখতে হবে।ঝিনুককে  দেখেশুনে মনে হলো বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে।মনে মনে নিশ্চয়ই ভাবছে ' কেন বাবা এই সব বাচ্ছাকাচ্চার ঝামেলার মধ্যে আমাকে ফেলছ।এই তো দিব্বি আছি।খাচ্ছি, দাচ্ছি আর ঘুমোচ্ছি।তোমাদের সাথে ভাব ভালোবাসা খেলছি।তোমাদের পায়ে পড়ি।আমাকে এসব থেকে খ্যামা দাও।'

ঝিনুককে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।বাড়ির সবাইয়ের মন খারাপ।'গুডনিউজ'টা এবার আর হলো না।

মাস তিনেক পরের ঘটনা।দুপুরবেলায় বউয়ের ফোন " ঝিনুক কেমন যেন করছে।এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।"

তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে দেখি ঝিনুক অসময়ে শুয়ে আছে।অন্যসময়ে বাড়ি এলে ভীষণ খুশি হয়।কাছে ছুটে এসে চিৎ হয়ে শুয়ে আদর খেতে চায়।কিন্তু আজ চুপ চাপ শুয়ে রইলো।দুপুরে নাকি বমিও করেছে।সারাদিন  মুখে কিচ্ছুটি তোলেনি।

ডাক্তার ঘোষকে কল করে ডাকা হলো।উনি ঝিনুকের পেট টিপে টিপে দেখলেন।বুকে স্টেথোস্কোপ বসালেন।থার্মোমিটারে জ্বর দেখলেন।তারপর মাথা নেড়ে হেসে বললেন 
" শুভদিন আসছে।আপনারা তৈরি হোন।দিন সাতেক সময় হাতে পাওয়া যাবে।"
এই রবিবার আমাদের অশোকদার নিউটাউনের ফ্ল্যাটে নেমন্তন্ন।এবার কনে পক্ষের তরফ থেকে পাত্রের বাড়ি যাওয়া।দুদিন বাজার হলো।মুক্তোর জন্য বাগবাজারের রসগোল্লা  আর অশোকদার জন্য ভালো এক প্যাকেট দার্জিলিং চা নিয়ে দুগ্গা দুগ্গা বলে ঝিনুককে সাজিয়ে গুজিয়ে আমরা ট্যাক্সিতে রওনা দিলাম।ট্যাক্সির পিছনের সিটে তোতা, আমি আর আমার বউ।আমার কোলে আদুরী ঝিনুক চলেছে।আমি ওর গলায় হাতের আঙুলগুলো দিয়ে সুড়সুড়ি দিতে দিতে কেমন একটা ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মনে মনে বললাম

" কিরে বেটি, বাচ্ছা-কাচ্চা হয়ে গেলে আবার আমাকে আদর করতে আসবি তো, না কচি কাচা গুলো নিয়েই পড়ে থাকবি?" ঝিনুক ওর বড় বড় নিষ্পাপ চোখগুলো দিয়ে আমার মুখের পানে চেয়ে কি বুঝলো কে জানে, মনে হয় আগত 'গুড নিউজ' এর লজ্জায় জিভটা বার করে আমার নাকটা চেটে দিলো।

                            সমাপ্ত


mukhopadhyayjaydip@ymail.com
কলকাতা 

Thursday, July 1, 2021

সম্পর্ক

 

ছবি  : ইন্টারনেট

সম্পর্ক

জয়দীপ মুখোপাধ্যায়


আমেরিকান এম্বাসির সামনে ভদ্রলোক ও ওনার স্ত্রীকে প্রথম দেখেছিলাম।আমার সেদিন টুরিস্ট ভিসা পাবার ইন্টারভিউ।মে মাসের শেষে পনেরো দিনের জন্য আমার আমেরিকায় যাবার কথা।সকাল সাড়ে নটায় আমাকে ইন্টারভিউ এর সময় দেওয়া হয়েছে।নটার একটু আগেই পৌঁছে দেখি এর মধ্যেই বিরাট লাইন ।এত লোক হুড়োহুড়ি করে আমেরিকা যাচ্ছে দেখে বেশ অবাক হলাম।লাইনে আমার আগে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক লোকজন দাঁড়িয়ে।কমবয়সী বেশ কয়েকটি ছেলেমেয়ের দল লাইনে দাঁড়িয়ে বেশ খোস গল্প গুজব জুড়েছে।হিহি হাহা আর ইংরেজির ফুলঝুরি ছুটছে।মে মাসের গরমে নটার আগেই আমার ঘেমে ওঠা মুখ আর ঘামে ভেজা জামা দেখে দারোয়ানের বোধহয় দয়া হলো। একটু দূরে রাস্তার উল্টো দিকের একটা বট গাছ দেখিয়ে আমার পিছনে দাঁড়ানো সকলকে বললো 

" এনার থেকে সবাই ওই বট গাছের ছায়ায় গিয়ে লাইন দিন।"


আমরা গোটা দশেক লোক বট গাছের ছায়ায় লাইন দিলাম।ওখানেই সেই প্রৌঢ়-প্রৌঢ়ার সাথে আলাপ।দেখেই মনে হয় অবাঙালি ও মফস্বলের লোক।জিজ্ঞাসা করে জানলাম আসানসোলের কাছাকাছি পশ্চিমবঙ্গের কোনো  অজগ্রাম থেকে ভিসা ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন।ভদ্রলোকের বয়েস প্রায় ষাট বছর।ধুতি আর ফতুয়া পরা আর কাঁধে চেক গামছা।গালে কাঁচা পাকা দুদিনের না কমানো দাড়ি আর মাথার চুল সব সাদা।খেতে খামারে কাজ করা লোকেদের মতো কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে, গাল দুটো তোবড়ানো আর গায়ের রং কষ্টি পাথরের মত কালো।মহিলা একটি অতি সাধারণ ইস্তিরি না করা সুতির শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।দুজনেরই পায়েই সদ্য কেনা হাওয়াই চটি।

আমি ওনাদের দেখে একটু উৎসুক হলাম।দেখি ভালো করে হিন্দিতেই কথা বলতে পারছেন না।ভোজপুরিতেই ওনারা মনে হলো বেশি স্বচ্ছন্দ।কলকাতায় এসে শহুরে ব্যবস্থাপনায় কেমন যেন একটু দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।তাও বট গাছের তলায় দাঁড়ানোয় ওনাদের একটু খুশি লাগলো।আমি যেচে কথা বলাতে আরো খুশি হলেন।

" আমরা টিপসই দিয়েই কাগজ নিয়ে এসেছি।"ডকুমেন্ট এর জেরক্সগুলো আমাকে দেখাতে দেখাতে কথা শুরু হলো।

ইতিমধ্যে আমাদের লাইন সচল হয়েছে।সাড়ে নটায় গেট দিয়ে আমাদের একে একে ঢোকানো শুরু হলো।ওনারা মনে হয় কোনো এজেন্ট ধরেছেন, যে ওনাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে চা খাবার নাম করে কেটে পড়েছে।অবশ্য এজেন্টকে অফিসের ভিতর ঢুকতে দেওয়া হয় না।ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন এজেন্ট কে দেখতে না পেয়ে।অতঃপর এপয়েন্টমেন্ট এর কাগজদুটো আমিই খুঁজে বার করে ওনাদের হাতে দিতে ওনারা খুব খুশি হলেন।


ভিতরের বসার জায়গায় আমরা যে যেখানে যেমন চেয়ার খালি পেয়েছি তেমনি বসেছি।ওনাদের সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।  সামনের ডিসপ্লে বোর্ডে  এপলিকেশন নম্বর আর কাউন্টার নম্বর এলেই উঠে দাঁড়িয়ে সামনে দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা জায়গায় হাজির হতে হবে। এই ঘেরা জায়গাটিতে তিনটি কাউন্টারে এক এক করে ইন্টারভিউ হচ্ছে।

