1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label মিলি ঘোষ. Show all posts
Showing posts with label মিলি ঘোষ. Show all posts

Saturday, October 21, 2023

দরজার পেছনে কে?

ছবি : ইন্টারনেট

দরজার পেছনে কে?

 মিলি ঘোষ

সবেমাত্র কলেজের ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সারাদিন বাড়িতে বসে বসে বোর হয়ে যাচ্ছি, সময় যেন আর কিছুতেই কাটতে চাইছে না। এই সময় ক'দিনের জন্য যদি একটু কোথাও থেকে ঘুরে আসতে পারতাম মন্দ হতো না। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? অলস দুপুরে বিছানায় শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই ফোনটা বেজে উঠল। সুদীপ ফোন করেছে। সুদীপ আমার ক্লাসমেট। বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সুন্দরবনের কাছে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। কলকাতায় হস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করে। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সুদীপ বলল, "এই শোন, তোর আর সুমির তো গ্রাম দেখার খুব ইচ্ছে, এখন তো কলেজের চাপ নেই, ক'টা দিন আমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে যা। আশা করি তোদের খারাপ লাগবে না।" আরে এতক্ষণ ধরে তো এই কথাই ভাবছিলাম। মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। সুদীপকে বললাম, "হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই যাবো।'' সুদীপ বলল, ''ঠিক আছে, তাহলে কবে আসবি আমাকে জানিয়ে দিস, আমি স্টেশন থেকে তোদের নিয়ে আসবো। আচ্ছা, তবে এখন রাখি।'' সুদীপ ফোন কেটে দিল। আমি তখনই সুমিকে ফোন করে ব্যাপারটা বললাম, ওতো একবার শুনেই রাজি হয়ে গেল। দুজনে মিলে ঠিক করলাম আগামী শুক্রবারই আমরা বেরোবো। বিকেল বেলায় ঘুম থেকে উঠে কথাটা মাকে বললাম। প্রথমটাই রাজি না হলেও যখন শুনলো সুমিও আমার সঙ্গে যাবে, তখন আর মা বেশি আপত্তি করলো  না। সুমি আমার ছোটবেলার বান্ধবী, ক্লাসমেটও বটে।

 শুক্রবার সকালে ট্রেন ধরে আমরা দুজনে ক্যানিং স্টেশনে পৌছালাম। সুদীপকে ফোনে আগেই বলা ছিল, ও আমাদের স্টেশন থেকে রিসিভ করল। এরপর আমরা নদী পথ পেরিয়ে ওদের গ্রামে এসে পৌঁছলাম। গ্রামের দৃশ্য দেখে চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। যেদিকেই তাকাই শুধু সবুজ আর সবুজ। দূরে দেখা যাচ্ছে ধানক্ষেত, চাষিরা মাঠে চাষ করছে আপন মনে। এইসব দেখতে দেখতে আমরা সুদীপদের বাড়িতে এসে পৌঁছলাম। মাটির বাড়ি, উপরে টালির চাল। আমরা গিয়ে পৌঁছতেই কাকিমা মানে সুদীপের মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আমাদের দেখে উনি খুব খুশি। বললেন, "তোমাদের কথা সুদীপের মুখে অনেক শুনেছি। তোমরা এসেছ আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমরা হাত মুখ ধুয়ে নাও আমি তোমাদের খাবারের ব্যবস্থা করছি।"

 দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা তিন বন্ধু মিলে গ্রামে ঘুরতে বেরোচ্ছিলাম। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি অল্পবিস্তর মেঘ জমেছে। কাকিমা আমাদের বেরোতে বারণ করলেন। কিন্তু আমরা তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো বলে তাঁকে আশ্বস্ত করলাম। কিন্তু আমাদের কপাল খারাপ। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সমস্ত আকাশটা ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেল, সেই সঙ্গে শুরু হলো তার গুরুগর্জন। অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলাম। এসে দেখি  কাকিমা আমাদের জন্য পেঁয়াজি ভাজার উপক্রম করছেন। আজ সন্ধ্যেবেলা চায়ের সাথে গরম গরম পেঁয়াজি আর মুড়ি।

