![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
আগন্তুক
মণিমোহন বন্দোপাধ্যায়
(এক )
বিকেল পাঁচটা বাজতেই অভ্যেস মত গুটিগুটি নিজের নার্সিংহোমের দিকে রওনা দিলেন নীলকমল ।
বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই, তবু নিয়মমাফিক সকালবিকেলের এই রুটিনটাই তাঁকে আজও সচল রেখেছে ।এমনিতেই কর্পোরেট চিকিৎসা ব্যবসার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী থাবার জেরে, ছোট বা মাঝারি নার্সিংহোমগুলো আজ ক্ষীয়মান l অচিরেই এগুলো এক বিলুপ্ত প্রজাতিতে পরিণত হতে চলেছে l
রাজনীতির কেষ্টবিস্টু , বড়ো ব্যবসায়ী, প্রোমোটার, মায় বিড়িফ্যাক্টরির মালিক, সবাই নার্সিংহোম আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসায় কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে l..
শহরতলি থেকে বড়ো শহর, গ্রাম গঞ্জ সর্বত্রই এক পরিস্থিতি l
তার উপরে, একগুচ্ছ হেলথ লাইসেন্স, দমকলের ছাড়পত্র, পলিউশন বিভাগের কড়াকড়ি, সর্বোপরি সরকারি স্বাস্থ্যকর্তাদের তুঘলকী ফরমান আর লালফিতের ফাঁসে তিতিবিরক্ত হয়ে বেশকিছু ডাক্তারই তাঁদের নার্সিংহোমের পাট চুকিয়ে দিয়েছেন l
নীলকমলের অবস্থাও সেরকমই l.. বেড আর কর্মচারীর সংখ্যা কমতে কমতে এখন এই নার্সিংহোম টিমটিম করে কোনোমতে তার অস্তিত্ত্ব জিইয়ে রেখেছে l
অথচ, দু-দশক আগেও এটা ছিলো এ তল্লাটে সবচেয়ে চালু l
অমায়িক ব্যবহার, অক্লান্ত পরিশ্রম, ভালো চিকিৎসা আর রোগীকে অহেতুক চাপ দিয়ে টাকা রোজগারের খাঁই না থাকায় নীলু ডাক্তারের তখন এ শহরে ব্যাপক পসার l
কিন্ত কালের চাকা ঘোরে, সময় তো বদলায় l
বেলা পড়ে আসে l.. বয়সও বাড়ে l
ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, সাউথ কোরিয়ায় l..মেয়ে তার স্বামীর কর্মসূত্রে লিসবনে l.. স্ত্রী সুরমার মৃত্যুর পরে, নীলকমল বড্ড একা হয়ে গিয়েছিলেন l..তখন এই নার্সিংহোমে সকাল বিকেলে ব্যস্ত থাকাটাই তাঁকে একাকিত্ব থেকে কিছুটা হলেও রেহাই দেয় l
সন্ধ্যে গাঢ় হয় l
হাসপাতালের বেড সবই প্রায় খালি l..চেম্বারে বসে মোবাইল ঘাঁটছেন l
পুরোনো কর্মী মিশির চা দিয়ে গ্যাছে l
হঠাৎ দারোয়ান রামভজন এসে খবর দিলো, একটু আগেই একটা লোককে দেখা গ্যাছে, প্রবেশপথের সিঁড়িতে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতে l
নীলকমল উঠে দাঁড়ালেন l..এরকম বিনা পয়সার চিকিৎসা তাঁকে প্রায়ই করতে হয় l
গিয়ে দ্যাখেন, শীর্ন এক বৃদ্ধ সিঁড়ির ধাপে পড়ে আছে, জ্ঞান নেই l পরনে ময়লা ফতুয়া আর খাটো ধুতি, পায়ে ক্ষয়াটে হাওয়াই চপ্পল l..পকেট হাতড়েও তার ঠিকানার কোনো হদিস উদ্ধার করা গ্যালো না l
গায়ে হাত ঠেকাতেই বুঝলেন বেজায় জ্বর l.শ্বাসকষ্টও l
ধরাধরি করে বেডে নিয়ে আসা হোলো l
পরীক্ষা করে দেখা গ্যালো ফুসফুসে গভীর সংক্ৰমণ, হয়তো নিউমোনিয়া l
চিকিৎসা শুরু হোলো l..কিন্ত অচেতন রোগীর নামধাম তো কিছুই জানার উপায় নেই !
