1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label নাটক. Show all posts
Showing posts with label নাটক. Show all posts

Saturday, October 21, 2023

ভগবানের আগমন

ছবি : ইন্টারনেট 

ভগবানের আগমন

অর্পণ ভট্টাচার্য

(চরিত্র দু জন। একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক, ভগবান)

শনি বার অফিস থেকে ফিরে,

রেডিওতে ব্যাকগ্ৰাউন্ডে গান বাজছে (আমার সাধ না মিটীলো আশা না ফুরিলো...)

মাঝ বয়সি ভদ্রলোক তারাতারি বাথরুম থেকে বেরিয়ে রেডিওটা বন্ধ করলো (পরনে একটা সাদামাটা ধুতি কানে পৈতে জড়ানো)

ভদ্রলোক- মা দেখা দে, নয় টাকা দে। মাথা ভরা টাক দিলি আকার দিলি না বলে (গান গাইতে শুরু করে)

দে মা টাকা দে। এই না না না... বেশি আশা একদম ভালো না তুই আমায় বরং পয়সা ই দে..!

বলে খালি গায়ে সিংহাসনের দিকে যায় সশটাঙ্গে প্রনাম করে বলে

মাআআ মা গো, সময় তো গড়িয়ে গেল কিছু আশার আলো দেখ মা, সকালে অফিস থেকে ফেরার পথে চন্ডির গুমটী থেকে চিয়ার লটারির ১০ সেম করে দু দুটো কিনেছি মা, একটা ৯ এর ঘরে লাগিয়ে দাও মা।

দেখো বাবা আমি কথা দিচ্ছি সত্য নারায়ণ এর দোকানের গুজীয়া আমি তোমায় শিওর খাওয়াবো। প্লিজ একটা নাম্বার লাগিয়ে দাও মা..

এই ছি ছি ছি তোমায় ১০ টা কালাকাঁদ খাওয়াবো একদম পাক্বা। তোমার ৫টা আমার ৫ টা। এই না না ৭ টা তোমার ৩ টে আমার। তাহলে ডিল ফাইনাল তো বাবা ভোলেনাথ। আর ৯ এর ঘরে লাগলে তোমার এই কাঠের সিংহাসন আমি পাথরের করে দেবো, নারকেল নাড়ু আমসত্ত্ব দিয়ে পূজো করবো, গেঁদার জেয়গায় গোলাপ দিয়ে পূজো করবো মা।

উঠে পরে একটা টাওয়েলে গা‌ মুছতে মুছতে আবার গুন গুন করে গান গাইছে।

(হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার করো আমারে) 

কলিং বেল বেজে উঠলো 

দরজা খুলে

ভদ্রলোক- এই কে বাওয়া তুমি, এলাকায় নতুন নাকি? আগে তো দেখি নি এলাকায়!

ভগবান- আমি? আমার নাম ভগবান আমি এসেছি আপনার সাথে....

ভদ্রলোক- দূঃখিত, ভগবান বাবু আপনি রং নাম্বার লাগিয়েছেন আমি না কিছু অর্ডার করেছি, আর না এই জেয়গায় সেলসম্যান এলাও। তুমি এবার আস্তে পারো ভগবান বাওয়া। (দরজা বন্ধ করে দেয় মুখের উপর)

আবার গান ধরে (হরি হরি যতৈ কর না হরি তোমায় দেখা দেবে না)

অতঃপর কলিং বেল আবার বেজে উঠলো।

দরজা খুলে রেগে গিয়ে..

ভদ্রলোক- এই বললাম না আমায় জ্বালিও না। আমার বারির দেনা, ছেলে মেয়ের পড়াশোনা, পরের বছর অফিস থেকে ছাঁটাই করে দিতে পারে তার চিন্তা, তার বৌ এর লোনের চাপে এমনি ই জ্বলছি তুমি এসেছো তার উপরে জ্বালাতে!

ভগবান- আমার কথা টা শুনন, এই একটু আগে আপনি জাকে ডাকছিলেন আমায় উনি পাঠালেন।

ভদ্রলোক- এই তুমি কে বলোতো মজা করছো? দেখবে দরয়ান ডাকবো!

অতঃপর ভগবান নামক ব্যক্তি বলে ওঠেন--

আপনার নাম গোপাল কুমার আচার্য,

আপনার বাবার নাম গনেশ কান্তি আচার্য,

আপনার বৌ এর‌ নাম দূর্গা দেবী আচার্য,

আপনার ওফিসের নাম বালাজি ইন্টারন্যাশনাল,

আপনার মাসিক বেতন....

ভদ্রলোক- এই দারাও দারাও দারাও তুমি কে হে বাছা বল তো? এত খবর পেলে কোথায়, এই তুমি চর নয় তো !!

ভগবান- না স্যার, 

লোক- ই ই ই তাহলে গোয়েন্দা? এই আমি কিন্তু কিছু করিনি বলে দিলাম।

ভগবান- আমি ভগবান।

লোক- মানে! তাই নাকি! আপনি মশাই সত্যি ভগবান?

ভগবান- হ্যাঁ

লোক- আরে বাওয়া আসুন আসুন আগে বলবেন তো কি মুশকিল, বুঝলেন ভগবান বাবু আপনি যে স্বয়ং ঈশ্বর তা আগে জানলে সত্যর দোকান থেকে ঐ গুজিয়া টা...

ভগবান- থাক আমার হাতে সময় খুব কম ১ মিনিটের মধ্যে জা খুশি চেয়ে ফ্যাল দেখি। আমি তোর মনস্কামনা পূর্ণ করব।

ভদ্রলোক- (চোখ বন্ধ করে) আমার প্রমোশান, ছেলে মেয়ের ভালো নাম্বার, লটারির টাকা, চাকরিটা যেন থেকে যায়, আর হ্যাঁ পারলে আমার গিন্নি টাকেও আপনার সাথে নিয়ে যান। 

ভগবান- তথাস্তু। তবে আপনাকে কিছু কথা বলে রাখা ভালো‌, ভালো কাজ করে জান প্রমোশন ঠিক হবে, আপনার সন্তানের মনোযোগ দিয়ে পরাশনা করলে ভালো নাম্বার নিশ্চিত পাবে, লটারি কপালে থাকলে পাবেন, তবে সব হবে ঐ শেষের টা ছারা।

ভদ্রলোক- এই কেন ভগবান বাবু?

ভগবান- আপনার গিন্নির ইচ্ছে আমি জেন আপনাকে আমার সঙ্গে করে নিয়ে জাই। এখন আমি যদি দু জন কেই নিয়ে চলে যাই তাহলে আপনার সংসারের কি হবে?

ভদ্রলোক- কি বলছেন কি ভগবান বাবু! এতো কেলেঙ্কারি কান্ড।

ভগবান- তাহলে আর বলছি কি। আর তাছাড়া আমাদের স্বর্গলোকে এখন জনসংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে। প্রত্যেক মাসে মাসে এখন স্বর্গ আর নরক এই দুই জায়গা মিলিয়ে নিয়মিত 'ভূত গণনা' আর 'দেব গণনা' চলছে। 

ভদ্রলোক- বাবা বলেন কি?

ভগবান- আর তাছাড়া ওটা তো আমার ডিপারমেন্ট ও নয়। ওটা জম দার। ওনাকে সময় করে বলে দেখবো একবার। ওই জনদা, দেবরাজ ইন্দ্রের সবার মাঝে মাঝে আসেন, একটু আমদ প্রিয় মানুষ তো.. তাস ফাঁস খেলে। 

ভদ্রলোক- ও বাবা তাই নাকি? এই তাহলে কি হবে? তাহলে বরং ছেড়েই দিন গিন্নি কে। আসলে সত্যি বলতে আমার গিন্নি একদম অবুজ প্রানী, ভূল করে বলে ফেলেছে! ক্ষমা, ক্ষমাই পরম ধর্ম। আপনি কি বলেন?

ভগবান- তাহলে আমি চলি? বাইরে আবার অনেকক্ষণ আমার বাহন টা অপেক্ষা করছে। অনেক দূরের রাস্তা তো! সেই স্বর্গ, সময় লাগবে যেতে।

ভদ্রলোক- আসুন ভগবান বাবু, তবে গিন্নি জিগ্গেস করলেন কি বলবো?

ভগবান- বলবেন পাশের পাড়ার ইশ্বর এসেছিলেন, রং এর মিস্ত্রি।

ভগবান উঠে চলে যায়...

লোকটি বিভোর হয়ে চোখ বন্ধ করে জোর হাতে প্রনাম করতে থাকে

ঠাকুর তুমি দেখা দিলে ঠাকুর....আমার কি সৌভাগ্য আজ ভগবান বাবু এই চিয়ারে বসেছিলেন আর এই টেবিলের উপর হাতও রেখেছিলেন। ওরে বাবা আজ আমি এই চেয়ার, টেবিলই পুজো করবো...