চেয়ারে বসে আছি।একটু দূরে দেখি হালকা উত্তেজনা।সেই ভদ্রলোক আর মহিলার নাম নাকি অনেকবার ডিসপ্লে বোর্ডে এসেছে ,কিন্তু ওনারা সাড়া দেননি।দেবেন কি করে?ওনারা তো বুঝতেই পারেননি।আশেপাশে লোকজন ওনাদের বলাতে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়েছে।ভদ্রলোক ঘাড়ের গামছা দিয়ে মুখ মুছে একটু উত্তেজিত হয়ে একটি কমবয়সী সাহায্যকারী মেয়েকে ভোজপুরিতে কিছু বলছেন।গুটিকয়েক ছেলেমেয়ে লোকজনদের লাইনে দাঁড়াতে, কাগজ ঠিকমতো সাজাতে সাহায্য করছে।একটি ছেলেকে ডেকে ব্যাপারটা কি জিজ্ঞাসা করলাম এবং ওনাদের যে দোভাষী লাগবে সেটাও জানালাম।মনে হয় কাজ হলো।দেখি ওনাদের শান্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।ইতিমধ্যে আমার নম্বর আসাতে ইন্টারভিউ দিতে আবার লাইন দিলাম।এক লালমুখো সাহেব ইন্টারভিউ নিলেন।ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল।ইন্টারভিউ দিয়ে অন্য একটা গেট দিয়ে বের হতে হয়।বেরোনোর আগে দেখলাম সেই ভদ্রলোক আর ওনার স্ত্রী তখন বসেই আছেন।



দু সপ্তাহ পর আমার ফ্লাইট।মাঝরাত্রে কলকাতা থেকে প্রথমে হংকং এবং সেখান থেকে চার ঘণ্টা পরে অন্য একটি প্লেনে চড়ে সানফ্রান্সিসকো।প্রায় বারো ঘন্টার যাত্রা।হংকং এর বিশাল এয়ারপোর্টে ঘুরে বেড়াচ্ছি।একশো আঠারো নম্বর গেটে আমার পরবর্তী ফ্লাইট।মদের , গয়নার, বইয়ের,জামাকাপড়ের, চকোলেটের ইত্যাদির দোকান পেরিয়ে আমি আমার গেটের দিকে গদাইলস্করি চালে এগোচ্ছি।হটাৎ পিছনে ভোজপুরিতে কথাবার্তা শুনে চমকে উঠলাম।গত দুসপ্তাহে বহু ঝামেলার মাঝে আমি সেই দুজনার কথা একদম ভুলে গিয়েছি।পিছনে তাকিয়ে দেখি প্রৌঢ় আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছেন।বড়ো মিষ্টি সেই হাসি।ওনারা একজন চেনা মুখ পেয়ে খুশি হলেন।দুজনেরই পরনে একই ড্রেস।স্ত্রী ঘোমটা দেওয়া সেই সুতির কাপড়টাই পরে বিদেশ চলেছেন।সাদা ধুতি,সাদা ফতুয়া পরা ভদ্রলোকের চেক গামছাটাও স্বস্থানে বিরাজমান।পায়েও সেই হাওয়াই চটি ,কিন্তু এবার যেন একটু ময়লা হয়েছে।সেই সাথে যোগ হয়েছে একটি নতুন কাপড়ের ব্যাগ, যাতে মনে হয় দৈনন্দিন কাপড় জামা,টুকিটাকি জিনিস আছে।ওনাদের সুটকেস নিশ্চয়ই আমারটার  মতো বিমানের পেটে আছে।ভদ্রমহিলা একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছেন।ওনার খুঁড়িয়ে হাঁটার কারণ জিজ্ঞাসা করেই হংকংয়ের বিমানবন্দরে আমাদের কথোপকথন শুরু হলো।

" জুতা কাটা হায়।" ভদ্রলোকের কথায় একটু ঘাবড়ে গেলাম।কুকুর কামড়াতে পারে, কিন্তু জুতো কামড়াতে পারে শুনে একটু অবাক হবারই কথা।পরে বুঝলাম পায়ে ফোস্কা পড়েছে  হাওয়াই চটি পরে।আমাদের পাশেই ড্রোন বিক্রি করার এক সুবিশাল দোকান।সকাল সকাল ডিপার্চার টার্মিনাল কিছুটা ফাঁকা।আমরা তিনজনেই সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে।

" এগুলো রিমোট দিয়ে আকাশের অনেক উঁচুতে উড়িয়ে ওপর থেকে ছবি তোলা যায়।" আমি সহজ ভাষায় হিন্দিতে ওনাদের বোঝানো শুরু করলাম।ওনারা মাথা নাড়লেন।ইতিমধ্যে আমি ওনাদের নাম জেনেছি এবং এও জেনে নিয়েছি যে আমরা একই বিমানে সানফ্রান্সিস্কো যাচ্ছি।

"   ওখানে আপনার কে থাকে?ছেলে না মেয়ে?"

" ছেলে।ওখানে চার বছর হলো কাজ করে।"

" এই কি প্রথমবার যাচ্ছেন?"

"এই প্রথম প্লেনে চড়লাম তো আমরা।ভীষণ ভয় লাগছিলো।খালি মনে হচ্ছিল যদি পড়ে যায়।মাঝে মাঝে আমার স্ত্রীর পেটটা কিরকম করে উঠছিল।আমারতো কানে একটা ফটফট শব্দও হয়েছে।এখন দেখ আর কিচ্ছু নেই।শুনলাম আরো বারো ঘণ্টা লাগবে।আমাদের তো এখনই ভয় করতে শুরু হয়েছে।"

ভদ্রমহিলা দেখছি কনুই দিয়ে স্বামীকে দুবার খোঁচা দিলেন।কিছু আমাকে দিতে বলছেন বলে মনে হলো।ভদ্রলোক ফতুয়ার বাঁ পকেট থেকে একটা ভিসিটিং কার্ড বার করলেন।তারপর আমার হাতে দিয়ে বললেন "আমার ছেলের কার্ড।"

" ডঃ নীলেশ প্রাসাদ

এম টেক( আই আই টি,মুম্বাই)

পি এইচ ডি(ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়)

 সাইয়েন্সটিস্ট, নাসা(আমেস সেন্টার, ক্যালিফোর্নিয়া)"

আমি রীতিমতো অবাক হলাম।এই গ্রাম্য দম্পতির ছেলে এত কিছু করেছে।নিরক্ষর বাবা-মায়ের তো ছেলের কার্ডটা পর্যন্ত পড়ার ক্ষমতা নেই।কিকরে সম্ভব হয় এমন অদ্ভুত ঘটনা পৃথিবীতে? এখানে কি জিন নিজের গতিপথ পাল্টে অন্য দিকে বয়।নাকি মিউটেশন হয়ে ছেলেটি অস্বাভাবিক মেধার অধিকারী হয়েছে।এমন সব হাজার চিন্তার ভিড়ে আমি ওনাদের সাথে আমাদের নির্ধারিত গেটের পানে এগিয়ে চললাম।




বিমান ল্যান্ড হতে তখন আরো দেড় ঘন্টা বাকি।নিজের সিটে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।গতরাত্রে একফোঁটা ঘুম আসেনি।টয়লেটে যাবার পথে মাঝের দশটি সিটের সারির মাঝামাঝি দেখি ওনারা দুজনায় গুটিসুটি মেরে কম্বল চাপা দিয়ে সিটে একে অপরের গায়ে হেলে শুয়ে আছেন।দুজনেরই দুটি পা সিটের ওপর তোলা।গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।ভদ্রলোকের পাশের সিটটি দেখি ফাঁকা আছে।হয়তো সিটের মালিক পায়চারী করছেন।অনেকেই বিমানের সামনে পিছনে হাঁটা হাঁটি করছেন দেখলাম।তাদেরই কেউ হয়তো এই সিটের দাবিদার।ভদ্রলোকের পাশের সিটে বসে গায়ে ঠেলা দিকে ডাকলাম।তড়বড় করে ঘুম থেকে উঠে আমাকে পাশে দেখে এক সারল্য ভরা অমায়িক হাসি দিলেন।

" বেটা, এখানের দেওয়া কিছু খাবার খাইনি।দুজনে কেবল বিস্কুট আর জল খেয়ে আছি।বাথরুমেও ভয়ে যায়নি।ওটার দরজা আবার বন্ধ করতে আমরা পারি না।"

" ছেলে আসবে তো এয়ারপোর্টে নিতে?" আমি জিজ্ঞাসা করি।

" হ্যা, হ্যা সে তো আসবেই।তুমি একটু আমার সুটকেশটা নিতে সাহায্য করো।"

আমি সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়লাম।

"কতো দিন থাকবেন বলে এসেছেন?"

