1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label ড: করণ দেবদ্যুতি. Show all posts
Showing posts with label ড: করণ দেবদ্যুতি. Show all posts

Tuesday, January 26, 2021

বিসর্জন

 

ছবি  : ইন্টারনেট  

বিসর্জন
ড: করণ দেবদ্যুতি

        শরীরটা কয়েক মুহূর্ত আগেও হাঁফাচ্ছিল। এখন নিস্তেজ নিষ্প্রাণ। এই বাড়ির এই ঘরটায় কেটেছে নাদিয়ার জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময়; সেই কবে প্রথম যৌবন থেকে। এক কালে চাচাজিকে আব্বুকে নামাজ পড়তে দেখেছে। এখন মনে হয় সে বুঝি কত জন্ম আগে! তার জীবনে আব্বু আম্মু কিংবা সোহেল নামে যে কোনও ভাই ছিল সেকথা ভুলে গেছে বহুকাল। নিয়তির গতি তার আত্মীয় স্বজন পরিচিতদের কেড়ে নিয়ে দিয়েছে নতুন ঠিকানা। আর দিয়েছে নতুন কিছু গিরগিটি -মানুষ আর অনেক মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়ার ক্রমিক কলঙ্কায়িত স্মৃতি। সে এখন মুসলমান কিনা জানে না, হিন্দু বৌদ্ধ জৈন কিনা; তাও না। নামাজ পড়তে ভুলে গেছে কোনকালে! অন্য মেয়েদের মত কার্তিক পুজো করেছে। একটি জ্যান্ত কার্তিকও জুটে গিয়েছিল তার জীবনে। অকস্মাৎ ভুলে নয়; ইচ্ছেতেই। কিছুদিন তার সেই কার্তিক মূর্তিটি হারিয়ে গেছে।

          বিদায়ী মুহূর্তে সেই নিয়ে লড়াই চলল কিছুক্ষণ। ইচ্ছে -আকাঙ্খা আর বাস্তবের তীব্র লড়াই। সংসার হয় নি; আবার হয়েছেও! স্বামীর সুখ কী জিনিস বোঝেনি কোনওদিন। অথচ দেহজ অভিজ্ঞতা এসেছে সারাজীবন! সে অভিজ্ঞতা সুখের নয়। তবে কখনও যে সুখ পায় নি তাও কী ঠিক? সেই যে হিন্দু মাস্টারবাবুটি আসত! সে ওর কাছে কেন আসত তা ভেবে অনেকদিনই ও মাঝে মাঝে অবাক হত। এমন একটা মানুষ যে কখনও ওর সাথে জবরদস্তি করেনি। কখনও পোশাক খুলে ফেলার জন্য নাছোড় হয়নি। সেই ওর সুখ, ওর মনের পুরুষ। কত রাত্রি ওকে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে। পরে ও জেনেছিল মাস্টারবাবুটির জীবন স্বাভাবিক গতিতে এগোয় নি; বউ ব্যভিচারী। হয়তো সেই ক্ষত ঢাকতেই নাদিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে নিঃসঙ্গ রাতগুলোকে সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে চাইত। নাদিয়ার স্তনের আকুলতার চেয়ে চোখের অসহায়তা বাবুটিকে বড় টানত। শুধু নিশারতি আর যৌনতায় থেমে থাকেনি সম্পর্কটা। তাই কোনও এক দুর্বল মুহূর্তে নাদিয়া ঠিক করেছিল এই বাবুটির মত একটি ক্যাবলা কার্তিক সেও ধারণ করবে।

           মাষ্টারমশাই অবশ্য এই প্রস্তাবে সায় দেয় নি, ভয় পেয়েছিল। জীবনে ঝামেলার তো অভাব ছিল না; নতুনকরে আর ঝামেলা দিকে পা বাড়াতে চায় নি। নাদিয়া জেদ করেই নিয়েছিল সন্তান। সে এই সন্তানের দায়ে আবদ্ধ করেনি তাকে। অথচ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত লোকটি সন্তানের দায়িত্ব পালন করত। সেসব ছিল নাদিয়ার সুখের দিন। কিন্তু নিয়তি বড় হিংসুটে! অন্যের সুখ সহ্য করে না। লোকটি মরল হার্টের রোগে। তখন নাদিয়ার গর্ভের সন্তানের বয়স বারো। তারপর থেকে নাদিয়ার জীবনের আরেক পর্যায়।