যাই সত্যনারায়ণের গুজিয়া আর ভুলুর দোকানের আমসত্ত্ব টা কিনে আনি (এই বলে ভদ্রলোক সোফা থেকে মানিব্যাগটা নিতে যায়)

এই আমার মানিব্যাগ আমার মানিব্যাগ..! ওতে তো আমার মাইনের টাকা, এটিএম এর কার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, লটারির টিকিট সব আছে 

তাহলে ভগবান বাবু....

এই ভগবান, ভগবান আরে আমার ব্যাগ ও ভগবান.....

ভগবান গো সব গেলো সব নিয়ে চলে গেল গো...

ওরে কে কোথায় আছিস ভগবানকে ধর। ওকে ধরে আন, ধর ওকে......।।

(পুরো টাই ব্যাক ভয়েসে থাকবে, স্ক্রিন অফ হয়ে গেছে)

...(সমাপ্ত)...



পায়ে পা দিয়ে

ছবি : ইন্টারনেট 

পায়ে পা দিয়ে

দীপক কুমার মজুমদার

[কিছু মানুষ আছে যাদের স্বভাবই হলো সব কিছুতেই ক্ষুঁত ধরা আর পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করা। এইরকম এক মানুষের সামনে একজন সরল স্বভাবের মধ্যবয়সী মহিলা কি পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয় সেইসব উত্তেজনায় ভরপুর কথপোকথন নিয়ে এই শ্রুতিনাটক ‘পায়ে পা দিয়ে’।

মালিনী।। মেশোমশাই, ভালো আছেন তো?

হেমেন।। তুমি কেহে বাপু আমাকে মেশোমশাই বানিয়ে ফেললে।

মালিনী।। বানিয়ে ফেলার কি আছে, কিছু একটা সম্বোধন করে তো ডাকতে হবে।

হেমেন।। তার মানে, আর কি কোন কিছু বলার ছিলনা!

মালিনী।। সেকি, বয়স্ক মানুষ…

হেমেন।। বয়স্ক মানুষ! আমি কি আমার এজ সার্টিফিকেট বুকে ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি- যা দেখে তুমি কনফার্ম হয়ে গেলে যে আমি বয়স্ক।

মালিনী।। না না তা কেন হবে। তাছাড়া দেখে তো অনেকটাই বোঝা যায়।

হেমেন।। অ, দেখেই বুঝে গেলে আমি মেশোমশাই।

মালিনী।। হ্যাঁ চোখে মুখে বয়স্ক ভাব।

হেমেন।। বলো আমার বয়স কত।

মালিনী।। কারও বয়স নিয়ে হিসেব করা কি ঠিক হবে?

হেমেন।। কোনও অসুবিধে নেই, আমিতো কোনও ত্বন্যি মহিলা নই যে চটাস করে মানে লেগে যাবে! হতেই পারে সবার চামরা টান টান নাও থাকতে পারে। আমি তো আর এ যুগের মেয়েদের মতো ফেসিয়াল টেসিয়াল করি না।

মালিনী।। তারপর চুলের রঙটাও বেশ খানিকটা সাদা, মানে ঐ রুপোলি।

হেমেন।। অ.. চুলের রঙ রুপোলি,  এটা হলেই সে মেশোমশাই!

মালিনী।। আপনার কি ঐ মেশোমশাই কথাটাতেই আপত্তি?

হেমেন।। আপত্তি তো আমার সবটাতেই ।

মালিনী।। তাহলে কাকু!  নাকি আপনাকে নাম ধরে ডাকাই উচিৎ ছিল? নামটাও তো ঠিক জানা নেই।

হেমেন।।  তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়, দু দিনের মেয়ে আমায় তুমি নাম ধরে ডাকবে! আমার নাম হেমেন, হেমেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায়। কই ডাকো দেখি নাম ধরে।

মালিনী।। আমি কি তাই বলেছি!

হেমেন।।  আর কেমন করে বলে আমার তো জানা নেই।

মালিনী।। মোটেই তাই বলিনি, তবে একটা কিছু বলে তো ডাকার দরকার নাকি।

হেমেন।।  কেন ডাকতে হবেই বা কেন। যাচ্ছিলাম একটা কাজে, অমনি মেশোমশাই করে পেছনে না ডাকলেই চলছিল না!

মালিনী।। আমি কিন্তু ঠিক পেছন থেকে…

হেমেন।।  থামো তো তুমি, এতদিন পরে তোমার আর সামনে পেছনে দেখাতে এসো না, ওসব আমার ঢের দেখা আছে। দুদিনের মেয়ে আমায় পেছন দেখাচ্ছে।

মালিনী।। এ মা ছি ছি এ কি বলছেন আপনি। আমার সামনে পেছন…. লজ্জায় আমার ….

হেমেন।।  অতই যদি লজ্জা তাহলে এভাবে ডেকে আদিক্ষেতা না দেখালেই পারতে।

মালিনী।। আমি তো আপনাকে ভালো আছেন কিনা জানতে চাইছিলাম।

হেমেন।। কেন আমার ভালো থাকায় না থাকায় তোমার কোন অসুবিধে আছে?

মালিনী।। না না অসুবিধে হতে যাবে কেন। শুধু  জানতে চাইছিলাম।

হেমেন।। এতো কৌতুহল কিসের তোমার, চারিধারে কত কিই তো ঘটছে। তার কতটুকু তুমি জানো আর কটা লোককেই বা তুমি চেনো যে আমার সম্মন্ধে তোমায় সব জানতে হবে! 

মালিনী।। ভুল করছেন, আমার কিন্তু কোনও বদ উদ্দেশ্য ছিল না।

হেমেন।।  এই বয়সে আর উদ্দশ্য বিধেয় শেখাতে এসো না। আর উদ্দেশ্য যাই থাক আমার ভুল ধরার তুমি কেহে।

মালিনী।। ঠিক আছে আমারই ভুল। এখন থেকে আর কোনরকম খোঁজ নেব না।

হেমেন।। তা কেন নেবে! ওই এড়িয়ে চলা। এখনকার জেনারেশন…তুমি কি এই পাড়াতেই থাকো।

মালিনী।। হ্যাঁ।

হেমেন।।  তবে, পাড়ারই একজন মানুষ বাঁচলো কি মরলো, কেমন আছে কোন কিছুরই খোঁজ নেবে না। সামাজিকতা বোঝো?

মালিনী।। বুঝি বই কি।

হেমেন।।  তাহলে এত কিন্তু কিন্তু করছো কেনো। তুমি কি চাওনা আমি ভালো থাকি, সুস্থ থাকি।

মালিনী।। নিশ্চয় চাই। আপনার কি তাই মনে হয়।

হেমেন।।  আমার কি মনে হয় সেটা বড়ো কথা নয়, তোমার কি মনে হয়! তোমার বক্তব্য একান্তই তোমার।

মালিনী।। ভালোই থাকবেন। এখন আপনার কোনও টেনশন নেই, আফিসের চাপ নেই, রিটায়ার্ড….

হেমেন।।  রিটায়ার্ড! কি বলতে চাও তুমি, রিটায়ার্ড বলে কি আমার কোনও কাজ নেই। তোমাদের কি ধারণা একজন মানুষ তার সবরকম উৎসাহ নিয়ে পূর্ণ উদ্দ্যমে চাকরি জীবনে যাবতীয় কাজ করলো তারপর রিটায়ার্ড করে একদম শেষ হয়ে গেলো, ফুরিয়ে গেলো!

মালিনী।। তা আমি নিশ্চয় বলিনি।

হেমেন।।  আলবাৎ বলেছো।

মালিনী।। না বলিনি। আপনি ভালো আছেন কি না সেটাই তো জানতে চাইছিলাম।

হেমেন।।  তুমিই তো এইমাত্র বললে আমি রিটায়ার্ড করেছি।

মালিনী।। তো!সেটাতো আর দোষের নয়।

হেমেন।।  বিদ্রুপ করছো! আলু পেঁয়াজ কত দাম জানো? পটল ঢেঁড়স কত দাম জানো? জবাকুসুম তেল লাইফবয় সাবান কত দাম জানো? ওষুধের দাম জানো? এফ ডি ইন্টারেস্ট রেট জানো?

মালিনী।। কি মুশকিল খামোখা এতগুলো প্রশ্ন করে চলেছেন কেন? একি ইন্টারভিউ বোর্ড!

হেমেন।।  বুঝলেনা….

মালিনী।। না।

হেমেন।। এই দূর্মূল্যের বাজারে একজন রিটায়ার্ড লোক কি করে সংসার চালায় তুমি জানো? কোনো রকম ধারণা আছে। এতসবের পরেও তুমি বিদ্রুপ করছো, জানতে চাইছো ভালো আছেন?

মালিনী।। না ঐ এফ ডি ইন্টারেস্ট আর  পেনশন টেনশন নিয়ে হয়তো….

হেমেন।। ভুল করছো, এ দেশে রিটায়ারমেন্টের পর কত পারসেন্ট লোক পেনশন পায় তুমি জানো?

