1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label সৌমিক ঘোষ. Show all posts
Showing posts with label সৌমিক ঘোষ. Show all posts

Sunday, September 21, 2025

ও গঙ্গানদী; -আমার মিতা

ছবি : ইন্টারনেট


ও গঙ্গানদী; -আমার মিতা

সৌমিক ঘোষ 

ও গঙ্গানদী,

তুমি যে আমার মিতা ।

বিকেলের মন খারাপে তোমার কাছে আসি । কখনও রংবাহারী রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে, কখনও ঘাসে ভরা পাড়ে বসে তোমায় শুধু দেখি । গঙ্গা,- আমার একান্তের নিঃসঙ্গতার সাথী, কুলু কুলু শব্দের মোড়কে আড়াল করে রাখে কষ্ট । একাকীত্বের গারদে বন্দী আমি তোমার আলিঙ্গনে মুক্তি যে চাই । জীবনপথে ক্লান্ত নদী যেমন শান্তি অন্বেষণে মোহনায় যায় ।

তোমার চারপাশে গোধূলির লালচে কমলা ওড়নাটা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে যায় । তুমি ছায়াচ্ছন্ন মুখে ঠিক এঁকে রেখেছো এক চিলতে সুখের স্থিরচিত্র । তুমি অস্থির, উত্তাল দেহবল্লরীতে নিজেকে সাজিয়ে খুঁজে চলো বাঞ্ছিত মোক্ষ সাগরের ঠিকানা । তোমার জলরাশির অহংকার আমার অস্ফুট প্রেমকে ঢেউ-এর আঁচলে উড়িয়ে দিয়েছে । আবার স্রোতের সোহাগী হাসিতে আমায় মাতাল করে তোলে । উছল ধারার মাঝে তোমার নিদ্রিত চোখ আমি দেখতে চাই না । তোমার উজল চোখে আজ আমি আর ভালোবাসার রঙ দেখতে পাই না । সীমারেখার গণ্ডিতে সীমাহারা তোমার জলের শরীরে, আনন্দের কলতান আজ যেন ম্রিয়মান ।

ও গঙ্গানদী;-আমার বিষন্ন মিতা ।

দুঃখ, কষ্ট, হতাশার ঘোলাটে আবেগ তোমার গতির হর্ষধ্বনিকে নির্বাক করতে চায় । তবু অবিচ্ছিন্ন অবিরল ধারায় অদৃশ্য নিঃশব্দ স্রোতে তুমি বয়ে চলো । সতেজ গ্রাম, সচেতন শহর, সজাগ শহরতলী নিবিড়ভাবে দুষে যায় তোমাকে । তোমার দেহে রয়েছে যে বিষের চোরাবালি । নতুন ভোরের চিরন্তন সূর্যোদয় তোমার দিগন্তে আধুনিকতার ধোঁয়ায় শুধুই ঝাপসা হলেও তুমি প্রশান্তিতে বয়ে চলো অপূর্ণতা পূরণের আশায় অপার্থিব সূর্যাস্তের খোঁজে ।

আমি এখনও খুঁজে চলেছি চকচকে সেই জিয়ন মুক্তো; যার ছোঁয়ায় তুমি আবার স্বচ্ছ মায়াবিনী হবে । ঘোলাটে জলে, সভ্যতার জঞ্জালে, বিজ্ঞানের কূটকচালিতে তোমার চিরযৌবনের ঝাঁপিটাই আমি পাইনি । মন খারাপের আমি,- শুধুই আনমনে তোমার দীর্ঘশ্বাসের ঢেউ গুনে চলি । সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তে কত যে ছবির ফ্রেমে তোমার বিষাদের অভিসার সাগর সঙ্গমে অজ্ঞাতবাসে থাকে । ঝড়ে উত্তাল তোমার জলরাশির গভীরতায় আমি খুঁজে পাই দৈনন্দিন রোজনামচায় বেঁচে থাকার শক্তি । জীবনের দোদুল হাওয়ায় তোমায় নিয়ে কত লোকগাথা আমার স্মৃতির নকশিকাঁথায় র‍য়েছে আঁকা ।

জন্মান্তর যদি থাকে আমার প্রেমের অবগাহনে ব্যাকুল হতে তুমি চিরকাল থেকো;-

ও গঙ্গানদী; -আমার মিতা । 

...(সমাপ্ত)...