          আগে যদিও স্বামী না হোক মাথার উপর কেউ একটা ছিল। সে আশ্রয়ও হারাল ওরা। ছেলেটি বছর দুয়েকের মধ্যেই স্কুল ছাড়লো। ভিড়লো বস্তির ছিনতাই বাজদের দলে। একদিন ছেলের হাতে দামি ঘড়ি দেখে প্রথম আঁচ করে ও। সেদিন মেরেছিল খুব। কিন্তু সে মার সেদিন ওর সন্তানের গায়ে লাগেনি। তার আগেই তার বাস্তবের সাথে আলাপ হয়েছিল। দ্বিতীয়দিন মারতে গেলে সে ওর হাত ধরে। সেই হাতের স্পর্শ আর চোখের অভিব্যক্তিতে ও সেদিন বুঝেছিল যে মাস্টারবাবুকে সে তার গর্ভ দিয়ে ধরে রাখতে চেয়েছিল; তার মৃত্যুর সাথে সাথে ওর গর্ভজাতটিও মরেছে। 

         তবুও সন্তানকে তো বর্জন করা যায় না। সে যত খারাপই হোক সে আত্মজ! তাকে অস্বীকার করা মানে নিজের শরীরকে অপমান করা। গিরগিটি -মানুষের ভিড়ে এক রঙ নিয়ে থাকা অভিযোজনের প্রতিকূলে। নতুন প্রজন্ম সে পাঠ তাড়াতাড়ি নেয়। পুরনোরা পিছিয়ে থাকে। সেই পাঠের ওভাবেই বাঁধে জেনারেশন গ্যাপ। সন্তান যেন রাত কাটানোর আশ্রয়ের জন্য লুকিয়ে রাতের অন্ধকারে মায়ের কাছে আসে। সকালে হোটেলের ভাড়া বাবদ কিছু টাকা রেখে আবার মিলিয়ে যায় দিবালোকে কোনও আঁধার জগতের ভিড়ে। নাদিয়া ও টাকা ছুঁতে চায় নি প্রথম প্রথম। সে প্রথমের আড়মোড়া ভাঙতে যেটুকু সময়। তারপর সব হিসেব গুলিয়ে দেয় জীবন। 

          অভিমানের চেয়ে আহার বড়। অধিকারের চেয়ে আত্মিক টান। দিন দিন পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে। একদিনের তাপে অঝোর বর্ষা ভরা মাঠ শুকিয়ে যায়। চোখের জল শুকোতে কতক্ষণ! নাদিয়ার দেরি হয় নি। শরীরের সাথে চোখের জলও শুকিয়ে এল। শুকনো ডালের খটমট জড়িয়ে ধরল গাছটিকে। তখন ফল ভেসে গেছে স্রোতে। গাছ থেকে অনেক অনেক দূরে!

                                 ----

- সুসি তাড়াতাড়ি গোটা। ঘাটে কী লাফড়া জানিস তো!
সুস্মিতার সময়-জ্ঞান ছিল না এতক্ষণ। আজ মেয়েদের উৎসব; ওরা আজ উমার মত সিঁদুরে রাঙাতে চায় নিজের মুখ ও মন। বোন আর পাড়ার মহিলাদের সাথে সিঁদুর খেলছিল ও। বেলা বারোটা বাজতে চলেছে! ওর হাতে ঘড়ি থাকলেও বিশেষ মুহূর্তে মেয়েদের ঘড়ি অকেজো হয়ে যায়। 
রাকেশের তাড়ায় ধাতস্থ হল; - ও মা! ক’টা বাজল গো?
- হাতের ঘড়িটা দ্যাখ!
- বারোটা বেজে গেল তো। অ্যাই রুমি তাড়াতাড়ি কর। কত বেজে গেল রে!
রুমিও আনন্দে আত্মহারা। তরুণ গালে রাঙা সিঁদুর যেন বসন্তের কৃষ্ণচূড়া। রাকেশ তাড়াহুড়োতেও আটকে যায় ওই রাঙা নারীসৌন্দর্যে। সুস্মিতা প্রমাদ গোনে। 
- ওই যাও মিষ্টিগুলো কোথায় রাখলে? সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে মাকে তুলতে হবে যে!
রাকেশকে মোহ ভেঙে উঠে যেতেই হয়। রুমিতা মুখ ব্যাঁকায়। রাকেশকে সে যে একদম প্রশ্রয় দেয় না তা নয়। তবে কেড়ে নেবার কথা ভেবে না কখনও। দিদির সন্দেহে খানিক লজ্জাও আঁকড়ে ধরে তাকে। অপ্রস্তুত ভাবটা কাটিয়ে উঠতে রাকেশের কাছ থেকে মিষ্টি নিয়ে অন্যান্য মহিলাদের দিকে এগিয়ে যায়। সুস্মিতাকে ক্ষণিক অন্তরঙ্গতার সুযোগ করে দেয়।

       কিছুক্ষণের মধ্যে প্রতিমা বাঁশে বেঁধে মেটারোডে উঠে গেল। ওরা সুইফট গাড়িতে প্রতিমার পেছনে যাবে। এসিতে উঠে স্বস্তি পেল। বাইরে যা গরম! চেনা রিংটোনে রাকেশের আইফোন বেজে উঠল; মন্টু, - বশ! খারাপ খবর আছে।
- কী?
- মা... ইয়ে নাদিয়াজি মারা গেছে।
- হুঁ!
- আমি..
- নিমতলায় যা। বিসজ্জন দিয়ে আসছি।