মালিনী।। ঠিক জানিনা।

হেমেন।। তাহলে শোনো, আমাদের দেশে ১০% লোক রেগুলার পেনশন পায় আর ২৫% থেকে ৩০% লোক যৎসামান্য পেনশন পায়। বাকি বেশির ভাগ লোকেই যেটা পায় সেটা হলো টেনশন! যেটা তুমি একটু আগেই উল্লেখ করলে।

মালিনী।। এটা আপনি ঠিকই বলেছেন।

হেমেন।। এটা ঠিক বলেছি অর্থাৎ আমার আগের কথাগুলো ঠিক ছিলো না!

মালিনী।। না না আগের গুলোও ঠিক এটাও ঠিক। আপনিই ঠিক।

হেমেন।। আবার এড়িয়ে যাচ্ছো। একটা মানুষ কখনও সবটা ঠিক হতে পারে?

মালিনী।। পারে না বোধ হয়। কি জানি এই সময় কি  বলা উচিৎ। তাহলে আমি যাই।

হেমেন।। যাই মানে! আমি তোমায় আটকে রেখেছি না তুমিই আমায়….

মালিনী।। হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই আপনাকে ডেকে আপনার কুশল জানতে চেয়েছি । অপরাধ নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন মেশো… সরি হেম… সরি কি বলে ডাকবো?

হেমেন।। আবার সেই তাচ্ছিল্যের সুর। না পোষায় কথা বলবে না । কিন্তু এইরকম তাচ্ছিল্য আমার এক্কেবারে অপছন্দের।

মালিনী।। আপনার কোনটা পছন্দের আর কোনটা অপছন্দের তা বোঝা শিবের অসাধ্য। আপনি মশাই বলতে বাধ্য হচ্ছি পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে পারেন।

হেমেন।। পায়ে পা দিয়ে মানে, সারা শরীরটা থাকতে তোমার পায়ের দিকেই আমার নজর পড়বে! এতক্ষণে তোমার  এই মনে হলো!

মালিনী।। নয় তো কি?

হেমেন।। তোমাদের মেয়েদের ঐ হলো দোষ কোনও  কথাই সোজা ভাবে নিতে পারো না। সবসময় উল্টো মানে ….

মালিনী।। মোটেই না। বরং উল্টোটা আপনিই বলছ। কিছু পুরুষ মানুষের চরিত্রই হলো মেয়েদের খুঁত ধরা আর ....

হেমেন।। তুমি থামো তো। আমার চরিত্র নিয়ে কথা! তর্কবাগীশ কোথাকার।

মালিনী।। বেশ তো তাই। এবার থেকে দেখা হলে  কিছু বলেও ডাকবো না, কেমন আছেন জানতেও চাইবো না। সোজা পাশ কাটিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে গট গট করে চলে যাবো ।আর লম্বা হিল তোলা জুতো পরে পা টাকে শাড়ী দিয়ে এমন ভাবে ঢেকে রাখবো যাতে আমার পা আপনি দেখতে না পান।

হেমেন।।  হ্যাঁ হ্যাঁ তাই ক’রো! যতো রকম বেআক্কেলে মেয়ে…বলে কিনা পায়ে পা দিয়ে, বয়ে গেছে তোমার মতো মেয়ের পা দেখতে। সারা শরীর থাকতে শুধু পা.....?


...(সমাপ্ত)...

Sunday, September 25, 2022

বাড়িওয়ালা

ছবি : ইন্টারনেট

বাড়িওয়ালা

উজ্জ্বল দাস

চরিত্র

বাড়ি ওয়ালা - করিতকর্মা মজুমদার

ভাড়াটে বউ -  নন্দিনী

ভাড়াটে কর্তা – গোবর্ধন গুপ্ত

~~~~~~


ওই মালতি লতা দোলে, 

- কই গো? আরে দাও দাও জলদি দাও, বুঝলে? নন্দিনী আজ জমিয়ে মাছটা খেতে হবে, তাও আবার পমফ্রেট বলে কথা... একটু কষে কষে করো কিন্তু....

- এই এই এই..তো হয়ে এলো গো, একটু এপিঠ ওপিঠ করে নিয়েই পাতে দিয়ে দেবো গরমা গরম।

(আড়াল থেকে উঁকি মেরে বাড়িওয়ালা)

-অ্যাঁঅঅঅঅঅঅ ব্যাটা বজ্জাত,  দুই মাস বাড়ি ভাড়া দেয়নি আবার পমপ্লেট মাছ খাচ্ছে, খাওয়াচ্ছি। (স্বগতোক্তি)

(দরজায় টোকা মারার শব্দ)

টক টক টক...

- আরে আরে কাকু যে! আসুন আসুন, বসুন। যাক এলেন খুব ভালোই হলো নাহলে আমিই যেতাম।

- ওহ, তা তুমি যেতে বুঝি? দাও দাও যখন এসেই পড়েছি নিয়েই যাই, আর রশিদটা কিন্তু বাবা বিকেলে ওপরে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে।

- ওপরে! মানে কী কাকু? এভাবে ওপরে যাবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয় নাকি?

- কী বললে? অ্যাপন্ট ...মেন্ট। সেটা কী?

(গোবর্ধন বাবুর বউ নন্দিনীর প্রবেশ)

- আরে নানা কাকু, উনি বলছিলেন যে...

- আরে বৌমা, তা পমপ্লেট মাছটা কি রেডি হলো? তোমার কত্তার যে এবার জিভের জল ধরার জন্য বাটি লাগবে। যা লিপ্সা অ্যাঁঅঅঅঅঅ...

- ওওওওহ, আড়ি পাতার অভ্যেস ভালোই আছে দেখছি, তা একটু খেয়েই যান আজ দুপুরে।

- আরে না না আমিতো এসেছিলুম...

- ভাড়ার টাকাটা নিতে তাইতো?

- অজ্ঞে হ্যাঁ, মানে...কথা। দুই মাস হলো তো, তাই আর কী, ভাবছিলাম..

- ভুল ভাবছিলেন কাকু, আসলে চাঁদা-যেহেতু আমাদের দিতেই হয় তাই ভাবছিলাম পাশের ক্লাবের চাঁদার বইটা নিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করব।

-হ, বুঝলাম। বাড়ি ভাড়ার টাকা না দিয়া তোমরা আমার পকেট থেকে টাকা বের করার তাল খুজছো বৌমা তাই তো।

- আরে না না কাকু, টাকাটা তো পরের হপ্তায়...

- এই থামো তো গোবর্ধনবাবু, এই হপ্তার গল্প আমি রোজ সকালে বাথরুমে ঢুকে ভাবি আর একের পর এক হপ্তা পেরিয়ে যায়। আমাকে আর এই হপ্তার গল্প দিও না তো মশাই, যত্তসব। এরপর বাড়ি ছাড়তে হবে কিন্তু। 

- দেখুন কাকু, টাকা দিতে পারিনি, ঠিক আছে...

- আরে, ঠিক আছে মানে কী হ্যাঁ? ঠিক আছে মানে কী... (রাগান্বিত হয়ে)

(নন্দিনী)

- আরে কাকু কথাটা তো শুনবেন, তাগাদা দিতে এয়েছেন ঠিক আছে কিন্তু বাড়ি ছাড়তে বললেই কিন্তু...  হেঁ হেঁ... হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেবো।

- আচ্ছা আচ্ছা বৌমা! ঠিক আছে, না হয় পরের হপ্তায় একবার...

- ওহ হ না না, উনি বলতে গেছিলেন পরের হপ্তার পরেরটায় আমাদের একটা ফিক্স ডিপোজিট ম্যাচিওর করবে তখন আপনার টাকাটা একেবারে আগাম....

- আগাম! আগাম মানে কী? তা বৌমা কতগুলো পরের হপ্তা বললে, মনে  থাকবে তো? আর এখন তো  টাকা বাকি পড়েছে তাহলে আগাম বলছো কেনো?

-দেখুন কাকু কতগুলো হপ্তা বললাম সেটা যে আপনি মনে রাখবেন সেটা পাশের বাড়ির.. অনু কাকিমাও জা...

- আচ্ছা আচ্ছা বেশ। সে না হয় আমিই তাগাদা করে ...

-আচ্ছা, এবার যদি আপনি ওপরে যান তাহলে আমাদের ছুটির দিনের দুপুরটা একটু ভালো কাটে। অন্তত আমরা ভদ্র বাড়ির লোক। ঝগড়া বা তর্ক বিতর্কে যেতে চাই না।

-ঠিক আছে ঠিক আছে। এই মনে রাখলাম। আমার বাড়ি থেকে আমাকে চলে যেতে বলা.. গোবর্ধনবাবু তুমি একটু সজাগ হও, যা দজ্জাল বউ তোমার।

- এই এই দজ্জাল বললেন কেন। দজ্জাল মানে কী! এক্ষুনি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেবো। যান উপরে।

~~~~~~

(নন্দিনী)

