1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label পার্থ ঘোষ. Show all posts
Showing posts with label পার্থ ঘোষ. Show all posts

Wednesday, October 2, 2024

একটা প্রেমের গল্প

 

ছবি : ইন্টারনেট

একটা প্রেমের গল্প

পার্থ ঘোষ

এই সময়টা ছাদের ওপর একাকী বসে থাকতে বেশ লাগে সৌমর। একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করে এখানে। চারপাশের শব্দগুলো কেমন স্পষ্ট কিন্তু কেমন যেন একটা দুরত্ব বজায় রেখে ভেসে আসে। ছাদটা নিস্তব্ধ। ভেসে আসা শব্দগুলো পাখির ডাক, রাস্তা দিয়ে ছুটে যাওয়া যানবাহনের যান্ত্রিক শব্দ, দূর থেকে ভেসে আসা রেলগাড়ির হর্ণ কিংবা চাকার ঘর্ষণের শব্দ। আবছা ভেসে আসা মানুষের কথপোকথন। মাথার ওপর দিয়ে ঘরমুখো কাকের ডানায় বাতাস কাটার শন্‌ শন্‌ শব্দ। সময়টা শেষ বিকেল। কিছুক্ষণ পরই নেমে আসবে সন্ধ্যা। গোধূলীবেলা, তবে আজ রঙহীন। আকাশে হালকা মেঘের আনাগোনা। বাতাসে ঠান্ডা আমেজ।

সদ্য মিটে যাওয়া দোল উৎসব। বসন্ত এসে গেছে। এবার পরিবেশ উষ্ণ হওয়ার অপেক্ষায়। তবুও শীতের চলে যাওয়া আর গরমের আগমনের মাঝামাঝি এই সময়টা একটু অন্যরকম। সব ক্ষেত্রেই যাওয়া আর আসার মাঝের সময়টা একটু অন্যরকম হয়েই থাকে, সে পরিবেশের ক্ষেত্রেই হোক বা জীবনের।

অদ্রিজার কিশোরী বয়স বিদায় নেওয়ার সময় আগতপ্রায়। আগত যৌবনের বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর মন। আর ছয়টা মাস, তারপরই প্রাপ্তবয়ঃস্ক তকমা ঝুলে যাবে জীবনের ক্যানভাসে।

মনটা কেমন যেন বদলে গেছে সহসাই। একটা অন্য অনুভূতি খেলা করে ফেরে সব সময়। বয়ঃসন্ধি কথাটার মানে বুঝত না আগে। এখন ব্যাপারটার শুধু মানে নয় রক্তে রক্তে অনুভব করে।

ঘরে ফেরা পাখিগুলো কেমন জোট বেঁধে যায় উড়তে উড়তে। সেদিকে তাকিয়ে মনটা কেন যে উদাস হয়ে পড়ে ভেবে পায় না অদ্রিজা। নারকোল গাছের কঠিন শরীরে কাঠঠোকরা দম্পতির একসাথে ঠোক্কর দেওয়া দেখে সেদিকে তাকায় অদ্রিজা। স্বামী-স্ত্রী পাখি দুটো একজন গাছ বেয়ে ওপরে ওঠে, একজন নামে। ওদের নামা ওঠা দেখে নারকোল গাছে যারা নারকোল পাড়তে ওঠে তাদের কথা মনে পড়ে।  একই ভাবে পাখি দুটোও ওঠা নামা করে। মাঝে মাঝে ঠোকর দিয়ে গর্ত করতে চায় গাছের শরীরে।   হঠাৎই ডেকে ওঠে ওরা, অদ্ভুত স্বরে। চমকে ওঠে অদ্রিজা। উদাস হয়ে ওঠে অদ্রিজার মন। মনটা কেমন অসুখী যেন? অদ্রিজা মনের ভাসা বুঝতে পারে না। মন বড় চঞ্চল। কথা শোনে না।

সৌমর মনটা বিদ্রোহ করতে চায়। একঘেয়ে নিয়মকানুন সব কেমন সেকেলে লাগে। ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে নতুন করে কিছু তৈরি করতে। আঠারো পেরিয়েছে ছয় মাস। নিজের ছাড়া অন্যের কথা কেমন যেন জ্ঞান বলে মনে হয়। সবাই কেমন যেন বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাবে বোঝাতে চায়। ওর মনে হয় ও কি কচি খোকা? কিছুই বোঝে না? এতো জ্ঞান ওর ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করে। মনে হয় সব কিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওই ঘরে ফেরা একাকী কাকের মত। কাকের পাখায় ভর করে সন্ধ্যা নামে আস্তে আস্তে। ছাদ থেকে অনেক নীচের পাঁচিলে কালো বেড়ালটা গুটি গুটি পায়ে এগোয়। ওপাশের বাড়ির ছাদে অদ্রীজার কালোচুলের মত সন্ধ্যা ঘণায় প্রকৃতির বুকে। অদ্রিজার বুকের ওড়না খসে দমকা হাওয়ায়। অভ্যস্ত হাত সেই ওড়না স্বস্থানে তুলে নেয়। লজ্জা হারায় সাঁঝের আঁধারে। নীচু স্বরে ভেসে আসে – আমি ঘরে চললাম।

-     আমারটা দিয়ে যাও।

-      না! প্রতিদিন নয়। মুখে বলেও জিব ভেঙচে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দেয় অদ্রিজা। দৌড়ে পালায় ছাদ থেকে।

সৌম্য মুঠোয় ধরে কাল্পনিক চুমু প্রতিদিনের মত। চেঁচিয়ে বলে – ডিউ রইল এটাও। শোধ করব একসাথে।

 

(২)

 

অদ্রিজার সঙ্গে পরিচয় ছিল আগেই। সৌম্যদের বাড়ির পড়ে একটা সরু সিমেন্ট বাঁধান গলিপথ। যে গলিপথ শেষ হয়েছে রজত কাকার বাড়ির দরজায়। এককথায় গলিটা কানা। কানাগলি বলতে যা বোঝায়, সেরকমই। কানা গলি মানে যে গলিতে ঢোকার পথ আছে, বেরোবার পথ নেই। প্রেম মনে হয় এরকম গলিতেই মাখোমাখো হয়। “সেই গলিতেই ঢুকতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে দেখি, বন্ধু সেজে শত্রু আমার দাঁড়িয়ে আছে একি!”