রাত ডিউটির কম্পউণ্ডারকে ওষুধপত্র, ইনজেকশন বুঝিয়ে দিয়ে রাতে বাড়ী ফিরতে বেশ দেরী হয়ে গ্যালো নীলকমলের l
পরেরদিন দুপুর নাগাদ লোকটার হুঁশ ফিরলো, কিন্ত আচ্ছন্ন ভাব কাটলো না l
তবুও রাউন্ডে নীলকমল জিজ্ঞেস করেছিলেন, কি নাম, বাড়ী কোথায়?
নিরুত্তর লোকটা একবার চোখ খোলে, শূন্য দৃষ্টিতে তাকায়, তারপরে পাশ ফিরে শোয় l
দিনতিনেকের মধ্যেই অল্প শারীরিক উন্নতি দেখা গ্যালো তার l
কিন্ত, বহু কসরত সত্বেও নাম, ঠিকানা কিছুই বলানো গ্যালো না l
সেদিন রাতে দীর্ঘ লোডশেডিং l এ অঞ্চলে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের প্রকোপ রীতিমত বিরক্তিকর l
রামভজন জানালো, ডিজেল আনানো নেই, তাই এখন জেনারেটার চালানো যাবে না l
সবেধন নীলমনি ইনভার্টারটাও বিকল হয়ে পড়ে আছে l.. কাঁপা কাঁপা মোমবাতির আলোতেই রাতের রাউন্ড শেষ করতে হোলো l
ফিরে আসবেন নীলকমল, এমন সময় লোকটা জড়ানো আওয়াজে ডাকলো, ডাক্তারবাবু.. !
তারপরে ঘড়ঘড়ে স্বরে বললো, আমার নাম চন্ডিদাস চক্কোত্তি, বাড়ী বাঁকুড়া, তালডাংরা l
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে, এবারে বলে উঠলো, মালতী কে মনে আছে স্যার?
মালতী ! এতকাল পরে আবার?
যেন বহু যুগের ওপার হতে ফিরে এলো একটা ভুলতে বসা নাম l
আবার ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে লোকটা বললো, মালতী আমার বৌ ছিলো, তারপর আবার পাশ ফিরে শুলো l ছিলো শব্দটার উপরে একটু বেশী জোর দিলো কি?
নিজের চেম্বারে ফিরে গিয়ে চেয়ারটাতে ধপাস করে বসে পড়লেন নীলকমল l
একটা দমকা হাওয়ার মতো, একরাশ পুরোনো স্মৃতি তাঁর সমস্ত চেতনা তোলপাড় করে দিতে লাগলো l
প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা l
নীলকমল তখন সবে পঞ্চাশের কোঠা ছুঁয়েছেন l
নার্সিংহোম সদা ব্যস্ত, বেশ রম রম করে চলছে l
দুজন আর এম ও থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত থেকে যেতে হত তাঁকে l
কখনো বা রাতভোরও হয়ে যেত বাড়ী ফিরতে l
তাই নিয়ে সুরমার সঙ্গে নিত্য খিটিমিটি আর অশান্তি লেগেই থাকতো l
ডাক্তারী পড়াকালীনই সুরমার সাথে আলাপ একটা গানের অনুষ্ঠানে l. বেশ কয়েক বছর প্রেমের পরে, তাদের বিয়েটা হয়, বেশ ঝামেলার মধ্যে দিয়ে l. নীলকমলরা উত্তর কলকাতার বনেদী বাসিন্দা, আর সুরমার বাড়ীর লোক সব পদ্মাপাড়ের l.. সে সময়েও কিছু সাবেক এদেশীয়দের কাছে বাঙ্গালদের দেখা হতো এক অস্পৃশ্য প্রজাতি হিসেবে l.. এই টানাপোড়েন বিয়ের দিন থেকেই শুরু l. সেই তিক্ততা পরবর্তী সময়ে আরো বেড়ে ওঠে l.. কয়লাখনি কোম্পানির চাকরি নিয়ে নীলকমল যখন কলকাতা ছাড়েন, ভেবেছিলেন এবারে সব স্থিতিশীল হয়ে যাবে l