- দেখলে কী ভাবে তাড়াতে হয়, শিখে রাখো এই সব গোবর্ধন কুমার।

- সত্যিই গিন্নি। তোমার তুলনা নেই। এইভাবে যতদিন টাকাপয়সা বাঁচানো যায় আরকি, এদিকে দেখোনা ক্লাবের চাঁদাটাও কেটে নেব কায়দা করে।

~~~~~~~~~


(পরের দিন ভোরবেলা)

-কই গো গিন্নি, চা টা দাও।

- ওই যে বাঁ দিকের টেবিলে রাখা আছে দেখো। চা-টা খেয়ে জলদি বাথরুমে ঢুকে যাও। নইলে কিন্তু আজ তোমার অফিস যেতে দেরি হয়ে যাবে।

-বুঝলে কী ভাবছি?

-কী ভাবছো?

-আজ অফিস যাবার পথে ওই যে তোমার জন্য ঢাকাই জামদানি যেটা দেখে এসেছিলাম...

- ওরে বাবা সে তো অনেক দাম চার..চার হাজার টাকার ওপর।

 - আরে শোনো শোনো, ভাবছি ভাড়াটা না দিয়ে ওই টাকা দিয়ে... বায়না করে যাব অফিস যাবার সময়। সন্ধের সময় ফেরার পথে নিয়ে নেব। কিন্তু হ্যাঁ...

-কী ... তা নেবে যখন বলেছোই, নিয়েই নাও।

- আহা তা নয়,

-তালে কী...

-আরে বলতে তো দাও। বলছিলাম বুড়ো যেভাবে আমাদের ওপর নজর রাখছে আজকাল, তাতে করে শাড়িটা নিয়ে বাড়ি ঢুকি কী করে! সেটাই ভাবছি।

- হম্ম, তা মন্দ বলনি। এক কাজ করো বুঝলে, ফেরার সময় দোকান থেকে শাড়িটা কিনে আমাদের বাড়িতে রেখে দিয়ে এসো। ও আমি টুক করে একবার গিয়ে লুকিয়ে বাড়ি নিয়ে আসবক্ষণ।

- সেই, রেখে আসি আর আমার নির্লজ্জ শালিটা পরে বসে থাক আর কী।

- এই ...এই... এই ...কী বললে? আমার বোন ভগ্নিপতি, ঘর জামাই থাকে বলে ওদের তুমি এভাবে বললে?  অ্যাঁঅ.... অঅঅ ...অ...

- আরে শোনো শোনো ব্যাপারটা এত সিরিয়াসলি নিও না। গতবার তোমার চুড়িদারের পিসটা ঝেড়ে দিয়েছিল ঠিক এই পলিসিতেই তো। তাই আর কী.. আমি তো আর এটা বলিনি...... যে ওরা শ্বশুর বাবার ঘাড়ে বসে খায়। তাহলে নাহয় রাগ করার একটা কারণ ছিলো।

- এইইইইইই.... তুমি এবার থামবে নাকি আমি মুখ খুলবো?

-আচ্ছা আচ্ছা বাবা রে বাবা। এই তোমার দিব্যি। নাক মুলছি। রাগ করো না। আমি বাথরুমে যাই। ততক্ষনে তুমি ব্রেকফাস্ট রেডি করো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।

-এসো না তোমায় এক ছিপি ফলিডল খাইয়ে আজ অফিস পাঠাবো। শয়তান বুড়ো। হাড়মাস জ্বালিয়ে খেলে একেবারে।

(স্নানে চলে যায় কত্তা)

(জলের শব্দ। সঙ্গে কত্তার বাথরুমে গলা ছেড়ে সংগীত)

ওগো কাজল নয়না হরিণী। মেলে দাও না ও দুটি আঁখি....

ওগো......

গান থামিয়ে হঠাৎ বাথরুমের ভেতর থেকে।

- এই শুনছো, দেখোতো জল চলে গেলো। 

- ওমা সেকি। দাঁড়াও দেখি বলি বাড়িওয়ালা কাকুকে। কাকুকুকুকু... ও কাকুকুকু... বলছি জল চলে গেছে। এদিকে আমার কত্তা বাথরুমে ঢুকেছে। সারা গায়ে সাবান মেখে চোখ মুখ খুলতে পারছেনা। মাত্র এক বালতি জল আছে।

- এই যে বৌমা শুনতে পেলাম তুমি চিৎকার করছো জল নেই জল নেই করে। আমি তোমাকে বলতেই আসছিলাম যে বাড়ির জল চলে গেছে। জলের লাইনে কি একটা সমস্যা হয়েছে। সক্কাল বেলাই কলের লোককে ফোন করে জানালাম। ট্যাঙ্কিতে জল উঠছে না দেখে। সদ্য দেখে গেলো, আমাকে বললো নাকি ছ'হাজার টাকা খরচা। মটর আর চলবে না।

- ওমা সেকি কাকু?

- হ্যাঁ বৌমা। এদিকে আমি এখন এত টাকা পাই কোথা থেকে বলো। তাই এই সামনেই আমার এক কাকা শ্বশুরের বাড়ি আছে। দিন কয়েক গিয়ে থেকে আসি গে।

- কই গো, কাকু কী বললো? পাম্প কি চালাবে?

- ওই এক বালতি জলে চান করে বেরিয়ে এসো। তারপর সব বলছি।

- আচ্ছা বৌমা আমি তাহলে আসি এখন। টাকা জোগাড় করতে পারলে জল নিয়ে ফিরবো একবারে।

- যাহ, সেকি, কাকু দাঁড়ান দাঁড়ান এই রে। ও কাকু।

- আসি বৌমা...। জল নিয়ে তবেই ফিরবো। তোমাদের অসুবিধা হবে এ আমি চোখেও দেখতে পারবো না। তাই চললুম।

- এই তুমি চান করে এসে দেখো তো। ঘটনাটা ঠিক কী। এটা কি চাপ দিয়ে ভাড়া আদায়ের একটা রাস্তা নাকি?

- হ্যাঁ হ্যাঁ আসছি। বুড়োর একদিন কী আমাদের এক....

- আর ল...চ.... (লম্বা চওড়া) বাত ঝেড়ো নাতো। দিলো তো মুখে মুলো গুঁজে।

- আরে আমি তো তোমার কথা শুনেই ভাড়াটা আটকে রেখে ছিলুম। দাও বেল্টটা দাও... রুমাল টা...

- হ্যাঁ হ্যাঁ এখন সব আমার দোষ। বদমাশ বুড়োকে একটু ঢিট করবো বলেই তো...

- যাই বলো গিন্নি পায়ের উপর পা তুলে ঝগড়া করাটা তোমার একটা স্বভাব আছে। বয়স হচ্ছে এসব এবার একটু ছাড়ো। এই যে এবার আমিও অফিস বেরিয়ে যাবো। থাকো তুমি জল ছাড়া।

- অ্যঁ...অ্যঁ ... হ্যাঁ হ্যাঁ (নাকি কান্নার সুর) যাই হোক যাবার সময় শাড়ির অর্ডার টা দিতে ভুলে যেও না যেন। এই নাও ব্রেকফাস্ট রেডি।

- আরে আচ্ছা গো আচ্ছা তোমার শাড়ি আমি ঠিক অর্ডার দিয়ে যাব যাওয়ার সময়

- আচ্ছা বাবা। দুগ্গা দুগ্গা। জয় ঠাকুর, জয় ঠাকুর। তাড়াতাড়ি এসো এদিকে আমি দেখি জল ছাড়া কি করে চলে! নাকি জলের ব্যবস্থা করতে পারি...

###########


- হ্যালো, এই হ্যালো হ্যালো.. হ্যাঁ নন্দিনী?

- হ্যাঁ বলো।

- আমি অফিস পৌঁছে গেছি। আর শোনো না তোমার ঢাকাই জামদানিটার জন্য গুনে গুনে কড়কড়ে চার হাজার দুশ টাকা দিয়ে এসেছি। বুঝলে, হেঁ হেঁ, এবার একটু হাসো। ওগো হাসো।

- উফফ আমার সন্তাটা, আমার মোন্তাটা। আচ্ছা বুড়ো তো নেই বাড়িতে। ফেরার সময় বাড়িতেই নিয়ে এসো শাড়িটা- কেমন। আর হ্যাঁ শোনো, আমি আপাতত পাড়ার টিউকল থেকে জল ধরে রেখেছি ভর্তি করে। তা দিয়েই আমাদের চলবে ক্ষণ। দেখিনা বুড়ো কদ্দিনে ফিরে আসে।

- আচ্ছা গো আচ্ছা।

~~~~~~~~~

(বিকেল বেলা ফেরার সময়)

আমার সাধ না মিটিলো, আশা না পুরিলো...

(শাড়ির দোকানে গোবর্ধন বাবুর প্রবেশ)

-দাদা নমস্কার। আমি গোবর্ধন গুপ্ত। সকালে চার হাজার দুশ টাকা জমা করে গেছিলাম.....ওই... একটা... জামদানি...

(ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চক্ষু চড়কগাছ। দোকানের ভেতরে হঠাৎ দেখে বাড়িওয়ালা কাকু বসে আছেন)

-অ্যঁআআআআআ! সেকি কাকু আপনি।

- হেঁ হেঁ, কেনো বাছাধন গোবর্ধন, একদম ঠাওর করতে পারোনি তাই না?