সেই গলির অপর পাড়ে, অর্থাৎ সৌম্যদের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে মুখোমুখি ভাবে যে বাড়িটা আছে, সেটাই অদ্রিজার বাড়ি। ছাদে ওঠার ব্যাপারটা অদ্রিজা বা সৌম্যর কারোরই সেভাবে ছিল না। ছাদ বলে যে একটা ব্যাপার আছে, সেখানে উঠেও যে অনেক কিছু অনুভব করা যায়, যেখানে দাঁড়িয়ে মাথার ওপরের আকাশটাকে উল্টোনো গামলার মত মনে হয়; কিংবা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে ওপরের নীলাকাশের তিনশো ষাট ডিগ্রী এঙ্গেল অনুভব করা যায়, সেটা কেউই সেভাবে উপলব্ধি করতে পারত না। যেভাবে সেসব দিনে পারত।

ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা একটা সুন্দর অনুভূতি। আকাশেরও যে কতরকম রঙ বদল হয়, আকাশও যে কতভাবে সাজতে পারে, কিংবা আকাশেরও যে আনন্দ হয়, দুঃখ হয় সে আগে বোঝার কোন উপায়ই ছিল না। কোন আকাশ কথা বলে, কোন আকাশ দুঃখে কাঁদে, কোন আকাশ আনন্দে হাসে কিংবা কোন আকাশকে ফালা ফালা করে অশনি সংকেত সেসব যারা রাতের আকাশে কালপুরুষ বা সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখে বেড়ান, একমাত্র তাঁরাই জানতেন, আর সাধারণ মানুষ জানত – আকাশ মানে প্লানেটোরিয়ামের ছাদ। আসলে যে জিনিস জন্ম থেকে দেখতে দেখতে একঘেয়ে হয়ে যায়, তার দিকে কেউ তাকায় না, তাকে জানতেও চায় না।

সেই আকাশকেও সবাই জানতে শিখল। ছাদকেও সবাই আপন করে নিতে শিখল। ছাদে ছাদে সেই সময় কত কাহিনীর জন্ম হল। কত কথা, কত রাগ, অভিমান, পরকীয়া বা পরনিন্দা পরচর্চা অর্থাৎ পিএনপিসি-র জন্ম হল সে আর এক কাহিনী। সেসব নিয়ে লিখতে গেলে উপন্যাস হয়ে যাবে।

অদ্রিজা আর সৌম্যর প্রেম জমাট বেঁধেছিল সেই সময়েই । প্রেম হয়ত এমনই। প্রেমের কোন স্থান কাল নেই। প্রেম শ্মশানেও হতে পারে, আবার প্রেম যুদ্ধক্ষেত্রেও হতে পারে। প্রেম হতে পারে সারিসারি মৃতদেহের মধ্যে কিংবা প্রেমের অঙ্কুর জন্ম নিতে পারে মহামারী বা অতিমারীর ভয়ংকর বাতাবরণে। অদ্রিজা আর সৌম্য এমনই এক অতিমারীর পটভূমিকায় প্রেমে পড়ে গেছিল একে অপরের। তখন সারা পৃথিবীকে কোভিড তার কালো চাদরে ঢাকা দিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে শুধু মৃত্যুর গন্ধ। হাহাকার আর কান্নার শব্দ। একাকীত্ব আর ভেঙে যাওয়া সংসার, হারিয়ে যাওয়া প্রেমের মাঝে মৃতদেহের মিছিল। সম্পর্কের মৃত্যু, ভয়ের বাতাবরণ, মানুষ ঘরবন্দী। পশুরা অনাহারে ক্ষুধার্ত। রাজপথে বেজে ওঠা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেণ, পাড়ের তরী’ শ্মশান যাত্রাগাড়ির তীক্ষ্ণ হর্নের শব্দ আর রাতচোরা জন্তুদের অবাধ বিচরণ শুনশান রাস্তার প্রাগৈতিহাসিক পটভূমিতে।

সৌম্য এমনই এক গোধুলি লগ্নে প্রপোজ করেছিল অদ্রিজাকে – আমি কি তোমার মন পেতে পারি?