      সুস্মিতা আর রুমিতা দুই বোন থ্রি-সিটারে ওর পাশেই বসেছে। ওরা ফোনের ওপাশের চাপা আওয়াজ কিছুটা শুনতে পেল।
    রাহুল গুম হয়ে গেল। যতই হোক ওই যে আত্মিক যোগ। এড়িয়ে চলা যায়; অস্বীকার করা সহজ নয়। রুমিতা ওর দিদিকে দোষ দেয়; একটা মুমূর্ষু মানুষকে একটু দেখাশুনো করলে কী হত! খুলেছে তো সমাজসেবী সংস্থা। সেবা না হয় একটু শাশুড়িকে দিত! নিজে না পারলে আয়া রেখে লোকে করে না কী? নিষিদ্ধ পল্লীতে খাবার পোশাক বিতরণ কী শুধু নাম কেনার জন্য? মিডিয়ার সামনে যত ভাষণ! অথচ ওই মহিলা যদি কিছুটা শুশ্রূষা পেত হয়তো আরও কিছুদিন বাঁচতো। এই ব্যাপারে রাকেশকেও দোষ দিতে হয়। কোনও মেয়েমানুষের কথা শুনে মাকে ছেড়ে আসা কী যায়? আচ্ছা সে নিজে হলে কি করত? সেও কী দিদির মত সব স্বামীকে সব সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে বলত! যে নারী সমাজের কাছে পতিতা বলে পরিচিত তার সাথে কী একঘরে থাকা যায়? হয়তো যায় না; কিংবা চাইলেও সমাজ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে একসাথে থাকা না গেলেও শেষ অবস্থায় দূর থেকে হলেও এই মহিলার চিকিৎসা করাত সে।

        দিদির সম্পূর্ণ ঘটনা ওর অবগত। প্রথমবার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর সুস্মিতা সম্পর্কের ব্যাপারে খুব ফেরোসাস হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ডিভোর্সী মেয়েকে মেনে নেওয়ার মত মনের জোর কম পুরুষের আছে। রাকেশের ফ্যামিলি ব্যকগ্রাউন্ড ভালো হলে ওকে মেনে নিত কি? কিছুদিন বাপের বাড়িতে বসে থেকেই ও হাঁফিয়ে ওঠে। আত্মীয় স্বজনদের নানা প্রশ্ন উপযোগ অভিযোগ উপদেশে কান টেকা দায়! ওই সময় তার মনে হত বাড়ি থেকে বেরোতে পারলেই বাঁচে। 

       প্রথমে কিছুদিন প্রাইভেট টিউশনি করেছিল। তারপর জুয়েলারি শপের সেলসম্যানের কাজ; ও পরে পরিচিত কয়েকজনের বদান্যতায় সমাজসেবী সংগঠন করে। কিন্তু করলেই তো হল না। এখন তো লতাপাতার মত এদিক ওদিক গজিয়ে উঠছে সমাজসেবী সংগঠন। সবার মুখে এক বুলি দুঃস্থদের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। অনুদান দিন, চ্যালেঞ্জ নিন, আরও পাঁচ রকম বক্তেমি।

      একটা শক্ত গাছ দরকার ছিল এ লতার বেয়ে চলার। পেল কয়েক বছর পর। একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চে আলাপ হল রাকেশের সাথে। ও বালির মাফিয়া। বেশ দুপয়সা কমিয়েছে; পলিটিক্যাল ব্যাকআপও গড়ছে তখন। এরপর উপরে উঠতে হলে মিডিয়ার ব্যাকআপ চাই। জনগণের সামনে সমাজসেবার টোপ দরকার।তাই ওদের সংস্থায় সভাপতিত্বের আহ্বান লুফে নিল সে। তারপর সুস্মিতার সাথে প্রেম, অন্তরঙ্গতা। শুধু সভার নয়; ওরও পতিত্ব নিতে হল। কিন্তু এসবের মধ্যে থেকে নাদিয়ার সাথে সম্পর্কটা বিদায় নিল ধীরে ধীরে। এরকম নারীর ছেলে হিসেবে ওকে মেনে নেওয়া সহজ না। একে তো মুসলিম; তারপর পতিতা। মায়ের সাথে ক্ষীণ হয়ে আসা সম্পর্ক থেকে রাকেশকে বেরিয়ে আসতে হল। 