কিন্ত বাস্তবে সেই তিক্ততা আর ঘোচেনি, জীবনভর তাঁকে তাড়া করে বেরিয়েছে l
ফলতঃ এক ছাদের নিচে পাশাপাশি থাকলেও, তাঁদের দুজনের সম্পর্কে শৈত্য হয়ে উঠেছিল অবশ্যম্ভাবী l
মেয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করতেই, সুরমা তার শয্যা আলাদা করে নেয় l
নীলকমলের জীবনে তখন আর প্রেম নেই, শুধুই দায়িত্ব আর কর্তব্য পালন l
এই যাঁতাকল থেকে মুক্তি পেতে কাজকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন নীলকমল l
বেশ কয়েকটা বছর এভাবেই কোথা দিয়ে পেরিয়ে গেছে l
দেখতে দেখতে নীলকমল পঞ্চাশের কোঠায় l
এর মাঝেই হঠাৎ একদিন মালতী হাজির হোলো নার্সিংহোমে l.. সঙ্গে বাবাকে নিয়ে, কাজের খোঁজে l
(দুই )
বছর কুড়ি বাইশের বিবাহিতা তরুণী, ম্লান মুখ, পরনে সস্তা সুতির ছাপা শাড়ী, দু কানে ঝোলা পুঁতির দুল l. সুন্দরী বলা যায়না, তবে প্রথম যৌবনের একটা আলগা লাবণ্য আছে l
মালতী জানাল দু এক জায়গায় কাজ করেছে, কিছু নার্সিং এর কাজ শিখেছে l. একটা প্রাইভেট নার্সিং প্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট কোর্সও করেছে l
মাধ্যমিক পাশ করার পরই, বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় নিতান্ত অল্পবয়সে l.. বছর পাঁচেকের একটা ছেলে আছে l. স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে টিকতে না পেরে মা বাবার কাছে ফিরে এসেছে ছেলেকে নিয়ে l
সে সময় ওই মফস্সল অঞ্চলে পাশ করা নার্স হাতে গোনা l.. প্রাইভেট হাসপাতালে তো কেউই আসে না, সবাই সরকারি চাকরির পিছনে ছোটে l
নীলকমল বললেন, আমার ছোটো হাসপাতাল, এখানে সব রকমের কাজই করতে হবে, দরকার পড়লে আয়ার কাজও l.. পারবে?
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় মালতী l.সেই শুরু l
অল্পদিনের মধ্যেই কাজ বেশ রপ্ত করে নিল মালতী l.. হাসিখুশি স্বভাব আর কর্মদক্ষতায় অচিরেই নীলকমলের প্ৰিয়পাত্রী হয়ে উঠল l.আর সেটাই নার্সিংহোমের দু একজন পুরোনো কর্মচারীর তীব্র ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ালো l
সময় বয়ে যেতে থাকে l
এমনিতেই রাতে বাড়ী ফিরতে বেশ রাত হত নীলকমলের, সিরিয়াস রোগী থাকলে তো আরো দেরি l..
রাতের দিকে ঘনঘন চা বানানোর ফরমায়েশ করতে হত মিশির কে l
নিজের চেম্বারে চায়ের সরঞ্জাম, মায় হিটার মজুদ থাকতো l
সেদিন মিশির নেই, কোনো কারণে l
রামভজনকে মোড়ের দোকানে ফ্লাস্ক দিয়ে চা আনতে পাঠাচ্ছে, এমন সময় মালতী বললো, স্যার, আমি চা করে দেবো?
