1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label পিনাকী চক্রবর্তী. Show all posts
Showing posts with label পিনাকী চক্রবর্তী. Show all posts

Wednesday, October 2, 2024

মোমবাতির ছায়া

ছবি  : ইন্টারনেট

মোমবাতির ছায়া

পিনাকী চক্রবর্তী

বাস থেমে  যেতেই, ব্যাগ নিয়ে পিয়ালী গ্রামের মেঠো পথে  নেমে  পড়ল। সামনে মাঠ,  সবুজের কার্পেটে পা রেখে এগিয়ে  যেতেই, মাত্র সাত মিনিট বাদে একটা পুকুর দেখা যাচ্ছে। তার পাশ দিয়ে হেঁটে  একটা ভাঙা  দ্বোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। ঘড়িতে  বেলা সাতটা। শীতের রোদ উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। 

পিয়ালী  উঠানে দাঁড়িয়ে বলল- কেউ আছেন?

উঠান ছড়ানো  রোদ, বাড়ির পরিবেশ জুড়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা।

একজন  বয়স্ক লোক  বেড়িয়ে এসে  ভাঙা গলায় বলল- ঠিক চিনলাম না মা, তুমি কে?

পিয়ালীর  বুকটা ছ্যাঁত করে  উঠল!

এই অপরিচিত মানুষটাকে সে নিজেও চেনেনা।  তাহলে  ভুল  ঠিকানায় এসেছে? পিয়ালী এখানে এসেছে যার সাথে দেখা করবে বলে, তার পরিবর্তে সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপরিচিত বছর ষাটের বৃদ্ধ ।

পিয়ালী মনে মনে বলল -  চিঠি এই ঠিকানা থেকেই আসতো। বাইরে পাথরের উপর স্পষ্ট  ঠিকানা লেখা রয়েছে।

মুখে অস্থিরতার ছায়া, পিয়ালী বলল

-আমি কলকাতা  থেকে  এসেছি।  অভিজ্ঞান বাবুর খোঁজ  করতে।

লোকটি  হেসে  বলল – বুঝেছি। মা, সন্ধ্যায় দেখা  হবে। এখন সে  নেই।

পিয়ালীর বিরক্তি বোধ হচ্ছিলো। বলল

-আমি রাতের ট্রেনেই  কলকাতায় ফিরে যাবো  মেসোমশাই। এখানে থাকবার জায়গা হবে, মানে গেস্টহাউস।

লোকটি হেসে বলল

-মা, যদি  কিছু  মনে না  করো, এই বাড়িতেই থাকো। দুপুরে এখানেই খাওয়া দাওয়া  করবে। সে  বিকেলের দিকে  আসবে।

পিয়ালীর হাতে অপেক্ষার বিকল্প কোন রাস্তা নেই। যেই উদ্দেশ্যে এসেছে, তার সাথে বিকেলের আগে দেখা হবে না। পিয়ালী বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল, পুরানো বাড়ি, দ্বোতলা। ছাদটা ন্যাড়া, এই বাড়িতে মানুষজন তেমন একটা থাকে না। স্যাঁতস্যাতে সিঁড়ি পেড়িয়ে, পিয়ালী একটা ঘরে ঢুকল; নোংরা অগোছালো ঘর। বাইরে দিনের আলো খুব একটা ঢোকেনা। ঘরের ভিতর গিয়ে, খাটের উপর বসল। মনে মনে বলল - কয়েক ঘন্টা মাত্র, ঠিক কেটে যাবে ।

পিয়ালী জানালার শিকে হাত রেখে  অতীতের  বহু  কথা মনে  করছিল। অনেকক্ষণ বিছানায় বসে বসে কোমর ব্যাথা হয়ে গিয়েছে। জানালার ধারে এসে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় তিরিশ মিনিট;  স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ,   পিয়ালী সেন খেয়াল করেনি ঘড়ির কাঁটা দ্রুত এগিয়ে চলেছে!  ঘড়িতে বেলা চারটে। সে খেতে না চাইলেও , বুড়ো লোকটাকে ঘরেই খাবার দিয়ে গিয়েছে। পিয়ালী ইদানিং নিরামিষ খায়। ইসকনের থেকে দীক্ষা নিয়েছে।

অনেক স্মৃতিই ভাসছে, পিয়ালী যেই মানুষটার জন্য এই এতদূর ছুটে এসেছে, তারসাথে কলকাতায় আলাপ। যেই চাকরিটা পিয়ালী এখন করছে, সেই প্রাইমারি স্কুলের চাকরির জন্য অনেক আন্দোলন করতে হয়েছিল। তখন সবেমাত্র পিয়ালীর প্রেম ভেঙেছে।

একটা কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীতে  কাজ করা; গ্রামের বাইক চালানো ছেলেটির সাথে  প্রেম হয়েছিল পিয়ালীর। সেই প্রেম বিয়ে অবধি এগিয়ে যায়নি। প্রেম অবশ্য শুরু হয়েছিল যখন পিয়ালী প্রাইমারি স্কুলের পরীক্ষায় বসবে  বলে টিচার্স ট্রেনিং নিচ্ছিলো। প্রেম পর্ব প্রায় তিন বছর চলেছে। তারপর আচমকাই রোগা, ময়লা রঙের কৃষক পরিবারের মেয়ে পিয়ালীকে , ছেলেটি অপমান করতে শুরু করল,। বাইক চালানো  কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি করা ছেলেটির অপমানের  যন্ত্রণায় পিয়ালী সম্পর্ক ভাঙতে বাধ্য হয়।

পিয়ালীর জীবনে আসে অভিজ্ঞান। তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক কতদূর এগিয়েছিল , তা হচ্ছে তর্কের কথা। সদ্য প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার যন্ত্রণা ও চাকরি পরীক্ষার জন্য প্রতিদিন আন্দোলন করা, চাকরি জুটবে কিনা সেই  চিন্তা -এইসব থেকে রেহাই পাবে বলেই অভিজ্ঞানের প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। প্রেম নয় তবে প্রেমিকের মতন কেউ থাকলে মনের সারাদিনের জমে থাকা কথা তার সাথে শেয়ার করা যায়; মনের কথা বলবার মতন মন খুঁজছিল।

প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি পেতেই, পিয়ালী নিজেকে সম্পর্কে  বাঁধতে চায়নি। একটা নতুন জগৎ, আলাদা ব্যাপার, বাঙালি জীবনে সরকারি চাকরি হচ্ছে মহাকাশ অভিযানের সুযোগ পাওয়ার মতন। জীবন যে কতটা বিচিত্র, রহস্যময়, সুন্দর; অনুভব করবার মন  বাঙালিদের নেই। একটা বেকার ছেলের হাত ধরবার মতন ভিতরের টান পিয়ালীর ছিল না। বয়স তখন তিরিশ , ছেলেটির পঁয়ত্রিশ;  সরকারি চাকরি হবেনা, ব্যবসায়িক বা অন্য কোন ভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। পিয়ালী ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিল।

এখন পিয়ালীর বয়স বাহান্ন।

কিছুক্ষণ আগেই ঘরের বাইরে থেকে আচমকা অন্ধকারে নেমেছে । ঘড়িতে বিকেল ছ'টা। পিয়ালীর  জীবনে এই বছরে অনেক    পরিবর্তন এসেছে। সমীরের সাথে একবছর আগেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। একমাত্র ছেলে বাবার সাথে থাকে।

সরকারী  স্কুলের চাকরিটা যেই দিন পেয়েছিল, বুঝতেও পারেনি এতো দ্রুত জীবনে সাঁঝের মুখোমুখি হবে!

কথা গুলো একমনে ভেবেই চলেছে, পিয়ালী খেয়াল করল পিছনে এক পুরুষের ছায়া!  ঘাড়  ঘোরাতেই দেখল বছর বাহান্নর একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন।   

পুরুষটি নরম  কণ্ঠে  বলল- পিয়ালি, জন্মদিনের শুভেচ্ছা। এই বছর বাহান্ন  হয়েছে।

পিয়ালীর মুখে লজ্জার ছোঁয়া।

-ধুস, বুড়ি হয়ে  গেলাম।

লোকটি হাসতে হাসতে বলল

-ভালোবাসার যেমন বয়স থাকেনা,  শুভকামনার বয়স আছে নাকি? আমি সুকান্ত। অভিজ্ঞানের বন্ধু।

অভিজ্ঞান ,নামটা শুনতেই পিয়ালী অস্থির হয়ে বলল

-অভিজ্ঞান কোথায়?

পিয়ালীর প্রশ্ন শুনে, লোকটি বলল

- একুশটা চিঠি এনেছো ? 

পিয়ালীর  কণ্ঠে উত্তেজনা। বলল - ও একটা পাগল। সেই একবার আমাদের  মধ্যে  ভীষণ তর্ক হল। অভিজ্ঞান বলল,  আমার  জন্মদিন ওকে কেন জানানো হয়নি। আমি বললাম আমার  ভালোবাসার মানুষটা যখন মনে রাখেনা, তখন আর কেই বা  উইশ করবে? অভিজ্ঞান বলল, সে করবে।  বাইশ বছর ধরে  করবে। পাগলটা কথা রেখেছে।

লোকটি স্থির কণ্ঠে বলল

-আপনি ওকে ভালবাসলেও, সম্পর্কটা  বন্ধুর্ত্বের স্থানেই রেখে দিলেন তাইতো ! চাকরি পেলেন, অন্য কাউকে বিয়ে  করলেন,  সন্তান হয়েছে; বছরে কতবার ফোন করেছিলেন?

পিয়ালী ধীরে ধীরে বলল

-প্রায় ছয়বার। ধরেনি। ভেবেছি অভি সংসার করেছে।

 -আজ কেন ছুটে  এলেন?

পিয়ালী ভাঙা গলায় বলল

-ওকে বলা দরকার, সব কিছু পেয়েও আমি  একা। ওর একুশটা চিঠিই আমার এই জীবনের সম্বল। একাকীত্ব এক কঠিন  সত্য । এর মোকাবিলা করা খুব শক্ত। কিন্তু অভি কোথায়?

সুকান্ত মাথা নামিয়ে  ধীর  কণ্ঠে বলল- যেই বছর আপনার বিয়ে  হয়েছিল, ঠিক দু’মাস বাদেই লিভারে ক্যান্সার ধরা পড়ে।  ছয়মাসের মধ্যেই সব শেষ।

পিয়ালী আঁতকে উঠল! খুব কাঁদতে ইচ্ছা  করছে। কান্নায় গলা বুজে আসছে, বলল- তাহলে এই চিঠি গুলো আমার ঠিকানায় কেমন করে ?

সুকান্ত নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে পিয়ালীর দিকে। সেই দৃষ্টিতে অবজ্ঞা ছিল। বলল

-ওর বাড়িটা আমাকে দিয়ে  যায়।  আপনার নামে লেখা একুশটা  চিঠি আমাকে দিয়ে যায়।

পিয়ালী অবাক হয়ে বলল

- ঠিক বুঝলাম না!

সুকান্ত ধীরে ধীরে বলছে

 - আমার দায়িত্ব ছিল,  প্রতি জন্মদিনে আপনার  ঠিকানায় চিঠি গুলো পাঠিয়ে  দেওয়ার।

-আপনি নিজে  বিয়ে  করেননি?

সুকান্ত এতক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা গুলো বলছিল। ফতুয়া আর পাতলা পাজামা পড়ে আছে। সামনে কাঠের চেয়ারের উপর বসে পড়ল। বলল

-আমি অভিকে আজও ভালোবাসি। অভি যেমন আপনাকে ভালোবাসে।

পিয়ালী অবাক হয়ে শুনছে। সুকান্ত স্থির দৃষ্টিতে বলে চলেছে

-আমার ইচ্ছা ছিল অভির সাথেই সংসার করার। আপনি যেমন অন্যের সাথে সংসার করেছেন। আপনার ডিভোর্সের খবর আমি জানি।

পিয়ালী বলল - বুঝলাম না!