Wednesday, January 12, 2022

পিছুটানে বকখালি

১১ মাথার খেজুর গাছ  ছবি : সৌমিক ঘোষ

পিছুটানে বকখালি

সৌমিক ঘোষ


জীবনের ব্যস্ততা যেন থমকে যায় বঙ্গোপসাগরের পূর্ব পাড়ে , পশ্চিম বাংলার এক সমুদ্রতটে এসে ;- যার নাম ‘বকখালি’ । এখানে নেই শহরের কলতান , হারিয়ে যায় রোজকার জীবনের শব্দ ও কথার মায়াজাল । বেলাভূমির ছোট ছোট ঢেউয়ের আলপনায় , বালিয়াড়ির উঁচু নীচু রাস্তায় অচেনা পাখির ডাকে , অজানা জলাশয়ের শালুকের বাহারে ,- মাতোয়ারা মনে নিরালা সবুজের মাঝে শুধু অবসর উপভোগ করা যায় । ছোট্ট জঙ্গলের কালচে বাদামী গাছের গুঁড়ির ফাঁকে ফাঁকে ঝাউবনের ঝিরঝিরে হাওয়ায় একটু আলগা ভালোলাগার সঙ্গসুখ বেশ লাগে । পীচের রাস্তা ছেড়ে মোরাম ও বালির পথে নিঃস্তব্ধ , নির্জন পরিসরে বা পাইনের জঙ্গলের মাঝে প্রকৃতি যেন শান্ত ও সমাহিত ।


কলকাতা থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে এই আন্তরিক বিরামের আঙ্গিনায় ১১৭ নং জাতীয় সড়কপথে পৌঁছানো যায় । রিমঝিম বৃষ্টির মাঝে বা আদুরে শীতের ছোঁয়ায় বেড়ানোর নির্ভেজাল আনন্দের খোঁজে এখানে একবার আসা যায় ।

বাসস্ট্যান্ডের সামনে বন দফতরের বাগানে অবহেলার ইঁটের রাস্তা ধরে বেড়ানো যায় । তিনটি জালের পরিসরে সবুজ ঘাসজমি আর কাদার মাঝে অলস কুমির নিশ্চল । ঘাসবিহীন ধূসর জমিতে হরিণের দল ঘোরাফেরা করে । সবুজ পাতার ফাঁকে হঠাৎই উড়ে আসে রঙিন কোন প্রজাপতি । বাগানের কেয়া ,সুন্দরী , হেতালের ঝোপে চোখে পড়ে মাটি ফুঁড়ে ওঠা শ্বাসমূলের ঝাঁক । গাছপালার ফাঁকে কালচে লাল কুসুম ফল বা অচেনা কোন রঙিন ফুলের সমারোহ বেশ ভালোই লাগে । বাগানের ফাঁকা জায়গায় বন দফতরের সুন্দর দোতলা কটেজে থাকার ব্যবস্থা আছে । কখনও বাগানে ঢোকার জীর্ণ সাঁকোর পাশে মজে যাওয়া খালে রঙিন জাল সমেত মাছধরা নৌকা চোখে পড়ে ।