-না মানে...

- মানেটা আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই হলো আমার খুড়শ্বশুরের, ভগ্নিপতির ভায়রা ভাইয়ের কাকিমার জাঠতুত ভাইয়ের দোকান।

-অ্যঁঅঅঅঅঅঅঅ...মানে?

- মানে হলো গিয়ে এই শাড়ির দোকানটা আমার একদম কাছের সম্পর্কের ওই কী যেন হয়, তাদের দোকান। মানেই আমার দোকান।

-আমার টা...কা...টা...

-তোমার বাড়ি ভাড়া প্রতি মাসে এক হাজার। বাকি পড়েছে দু মাসের। আর আগাম নিলাম দুমাসের। এই হলো তোমার চার হাজারের বাড়ি ভাড়ার রশিদ। আর ফেরত দিলাম দুইশত টাকা। হেঁ হেঁ এইবার নিশ্চয়ই তোমার হিসেব মিলে গেছে। যাও কাল থেকে বাড়ির জলও পাবে। আলোও পাবে। হেঁ হেঁ বাবা আমিও করিতকর্মা মজুমদার।

বা......ড়ি যাও,

ফ...লি...ডল খাও।

...(সমাপ্ত)...


মায়ের ডাক

ছবি : ইন্টারনেট

মায়ের ডাক

নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়


সময় - দুপুর ।  একটি বিবর্ণ একতলা বাড়ির একটা ঘর। ঘরে আসবাবপত্র বলতে

একটি তক্তাপোশ, দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার, একটা আলনা, একটি ছোট স্টিলের আলমারি, আর ছোট

একটি কাঠের টেবিল। জানলা, দরজায়, ঘর আর আসবাবে  পুরানো স্মৃতি যেন মাখামাখি।

ছেলের বয়স বছর চল্লিশ। প্যান্ট ও একটি বিদেশি সার্ট পরে আছে।  সাতাত্তরে পা দেওয়া মা ও ছেলে কথা বলছেন। ছেলে খাচ্ছে, মা বসে পরিবেশন করে খাওয়াচ্ছেন।  ছেলের নাম দীপন।  দীপন সেনগুপ্ত।

মায়ের নাম গীতা। মায়ের পরনে ঘিয়ে রঙের শাড়ি।

চরিত্র --  মা ( গীতা, ছেলে দীপন, মাকে দেখাশোনা করবার মহিলা, বিনতা)


প্রথম দৃশ্য 

-----

 গীতা - বাবা অনেকদিন পর এলি, এই দুটো দিন থেকে যা না আমার কাছে।

       পোস্ত আর কাকরোল পুর আর দুটো দিই, আমি সব কালকে বিনতা কে দিয়ে আনিয়েছি বাজার থেকে

      জানি তুই আজ আসবি, তোর প্রিয় বিউলির ডাল আর পার্সে মাছটাও আনিয়ে নিলাম বিনতাকে দিয়ে।

দীপন- সেই দু বছর আগে তোমার হাতে খেয়েছিলাম, এসব পেলে আর কিছু খেতে ইচ্ছে করেনা মা।

গীতা - নারকেল নাড়ু, আর পাটিসাপটা, গুড়ের পায়েস  করেছি, সবগুলোই তোর প্রিয়, দু টো দিন আমার কাছে থেকে যা না বাবা আমার! কবে যে আবার আসবি কে জানে  !

দীপন - না তা সম্ভব নয় মা,  আমার খুব অসুবিধে হয়, আসলে এভাবে থাকা আমার অনেকদিনের অনভ্যাস।

গীতা - অভ্যাস নেই বলছিস,  তুই ঠান্ডা মেশিনের কথা,বলছিস বাবা।  জানিস তোর বাবাকে দেখতাম কারেন্ট নেই, হাতপাখাও নেই, ঘামছে, অথচ ভ্রুক্ষেপও নেই সবার সাথে হাসি মজায় কাটিয়ে দিচ্ছে। আমি তোকে

  তা বলবো না, তবু যদি দুটো দিন বুড়ী মায়ের কাছে থেকে যাস!

দীপন- হ্যা অভ্যাস তো একটা ব্যাপারই মা,তাছাড়া এ.সি. ছাড়া আমার ঘুম হয়না, সারারাত জেগেই

             কাটিয়ে দিতে হয়,  সকালে উঠে খুব অসুবিধা হয়.. থাক, ওসব বুঝবেনা মা!

গীতা- মনে আছে এই ঘরেই বৈশাখের  দুপুরে স্কুল থেকে এসে তুই খেয়ে দেয়ে শুলে, আমি কেমন

 ঘুম পাড়িয়ে দিতাম, তালপাতার পাখায় হাওয়া করে। আমার কাছে কত গল্প শুনতে শুনতে  ঘুমিয়ে পড়তিস তুই!

দীপন -- মা তুমি যে কি বলো, সে সব দিন তো কবেই চলে গেছে, ওভাবে গরমে শুয়ে আমার তো রাতে

     ঘুমই আসবেনা। ঘুম না এলে সকালে আমার মাথা ধরে যায়, সারাদিন সেই ভার থেকে যায়!

গীতা -- মনে আছে তুই তখন কলেজে পড়ছিস, ইঞ্জিনিয়ার হবি, পুজোর সময় তোর ছোটমাসী, মামাতো

 দাদারা এলো, তুই তো তখন ঘরে না শুয়ে রিনি, মতি, বিট্টু  ওদের সাথে ওই বাইরের বারান্দায় শোবার

জন্য জেদ করলি, পাখা ছিলনা, ঘুম কিন্তু হয়েছিল তোর!

দীপন - মা সে সব দিনের কথা আলাদা, তখন আমার গড়িয়াহাটে আর লন্ডনে ফ্ল্যাট ছিলনা,

   গাড়ি ছিলনা, সবই অভ্যেস মা, অভ্যেস।

গীতা - বছর দুই আগে একটা রাত তোকে দিদিভাই আর বৌমাকে নিয়ে পাশের ঘরটাতে

 থাকতে বলেছিলাম, তুই হোটেলে থাকলি ওদের নিয়ে, আমাকে বললি ফুটো ছাদের তলায়,

 ড্যাম্প ঘরে থাকো কি করে - আমি বলেছিলাম ভালোবাসার আর মায়ার জোরে থেকে যাইরে সোনা।

দীপ - উঃ মা, তুমি যে  , যাক অনেকদিন পর আলু পোস্ত, বিউলির ডাল খেলাম, আর কি সুন্দর

  পার্সে মাছের ঝাল, বার্গার, স্যান্ডউইচ খেতে খেতে.

 গীতা - কালকে তোকে পুকুরের শাপলার সেই চচ্চড়ি আর কই তেল করে খাওয়াবো, মনে আছে

এই দুটো জিনিস পেলে সব ভাতটাই ওই দিয়ে খেয়ে নিতিস বাবা।

দীপন - টুসি বলে দিয়েছে, রাতেই ফিরে যেতে, মেয়েটাকে আমি কাঁদাতে চাইনা, একদিন আমায় যদি

   না দেখে!

গীতা - দিদিভাই কে  হোটেলে না রেখে, নিয়ে এলিনা কেন? কতদিন দেখিনি, ক্লাস সেভেন হলোতো!

দীপন - হ্যা, ওরা আসতে চাইল না, আমিও জোর করলাম না, ফিরে যাব বলে।

বিনতা - এই তো দাদাবাবু!  পার্সে মাছটা ভাল ছিল তো, আমি বাজার থেকে এনেছি জানিনা কেমন!

দীপন -এসে গেছো বাহ, ভালই বাজার করেছো।  আর রান্নাটাও দারুন, সবগুলোই..।

বিনতা - জানেন, সবগুলোই মা করেছে, আমি শুধু বেটে, কেটে, ধুয়ে দিয়েছি

দীপন - কি বলছো বিনতা দি , কই মা কিছু বললো না তো! উঃ এত খেয়েছি উঠতেই কষ্ট হচ্ছে এখন

(উঠে পড়ে দীপেন)

বিনতা - আপনি খেয়ে যে  খুশি, এতেই মায়ের বুক ভরে গেছে, নিজের কথা তাই হয়তো বলতে চাননি।

(দীপনের মুখে হাসি, মায়ের চোখে জল, হাসি আর কান্না মিলেমিশে একাকার।)

গীতা - বিনতা তোর দাদাবাবু আজ থাকবেনা রে বিকেলেই  চলে যাবে!

বিনতা - কি বলছো মা, দাদাবাবু এই দু বচ্ছর পর এলেন, মায়ের কাছে দুটো দিন থাকবেনা

দীপন - না বিনতাদি, আজ আমাকে যেতেই হবে ( ফোন বাজবে, ফোন টা দেখে নিয়ে)

বিনতা - দাদাবাবু যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলবো! 