সেই থেকে মাঝে মাঝেই রাতের দিকে নীলকমলের চা বানিয়ে দিত মালতী, যখন ওর নাইট ডিউটি থাকতো l
হঠাৎ একদিন চায়ের কাপ দিতে এসে কাঁচুমাচু হয়ে দ্বিধাজড়ানো স্বরে বললো, - স্যার, একটা কথা ছিলো l. মাইনেটা যদি একটু বাড়িয়ে দ্যান, তাহলে ছেলেটাকে একটু ভালো ইস্কুলে ভর্তি করতে পারি l
ভেবে দেখার অছিলায় সেযাত্রা এড়িয়ে গেলেও, কিছুদিন পর আবার একই অনুনয় l
আর না করতে পারেন নি নীলকমল l..এক লহমায় মনে পড়ে গিয়েছিলো তাঁর নিজের শৈশবের দারিদ্র l..এক দুর্ঘটনায় হঠাৎ বাবা মারা যাবার পরে, তাঁর বিধবা মা আকুলপাথারে পড়েন, একমাত্র সন্তান নীলকমলকে নিয়ে l..তখন স্কুলের নীচু ক্লাস l..নামী ইংরিজি মিডিয়াম স্কুল থেকে ছাড়িয়ে সরকারি স্কুলে দেওয়ার প্রবল চাপ দিতে থাকলো জ্ঞাতি -আত্মীয়র দল l
কিন্তু উনি মাথা নীচু করেন নি সেই প্রতিকূলতার কাছে l
একটা প্রাইভেট কোম্পানির সামান্য বেতনের চাকরি নিলেন, সাথে ছোট ছেলেমেয়েদের টিউশন পড়ানো, আর গভীর রাত তক সেলাই এর কাজে নিজেকে নিঃশেষ করে, ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন সেই একা মা l.আত্মীয়দের দুর্ব্যবহারে তাঁকে স্বামীর ঘরও ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল l
ভালো রেজাল্ট করে নীলকমল ডাক্তারীতে ভর্তি হলেন l.পাশ করে বেরোনোর পরে আর মা কে কাজ করতে দ্যান নি l
সেই ফেলে আসা দিনগুলোয় মায়ের সংগ্রামের কথা মনে পড়ে গেলো তাঁর l.
এবারে আর না করতে পারলেন না l কিছু বেতন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, ওর ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে l
আঁচ করতে পারেন নি, সেটাই একটা স্ফুলিঙ্গ হয়ে শেষে দাবানলের রূপ নেবে l..একটা চাপা ঈর্ষার আগুন তো ধিকিধিকি জ্বলছিলই হাসপাতালে l
মালতীর এই মাইনে বেড়ে যাওয়াটা নার্সিংহোমের কিছু কর্মীর গাত্রদাহের কারণ হোলো l
ক্রমশঃ, মালতী আর নীলকমলকে জড়িয়ে কিছু রসালো ফিসফাস দানা বাঁধতে থাকলো, পরিকল্পিত ভাবে .., যদিও তিনি সেসবে আমল দিতেন না l
কিন্তু, ক্রমশঃ ঘনীভূত হতে থাকা একটা বদ্ধ বাতাস, হঠাৎই একদিন
কালবৈশাখী হয়ে আছড়ে পড়লো, রীতিমতো অপ্রত্যাশিত ভাবে l
সেটা বৃষ্টির সন্ধ্যে l
নীলকমল চেম্বারে বসে কাগজপত্র ওল্টাচ্ছেন, অদূরে মালতী হিটারে চা করছে, এমন সময় ঝড়ের বেগে বিদ্ধস্ত চেহারায় সুরমা ঢুকে এলেন চেম্বারে l
হতভম্ব নীলকমল কিছু বুঝে ওঠার আগেই সোজা গিয়ে মালতীর চুলের মুঠি ধরে উপর্যুপরি চড় -কিল মারতে থাকলেন প্রবল আক্রোশে, সাথে সক্রোধ গালাগালি, --নোংরা মেয়েছেলে, তোর লজ্জা করে না বাপের বয়সী লোকের সাথে ঢলাঢলি করতে l..এখুনি বেরিয়ে যা, দূর হ মুখপুড়ি এখান থেকে !