সমুদ্রতটের কাছে সরকারী ট্যুরিস্ট লজ বা রেস্ট হাউসে এবং অনেক হলিডে হোমে বুকিং করে থাকা যায় । এছাড়া বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি পীচ রাস্তার দুপাশে কয়েকটি হোটেলের আস্তানা ভালোই । সীজনে আগে থেকে বুক করা থাকলে ভালো ; নাহলে একটু বেশি টাকায় ব্যবস্থা হয়েই যায় । এখানেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছোট ছোট কয়েকটি খাবারের হোটেল আছে । দেশীয় বাঙালী রেসিপিতে সকালের ঘুম জাগানি চা ,প্রাতরাশ , জলখাবার , দুপুরের গুরুভোজ , সন্ধ্যার টিফিন আর রাতের হালকা মেনুতে রসনা তৃপ্ত হবেই । আবার বাজার থেকে টাটকা যে কোন মাছ বা মাংস কিনে কেজি প্রতি ৩০ বা ৩৫ টাকা দিলেই , মনপসন্দ ডিসে লাঞ্চ বা ডিনার সেরে ফেলা যায় । সন্ধ্যেবেলায় হালকা আলো আঁধারীতে বড় ছাতার তলায় বসে , সামনে সাজানো টাটকা মাছ কিনে , বেছে , পরিষ্কার করে গরম ফ্রাইয়ের সঙ্গে চা বা কফির মৌতাতই আলাদা । মেজাজটাই যেন জমিদারী আমলে পিছিয়ে যায় । কত গল্প , আড্ডা , মান-অভিমানে আর চাওয়া-পাওয়ার শব্দজালে বিভিন্ন বয়সের মানুষ-মানুষীরা বকখালির নিঃঝুম আঁধারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ,- নতুন ভালোবাসার খোঁজে ।


সকালে মনোরম বকখালির নিরালা সমুদ্রতটে কিছুক্ষণ হাঁটতে ভালোই লাগে । ছোট চায়ের দোকানে গলা ভিজিয়ে , বিশেষ করে শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে , হাঁটু জল পেরিয়ে , নৌকায় দূরের চড়ায় যাওয়া যায় । চারিদিকে নীল জলের মাঝে , ভিজে বালিতে পায়ের নকশা এঁকে দিতে মন চায় । মাঝির ডাকে সম্বিত ফেরে । আবার ফেরার পথে ,- উজানে – বকখালিতে ।

হেতাল , সুন্দরী , গেঁওয়া গাছের জঙ্গলের মাঝে অমরাবতী গ্রাম । বাস স্ট্যান্ডের ডানদিকে ইঁটের রাস্তায় , গ্রামে ঢোকার শুরুতেই , বাঁদিকে বিধ্বংসী ‘আয়লা’ ঝড়ের আগে , এক অদ্ভুত ১১ শাখার খেজুর গাছ ছিল । ‘আয়লা’-এর আগে বেড়ানোর সময় এই গাছটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ।


বিকালের হালকা রোদে ভ্যান রিক্সায় প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে হেনরি আইল্যান্ডে যাওয়া যায় ।ইঁট , পাথরে তৈরি রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ । দুপাশের ঢালু জমিতে রহস্যময় আঁধারে ঘেরা জঙ্গল । নরম কাদা মাটিতে তীক্ষ্ণ শ্বাসমূলের বিস্তৃতি । হেনরি আইল্যান্ডে রাজ্য মৎস্য উন্নয়ন নিগমের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ধরনের মাছ চাষের প্রকল্প চলে । এখানকার বিস্তীর্ণ এলাকায় চিংড়ি এবং অন্যান্য স্বাদু ও নোনা জলের মাছের প্রতিপালন নানা আকারের ভেড়িতে করা হয় ।

                                                                                                         সমুদ্রের কাছেই ঘন জঙ্গলের সীমানায় নির্জন প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সুসজ্জিত রঙিন তাঁবু ছাড়াও ‘গরান’ , ‘হেতাল’ , ‘গেঁওয়া’ নামের কটেজ এবং ‘সুন্দরী’ নামের তিনতলা গেস্ট হাউসে থাকা

যায় । জঙ্গলের মাঝে মজে যাওয়া খালের পাশে , সরু পায়ে চলা পথে এগোলেই গাছপালার ফাঁকে উত্তাল সমুদ্রের এক ঝলক নজরে পড়ে ।