 সন্ধ্যেবেলা আমরা তিন বন্ধু মিলে চা, পেঁয়াজি আর মুড়ি নিয়ে সুদীপের দাদুর ঘরে তক্তপোষে বসে গল্প জুড়লাম। দাদুও আমাদের দলে এসে যোগ দিলেন। সুদীপ বললো, "জানিস, দাদু কিন্তু খুব ভালো গল্প বলতে পারে, বিশেষ করে ভূতের গল্প। সুমি বললো, "তাহলে তো সোনায় সোহাগা! এই ঝড় বৃষ্টির সন্ধ্যায় পেঁয়াজি মুড়ির সাথে ভূতের গল্প পুরো জমে ক্ষীর। আমাদের অনুরোধে দাদু গল্প বলা শুরু করলেন।

-শোন আজ তোদের আমি যে গল্পটা বলবো সেটা শুধু গল্প নয়, এক্কেবারে বাস্তব ঘটনা। আমাদের গল্প শোনার আগ্রহ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। দাদু শুরু করলেন, "সেবার আমার ফুলদিদির শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফুলদিদির শ্বশুরমশাই ছিলেন সেই গ্রামের জমিদার। তার দাপটে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত। যাই হোক, সেখানে আমার খাতির যত্নের কোন অভাব হলো না। সারাটা দিন বেশ আনন্দেই কেটে গেল। রাত্রিবেলা ফুলদিদির সাত বছরের ছোট্ট ছেলে পলু আমার সঙ্গে শোবে বলে বায়না ধরলো। অতিথিশালায় একটা বেশ বড় ঘরে আমাদের দুজনের শোবার বন্দোবস্ত হল। আমি পলুকে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার কাছে গল্প শুনতে শুনতে পলু কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে আমার সে খেয়াল নেই। আমারও চোখটা প্রায় লেগে আসছিল, হঠাৎই মনে হল পাশের ঘর থেকে কেমন যেন একটা শব্দ আসছে। প্রথমটায় অতো কান দিলাম না, কিন্তু ধীরে ধীরে সে শব্দ বেড়েই চলল। এবার আমি বিছানা থেকে নেমে পড়লাম। দরজা খুলে বাইরে এলাম। মনে হল দক্ষিণ দিকের বন্ধ ঘরটা থেকেই আওয়াজটা আসছে। এই গ্রামে তখন ও বিদ্যুতের আলো প্রবেশ করেনি। পূর্ণিমার চাঁদের আলো এই চারিদিকটা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। আমি সেই বন্ধ ঘরটার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। আওয়াজটা ক্রমে বেড়েই চলেছে। দরজার সামনে গিয়ে দেখলাম দরজায় একটা পেল্লাই সাইজের তালা ঝুলছে। আমি দরজায় কান পাতলাম। মনে হল কেউ যেন ঘরের ভেতরে গোঙাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই আমি একটু সাহসী তাই ভয় না পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ''ভেতরে কে?'' কিন্তু কোন উত্তর এলো না। দরজা ধাক্কানোর শব্দটা এবার থেমে গেল কিন্তু গোঙানির শব্দটা এখনো শোনা যাচ্ছে। আমি আবারো জিজ্ঞেস করলাম, "ঘরের ভেতরে কে আছো?" কিন্তু এবারেও কোন সাড়া পেলাম না। হঠাৎ মনে হল গোঙানির শব্দটা যেন থেমে গেল। আমি এবার নিজের ঘরের দিকে ফিরতে উদ্যত হলাম। যেই না পিছন ফিরেছি আবারও দরজায় ধাক্কা পড়লো। আমি চমকে পিছন ফিরলাম। সেই সঙ্গে শুরু হল গোঙানির আওয়াজ, আগের থেকে আরো জোরে। এবারে আমি বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। দৌড়ে ঘরে চলে এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু সে রাতে আর দু-চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। মনে হাজারো প্রশ্নের দোলাচল, সত্যিই কি কেউ আছে ওই বন্ধ দরজার ভেতরে? যদি থাকিও তবে কে? আর কেনই বা তাকে তালা বন্ধ করে রাখা হয়েছে?


 সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠেই প্রথমেই গেলাম ওই বন্ধ ঘরটার কাছে। দরজায় কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম ভেতর থেকে কোন শব্দ আসে কিনা। হঠাৎ আমার কাঁধের ওপর কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই চমকে তাকালাম। ফুলদিদি। দিদি আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ''কিরে কি করছিস এখানে?'' আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। মুখে বললাম, ''কই, কিছু নাতো।'' ফুলদিদি বললো, ''নিচে চল, খেতে দেওয়া হচ্ছে।'' আমি ফুলদিদির সাথে নিচে চলে এলাম।

 দুপুরের খাওয়া সেরে ফুলদিদির সাথে বসে গল্প করছি। মনে হলো কালকে রাতের ঘটনাটার কথা দিদিকে বলি। জিজ্ঞেস করলাম, ''আচ্ছা ফুলদি, দোতলার ওই দক্ষিণ ঘরটা তালা বন্ধ কেন?'' ফুলদিদি যেন একটু চমকে উঠলো কিন্তু মুখে বললো, "আসলে ওই ঘরে পুরনো আসবাবপত্র আছে। তাই তালা বন্ধ রয়েছে।" আমি আর কিছু বললাম না। কিন্তু আমার মধ্যে একটা চাপা কৌতূহল, কি আছে ওই বন্ধ দরজার ওপারে?

 বিকেল বেলা সকলের চোখ এড়িয়ে ওই বন্ধ ঘরে সামনে আবার এসে দাঁড়ালাম। নাঃ, এখন আর কোনো  শব্দ নেই। ''... এখানে একা একা দাঁড়িয়ে কি করছো দাদাভাই?'' রামু কাকা। এবাড়ির চাকর। বহু বছর ধরে রামু কাকা এ বাড়িতেই আছে। আমি রামু কাকাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা রামু কাকা, এই ঘরের ভেতরে কী আছে?' রামু কাকা কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল। বললো, "ও কিছু না দাদাভাই, তুমি এখানে আর কখনো এসো না।" কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। আজ আমাকে জানতেই হবে কী  আছে এই ঘরে। আমি রামু কাকার হাত চেপে ধরলাম। "বলোনা রামু কাকা, কী  আছে এখানে? কেন তালা বন্ধ থাকে এই ঘর?" এইবার রামু কাকা বলতে শুরু করলো, ''এই ঘরে থাকতো ভুবন দাদাবাবু, আমাদের বড় দাদাবাবুর কলেজের এক বন্ধু। বাপ-মা ছিল না, তাই এ বাড়িতে থেকেই সে পড়াশোনা করতো। কলেজে যখন ছুটি পড়তো তখন সেও বড় দাদাবাবুর সাথে এই বাড়িতে চলে আসতো। কলেজ পাস করেও সে এ বাড়িতেই থাকতো। জমিদারমশাই ভুবন দাদাবাবুকে কোষাধ্যক্ষর কাজে নিযুক্ত করলেন, সেও সেই কাজ দায়িত্বের সাথে পালন করতো। কিন্তু হঠাৎ একদিন কোষাগারে হিসেবের গোলমাল হলো, আর সেই দায় গিয়ে পড়ল ওই ভুবন দাদাবাবুর ওপর। লজ্জায়, অপমানে ভুবন দাদাবাবু এই ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। ঘটনার পর জমিদারমশাই এই ঘরটা তালা বন্ধ করে দেন। তারপর থেকে এই ঘরে আর কেউ ঢোকেনা। আমার মনে পড়ে গেল গতকালও ছিল পূর্ণিমা। হঠাৎ কী মনে করে আমি রামু কাকাকে জিজ্ঞেস করলাম, ''তোমার মনে আছে রামু কাকা, যেদিন তোমাদের ভুবন দাদাবাবু আত্মহত্যা করেছিলেন সেদিন তারিখটা কত ছিল?''রামু কাকা একটু ভেবে নিয়ে বললো, "১৩ই ভাদ্র।" আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো। আজ তো ভাদ্র মাসের ১৪ তারিখ। তাহলে...? এই পর্যন্ত বলে দাদু থামলেন। ঘরের মধ্যে একটা চাপা নিস্তব্ধতা, কারো মুখে কথা নেই। "বাবু, ভাত বাড়ছি। তোরা হাত ধুয়ে বসে পড়।" কাকিমার ডাকে আমাদের ঘোর কাটলো। আমরা তাড়াতাড়ি উঠে হাত ধুয়ে খেতে বসলাম। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম না জানি কত যন্ত্রণা বুকে চেপে সেদিন শুধুমাত্র নিজের সম্মান বাঁচাতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছিল ভুবনবাবুকে। নিজের অজান্তেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা জল।