সুকান্ত শক্ত দৃষ্টিতে পিয়ালীর দিকে তাকিয়ে বলল - সরকারি চাকরি পেয়ে, খাঁটি মানুষটাকে ভুলে গেলেন! আপনার প্রেমিক যখন আপনার সাথে বাজে ব্যবহার করেছিল, সম্পর্ক ভেঙে নতুন ভাবে শুরু করতেন, যদি অভিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হতো।

কথাগুলো ততটাই সত্যি, যতটা শুনে পিয়ালীর নিজের উপর ঘৃণা আসছিল। পিয়ালী বলল - সেটা অপরাধের নয়। আমিতো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিইনি।

- এটা আপনার কাছে খুব স্বাভাবিক, আপনাদের মতন মানুষদের কাছে সম্পর্ক মানেই নিজের যন্ত্রণা ভাগ করে নেওয়ার অংশীদার। যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সে আপনার।

পিয়ালী নিজেকে সামলাতে পারল না। চিৎকার করে বলল

- সবাই তাই করে। আমি তখন নতুন চাকরি পেয়ে স্বাধীনতার স্বাদ নিচ্ছিলাম। আমরা কেউই অন্যের সাথে দায়বদ্ধ নই। যার জীবন সে সামলাবে, এটা অন্যায় নয়।

সুকান্ত বলল - আমি কিন্তু অভিকে একজন প্রেমিকার মতন একান্তে জড়িয়ে থেকেছি। ওকে কখনো নিজের থেকে আলাদা করিনি। সমাজ আমাকে নিয়ে অনেক ঠাট্টা করেছে। পাত্তা দিইনি।

কিছুক্ষণ  থেমে সুকান্ত ভেজা  গলায়  বলল- বলতে পারেন, আমার প্রেমকে অভি বন্ধুর্ত্বের স্থানেই রেখে চলে গেলো। জানেন মৃত্যুর সময় অভি একটা অদ্ভুত শর্ত  দিয়ে গেলো!

পিয়ালী সেন উত্তেজিত হয়ে বলল

-কিসের শর্ত?

-ওর ভালোবাসাকে আপনি স্বীকৃতি  না দিলেও, আমি যেনও  দিই। যদি পরের জন্ম বলে কিছু থাকে, আমি নারী হয়ে অভিজ্ঞানের পিয়ালী হতে চাই।   বলুনতো মোমবাতির খুব নিকটে  কে থাকে, আলো না ছায়া ?

পিয়ালী চুপ করে রয়েছে। জানালার  উল্টোদিকে নিথর  অন্ধকার  নামছে, ঘড়িতে এখন পুরোপুরি সাতটা বাজল। একমাস আগে এই সময়েই সে ডিভোর্স পেপারে উকিলের সামনেই স্বাক্ষর করেছিল।

ঘরটা অন্ধকারে ভরে গিয়েছে। বাইরে বারান্দায় কেউ এসে হালকা হলুদ রঙের কম পাওয়ারের আলো জ্বালিয়েছে। সুকান্তের চোখের দিকে পিয়ালীর তাকিয়ে থাকবার সাহস নেই। সেই চোখ আমরা পড়ছি। পিয়ালীর একুশ চিঠির বিশ্বাস ঘাতকতার ইতিহাস, তার স্বামী, সন্তান জেনে গিয়েছে কিনা জানিনা, সুকান্ত ডিভোর্সের খবর জেনে গিয়েছে কেমন ভাবে ?

অভিজ্ঞান বেঁচে থাকলে কাকে বেশী ভালোবাসতো - পিয়ালী, না সুকান্ত? প্রেম শুধুই শরীরের, সেখানে ত্যাগের ভূমিকা ক্ষীণ!!

...(সমাপ্ত)...

Tuesday, January 26, 2021

পালাবার পথ নেই

 

ছবি  : ইন্টারনেট 

   পালাবার পথ নেই
পিনাকী চক্রবর্তী
‘জিতলে বাড়ি ফিরব না হলে মরেই  ফিরব’ 
- মেভা খোটে 
           ১ 
      গাড়ি বলবন্তপুরের মাটি ছুঁতেই, ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা। শীতের আকাশে তাড়াতাড়িই  আলো  ফুরিয়ে   আসছে। চারপাশের পার্থিব যাবতীয়  আয়োজন অপার্থিব হয়ে উঠেছে!  গাড়ির ভিতর থেকে খুশবন্ত সিং   বাইরের   পরিবেশ  দেখছিল। গাড়ি চালাচ্ছে  হরকিশন পাসোয়ান, খুশবন্তের  ব্যাক্তিগত ড্রাইভার, ওঁরা  সরকারি বাংলোর  সামনে  এসে থামল। দুজনেই  গাড়ি  থেকে  নামল। 
 কালো রঙের  লোহার  লম্বা গেট দিয়ে ঢুকলে, সবুজ ঘাসে  মোড়া লন দেখা  যায়; চারপাশ   বড়  বড়    গাছে ঢেকে গিয়েছে। অনেকদিন বাদে  বড় সাহেবদের  পায়ের  ধুলো পড়বে, ঝাঁড়পোছ হচ্ছে। লন পেড়িয়ে তিনতলা বাংলোর  সামনেই খুশবন্তের গাড়ি  দাঁড়িয়ে। দুজন কনস্টেবল তাঁকে স্যালুট করল। খুশবন্ত  সিং পঁয়ত্রিশ বছরের  ঝকঝকে  তরুণ। টিকালো নাক,  পেশীবহুল শরীর, লম্বা, ফর্সা চেহারা। খুশবন্ত দিল্লি  পুলিশের এসিপি। তাঁর  চেহারা  দেখে  বলাই যায় - চাইলে বলিউডের  নায়ক  হতেই পারত। 
খুশবন্ত হাতে থাকা মোবাইল ফোনে  নম্বর  ডায়েল করল। ফোনের উল্টো দিক থেকে ভেসে আসছে নারী কণ্ঠ। মেয়েটি বলল 
- যাওয়ার আগে  অন্তত একবার ফোন  করতে  পারতে।
-একদম মাথায় ছিল না। স্যরি।
-এটাই  কমন কথা, তুমিও বললে  আমিও শুনলাম। এও জানি আবার স্যরি  বলতে  হবে।
-তুমি এখনি শুরু  করলে! 
খুশবন্ত  গাড়ির সামনে  আড়ালে এসে  বলল 
-আসবার  সময় তোমার  কথা  খুব  মনে  পড়ছিল।
উল্টো দিকের  নারী  কণ্ঠ থেকে হাসির শব্দ ভেসে এলো। বলল 
-গুছিয়ে  মন রাখবার কথা  বলতে  হবেনা, ডিউটির  সময় পৃথিবীর  কাউর  কথাই  মনে  থাকেনা তোমার।
খুশবন্ত কিছুক্ষণ  থেমে, পিছনের  দিকে  তাকিয়ে  দেখল, পাতলা  কালো রঙের বছর  আঠারোর  একটা ছেলে দাঁড়িয়ে  আছে। তাঁর দিকে  তাকিয়ে  খুশবন্ত বলল-‘ঘর  ঠিক  করও,  স্নানের  জল লাগাও’।  ছেলেটিকে  নির্দেশ  দিয়েই  আবার  ফোনে কথা  বলতে শুরু  করল। 
- উপর মহলের চাপ আছে নিধি। এই ব্যাপারটা নিয়ে সরকারের উপরমহলেও চাপে আছে। 

এখন চারপাশে আলো  নেই। সব আলো আচমকাই  উধাও! খুশবন্ত ফোন  রেখে দিয়ে, চারপাশের  বড়  বড়  গাছ , গাছের শাখা প্রশাখায় মিশে থাকা আত্মনিবেদিত শব্দদের  খুঁজছিল।  কিছুক্ষণ আগেও  পাখিদের  কিচিরমিচির কানে আসছিল। ঘড়িতে পাঁচটা তিরিশ, শীতের বিকেল, ভারী  ঠাণ্ডা  চেপে ধরছে। ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা  নামছে। রাস্তার ধকল এখনো খুশবন্তের চোখে  মেখে রয়েছে। ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। 

ঘড়িতে রাত দশটা, বাংলোর বাইরে ঝি ঝি পোকারা  ডাকছে। খুশবন্ত জানলার সামনে  দাঁড়িয়ে  আছে। বাইরে ঠাণ্ডা রাত  ক্রমশই নীরব  হয়ে  উঠছে। আকাশে তারারা জ্বলছে। রাতের ছায়ায় মিশে  গিয়েছে  বড় বড় গাছেরা। এখানে  খুব একটা আলোর  ব্যাবস্থা নেই। কিছুটা দূরে গেটের সামনে হাল্কা পাওয়ারের হলুদ বাল্ব জ্বলছে। কেয়ারটেকার বাথরুমের সামনে  নতুন বাল্ব ঝুলিয়েছে; খুশবন্ত  আলোর  তীব্রতা দেখে  বুঝতে পেরেছে।  

ঘরের বাইরে কেউ দাঁড়াল। খুশবন্ত  বলল- বাইরে  কে? 
-স্যার আমি পাপ্পু। আপনার রাতের খাবার এনেছি। 
 খুশবন্ত  বলল- আয়, ওই  টেবিলে  রাখ।
মাথায় টুপি, গায়ে চাঁদর জড়ানো।
- তোর নাম কী ?
খুশবন্ত চেয়ারে বসেই, হাতের  সিগারেটে টান  দিল।    
ছেলেটি  বলল- স্যার আমি  হরিমোহন। 
-এখানে  কতদিন আছিস?
-স্যার, আপনি আসবেন বলে আমাকে ডাকা হয়েছে। আমি রাঁধুনি নই। মহাজন কৃষকদের জমিতে ক্ষেত মজুরি করি।
-তাহলে এখানে রান্নার কাজ করছিস!
-গ্রামে এখন চাষের  কাজ বন্ধ আছে, কিছুতো  খেতে হবে। ঘরে  বাপটা অসুস্থ। 
ছেলেটা  এদিক ওদিক  তাকিয়ে, পা ভাঁজ করে  খুশবন্তের  পায়ের কাছে বসল। ফিসফিস করে  বলল-  বাবু, শুনেছি গুরুবন্তের  শরীর  ভালো নেই,অবস্থা খুব খারাপ। বয়স হয়েছে, এমনিতেই ভুখা পেটে  তাকত নেই। এবার  জল পর্যন্ত  খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।   
-তুই  গুরুবন্তকে  চিনিস?
হরিমোহন  বলল- তাঁকে  এই  তল্লাটে সবাই  জানে।
-তাই নাকি ?  
-হুযুর, সে  যে  বাঁজা  জমিতেও ফসল  ফলাতে পারে। আমরা তাঁকে বাবা গুরুবন্ত  বলি।
খুশবন্ত তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বলল- সেই বাবা এখন কেরামতি দেখাচ্ছে। সরকারের  নাকে  দড়ি  দিয়ে  ঘোরাচ্ছে। প্রশাসনের  ঘুম  কেড়ে  নিয়েছে। 
হরিমোহন  বলল- বাবা গুরুবন্ত সবসময় আমাদের  হয়েই  কথা  বলে। 
ছোট্ট  নিঃশ্বাস  ছেড়ে, খুশবন্ত বলল- হরি, আমি এখন  ঘুমাব, তুই ঘরের আলো নিভিয়ে, দরজা  বন্ধ   করে  চলে  যা। 
হরিমোহন খাবারের  দিকে  তাকিয়ে  বুঝতে পারল না, খুশবন্তের মেজাজের  গতিবিধি। স্থির চোখে  অপেক্ষা করে ঘরের  বাইরে বেরিয়ে গেল। 
বাইরে  তখন  দেহাতি ঠাণ্ডা, ঘন কুয়াশায়  বাল্বের আলো ঘোলাটে  হয়ে গিয়েছে। ঘরের  ভিতর অল্প পাওয়ারের টিউব নিভে গেল। খুশবন্ত রাতে হুইস্কি অনেকটাই নিয়েছে, বিছানায়   শুয়ে ঘুম আসতে বেগ পেতে হবেনা। 
  