হেনরি আইল্যান্ড থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ‘বেনফিস’ নিয়ন্ত্রানাধীনে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ত মৎস্য বন্দর ‘ফ্রেজারগঞ্জ’ যাওয়া যায় । কখনও জল কাদায় ভরা কোন চাষের জমিতে , বিকালের রোদে পোকামাকড় যোগাড়ে ব্যস্ত এক ঝাঁক বক দেখা যায় । এরা যখন উড়ে যায় , তখনই সবুজের মাঝে ‘বকখালি’ নামের সার্থকতা । মাছের গন্ধ , ইতস্তত ঝাউগাছে বাতাসের স্পন্দন , কাদা জলের পাড়ে , নানা ধরনের নৌকার অলস আস্তানায় ঘেরা ফ্রেজারগঞ্জের শান্ত , নির্জনতার সৌন্দর্যটাই অন্যরকম । এখানে সারাদিনই ছোট বড় ট্রলারের ব্যস্ততা , মাছধরা জালের পরিচর্যা , নৌকা মেরামতি , ধরে আনা মাছের সংরক্ষণ , বরফ এবং নৌকা চালানোর তেলের যোগান ইত্যাদি কর্মব্যস্ততা লেগেই থাকে ।


ফ্রেজারগঞ্জের পুরোনো নাম ছিল ‘নারায়ণতলা’ । এক সময় এখানেই ছিল ব্রিটিশ শাসনাধীনে বাংলার ছোটলাট এন্ড্রু ফ্রেজার সাহেবের বাগান বাড়ি । সেই বাড়ি বহুদিন আগে বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়েছে । ফ্রেজার সাহেবের স্মৃতিতে প্রায় ৭৫ বর্গ কিলোমিটারের এই বিস্তীর্ণ এলাকা ফ্রেজারগঞ্জ নামে পরিচিত । আলো আঁধারীর মাঝে কাদা জল বাঁচিয়ে , টাটকা মাছ দেখতে দেখতে কখনও চোখে পড়ে যায় , নীচের ঢালাই কংক্রিটের থামগুলোতে শামুক , ঝিনুক আর অজানা জলজ প্রাণীর বাদামী খোলকের আলপনা । ১৯৯৫ সালের ২২শে এপ্রিল এই মৎস বন্দর চালু হয়েছিল ।

মাছ ধরার এই বন্দর এলাকা ছাড়িয়ে , সোজা পথ ধরে ঝাউগাছে ঘেরা ফ্রেজারগঞ্জের নিরালা সমুদ্রতীরে সূর্যাস্তের স্মৃতি সততই সুখের । এখানে বিকেল থেকে ডিজেল পুড়িয়ে বিশাল আগুনের ঝলকানিতে কাঠকে ‘সিজন’ করে , আলকাতরা মাখিয়ে নৌকা মেরামতির কাজ চলে । দূরে কখনও কোন নৌকা ঘিরে মাছ দেখার ভীড়ও চোখে পড়ে । গোধুলীর হালকা আলোয় দিগন্তে নীল , কমলা , লাল , কালোর কত নকশা ।

ফ্রেজারগঞ্জের ঝাউবনে ঘেরা প্রাকৃতিক নিসর্গে পশ্চিমবঙ্গের অচিরাচরিত শক্তি দপ্তর “WEBREDA”-এর দায়িত্বে থাকা বিশালাকার হাওয়াকলগুলি থেকে প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব । শীতকাল ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে চাহিদানুযায়ী এগুলি চালু থাকে ।

ফ্রেজারগঞ্জ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে আণুমানিক ১৬ বর্গ কিলোমিটার পরিসরে জম্বুদ্বীপের বিস্তৃত বালির তটভূমিতে লাল কাঁকড়ার মঝে ও ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে বেড়ানো এখন পুলিশ ও অন্যান্য দপ্তরের নির্দেশে নিষিদ্ধ ।