সেদিন সেইসময় আকাশ থেকে চুঁইয়ে পড়া গোধূলি বেলার মনমড়া হলদে আলো  যেন অদ্রিজার মুখে মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল সৌম্যর মুখ নিঃসৃত শব্দের বহিঃপ্রকাশে। কেঁপে উঠেছিল কিশোরীর শরীর। দেহের মধ্যে ঝরণা ঝরে পড়তে শুরু করেছিল। এরকম একটা ভালো লাগা ক’দিন ধরে যে অদ্রিজার মনের ভেতরেও বুদবুদাকারে গেঁজিয়ে উঠছিল, কিন্তু বাঙালি মেয়ের লাজ-লজ্জা আধুনিকা নারীকেও বোবা করে দিতে বাধ্য থাকায় সেই গেঁজিয়ে ওঠা গ্যাঁজলার বহিঃপ্রকাশ হতে না পেরে, মনের চার দেওয়ালের মধ্যেই ধাক্কা খেয়ে ফিরছিল অতিমারী আক্রান্ত পৃথিবীর দিন রাত্রির রোজনামচার সাথে সাথেই।

আদ্রিজা সেদিন দৌড়ে পালিয়েছিল ছাদ থেকে। আর তারপর পরই ওর হাতের স্পর্শ ফোনের পর্দায় দেখেছিল সৌম্যর নাম ও ফোন নম্বর। ভলিয়্যুম কি চিপে ফোনটা সাইলেন্ট করে ফোন নিয়েই বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছিল অদ্রিজা। দেয়ালে পিঠ চেপে ধরে ফোনটা পায়রার শরীরের মত নরম ও গরম কিশোরী বুকে চেপে ধরে তিরতির করে কেঁপেছিল। ফোনটা বেজে যাচ্ছিল। অদ্রিজার শরীরে কোথাও জলপ্রপাত ঝরে পড়ছিল অঝোর ধারায়। ফোনটা একসময় বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অদ্রিজা ফোনটা নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল বোতাম টিপে। অনুভব করেছিল কপালে, ঠোঁটের ওপরে, ক্লিভেজে আর দুই উরুর সন্ধিক্ষণে ঘাম জমেছে বিন্দু বিন্দু। কোমল বুকের ভেতর থেকে হৃদপিন্ডটা যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে জোরে জোরে কাঁপতে কাঁপতে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ভেবেছিল – এরপর কি উত্তর দেবে সৌম্যকে? চমক ভেঙেছিল রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া অ্যাম্বুলন্সের হুটারের বিকট শব্দে – আবারও কেউ অতিমারী আক্রান্ত হয়ে চলে গেল নিরুদ্দেশের পথে। অদ্রিজা নিজেকে সামলে স্নানঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্টাডিতে ঢুকে বসেছিল দু’হাতের ওপর মাথা রেখে টেবিলের ওপরে কনুইয়ের ভর দিয়ে।

(৩)

পাড়ায় যেদিন বিকেলে খবরটা এলো, অংশুকাকু আর নেই, সেদিনই সকালে স্নান শেষে ছাদে জামাকাপড় শুকোতে দিতে গিয়ে সৌম্যর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। এর মাঝে দিন তিনেক সময় পার হয়ে গেছে। সেদিন সৌম্যর মুখোমুখি হতেই সৌম্য প্রতিদিনের মত জিজ্ঞেস করেছিল ঈশারায় তার প্রশ্নের জবাবটা কি? অদ্রিজা সেদিন নিজেকে তৈরি করেই এসেছিল। সৌম্যর চোখে চোখ রেখে দড়িতে মেলা কাপড়ের আড়াল থেকে শুধু মুখটা বার করে জিব ভেংচে বলেছিল – প্রেম করার খুব সখ? তা, উত্তর জানার আর কি আছে? আমি কি মন দেব না বলেছি? – কথাটা বলেই কাপড়ের আড়ালে নিজেকে আড়াল করে দৌড়ে নেমে গিয়েছিল ছাদ থেকে। সৌম্য অদ্রিজার মুখ দেখতে পায়নি, শুধু দুটো আলতা পড়া ফর্সা পা যুগলকে নুপূর নিক্কন ছড়িয়ে চলে যেতে দেখেছিল। সৌম্য ইয়াঃ! শব্দ করে দু’হাত তুলে লাফিয়ে উঠেছিল। ছাদের ওপর লাফালে ঢক্‌ করে একটা আওয়াজ ওঠে। সেই আওয়াজ ছড়িয়ে গিয়েছিল নিচের তলা পর্যন্ত। সৌম্যর হৃদপিন্ডটাও যেন লাফিয়ে উঠেছিল ওর সঙ্গে। ওদের প্রেম স্বীকৃতি পেয়েছিল।