          ২ 
     গাড়িতে  খুশবন্তের  সাথে  তিনজন   কনস্টেবল আছে। গাড়িটি যিনি চালাচ্ছেন তাঁর নাম জায়গিরদার। সেই  প্রথম  বলল- স্যার আমাদের  প্রায় কুড়ি  মিনিট  পায়ে  হাঁটতে  হবে। গাড়ি  যেখানে  থামবে সেখান থেকে  হাঁটা  পথ। 
খুশবন্ত  বলল- মানে? আমরা হেঁটে  যেতে  যাব কেন?
জায়গিরদার গাড়িটাকে  কিছুটা ধীর  করে  বলল- সেখানে যে  আল্লার বান্দা আছে। 
খুশবন্ত  বলল- তুমি কার কথা  বলছো ? 
ফোন  বেজে  উঠতেই, খুশবন্ত  ইশারায় গাড়ির  ভিতর  সবাইকে  চুপ থাকতে বলল। গাড়িটি থামতে, খুশবন্ত গাড়ি  থেকে  নেমে, ফোন  ধরল। উল্টো দিকে  ভারী কণ্ঠস্বরে যিনি বলছেন কথা, তিনি খুশবন্তের  সিনিয়ার। 
-গুড মর্নিং  স্যার। 
ভারী কণ্ঠে  বছর  পঞ্চাশের উপর  বয়সী একজন বললেন
-কোনও  অসুবিধা  হয়নিতো? 
কথাটা শুনেই  খুশবন্ত কিছুক্ষণ  থেমে  বলল- স্যার আজই  প্রথম  যাচ্ছি। আমি সব  খবর  নিয়ে  রেখেছি।
-ডিপার্টমেন্ট খবরে নয়, কাজে  বিশ্বাস  করে। 
কিছুক্ষণ  থেমে  খুশবন্ত  বলল- স্যার এর আগে  আরও  অনেক  বড়  বড়  কেসে  আমাকে পাঠিয়েছেন। আশা  করছি  হতাশ  করব না।
-এটা   রাজনৈতিক  আন্দোলন  নয়। ব্যাক্তিগত  আন্দোলনও  নয়।এটা  কৃষক আন্দোলন। ওরা দেশের অন্নদাতা। সেন্টিমেন্ট  বুঝতে না পারছো? একটু এদিক ওদিক হলে,  পাবলিক সরকারের বিপক্ষে  চলে  যাবে।  
-জানি স্যার।
খুশবন্ত  কিছুক্ষণ   চুপ  করে  বলল- যারা ফসল ফলাচ্ছে, যারা দেশের  মানুষের  মুখে  খাবার দিচ্ছে, আজ তাঁদের  পথে  নামতে  হয়েছে, দেশের  রাজনৈতিক  দলেরা নিজেদের  অন্যায় আবদারকে রাখতে  গুণ্ডামি করে। আর স্যার কৃষকদের  আন্দোলন  দমাতে আমাদেরও  অন্যায় করতে হবে।  
-হু হু, একটু  চেঞ্জ করে  বলও। , আমাদের  পদন্নতির জন্যই, সরকারের অন্যায় কাজে সাথ দিতে হয়। এটা নতুন ঘটনা নয়। 
উল্টো দিকের  ভারী  কণ্ঠস্বর  থেকে  প্রবল  হাসির শব্দ  ভেসে এলো। 
-স্যার আপনি হাসছেন!
-হ্যাঁ  হাসছি, আমার খুব  কাছের  হয়েও, এখনো এইসব  আবেগ নিয়ে  বসে আছো! এইসব চিন্তা কলেজ  স্টুডেন্টদের  জন্য  রেখে  দাও। একটু  ম্যাচিওর  হয়ে  ওঠো। সুনিধিকে তো  তোমাকেই সামলাতে  হবে। মনে  রেখো, তুমি  বলেন্দ্রর সিং এর একমাত্র  মেয়েকে  বিয়ে  করবে। ইউ আর মাই  সন  ইন  ল।
খুশবন্ত কথাগুলি  শুনে চুপ  করে  থাকল। উল্টো  দিক  থেকে ভেসে  এলো- এতো  বেশি  চিন্তা  করলে  জীবনে  একজায়গায়  থেমে  থাকতে  হবে। আমরা   সবাই এগিয়ে  যেতে  চাই। গো এহেড... 
ফোন  রেখে দিতেই , পিছনে  পাতলা  চেহারার   সদ্য  কাজে  যোগ  দেওয়া  ছেলেটি দাঁড়িয়ে  আছে । তাঁর  দিকে  তাকিয়ে  বলল-  তুমি  নতুন এসেছো?
ছেলেটি  লাজুক  মুখে  বলল-  হ্যাঁ স্যার, বাবা  এক্সিডেন্টে  মারা  যায়। একবছর  ওয়েটিং এ ছিলাম।
‘কি  নাম?’  কথাটা  বলেই, খুশবন্ত পকেট  থেকে সিগারেট  নিয়ে মুখে দিল। আগুন দিয়ে  সিগারেট জ্বালালো। 
ছেলেটি  বলল- আমার নাম রাকেশ  গুপ্তা। 
খুশবন্ত  বলল- তুমি তো  একজন সিভিল  ইঞ্জিনিয়ার। ভালো লাগবে  তোমার সাথে  কাজ  করে।
রাকেশ  কিছু  বলতে  যাবে। মুখ দেখে খুশবন্ত বলল- কিছু  বললে  বলতে  পারো।
খুশবন্তের পায়ে হাত দিয়ে রাকেশ বলল- আপনার সাথে  কাজ  করবার   সুযোগ  অনেক  বড় ব্যাপার। ট্রেনিং  করবার সময় ব্যাটেলিয়নে আপনার  কথা  অনেক শুনেছি। আপনি গুরু আমাদের। 
- এই বয়সে আমাকে  বাবা বানিও না। তুমি অবশ্য চ্যালা হতে চাইলে  অসুবিধা নেই। 
কথা শুনে হেসে ফেলল। রাকেশ উঠে দাঁড়াতেই, মাথায় হাত বুলিয়ে বলল- আমার সাথে  থেকো, তোমার দরকার  হবে।
- স্যার জীবন দিয়ে  দেবো।  
খুশবন্ত চোখে   চোখ  রেখে  বলল-  এখন অন্তত কৃষক আন্দোলনের গতিবিধির খবরটা আমাকে  দিও।   

ওরা গাড়িতে  উঠতেই, গাড়ি   চলতে  শুরু করল। 

ওদের  গাড়ি  ক্ষেতের  মাঝখান দিয়ে আসছে। চারপাশে  গম ক্ষেত। সেইদিকে  তাকিয়ে  রাকেশ বলল- ‘জমি আবেগ। আমার বাবার দশবিঘা জমি ছিল। দিদি, বোন, দাদা, বাবার চিকিৎসায় এখন  দুবিঘায় এসেছে।’আকাশে রোদ বাড়ছে। গাড়িটির গন্তব্য  খুবই ধীরে, এর একটা কারন এটি  গ্রামের  এবড়ো খেবড়ো পথ। এখানে  ধরে না চালালেই, গাড়ি ক্ষেতে  ঢুকে  যেতে  পারে। ঘড়ির দিকে  তাকিয়ে খুশবন্ত  বলল-‘জায়গাটা কোথায়?’ জায়গিরদার বলল-‘দিল্লির  টিকরি বর্ডারে কৃষকরা আন্দোলন করছে। ওখানেই  দশদিন   ধরে বুড়ো গুরুবন্ত বাবা অনশন চালাচ্ছেন। দম আছে  বলতে হবে। এই বয়সেও...  
খুশবন্ত বলল- রাতে  যদি  ঝামেলা  করতে  হয়, তোমাদের  সবাইকে  পাবো তো? 
খুশবন্ত রাকেশের দিকে  তাকিয়ে  বলল- তুমি রাতে  থাকবে তো?
বাকীরা সম্মতি দিলেও, রাকেশ মৌন রয়েছে! খুশবন্ত এই  মৌনতা দেখে বিরক্তই হল। গাড়ি গ্রামের রাস্তা ছেড়ে পাকা সড়কে উঠল। গাড়ির গতি বাড়তে শুরু  করেছে। খুশবন্ত বলল –রাকেশ চুপ কেন? কিছু বলও? তুমি  নিজে  একজন কৃষক, তাই  হয়ত কৃষকদের প্রতি মন  নরম  হচ্ছে?
রাকেশ চুপ করে  আছে। খুশবন্ত তাঁর নীরবতাকে মেনে নিতে পাচ্ছেনা। পনেরো দিন ধরে টিকরির মতন ব্যস্ত সীমান্তে, কৃষকরা অহিংস আন্দোলন করছে! এই আন্দোলন যতটা  শান্ত, স্থির ততটাই  বিপদজনক,  বড়  বড়  রাজনৈতিক নেতাদের রাতের  ঘুম  উড়ে  গিয়েছে। নেতারা  রাতে  ঘুমাতে, ঘুমের ওষুধ আনতে   প্রশাসনকে পাঠিয়েছে। এইসময়ই সবচেয়ে  দামী  সময়। এই ক্ষণই  মাহেন্দ্রক্ষণ। আটকে থাকা  পদন্নতি  গুলি খুব দ্রুত  হতে থাকে। উঁচুতলার  কর্মীদের  ভাগ্যে  শিকে  ছিঁড়তে থাকে। 
খুশবন্ত যদি  নিজের  দায়িত্ব পালন  করতে  পারে, তাহলে বিয়ের আগেই পদন্নতির সরকারি সম্মতিপত্র  হাতে  নিয়ে  বিয়েতে  বসবে। এই সময়ই নিজের  জীবনকে  সাজিয়ে  নেওয়ার চূড়ান্ত  সময়। সে  নিজেও  খুব মানসিক চাপে আছে। তাঁর  উপর অনেক  বর্ষীয়ান পদাধিকারীরা ভরসা করছে। নিজেকে এই মুহূর্তে হিন্দি সিনেমার  নায়ক বলে  মনে হয়, তাঁর  গতিবিধির  উপর  পুরো চিত্রনাট্য, দর্শক, প্রযোজক  নির্ভর  করে  আছে। পকেট  থেকে সিগারেট নিয়ে  মুখে  দিয়ে, জ্বালিয়ে দিল, ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে  বলল- ‘রাকেশ আবেগের জায়গা প্রশাসন নয়। আমরা উপরতলার  হুযুরের কর্মচারী। রাষ্ট্র, সরকার আর  রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যেই আমাদের জীবন আটকে আছে।  আমি বা  তুমি, আমরা  কেউই  সার্থক  বিদ্রোহী হতে পারব না। আমাদের কাজ কৃষকদের আন্দোলন নষ্ট করা। সেটা  করবার জন্যই এসেছি। আমার  নেতৃত্বে  যে  টিম  তৈরি হয়েছে, তাঁদের দায়িত্ব এই  আন্দোলনকে  যে কোন ভাবে  নষ্ট করা। আমাদের যে  কোন মূল্যে সফল হতে হবে।’  
গাড়িটা যেখানে  থামল, কিছুদূর  থেকেই  মানুষের মেলা  বসেছে! সবাই কৃষক নয়। অধিকাংশই  কৃষক, সাথে  অল্প বয়সী ছেলে  মেয়েদের দেখা  যাচ্ছে। সবাই  মাটিতে  বসে আছে। মুখে কৃষিবিল  বিরোধী  শ্লোগান  চলছে। খুশবন্ত দেখল, আন্দোলনকারীদের ব্যারিকেড  দিয়ে  আটকে  রাখা  হয়েছে। সামনে  মিডিয়ার লোকজন খবর  করছে। যারা  প্রতিবাদ  করছেন, বিক্ষোভ  দেখাচ্ছেন, তাঁদের  ভাষায় যে  উষ্ণতা  আছে, তা  চারপাশের আবহাওয়াকে উষ্ণ করে  তুলেছে। খুশবন্ত চারদিকে আন্দোলনের ছবি দেখে  স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। জায়গিরদারকে  হাত নাড়িয়ে ইশারা করল। জায়গিরদার  স্যালুট জানিয়ে  বলল-স্যার, টিকটিকি পিছনের পথ  দিয়ে নিয়ে  যাবে। আমার লোক সে, আন্দোলনের সব খবর ওই দেয়। স্যার শুধু একটা  অনুরোধ আছে । 
খুশবন্ত বলল- কীসের? 
খুশবন্ত কথা গুলো বলতে  বলতে  মোবাইল দেখছে। 
জায়গিরদার মাথা নিচু করে  বলল- স্যার ওর ভাইকে একটা চাকরী দিতে হবে। হোমগার্ডের চাকরী। একটু  দেখবেন স্যার।
খুশবন্ত বলল- কাজ ঠিকঠাক  হলে, উপরতলার সুপারিশে  চাকরী হবে।  
কিছুক্ষণ বাদে, একজন শুকনো চেহারার বছর পঁয়তাল্লিশের  লোক, খুশবন্তের দিকে  তাকিয়ে বলল- সালাম সাব।  
জায়গিরদার লোকটিকে  বলল- রফিক, বড়া  সাব এসেছে।
খুশবন্ত চোখে  সানগ্লাস  পড়ে নিল। রফিকের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে জায়গিরকে  বলল- তাড়াতাড়ি চলো।