বর্ষাকালে বকখালির আকর্ষণ হলো – রসনা তৃপ্তির জন্য নানা আকারের ইলিশ মাছ । আবার শীতকালে ভোরবেলায় চারিদিক খেজুর গুড়ের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে থাকে । খড় বা শুকনো ঝাউপাতার মিহি আঁচে চওড়া অ্যালুমিনিয়ামের আয়তাকার পাত্রে খেজুর রস ক্রমাগত ফুটিয়ে পাতলা নলেন গুড় , পাটালি তৈরি হয় । এই গুড়ের স্বাদ , গন্ধ , স্থায়িত্ব অসাধারণ ও দামেও বেশ সস্তা । বর্ষাকাল ছাড়া অন্যান্য সময়ে বকখালির সমুদ্রে স্নান করে আনন্দ পাওয়া যায় না । কারণ সমুদ্রতট থেকে অনেকদূর পর্যন্ত জলের গভীরতা খুবই কম । ঢেউয়ের উত্তাল রূপও সেইকারণে দেখা যায় না ।

সমুদ্রতীর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে জঙ্গলের মাঝে দেবী বিশালাক্ষি , বন দেবী ও গঙ্গা মায়েরমন্দির দেখে নেওয়া যায় । যাতায়াতের পথে কখনও চোখে পড়ে ছোট জলায় শালুক ফুলের সৌন্দর্য , বিশাল গাছের গুঁড়ির অদ্ভুত আকার ।

ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর পাখির কিচির মিচির শব্দের পিছুটানে বকখালির প্রকৃতিতে চেনা ছোট্ট অবসরটা আনন্দের ক্যানভাসে রঙিন হয়ে ওঠে ।

 হুগলী 

 soumikghosh57@gmail.com

Wednesday, October 6, 2021

হাস


চলচ্চিত্র সমালোচনা

সিনেমার নাম – হাস

ভাষা - ইংরাজী

লেখক – সৌমিক ঘোষ

ম্যাডি ইয়ং একজন মূক ও বধির লেখিকা । ১৩ বছর বয়সে মেনিনজাইটিস রোগে শোনা ও কথা বলার ক্ষমতা চলে গেছে ।‘মিডনাইট মাস’ উপন্যাসের আন্তর্জাতিক সম্মান লাভের পরে তিনি নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে যান । তার দ্বিতীয় বই লেখা চলছে । রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস । তিনি শহরতলির শেষ প্রান্তে জঙ্গলের মধ্যে নির্জন একটি বিশেষ সুরক্ষিত বাড়িতে একা পোষ্য বেড়াল নিয়ে থাকেন । দূরে প্রতিবেশী জন ও তার প্রেমিকা সারা থাকেন । সারা মাঝে মাঝে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে গল্প করতে আসে । ল্যাপটপে লেখা চলে । মাঝে ম্যাক্স নামের বান্ধবীর সঙ্গে চ্যাট চলে । শুরু হয় রান্না শেখার অনলাইন অসাফল্য থেকে । সারা গল্প করে ফেরার সময় এক খুনির মুখোমুখি হয় । তাকে ম্যাডির দরজার সামনে এনে বিভৎসভাবে খুন করে । সে বোঝে না যে ম্যাডি শুনতে পায় না । ম্যাডি দেখে ফেলে । তারপর দরজা জানলা বন্ধ করে খুনির থেকে বাঁচার মরীয়া চেষ্টা । মুখোশে ঢাকা খুনীর হাতে আধুনিক ধনুক ও তীর । কোনোভাবে গাড়ির অ্যালার্ম চালিয়ে খুনিকে ব্যস্ত রাখা । খুনি বাড়ির আলো বন্ধ করে দেয় । খুনি চালাকি করে মোবাইল নিয়ে নেয় । দুরে বিশেষ আলোর টর্চ ফেলে খুনিকে ব্যস্ত রাখে । এর মধ্যে জনকে খুন করে । ম্যাডি উপন্যাসের শেষে খুনির বিবরণ লেখে । বিপদ লেখে । তারপর খুনির হাত থেকে কী মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে ম্যাডির অবস্থা দেখতে দেখতে গল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় দর্শকদের মন । পরিচালক দুঃসাহসিক উদ্যমের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন কাহিনী । মুন্সিয়ানার সঙ্গে একটি বাড়িতে রাতের বেলা দারুণ গল্প বলার টেকনিক দেখিয়েছেন । আলো আঁধারিতে অসাধারণ সিনেমা । ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল লাইটিং লোকেশন এডিটিং স্মার্ট । জেমস নীস্ট -এর সিনেমাটোগ্রাফি গল্প অনুসারী । ইনডোর শুটিং খুবই ভালো ।  একটা হালকা ব্লু টোন ছবির দৃশ্যায়নকে রাতের পরিবেশের সঙ্গে রহস্যময়ভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে । নিউটন ব্রাদার্সের মিউজিক ও সাউন্ড যথাযথ । পাঁচজন অভিনেতা ও অভিনেত্রীর অভিনয় যেন চরিত্রকে ছাড়িয়ে যায় । ম্যাডির ভূমিকায় কেট সিগাল , সারার চরিত্রে সামান্তা স্লোয়ান , মাইকেল ট্রুকো অভিনীত জন , এম্মা গ্রেভ্‌স – এর ম্যাক্স ও খুনী হিসাবে জন গাল্লাঘের জুনিয়র দর্শকদের মননকে আবিষ্ট করে ফেলে ।মাইক ফ্লানাগান ও কেট সীগাল লিখিত গল্প , - মাইক ফ্লানাগানের যথাযথ নির্দেশনায় চলচ্চিত্রায়িত ছবি দেখে  ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে । এই সিনেমা বার বার দেখার মতো । অ্যাকশন শ্যুটিং সবই যেন বাস্তবকে ছুঁয়ে যায় । দারুণ সিনেমা ।