অতিমারী তখন একে একে ধ্বংস করছিল প্রেমের সম্পর্ক গুলোকে। গৃহবন্দী মানুষের তখন একটাই ঠিকানা – বাড়ির ছাদ। যাদের ছাদ নেই তাদের ঠিকানা উঠোন। তবে সব কিছুই দুরত্ব রেখে। ছাদ এমনই একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছিল, যেখান থেকে মানুষের সঙ্গে মানুষ মেলামেশা করতে পারত, কিন্তু জড়াজড়ি করতে পারত না। ফলে যেসব প্রেম ছাদে ছাদে সংঘটিত হয়ে উঠেছিল তারা কথা বলে মনের খিদে মেটাতে পারলেও শরীরের খিদে মেটাতে না পেরে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল নিজ নিজ ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে। স্বপ্নে তারা মিলিত হতে শুরু করেছিল একে অপরের সঙ্গে । সেই সময় সারাদিন শুয়ে বসে ঘরের মধ্যে কাটাতে কাটাতে ঘুম ব্যাপারটা অনেকটাই কম হচ্ছিল সবারই । তাই পাতলা ঘুমের মাঝে নানান স্বপ্নরা এসে ভীড় করছিল প্রেমিক প্রেমিকার চোখের পাতায়। এতো প্রেমের মধ্যে পরকীয়াও থাকত কিছু কিছু, যেমন সৌম্যর পাশের বাড়ির রত্না কাকিমার সাথে গলির মুখের স্বজল কাকার পরকীয়া জমে উঠেছিল রত্না কাকিমার স্বামী কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরতে না পারার কারণে আর স্বজল কাকার স্ত্রীর বাপের বাড়ি থেকে নিজ সংসারে এসে পৌঁছতে না পারার কারণে। সেই সময় পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ থাকার কারণে যারা বাইরে ছিল তারা ফিরে আসতে পারেনি নিজ নিকেতনে। তাছাড়াও সতর্কীকরণ অনুযায়ী ওই সময় কেউ স্থান ত্যাগ করতে পারছিলেন না। কেউ যদি কোন জায়গা থেকে অপর জায়গায় চলে যেতেন তবেই পাড়ার লোক তাঁকে ধরে প্রশাসনের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। সবাই মৃত্যুভয়ে কাতর হয়ে নিজেকে বাঁচাতে, নিজের পরিবারকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এমত সময়ে একমাত্র প্রেম আর মৃত্যু নিজ নিজ কর্মে আসীন হয়েছিল চিরকালের প্রথা মেনে। পালপাড়ার ঠাকুরগলির সেই কানাগলিতেও তাই প্রেম আর মৃত্যু পাশাপাশি এগিয়ে চলেছিল হাত ধরাধরি করে। তাই প্রেম সংঘটিত হয়েছিল সৌম্য আর অদ্রিজার, পরকীয়া প্রেম গড়ে উঠেছিল রত্না কাকিমা আর স্বজল কাকার ওদিকে গলির অংশুকাকা মারা গিয়েছিল । তার মৃতদেহ আর তার পরিবার দেখতে পায়নি। সে সময় এমনই নিয়ম ছিল। করোনায় মৃত্যু হলে সে শরীর আর বাড়ি ফিরবে না। ছাদে প্রেম আর মাটিতে মৃত্যু। এভাবেই কেটেছিল জীবনের অভিশপ্ত সময়।

তবে সৌম্য আর অদ্রিজার প্রেম পেকে উঠলেও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে, অতিমারীর অতিশয় প্রকোপের নিবৃত্তির সাথে সাথে রত্না কাকিমা আর স্বজল কাকার পরকীয়া কিন্তু চাপা পড়ে গিয়েছিল সাধারণ ভাবেই, রত্না কাকিমার স্বামী আর স্বজল কাকার স্ত্রী বাড়ি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই।

সেই থেকেই ছাদের প্রতি একটা ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল সৌম্যর। সেই করোনা কালে সারাদিন ছাদে থাকতে থাকতে সে আবিষ্কার করেছিল প্রকৃতির নগ্ন রূপ। দেখেছিল বিশাল আকাশে কত রকমের পরিবর্তন হয়। পুর্নিমায় একরকম, অমাবস্যায় একরকম। ছাদের ওপর থাকলে প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলা যায়। একটা আলাদা অনুভূতি একটা আলাদা আনন্দ ভর করে থাকে মনকে।

তারপর কেটে গেছে পাঁচটা বছর। স্বাভাবিক ভাবেই সম্পর্কের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে দুই বাড়িতে। এখন অতিমারী চলে যাওয়ায় ছন্দে ফিরে আসা জীবনযাত্রায় মেলামেশা বা দেখা স্বাক্ষাৎ হয় দু’জনের বাড়ির বাইরে। কখনও কখনও একে অপরের বাড়িতেও চলে যায়। একসঙ্গে ওরা ছাদেও কাটায় এক এক সময়। সৌম্য অদ্রিজাকে আকাশ দেখতে শিখিয়েছে, শিখয়েছে প্রকৃতিকে দেখতে । অদ্রিজা সৌম্যকে শিখিয়েছে প্রকৃতির শরীরে কি ভাবে হারিয়ে যেতে হয়, কিভাবে প্রকৃতিতে মিশে যেতে হয় সোঁদা গন্ধের ঘ্রাণ নিতে নিতে। সৌম্যকে বুঝিয়েছে অদ্রিজা মেয়েরাই প্রকৃতি, মেয়েরাই ধরিত্রী, মেয়েরাই আবাদী জমি। সৌম্য এখন চাকরি করে সেক্টর ফাইভে।  অদ্রিজাও চাকরি করে এক ট্যুর কোম্পানীতে।  

আর কিছুদিন পরই ওদের প্রেমের বলিদানের দিন আসছে। সব ঠিক হয়ে গেছে। শুধু দিনক্ষণের শুভক্ষণে চার হাতের মিলন হতে যতক্ষণ। তাই এখন ওদের আর দেখা স্বাক্ষাৎ হয় না। দুই বাড়ি থেকেই বলে দিয়েছে, বিয়ের আগে আর ঘোরাঘুরি নয়। যা হবে আবার বিয়ের পরে। তাই এখন ওরা রেস্টুরেন্টে যায় না, যায় না মাল্টিপ্লেক্স বা ক্যাফেতে কিংবা পার্কে। এখন ওরা ছাদেই দেখা করে। ছাদ থেকে ছাদে উড়ন্ত চুমু দেওয়া নেওয়া করে। শরীরের ভেতরের আগুনটাকে ছাই চাপা দিয়ে ধিকিধিকি করে জ্বালাতে থাকে সেদিনের জন্য, যেদিন ফুলের সজ্জায় দাবানল লাগবে শরীরে শরীরে, মনে মনে, রক্তবাহী শিরা থেকে ধমনীতে।

...(সমাপ্ত)...