ওরা পিছনের রাস্তা দিয়ে অনশন  মঞ্চের কিছুটা  কাছে গিয়ে  দাঁড়িয়ে  আছে। রফিক  বলল- ওদের ডেকে আনছি। 
মাথার  উপরে  যে  বিস্তৃত  আকাশ, শীতের রোদ খেলা  করছে। তিনটে  মঞ্চ খাটিয়ে, চারদিক  ঢেকে  দেওয়া  হয়েছে। রফিকের  সাথে তিনজন  লোক  চলে  এল।মোটা মতন  একজন  লোক মধ্যবয়সের,  খুশবন্তের  দিকে  তাকিয়ে  বললেন- আপনারা সামনের দিক  থেকে  এলেন না  কেন? 
খুশবন্ত  বলল- আমরা  আপনাদের  সাথে  আগে  আলোচনায়  বসতে  চাইছি।
- অসুবিধা নেই, আমাদের  দাবী  মেনে  নিন। আমরাও  আন্দোলন থামিয়ে  দেবো।
-দাবীটা মানা যায়?
-দেখুন আমরা  যে  দাবী  করেছি, আমাদের  হকের কথা  ভেবেই। কৃষকদের এতো  অবুঝ ভাববেন না।
-প্রশাসনের  ভাবার  অধিকার  নেই। তাঁরা হুকুম  পালন  করে।
-কৃষকরা প্রশাসনের  মতন  হুকুম মানতে  বাধ্য  নয়।
-দেখুন, আমি  শুধু  বলব, আজ মিডিয়া, কাল বিরোধী  রাজনৈতিক দল, পরশু  আপনাদের  যারা পিছন  থেকে সাহায্য  করছে, তারা  থাকল। কিন্তু  তারপর? সরকার পক্ষের সাথে  আলোচনায় আসুন। 
-আমরা  শান্তিপূর্ণ  ভাবে আমাদের  কথা  সবাইকে  বলছি। সরকার  আমাদের  যন্ত্রণা  নিয়ে  আদৌ চিন্তিত  নয়। প্রতি বছর  কত কৃষক  আত্মহত্যা  করে, হিসেব আছে?
-এইসব  ব্যাপার  নিয়ে আলোচনা  করুন, আগে  অনশন  তুলে নিন। 
লোকটি কিছুক্ষণ থেমে  বললেন-  সরকার প্রথমে নিজেদের সিদ্ধান্ত  থেকে  নড়বে না বলে। যখন  জনমত তাঁদের  বিপক্ষে   যেতে  থাকে,  মিথ্যা  প্রতিশ্রুতি  দেয়। কৃষকদের  জীবনে  পরিবর্তন  আসেনা।
লোকটির  চোখে অসম্ভব উগ্রতা লক্ষ্য  করছে। খুশবন্তের  এই  দৃষ্টি  অসহ্য লাগছে। এদের  চোখে  ভয়  নেই  কেন!
লোকটি বললেন-  বাবা গুরুবন্ত বলেছেন, আপনাদের সাথে  মেহেমান নামাজি  করতে। এখন  দুপুর। আমরা আপনাদের  জন্য খুব সামান্য  খাবারের  ব্যবস্থা  করেছি। অসুস্থ  শরীরে  বাবা  আপনাদের  জন্য  নিজে দাঁড়িয়ে থালি  তৈরি  করেছেন।
রাকেশ হাত জোর করে বলল- বাবা  গুরুবন্ত! আমার প্রণাম  জানাবেন।
লোকটি  প্রতিনমস্কার জানালেন। কথার উত্তেজনায় খেয়াল  ছিল না, এখন  দেখল  পিছনের  চারজন  লোক  খাবার থালা, আর  ভাত, তরকারি, ডাল ভরা  বালতি  নিয়ে  এসেছেন। লোকটি  রাকেশের দিকে  তাকিয়ে  বললেন- সন্ধ্যার দিকে  এখানে  ভজন  হয়। বাবাকে দেখতে  আসতে  পারো। নাও এখন  খেয়ে  নাও। 
খুশবন্ত  বলল- আমাকে  যেতে  হবে, তোমরা  চাইলে  খেতে  পারো। 
রাকেশ  বলল- স্যার চলুন। 
গাড়িতে  যখন  ফিরছিল, খুশবন্তের  দুটো  চোখ  ভরা  অপমানের  লেলিহান  আগুনের  শিখা, দাউ দাউ  করে  জ্বলছে।  খুশবন্ত শান্ত  হয়ে  গিয়েছে। তাঁর চোখে  অতীতের  ছায়া ভাসছে, মানুষের  অতীত  রহস্যে  ঘেরা দ্বীপ। সেখান থেকে  মাঝে মধ্যেই অনেক  কিছুই  মানুষটির বর্তমান  জীবনকে  প্রভাবিত  করে। খুশবন্তের  অতীতের  কিছু  অমীমাংসিত অধ্যায়  রয়েছে। এই  অধ্যায়  সে রাতের  অন্ধকারে, লোহার বাক্সে থাকা  সেই ছেঁড়া  পরিচয়হীন  চিঠির  শরীরে  খুঁজতে  থাকে। খুশবন্ত চোখ  বন্ধ  করতেই , চিঠির ছায়া দেখছে! রাকেশর  উদ্দেশ্যে বলল- একজনের  পরিচয় জানতে  রাকেশ  তুমি কতদিন সময়  নেবে?
রাকেশ আচমকা  এই  কথায়  ঘাবড়ে গেল। ঢোক  গিলে  বলল- দুদিন  সময় দিন  স্যার। 
খুশবন্ত  বলল- বাবা গুরুবন্তের অতীত জানতে হবে। যদি কোনও ক্রিমিনাল রেকর্ড  থাকে। 
রাকেশ  বলল- স্যার সত্তর বছরের  বৃদ্ধ! 
খুশবন্ত- রাকেশ যা  বলছি  সেটা  করবে। 
৩ 
‘আপনি তাহলে আমাকে ফিরিয়ে দেবেন!’- খুশবন্ত কথা  গুলো বলতে  বলতে  নিজের অসহায়তা টের  পাচ্ছিলো! সামনে সত্তর  বছরের  বুড়ো মানুষ, খড়ের গাদার উপর বিছানা  তৈরি করে শুয়ে আছে।  কিছুক্ষণ আগেই খড়ের  বিছানার উপর চাঁদর  জড়িয়ে শুয়ে ছিল। এখন মাঝরাত। ঘড়িতে  বারোটা  দশ। এই  তাঁবুর  ভিতরে দুজন মানুষ  ছাড়াও  শুধু একটি  খড়ের  বিছানা আর   হ্যাজাকের লণ্ঠন  রয়েছে।  সামনে  আধশোয়া  মানুষটা টানা বারো দিন একফোঁটা জল মুখে তোলেনি। শরীরে  ক্লান্তি, চোখ দুটোর  দিকে  তাকিয়ে আছে। খুশবন্তের  মনে  হচ্ছে  চোখ দুটো এতোটা  গভীর, যার  তল মাপতে  সে ব্যার্থ। তাঁবুর বাইরে  শীতের  রাতের  জবুথবু  নীরবতা। দূরে  কুকুর  ডাকল। তাঁবুর  ভিতর  কিছুক্ষণ আগেই  কথা  হয়েছে। এখন দুজনেরই  মুখে  কথা  নেই। খুশবন্ত  বলল- আপনার কাছে   এসেছিলাম, ভেবেছি আপনি   মেনে  নেবেন।
বৃদ্ধ  লোকটি শুকনো  হেসে  বললেন- আমি  অনেক দূর  এগিয়ে  গিয়েছি। আমি আর ফিরতে  পারব না। তুমিও পারবে  না। আমরা  কেউই  হয়ত  পারিনি। 
খুশবন্ত চোয়াল  শক্ত  করে  বলল- আমি  পারব। আমি হারবো না। কিছুতেই  নয়।  
বৃদ্ধ লোকটি  বলল- আমাদের আদৌ  পালাবার  পথ আছে? 
খুশবন্ত  কণ্ঠস্বর   শক্ত  করে  বলল- আজ থেকে  চল্লিশ বছর আগে, তখনও  আপনি বাবা গুরুবন্ত  হননি।  এখন  আপনার সামনে-পিছনে  যে  বিশাল  অনুরাগীর  দল, যারা  আপনাকে  কৃষক  দরদী  ভাবছে, তাঁদের আবেগ থেমে যাবে, সেই কালো অতীত জানলে। 
গুরুবন্তের চোখ দুটো স্থির, শান্ত আর  প্রতীক্ষিত। এইরকম  কথা শুনবার  পর শুধু  মুচকি হাসলেন। খুশবন্ত বলল-  মনে  পড়ছে? গুরুদাসপুরের গ্রাম, সেখনাকার বিঘে বিঘে জমি, আর বিশ্বাস ঘাতকতা? আপনি  ভুলে গেলেও, আমরা  ভুলিনি। ইতিহাস আদৌ মুছেফেলা যায় না! আপনার  জীবনের  কালো  অধ্যায় হয়ত কেউ জানেনা, তবে  কেউ কেউ জানতেই  পারে।
গুরুবন্ত হাসল। হাসি দেখে  খুশবন্তের রাগ হয়ে যাচ্ছে, যেই মানুষটা  টানা  পনেরো দিন অনশনে রয়েছেন, যার জীবনের  শেষ   সম্বল  বলতে  মানুষের  ভরসা; সেই  ভরসাটুকু  ছিনিয়ে  নিতে এসেছে। সেই মানুষ এখনো এতো আত্মবিশ্বাসী! গুরুবন্ত বললেন-  ভুল মানুষই  করে। ভুলের মাশুল  বলে  আমরা  যেটা  বলে  থাকি, সেটা  আসলে  নিজের  কাছে নিজের স্বীকারোক্তি। আমি শেষ চল্লিশ বছর প্রতি নিয়ত স্বীকার করে   চলেছি আমার  ভুলের। এই যে  যন্ত্রণা, আমার নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য আমাকে কষ্ট  পেতে  হচ্ছে, ধরে নাও এতে  নিজের  অপারাধের  শাস্তি  ভোগ  করছি। 
খুশবন্ত  বলল- পালিয়ে  বেরাচ্ছেন নাতো? আপনার অপরাধের দলিল আমার কাছে আছে। 
গুরুবন্ত, বুকের কাছে  ময়লা কম্বল  টেনে  নিল। বলল- জীবনে  পালাবার পথ  নেই। যেই  পথ দিয়েই পালাবার চেষ্টা  করও, দেখবে   ঘুরে ফিরে  শুরু  থেকেই শুরু  হচ্ছে! 
খুশবন্ত  কালো জ্যাকেট, জিনস পড়েছে। তাঁবুর ভিতরের ঠাণ্ডা গা ছুঁয়ে আছে। দুটো  মুখ, দুই  প্রজন্মের   প্রতিভূ হয়ে মুখোমুখি। খুশবন্ত  বলল- আপনার  পরিচয় আমি শুরুতেই  পেয়েছি। ভেবেওছিলাম এই  গল্প এমন  ভাবে শেষ  করব না। আপনিই বাধ্য  করছেন।
গুরুবন্তের চোখের দুটো  পাতা ধীরে  ধীরে  নেমে  আসছে, সে বলল- জীবনের শেষ  পর্বে  আমার নিজের  কাছেই  কিছু  বলবার নেই। এখন লোকের চোখে নিজেকে  সাজাতে ভালো লাগেনা। খুশবন্ত এটা  জীবন,  এখানে আমরা কেউ পালাতে পারিনা। আমিতো পারিনি। আমার অপরাধটা সেইদিন অপরাধ ছিল, আজও আছে, আর যেইদিন এই পৃথিবীতে থাকব না, তখনও অপরাধই থাকবে। নিজের অপরাধকে আমি ভয়  সারাজীবন মেনে এসেছি। তুমি যাদের  পক্ষ থেকে এসেছো, তাঁদের জানিয়ে দিও, আমার মৃত্যুর পরেও আন্দোলন  চলবে।  
খুশবন্ত এই প্রচণ্ড শীতেও ঘামছে! দিল্লির ঠাণ্ডায়, তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সে একটা চেয়ারের উপর  বসে ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল- আপনি  অনশন  ত্যাগ করবেন না?
গুরুবন্ত চিত হয়ে শুয়ে  পড়লেন। শুয়ে   শুয়ে  বললেন-‘ তোমার বাবা, জশবন্ত  মারা  যাওয়ার দুমাস আগে আমাকে চিঠি পাঠায়। আমরা দুজন বাল্যকালের  বন্ধু। আমিও  তোমার  পিতাতুল্য। কাল সকালে  সেই চিঠি  তোমাকে  পাঠিয়ে  দেবো। আমার  মনে  হয়, চিঠিটা তোমার পড়া দরকার।’  
 চোয়াল চেপে রেখে, খুশবন্ত তাকিয়ে রইল। তাঁবুর বাইরে একজন লোক মাথা ঢুকিয়ে বললেন- উনি ঘুমিয়ে  পড়েছেন। গুরুবন্ত খুব নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন। এতো নিরাপদ  ঘুম বহুদিন উপভোগ করেনি খুশবন্ত সিং।   
৪ 
  ঘড়িতে  বেলা দশটা। ফোন  বেজেই খুশবন্তের ঘুম  ভাঙল। আগের রাতে   দুটো চোখের পাতা এক করতে পারেনি, নিজেকে  খুব   দুর্বল  মনে  হচ্ছে। একজন   বিশ্বাসঘাতকের  ভাঁওতায়  কৃষকরা  আন্দোলন চালাচ্ছে! দেশের লোকজন, মিডিয়া ভালোই নাটককে  উৎসাহিত করে চলেছে। 
দরজার বাইরে শুনতে পেল, রাঁধুনি ছেলেটা  ডাকছে। খুশবন্ত বলল- ভিতরে এসো
ছেলেটা এসে  বলল- আপনার নামে  এই   চিঠিটা  একজন  দিয়ে  গিয়েছেন। বাবা গুরুবন্তের  শিষ্য।
খুশবন্ত চিঠিটা  নিয়ে  হাত  দেখিয়ে  ঈশারা  করল। ছেলেটি  ঘরের  বাইরে  চলে  গেল, খামটি  খুলে দেখল লম্বা   কাগজ বাবার বাঁকা হাতের লেখায়   ভরে গিয়েছে। 
 গুরুবন্তকে  লেখা, মৃত্যুর   দুমাস আগে বাবার চিঠি।  