soumikghosh57@gmail.com 
হুগলী

Thursday, July 1, 2021

আমার বাগান

 

ছবি  : সৌমিক ঘোষ 

আমার বাগান
সৌমিক ঘোষ
বাগান তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত । বাড়ির দক্ষিন দিকে গোলাপ বাগান , পেছন দিকে সবজি ও পুজোর ফুলের বাগান আর ছাদে শীতকালীন মরসুমি ফুলের আয়োজন ।

সারা বছরই প্রায় প্রত্যেক মাসে আগাছা ও ঘাস নির্মূল করা হয়ে থাকে । মাটিও খোঁড়া হয় ।
সেপ্টেম্বর মাসের শেষ থেকেই গোলাপের বিশেষ পরিচর্যা শুরু । প্রথমে পুরোনো ডাল ছেঁটে ফেলা হয় । ব্যবিস্টিন ওষুধ স্প্রে করা হয় । ভোরের দিকে একটু শিশির পরা শুরু হলেই গোড়ার মাটি খুঁড়ে দেওয়া
হয় । দুদিন রোদ ও বাতাস লাগে । তারপর হাড় গুঁড়ো , সুপার ফসফেট , জৈব সার , নিম খইল
১-১-১-১ অনুপাতে মিশিয়ে সব গাছের গোড়ায় দেওয়া হয় । ১৫ দিন অন্তর সরিষার খইল পচিয়ে
পাতলা জলের মিশ্রণে সব গাছে দেওয়া হয় । ১৫ দিন অন্তর নিম তেল স্প্রে করা হয় । এন-পি-কে পাউডার জলে গুলে সব গাছে স্প্রে করা হয় । ডিসেম্বর মাসে ফুলে বাগান ভরে যায় ।

পেছনের সবজি বাগানে শীতের শুরুতে দুই বস্তা গোবর সার গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দেওয়া হয় । জমিতে
থাইমেট পাউডার ছড়ানো হয় । এটি মারাত্মক বিষাক্ত । সাবধান । জমিতে সবরকম ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ মেরে ফেলে । পালং – এর দানা আগের দিন জলে ভিজিয়ে রাখা হয় । পরের দিন মাটিতে ছড়িয়ে হালকা করে মাটি ঘেঁটে দিতে হবে । লাউয়ের দানা বসানো হয় । বেগুন , লঙ্কা , টমাটো , ফুলকপি –এর চারা ১ হাত দূরত্বে থাকে । সুপার সোনাটা স্প্রে করা হয় ১৫ দিন অন্তর । একটু ডি-এ-পি দানা গোড়ায় দিতে হয় । ১৫ দিন অন্তর সরিষার খইল পচা জল দেওয়া হয় ।