প্রাথমিক ধাক্কার অভিঘাতটুকু সামলে, নীলকমল যখন লাফিয়ে পড়ে সুরমার হাত থেকে মালতীকে ছাড়িয়ে নিতে পারলেন, ততক্ষনে চেম্বারের ভিতরে নার্সিংহোমের সব কর্মীরা জড়ো হয়ে তামাশা দেখছে l
শোনো, তোমার ভুল হচ্ছে l.. এসব কি বলছো তুমি? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গ্যাছে,.... উদ্ভ্রান্ত কণ্ঠে বলে ওঠেন নীলকমল l
সুরমা থামেননি l.. সমানে তড়পাতে থাকেন, ওকে এখুনি তাড়াও, তা নাহলে আমি তুলকালাম করে ছাড়বো l.. তোমাকেও ছাড়বো না l..লম্পট, বুড়ো ভাম !
মালতী কোনো প্রতিবাদ করেনি, কোনো কথা বলে নি l.. নিশ্চুপে মাথা নীচু করে ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো l.. আর দরজার কাছে গিয়ে একটিবার মাত্র মাথা ঘুরিয়ে নীলকমলের দিকে তাকিয়েছিলো l
সেই বিষণ্ণ ,বিহ্বল দৃষ্টি আজও তিনি ভোলেন নি l
সেই সন্ধের আকস্মিক দুর্ঘটনা নীলকমলের পারিবারিক জীবন আর নার্সিংহোমের পরিবেশ দুটোকেই দুর্বিসহ করে তুলেছিলো l
এই মানসিক ও সামাজিক আঘাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন l
নার্সিংহোম কিছুদিনের জন্যে বন্ধও করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন l
পরে জানা গিয়েছিলো, কে বা কারা মালতী আর তাঁর সম্পর্কের ব্যাপারে দিনের পর দিন সুরমার কাছে মিথ্যে খবর দিয়ে গ্যাছে, উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ভাবে l
সুরমার এমনিতেই সন্দেহবাতিক ছিলো, তাই আগুন জ্বলতে দেরী হয় নি l
বাড়িতে নীলকমল একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে থেকেছিলেন দীর্ঘদিন l
সুরমা বিছানা তো কবেই আলাদা করে নিয়েছিল, এবারে বাক্যালাপও বন্ধ করে দিলো l
ছেলে মেয়ে বাড়িতে এলেও তাঁর সঙ্গে বিশেষ কথা বার্তা বলতো না l
একটা তার ছেঁড়া যন্ত্রের মতোই জীবন চলেছিলো অনেকদিন ধরে l
কয়েকমাস পরে, আবার যখন নার্সিংহোম খোলা হোলো, অধিকাংশ কর্মচারীই চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গ্যাছে, দু একজন বয়স্ক বিশ্বস্ত লোক ছাড়া l
জীবন থেমে থাকে না, আবার নতুন করে কাজের মধ্যে ডুবে থাকার চেষ্টা করলেন নীলকমল l
কিন্ত সেই ছন্দ , সেই প্রশান্তি আর ফিরে এলো না l
তাছাড়া, সন্দেহপ্রবন সুরমা প্রায়ই সময় -অসময়ে হাসপাতালে এসে হাজির হতেন নজর দারির জন্যে l
(তিন )
অনেকগুলো দিন কেটে গ্যাছে l.. এক বিকেলে নীলকমলের মোবাইলে হঠাৎ একটা কল, অজানা নম্বর থেকে l
ফোন তুলতেই একটা নারীকন্ঠ ভেসে এলো, খুব মৃদু স্বরে, " স্যার, আমি মালতী বলছি l
খুব বিপদের মাঝে আছি, তাই বাধ্য হয়ে ফোন করেছি l"
কি ব্যাপার জিজ্ঞেস করতেই মালতী বললো, "আপনাকে বিরক্ত করতে চাই না l.. তবুও বলি, আমার ছেলেটার আর লেখাপড়া হোলো না l..