Saturday, October 21, 2023

দেবোপম

ছবি : ইন্টারনেট

 দেবোপম

পার্থ ঘোষ

ছোটো পত্রিকার অনুষ্ঠান আছে শহরের বড় প্রেক্ষাগৃহে।  সেই অনুষ্ঠানে আমি চিত্রগ্রাহক। ছবি তুলতে হবে সমগ্র অনুষ্ঠানের।  আমার দামী ক্যামেরা নেই; তবে একটা মাঝারি দামের ক্যামেরা আছে।  তাতেই ছবি তুলি ।  যদিও সেসব ছবির প্রিন্ট নিলে খুব একটা দৃষ্টিনন্দন হয় না তবুও লোকসানের স্রোতে গা ভাসিয়ে এগিয়ে চলা ছোটো পত্রিকার বিনা পয়সার চিত্রগ্রাহকের সেসব ছবিই আনন্দের সঙ্গে ছাপেন পত্রিকার সম্পাদক।  তাতে আমার পকেট না ভরলেও মন ভরে।  টাকায় তো সব কিছু কেনা যায় না।  তাই আমার আনন্দটাকেও আমি বিক্রি করার কথাও মনে করি না।  লাভ যে একদম হয় না তা নয়।  ছবি তুলতে তুলতে পরিচিতির পারদটা বাড়তে থাকে।  অনেক নামি-দামী মানুষের সান্নিধ্যে আসতে পারি।  তাঁদের সঙ্গে চেনা পরিচিতি হয়।  এটাও একধরণের নেশা, আবার ভালোবাসাও ।  অর্থের বিনিময়ে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের থেকে অনেকটাই বড় পাওনাও বটে।

যাক্ যেখান থেকে শুরু করেছিলাম – অফিস থেকে বেরিয়ে বাস ধরে সোজা ষ্টেশনে আসতেই ঘোষণা শুনলাম – ট্রেন  আসছে।

আসছে মানে আসছেই।  দু’মিনিট, পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট – ট্রেন আর আসে না।  ক্রমশঃ ভীড় বাড়ছে ষ্টেশনে।  ভীড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মনে বাড়ছে উৎকণ্ঠা – ট্রেনটা  দেরী করছে মানে মানুষের ভীড়ে ভর্ত্তি হয়েই আসবে, উঠতে পারবো তো?

ভীড় ট্রেনে ওঠা অভ্যেসের ব্যাপার।  কায়দাও আছে।  প্রতিদিন যাতায়াত করতে করতে নিত্যযাত্রীরা অভ্যস্ত হয়ে যায়।  তবু জনতা জনার্দন তো, তাই জনতার ভীড় মনে একটু ভীতির সঞ্চার করেই।  কারণ, এই জনতার অনেক ক্ষমতা।  জনতা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে সে যে কোনো ক্ষেত্রেই। 

প্রায় পনেরো মিনিটের ধৈর্য্য পরীক্ষার পর ট্রেন ষ্টেশনে এলো।  সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম একসাথে।  যেন ষ্টেশনে মহাজাগতিক বিস্ফোরণ হবে একটু পরেই, আর এটাই আজকের শেষ ট্রেন।

গুঁতো, লাথি, খামচা-খামচি, জটলা, লেঙ্গা-লেঙ্গি – উঠে পড়লাম ।  টেনশন কমলো।  প্রতিদিনের অভ্যাস; ভুল হবার নয়। এবার কোমরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পালা।  কোমড়ের ঠেলায় ট্রেনের পেটের ভেতরে সেঁধিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ।  সে যুদ্ধে পায়ের ওপর পা, ব্যাগের হ্যাণ্ডেলের মধ্যে জড়িয়ে যাওয়া হাত, বগলের তলায় মাথা, পাছা আর পিঠের মাঝের গড়ান অংশে খাপে খাপে বসে যাওয়া নেয়াপাতি ভুঁড়ি। পদচালনার দরকার নেই; উচ্চগতির গাড়ী হঠাৎ ব্রেক কষলে যেভাবে ঘষ্‌টে যায় সেভাবে একে বারে ট্রেনের ভেতরের জানলার ধারের প্যাসেজে ঢুকে যেতে লাগলাম। কারো রেশমী ওড়না জড়িয়ে গেল শরীরের সঙ্গে ক্ষণিকের অসাবধানতায়।

হঠাৎই ওড়নায় হ্যাঁচকা টান; কারণ, ওড়নার টানে সেই মহিলার গলায় ফাঁস পড়ার যোগাড়।  সঙ্গে ‘কানা নাকি!’ শব্দের ব্যাক্‌ পাস। অসহায় আমায় সহ্য করতেই হ’ল।  এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আর এক কান দিয়ে বার করে দিলাম সেই শব্দের ব্রহ্মাস্ত্র।  এই জন্যেই মনে হয় বিধাতা মানুষের দুটো কান সরলরেখায় করেছেন।  বিধাতা ভদ্রলোকের ব্রেনটা যেন সত্যিই কম্পিউটর। এটা প্রমাণিত।

এমতাবস্থায় এক চড়া গন্ধ নাকে এসে লাগল।  এই গন্ধ চিনতে ভুল হয় না।  অ্যালকোহলিক সুবাস! তাও আবার দেশী।  একে সুবাস বলা যায় কিনা জানি না তবে সেই গন্ধ লক্ষ্য করে পাশে তাকিয়ে দেখি ঢুলুঢুলু চোখ, টালমাটাল পা, উস্কোখুস্কো চুল, বোতাম খোলা জামার ফাঁকের রুগ্ন শরীর নিয়ে একজন আমার বামদিকে দাঁড়িয়ে গা ঘেঁষে।  আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বলে উঠল জড়ান স্বরে – “আপনার ওপাশে একটু জায়গা হবে?”