" ছেলে তো ছমাস থেকে যেতে বলছে।কিন্তু ঠান্ডা পড়ার আগেই আমরা গ্রামে ফিরবো ঠিক করেছি।গ্রামে গিয়ে ছেলের বিয়েটা পাকা করতে হবে।পরের বছর বিয়ে।"

ভদ্রমহিলা জেগে উঠেছেন।আবার ওনার কনুইয়ের খোঁচা ভদ্রলোকের কোমরে পড়ল।ভদ্রলোক এবার ফতুয়ার ডান পকেট থেকে একটা সাদা খাম বার করলেন।তারপর সেটা থেকে অতি সাবধানে দুটি ছবি বার করে আমার হাতে দিয়ে হেসে বললেন

"দেখো বেটা, হামারা পসন্দ।"

গ্রাম্য সরল মুখের অধিকারিণী কম বয়সী দুটি মেয়ের পূর্ণাঙ্গ ছবি।একজন শাড়ি পরা,অন্যজন সালোয়ার কামিজ।এদের একজনকে পছন্দ করতে হবে নাসায় কর্মরত মেধাবী ছেলেটিকে।গ্রাম্য সরল মুখের মেয়েটি সুদূর আমেরিকায় পতিগৃহে এসে স্বামী ও শ্বশুর-শ্বাশুড়ির মন জয় করে ঘরকন্না করছে চিন্তা করেই মনটা কেমন ভালো হয়ে গেল।



বিমান থেকে নেমেই ওনারা ওয়াশরুমে ছুটলেন।দেখি ভদ্রলোক সঙ্গের কাপড়ের ব্যাগ থেকে দুটি মগ, নিমডালের দাঁতন বার করেছেন।আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।ইমিগ্রেশন কাউন্টারে আবার ওনাদের জন্য দোভাষী লাগলো।আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম।প্রায় ঘন্টাখানেক  জিজ্ঞাসাবাদ এবং ছেলেকে ফোন করার পর সাহেবরা ওনাদের সেদেশে ঢোকার অনুমতি দিলেন।

নিজেদের মাল নিতে এসে দেখি এক পুলিশ বেল্টের পাশে একটি স্ট্রলিব্যাগ ও একটি পুরোনো দড়িবাঁধা সুটকেস সরিয়ে তুলে নিয়ে যাবার তোড়জোড় করছে।অভিভাবকহীন মালদুটোতে বোমা টোমা আছে কিনা সেই নিয়ে সাহেবপুলিশ খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।হাঁ হাঁ করে ছুটে গেলাম।আমাদের ফ্লাইটের মাল যে যার সবাই নিয়ে চলে গেছে।অন্য প্লেনের পেটের মাল নেমেছে।আমার বড় খয়েরি স্ট্রলিব্যাগ আর ওনাদের নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা একটি পুরোনো সুটকেস ফেরত চাইতেই ইয়া লম্বা চওড়া সাহেবপুলিশ ভীষণ হম্বি তম্বি শুরু করলো।কোনো রকমে "সরি, সরি" বলে টিকিট দেখানোর পর সাহেবের মানভঞ্জন হতে,দুটো মালকে উদ্ধার করলাম।বিশাল  এর্রিভাল লাউঞ্জের কোন গেট দিয়ে বেরোলে  ছেলের নিরাপদ আশ্রয়ে ওনাদের দুজনকে তুলে দিতে পারব চিন্তা করে আমার প্রেসার বাড়তে শুরু করলো।আমাকেও তো আমার গন্তব্যস্থলে যেতে হবে।আমার ঘড়িতে স্থানীয় সময় রাত আটটা, কিন্তু বাইরে দৃষ্টি গেলে দেখলাম ঝকঝকে রোদদ্দুর আর মেঘবিহীন ঘননীল আকাশ।এত ঘননীল আকাশ আমাদের দেশে সচরাচর দেখা যায় না।ওনাদেরকেও দেখালাম।ভদ্রলোকের ঘড়িটা নিয়ে স্থানীয় সময়ে সেটা সেট করছি তখনই উনি আঙ্গুল দিয়ে কাঁচের বাইরের দিকে দেখিয়ে উচ্ছসিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন " লো, হামার বাবুয়া আ গয়া।"

মহিলা জোর গলায় ডাকতে শুরু করলেন " ও বাবুয়া,ও বাবুয়া হামার।"

কোনো চিৎকারই কাঁচের দেওয়ালের ওপারে পৌঁছছে না।কিন্তু লাউঞ্জে বেশ কোলাহলের সৃষ্টি হওয়ায় বেশ কয়েকজন যাত্রী থমকে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখতে লাগলেন।হেল্প ডেস্ক থেকে দুই মেমসাহেবকে ছুটে আসতে দেখলাম।মেঝে পরিষ্কার করার দুটি ব্যাটারি চালিত গাড়ি আমাদের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো।ওই গাড়ির চালিকা দুই আফ্রিকান মহিলা হতভম্ব হয়ে বড় চোখ করে আমাদের দিকে চেয়ে আছেন।বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা তখনও চিৎকার করে যাচ্ছেন "মেরা বাবুয়া, মেরা বাবুয়া।"

 আমি বোঝাতে আবার সব শান্ত হলো।আমরা দ্রুত পায়ে সামনের গেট দিয়ে বাইরে একরাশ ঠান্ডায় বেরিয়ে বাবুয়ার দিকে এগিয়ে গেলাম।সুন্দর ,স্মার্ট, বুদ্ধিমান চোখ, মাঝারি উচ্চতা,চাপা গায়ের রং, সবুজ টি শার্ট আর জিন্স পরে বাবুয়া বাবা-মাকে নিতে এসেছে।আমি কার সাথে ওর মুখের মিল তা নিয়ে গবেষণারত হতেই দেখি বাবুয়ার পাশে লাল টি শার্ট আর জিন্স পরা, নীলচোখের এক সুন্দরী মেমসাহেব দাঁড়িয়ে।

"হ্যালো" বলে  বাবুয়ার সেই সুন্দরী সঙ্গিনী প্রৌঢ়র দিকে করমর্দনের হাত বাড়িয়ে দিলেন। ভদ্রলোক সেসবের ধার ধারেন বলে মনে হলো না।মেমসাহেব দমে যাবার পাত্রী নন।উনি প্রৌঢ়াকে "হ্যালো মাম্মি" বলে জড়িয়ে ধরলেন।

আমাকে ওনারা কেউ ঠিক খেয়াল করেননি।আমি আমার স্ট্রলিব্যাগ নিয়ে এক পা দু পা করে পিছু হেঁটে সেই মহামিলনস্থল ছেড়ে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলাম।নীল আকাশের পশ্চিমকোনে সবে লাল,গোলাপি,হলুদ  রঙের খেলা শুরু হয়েছে।সম্পর্কের রঙিনতাগুলোও আকাশেও যেন তার ছাপ ফেলে চলেছে।

mukhopadhyayjaydip@ymail.com
কলকাতা

Wednesday, March 31, 2021

সাইকেল

 