দীপন- বলো ।

বিনতা - আপনার যেমন টুসি  দিদিভাইয়ের জন্য মন কাঁদে,  মায়ের তো আপনার জন্য মন কেমন করে, বুক ফেটে যায়..  দু বছর, তিন বছর পর আপনাকে দেখে একটু হাল্কা হয়, তাই বলছিলাম, যদি থেকে যান.

 মায়ের পাশে সেই ছোটবেলার মতো শোবেন, গল্প করেন।

(হঠাৎ কেঁদে ওঠেন দীপন)


দ্বিতীয় দৃশ্য

-------

---দীপন- সেই সাতাশ বছর বয়স থেকে দৌঁড়ে বেড়ালাম, কিন্তু কি পেলাম! হ্যাঁ পেয়েছি, অনেক, অনেক টাকা

কিন্তু হারিয়েছি অনেক বেশি।

বিনতা - কি হারাবার কথা বলছেন দাদাবাবু?

দীপন - না, তুমি আমার  চোখ খুলে  দিয়েছো, বিনতা দি।  আমি যে সবথেকে দামী বস্তুটাই হারিয়ে ফেলছিলাম, মায়ের স্নেহ, ভালবাসা, আর অনেক অনেক আদর।

বিনতা -- হারায়নি কিছুই দাদাবাবু, সব আছে

দীপন- তুমি বলছো বিনতা দি, সব আছে, হারায়নি কিছু।  (শিশুর মতো হেসে ওঠে)

বিনতা- মা, ছেলের সম্পর্ককি নষ্ট হবার  হারিয়ে যাবার!  সব আছে, মাকে একবার ঠিক আগের মতো

মা বলে জড়িয়ে ধরুন না!

দীপন- মা বলে জড়িয়ে ধরে ( দু চোখ জলে ভরে যায়)

...(সমাপ্ত)...

Monday, August 15, 2022

ব্যাগ বিভ্রাট

ছবি  : ইন্টারনেট 

ব্যাগ বিভ্রাট  
সবিতা বিশ্বাস 
                                             
চরিত্রলিপি                                                                                                
১) সুমন – মনিকার স্বামী                              
২) মনিকা – সুমনের স্ত্রী                                
৩) তিতির—সুমন ও মনিকার কন্যা                   
৪) মিনার মা—গৃহপরিচারিকা                           
৫) সান্টু—বেকার যুবক
৬) রিমলি—সান্টুর প্রেমিকা
৭) মিঠাই—রিমলির বান্ধবী
৮) মিলন – মনিকার বাবা
৯) প্রতিভা – মনিকার মা
১০) রাকেশ—সুমনের বন্ধু

প্রথম দৃশ্য
 
{মধ্যবিত্ত বাড়ির ড্রয়িং রুম কাম ডাইনিং রুমের চায়ের টেবিলে সুমন আর মনিকা | সুমনের পরনে বারমুডা টি শার্ট আর মনিকা হাউসকোট পরে আছে | চা খাওয়া শেষে সুমন চামচ দিয়ে কাপ প্লেট বাজিয়ে ঝুমুর গান গাইছে, মনিকা হাতের মোবাইলে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছে জয়তী চক্রবর্তীর গলায় “বরিস ধরা মাঝে শান্তির বারি” |}
 
সুমন— লালে লাল পলাশবন/মন হল আজ উচাটন/মন মেতেছে মহুল ফুলের বাসে গো/আমার মন মেতেছে মহুল ফুলের বাসে/ও মোর সজনী, গোপনে সে আমায় ভালবাসে গো/গোপনে সে আমায় ভালোবাসে | তার ভালবাসার নাই ঠিকানা/যখন তখন আনাগোনা, থাকে আশেপাশে গো/থাকে আশেপাশে | মন মেতেছে মহুল ফুলের বাসে গো/মন মেতেছে মহুল ফুলের বাসে | ও সজনী গোপনে সে আমায় ভালবাসে গো/গোপনে সে আমায় ভালবাসে |
 
মনিকা—ওঃ সুমন! থামবে? এসব কি হচ্ছে? শান্তির বারির মধ্যে গোমূত্র দিয়ে দিলে! সকালবেলায় কি আজেবাজে গান গাইছ? কি যেন লাইনটা গাইলে—অ্যাই কি গাইছিলে? কি একটা ভালোবাসার কথা বলছিলে?
 
সুমন—(উচ্চস্বরে হেসে) ও হো—হো—শুনবে তুমি? দুর্দান্ত গান, মনি দুর্দান্ত গান--- গোপনে সে আমায় ভালোবাসে গো/ গোপনে সে আমায় ভালোবাসে |
 
মনিকা—(উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাতে কান চাপা দিয়ে) থামো, থামো বলছি | যত্ত সব আজেবাজে গান | এটা কোনো গান হল? কোথা থেকে এইসব সস্তা, চটুল গান আমদানি করো? নাকি এ তোমার মনের কথা | অ্যাই ঠিক করে বলতো কি ব্যাপার! ডুবে ডুবে জল খাচ্ছো নাকি? দাঁড়াও দাঁড়াও মনে পড়েছে সেদিন বলেছিলে তোমাদের অফিসে দারুণ স্মার্ট, সুন্দরী একজন জয়েন করেছে | তুমি কি তার কথা বলছো?
 
সুমন— (ঠক করে টেবিলে কাপ নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াবে) এটা কি বাড়ি? নাকি স্কুল? খালি জেরা আর জেরা, জেরায় জেরায় একেবারে জেরবার হয়ে গেলাম | রবিবার ছুটির দিন, চা খেতে খেতে দোলা রায়ের একটা ঝুমুর গান গাইছি সেটাও সহ্য হলনা | অবশ্য ঝুমুর গানের কথা তোমাকে বলে লাভ নেই কিছু | এসব বিষয়ে তোমার কোনো ধারণাই নেই | ধুস্ থাকো তুমি আরাম করে, চোখ বুজে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনো | আমি চললাম |
 
মনিকা— (চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে সুমনকে বলবে) চললাম, চললাম মানে? কোথায় চললে চাঁদু? খবরদার! সকালে আমার মাথাটা গরম করে দিওনা | বাজারটা কে করবে শুনি? দাঁড়াও, এক পা-ও নড়বে না | আমি ফর্দ আর ব্যাগ নিয়ে আসছি | (মনিকা ভেতরে চলে যাবে)
 
সুমন--- (স্বগোতক্তি করবে) নাঃ! কাটতে পারলাম না | একটা দিন ও নিজের মত করে এনজয় করতে পারলাম না |
 
মনিকা---- (ফর্দ আর দুটো বড় বড় ব্যাগ এনে সুমনের হাতে ধরিয়ে দেবে) এই নাও, যা লেখা আছে সব ঠিকমত আনবে |
 
সুমন— (ফর্দ খুলবে, বিরাট লম্বা ফর্দ দেখে চমকে উঠবে) ওরে বাবা! এ যে বিরাট লিস্টি | এটা কি বিয়েবাড়ির ফর্দ লিখেছো নাকি? আমি এত সব আনতে পারবোনা | রবিদাকে হোয়াটস আপ করে দাও, পাঠিয়ে দেবে | জাস্ট মাটনটা এনে দিয়ে যাচ্ছি | আমার কাজ আছে, অমিতদার বাড়ি যাবো |
 
মনিকা— (মুখ ভেঙ্গিয়ে) বা, বা, বা বেশ বললে! পারবো না | আর রবিদার কথা বলছো? তুমি কি ভেবেছো আমি কল করিনি? রবিদার মা বাথরুমে পড়ে গেছে, তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি করছে তাই দোকান খোলেনি |
বাজার তাহলে কে করবে? আমি? কান খুলে ভালো করে শুনে নাও, যেখানে খুশি সেখানে যাও কিন্তু তার আগে বাজার করে তবেই যাবে | তুমি ভালো করেই জানো, আমার কথা না শুনলে কি হবে?
 