পুজোর ফুলের গাছে সারা বছর জৈব সার , সুপার ফসফেট , সরিষার খইল মিশিয়ে দেওয়া হয় । ১৫ দিন অন্তর একতারা ওষুধ জলে গুলে স্প্রে করা হয় । এছাড়া রোগোর স্প্রে করা হয় । জবা , টগর , গন্ধরাজ , কাঞ্চন , আকন্দ , কুন্দ , লঙ্কা জবা ,স্থল পদ্ম , বেল , জুঁই সারা বছর নানা সময়ে পুজোর ফুলের যোগান দেয় । বর্ষার আগে এইসব গাছের গোড়ায় গোবর সার মেশানো দোঁয়াশ মাটি উঁচু করে দিতে হয় ।


জুলাই – আগস্ট মাসে চন্দ্রমল্লিকা মাদার গাছের পুরোনো ডাল কেটে ফেলা হয় । নতুন শাখা গজালেই কেটে একদম পাউডার মাটিতে হার্মোন পাউডার লাগিয়ে বসানো হয় । দিন সাতেক পরে শেকড় গজিয়ে যায় । গোবর সার মেশানো টবের মাটিতে বসানো হয় । একটু ডি-এ-পি দানা ও সরিষার খইল পচা জল দেওয়া হয় । নভেম্বর মাসের শুরুতে সব টব রোদে দেওয়া হয় । দোঁয়াশ মাটি ও গোবর সার রোদে শুকোনো হয় । মিশিয়ে চেলে টবে ভর্তি করা হয় । একটু ঠান্ডা পড়লে ভালো বৈশিষ্ট্যের চারা আনা হয় । ডালিয়া , ইনকা , ফিটুনিয়া , অ্যাস্টার , ফ্লক্স , ডাইনথাস , এন্টিরাম , সিনেরিয়া , গ্যাজেলিয়া , জারবেরা , স্প্যাঞ্জি , সালভিয়া আর চন্দ্রমল্লিকা সারা ছাদ ভরিয়ে রাখে রঙিন ক্যানভাসে । এদের বাড় ঠিক রাখার জন্য বিকালে ২-৪ টি ইউরিয়া দানা প্রথম দিকে দেওয়া হয় । পরে ডি-এ-পি দানা দেওয়া হয় । ৭ দিন অন্তর এন-পি-কে পাউডার জলে গুলে স্প্রে করা হয় । রোগোর স্প্রে করা হয় । রাতের দিকে শুঁয়োপোকা ও অন্য লার্ভারা গাছের পাতা খেতে আসে । রাতে গাছে নজর রাখতে

হয় । তামাক পাতা ভেজানো জল দিলে উপকার পাওয়া যায় । ডিসেম্বর মাস থেকে ফুল ফোটা শুরু হয় । ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত ফুল থাকে । ঠিকমতো জল দিলে ও পর্যাপ্ত ছায়ার ব্যবস্থা থাকলে খোলা ছাদে অনেকদিন ফিটুনিয়া সতেজ থাকে । শীতের শেষে টব থেকে মাটি ঢেলে শুকিয়ে বস্তায় রাখা হয় । টবগুলো রোদে রেখে তুলে রাখা হয় ।

গাছের জন্য আমরা – আমাদের জন্য গাছ – সত্যি , মন ভালো করার জন্য , মন ভালো করতে , মন ভালোর সঙ্গী --- একটুখানি ‘বাগান’ ।
ছবি  : সৌমিক ঘোষ 

ছবি  : সৌমিক ঘোষ 



ছবি  : সৌমিক ঘোষ 

ছবি  : সৌমিক ঘোষ 









soumikghosh57@gmail.com
হুগলী

Wednesday, March 31, 2021

কুলডিহার জঙ্গলে

 