প্রায় বছরখানেক বসে আছি l.. ঘরে অভাব l.. ওর ইস্কুল ছাড়িয়ে দিতে হয়েছে l.. যদি কাউকে বলে আমার একটা কাজের জোগাড় হয়, একটু দেখবেন স্যার l"
ফোন কেটে দিয়েছিলো মালতী l
কিন্তু, মনের মধ্যে তোলপাড়, আর একটা চাপা কষ্ট বেশ নাড়া দিতে থাকলো নীলকমলকে l
একদিন আচম্বিতে মনে পড়লো, মেডিকেল কলেজে ওঁর বছর দুয়ের জুনিয়র নির্মল, তার পৈতৃক শহর বাঁকুড়ায় একটা বড় নার্সিংহোম চালায় l
ফোনে যোগাযোগ করে বললেন, "শোন্, তোর নার্সিংহোমে একজন দুঃস্থ মেয়েকে একটা কাজ দিতে পারিস? অল্প নার্সিং জানে l বহুদিন বসে আছে l.. স্বামী দেখে না l.. একটা ছেলেও আছে l.. একটু দেখিস l"
অল্পদিন পরেই বাঁকুড়া থেকে নির্মলের ফোন এলো, "দাদা, তোমার ক্যান্ডিডেট কে পাঠিয়ে দাও "l
ঠিকানা জানিয়ে মালতীকে ফোন করে দিয়েছিলো নীলকমল l
ওর কাজটা হয়েও গিয়েছিলো l
দিন, মাস, বছর ঘোরে l
মালতী বছরে এক আধবার ফোন করে l.. জানায় ছেলে কোন ক্লাসে উঠলো l
এরই মাঝে, ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মত হানা দিলো মহামারী কোভিড l
প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিলেও, দ্বিতীয় বারের কোভিড আক্রমণ সুরমাকে নিয়ে চলে গ্যালো l
নীলকমলের জীবন আরো নিস্তরঙ্গ হয়ে গ্যালো l.. ছেলে, মেয়ে কেউই কাছে থাকে না এখন l.. এখন তাঁর কাছে জীবন যেন দিনগত পাপক্ষয় মাত্র l
মাঝে একদিন, মালতীর ফোন এসেছিলো l জানালো তার ছেলে এবারে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে l..কিন্ত লকডাউনে বাঁকুড়ার হাসপাতাল সেই যে বন্ধ হয়েছে, আজও খোলেনি l..
আমতা আমতা করে বলেছিলো, "কিছু যদি সাহায্য করেন স্যার, আমার হাত তো খালি l..বলেন তো ভাইকে পাঠিয়ে দোবো l..না হলে ছেলেটার পরীক্ষা দেওয়া হবেনা l"
সেসময় নীলকমল নিজেই বিপর্যস্ত, শারীরিক, মানসিক আর আর্থিক চাপে l
তাঁর অপারগতার কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন l
সেই তার শেষ ফোন l.আর তার কোনো খবর আসেনি এতদিন l
( চার )
আজ, এই এতো বছরের ওপার থেকে আবার স্মৃতি খুঁড়ে মালতী !