...(সমাপ্ত)...


পরশ পাথর

ছবি : ইন্টারনেট

পরশ পাথর

মিলি ঘোষ

সায়নের বাবা-মা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিব্য পা ফেলছেন এখন। বাড়ির চেহারা পাল্টেছে, দু'জন কাজের লোক। তবে দু'দিন ধরে চন্দনার মেজাজ খারাপ। রান্নার লোক বকুল আসেনি, একটা খবর পর্যন্ত দেয়নি।

তৃতীয়দিন সকালে একটি বছর দশেকের মেয়ে এসে বলল, "মা আসবে না। খুব জ্বর।"

 "দু'দিন আগে বলতে পারিসনি ?" বলল চন্দনা।

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে মেয়েটি।

সায়ন এগিয়ে এসে মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, " নাম কী তোর ?"

 "টগর"

চন্দনা টগরকে বলে দিল, "সুস্থ হলে যেন দেরি না করে তোর মা, বুঝেছিস ?"

টগর ঘাড় কাত করে ফিরে গেল।

কিন্তু বকুল আর এল না। এদিক সেদিক থেকে খবর নিয়ে জানা যায় বকুল হাসপাতালে। ওর গুণধর স্বামী বেশিরভাগ রাতেই বাড়ি ফেরে না। যেদিন টাকার দরকার হয় আসে, না পেলে বৌকে পেটায়। জ্বর দেখেও তার হৃদয় গলেনি। বাক্স প্যাটরা ঘেঁটে কিছু না পেয়ে উদোম মারে বৌকে। বাধা দেবার অবস্থা ছিল না বকুলের। টগর বাধা দিতে গেলে ওকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। টগরের চিৎকারে আশেপাশের লোক ছুটে আসায় পালায় বকুলের বর। বস্তির লোকেরাই হাসপাতালে দেয় বকুলকে।

বাড়িতে গ্যাস রাখার ক্ষমতা বকুলের কোনোদিনই ছিল না। রেল লাইনের যে ধারে ওরা থাকে, তার অন্য ধারে একটু ভেতরে, একজনের থেকে জ্বালানির কাঠ কিনে মাথায় করে নিয়ে আসে বকুল। যেদিন স্কুল থাকে না, সেদিন মায়ের সঙ্গে টগরও যায়।

মা হাসপাতালে, তাই একাই গিয়েছিল সেদিন টগর কাঠ আনতে। কিন্তু কাঠ নিয়ে সে ফেরেনি। ফেরেনি মানে ফেরেইনি। পরদিন রেল লাইন থেকে খানিক দূরে ঝোপের মধ্যে টগরের দেহ পাওয়া যায়।

ঘটনার আকস্মিকতায় এবং জেরায় জেরায় হাসপাতালের বিছানায় আধমরা বকুল, আধপাগল হয়ে গেল।