                       ----

       দেবীমূর্তির বিসর্জন দিতে দেরি হল না। রাকেশের লোক ধরা ছিল। বিকেলের মধ্যেই ওখান থেকে নিমতলায় এল। মন্টু ওদের শবদেহর দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল; - ম্যাডিকেল সাটফিকেট কী লাফড়া গুরু! করোনার ছাপ্পা পড়লেই বডি ভ্যানিশ।
- হুঁ!
রাকেশ গুম হয়ে আছে এখনও। নাদিয়া স্নাত শব-শরীর সব কালিমা মুছেছে। ফুল-চন্দন চর্চিত প্রৌঢ়র সর্বাঙ্গ। এতদিন এই শরীরে ফুল রাকেশের জঘন্য লাগত; আজ তেমন লাগছে না। সে শেষবারের মত প্রণাম করল; ওর পাশে রুমিতাও।
ওদের দেখাদেখি সুস্মিতাও দূর থেকে প্রণাম জানাল প্রৌঢ়কে। রাকেশ অবাক হল না। সময় মানুষের সব দম্ভ বিদ্বেষ কলঙ্ক কেড়ে নেয়। 

    এরপর বিদায়ের পালা। শবদেহ ধাতব শব্দে চুল্লীতে প্রবেশ করল। কিছুক্ষন বাদে বেরিয়ে এল ছাই হয়ে। রাকেশ হিন্দু আচার মেনে অস্থি বিসর্জন দিল গঙ্গায়। 
দেবীর মৃত্তিকা ও মানবী মূর্তির অবশিষ্টাংশ ভেসে চলল। ও অনেকক্ষণ তাকিয়ে আছে অস্থি যাত্রার দিকে। জলে হবু ডুবু খেয়ে ডুবে ভেসে কিছুদূর এগিয়ে মিলিয়ে গেল। সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হতে হতে মিশে যাচ্ছে রাত্রিতে। এ রাত্রি কাটলে আবার নতুন ভোর! কোলাহলে মিশে ম্লান হবে সব কালিমা। তাদের কথা আবার শোনা যাবে যারা বেঁচে আছে। আর যারা মৃত তারা হারিয়ে যাবে ধীরে ধীরে।

   রুমি রাকেশের কাঁধ স্পর্শ করে বলল; - চলো ফিরতে হবে এবার! 
সুসি বলল; - ওকে আর একটু থাকতে দে রুমি। খানিক থেমে বলল;- দ্যাখ, একই নদী; মানুষ আর মাটির বিদায়ের মিল কেমন! শুধু সমুদ্রে হারিয়ে যাবার অপেক্ষা।
    রুমি দিদির মুখে এরকম কথা কথা শোনেনি। অবাক হয়ে তাকায় ওর দিকে। ওর মনে হয় তার এতদিনের অভিযুক্ত মানুষটার সব অহংকার আজ নাদিয়ার অস্থির সাথে ভেসে গেল গঙ্গায়। 

drdebadyuti.karan@gmail.com
পূর্ব মেদিনীপুর




Wednesday, October 21, 2020

সেই মুহূর্তে

 

ছবি : ইন্টারনেট

                                                                        ড: করণ দেবদ্যুতি

- ভাইয়া, থোড়া রুখো। দেখো উধার... কই আদমি রোডকে উপর গির গ্যায়া!

শামসুর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রাজিয়া ভুল বলেনি। রাস্তার উপর একটা মানুষ নড়ছে। পাশে পড়ে আছে বাইকটা। হয়তো ওই ব্যক্তিরই।

- হাঁ; শায়দ কিসিকো অ্যাকসিডেন্ট হুয়া!

এরকম শুনশান রাস্তায় অ্যাকসিডেন্ট হওয়া খুব বিপদজনক। মানুষটা এভাবে কতক্ষণ পড়ে আছে তার ঠিক নেই। এখুনি এর চিকিৎসা প্রয়োজন। এভাবে সারারাত পড়ে থাকলে বেঘোরে মারা পড়বে। এই এলাকায় হাসপাতাল নেই। নেশান্যাল হাইওয়ের উপর অখ্যাত একটা জায়গা।  

ওরা মানুষটাকে আরও একটু ভালো করে বোঝার জন্য কাছাকাছি যায়। মাঝে মাঝে তার মুখ থেকে কিছু আর্ত ধ্বনি বের হয়ে আসছে। হেলমেট পরিহিত লোকটার পোশাক ভদ্র ও মার্জিত। হুজুগে বা গুন্ডা প্রকৃতির বলে মনে হয় না। ওরা ভালো করে দেখার জন্য মোবাইলের টর্চ জ্বাললো। হেলমেটে ঢাকা আংশিক মুখটা দেখে মনে হয় নিতান্ত ভদ্রলোক। বাঙালি বলেই মনে হয়। ওরা দীর্ঘকাল ধরে বাংলার বাসিন্দা হলেও হিন্দিভাষী মুসলিম। যদিও বাংলা ভালই বলতে পারে।