প্রিয়,
গুরু।
তোর সামনে  কোন  মুখ  নিয়ে  দাঁড়াব? নিজেকে  খুব  অসহায়  মনে  হয়, ইদানীং  আরও  বেশি  করে  মনে  হচ্ছে। জীবনের আলোর তেজ  ক্রমশই  কমে আসছে। একদিন নিভে  যেতে  হবে। তুই  অনেক  বড় জায়গায় গিয়েছিস। অর্থ, প্রতিপত্তিতে তোর থেকে আমি এখনো এগিয়ে। তুই  কিন্তু আমাকে  হারিয়ে  দিয়েছিস অন্য জায়গায়। জানি, গুরু  থেকে   বাবা  গুরুবন্ত  হওয়ার পথ ছিল আত্মত্যাগের। আমি যেটা  চেয়েছি, তারই  প্রতিচ্ছায়া  হয়ে  রয়েছি। আমার চোখে  এখনো সেই সব দিন  জ্বলে  ওঠে। আমাদের   যৌবনের  দিন। তোর, আমার , আর  মনপ্রিতের  বন্ধুত্ব। আজ আমি আর মনপ্রিত স্বামী স্ত্রী, খুশবন্ত আমাদের একমাত্র ছেলে। বিশ্বাস  কর আমি মনপ্রিতের মনে  আমার  জন্য  একফোঁটাও  শ্রদ্ধা  দেখতে  পাইনি। ওঁর  মৃত্যুর এতবছর বাদেও, ওঁর  সবটুকুতো পেলাম না! যন্ত্রণা  হয় খুব। তোকে ভালবাসত, জীবনের শেষ  সময়  অব্দি ভালবেসেছে। আমাদের  গ্রামে  জোতদারদের  নিজের জমি দেওয়া হবেনা  বলে আমরা ঠিক  করলাম। সবাই  সিদ্ধান্তে  অনড়।  আমাদের  চোখে  তখন  রঙিন স্বপ্ন, মনপ্রিতের বাবা আমাদের অর্থের   লোভ দেখাল। আমি আমার  জমি বিক্রি করে দিলাম। তুইও দিলি।  গ্রামের  কৃষকদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা  করেছি।  গ্রাম ছাড়তেই হবে। আমরা গ্রাম থেকে  শহরে পালিয়ে এলাম। সেইদিন থেকেই  তোর  মধ্যে এক   অদ্ভুত পরিবর্তন দেখলাম! মনপ্রিতের বাবার দেওয়া  মোটা  অঙ্কের টাকা নিয়ে সুখে সুন্দরি বউ, সন্তান নিয়ে জীবন কাটাতে পারতিস। সেই পথে গেলিনা। কঠিন পথ বেছে নিলি। আমাদের ছেড়ে অন্য কোথাও পালিয়ে  গেলি! আমরা তখনও নিঃসন্তান ছিলাম, দশ বছর বাদে  যখন ফিরলি, তোর কোলে  নবজাতক শিশু, মনপ্রিত কোলে  নিয়ে সন্তান যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে। খুশবন্ত যতটা আমাদের ছেলে  ঠিক ততটাই তোর ছেলে। ঝোঁপে ফেলে দেওয়া  বাচ্চা আজ সমাজে  প্রতিষ্ঠিত। তাঁর পিতা –মাতা  যে  জীবন তাঁকে দিতে চায়নি, তুই দিলি।    

আমি  সারাজীবন সুখ বেছে নিয়েছি। এই অপরাহ্ণ বেলায়  নিজের থেকে  নিজে  পালাতে পারলাম কই! দুজনেই পাপ  করেছিলাম। তুই  সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছিস। আমি  পালিয়ে বেরাচ্ছি।  
আচ্ছা গুরুবন্ত যদি  কখনো আমাদের   খুশবন্ত  কোনও পাপের  মুখোমুখি  হয়, আমরা পারব তাঁকে   বাঁচাতে? এই চিঠি ওকে দিস। আমার  মৃত্যুর পর দিস...’  

খুশবন্ত কিছুক্ষণ চুপ  করে  থাকল। খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে। বাবা গুরুবন্তের পা ধরতে  ইচ্ছা করছে। গুরুবন্ত তাঁকে  নিশ্চই আরেকবার ক্ষমা  করে  দেবে। এখনি  যেতে হবে, দেরী  করা  ঠিক  নয়। 
আচমকাই   বলেন্দ্রর সিং এর ফোন বেজে  উঠল।
-হ্যালো স্যার।
উত্তেজিত  গলায় বলেন্দ্রর বলছে- তোমার ভাগ্য সত্যিই   হিংসা করবার মতন। শুনেছি কাল রাতে গুরুবন্তের সাথে  কথা  বলতে গিয়েছিলে, আজ  সকালে  অবস্থা ভীষণ  সিরিয়াস হয়। কিছুক্ষণ আগেই  হৃদযন্ত্র  বিকল  হয়ে  মারা  গিয়েছে। তোমার প্রোমোশন  নিশ্চিত। যদিও   বিরোধীরা হই  হট্টগোল  করছে। মিডিয়া প্রেসার দিচ্ছে। তবে আমরাও  বলব সব দাবী দাওয়া মানতেই  আমরা আলোচনা চালাচ্ছিলাম। প্রাথমিক ঝামেলা মিটল...  

খুশবন্ত সিং বাকী কথা শুনতে পেল না। সে পালাবার পথ  খুঁজছিল। তাঁকে এখন পালাতে  হবে।  

সাতদিন বাদে  ভারতবর্ষের সবকটা সংবাদ মাধ্যমে  ‘ব্রেকিং নিউজ’ ভেসে উঠল-
‘এইমাত্র দিল্লি পুলিশের এসিপি  শ্রী খুশবন্ত  সিং চাকরী থেকে  পদত্যাগ করেলেন…’    