সায়নের কিন্তু কোনও হুঁশ নেই। সে মূর্তি বানিয়ে চলেছে নেশার ঘোরে।

এবার সে বানাল একটি বালিকার মূর্তি। মাথায় কাঠ নিয়ে আসছে, চোখ দু'টো যেন খুব চেনা। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় সে চোখ দৃষ্টি পেল।

মূর্তি রাখার জন্য সায়ন ছাদে আর একটা ঘর বানিয়েছে। সেখানে তার যাবতীয় শিল্প রাখা থাকে। যারা কিনতে আসে সবার চোখ ওই বালিকার মূর্তির দিকে। কিন্তু সায়ন নারাজ। ওই মূর্তি সে কিছুতেই বেচবে না।

বেশ কিছুদিন পর। সূর্য তখন সমস্ত দিন ব্যাপী নিজের অস্তিত্ব জাহির করে চলেছে। ভরা দুপুরে প্রকৃতির চরম নির্জনতায় একমাত্র ঘুঘুর ডাক কানে মিঠে লাগে। সে'সময়ে একদিন কলিং বেল বাজে সায়নদের বাড়িতে। চন্দনা দরজা খুলে দেখে বকুল দাঁড়িয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো।

    ভেতরে এসে বলল, "কাজ নেই বৌদি। মরে যাব যে এবার।"

টগরের কথা বলতে গিয়ে আকুল কান্নায় ভেঙে পরে বকুল।

নতুন রান্নার লোক এসেছিল একজন। চন্দনার পছন্দ হয়নি। বকুল ফিরে আসায় ওকেই রান্নার কাজে বহাল করা হলো।

বকুল গুছিয়েই কাজ কর্ম করে। অনেক বাড়তি কাজও করে দেয়। চন্দনা সে'জন্য কিছু টাকা অতিরিক্ত দিতে গেলে নিতেও চায় না।

    বলে, "লাগবে না বৌদি। রোজ তো আর করি না।"

চন্দনা তবু জোর করেই দেয়। 

পরে পাওয়া চোদ্দো আনার মতো বেশ একটু শীত পড়েছে ক'দিন। বাথরুমের পাশে ঘড় ঘড় শব্দে যন্ত্রের মধ্যেই জামাকাপড়গুলো ধুয়ে নিংড়ে শুধু একটু রোদের আশায় চুপ করে রইল। কিন্তু বারান্দার এক ফালি পূবের রোদ ততক্ষণে ঝাঁপ ফেলেছে।

 চন্দনা বলল, "বকুল, ছাদে একটু মেলে আসবে এগুলো ?"

"হ্যাঁ বৌদি, যাই।"

হাতের কাজ সেরে এক বালতি কাচা জামাকাপড় নিয়ে ছাদে মেলতে গেল বকুল। ফেরার সময়, কী মনে করে সায়নের ঘরে একবার উঁকিও দিল। সায়ন পেছন ঘুরে বসে নিজের কাজে মগ্ন। বকুল দরজায় দাঁড়িয়ে ঘরের ভিতরে রাখা মূর্তিগুলো দেখতে লাগল। এত নিবিড়ভাবে কোনোদিনই দেখে না ও। কোনও মূর্তি দরজার বাইরে থাকলে হয়তো একবার ঘাড় ঘোরায়। ওর অত আগ্রহ নেই। আজ কিন্তু বকুল দাঁড়িয়ে গেল।

হঠাৎ একটা মূর্তিতে এসে চোখ আটকে যায় বকুলের।

 "মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে এ কে ? আমার টগর না ?"

দিন পাল্টেছে। তাই সায়নকে না জিজ্ঞেস করে ওই ঘরে পা রাখার সাহস ওর মা, বাবারও হয় না।

কিন্তু বকুল অনুমতি না নিয়েই ঢুকে গেল ঘরের মধ্যে।

মূর্তিটার একদম সামনে দাঁড়িয়ে বলল, "হ্যাঁ, টগরই তো!"