সুমন— কি হবে মানে? কি হবে? তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো নাকি?  
ওই একটা কাজই তো পারো, কিছু হল কি না হল ব্যাগ গুছিয়ে বাপের বাড়ি হাঁটা |
 
মনিকা—না মশাই, আজ আর বাপের বাড়ি যাচ্ছি না | আর লাঞ্চ করতে হোটেলেও যাচ্ছি না | আজ তোমার শ্বশুর, শ্বাশুড়ি আসছেন, অতএব শ্বশুরের সুপুত্র লিস্ট মিলিয়ে চটপট বাজারটা করে আনো | অবশ্য যা ডোজ দিলাম
(হেসে গড়িয়ে পড়বে)  না গিয়ে উপায় আছে? তোমার দৌড় আমার জানা আছে সুমন বাবু! বলে কিনা বাজার যাবেনা! হি—হি—হি--- (হাসি)
(রাগে গজগজ করতে করতে সুমন ব্যাগ আর ফর্দ নিয়ে বেরিয়ে যাবে) (নেপথ্যে বাইক স্টার্ট দেবার শব্দ)
সুমনা--- (স্বগোতক্তি) কিন্তু এত বেলা হল মিনার মা তো এখনো কাজে এলোনা! রবিবার দেখে সেও কি ডুব দিল নাকি? আর একটু পরেই তিতিরকে নিয়ে মা বাবা চলে আসবে | কিচ্ছু কাজ হয়নি, জলখাবার করতে হবে | ধ্যাত্ ভাল্লাগেনা | (মঞ্চ থেকে চলে যাবে)
 
(দ্বিতীয় দৃশ্য)
 
{মনিকার বাবা মা মিলন বাবু আর প্রতিভা দেবী নাতনি তিতিরকে (পাঁচ বছর বয়স) নিয়ে বড় বড় দুটো ট্রলি ব্যাগ নিয়ে মঞ্চে{গ্রিল ঘেরা বারান্দা} ঢুকবে |}
 
তিতির— (হাতে একটা বার্বি ডল) মা—মা—ও মা, মা মা---আ---
 
মনিকা— (ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরোবে, নাইটিতে হাত মুছতে মুছতে ) ও মা! তোমরা এসে গেছো? (মা বাবাকে প্রণাম করবে) |
 
 তিতির—আমিও এসেছি | তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছো না? (মুখ ঘুরিয়ে থাকবে)
 
মনিকা—তাইতো, তাইতো! আমি তো দেখতেই পাইনি | কোথায়-- কোথায় আমার তিতু সোনা! (কানামাছি খেলার মত ভঙ্গি করে মেয়েকে জড়িয়ে ধরবে |) এইতো আমি পেয়ে গেছি আমার সোনা মাকে | 
 
তিতির—আমি কথা বলবো না তোমার সঙ্গে, আমার বেবিকে একটুও আদর করলে না তুমি | তোমার সঙ্গে আড়ি-আড়ি-আড়ি |
 
মনিকা—কই কই কই তোমার বেবি? কি সুন্দর! এটা কে দিয়েছে তোমায়? দিদুন? (তিতির মাথা নাড়বে) উ—উ—উ—উম মা | এই তো কত্ত আদর করে দিলাম তোমার বেবিকে | এবার তুমি খুশি হয়েছ? বেবিকে নিয়ে একটু খেলা করো, আমি দিদুন-দাদানের সঙ্গে কথা বলি | (তিতির মায়ের হাত ছাড়িয়ে মঞ্চের একপাশে বসে পুতুল খেলবে)
 
প্রতিভা—--মনি সুমন কই রে! তাকে তো দেখতে পাচ্ছিনে |
 
মিলন--- দেখতে পাবে কি করে? দেখো হয়তো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে | যা কুঁড়ে জামাই তোমার! তখন পই পই করে বলেছিলাম, ও ছেলে একটা মাকাল ফল, কোনো গুণ নেই, তা তোমরা মা-মেয়ে জামাইয়ের রূপ দেখে পাগল হয়ে গেলে | এখন বোঝো!
 
প্রতিভা— খবরদার! একদম বাজে কথা বলবে না | বুড়োর কথার ছিরি দ্যাখো, বলে কিনা মা-মেয়ে জামাইয়ের রূপ দেখে--- মাগো মা! এ কথা শোনাও পাপ |
 
মিলন--- পাপ? পাপের কি হল? বলোনি, বলোনি তুমি? আহা! কি সুন্দর কার্তিকের মত ফিগার!
 
প্রতিভা—হ্যাঁ বলেছিলাম, বলেছিলাম | তা ভুলটা কি বলেছিলাম শুনি! জামাই আমার রূপে কার্তিক | তুমি যখন আমায় বিয়ে করেছিলে অসুরের মত চেহারা ছিল তোমার | আমার হাতে পড়ে তবে তো শ্বশুর হলে!
 
মিলন--- অসুর থেকে শ্বশুর! মাঝখানের চ্যাপ্টারগুলো বেমালুম গায়েব করে দিলে! এই—এই—জন্যে তোমার সঙ্গে কোনদিন---
(তিতির দাদান-দিদুনের ঝগড়া শুনে ভয় পেয়ে কেঁদে মাকে জড়িয়ে ধরবে )| (মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মনিকা আদর করবে)
 
মনিকা--- আঃ মা | থামো তোমরা, এসেই শুরু করে দিলে | সুমন মোটেও পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে না, বাজারে গেছে | তোমরা এখন চলো, হাত মুখ ধুয়ে জলখাবার খাবে | লুচি আলুরদম করেছি | আর বাবা তোমাকে বলছি আগেরবারের মত পালাই পালাই করবে না | দু’দিন থাকবে |
 
 মিলন— দু’দিন কিরে! এবার তো আমরা থাকবো বলেই এসেছি | দেখছিস না, কতগুলো লাগেজ গুছিয়ে এনেছে তোর মা |
 
মনিকা--- থাকবে মানে? ক’দিন?
 
মিলন--- কদিন কিরে? বলতে পারিস বছরের বেশিরভাগ সময়টা তোদের সাথে কাটাবো | একেবারেই যে বাড়ি যাবোনা, তা নয় | বাড়িতে ভাড়া বসিয়েছি, খোঁজ খবর না করলে তারা চেপে বসবে | জবরদখল করাও বিচিত্র নয় | তাই--- মাঝে মাঝে---
 
প্রতিভা— হ্যাঁ রে মনি, এবার আমরা সব গুছিয়ে এনেছি | প্ল্যান প্রোগ্রামও রেডি | তোর বাবা বলল, তোদের দুটো ঘর বলে আমাদের এখানে থাকাই হয়না | একটাতে তোরা থাকিস, আর একটাতে তিতির দিদিভাইকে পড়াতে আসে, ছবি আঁকাতে, নাচ গান শেখাতে | তাই—
 
মনিকা—(হতভম্ব হয়ে) তাই? তাই কি করবে? কি প্ল্যান করেছো?
 
মিলন— তাই এবার তোদের শোবার ঘর লাগোয়া আর একটা ঘর তৈরী করবো | দুটো ঘরের মাঝখানে দরজা থাকবে | তাহলে আর ব্যালকনি দিয়ে তোদের ঘরে যেতে হবেনা | কাল থেকেই রাজমিস্ত্রি আসবে | প্ল্যান, এস্টিমেট সব রেডি | সুমনকে কিচ্ছু করতে হবেনা | অফিস থেকে পারসোনাল লোন তুলে আমার হাতে দিলেই হবে | কোনো ব্যাপারে তোদের মাথা ঘামাতে হবেনা | তোদের কিচ্ছু চিন্তা করতে হবেনা | তোর মা যতই আমাকে বুড়ো বলুক আমি এখনো সুমনকে বলে বলে গোল খাওয়াতে পারি | বুঝলি? এই দ্যাখো, হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলি কেন মনি? নে চল চল | ওদিকে লুচি ঠান্ডা হয়ে গেল! চলো দিদিভাই, তাড়াতাড়ি চলো | (নাতনিকে নিয়ে দাদু দিদা মঞ্চ থেকে চলে যাবে)
 
মনিকা— (মাথায় হাত দিয়ে) হা ভগবান! বাবা এসব কি বলছে? আমাদের ঘরের পাশে, আবার মাঝখানে দরজা! ইমপসিবল, এটা হতেই পারেনা | সুমন আসার আগেই বাবার প্ল্যান বাতিল করতে হবে, নাহলে বাবা সুমনকে ঠিক রাজি করিয়ে ফেলবে | সে তো আবার শ্বশুরকে অসুরের মতই ভয় করে | সত্যি সত্যি যদি বাবা ঘর করে আর ওরা এখানে পার্মানেন্টলি থাকে তাহলে বাবা-মাকে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আমাদের অন্য কোথাও চলে যেতে হবে | ওঃ কি যে করি! আমার মাথায় কিচ্ছু আসছে না | সুমন যে কেন এখনো আসছে না! ( মঞ্চ থেকে চলে যাবে)
 
(তৃতীয় দৃশ্য)
 
{বাজারের চায়ের দোকানে ভাঁড়ে চা খেতে খেতে সুমন, রাকেশ গল্প করছে}
 
রাকেশ— সত্যি এবারের প্যারালিম্পিক্স দারুণ এনজয় করেছি | ভারত অতগুলো পদক পাবে জাস্ট ভাবা যায়নি | সরকারের উচিত ক্রিকেট ক্রিকেট না করে এদিকে একটু বেশি করে নজর দেওয়া |
 
সুমন— একদম ঠিক বলেছ রাকেশদা | গ্রামের কত ছেলে মেয়ের প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও মাঝপথে সব বন্ধ করে দিতে হয় শুধুমাত্র অভাবের জন্য | আমাদের শিলিগুড়ির মেয়েটা! কি ট্যালেন্ট! অথচ অফ সিজনে চা বাগানে কামিন খাটে | এই করলে কি কনটিনুইটি থাকে?
 
রাকেশ—হান্ড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট বলেছিস | তুই অত দূর যাচ্ছিস কেন? আমাদের বাজারেই মাছ বিক্রি করতো – কি যেন নাম--- আচ্ছা ছাড়, ওসব কথা থাক এখন, আমাদের সেই প্ল্যানটার কি হলো?
 