ছবি  : ইন্টারনেট 
সাইকেল
জয়দীপ মুখোপাধ্যায়


          অসীমবাবু একটা মায়াজড়ানো দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো  সাইকেলটার দিকে।উনি যেন ওনার কোনো এক বৃদ্ধ আত্মীয়র পানে চেয়ে পুরোনো সুখস্মৃতিগুলো ধুলো ঝেড়ে নেড়েচেড়ে দেখছেন।কি একটা বলশালী নাম সাইকেলটার - হারকিউলিস।

        একটু বাঁকাচোরা হয়ে গিয়ে মরচে পড়লেও সাইকেলের স্টান্ডটা কিন্তু এখনো আস্ত আছে।অথচ স্ট্যান্ড থাকা সত্ত্বেও ওটা পাশের শ্যাওলা পড়া দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো আছে।সামনের টায়ার টা মাস ছয়েক আগে বদলানো হয়েছে।শিরদাঁড়ার শেষের হাড়টাতে একবার পড়ে গিয়ে ব্যাথা হওয়াতে সাইকেলের সিটের ওপর একটা দামি গদিওয়ালা সিট কভার বসিয়েছিলেন অসীমবাবু।সেটা অক্ষত।সাইকেলের হ্যান্ডেল আর সিটের মাঝখানে রডটার ওপরে ছোটদের বসার কাঠের সিটটা আজ আধভাঙ্গা অবস্থায় উল্টো হয়ে ঝুলছে।বহুদিন যে ওটাতে কেউ বসেনি।

         অসীমবাবু যদিও আজকাল কালেভদ্রে সাইকেলে চড়েন।কারণ ওনার বউ উমার আবার সাইকেল চড়া নাপসন্দ।কোথায় একটা বাইক কিনবে; না সকাল-সন্ধ্যা পুরোনো মরচে পড়া সাইকেল নিয়ে পাড়ায় যাতায়াত করছে।আশেপাশের বাড়ির কর্তারা সাইকেল ছেড়ে কবে থেকে বাইক-স্কুটার চড়ছে, না কিনতে পারলে সাইকেলে না চড়ে নিদেনপক্ষে রিক্সা চড়ছে।কিন্তু অসীম বাবুর মতো ঘাড় কুঁজো করে সাইকেলে চেপে কেউ অফিসে-বাজারে যাতায়াত করে না।যে বয়সে যেটা মানায়।কমবয়েসে যা করেছ বাপু তা এক সন্তানের বাপ হয়ে করা কি শোভা পায়?উমা এটাই কিছুতে বোঝাতে পারেনা ওর বরকে।একটু মডার্ন হতে ওর যে কিসের এত আপত্তি সেটা উমার মাথায় ঢোকেনা।আজকাল সাইকেল-ফাইকেলে কেউ আর চড়ে না।কচি মেয়েরা সরকার থেকে সাইকেল পেলেও সেটা ঘরে পড়ে মরচে পড়ছে।আর উনি পয়তাল্লিশ বছরের আধবুড়ো একটা; শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা হ্যা হ্যা করে সাইকেল চালিয়ে এদিক ওদিক চরখী খাচ্ছেন।কিছু বললেই বলে "বুঝলে স্বাস্থ্য ভালো রাখে।"

        হেলান দিয়ে রাখা সাইকেলটার সাথে অসীম বাবুর একটা হৃদয়ের সম্পর্ক।এটা ওনার   উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া।উনি শুনেছিলেন ঠাকুরদা নাকি বেশ বয়েসকালে কাছারি যাবার জন্য কলকাতার কোনো বড় দোকান থেকে কিনে ওটা নিজে চালিয়ে বান্ডেলের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।এর বছর পাঁচেক পর অসীম বাবুর ঠাকুরদা মারা যেতে বাড়ির বড়ছেলে হিসেবে অসীমবাবুর বাবা গণপতিবাবু সাইকেলের অধিকার লাভ করলেন।গণপতিবাবু ডেরা বাঁধলেন বর্ধমানে।ওখানে ওনার  রংয়ের ব্যবসা।বাড়ি থেকে দোকান আবার ফেরা এসব ওই সাইকেলটা চেপেই গণপতিবাবু করে বেড়িয়েছেন।বর্ধমান দাপিয়ে বেড়াতো এই হারকিউলিস সাইকেল।

      অসীমবাবু ওই সাইকেল চালানো শিখেছিলেন দশ বছর বয়সে।প্রথমে হাফ পেডল পরে একটু লম্বা হতেই সিটে বসে চালাতে লাগলেন।কলেজ শেষে  চাকরি করাও শুরু করলেন ওই হারকিউলিসে চড়ে।

      বিয়েটা দিনটার কথাও অসীমবাবুর স্পষ্ট মনে আছে।সন্ধ্যার মুখে বরের জন্য সাজানো এমবাসাডার গাড়ীতে টোপর মাথায় চড়তে যাবেন তখনই সিঁড়ির পাশে রাখা সাইকেলটার দিকে নজর পড়লো। ছোটবেলার সুখ দুঃখের সাথী,যৌবনের ছায়াসঙ্গী সাইকেলটা সেদিন যেন কেমন মন খারাপ করে একলা দাঁড়িয়ে আছে।সন্ধ্যের মুখে তখনও সিঁড়ির নীচের লাইট কেউ জ্বালায়নি।প্রয়োন্ধকারে সাইকেলটা দাঁড়িয়ে টোপর মাথায় অসীম বাবুকে দেখে কেমন যেন মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে বলছে-যাঃ, তোর সঙ্গে আড়ি।

     সেই আনন্দের দিনেও অসীম বাবুর মনটা কেমন হুহু করে উঠেছিল।তড়িঘড়ি সিঁড়ির নিচের আলোটা জ্বালিয়ে সাইকেলটার সামনে দাঁড়ালেন।সিটটার ওপর আনমনে হাত বুলিয়ে অসীম বাবু মনে মনে বলেছিলেন "দুঃখু করিস না।আমার বৌকে তোর সিটের সামনের এই রডটাতে বসাবো।কাল বিকেলেই আমাদের আবার দেখা হবে।তোকে দেখিয়েই  নতুন বউকে ঘরে ঢোকাব।"

পরদিন বিকেলে বাড়ির সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াতেই অসীম বাবু জোড় বাঁধা নতুন বউ উমার কানে কানে বলেছিলেন" আমার এক বন্ধুর সাথে আগে তোমার দেখা করাব, তারপর তোমার বরণ হবে।"

গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ির নীচে তাকিয়েই বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল অসীমবাবুর।সাইকেলটা তো নেই ওখানে।তবে কি বাড়িতে লোকজন গতকাল কম থাকায় ওটা চুরি হয়ে গেল?কেউ কি ওটা নিয়ে কোথাও গেছে?বোকার মতো হাস্যকর চিন্তাও মাথায় এলো।সাইকেলটা অভিমান করে কোথাও চলে গেল নাতো?