ওরা নিজেদের মধ্যে কিছুসময় কথা বলে ঠিক করল ওদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আজ রাতের মত চিকিৎসার বন্দোবস্ত করবে। এই সিদ্ধান্তে শামসুরের চেয়ে রাজিয়ার জোরই ছিল বেশি। এই মানুষটিকে দেখে তার যে শুধু ভদ্রলোক বলে মনে হয়েছে তাই নয়। তার চেয়েও আরও কিছু বেশি। সে ব্যাপারে যথা সময়ে যদি তার মনে হয় অন্যকে জানাবে এখন শামসুরকেও কিছু বলল না। শুধু জোর দিয়েই বলল, এরকম একটা মানুষকে রাস্তায় তারা মরতে দিলে আল্লাহ তাদের কখনও কবুল করবে না। শামসুর রহমান ধার্মিক মানুষ; আল্লাহের প্রসঙ্গ তোলায় দ্বিরুক্তি করল না। বোনের কোথায় নিস্বব্দে মাথা নাড়ল।

ওরা লোকটার হেলমেট খুলে মুখে জল দিল। তার নাম জিজ্ঞেস করল। কিন্তু সে আর্তনাদ মিশিয়ে কি উত্তর দিল বোঝা গেল না। শামসুর ব্যবসায়ী মানুষ, এই অঞ্চলের পুলিশদের সাথে পরিচিতি আছে। স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে ফোন করে ঘটনার বিবরণ দিয়ে দুজনে তাকে ধরাধরি করে লোকটাকে গাড়িতে তুলল। লোকটা রাজিয়ার জলের বোতলের দিকে হাত দেখাল। ও তার মুখে কয়েক চুমুক জল ঢেলে দিল। জল খাবার পর লোকটা গা এলিয়ে দিল ব্যাক সিটে। রাজিয়া সামনে দাদার কাছে না বসে পেছনে আহত ব্যক্তিটির কাছে বসল। এই অবস্থায় ওর কাছে থাকা বেশি জরুরি। 

লোকটা জল খেয়ে ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে বলল,- কো.. থায় যা..চ্ছি?

রাজিয়া উত্তর দিল,- আপনার চিকিৎসা দরকার। এখন আমাদের বাড়ি যাছি।

আহত লোকটা ওর মুখ ভালো করে নিরীক্ষণ করল। কিছু বোঝার চেষ্টা। হয়তো স্বস্তি পেল; ঘাড় এলিয়ে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল। অ্যাকসিডেন্ট হলে ব্যাথা উপশমের জন্য শরীর থেকে একরকম মরফিন বের হয়। সেই কারণেই হয়তো এত সহজে ঘুম এল। রাজিয়া তাকে দেখল ; ঠিকঠাক ঘুমিয়েছে তো? ও উপলদ্ধি করল এই ব্যক্তির শরীরে আর চেতনা নেই; অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ও ঝুঁকে পড়ে তাকে দেখল কিছু সময়। লোকটি সুপুরুষ, বলিষ্ঠ চেহারা। নাজিমের সাথে কিছুটা মিল। দূর থেকে দেখলে ও আবেগের বশে হয়তো নাজিম বলে ভুল করত। তফাৎ অনেক। এ লোকটি লম্বায় কিছুটা খাটো, চেহারাও আলাদা; চশমা পরে। রিমলেস চশমাটায় ফাট ধরেছে। লোকটাকে দেখে বেশ শিক্ষিত বলে মনে হয়।

ব্যবসায়ী বাড়িতে শিক্ষা না ঢুকলে অনেক সময় কাঁচা টাকার সাথে উৎশঙ্খলতা ঢোকে। তবে রাজিয়া শিক্ষিত। গ্র্যাজুয়েশনের পর আরও এগোনোর ইচ্ছে ছিল কিন্তু ওইসময় ওর আম্মা মারা যায়। সেই মৃত্যুতে ওর মন ভেঙেছিল ; আর পড়া হয়ে ওঠেনি। নাজিমের ব্যাপারটা ওর স্কুল জীবনের সাথে জড়িত। সে ওর গৃহশিক্ষক ছিল; বিজ্ঞান পড়াত। ওর বাড়ির মেয়েদের কোচিং সেন্টারে গিয়ে পড়ার স্বাধীনতা ছিল না। মাধ্যমিক পর্যন্ত নাজিম ওকে বাড়ি এসে গণিত আর বিজ্ঞান দেখাত। ছাপোষা বাঙালি ঘরের মুসলিম ছেলেটির প্রতি ওর দুর্বলতা জেগেছিল সেই তখনই। পড়ার সময়টা তার সহচর্যে বেশ ভালো কাটত। পড়তে পড়তে ওর মুখের মধ্যে হারিয়ে যেত যেন। নাজিম ছোট একটা প্রাইভেট স্কুলে কাজ করত, আর দু চারটে টিউশনি। অন্যদের থেকে আলাদা করার মত কিছু যে ছিল তার মধ্যে তা নয়। তবে পড়াত বেশ ; পড়া এবং পড়ানোটাই যেন ওর নেশা। 