একটু বিরক্তই হলাম।  মনে মনে বললাম, এ আপদ আবার এখানেই এসে জুটল!   যদিও সুটেড-বুটেড বিলাতী খাওয়া কেউ হলে তার সম্বন্ধে আপদ কথাটা মনে আসতো কিনা জানি না, তবে এর ক্ষেত্রে এলো।

ব্যাজার মুখে বললাম – “পেছন দিয়ে চলে যাও”।  আসলে তাকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা।  গরীব মানুষ তো তার ওপর আবার বাংলার সেবক, তাই এই অচ্ছেদ্দা।

সে আমায় গুঁতো দিতে লাগল।  তবে খুব একটা নড়ে চড়ে ওপাশে যাবার চেষ্টা করল না।  আমি পুনরায়  বললাম বিরক্তি সহকারে – “কি হ’ল? ঠেলা দিচ্ছ কেন?”  বিলাতী সেবককে হয়ত আপনি বলতাম, কিন্তু যেহেতু বাংলার সেবক তাই তুমি ছাড়া মুখ থেকে কিছু বেরলো না।  যেমন এম. এ. পাশ করা রিক্সাচালককেও আমরা ‘তুই’ সম্বোধন করে থাকি, তেমনই। 

সে এবার নেশা মাখা কণ্ঠে বলল – “ঠেলা! ঠেলা দিলাম কই! আমি তো ওদিকে যাবো”।

বললাম – “যাও! কোথায় যাবে? ওদিকে জায়গা আছে? দেখতে পাচ্ছ না? ঠিক করে দাঁড়াও। গায়ে পড়ছ কেন?”

মানুষটা হাত উল্টে ঠোঁট উল্টে একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে বলল – “যাঃ! বাবা! ওদিকে জায়গা নেই? কেন বাবাঃ!”

এবার সীটে বসা একজন তথাকথিত ভদ্রলোক লোকটাকে বললেন – “এখান থেকে যাও তো। ঝামেলা বাড়িও না। ঘাড়ের ওপর উঠে আসছ কেন? দেখছো না ভীড় রয়েছে?”

লোকটা মুখটা নীচু করে সেই যাত্রীটার দিকে তাকাল।  বলল – “কি ভুল করলাম?  ট্রেনে উঠেছি দাঁড়াব না?” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল – “আপনি কোথায় যাবেন?”

আমি বিরক্ত হলাম অনধিকার চর্চায় ।  ঝাঁঝিয়ে বলেই উঠলাম – “তোমার কি? আমি যেখানেই যাই?  চুপ করে দাঁড়াও। গন্ধ বেরোচ্ছে”।

লোকটা বলে উঠল – “ওই একটু খেয়ে ফেলেছি।  বাংলা খেয়েছি”।

-       “এই দিনদুপুরে খেয়ে ট্রেনে উঠেছো, তাও আবার বড় গলায় বলছ, লজ্জা করে না? তার ওপর টলছো!”

-       “ট্রেন তো চলছে, তাই টল্‌ছি”।

-       “এতো খেলে পায়ে জোর থাকে? টলবে তো বটেই। ঠিক করে দাঁড়াও। গায়ে ভর দিও না”।

-       “যাঃ শ্লা! পড়ে যাচ্ছি, ধরে দাঁড়ালেও দোষ?” – লোকটা বলল জড়ান গলায়। 

-       “আমি কি তোমার ধরে দাঁড়াবার জিনিষ নাকি?” – বললাম আমি।

মানুষটা আরও আমার গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল।  ওর পায়ের জোর শেষ।  ভীড়ের চাপ ওকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না।  সমস্ত শরীরটা আমার শরীরের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।  আমার অস্বস্তি হচ্ছে।  সেই সঙ্গে তীব্র গন্ধে নিঃশ্বাস জড়িয়ে আসছে।  আমি বিরক্ত প্রকাশ করলাম – “কি হলো! এভাবে দাঁড়ান যায়?”

সে জড়ান গলায় কিছু বলল। মুখ খুলতেই আবার অ্যালকোহলের গন্ধ নাকে এসে লাগল।  আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। বুঝলাম, সমস্ত পথটা এভাবেই যেতে হবে।  বেশী কিছু বলার সাহসও পাচ্ছি না।  আমি সুটেড-বুটেড তথাকথিত ভদ্রলোক।  আর এতক্ষণ ধরে দেখে মানুষটাকে আমি নীচু ক্লাসের লোক বলে মনে করেই নিয়েছি।  তারপর আবার বাংলা খাওয়া মাতাল।  বেশী কথা বললে আমার ভদ্রতার মুখোশটা সে খুলে দিতে পারে।  তাই নিজের ভদ্রতা নিজের কাছে গুটিয়ে রাখলাম।  অসহ্যতা সহ্য করেও নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম।  মধ্যবিত্ত ছা-পোষা কেরানীরা এভাবেই সব কিছুর সঙ্গে আপোষ করে চলে।  এটা আমার জন্মগত অভ্যাস।

একটা জংশন স্টেশন এল। হুড়মুড় করে এক দঙ্গল লোক নামতে থাকল সেই নিত্যদিনের কে আগে যাবে পদ্ধতীতে। এ ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে, পা মাড়িয়ে, গুঁতো মেরে। কামরাটা একটু ফাঁকা হলো।  নতুন যাত্রী উঠল কিছু। তবে সংখ্যায় কম।  আগের মত গা ঘেঁষাঘেঁষি  ভাবটা এখন আর নেই।  একটু হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়াবার মত অবস্থা হয়েছে।  আমি একটু সরে দাঁড়ালাম।  তাতে লাভ কিছু হলো না। 

মানুষটা আমার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াল।  আমি বাধ্য হয়ে বললাম – “কাঁধ থেকে হাত নামাও”।  আমার গলার স্বরে দৃঢ়তা ফুটে উঠল।  তাতে কাজ হলো।  সে হাতটা নামালো।  তবে বিড়্‌বিড় করে বলল – “একটু ধরা যাবে না? গাড়ী যে চলছে!”