" মা, সাইকেলটা কোথায় গেল?"চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন অসীম বাবু।

নতুন বউ উমা, আশেপাশে উপস্থিত আত্মীয়স্বজনরা অনেকে সেই চিৎকার শুনে চমকে উঠেছিল।উমা সেদিনই উপলপদ্ধি করেছিলেন যে এই সাইকেল নামক সতীন কে নিয়েই এখানে ঘর করতে হবে। শীঘ্রই জানা গেল পাশের বাড়ির বাবলু সাইকেলটা নিয়ে রেশনের চাল,ডাল, আটা আনতে গেছে।চট করে মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল অসীম বাবুর।ওনার অনুমতি না নিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া উনি একদম বরদাস্ত করতে পারেন না।যাহোক মা,মামারা বুঝিয়ে সুঝিয়ে সে যাত্রায় অসীম বাবুর মাথা ঠান্ডা করলেও উনি বউকে নিয়ে বাড়ির বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন।বধুবরণ আটকে রইলো।সাইকেল ফিরতে, উনি হ্যান্ডেলটার ওপর পরম যত্নে হাত বুলিয়ে নতুন বউকে বললেন " দেখো উমা এই আমার প্রাণের বন্ধু।"

উমা সেদিন অসীমবাবুর মস্তিষ্ক বিকৃতি আছে কিনা সেটা ভেবে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে ভীষণ কান্নাকাটি করেছিলেন। পরে অবশ্য বুঝেছিলেন অসীমবাবু লোকটি নিপাট ভালোমানুষ।কিন্তু সেই যে সাইকেলটার প্রতি ওনার ঘৃণা বা রাগ জন্মালো তা আজও বিদ্যমান।

        বিয়ের দুবছর পর বাবু এলো।একবছরের বাবুকে সাইকেলের রডের ওপর সুন্দর গদি আঁটা সিটে বসিয়ে অসীমবাবু এপাড়া ওপাড়া করে চষে বেড়াতে লাগলেন।মাঝে মাঝে বাবুকে সাইকেলে চাপিয়ে রেললাইনের পাশে চলে যেতেন।লোকাল ট্রেনের আনাগোনা দেখে বাবু সাইকেলের হ্যান্ডেলটা বাঁ হাত দিয়ে খুব জোরে চেপে ধরে ডান হাত দিয়ে চলে যাওয়া ট্রেনকে টা-টা করতো।বাবুর যখন আট বছর বয়স তখন সাইকেলটা নিয়ে পাড়ার মাঠে নিয়ে গিয়ে ওকে হাফ পেডেল করা শেখানো শুরু করলেন।ব্যস, আর যায় কোথায়।সেদিন উমা চিল্লিয়ে পাড়া মাত করেছিলেন বরের বেআক্কেলেপানায়।

       ইতিমধ্যে গণপতিবাবু অসুস্থতার কারণে রংয়ের ব্যবসা বেচে দিয়েছেন।একমাত্র সন্তান অসীম সরকারি অফিসের বড়বাবু।গণপতিবাবু তীব্র হাঁপানির কষ্টে ভোগেন।আগে তাও রবিবার উনিও সাইকেলটায় চড়ে বাজারে বেরোতেন।কিন্তু স্ত্রী বিয়োগ হওয়ার পর শয্যা নিয়েছেন।শরীর ও মন দুইই খারাপ।মাঝে মাঝে  ছুটির দিনে সাইকেলটা পরিষ্কার করা হয়ে গেলে অসীমবাবু ওনার বাবার ঘরে নিয়ে গিয়ে ওটাকে দেখিয়ে আনতেন।বৃদ্ধর চোখগুলো সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে চকচক করে উঠতো।দুজনে ওই সাইকেলটার সাথে ঘটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে গল্পে মেতে উঠতেন।ওটা ঠিক প্রাণহীন সাইকেল যেন নয়।গণপতি ও অসীমবাবুর কাছে ওটা একটা পবিত্র বন্ধন।সাইকেলটাও ওদের দুজনকে দেখলে কেমন যেন খুশি হয়ে উঠতো।

     একবার অসীমবাবু কে অফিস থেকে কম্পিউটারে ট্রেনিং নিতে দশ দিনের জন্য দিল্লি পাঠালো।ইচ্ছে না থাকলেও যেতে হলো।কম্পিউটার আর এই বয়সে শিখতে কার  ইচ্ছে করে।কিন্তু না শিখলেও নয়।বদলি করে দেবে কোনো ছোটখাটো অফিসে।তাতে আবার ঝক্কি অনেক।তার থেকে একটু আধটু শিখে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

   দিল্লি থেকে ফিরে যা দৃশ্য দেখেছিলেন তা চিন্তা করলেই অসীমবাবুর মনটা আজও আনন্দে নেচে ওঠে।সেদিন ছিল রবিবার।সকালে দিল্লি থেকে বাড়ি ফিরেই যথারীতি চোখটা সিঁড়ির পাশের জায়গাতে পড়লো।সাইকেলটা নেই তো।আগের মতো আজকাল আর অসীমবাবু সাইকেল নিয়ে  আদিখ্যেতা করেন না।সময়ের সাথে উনি চালু হয়ে গেছেন।তাছাড়া উমাকে ভয়ও পান।জানেন সাইকেল কোথায় গেল বললেই উমা চিৎকার করে তেড়ে আসবে।সেজন্য হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে উমাকে কিছু না বলেই উনি পাড়ার মাঠে আগে দেখতে গেলেন।সেখানেই সেই অপূর্ব দৃশ্যটা চোখে পড়লো।বাবু সাইকেলটা চালিয়ে মাঠটা চক্কর কাটছে।কি যে খুশি হয়েছিলেন সেদিন।জড়িয়ে ধরেছিলেন বাবুকে।

" চা খাবে নাকি?" উমার প্রশ্নে অসীমবাবুর চিন্তাটায় ছেদ পড়লো।চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিতেই উমা বললো "ছেলে এবার কলেজে পড়তে যাবে।এবার অন্ততঃ সাইকেলটা বেচে একটা বাইক নাও।"

ছেলের কলেজ যাবার সাথে সাইকেল বেচা বা বাইক কেনার কি সম্পর্ক সেটা কিছুতেই মাথায় ঢুকলো না অসীমবাবুর।উমা যেন তেন প্রকারেন সাইকেলটা বাড়ি থেকে বিদায় করতে চায়।সিঁড়ির নীচে একটা কোনায় বেচারি পড়ে আছে, তাতে লোকের কিসের এত আপত্তি সেটা অসীমবাবু বোঝেন না।বুড়ো হলে কি কেউ কি বাপের বয়েসী আত্মীয়কে  বাড়ির বাইরে বার করে দিতে পারে? মনটা দুঃখে ভরে যায়।মাঝে মাঝে মনে হয় সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে সাইকেলটাকে নিয়ে যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে চলে যাবেন।রইলো তোর চাকরী আর সংসার।সংসারের মায়ার বন্ধন কাটিয়ে প্রানের সঙ্গীর সাথে বহির্বিশ্বে বেরিয়ে পড়তে ওনার বহুবার ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু মরণাপন্ন বাবা আর বাবুর কথাটা ভেবে উনি শেষমেষ পেরে ওঠেন নি।এই তো সেদিন উমার মামাতো ভাইয়ের ছেলে এসে সাইকেলটা ওদের চুঁচুড়ার বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য আবদার জুড়েছিলো।উমা তো এক কথায়  হ্যা করে দিলো।ভাগ্গিস বাবু বেঁকে বসলো।একটা জিনিস আজকাল অসীমবাবু লক্ষ্য করেছেন যে 

বাবুরও যেন সাইকেলটার প্রতি একটা কেমন টান আছে।এই একটা ব্যাপারে বাবু আজকাল মায়ের সাথে লড়ে যেতে পারে।হাজার হোক অসীমবাবুর জিনটা তো ওর মধ্যে রয়েছে।এত সমস্যার মধ্যেও ওই জিনটা অসীমবাবুর অহংকারের কারণ।

শনিবার দুপুরবেলা সেদিন গণপতিবাবুর প্রায় যায় যায় অবস্থা।ডাক্তার সেন এসে গম্ভীরমুখে বলে গেলেন এক্ষুনি হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে ভর্তি করতে হবে।অসীমবাবু সাইকেলটা নিয়ে ছুটলেন এম্বুলেন্স ডাকতে।পাড়ার 'ভাইভাই' ক্লাবে একটা এম্বুলেন্স আছে।গিয়ে দেখেন সেটা অন্য কোথাও গেছে।তবে কিছুক্ষন পরেই ফিরে আসবে।অসীমবাবুর সীমিত সামর্থ।মাস গেলে ওই তো কটা টাকা আর পান।পারিবারিক সম্পদও কিছু তেমন নেই।নার্সিংহোমের ব্যায়বহুল চিকিৎসা উনি কতটা করতে পারবেন সেটা নিয়ে দ্বিধায় আছেন।তার থেকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত।সেখানে গিজগিজ ভিড় ও নোংরা হলেও বিনাপয়সায় চিকিৎসা তো হয়।এম্বুলেন্সকে বাড়িতে আসতে বলে বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখলেন গেটের কাছে সুটপরা টাকমাথা এক ভদ্রলোক ঘোরাঘুরি করছেন।

কাকে খুঁজছেন জিজ্ঞাসা করাতে সেই ভদ্রলোক অসীমবাবুর নামটাই উচ্চারণ করলেন।

" কি ব্যাপার বলুন তো?আমিই অসীমবাবু।"

"ওহ।আপনি আমায় বাঁচালেন।আমি কলকাতার হারকিউলিস কোম্পানির অফিস থেকে আসছি।খবর পেয়েছি আপনাদের যে সাইকেলটা আছে সেটা নাকি আপনারা চারপুরুষ ধরে ব্যবহার করছেন?"