chakrabortypinaki50@gmail.com
কলকাতা



Wednesday, October 21, 2020

লকডাউনে বউ পালালো


ছবি : ইন্টারনেট

                                                                                  পিনাকী চক্রবর্তী

          ঠিক ব্রাহ্ম মুহূর্তেই  প্রবল আর্তনাদ ছুটেএল! খাটের পাশে খোলা জানলা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখা যাচ্ছে৷ এখন  আকাশে আলোর হাল্কা প্রলেপ পড়েছে৷ ভোর এখনো হয়নি, রাতের মেয়াদ ফুরিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই, এই সময় খুব সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি হয়, আকাশের বুকে পাখিরা প্রথম শুরু করে সাঁতরানো, বাসা থেকে তারা বেরিয়ে আসে৷ এই দৃশ্যপটকেই উপনিষদের শ্লোকে ব্রাক্ষ্ম মুহূর্ত বলা হয়েছে৷ খাটের উপর আমি ডানদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়েছি, ডানদিকের জানালা খোলা আছে, বাইরে আলোর খেলা চলছে, এখন চারপাশটা খুব মায়াবি হয়ে ওঠে৷ এই দৃশ্য যারা হঠাৎ দেখবে,তাদের কাছে বিস্ময় মনে হবে৷ আমিতো প্রতিদিন দেখি৷ আমি দেখছি৷ প্রতি এই সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়াটাই আমার অভ্যাস, আজ ভেঙে গিয়েছে আচমকাই আর্তনাদ শুনে৷ ঘুম ভেঙে যেতেই, পাশের দেওয়ালে বোবা ঘড়িটার দিকে চোখ গিয়েছে৷ চারটে বাজল৷ পাশের বাড়ি থেকেই আর্তনাদ, এই কন্ঠস্বর পরিচিত লাগছে, সরলা মাসিমার গলার আওয়াজ৷ মেসোমশাইয়ের তাহলে কিছু হল! লোকটা কাল অব্দি ভালো ছিলেন৷ লোকটা কালকে অব্দি আটটা রুটি আর একবাটি খাসির মাংস খেয়েছে, আমিই পাশে বসে ছিলাম৷ সরলা মাসিমা সেই সময় বললেন- "এতো খেয়ো না৷ বয়সের কথা মাথায় আছেতো?" মাথা থাকলেও, মেসোমশাই সেই সময় মাথার দিকে পাত্তা দিচ্ছিলেন না৷ জিভের দিকেই তার নজর রয়েছে; পেটের আবদার তিনি ফেলতে  পাচ্ছিলেন না৷ আমি উল্টো দিকে বসে ছিলাম৷ বললাম-মেসোমশাই, আপনি নিজের দিকে খেয়াল করছেন না৷ নিজের শরীরের কথা ভাবুন৷
মেসোমশাই খালি গায়ে, লুঙ্গি পড়েছেন, হাঁটু অব্দি লুঙ্গি তুলে কোনমতে বাবু হয়ে বসেছেন৷ সামনে থালায় রুটি আর খাসির মাংস রাখা আছে৷ দুহাত দিয়ে রুটি ছিঁড়ছেন, হলুদ ঝোলে চুবিয়ে, ঝোল শুদ্ধ মুখে টুকিয়ে দিচ্ছেন! কালো গোঁফ ভিজে গিয়েছে, হলুদ ঝোল মুখে মেখে আছে৷ মাথার উপর অনেক বড় টাক, এতো বড় টাক যে ফিল্ম সিটি তৈরি করা যাবে, চকচকে টাকে ঘাম দেখলাম৷ মাসিমা বলল-তুমি ঘামছো তো?
মেসোমশাই মুখটা গম্ভীর করে বললেন- ঘামবোনা, এই কাজ চাট্টিখানি নয়৷ এই বয়সে এতো গুলো রুটি  আর খাসির মাংস খেতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠলাম!
আমি বললাম- থাকুক না৷
মেসোমশাই  আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- উঃহু৷ থাকবে না৷ থাকতে পারে না৷ থাকতে দেবো না৷ আমি বয়সে সত্তর হলেও, দম এখনো  ফুরিয়ে  যায়নি।  
মাসিমা বললেন- সে তো টেরই পাচ্ছি৷ এই বয়সেও লোভ সামলাতে পারলেনা! 
মেসোমশাই বললেন, চিৎকার করে বললেন- আমাকে তোমার ছেলে পাওনি৷ ওটা একটা ভেড়া৷ আমার মতন মহিষের ঘরে ভেড়ার জন্ম হয়েছে৷ ছিঃ...
আমি বললাম- মেসোমশাই, আপনি হচ্ছেন সিংহ। মহিষ কেন হবেন?
আমার দিকে আড় চোখে তাকালেন৷ চোখে রাগ, মনে হচ্ছে আমি ওনার জাত্যাভিমানে আঘাত করলাম! উনি বললেন- আমরা ঘোষ৷ গোয়ালা৷ আমাদের গরু, মহিষ নিয়ে কারবার৷ ব্যাটাছেলে,  তাই মহিষ বললাম৷ একটু পড়াশুনো করো৷
আমি মাথা নামিয়ে নিয়েছিলাম৷ মেসোমশাইয়ের সামনে আর কিই বা করতে পারতাম! মানুষটাকে আমি খুব সমীহ করি৷ উত্তর কলকাতায় লোকটার নিজের নামে খাটাল ছিল৷ সেই খাটাল থেকে আজ মোষের দুধ বেঁচে, পাড়া কাঁপানো বাড়ি তৈরি করেছেন৷ চারতলা বাড়ি, একছেলে, ছেলের বউ আর একটি মাত্র মেয়ে আছে৷ পাড়ায় যেই যেই ক্লাবগুলো অনুদান পেয়েছে, এবং যেই গুলো অনুদান পায়নি বলে বন্ধ হয়েছে, যেই যেই ক্লাব গুলো সদ্য স্টার্টআপ ক্লাব- সবকটার প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন দুলুচরণ ঘোষ, আমাদের মেসোমশাই৷ আমাদের পাড়া একটি, ক্লাব অজস্র, যতই দিন যাচ্ছে ক্লাবযে এখানে লাভজনক ব্যবসা, টের পাচ্ছি৷
চোখে জল চলে এল৷ আগের দিন রাতের কথা গুলো মনে পড়ছে৷ আজকের দিনটা খুব খারাপ কাটবে৷ ঘড়িতে সাড়ে চারটে বাজল৷ আমাদের এখানে পাঁচটা থেকে রাস্তায় লোকজনের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে৷ মেসোমশাইয়ের শুয়ে থাকা প্রাণহীন দেহটাকে কাঁধে করে নিয়ে যেতে ভিড় হবে৷ আজ এই ভিড় আরো   উপচে পড়বে, কেননা  অনেক ক্লাবেরই পেমেন্ট আটকে আছে৷ লকডাউনে  অনেকেই পকেটখালি করে ফেলেছে৷ শুনেছি চেকে সই মেসোমশাই করতেন৷ আমি দেরী না করে হাফ প্যান্টের উপরেই গোলগলার রং উঠে যাওয়া টিশার্ট গলিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় নেমে এলাম৷ উল্টো দিকের বাড়িতেই মেসোমশাই থাকেন৷ আমি  ঢুকে পড়লাম, দরজা খোলাই ছিল, এই বাড়ির কেউ খুলেছে হয়ত৷ আমি ঢুকেই দেখলাম দ্বোতলার বাবাইদার ঘরের মুখে মাসিমা, বাবাইদা, বাবাইদার  বোন  ফুলকি, বাড়ির পরিচালিকা সরলাদি  দাঁড়িয়ে আছে৷ আমি দেরী না করে ঢুকে পড়লাম৷ ঢুকেই খাটের দিকে হাউমাউ করে এগিয়ে গিয়ে কেঁদে ফেললাম৷ 
কিছুক্ষণবাদে নিজের ভুলটা টের পেলাম! খাটের উপর,চিৎ হয়ে টাণটাণ শুয়ে থাকা মেসোমশাই উঠে  বসলেন! আমি ঘাবড়ে গেলাম৷ মেসোমশাই মারা যাননি!!! স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে বললাম- মেসোমশাই এখান থেকে মাসিমার কান্না শুনে ছুটে এসেছি৷ ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না৷
মেসোমশাই বললেন- বউ পালিয়েছে! লকডাউনে আমরা নিঃস্ব হলাম!!
মেসোমশাই এমন ভাবে কথা গুলো বলছিলেন, তার মুখে ক্লান্তির ভাব ফুটে উঠেছে৷ ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বেজেছে৷ খোলা জানলা থেকে আলো ঢুকছে৷ আমি কিছুই বুঝতে পাচ্ছিনা! মাসিমা দাঁড়িয়ে আছেন, তাহলে বউ পালালো বলছেন কেন?
আমি মেসোমশাইয়ের কানের পাশে ফিসফিস করে বললাম- মাসিমা আছেন৷ বউ পালালো কোথায়? বুঝতে পাচ্ছিনা৷
মেসোমশাই আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন- গাধা৷ তোমরা ইয়ং জেনারেশন হচ্ছো গাধা৷ আমারটার বউ পালিয়েছে৷ আমার গাধাটা বউ ধরে রাখতে পারেনি৷ এই লকডাউনে বউ পালিয়ে গেল!
আমি বাবাইদার দিকে তাকালাম৷ মাথা নামিয়ে, খালি গায়ে আর লালচেকের লুঙ্গি পড়ে দরজার সামনে বসে আছে, বগল তুলে চুলকে নিল৷ আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ 
আমি খাটের পাশে বসেছিলাম৷ বাবাইদার কাছে এগিয়ে গেলাম, কানে কানে বললাম- দাদা, বৌদি কোথাও গিয়েছে?
বাবাইদা  নিস্পৃহ ভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল৷ মাসিমা কাঁদতে কাঁদতে আমার পাশে এসে বসলেন৷ বললেন- আমি সাড়ে তিনটের সময়  দরজা খোলা দেখি! প্রথমে চোর ঢুকেছে ভয় পাই৷ বাবাইয়ের ঘরে যেতেই দেখি বৌমা  নেই! প্রথমে  ঘাবড়ে গিয়ে বাবাইকে ডাকি৷ আরো অনেকের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল৷ আমরা খোঁজ করি৷ চারটে পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম৷ ফিরলনা!!.....
আমি বললাম-কোথায় যেতে পারে?
মাসিমা আমার দিকে তাকিয়ে কড়া ভাবে বললেন- সেটা জানতে পারলে কী আমরা এখানে থাকতাম? মাথামোটা, এরজন্যই কোন মেয়ে তোর প্রেমে পড়ল না!
মেসোমশাই  বলে উঠলেন- তোমার ছেলেটিও একই পদের৷ নিজের বউকে রাখতে পারল না!
বাবাইদা বলল- বাবা চেষ্টাতো করে গিয়েছি৷ এটা প্রথমবার অভিজ্ঞতা ছিলনা৷
আমি মনে মনে বললাম- বিয়েতেও অভিজ্ঞতা লাগে! অভিজ্ঞ বিবাহিত পুরুষদের তাই এতো চাহিদা! পাড়ার দাদা এমনকী কাকুদের হাঁটুর বয়সি বান্ধবী আছে৷ আমার দিকে পাড়ার মেয়েরা তাকায় না৷ আমিই শুধু তাকিয়ে থাকি! অভিজ্ঞতা  নেই   বলেই  পিছিয়ে পড়ছি। 
মাসিমার   দিকে তাকিয়ে, মুখে বললাম- আপনি ঠিক বলেছেন৷ ভুলটা আমারই হয়েছে৷   সে  কোথায়  জানতে পারলে, এক্ষুনি সমস্যার  সমাধান   হয়ে  যেত। 
মেসোমশাই বললেন- পাড়ায় আমি মুখ কেমন দেখাবোকেমন করে! আমার বিরোধীরা অক্সিজেন পেয়ে গেল! ছিঃছিঃ এখন ওরা বলবে, যে ঘর সামলাতে পারেনা, তার হাতে পাড়া সামলানোর দায়িত্ব নেবে কেমন করে! 
বাবাইদার দিকে তাকিয়ে বললেন- পাঁঠাটার জন্য আমার রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে গেল! এতোগুলো ক্লাবের অনুদান দিয়েছি৷ ব্যাঙ্ক একাউন্ট ফুরিয়েছি, ভেবেছিলাম কাউন্সিলার হয়ে ডবল লাভ তুলব৷ এই অপদার্থটার জন্য সব গেল!
আমি  হাল্কা স্বরে বললাম- মেসোমশাই এতো ভাববেন না৷
মেসোমশাই খাটে আধশোয়া হয়ে বললেন- ভাবতে হচ্ছেই, দুমাস বাদেই ভোটের টিকিট দেবে, শুনেছি তালিকায় আমার নাম থাকবার সম্ভাবনা আছে৷ সব গেল! 
আমি বললাম- অতো ভাবছেন কেন? মেসোমশাই আগে ঘরের সমস্যা মেটান, তারপর না হয় দেখা যাবে৷ 
আমি ঘড়িতে দেখলাম সাতটা বেজেছে৷ বাবাইদার বউ, অর্পিতা বৌদি; এই পাড়ার অনেকেই পিছন পিছন ঘুরত৷ শিক্ষিত, সুন্দরি আর ব্যক্তিত্বময়ী, অনেকেই প্রেমে পড়েছে, মেসোমশাইয়ের ভয়ে পাড়ার প্রেমিকরা খুব একটা আগ্রহ দেখাতো না৷ আমিও দূরেই থেকেছি৷ অর্পিতা  বৌদিকে গোপনে  ভালোবেসে ফেলেছি।   মেসোমশাই ঘরের বউ হারিয়ে যতটা অসহায় চোখে মুখে হয়ে উঠেছেন, আদৌ লোকটা অতটা  নিরীহ নয়, বরং পাক্কা  ঘুঁঘু বলা যায়৷ শেয়ানা লোক৷ 
আমি বাবাইদাকে ডেকে নিয়ে বাইরে এলাম৷ বাবাইদা আর আমি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি৷ আমরা ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম৷  বাবাইদা লুঙ্গির ভিতর গিঁট খুলে  খৈনীর ডিব্বা বের করল৷ খৈণী পিষছে৷ মুখে পুড়ে বলল- বুঝলি বিয়ের রাতে আমি বেড়াল মারতে পারিনি৷ এই দোষ আমার৷ এখন টের পেলাম, বেড়ালটাই পালিয়ে গেল! সে এখন ওকে মাছ, দুধ যে খাওয়াবে, বেড়াল তার৷ আমিতো মারতে পারিনি৷
আমি বললাম- বাবাইদা তুই বউদিকে খুব ভালোবাসতিস না?
বাবাইদা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল৷ বলল- দ্যাখ, একবার যাদের বিয়ে হয়েগেছে, তারা বউকে ভালোবাসতে বাধ্য৷ তাদের ভালোবাসা ছাড়া আর কোন গতি নেই৷ তুই ভালো না বাসলে উদ্ধার পাবিনা, আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে যাবি৷ বলতে পারিস বউ এখনকার নতুন ভাইরাসটার মতন, একবার সঙ্গদোষ হলেই, আজীবন অন্য কিছু থেকে ইচ্ছায় নিজেকে সড়িয়ে নেওয়া৷ সামাজিক কোয়ারেনটাই৷ বিয়ের পর বউ ছাড়া বাকী সবকিছু অন্ধকার দেখতে হয়৷ আমি দেখতামও৷ এখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছে! এতো স্যাক্রিফাইস করেও, তোদের বউদিকে ধরে রাখতে পারলাম না...
আমি বললাম- বাবাইদা তুই নিজেকে শক্ত কর৷ চেষ্টা করেছিলিস৷ সফলতা হওয়া বা নাহওয়া আমাদের হাতে থাকে না রে৷ আমিতো এতোবছর চেষ্টা করে একটা গার্লফ্রেন্ড জোটাতে পারলাম না! 
বাবাইদা আরো জোরে কাঁদতে শুরু করল৷ বলল- আমিতো পেয়েও হারিয়ে ফেললাম! জানিস নিজে হারিয়ে ফেললে কষ্ট সবচেয়ে  বেশী হয়৷ তুই দেখতে পাচ্ছিস না, আমার বুক ঝলসে যাচ্ছে৷
বাবাইদা কথা গুলো বলেই কিছুক্ষণ চুপ থাকল৷ বাবাইদার গলা ভেঙে গেছে৷ ভাঙা গলাতে বলল-  এই যে ঘটনা গুলো ঘটল , বিশ্বাস করবিনা কাল রাত  অব্দি আমরা একসাথে বসে লুডো খেলেছি৷
আমি বললাম- দাদা ঝামেলাটা কী নিয়ে ছিল?
বাবাইদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- আগে বউ হোক, তখন বুঝবে বউ রাখার হ্যাপা৷
আমার মনে হচ্ছে এখন যাওয়া দরকার ৷