সায়ন কাজ ছেড়ে উঠে এসে বলল, "পিসি, তুমি ?"

বকুল যেন শুনতেই পেল না সায়নের কথা।

 সায়নের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, "আমাকে এটা বিক্রি করবে খোকন ? আমার তো বেশি টাকা নেই। যে'টুকু জমিয়েছি, সবটা তোমায় দেব।"

সায়ন কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না।

 বকুল আবার বলল, "বলো না, বিক্রি করবে ?"

 "না, পিসি। এটা তো বিক্রি করার জন্য রাখিনি আমি।"

বকুল যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো।

 "করবে না ? মাস গেলে বৌদি যে টাকাটা দেয়, আমি তোমায় দিয়ে দেব। নেব না। আমি যদ্দিন বাঁচব, তোমাদের কাজ ছাড়ব না।"

কথাগুলো বলে এক বুক আশা নিয়ে তাকিয়ে রইল বকুল, সায়নের মুখের দিকে।

 সায়ন খুব নিচু স্বরে বলল, "এটা তুমি এমনিই  নিয়ে যেও পিসি।"

 "নিয়ে যাব ? সত্যি তুমি আমায় দেবে ? খোকন ?"

সায়নের চোখে প্রায় জল এসে যাচ্ছিল। বকুলের সামনে নিজেকে সামলে শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিল।  


শুনে আঁতকে উঠেছে চন্দনা।

 "বলিস কী রে! এমনি এমনি দিয়ে দিবি ? এরপর যদি আবার একটা মূর্তি চেয়ে বসে!"

  "না, মা। কারণটা বোঝো।"

  "আমিও তো দেখেছি মূর্তিটা। কই, আমার তো মনে হয়নি ওটা টগরের মতো দেখতে। কত মানুষ, কত দাম দিয়ে কিনতে চেয়েছেন, আর তুই ..."

    "পিসি কিন্তু বিনা পয়সায় নিতে চায়নি। দাম দিতেই চেয়েছে।"

    "তুই কি পাগল হলি ? ও ক'টাকা দিতে পারবে ? আচ্ছা আচ্ছা পয়সাওয়ালা লোককে তুই ফিরিয়ে দিয়েছিস।"

    "তুমি যে দু'হাজার টাকা দাও ওকে, সেটা ও নেবে না। আমাকে দিয়ে দেবে বলছে।"

    "না না। তা কেন ? তাহলে ওর চলবে কী করে ? কী যে ভূত চাপল ওর মাথায়। ওদের ওই বস্তির ঘরে রাখবেই বা কোথায় এই মূর্তি ?"

    "ও বললেই কি আমি ওর থেকে টাকা নেব ?"

   একটু চুপ থেকে চন্দনা বলল, "হ্যাঁ রে খোকন,  বকুল এই মূর্তিটা কাউকে বিক্রি করে দেবে না তো ? তার কাছ থেকে ভালো টাকা হাতিয়ে কেটে পড়ল হয়তো। বিশ্বাস নেই। এদের চক্র থাকে। যাই বল খোকন, তোর এক কথায় রাজি হওয়া ঠিক হয়নি।"

    "যদি তাই হয়, আমার কষ্ট হবে, নিজের হাতে গড়েছি। কিন্তু লস তো কিছু হবে না। আমি তো এটা বেচব বলে বানাইনি।"

চন্দনার মন তবু খচ খচ করতে থাকে।

সায়নের ঘরে মূর্তি কেনার জন্য লোকজনের আনাগোনা চলতেই থাকে। প্রতিদিন তাই সুযোগ পায় না বকুল। যেদিন উঁকি দিতে পারে, ভয়ে ভয়ে ঘরের ভেতরটা দেখে, টগর আছে তো! কেউ নিয়ে যায়নি তো! বাইরের কেউ এলেই বকুলের বুকের মধ্যেটা ধড়াস ধড়াস করতে থাকে।

বকুল আর দেরি করতে চাইল না।

    একদিন সকালে এসে সায়নকে বলল, "লাইনের ধারে লোকজন ভালো নয়। দিনে দিনে আমি টগরকে নিয়ে যেতে পারব না। আজ রাত ন'টা নাগাদ ভ্যান নিয়ে এসে নিয়ে যাব।"

   সায়ন বলল, "রাতে এসে নিয়ে যাবে ? এই ঠান্ডার মধ্যে ?"