" হাঁ।তো?"

" কোম্পানি একটা বিজ্ঞাপনে এটাকে ব্যবহার করবে।আপনাদের সাথে সাইকেলটার একটা ছবি নেব।আর এর জন্য আপনাকে কোম্পানি তিন লক্ষ টাকাও দেবে।"

এম্বুলেন্স এসে হাজির হয়েছে।অসীমবাবুর হাতে কন্ট্রাক্ট ফর্ম।বাঁ হাতে সই করা ফর্মটা নিয়ে ডান হাত দিয়ে পরম যত্নে অসীমবাবু সাইকেলটাকে আদর করছেন।ওনার চোখ দিয়ে অজান্তেই টপ টপ করে আনন্দাশ্রু গাল বেয়ে নেমে আসছে। গণপতিবাবুকে এম্বুলেন্স এ তোলা হলো।বাবুও পিছনে ঠাকুরদার সাথে উঠেছে।ইতিমধ্যে ছবি তোলার কাজটাও সম্পূর্ণ হয়েছে।অসীমবাবু এম্বুলেন্সের সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে আদেশ দিলেন " নার্সিং হোম চলো।"

mukhopadhyayjaydip@ymail.com
কলকাতা


Tuesday, January 26, 2021

মহাপুরুষ

 

                                                                                                                            ছবি  : ইন্টারনেট 

মহাপুরুষ
জয়দীপ মুখোপাধ্যায়
        গতবছর বিএ পাস করে বাবার হোটেলে থাকি।সকাল হলেই জলখাবার সাঁটিয়ে সাইকেল চড়ে এদিক ওদিক উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আমার আর কোনো কাজই নেই।আমার বন্ধু রথিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, ফাইনাল ইয়ার, তার আড্ডা দেবার সময় নেই।সংকল্প হোস্টেলে থেকে ডাক্তারি পড়ে, সুতরাং ওর সাথে দেখা হবার সুযোগটাও নেই।ওরা দুজন আমাদের পাড়াগাঁয়ের মুখউজ্জ্বল করা ছেলে।এখন নিজের কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যস্ত।আমি সাইকেল নিয়ে সারদাসুন্দরী মহিলা কলেজের আশেপাশে চক্কর কাটি,দূরথেকে সুন্দরী মেয়েদের দেখি।কখনো কখনো চলে যাই সাতসা মাইল দূরে গোলাপ বাঁধে।লোকেদের অলসভাবে  মাছ ধরা দেখতে ভালো লাগে।কি অসীম ধৈর্য নিয়ে সবাই ফাতনার পানে চেয়ে আছে।কখন ফাতনাটা টুপ করে জলে ডুবলে একটানে মাছটাকে ডাঙ্গায় ফেলবে সেই আশায় ওরা দুপুর রৌদ্রে বসে আছে।রোদ চড়া হতে শুরু করলেই যখন নিজের ছায়াটা ছোট হতে শুরু করে তখন শর্টকাট দিয়ে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।

      দুএকটা চাকরির দরখাস্ত যে করিনি তা নয়, তবে ডাক পাবার সম্ভাবনা ভীষণ ক্ষীণ।ইতিহাসে এমএ করার কথা মা বললেও আমার সেসবে ইচ্ছে নেই। পাড়াগাঁয়ের নিস্তরঙ্গ জীবন আমাকে আর যেন টানে না।মনে হয় দুর্ভাগা বলেই পাড়াগাঁয়ে জন্মেছি।শহরে জন্মালে এতদিনে কোথাও একটা না একটা কিছু ঠিক জুটিয়ে নিতাম।
     সেদিন সাইকেল নিয়ে এক নাম না জানা গলি দিয়ে ভর দুপুরে ফিরছি হঠাৎই একটা বাড়ির গেটের ওপর ছোট্ট নতুন ফ্লেক্সে লেখাটা আমার চোখে পড়লো।
"  মহাপুরুষ - শিক্ষা নিন "
নিচেই এক সাধুর ছবি যিনি ধ্যানে বসেছেন।
বেশ নতুনত্ত্ব আছে।এখানে কি কোনো মহাপুরুষ এলেন?সাইকেল থেকে নেমে বন্ধ দরজায় কড়া ধরে দুবার নাড়াতেই ভিতর থেকে তীব্র নারিকণ্ঠের চিৎকার ভেসে এলো।
" কে রে মুখপোড়া দুপুরে খাবার সময় বিরক্ত করিস?" 
একটু ঘাবড়ে গেলাম।পাড়ার কেউ বদমাইসি করে মজা করার জন্য ফ্লেক্সটা দরজার ওপরে টাঙিয়ে যায়নি তো? নিজের মনেই প্রশ্ন করলাম।
" একটু দরজাটা খুলবেন মাসিমা?" আমি বাইরে থেকে বলি।
একটু পরে দরজাটা খুলে গেল।ভীষণ রোগা, শ্যামবর্ণ, সাদা থান পরে মাথায় ঘোমটা দেওয়া প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সী এক মহিলা দরজাটি খুলে দু হাত দিয়ে দোর আগলে দাঁড়ালেন।
" কি ব্যাপার ছোকরা, ভরদুপুরে কি চাই? আমি কোনো সাবান, সেন্ট কিনতে পারবো না।"
" না না মাসিমা,আমি সেলসম্যান নই। মানে এই ফ্লেক্সটি কি আপনাদের বাড়িতে দেওয়া হয়েছে?" আমি দরজার ঠিক ওপরে আঙ্গুল দিয়ে দেখালাম।
" ও, ছাত্র।এসো।আরো দুজন ছাত্র সকালে ঘুরে গেছে।সাইকেল স্ট্যান্ড করে বারান্দার ডানদিকের ঘরে ঢুকে যাও।" উনি হাসি হাসি মুখে আদেশ দিলেন।
নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠে মাথা ঠুকল। প্রয়োন্ধকার ঘরটিতে এক সাদা দাড়িওয়ালা বয়স্ক লোক চেয়ারে বসে টেবিললাম্প  জ্বালিয়ে বই পড়ছেন।বইটিতে মলাট দেওয়া বলে কি বই বুঝতে পারলাম না।লোকটির সামনে রাখা টেবিলের ওপর অনেক মলাট দেওয়া বই ডাঁই করে রাখা।
" কি ব্যাপার? হুটহাট করে কাউকে জিজ্ঞাসা না করে ঘরে ঢুকে পড়ছো যে?" উনি বেশ রেগে বললেন।
" স্যার, আমি মহাপুরুষ হতে চাই।আমার সব বন্ধু বান্ধবরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বড়ো ব্যবসাদার হয়ে যাচ্ছে।আমাকে আপনি মহাপুরুষ হবার ট্রেনিং দিন।"
" ধীরে বৎস,ধীরে।সারা ভারতে আমরা এজেন্সি খুলেছি।ছাত্রদের বিভিন্ন জায়গা থেকে যোগ্যতা অনুসারে তুলে তারপর এক অজ্ঞাত জায়গায় ট্রেনিং হয়।একটা ফর্ম দিচ্ছি।আমাদের এখানে পাশ্চ্যাত্বের নিয়ম মেনে সিলেকশন করা হয়।তিনটি পয়েন্ট আছে।প্রথম, কেন তুমি মহাপুরুষ হতে চাও, দ্বিতীয় এযাবৎ তুমি এই জগতে তুমি কি কি মহান কাজ করেছ,আর পরিশেষে একজন যাকে তুমি গুরু বলে মান তার থেকে প্রশংসা পত্র।" এই বলে উনি আমার হাতে একটি দুপাতার ছাপানো কাগজ ধরিয়ে দিলেন।
" এটা দশ দিনের ভিতর জমা করে দিও।"  ভদ্রলোক বললেন।