দুপুরের দিকে ফোনে মেসেজটা ঢুকল৷ অপুর  এস এম এস  এলো৷ দুপুরের খাবার খেয়ে, আমার ঘরের দরজা বন্ধ করে  শুয়ে আছি৷ এরমধ্যে আরেকটা ব্যাপার ঘটেছে, মেসোমশাইয়ের ঘর থেকে যখন ফিরছিলাম, ঠিক তখনই লোকাল থানার দারোগার মুখোমুখি হলাম৷ 
 দারোগা বাবু আমাকে চিনতে পেরেছিলেন৷ মেসো'র সাথে খুব ভালো সম্পর্ক, সেই সূত্রেই আমার সাথেও ভালো পরিচয়৷ উনিই মেসোমশাইয়ের কেসটা দেখছেন৷ বহুদিন আগে ওনার সাথে আমার কথা হয়েছিল৷ আমি ওনাকে বলেছিলাম, আমার জন্য একটা চাকরী খুঁজে দিতে৷ আচমকাই উনি আজ আমাকে বললেন, আমি যেনও ওনাকে আলাদা ভাবে তদন্ত করে বলি, অর্পিতা বউদি কেন চলে গেলেন? আমি সেই ব্যাপারটাই খুঁজছিলাম৷ এই ভাইরাসজনিত মহামারির সময়, পুরো দেশ জুড়ে লকডাউন শুরু হবে, ঠিক তার আগের দিনই - কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে বউ পালাতে পারে!
দুপুরেই , অপুর এস এম এস এসেছে৷
- এতো চিন্তা কিসের?
লেখাটা পড়ে মনে হলো, আজ যে  অপুর সাথে সারাদিন কথা হয়নি৷ আজ যে এস এম এস এ আমাদের কথার আলাপ হয়নি৷ অপুর কাছে খুব খারাপ লেগেছে৷ মেসোমশাইয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আমি ঘেঁটে আছি৷ অবশ্য এরমধ্যে ওই যে বললাম  আমাদের পাড়াতুতো দারোগা বাবু, যিনি আমাকে বলেছেন এই বাবাইদার বউ পালিয়ে যাওয়ার পিছনে যে কারণ গুলো রয়েছে, ওনাকে জানাতে হবে৷ আমি যদি এই কাজটা করতে পারি, আমার জন্য উনি চাকরীর ব্যবস্থা করে দেবেন৷  মেসোমশাইয়ের কেসটা উনি ভীষন গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন৷ 
আমি অপুকে ফোন করলাম৷ দুবার   ফোনের  কলার  টিউন বেজে  উঠবার  পর  তুলল। নরম, প্রশ্রয় দেওয়া মিষ্টি কন্ঠস্বর ভেসে এলো
- এতক্ষণে সময় হলো?
- সারাদিন এখানে যা হয়েছে!
- কেন?
- তুমি জানোনা?
উল্টো দিকে কিছুক্ষণ অপু থেমে আছে, বলল
- আজতো আমাকে তেমন কিছু বলনি৷
-আজই তো বলবার মতন দিন৷ মেসোমশাই খুব রেগে আছেন৷ বাবাইদার চোখ দুটো কেঁদে কেঁদে লাল হয়ে গিয়েছে৷
- এত খারাপ অবস্থা!
অপুর কথায়, খানিক হেসে বললাম
- ঘরের বউ পালালে, এইরকম অবস্থা হওয়াই স্বাভাবিক নয় কি?
- ঘরের বউ পাখি নাকি, খাঁচা থেকে পাখি পালিয়ে যায়৷ জেল থেকে আসামি পালিয়ে যায়৷  বউতো স্বতন্ত্র মানুষ,  সে ছেড়ে যেতে পারে৷ পালাবে কেন? 
অপু  আমার কথায় আঘাত পেয়েছে৷ বলল
- মেয়েরা কোন সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে, তোমাদের এতো আপত্তি কেন থাকে?
আমি ঢোক গিলে বললাম
- ডিভোর্স একেবারে করে দিলেই, সব সমস্যা চুকে যেত৷ এই ভাবে কাউকে না বলে বাড়ি ছাড়বার কোন কারণ নেই৷ 
অপু বলল
-  আছে৷ বিয়ের পর মেয়েদের যদি শ্বশুর বাড়ির সম্পত্তি ভাবা না হয়, তাহলে হয়ত এই সমস্যা হত না৷ কর্মহীন বিবাহিত মেয়ে হচ্ছে শ্বশুর বাড়ির শর্তহীন সম্পত্তি৷
- অপু, এমন ভাবে বলছো! 
- যা সত্যি তাই বললাম৷ 
- অপু, বাবাইদার কথা ভাবো! ছেলেটা এই বয়সে বউ হারিয়ে সর্বস্রান্ত হয়ে পথে গড়াগড়ি খাচ্ছে! 
- যখন যেটা করা দরকার সেটা না করলে, বাকী জীবন গড়াগড়ি দিতে হয়৷ তোমার বাবাইদাকে দেখে শেখো৷
- কষ্ট লাগছে৷ বাড়ি, অর্থ, সফলতা সব কিছু আছে৷ তারপরেও বউ পালিয়ে গেল!
- টাকা দরকার, তার থেকেও দরকার উল্টো দিকের মানুষকে সম্মান করবার চিন্তা ভাবনা৷ যাদের সেটা নেই, তারা জীবনে সফল নয়৷ সফলতার সংজ্ঞা সকলের এক নয়৷
- আমি এখন কী করব বলো?
-কেন? 
- পাড়াতুতো দারোগাকাকু আমায় একটা কাজ দিয়েছে৷ মেসোমশাইয়ের বাড়ি থেকে কেন বউ পালালো,  সেটা  ওনাকে জানাতে হবে৷ যদি জানাতে পারি চাকরী পাবো৷ বুঝতে পাচ্ছিনা কেমন ভাবে এই খোঁজ শুরু  করব! 
কিছুক্ষণ থেমে অপু বলল-  বাড়ির সবাইকে আলাদা আলাদা ভাবে জানতে চাইবে৷ 
-আমি নিরুপেক্ষ থাকব৷
- সেটাও একটা পক্ষ৷ তুমি ওদের দিকের হয়েই কথা বলবে৷ যখনই ওরা বুঝবে তুমি ওদের দলের, দেখবে আসল চেহারা দেখাতে সময় নেবেনা৷ চাকরীটাও পেয়ে যাবে৷
ফোন রেখে দিলাম৷ কাল থেকে শুরু হবে আমার নতুন দায়িত্ব৷ অনেক চেষ্টা করে চাকরী জোটাতে পারিনি৷ এইবার আরেকবার চেষ্টা করব৷