   চন্দনাকে আসতে দেখে বকুল বলল, "এখানে আর কী ঠান্ডা বৌদি। লাইনের ধারে যা ঠান্ডা! কেউ বাইরে থাকে না তখন। রাতেই ভালো।"

শীতের আবেশে রাত্রি বোধহয় একটু বেশিই নিঝুম আজ। সন্ধ্যা নামার একটু আগে, আকাশের রংবাহারি রূপটাও কোথাও হারিয়ে যায় শীতের সময়। সন্ধেটা ঝুপ ঝুপ করে নেমে এলেই সামনে  বড়ো একটা রাত! আজ কি রাত একটু বেশিই বড়ো ?

কাজে মন নেই আজ সায়নের। খালি ঘড়ির দিকে দেখছে। ন'টা বেজে দশ মিনিট। কলিং বেলটা বাজল।

   ভ্যানে ওঠার সময় সায়ন বলল, "সাবধানে যেও পিসি।"

   বকুল বলল, "চিন্তা কোরো না খোকন। তুমি ঘরে যাও। ঠান্ডা লেগে যাবে।"

সায়ন তবু দাঁড়িয়ে রইল। ভ্যান চলে যাচ্ছে। টগরকে নিয়ে বকুলও।

কেন এত কষ্ট হচ্ছে সায়নের ? নিজের হাতে গড়া মূর্তি, যাকে সায়ন কখনও হাতছাড়া করেনি, সেই মূর্তি চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে বলে ? না কি আরো কিছু ?

মাতৃত্ব কী, সে তো সায়নের বোঝার কথা নয়। বকুল যেভাবে মূর্তিটা বুকে আগলে বসে আছে, যেন হারানো সন্তান ফিরে পেয়েছে। একেই কি মাতৃত্ব বলে ?

মোড়ের মাথার লাইটটা জ্বলেনি আজ। লম্বা রাস্তাটা বাঁক নেবার সময় বকুল কি একবার দেখল ঘাড় ঘুরিয়ে ? অন্ধকারে ঠিক বোঝা গেল না।

কত মূর্তিই তো কত মানুষ নিয়ে গেছে। একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তৈরি করার সময়ের যে যত্নগুলো লেগে থাকে মূর্তিতে, সে তো অন্য কেউ বুঝবে না। যত্নের সঙ্গে যে ভালোবাসাটা থাকে, সেটাও শুধুমাত্র কারিগরের। তবে আজকের কষ্টটা একদম ভিন্ন। সায়ন এর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পেল না।

চন্দনা লক্ষ করছে, বকুল আজকাল একটু দেরি দেরি করে আসে। তাতে অসুবিধা কিছু হয় না। বকুল হাত চালিয়ে সব ঠিক মতোই করে দেয়।

তবে কিছুদিনের মধ্যে একটা পরিবর্তন বকুলের হয়েছে। ও আজকাল একটু টিপটপ থাকে। শাড়িটা গুছিয়ে পরে। কপালে আদরের টিপ। কানের দুলও আজ এটা, তো কাল ওটা।

    নিজেই বলে, "জানো তো বৌদি, এই দুলটা গতবছর কালীপুজোর মেলা থেকে কিনেছিলাম। সে আর পরাই হয় না। ভালো না, বলো বৌদি ?"

চন্দনা ঘাড় নাড়ে।

ক'দিন হলো বকুল আরো একটু দেরিতে আসছে কাজ করতে।

   দু'দিন দেখে চন্দনা জিজ্ঞাসা করল, "এত দেরি করো কেন আজকাল, বকুল ? নতুন কাজ নিয়েছ না কি ?"