       প্রথম প্রশ্নের উত্তর সোজা।কেন তুমি মহাপুরুষ হতে চাও? মহাপুরুষ হলেন সেই  ব্যক্তি যিনি নিজের সুখের কথা চিন্তা না করে অন্যের সুখের জন্য চিন্তা করেন এবং অন্যের মঙ্গল সাধন করেন ।আমিও নিজের সুখের ও মঙ্গলের কথা চিন্তা না করে সর্বদা অপরের সুখ ও মঙ্গলের কথা চিন্তা করতে চাই।কলিযুগে মহাপুরুষের বড় অভাব।আমি নিজে মহাপুরুষ হয়ে সেই অভাব পূরণ করে জগতের ভালো করতে চাই।লিখছি আর ভাবছি বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল নাতো? বেশি ভালো ভালো কথা লিখে ফেললে না আবার ফর্মটা ছিঁড়ে ফেলে দেয়।
      দ্বিতীয় প্রশ্নে আমি ঠোক্কর খেলাম।আমার ভালো কাজের খতিয়ান দিতে হবে।আজপর্যন্ত সত্যি কি কিছু ভালো কাজ করেছি সেই নিয়েই সন্দেহ দেখা দিল।টিকিট কেটে ট্রেনে চড়েছি,চুরি ছিনতাই করিনি, পরীক্ষায় টুকলি করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও করিনি এগুলো ছাড়া আমার আর ভালো কাজের খতিয়ান নেই।এগুলো যে সাধারণ কাজ যা সবাই এর করা উচিত এটা জেনেও আমাকে তাই লিখতে হলো।আমি আবার বানিয়ে লিখতেও ছাই পারি না।
       আসল সমস্যা এলো রেকমেন্ডেশন লেটার বা প্রশংসা পত্রে। কলেজের স্যারেরা আমাকে চেনেই না।কারণ এখন কলেজে যেতে হয় না।আজকাল খালি টিউশন গেলেই চলে।পুরোনো টিউশনের স্যারের সাথে দেখা করে প্রশংসাপত্র দিতে বলাতে উনি আকাশ থেকে পড়লেন।
" কিসে লাগবে রে? আমেরিকা পড়তে যাচ্ছিস নাকি?" 
" না স্যার।আমি মহাপুরুষ হতে চাই।তাই আমার মধ্যে মহাপুরুষ হবার কি কি গুন আপনি দেখেছেন সেটাই লিখে প্রশংসাপত্র দিতে হবে।" আমি আঙ্গুল কচলাতে কচলাতে বললাম।
স্যার মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলেন।কোনো রকমে ধরে মাটিতে বসালাম।উনি মাটিতেই সটাং শুয়ে পড়ে চোখ উলটে ফেললেন।চোখে মুখে জলের ছিটা দেবার বেশ কিছুক্ষণ পর ঘোলাটে চোখে চেয়ে বললেন" আমি কোথায়,আমি কোথায়?" আমাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠে  বললেন " তুই এখন চলে যা।পরশু আসিস।"
     স্যারের জন্য একঠোঙা জিলিপি নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে ওনার বাসায় হাজির হলাম ।দেখি স্যার বিরাট ব্যাচে পড়াচ্ছেন।মেয়েরা খচখচ করে মাটিতে বসে নোট নিচ্ছে আর ছেলেরা ভাবুক দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, খুনসুটি করছে।।স্যারের দিকে ঠোঙাহাতে তাকাতেই  স্যার চমকে উঠলেন।
" আরে ,আমি ভীষণ ব্যস্ত।লিখে উঠতে পারিনি।অন্যদিন আয়।" উনি বললেন।আমিও জিলিপির ঠোঙা হাতে নিয়ে ফিরে এলাম।
রাস্তায় নিতাইদার সাথে দেখা হয়ে গেল।জিজ্ঞাসা করলো " কিরে মুখ শুকনো করে কোথায় যাচ্ছিস?" 
নিতাইদা আমাদের এই পাড়াগাঁয়ের কেউকেটা লোক।পঞ্চায়েতের প্রধান।একশো দিনের কাজে আশিজনের নাম দিয়ে চল্লিশজনকে দিয়ে কাজ করিয়ে দাদা বেশ টুপাইস করেছে।তিনতলা বাড়ি।গোটা চারেক বাইক।দাদার চেলাচামুন্ডা অনেক।বালির কারবারও আজকাল শুরু করেছে।মনে অনেক দ্বিধা নিয়েও জিলিপির ঠোঙাটা নিতাইদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে  বললাম
 " দাদা আমাকে একটা প্রশংসাপত্র দেবে?"
"আরে আমি তো সিক্স ফেল রে। বিএ পাস কে কি প্রশংসাপত্র দেব? আমার প্যাডের একটা কাগজ তোকে দিয়ে দেব, তুই ওতে লিখে নিয়ে আসিস আমি সাইন করে স্ট্যাম্প মেরে দেব।আর শোন।তোর তো এখন সাইকেলে করে মেয়েদের কলেজের সামনে ঘোরা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।সব খবর রাখি।আমার বালি ব্যবসায় কিছু লেবার লাগবে।তুই কাজটা করতে পারিস।ভেবে দেখিস।"
" দাদা,আমি মহাপুরুষ হতে যাচ্ছি।ওই লেবারের কাজ আমার জন্য নয়।"আমি একটু মিনমিন করে বলি।
" কি পুরুষ?এই সব পুরুষ,নারী নিয়ে কি কাজকারবার করছিস বলতো? তোর ভাবগতিক তো ভালো ঠেকছে না।নাঃ তোর একটা বন্দোবস্ত করতে হবে দেখছি।" নিতাইদা বাইকে স্টার্ট দিয়ে চলে গেল।আমি হতভম্ব হয়ে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে রইলাম।