মেসোমশাই আমাকে ডেকেছেন৷ বেলা দশটা বেজেছে৷ দুদিন এই বাড়িতে আসিনি৷ মেসোমশাইদের মনমেজাজ ভালো ছিলনা৷ লকডাউন না থাকলে, জনসমাগম হত৷ আমি সোফায় বসে আছি৷ মেসোমশাই খাটে বসে আছেন৷ আমি বললাম
- আপনাকে কেমন ভাবে সান্ত্বনা দেব জানিনা, শুধু বলব বৌদি ঠিক করল না৷
মেসোমশাই আমার দিকে তাকিয়ে ধীর হয়ে বললেন
- আমার ছেলের দোষ সবার আগে দেবো৷ পাঁঠা একটা৷ ঘরের বউকে দাবড়ে, চাপরে রাখতে হয়৷ টু শব্দটি করতে পারবেনা৷ গলা টিপে দিতে হয়৷
আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম
-ইয়ে, মানে সে তো ক্রিমিনাল অফেন্স হয়ে যাবে! থানা কোর্টের চক্কর কাটতে হবে৷
-হোক৷ এতো খরচ করে বিয়ে দিয়েছি কেন? আমার ছেলের দোষ ছিল।  বউকে   ধরে  রাখতে  পারেনি তাই এই লকডাউনে বউ চলে গেল!
- আপনারা খুব ভালোবাসতেন৷ সেই ভালোবাসার প্রতিদান এমন ভাবে দিল!
এই রে... আমার কথাটা শুনেই, মেসোমশাই চোখ দুটো নিয়ে প্রায় তেড়ে আসবার মতন করে চীৎকার করে বললেন
- ওই সব ছেনালি( ....প্রকাশের অযোগ্য শব্দ বলে.. বিপ বিপ... লিখলাম)মেয়েছেলেদের জন্য কোন ভালোবাসা নেই৷  এই ধরনের মেয়েছেলেরা পরিবারের, বাবার, সমাজের কলঙ্ক৷ 
আমি দেখলাম, মাছ চারা খেয়েছে৷ মনের মধ্যে খুব কষ্ট লাগছিল৷ মেসোমশাই বা অন্য কেউ নাই বা জানুক,আমিতো জানি, আমি অর্পিনা বউদিকে মনে মনে ভালোবাসতাম৷ সাহসে কুলোয়নি, মেসোমশাইয়ের কেলানি খাওয়ার ভয়ে চুপ থেকেছি, দূর থেকে দেখেছি,আর রাতে পাশবালিশ দু"পা দিয় চেপে ভালোবেসেছি, অর্পিতা বউদির প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছি৷ তাকে নিয়ে এই ধরনের গালাগালি শুনে আমার খুব রাগ হচ্ছিলো৷ অর্পিতা বউদির প্রতি মেসোমশাইয়ের ভাষা খুব খারাপ৷
আমি জলে মিইয়ে যাওয়া মুড়ির মতন থেথানো হাসি দেখিয়ে বললাম
-  এইটা একদম ঠিক বলেছেন৷ আপনিই মনে হয় শুধু প্রতিবাদ করতেন৷
মেসোমশাই গর্বের হাসি হাসলেন৷ ঘরের ছেলের বউ পালানোর পর এই প্রথম আমার সামনে, মেসোমশাইয়ের মুখে আত্মবিশ্বাস দেখলাম! বললেন
- আমি বেশ কয়েকদিন বেশ গলা চড়িয়েই বলেছিলাম, তোমার স্বামী আমার হুঙ্কারে প্যান্টে এখনো হিসু করে৷ তুমি চুনোপুঁটি৷ এখানে থাকতে হলে, যা বলব তাই করবে৷
আমি বললাম- জয়তু মেসোমশাই৷
মেসোমশাইয়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে বেলা এগারোটা বেজে গিয়েছে৷ আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখছি, চারপাশে মানুষের পদশব্দ কমে আসছে! পাড়ার মুখে থিথিয়ে গিয়েছে কোলাহল, মাঠে বাচ্চাদের কিচিরমিচির নেই৷ উল্টোদিক থেকে সৌভাগ্যবশত বাবাইদাকে এগিয়ে আসতে দেখলাম! আমাকে দেখে থেমে গেল৷ বলল
- এটাই জীবন৷ যখন ভাবলাম লকডাউনটা ভালো কাটবে, তখনই এই অবস্থা! 
আমি বললাম
-বাবাইদা  বৌদি তোমার সাথে ঠিক করেনি৷
বাবাইদা চুপ করে থাকল৷ বলল
- বাবা ঠিকই বলেছে, আমি একটি পাঁঠা!
আমি আচমকাই বলেফেললাম - এতোদিন পর জানলে!
কথাটা বলে বুঝতে পারলাম ভুল করেছি৷ বাবাইদা বলল-
- কিছু বললি?
আমি মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম
-দাদা  বৌদির  কথা মনে পড়ছে? 
বাবাইদা  চোখ দুটো মুছে বলল- অর্পিতার মন বুঝতে পারিনি৷ ও সরকারী চাকরী পরীক্ষায় বসতে চেয়েছিলো৷ আমি বলেছিলাম, বসে লাভ নেই৷ আমাদের বাড়ি থেকে  বিবাহিত   মহিলারা কেউ চাকরী করে না৷ আমরা চাকরী  করতে  দেবো না। 
আমি বললাম- বেশ করেছিস, খাসা করেছো দাদা৷ তুই হলি  ‘তিস মার খান’... প্রথম রাতেই বিড়াল মেরে   দিয়েছো! আমরা থাকতে মেয়েরা কেন চাকরী করতে যাবে?
আমার কথা শুনে বাবাইদার মুখটা বিজয় দশমীর সাদা রসগোল্লার মতন রসে ছলছল করতে লাগল! গাল ঠেলে হাসি, হাড়ির গা বেয়ে গড়িয়ে নামা রসের মতন নামছে৷ আমার বেশ লাগল৷ এতোদিন বাদে বাবাইদার মনে আনন্দ জোয়ার এসেছে, বউ ফিরে এসেছে বলে নয়, বউকে চাকরী করতে দেয়নি বলে; এমন শ্লাঘা ভারতীয় বাঙালি পুরুষদের সাথেই মানানসই৷ আহাঃ আমি দেখছি বাবাইদার মনের আকাশে শরতের সাদা মেঘ উড়ছে৷ আহাঃ আমরা মাতৃআরাধনা করি, মাতৃ পূজোয় পাঁচটি দিন কাটিয়ে দিই৷ আমাদের চিন্তায় এমন ভাবে দুর্নীতি মিশে আছে, আমরা না-চাইলেও দুধে জল আর চালেতে কাঁকড় মেশাবো, মুখে বলবো-দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই৷
আমি বললাম- তুই বৌদিকেব ভালবাসতিস৷ সেই দাম দিতে পারল না! 
বাবাইদা হাসতে হাসতে বলল- গাড়ল, এরজন্যই কোন মেয়ে তোকে পাত্তা দিলনা৷ আজ অব্দি বউহীন হয়ে রইলি! মেয়েদের কখনই পুরোপুরি ভালোবাসতে নেই৷ অর্ধেকও ভালবাসতে নেই৷ হ্যাঁ শুধু ভালোবাসি ভালোবাসি বলে, পুরুষ মানুষের অধিকার ফলাতে হয়৷ আমি ওকে বলেছিলাম, যতই ন্যাকামো মারো৷ যতই পড়াশুনো করো৷ তোমার স্বামী মুরগির ডিম বিক্রি করে, এটাই তোমার সম্মানের৷ আমি কখনই মেনে নেবোনা, আমার বউ সরকারি চাকরী করছে৷
আমি বললাম- তা ঠিক৷ পোলট্রি দোকানের সাথে সরকারী চাকরী ঠিক যায়না৷
মাসিমা রান্না ঘরে বসেছিলেন৷ দুপুরে বাবাইদার সাথে কথা হওয়ার পর, অপুকে ফোন করেছিলাম৷ সন্ধ্যাবেলায় ভাবলাম মাসিমার সাথে কথা বলা যাক৷ মাসিমা আমাকে দেখে বললেন- সব শেষ রে৷ মেয়েটা পরিবারের মুখে কালি ছিটিয়ে চলে গেল৷ বাজে মেয়েছেলে৷ এমন সুন্দর শ্বশুরবাড়ি থাকতেও পালিয়ে গেলি! 
আমি মাসিমার সুরে সুর খেলিয়ে দিলাম৷ বললাম- হ্যাঁ খুব বাজে মেয়েছেলে, আপনাদের ঠকিয়েছে৷ আপনারা কত ভালো! আচ্ছা মাসিমা মেয়েটাকে ঘরে তুলবেন যদি ফিরে আসে?
মাসিমা চোখদুটো ভারী করে বললেন- দেখ, উনিত দয়ার সাগর৷ বুঝতেই পাচ্ছিস৷
আমি মুখ দুটোকে বাধ্য ভক্তের মতন করে বললাম- সে আর বলতে! মেসোমশাইয়ের দয়ায় পাড়ার সমাজবিরোধীরা কিছু করে খাচ্ছে৷ এমন দয়া আছে বলেই, আমরা এখনো চাঁদার নামে তোলা দিয়ে চলেছি৷ আগে ক্লাবকে ভালোবেসে চাঁদা দিতাম৷ এখন আমরা ক্লাবকে ভালোবেসে চাঁদা দেওয়ার ফলাফল টের পেয়েছি৷
মাসিমা কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে কড়া করে তাকিয়ে রইলেন৷ আমি বললাম- তোমরা একটু বেশীই ভালোবেসেছো৷
মাসিমা কিছু বলবার আগেই, বাবাইদার বোন ফুলকি বলল- না গো দাদা, মা বলেই দিয়েছিল বৌদিকে পড়াশুনো করছ করো৷ চাকরী করতে দেবও না৷
আমি হাসতে হাসতে বললাম- একদম৷ 
মাসিমা বললেন- আমার ছেলেটা মাধ্যমিক টপকাতে পারেনি৷ আমার মেয়েকে টেনে টুলে উচ্চমাধ্যমিকে বসিয়েছি, পাশ করতে পারেনি৷ আমি নিজে সই করতে পারিনা৷ এমন বাড়িতে শিক্ষিত মেয়ে আনলেও, চাকরী করলে আর সেই মেয়ের উপর খবরদারি চালানো যাবে? তুই বল৷
আমি বললাম- মাসিমা, আমার তো বউ নেই৷
মাসিমা বলল-আর আমার ছেলেটার থেকেও ধরে রাখতে পারল না!
ফুলকি বলল- তুমি কিন্তু আমার মতন মেয়েকে বিয়ে করবে, বৌদি  মতন মেয়েকে বউ করলেই ডুববে৷ 
ফুলকি কথা গুলো বলছিলো, আমি ওর চোখে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস দেখছিলাম৷ ভালোই লাগছিলো৷ আমি এই জিনিসটার অভাবেই এই জীবনে প্রেমিকা পেলাম না! অর্পিতা বৌদিকে খুব ভালোলেগেছিলো, সাহস করে বলতে পারিনি৷ প্রেমিক হওয়ার আসল শর্ত আত্মবিশ্বাসী হতে হবে৷
- তুমি সব শুনলে৷ আর কোন সংশয় আছে?
অপুর গলার আওয়াজে আমি কষ্টের জলীয় বাষ্পর আভাস পাচ্ছি! মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে৷ উত্তরকলকাতা থেকে দমদমে গিয়ে আছে, মামার বাড়িতে আছে৷ সন্তানহীন মামা অপুকে নিজের মেয়ের মতন মানুষ করেছেন৷ অপুর বিয়ে হয়েছিল, মামা এবং অপুর অমতেই, শুধুমাত্র একদিনের দেখায়, বাবা আর মায়ের জেদে৷ শ্বশুর বাড়ির লোকেরা উত্তর কলকাতার এক জাঁদরেল ব্যবসায়ী পরিবারে বিয়ে হয়৷ অপুর ইচ্ছা পড়াশুনোটা কাজে লাগিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে৷ 
এখন মাঝরাত হবে৷ বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে৷ আমি জানলা খুলে, খাটের উপর বসে আছি৷ পা তুলে বসে আছি৷ জানলার  উল্টো পাড়ে  নদীর  মতন  আকাশ , নদীর  মতন  বয়ে  চলেছে।  আকাশে  ছড়িয়ে  থাকা তারারা টিপ টিপ করে জ্বলছে৷ লকডাউনে শহরের দূষন কমছে৷ পৃথিবীতে অনেক ভয়ংকর ভাইরাস  এসেছে,  মানুষের   দখলদারী করবার মানসিকতা, সেই অভ্যাসের ভাইরাসের থেকেও  বেশী ভয়ংকর মনে হয়৷ এখানে   এক শ্রেণীর  মানুষ  আরেক   শ্রেণীর  মানুষকে নিজের হাতের  মুঠোয়  রাখতে   চাইছে।  অর্পিতার কথা ভাবছিলাম৷ মেয়েটা শ্বশুর বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছে, এটা খবর হয়েছে, তাঁর পালিয়ে যাওয়ার কারণ কত জন খুঁজেছে?
-তুমি হারিয়ে গেলে নাকি?
ফোনের উল্টো দিকে অপু আছে৷ মিষ্টি গলা, অন্ধকালে কালো কালো ছায়া হয়ে যাওয়া পাড়ার পুরানো বাড়িরা, স্থির রাস্তা,পাশের বাড়ির  দেওয়াল নিঃশব্দে পেড়িয়ে যাওয়া ভীরু বিড়াল, চাঁদের আলোর ছড়িয়ে থাকা, সব মিলিয়ে এই সময় মায়াবি হয়ে উঠেছে৷
অপুর গলা শুনে বললাম
- আমাদের খেলাটার আজ শেষ দিন৷
- তোমার মন খারাপ লাগছে?
- একটু লাগছে, তোমাকে অপু বলে আর ডাকতে পারবো না৷ আবার আমরা সম্পর্কে ফিরে যাবো৷ 
- কেন? আমাদের   মধ্যে একটা   সম্পর্ক   আগে ছিল। এই  দুমাসে   নতুন সম্পর্ক  তৈরী  করেছি৷ সেই   সম্পর্কের  জন্য   তুমি আমায়  অপু বলে ডাকতে পারো৷
- খেলা শুরুর প্রথম দিনের কথা মনে আছে৷ আমি ভুলিনি৷
-শুনি শুনি৷ কেমন মনে আছে দেখি৷
- আমি যে তোমায় ছাদ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি, তুমি টের পেয়েছো৷
- সে বাপু,মেয়েদের একটা আলাদা অনুভূতি থাকে৷ বুঝতে পারে, তাদের কে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে৷
- আমি ধরা পড়ে গেলাম৷
-মিথ্যুক, আমার চাপাচাপিতে, ছাদে দুজন ছিলাম৷ তুমি আর আমি, তখনই তুমি আমাকে প্রেম নিবেদন করলে৷ ভয় পেয়েছিলে৷ আমার চাপাচাপিতে বলেই দিলে৷
- সেটাই স্বাভাবিক নয়৷
- রেগে যাচ্ছো কেন? প্রেমিকদের এতো অল্পে ধৈর্য্য হারালে চলবে?
- তুমি বললে সেই থেকে দুমাস আমরা দুজনে একটা খেলা খেলব৷ 
- খেলছিতো৷ আমি যে অর্পিতা, তা তুমি ভুলে গিয়েছো৷ অর্পি বলে আমার সাথে বন্ধুত্ব করেছো৷ নিজের সুখ দুঃখের কথা আমার সাথে আলোচনা করেছো৷
— তুমি যে বাবাইদার বৌ, মেসোমশাইয়ের ছেলের বৌ , আমি এই সব কিছু ভুলে গেলেও, আইন বলে একটা ব্যাপার আছে৷
- আমি বউ ছিলাম৷ ওদের বাড়ি ছেড়ে দমদমে চলে এসেছি৷ বিবাহবিচ্ছেদ বলে একটা ব্যাপার আছে৷
-ডিভোর্স!!
- ভয় লাগছে? ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করতে হবে বলে ভয় পাচ্ছো? আমি কিন্তু ভার্জিন৷
অর্পিতার কথা শুনে আমি লজ্জা পেলাম৷ বুকটাও ধরাস করে উঠল৷ এতোটা ঘনিষ্ঠ কথা এই প্রথম কোন মেয়ে আমাকে বলল৷ আমার মতন হাঁদার সাথে কোনও মেয়েই বন্ধুত্ব করতে চাইবে না৷ আমিযে প্রেমহীন পরিত্যক্ত যুবক৷ 
আমি বললাম
-একটু সাহস আছে অর্পিতা ম্যাডাম৷
-তাহলে মনে রেখো, তোমার কেউ একজন অনুরাগী আছে৷
- এতো জোর পাচ্ছো কেমন করে?
-তোমার থেকে৷ তুমিই দিয়েছো৷
-ধুর, যার নিজের জীবনই ব্যর্থ৷ যে নিজেই পাঁচ হাজার টাকার চাকরী জোটাতে পারেনা৷ সে তোমার কোন কাজে এসেছে?
- এই যে দুমাস আমার সাথে নতুন পরিচয়ে বন্ধুত্ব শুরু করলে৷ আমাকে বুঝিয়ে দিলে, বিবাহিত হয়েও, আমার নিজের পরিচয় আছে৷ আমাকে কেউ ভালোবাসতে পারে৷ এই দুমাসে আমি ছটা সরকারী চাকরীর পরীক্ষা দিয়েছি৷ ওদের শত বাঁধা পেড়িয়ে৷ তুমি যে ফর্ম গুলো এনে দিতে, আমি ফিলাপ করে শুধু তোমায় দিতাম না৷ মন দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম৷ 
-তারপর?
- জয়েনিং লেটার এসেছে৷ নবান্নতে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক৷ এরপর ডব্লু বি সিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবো৷
-ভালো৷ তোমাকে নতুন জীবনের শুভেচ্ছা৷ 
-আমার পাশে থাকবে না!
- আমি হাঁদারাম৷ তোমার মতন প্রতিষ্ঠিত মেয়ের পাশে কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবো?
-আবার মেল ইগো? পুরুষতান্ত্রিক আমিত্ব!
-না গো৷ আমি খুশি৷ আমি জানি আমি তোমার ভালোবাসার যোগ্য নই৷
-কচু জানো৷ গাড়ল একটা৷ শোনও কাল থেকে যদি  ফেসবুকে এনগেজড স্টাটাস না দাও৷ লকডাউন উঠলে, পাড়ায় গিয়ে ঝগড়া করব৷ লকডাউন উঠলে কাজের চেষ্টা করবে৷ আমিতো পাশে রইলাম, চিন্তা কিসের৷ ভয় নেই, বিশ্বাস করতে পারো৷
- এই অপু, মানে আমরা এখন থেকে প্রেমিক আর প্রেমিকা? মানে তুমি আমার অর্পিতা বৌদি নও! যাক এতোদিন বৌদিবাজির মানসিক চাপ থেকে মুক্ত হলাম!
-কী আমি বৌদি!! 
-না, তা বলছিনা৷
-গাড়ল একটা....
যাঃ অর্পিতা ফোন কেটে দিল৷ রেগে গেছে৷ আমি জানি এই রাগ কাল সকালেই ভেঙে যাবে৷ 
আমি জানি দারোগাবাবুর দেওয়া চাকরীর প্রস্তাবে আমি সফল হলেও, চাকরীটা আমি পাচ্ছিনা৷ অসুবিধা নেই৷ এমন সময় ফোন বেজে উঠল৷ বাবাইদার নাম ভাসছে, ফোনের স্কীনে৷ ফোন ধরলাম৷ বাবাইদার গলা ভেসে আসছে৷ বাবাইদা আনন্দে চিৎকার করে বলছে
- "বুঝলি এই লকডাউনে শুধু আমার বউটাই পালায়নি৷ আমার আরো দুজন বন্ধুর বউও পালিয়েছে৷"
আমি  বললাম- দাদা,  বউ পালায়নি। ওঁরাও  বউকে লকডাউনে ধরে রাখতে পারেনি৷

chakrabortypinaki50@gmail.com
কলকাতা