   "না বৌদি। সকালে ওই মাসিমার বাড়িতে বাসন মেজেই তো তোমার এখানে আসি। নতুন কাজ আর নিইনি।"

   "না, এত দেরি তো করতে না আগে, তাই বলছি।"

    বকুল মুখে কিছুটা লজ্জা কিছুটা হাসি এনে  বলল, "আসলে বৌদি, এখন তো দু'জনের রান্না। আগে তো আমার একার জন্য অত গরজ ছিল না। তাই আসতে একটু দেরি হয় গো।"

    "দু'জনের মানে ?"

    "টগর আর আমি গো। জানোই তো, আমাদের মা-মেয়ের সংসার।"

চন্দনা হাঁ করে বকুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

    "এসব কী বলছে বকুল! পাগল হয়ে গেল না কি ?"

    বকুল কাজ করে চলে যেতেই চন্দনা সায়নকে ডেকে সব কথা বলল।

    সায়ন বলল, "মনে হয় পিসি মূর্তিটাকে সেরকমই ভাবে।"

    "কী যে বলিস! কোনও সুস্থ মানুষ এরকম ভাবে, না এরকম বলে ? ওর ট্রিটমেন্ট দরকার।"

    "হয়তো এই বিকল্প পথে ভালো আছে পিসি। দেখছ না, আজকাল কী রকম সাজগোজ করে আসে।"

    "কিন্তু সত্যিটা তো ওকে মানতে হবে। মূর্তিটা দিয়ে আরো ক্ষতি হলো না তো বকুলের ?"

বকুলের একটা ছোট ফোন আছে। চন্দনাই দিয়েছে।

   বলেছে, "যেদিন আসতে পারবে না, আগে থেকে জানিয়ে দেবে।"

   বকুল অবশ্য খুব অসুবিধায় না পড়লে কামাই করে না। ওর দেরি দেখে চন্দনা সেটাই ভাবছিল। দেরি মানে, বারোটা বাজতে চলল। সায়নের বাবাকে দেড়টার মধ্যে খেতে দিয়ে দেয় চন্দনা। বকুল তো জানে ভালো করেই।

আর দেরি করা ঠিক হবে না ভেবে চন্দনা নিজেই ফোন করবে বলে উঠে গেল। তখনই কলিং বেল বেজে উঠল।

আজকাল বকুলের হাবভাব এমনিতেই চিন্তা বাড়িয়েছে চন্দনার। আজ এত দেরি করাতে মেজাজটা চড়ে গেল আরও।

   "না বলে বলে বেশি পেয়ে বসেছে ..." বলতে বলতে দরজা খুলতেই দেখে একটা গোল টিফিন বাক্স হাতে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে বকুল।

   চন্দনার হাতে বাক্সটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, "রাগ কোরো গো না বৌদি। মেয়েটার আজ জন্মদিন। তাই একটু পায়েস বানালাম।" 

চন্দনা পায়েসের বাক্সটা হাতে নিয়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল।

   বকুল বলে যাচ্ছে, "ঠাকুরের কৃপায় মেয়েটাকে ফিরে পেলাম। তাই ভোর ভোর একটু দক্ষিনেশ্বরে গেছিলাম পুজো দিতে। লাইন বেশি পড়েনি। ফাঁকায় ফাঁকায় পুজো দিলাম। তাও দেরি হতো না। এই পায়েসটা করতে গিয়েই সময় গেল ...."

   বকুল রান্না বসিয়ে আরো কত কী বলে গেল, চন্দনা শুনতে পায়নি। হয়তো শুনতে চায়নি। বকুল কি সত্যিই মনোরোগে আক্রান্ত হচ্ছে ? না কি এতেই ওর সুখ ? হয়তো বা এটাই ওর বেঁচে থাকার রসদ!

...(সমাপ্ত)...