হঠাৎ, চেম্বারের দরজার সামনে কার নড়াচড়া l
"কে ওখানে? ভিতরে আসুন " বলে ওঠেন নীলকমল l
আস্তে দরজা ঠেলে সেই লোকটা, মালতীর স্বামী ভিতরে এসে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ায় l
নীলকমল বলেন, "তোমার ছুটি করে দিয়েছি l.. ডিসচার্জ সার্টিফিকেট অফিসে মিশিরের কাছ থেকে নিয়ে নিও l.. আর হ্যাঁ, সকালের ব্রেকফাস্টটা খেয়ে যেও l"
লোকটা নীরবে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত l
তারপর, ধরা গলায় বলে, "ডাক্তারবাবু, আপনি দেবতুল্য লোক l.. আপনার এখানে না এলে আমি মারাই পড়তাম l
আমি অল্প রান্নার আর হালুইকরের কাজ জানি l.. এ তল্লাটে একটা বিয়া বাড়িতে রান্নার কাজে হেল্পার হয়ে এসেছিলাম l
শরীল খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমায় ফেলেই ওরা চলে যায় l
মনে হোলো, আপনি এদিকেই থাকেন, তাই চলে এসেছিলাম l"
একটু থেমে কান্না ভেজা গলায় বললো, "আমি ভিকিরি মানুষ l..আপনার টাকা আমি তো দিতে পারবো না l"
--না না, টাকার কথা তুলো না l..ভালো হয়ে গ্যাছো, বাড়ী যাও l..বলে ওঠেন নীলকমল l
--"আর বাড়ী !" দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে সে l.."আমার তো নিজের কেউ নেই, একটা ভাইপো আর তার বৌ দয়া করে গাঁয়ের বাড়ীর এক কোনে ঠাঁই দেয়, দুবেলা দু মুঠো সামনে ধরে দ্যায়, এটুকুই l"
--কেনো? তোমার ছেলে? ...নিজের গলাই অচেনা ঠেকে নীলকমলের l
--"মালতী তো কবকেই আমায় ছেড়ে গ্যাচে l..আর ছেলে এখন বড়োলোক, চাকরি করে l
আমার খপর তো নেয়ই না, ওর মা কেও দ্যাখেনা l"
--"সে কী? "..নিজের অজান্তেই প্রশ্নটা বেরিয়ে আসে নীলকমলের গলা থেকে lতারপর বলে ওঠে, "মালতী কেমন আছে? "
--"সে অনেক কথা ডাক্তারবাবু !..ছেলেকে মানুষ করা আর ওর লেখাপড়ার খরচা জোগাতে মালতী সারা জীবন কষ্ট করে গ্যাচে l
আপনি ওর পাশে সাধ্যমত দাঁড়িয়েছেন l..তদবির করে ওর একটা কাজও জুটিয়ে দিয়েছেন l
কিন্তু লকডাউনে ওর বাঁকুড়ার হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গ্যালো l..তখনও ছেলেটার পড়া শেষ হয় নি l..আপনাকে আর জানায় নি,-- কোন মুখেই বা জানাবে বলুন স্যার, এক লোকাল প্রোমোটারের বাঁধা মেয়েছেলে হয়ে যায় রোজগারের জন্যে , দেখতে শুনতে তো মন্দ ছিলো না l..সেই টাকাটা পুরোপুরি ছেলের পড়াশোনাতেই খরচ করেছিল l
ছেলেও ওকে ঘেন্না করে l
সম্পক্ক রাখে নি l..মুখও দ্যাখে না বহুকাল l..জানিনা মালতী এখন কোথায় আচে l"
একটা নৈঃশব্দ নেমে এলো কিছুক্ষনের জন্যে l
আবার লোকটা বলে উঠলো মালতীকে নিয়ে আপনার নামে যে কেচ্ছা হয়েছিল, তা নিয়ে আমিও ওকে অনেক গালমন্দ করেচি l..কিন্তু জানতাম এ সকল সত্যি নয় l..আমাকে মাপ করে দিবেন ডাক্তারবাবু l"
দূর থেকে আর একবার দুহাত জড়ো করে নমস্কার জানায় লোকটা l..তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায় l
স্থানুর মতো বসে থাকেন নীলকমল l..তখন অনেক রাত l
পরদিন সকালে, হাসপাতালে আর তার দেখা পায় নি কেউ ॥

.png)
.png)