আমি ওর কথার কোন উত্তর দিলাম না।  

ইতিমধ্যে জানলার ধার থেকে একজন যাত্রী উঠে যাওয়ায় আমার পেছনে দাঁড়ান আগের ষ্টেশন থেকে সদ্য ট্রেনে ওঠা এক পরিবারের সর্ব কনিষ্ঠ সদস্যাকে তার বাবা জানলার ধারে এগিয়ে দিলেন।  ছোট্টো মেয়েটি গুটি গুটি পায়ে তার ঈপ্সিত জায়গাটায় গিয়ে বসল। 

শিশুটিকে দেখে আমার ছোটোবেলার কথা মনে পড়ল।  ট্রেনে হাওয়ার দিকের জানলার ধারটা পেলে তখন খুব খুশী হতাম। ভাই-বোনদের সঙ্গে মারপিট লেগে যেত ওখানে বসার জন্য।  কে বসবে? জানলা দিয়ে বাইরের চলমান পৃথিবী দেখার আনন্দই আলাদা ।  বিশেষ করে শিশু বয়সে।  এখন তো প্রতিদিনের যাত্রাপথের একই দৃশ্য আর দেখতে ইচ্ছে করে না।  তার ওপর স্মার্ট ফোনের সৌজন্যে বাইরের চলমান দৃশ্য উপভোগ করার লোকও অনেক কমেছে।  শিশুটির মুখে একশো প্রদীপ জ্বলে উঠল।  সে দৃষ্টি প্রসারিত করল বাইরের পিছ্‌লে যাওয়া দৃশ্যাবলীর দিকে। 

মাতাল যাত্রীটি হঠাৎই হাত বাড়িয়ে মেয়েটার চিবুক ছুঁয়ে আদর করে উঠল ‘পরী মা’ বলে।  শিশুটি একটু চমকে গেল। তার চোখের সামনের সচল পৃথিবী থমকে গেল। সে অবাক দৃষ্টিতে মানুষটার দিকে তাকাল। 

আমি এবার একটু ধমকে উঠলাম – “চুপ করে দাঁড়াতে পারছো না? মেয়েটাকে বিরক্ত করছ কেন?”

অন্য যাত্রীরা যারা ব্যাপারটা দেখেছে তারাও ফিরে তাকাল।  তাদের চোখে মুখে কিছুর প্রতীক্ষা নজরে পড়ল।  আমার মনে হল মাতালটা প্রতিবাদ করলেই ওরা গর্জে উঠবে। 

মাতালটা চুপ করে গেল।  তার মুখে যেন দুঃখের ছায়া পড়ল।  কোনো কথা না বলে নিজের জায়গায় সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করল।  আমি ভাবলাম, আমায় নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছে।

শিশুটির পাশে বসা বয়স্ক যাত্রীটি উঠে গেলেন।  একইসঙ্গে উঠে পড়লেন পাশের আরো দুজন যাত্রী। ওঁদের গন্তব্য এসে গেছে।  শিশুটির মা এবার এগিয়ে এসে ওর পাশে বসলেন।  নিত্য যাত্রীদের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী তারপর বসার কথা মাতাল লোকটির, তারপর আমার। 

বসার ব্যাপারটা সেভাবেই হল নিয়ম মেনে।  আমি চার নম্বর আসনে বসলেও অনেকটা জায়গা পেলাম। যেহেতু জানলার ধারে এক নম্বর আসনে বাচ্ছা মেয়েটা বসেছে তাই স্থান সঙ্কুলান ব্যাপারটা পীড়া দায়ক হল না। 

মাতাল লোকটা মহিলার পাশে বসেই দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে ভদ্রমহিলার স্বামী।  কি মনে হতেই সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল।  স্বামী ভদ্রলোকটিকে বলল – “দাদা, বসুন”।

আমি চমকে তাকালাম।  ভদ্রলোক বলে উঠলেন বিনয় ভরে – “না, না, ঠিক আছে; আপনিই বসুন”।

মাতাল আবার বলল – “বসুন না, আমি দাঁড়াচ্ছি”।

ভদ্রলোক হাসি মুখে প্রতিবাদ করলেন – “আপনি বসুন। আপনারই বসার কথা ওখানে”।

আমার এবার ব্যাপারটা কেমন অন্যরকম লাগল।  এতক্ষণের মানুষটাকে এখন ঠিক চিনতে পারছি না। কোথায় যেন অঙ্ক মিলছে না।  সেতারের তারটা যেন বাজাতে বাজাতে হঠাৎই কেটে গেছে।  আমি পরের ঘটনার জন্য সবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম।