কুলডিহার জঙ্গলে
সৌমিক ঘোষ

                উড়িষ্যার বালাসোর জেলায় ‘বন্য জীবন’ অভয়ারন্য কুলডিহার ২৭২.৭৫ বর্গ কিলোমিটার বিস্তারের মধ্যে টুরিস্টদের জন্য নির্দিষ্ট ৭০ বর্গ কিলোমিটার । অনুমতিপত্র , খাতায় এন্ট্রি মিটিয়ে সমুদ্রতল থেকে ১৬৯ মিটার উঁচু জঙ্গলের নির্জন পথে ঢোকা যায় । গাড়ি চলা সামলাতে ২০-২৫ ফুট অন্তর লাল মাটির বাম্পার ।পাখির ডাকে সজাগ হয়ে রাস্তার বাঁক , গাছপালায় নজর চলে যায় । ঢালু পথের মাঝে ঢালাই চাতালের উপরে নদীর জল ছুঁয়ে গাড়ি এগিয়ে চলে । তঙ্গনা , কমলা , বাসুধর , উয়াস্তল – কত নদীর নাম ।হঠাৎই পথের পাশে সুন্দর অর্কিডে ঘেরা শালগাছে চোখে পড়ে বাদামী , হলুদ রঙের ‘দৈত্য কাঠবিড়ালী’ ।

প্রায় দেড় ফুট লম্বা । ইঁদুরের মত মুখ । কালো রোমশ লেজ ঝুলিয়ে কচি পাতা খেতে ব্যস্ত ।আলো আঁধারিতে রাস্তা পেরিয়ে যায় কালো , বাদামী , লাল পালকের লম্বা লেজওলা বনমুরগী । ফাঁকা পাহাড়ী চাতালে একটু বিরতি । হাতিদের স্নানের জায়গায় পাথরের ফাটলে আর ঢালুতে বয়ে চলে বাসুধর নদী । ১৯৮৪ সালে তৈরি ‘কুলডিহা রেস্ট হাউসে’ লাঞ্চ করেই সামনের ফাঁকা সমতলে্র ‘সল্ট পিট’ – এ আসা বন্যজন্তুদের গল্প শুনে আবার গাড়িতে চলা । বাঁদিকের জঙ্গলে হালকা ধূসর রঙের একটা বাচ্চা হাতি চোখে পড়ে । কয়েক মুহুর্তের চাহনি । একটা ছোট হুংকার দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যায় । দুপুর থেকে বিকালের পড়ন্ত আলোয় জঙ্গলের বাইরে ‘রিশিয়া বাঁধ’ এ পৌঁছে যায় গাড়ি । তঙ্গনা নদীর লাগোয়া উত্তর – পশ্চিমে বিশাল ‘রিশিয়া হ্রদ’ সারা বছর চাষের জলের যোগান ও বৃষ্টিচক্র বজায় রাখে । বাঁধের ঢালু জমিতে টং – টং শব্দ । গলায় ফাঁপা কাঠের মাঝে লোহার বল বা টুকরো লাগিয়ে গরুদের চরাতে এনেছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা । অসাধারণ সূর্যাস্ত  ।পরদিন দুপুরে জঙ্গলের পথে দেখা – এক ঝাঁক হরিণ ।ড্রাইভারের কাছে জানতে পারি ওড়িয়া ভাষায় ‘কুলডিহা’ বোঝায় – ‘ছোট ছোট কুলগাছে ঘেরা ছোট মাটির বাড়ি’ । সেরকম বাড়ি চোখে পড়ে না । কিন্তু দেখা যায় বাঁশপাতি পাখি , হলুদ বেনে বৌ , নীল ও খয়েরি মাছরাঙা । রাস্তার পাশে ছোট থেকে বিশাল উইঢিবি । গড়শিমুলিয়াতে উয়াস্তল নদীর এক উচ্ছ্বল ঝর্ণা দেখা যায় ।বনবিবির থান দেখে , জঙ্গলের পথ শেষ । গেটে লেখা – ‘বিদায় অরণ্য’ ।

soumikghosh57@gmail.com
হুগলি