" ভবিষ্যতের মহাপুরুষ হবার সব গুণই ওর মধ্যে বিদ্যমান।শুধু মহাপুরুষ কেন আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসেবেও ওকে আমি যোগ্য মনে করি।ও নিজেকে আশা আকাঙ্খা থেকে মুক্ত করেছে।ওর বড় হবার , চাকরিবাকরি করে সংসারী হবার বাসনাই নেই।জাগতিক বন্ধন ওর মুক্তির পথ আটকাতে পারবে না।জগৎসংসারের সুখ ও কল্যানসাধনের জন্য ওর মহাপুরুষ হবার যাত্রা যেন সাফল্যমন্ডিত হয় এই কামনা করি।"
প্রশংসাপত্রের লেখাটা দেখে নিতাইদা প্রথমে পড়ার চেষ্টা করে বিফলমনোরথ হলো।কিন্তু সেটা মুখে প্রকাশ করা শোভনীয় নয় বুঝে বললো " বেড়ে লিখেছিস তো।যাক নিচে সাইন করে দিচ্ছি।একটা গরিব ছেলের যদি উপকার হয় তো ভালো।আমি ডিসেম্বর মাসে গরিবভোজন করাবো।তোর বাবাকে বলিস গরিবভোজনের চালটা দিতে।"
ফর্ম আর প্রশংসাপত্র আমি জমা দিয়ে দিলাম।শুনলাম রেজাল্ট আসতে মাসখানেক অপেক্ষা করতে হবে। বিভিন্ন জেলা থেকে ছাত্র নিয়ে তারপর ট্রেনিং শুরু হবে।আমি মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রাথমিক কাজগুলো শুরু করলাম।
রোজ ভোরবেলায় ধ্যান করে, সূর্যপ্রনাম সেরে জোর কদমে পাড়ার ফুটবল মাঠটাকে গুনে গুনে দশ চক্কর দৌড়োন শুরু হলো।তার সাথে সাত্ত্বিক আহার আর ভগবৎ গীতা পাঠ মন দিলাম।বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেলো।ছেলে সংসার ধর্ম ত্যাগ করে মানবকল্যাণে জীবন উৎসর্গিত করতে চলেছে শুনে মা -মাসীরা কেঁদে কেঁদে শরীর খারাপ করে ফেললো।কেবল বাবা বললো "ন্যাকামি হচ্ছে।চাপকে সব সিধে করে দিতে হয়।"
প্রায় মাস দেড়েক পর বাড়িতে একটি চিঠি এলো।প্রেরকের ঠিকানা ঋষিকেশ।মহাপুরুষ বানানোর আদর্শ জায়গাই বটে।ডিসেম্বরের  এক তারিখে নির্দিষ্ট ঠিকানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
মায়ের দেওয়া হাতেবোনা গোটা দুয়েক সোয়েটার, বাঁদর টুপি, মাফলার, আর গোটা তিনেক জামাপান্ট নিয়ে আমি যখন দুন এক্সপ্রেসে চড়ে বসলাম তখন দুচোখে মানবকল্যানের স্বপ্ন।শীতে কাঁপতে কাঁপতে  ঋষিকেশে হাজির হয়ে দেখি আমার বয়সী বেশ কয়েকটি ছেলে সেখানে মহাপুরুষ হবার স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছে।একটি ছেলেকে খুব চেনা চেনা লাগলো।সেও যেন আমাকে চিনতে পেরেছে।
" ভাই তোকে কেমন চেনা চেনা লাগছে।" আমি বললাম।
" আরে আমি ভোঁদড়, তুই ভুলে গেলি।সেই যে ক্লাস টুতে আমি ক্লাসে ইয়ে করে ফেলেছিলাম।এবার মনে পড়েছে?"ভোঁদড় হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
" ওহ তোকে পেয়ে যেন বাঁচলাম।এখানে কোনো চেনা মুখ দেখতে পাচ্ছি না।অবশ্য মহাপুরুষ হবার পথে চেনাশোনা লোক না পাওয়াই ভালো।এ পথে একলাই যেতে হয়।নাহলে মন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে।" আমি বেশ গম্ভীর হয়ে বললাম। জিজ্ঞাসা করলাম
" হাঁরে, তুইও কি আমার মতো মহাপুরুষ হতে এসেছিস?"
ভোঁদড় ওর পানপরাগ খাওয়া কালো মাড়ি আর হলদেটে দাঁত বার করে বললো " সেভেন ফেলের পর কলকাতায় মামার বাড়ি চলে এলাম।কিন্তু কিসসু হোলো না।ভাবলাম এই ট্রেনিং টা নিয়ে রাখি।আজকাল তো বাবা টাবাদের জমানা।কখন কোন বিদ্যেটা কাজে লেগে যায় কে জানে।"
" আমি কিন্তু সিরিয়াসলি শিখে মহাপুরুষ হতে চাই।আজকাল সব জিনিসে প্রফেশনাল হতে হয়।ঠিকঠাক ট্রেনিং নিয়ে আমি কাজে নেমে পড়লে আশা করি খাবার অভাব থাকবে না।শিষ্যটিস্য তো দেদার হবে।।ভাগ্য ভালো থাকলে শহরের বাইরে শিষ্যের দেওয়া জমিতে আশ্রমও তৈরি হয়ে যাবে খন।" স্বপ্ন দেখি আর ভোঁদড়কে দেখাই।

        লছমনঝুলা পেরিয়ে ডান দিকে একটু ঢালু রাস্তা দিয়ে  গঙ্গার পাড়ের দিকে নেমে একটা দোতলা বাড়িতে আমাদের প্রথম মিটিং।উত্তেজনায় আমার বুক ধড়পড় করছে।আমার আর ভোঁদড়ের মতো গোটা কুড়ি ছেলে জড়ো হয়েছে।বিহার, ঝাড়খন্ড, উত্তরপ্রদেশ আর পশ্চিমবাংলা থেকেই অধিকাংশ ছেলেরা এসেছে।মহাপুরুষ হবার জন্য লোকের এত উৎসাহ দেখে মনটা আনন্দে ভরে উঠল।এই পোড়া দেশের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নতি এখন খালি সময়ের অপেক্ষা।দলে দলে মহাপুরুষ বেরিয়ে যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে তখন দেশে একটা পরিবর্তনের জোয়ার আসবে।কে না জানে পরিবর্তনই জগতের একমাত্র সত্য।এই পরিবর্তিত দেশ যে আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেবে সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইলো না।
      পবিত্র গঙ্গা আমাদের ছোট্ট ঘরটির প্রায় গা দিয়ে বয়ে চলেছে। ঘরটিতে একটি টেবিল চেয়ার আর গোটা সাতেক বেঞ্চ রাখা আছে।স্যাঁতস্যাঁতে ঘরটিতে জ্বলা একমাত্র টিউবলাইট যেন ঘরটির অন্ধকার দূর করতে অক্ষম।অবশ্য ঘরের অন্ধকার দূর না হলেও যদি ওদের শিক্ষায় মনের অন্ধকার দূর হয় তাহলেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে।মহাপুরুষ তৈরির এক আদর্শ পরিবেশ।বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কোট, প্যান্ট আর লাল টাই পরা একটি লোক হাতে একটি বড় চটের ভর্তি থলি নিয়ে আমাদের ঘরে প্রবেশ করলেন।ওনার হাতে একটি কাগজে আমাদের সবাইয়ের নাম, ঠিকানা লেখা আছে।রীতিমতো রোলকল করে আমাদের ক্লাস শুরু হলো।
      কোট প্যান্ট টাই পরা আমাদের প্রথম শিক্ষক হিন্দিতে নিজের নাম বলে থলিটি থেকে কিছু প্যাকেট বার করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে লাগলেন।মহাপুরুষ পাঠের প্রথম প্রাক্টিক্যাল ক্লাস।নিশ্চয়ই সাত্ত্বিক মন নির্মলকারী আহার সামগ্রীর ওপর বক্তৃতা হবে।আমরা অধীর আগ্রহে ওনার পানে চেয়ে আছি।প্যাকেট সাজানো হয়ে গেলে এবার  ভদ্রলোক বলা শুরু করলেন।
" হিমালয়ের অনেক উঁচুতে অবস্থিত গাছগাছড়ার থেকে আমাদের কোম্পানি এক মহা শক্তিশালী ওষুধ আবিষ্কার করেছে।পুরুসত্ত্বহীনতায় যারা ভুগছে এবং সেই জন্য যাদের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে তাদের আবার পুরুসত্ত্ব ফিরিয়ে দেবার ওষুধ এই প্যাকেটে আছে।এই ওষুধই 'মহাপুরুষ'।সাধারণ পুরুষকে পুরুষশ্রেষ্ট তৈরি করাই আমাদের ওষুধের কাজ।তোমাদের এই 'মহাপুরুষ' বিক্রি করতে সারা দেশের ট্রেনে, বাসে ছড়িয়ে পড়তে হবে।আর গুণগান গেয়ে যা বিক্রি হবে তার চল্লিশ পার্সেন্ট তোমাদের।"
এখন আমি বনগাঁ লোকালে " মহাপুরুষ " বিক্রি করি।

mukhopadhyayjaydip@ymail.com
কলকাতা