ভালোলাগাটা ঠিক কখন থেকে ও বুঝে উঠতে পারেনি। ছেলে মানুষি অনুভূতিটাই ওকে উন্মাদ করত। মাধ্যমিকের পর যখন ইস্কুল টিউশনি পরিবর্তন হল, কয়েকবার চিঠিও লিখেছে নাজিমকে। নাজিম কী ওর ফিলিংসগুলো বুঝত? পশ্রয় দিত! নাকি সেও ওকে ভালোবেসে ছিল! না বাসলে ওর চিঠির উত্তরে দেখা করত কেন? তবে মুখে কখনও ওকে ভালোবাসার কথা বলেনি। হয়তো তার মধ্যে বাস্তব বোধ প্রবল ছিল। এই সম্পর্কের যে কোনও পরিণতি হবেনা সে আগে থাকতেই বুঝেছিল। সেই বাস্তবই মিলেছিল ওদের জীবনে। ওদের দুজনকে একবার ওদের এক আত্মীয় দেখে ফেলে। সে খবর যায় ওর বাবার কানে। তিনি শুধু ব্যবসায়ী ছিলেন না; এখানকার পলিটিক্যাল মাথাদের সাথেও দহরম ছিল। শোনার পর তিনি ওকে ঘরে তালা দিয়ে রেখেছিলেন বেশ কিছুদিন। নাজিমকে গুন্ডা মারফৎ হুমকি দেওয়া হয়। সে এরপর কখনও ওর দিকে তাকায় নি। রাজিয়া তাকে দোষ দেয় নি, ওর বাবার প্রভাবে ওই ছাপোষা ছেলেটিকে ভিটেবাড়ি ছাড়া করতে দুদিনের বেশি লাগত না। রাজিয়া মেনে নিতে শিখেছিল। বা হয়তো নাজিমকে সুস্থ থাকতে দিতে ভুলে যেতে হয়েছিল তাকে। 

সেই প্রভাবশালী মানুষটা আজ কয়েক বছরে দুবার সেরিব্রাল অ্যাটাকে পঙ্গু হয়ে বিছানা সজ্জায়। রাজিয়া একটা স্কুলে চাকরি নিয়েছে। ওর দাদা এখন বাবার ব্যবসা দেখছে। পুরনো দুটো মানুষের ফাঁকা  জায়গাটা ওর দাদার সংসার ভরে দিয়েছে। শুধু এসবকিছুর হারিয়ে গেছে ওর জীবনের নাজিমের ক্ষুদ্র অধ্যায়টুকু।

  ***

রাজিয়া লোকটাকে আরও ভালো করে দেখে । নাজিমের সাথে এর মিল কতটুকু? অল্পই! তবুও ওকে দেখে তার নাজিমের কথা মনে পড়ল কেন? যখন মোবাইলের আলোয় ওর হেলমেটে আবদ্ধ মুখটা দেখেছিল ও নাজিম ভেবে আঁকতে উঠেছিল। মুহূর্তের জন্য হলেও সে শিহরণ এল কেন? এখনও কি সে ভালোবাসে ওকে? না না, ভালোবাসে না। সে তো দূরে সরে যেতেই চেয়েছিল। ওই ঘটনার এক বছরের মধ্যে সে বিয়ে করে। হয়তো রাজিয়ার বাবাকে পাকাপাকি ভাবে বোঝানোর জন্যই যে সে ওর পথ থেকে সরে গেছে। তবুও কিসের এত টান! নাকি এই ব্যক্তির প্রতি হঠাৎ জন্মানো পূর্বরাগ? এই কথাটি ভাবা মাত্র ওর মনে তীব্রভাবে কোনও আশঙ্কা জাগল। ও পোশাকের উপর দিয়ে আহত মানুষটির আঘাতের অনুমান করতে চাইল। আল্লাহ করুন আঘাত যেন গুরুতর না হয়, মানুষটা বেঁচে থাকে। আবার কেড়ে না নেন তিনি!

কয়েক মুহূর্ত পর লোকটি চোখ খুলল। রাজিয়াকে তার উপর ঝুঁকে থাকতে দেখে বিস্মিত হল। ও অপ্রস্তুত ভাবে চোখ সরিয়ে নিল। হয়তো সেই অপ্রস্তুত ভাবটা কাটানোর জন্যই জিজ্ঞেস করল, - নাম কী আপনার?

একটু বিশ্রাম পেয়ে লোকটি বোধ হয় চাঙ্গা হয়েছে কিছুটা। স্পষ্ট উচ্চারণে বলল,- আবির.. আবির মিত্র।

রাজিয়া সকৌতুকে হাসল। আল্লাহ নাজিমকে দিয়ে তো তার সাথে কম খেলা করেন নি। এবার আবার হিন্দু! ভাগ্যিস আব্বা আজ পঙ্গু নাহলে এই লোকটিকে বাড়িতে তোলাই মুশকিল হত। দাদাকে বলে দিতে হবে এই লোকটির পরিচয় বাড়ির অন্যদের থেকে কিছুটা গোপন রাখতে। সে আবার জিজ্ঞেস করল, - কোথায় থাকেন? 