লোকটি বসল।  বসেই অনেকটা সরে এল আমার দিকে। একেবারে আমার গায়ের সঙ্গে গা মিলিয়ে। আমি দেখলাম, সে একটা দুরত্ব রাখল ভদ্রমহিলার শরীর থেকে।  যে জায়গায় ওর বসার কথা সেখানে বসলে ওর শরীরের সঙ্গে ভদ্রমহিলার শরীর গায়ে গায়ে লেগে যাবে।  ভদ্রমহিলা একটু স্বাস্থবতী।  আমার কেমন যেন মনে হল মানুষটা মহিলাকে সন্মান দিতে চাইছে।  আমি আর একটু বামে সরে এসে মানুষটাকে জায়গা দিলাম ভালো করে বসতে।  সে বসল। 

আমি ওর দিকে তাকালাম। ঢুলুঢুলু রক্তিম চোখে যেন এক অন্য হাসির ঝিলিক।  তাতে কি লজ্জা মেশান রয়েছে? বোঝার চেষ্টা করলাম। 

জড়ান স্বরে স্বগতোক্তি করল মাতাল – “ আসলে, সকালে বেরোই।  সারাদিন কাজ।  নোংরা ঘাঁটতে হয়।  সুইপারের কাজ করি।  মদ না খেলে কাজ করতে পারি না।  চাকরি জীবনের প্রথম থেকে অভ্যেস হয়ে গেছে”।  আমার সামনে কেউ যেন চড় মারার জন্য করতল উঁচু করে ধরল। 

আমি জিজ্ঞেস করলাম – “কোথায় নামবে?” – এই প্রশ্নকে সে আমার মতো অনধিকার চর্চা বলে মনে করল না। সে উত্তর দিল – “আর চারটে ষ্টেশন পরে”।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম – “কতদিন হল কাজ করছ?

সে বলল – “তা পঁচিশ বছর হল।  যুবক বয়সে ঢুকেছিলাম।  বাবা সুইপার ছিল।  মদ খেয়ে খেয়ে শেষ হয়ে গেল।  বাবুরা বাবার কাজটা আমাকে দিল।  তারপর থেকে আমিই করছি।  প্রথম প্রথম খুব ঘেন্না করত। বাড়ী এসে খেতে পারতাম না।  ডান হাতটা মুখে তুলতে গেলে কেমন বমি পেতো। ভেবেছিলাম চাকরী ছেড়ে দেব।  পারিনি।  ঘরে তখন অনেকগুলো মুখ আমার রোজগারে বেঁচে থাকত।  চেয়ে থাকত আমার দিকে।  অফিসের একজন পুরান সুইপার আমায় মদ খাওয়া ধরাল।  বলেছিল, কাজ করার আগে খেয়ে নিবি, আর কোন অসুবিধা হবে না।  প্রথম প্রথম সেটাও ভালো লাগত না।  তারপর সয়ে গেল।  দু’হাতে নোংরা পরিষ্কার করতে তখন আর কিছু মনে হতো না।  আমি মাতাল হয়ে গেলাম আস্তে আস্তে।  সে অভ্যেস রয়ে গেছে”।  - একটু থামল মানুষটা। তারপর আবার বলতে শুরু করল – “জানি গন্ধ বেরোয়। আমার নাতনিটাও বলে, দাদু তোমার মুখে গন্ধ। ওই ছোট্টো মেয়েটার বয়সি আমার নাতনি।  খুব মিষ্টি দেখতে। ইংরাজী স্কুলে পড়ে। ট্রেনে আপনাদেরও অসুবিধা হয়।  কিন্তু কি  করব? মদ যে এখন আমাকে খায়।  আমার ঘামে মদের গন্ধ, আমার রক্তে এখন বাংলা মদ। তাই আমি মহিলাদের পাশে বসতে চাই না।  আমি আট ক্লাস পর্যন্ত পড়াশুনা জানি। পয়সার অভাবে আর পড়া হয়ে ওঠেনি তারপর।  মদ খাই, কিন্তু নিজের সন্মানটাকে এখনও খেয়ে ফেলতে পারিনি বাবু, লজ্জা করে”।

আমি কি বলব ভেবে পাই না।  উঠিয়ে রাখা অদৃশ্য হাতটার চপেটাঘাত যেন আমার গালের ওপর ‘চটাস্‌’ শব্দে নেমে আসে।  এখন আমার কোন গন্ধ লাগছে না।  সুইপারের পাশে বসে আছি বলে কোন ঘেন্না লাগছে না।  মনে হচ্ছে মানুষটাকে দু’হাতে আলিঙ্গন করে বলি – “তুমি মাতাল নও; তুমি সেই মানুষ, যার মান ও হুঁশ দুটোই বর্ত্তমান।  তুমিই ভদ্রলোক আর আমি তোমার পাশে বসে থাকা কেরানি-আমি একটা নীচ মনের অভদ্র, অহংকারী মানুষ।

আমি ওঁকে আর ‘তুমি’ সম্বোধন করতে পারিনা। জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলি – “আপনি ভালো করে বসুন।  আরাম করে। আমাকে এবার নামতে হবে। 

মানুষটা সরে বসেন আমার জায়গায়।  তারপর ভদ্রমহিলার স্বামীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে ওঠেন – “এবার বসুন, দাদা”।

ভদ্রলোক মৃদু হেসে ফাঁকা জায়গায় বসে পড়েন তাঁর সহধর্মিনীর পাশে।

আমি ট্রেন থেকে ষ্টেশনে নামার আগে শেষ বারের মত মানুষটার দিকে একবার তাকাই ভালো করে দেখার জন্য। এবার যেন ওঁনার মুখে শান্তির ছায়া দেখি।  মনে মনে ভাবি, মানুষটার নাম জানা হল না। আমি তাঁর অজান্তে তাঁর নতুন নাম দিয়ে ফেলি – ‘দেবোপম’।

...(সমাপ্ত)...