আবির উত্তর দিল, - বউবাজারের কাছে। আমাদের পৈতৃক বাড়ি ওখানেই।

ও অবাক হল। কলকাতা থেকে এতদূরে রাতে এই লোকটা কী করছিল? কোথায় যাচ্ছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়ায় আবিরই দিল। ও পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। বহরমপুরে ওদের একটা প্রজেক্টের কাজ এতদিন লক ডাউনে আটকেছিল। ইদানিং শুরু হয়েছে। সেই কাজের জন্য ওর এখন যাওয়া খুব জরুরি হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে কোনও গাড়ি কলকাতার বাইরে যেতে চাইছিল না। তাই শেষমেষ বাইকে রওনা দিয়েছিল। মাঝপথে এই কান্ড! 

আরও কিছু সময় ওদের মধ্যে কথা হল। রাজিয়া তার পরিচয় জানাল। আবিরের মধ্যে এতসময় যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব চলছিল কোনও বদমায়েশ রেকেটের হাতে পড়েছে কিনা; সে আশঙ্কা গেল। রাজিয়া মেয়েটা মুসলিম হলেও শিক্ষিত এবং মার্জিত। ওর মধ্যে একটা তীক্ষ্ম ব্যক্তিত্ব আছে চোখে পড়ার মত। অসুস্থ অবস্থাতেও সে ওর সাথে কথা বলে মুগ্ধ হল।

   ***

আরও কিছুসময় গাড়িটি একটা বিশাল অট্টালিকার সামনে এসে দাড়াল। শামসুর আর রাজিয়ার দীর্ঘ সুঠাম দেহ আবিরকে তুলে আনল দোতলার একটি অতিথি কক্ষে। সেগুন আর শিশু কাঠের সুন্দর নক্সা করা দরজা আসবাবে সুসজ্জিত সমগ্র গৃহটি। বাহারি আলোয় ভরপুর। প্রাচুর্য্য যেন আগলে রেখেছে সমস্ত গ্রহকোণ। 

আবিরের সমস্ত নোংরা মোরাম লাগা পোশাক কাঁচি দিয়ে দিয়ে কেটে শামসুরের নতুন একটা কুর্তা পাজামা পরানো হয়েছে। ড: আসগর ওকে ভালো করে পরীক্ষা করলেন। অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সচলতা বিচার করে জানালেন; বড় চোট আছে বলে তো মনে হয় না। পায়ের কোনও হাড় গেছে। কোমরের হাড় গেলে উনি নিজে থেকে বসতে পারতেন না; পারলেও ভীষণ কষ্ট হত। এক্সরে না হওয়া পর্যন্ত কোন হাড় ভেঙেছে তা বলা যায় না। তবে কোনও বড় হাড় নয় তাহলে হাত দিয়ে বুঝতে পারা যেত। উনি পথের মাঝে ভয়েই বেশি অসুস্থ বোধ করছিলেন। তাই হয়তো সংজ্ঞা হারাতে বসেছিলন। রাতটা বিশ্রাম পেলেই অনেকটা সেরে উঠবেন। তিনি কিছু পেন কিলার জাতীয় ওষুধ আর ব্যথার মলম এনেছিলেন। তা-ই রাতের মত দিয়ে একটা প্রেসক্রিপশন করে দিয়ে গেলেন।

মানসিকভাবে সুস্থ বোধ করার পর আবির দুজনকে ফোন করল। প্রথমে মাকে; সামান্য চোটের কথা জানিয়ে কতগুলো মিথ্যে কথা বলল। যাতে তিনি দুশ্চিন্তা না করেন। দ্বিতীয় ফোনটা করল; প্রজেক্ট সাইটে। আগামীকাল সকালে এই লোকেশনে একটা গাড়ি পাঠাতে বলে। সে ওখানে পৌঁছলে বসে থেকেও কাজ অনেকখানি এগোতে পারবে। তাকে দেখলে ওয়ার্কারাও ভরসা পাবে। বাইকটা স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের হেফাজতে আছে। সেটাকেও পরে সময় করে নিয়ে যাবার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আর রাজিয়া? যে মেয়েটি এত সময় ধরে তাকে নিরীক্ষণ করল তার কথা সে ভাববে না? মনে পড়তেই সে হেসে ফেলল। মেয়েটা কিন্তু বেশ! এখন কী মানুষ জাত ধর্ম নিয়ে ভাবে? অজাত বেজাতকেও কী মানুষ ভালোবাসে না? কিন্তু সে এরকম ভাবছে কেন! রাজিয়ার কাজে কীই প্রমাণ পাওয়া যায় সে তার প্রতি অনুরক্ত! দাদাকে বুঝিয়ে, তার পরিচয়টা সবার চোখের আড়ালে রেখে তাকে এবাড়িতে এনেছে ঠিকই। এতে কী ভালো লাগা প্রমাণ হয়? না সে বড় আগডুম বাগডুম ভাবছে। চিন্তা গুলো মাথা থেকে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। 

দরজায় কেউ কড়া নাড়ে; - এই যে; আসব?

খুব ভুল না করলে রাজিয়ার গলা। ও চমকে ওঠে। এ কি টেলিপ্যাথি? ভাবতে ভাবতেই মানুষ হাজির। একটা খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে রাজিয়া দরজায় এসে দাড়িয়েছে। ও আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে উঠে বলে; - হ্যাঁ, আসুন আসুন। কী মুশকিল, বাইরে দাড়িয়ে কেন?

- ভাবলাম না বলে এলে খারাপ ভাবতে পারেন। আপনারা ভেতো বাঙালি না!

দুজনেই একটু হাসল। আবির বলল; - বাঙালিদের উপর খুব রাগ দেখছি! ... কেন?

- ভেতো যে! - রাজিয়া উজ্জ্বল সাদা দাঁত গুলো বের করে আরও একটু হাসল। তারপর একটু কসরত করে বলল; - এগুলো সব খেয়ে নিন দেখি। ... তারপর আবিরের হাতে আঁচড়, ক্ষত গুলো লক্ষ্য করে বলল; - ভেতো, খাবেন কীকরে! হাত ছিঁড়ে বসে আছেন যে?

- না না, একটা চামচ দিন ঠিক খেতে পারব। ভাত খাই বলে এত দুর্বল নয়!

রাজিয়া উজ্জ্বল হাসল। বলল, - দাড়ান আমি খাইয়ে দিচ্ছি।

ও আবিরের কাছে চেয়ার টেনে বসে প্রথমে গ্লাসের গরম দুধটুকু খাওয়ালো তারপর বাকি খাবার গুলো একটু একটু করে যত্নে তুলে দিতে লাগল ওর মুখে। আবির অনুরাগের দৃষ্টিতে দেখে যেতে লাগল রাজিয়ার কমনীয় লাবণ্য, সুন্দর মুখশ্রী; কোমল হাত, লম্বা নারীসুলভ আঙুল আর আভরণে আবৃত দেহ সৌষ্ঠব। তার এত সময়ের আপাত আগডুম ভাবনাগুলো কী খুব ভুল ছিল? 

প্রতিবার খাবারের সাথে রাজিয়ার হাতটা  আবিরের মুখের কাছে উঠে এসে তাকে চমকে দিচ্ছে আরও আরও করে।

  ***

পরদিন সকালে আবির আর্ম ক্রাচে ভর দিয়ে এগিয়ে এগিয়ে গেল তার প্রজেক্ট সাইট থেকে আসা গাড়ির দিকে । রাজিয়া পেছনে পেছনে গেল তাকে এগিয়ে দিতে। গাড়িতে ওঠার সময় ও রাজিয়ার দিকে উজ্জ্বল হয়ে তাকিয়ে বলল; - তাহলে গতকাল রাতের কথা মত কলকাতায় আসছেন তো?

রাজিয়া মৃদু হেসে মুখ নিচু করে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।

গতকাল রাতে আবির ওকে কলকাতার গল্প করেছিল। কলকাতার কর্মব্যস্ততা, প্রাণচঞ্চলতা, ঘামে ভেজা আফিস টাইম, বিকেলের অফিস ফেরতা রেস্টুরেন্টের ভিড়, গিসগিসে বাড়িঘর, তাতে কাজের সন্ধানে উপচে পড়া মানুষ; আর কলকাতার পুজো! জানা জিনিস একটু নতুন করে। ওর বাড়ির সকলের কথা। ওদের বাড়ির সেই আদ্যিকালের দুগগা পুজো! 

রাজিয়া আবিরের দূরে মিলিয়ে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে ভাবল তাকে কলকাতা যেতেই হবে। ততদিন সঙ্গে থাক গতকাল রাতের ওকে কাছে পাওয়ার মুহূর্তগুলো। আল্লাহ শেষে একটা হিন্দু নাজিমকে তার কাছে এনে দিল। ভেবেও একটু লজ্জার হাসি হাসে সে।

আবির ওয়ার্ক সাইটের গাড়ির ব্যাকসটে হেলান দিয়ে বসে ভাবে সেই মুহূর্তে তার দুর্ঘটনা না ঘটলে তার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা থেকে সে বঞ্চিত হত।

drdebadyuti.karan@gmail.com
পূর্ব মেদিনীপুর