সুমন—কোনটা বলোতো? হ্যাঁ—হ্যাঁ মনে পড়েছে | হা-হা-হা-- অপারেশন মন্দারমণি | সে তো দেরী আছে, কিন্তু একটা প্রবলেম —
 
রাকেশ— সুমন, নো-নো, ওসব প্রবলেম ট্রবলেম গুলি মারো | বাড়িতে এই ট্রিপ নিয়ে বৌয়ের সাথে নো ডিসকাসন | সারাক্ষণ ল্যাংবোটের মত লেপ্টে আছে সব | এবার শুধু আমরা চারজন, আমি, তুই, অর্ণব, নিলাদ্রী | একদম কলেজ লাইফের মত, খানা পিনা একেবারে জমিয়ে মস্তি! হা—হা—হা—
 
সুমন— এই রাকেশদা, খুব দেরী হয়ে গেল | আমি যাই – বাজারটা এখনো কমপ্লিট হয়নি |
 
রাকেশ --- আরে যাবি—যাবি, অত তাড়া কিসের? এই সুমন, দেখ—দেখ ওটা সান্টু না? সকালেই কি মাঞ্জা দিয়েছে মাইরি! দাঁড়া ডাকি, এই সান্টু--- সান্টু-----
 
সুমন--- রাকেশদা আমাকে ছেড়ে দাও প্লিজ | আজ সত্যিই একটু তাড়া আছে |
 
রাকেশ--- কিরে, শ্যালিকা আসছে নাকি বাড়িতে? ওহ্ তোর তো আবার কপাল খারাপ, তোর বউয়ের কোনো বোন নেই | বুঝলি সুমন, শ্যালিকা হল ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ | ফ্রিতে চার্ম বেশি | (নিজের রসিকতায় নিজেই হাসবে)
 
সান্টু— (বড় একটা প্যাকেট নিয়ে মঞ্চে আসবে) রাকেশদা কিছু বলবে? আজ একটু ব্যস্ত আছি | বৌদিকে বোলো আমি নেক্সট উইকে কাজটা শিওর করে দেবো |
 
রাকেশ— আচ্ছা, আচ্ছা সে বলে দেব’খন | কিন্তু তোর কি ব্যাপার! সকালেই এত মাঞ্জা দিয়ে চললি কোথায়? ব্যাগে কি আছে রে? হেব্বি সেন্টু বের হচ্ছে! (সান্টুর চুলে হাত দিয়ে) পুরো শারুখ খান লাগছে মাইরি | কিন্তু কিছু একটা চেপে যাচ্ছিস মনে হচ্ছে | লগতা হে কুছ গড়বড় হ্যায় |
 
সান্টু— কি যে বলোনা রাকেশদা! গড়বড় আবার কি! সুমনদা যাবে? চলো তোমার বাইকেই যাই | (ব্যস্ত হয়ে চলে যাবে)
 
সুমন—ঠিক আছে চল | এই নে চাবি, গাড়ি স্টার্ট দে | চলি গো, রাকেশদা |
 
রাকেশ— যাবি? কিন্তু বুঝলি সুমন, কেস ঠিক লাগলোনা | ডাল মে কুছ কালা হ্যায় | আরে রেশন ডিলার ঘনশ্যাম গোলদারের মেয়েটাকে কব্জা করেছে ব্যাটাচ্ছেলে | ওই রিমলির সব ভালো, একটু তোতলা আছে এই যা | জপিয়ে জাপিয়ে বগলদাবা করতে পারলেই রাজত্ব রাজকন্যা সব ওর | ব্যাটা কোটি টাকার লটারি পেয়ে যাবে | কিন্তু এত সকালে কোথায় যাচ্ছে কোথায়? নাঃ পাত্তা লাগাতে হচ্ছে | গন্ধটা ঠিক সুবিধের মনে হচ্ছে না | তোর বাইকেই তো যাচ্ছে, নোটিশ করিস |  
 
সুমন— করবো, করবো | তুমি পাত্তা লাগাও রাকেশদা, জানতে পারলে আমায় জানিও | আমি চললাম | বাড়িতে শ্বশুর শ্বাশুড়ি আসবে |
(মঞ্চ থেকে দু’জনেই চলে যাবে)
 
(চতুর্থ দৃশ্য)

(মনিকার শোবার ঘর | স্নান করে শাড়ি পরেছে, চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে মায়ের সঙ্গে কথা বলছে | তিতির একগাদা পুতুল বিছানায় ছড়িয়ে খেলা করছে)
 
মনিকা— দেখলে মা তোমার জামাইয়ের কান্ডটা দেখলে? এতখানি বেলা হল, বাবুর এখনো বাজার সেরে বাড়ি ফেরা হলনা | পুরো বাজার উঠিয়ে আনলেও তো এত সময় লাগবেনা |
 
প্রতিভা— আমিও তো তাই ভাবছি, কি অত বাজার করছে! এত বেলা হল, ছেলেটা টিফিন করেনি | এরপরে পিত্তি পড়ে যাবে তো! মনি সুমন কি বাইক নিয়ে বেরিয়েছে?
 
মনিকা— হ্যাঁ, তা তো গেছেই | বাইক ছাড়া বাবু এক পা চলতে পারেন না | আসলে পক্ষীরাজে না চড়লে হিরো হবেন কি করে? মাঝে মাঝে পাড়ার সুন্দরী দিদি বৌদিদের লিফ্ট দিতে হবেনা?
 
প্রতিভা— মনি এসব কি হচ্ছে? মুখটাকে লাগাম দাও | পুরুষমানুষের পিছনে সারাদিন খ্যাঁচ খ্যাঁচ করতে নেই, তাহলে তার মন তো অন্যদিকে যাবেই | তারপরে যদি আবার সুমনের মত হ্যান্ডসাম পুরুষ হয়!
 
মনিকা— মা—আ--তুমিও মুখে লাগাম দাও | বাবা ঠিকই বলে মাঝে মাঝে তুমি ভুলে যাও সুমন তোমার জামাই, ছেলের মত |
 
প্রতিভা— ছেলের মত কি রে! ছেলে বল, কিন্তু যাই বলিস মনি আমার সুমনের জন্যে খুব চিন্তা হচ্ছে | মার্কেটে যা ভীড়! তোর আক্কেলটা কি বলতো, ছেলেটাকে এতক্ষণ একটা ফোন করিসনি?
 
মনিকা—কাকে ফোন করব মা? ফোন নিয়ে গেলে তো? সকালবেলাতেই আমার সঙ্গে ঝগড়া লাগিয়ে ফোন না নিয়েই বাবু গজগজ করতে করতে বাইকে স্টার্ট দিলেন |
 
প্রতিভা—তোকে কতবার পইপই করে বলেছি, কোথাও বেরোনোর সময় ঝগড়া করবিনে, পেছনে ডাকবিনে | তা সেসব কথা তো তোর কানেই যায়না | এখনো এলোনা, ছেলেটা আবার অ্যাক্সিডেন্ট ফেন্ট করে বসলো না তো!
 
মনিকা— (চীত্কার করে উঠবে) মা---- থামো | এসব কি বলছো তুমি?
 
মিনার মা— (মঞ্চে ঢুকবে) আরে বাবা, ওসব কিচু হয়নিকো | দাদাবাবুকে দেখলাম কোতায় যেন যাচ্চে, গাড়ির পেছনে ওই ছোড়া সান্টু বসে আচে |
 
মনিকা—দেখলে মা দেখলে, তুমি বলছিলে কি না কি হয়েছে | একবার বাইরে বেরোতে পারলেই হয়, আড্ডা, আসর বাসর করে তবে তিনি বাড়ি আসবেন |
 
মিনার মা— (মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসবে) ও কি বললে গো বৌদি? বাসর করলি তুমার সাতেই করবে, অন্য জাগায় যাবে কেন? আমার দাদাবাবুর কি চরিত্তির খারাপ নাকি? তাই না মাসিমা, কতাডা ঠিক বলিনি?
 
মনিকা— হয়েছে, আর মাসিমাকে সাক্ষী করতে হবেনা | বেলা দশটায় এসে আর ডায়লগ দিতে হবেনা? তোমাকে যে কাল অত করে বলে দিয়েছিলাম তিতিরকে নিয়ে মা বাবা আসবে,একটু আগে এসো | সে কথা বুঝি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আর এক কান দিয়ে বের করে দিয়েছো?
 
প্রতিভা— সত্যি মিনার মা, গেরস্ত বাড়িতে এত বেলা পর্যন্ত বাসি ঘরদোর ফেলে রাখলে অমঙ্গল হয় | এক ঘন্টা আগে আসতে পারোনা!
 
মিনার মা—  জানি মাসিমা সপই জানি | কিন্তু আমার তো দুটোই হাত না কি? ভগমান তো আমারে মা দুগ্গার মত দশটা হাত দেয়নিকো | আবার এক বাড়ি কাজ করলি তো পেট চলেনা | পাঁচ বাড়ি খেটি খেতি হয় |
 
সুমনা—পাঁচ বাড়ি? মিথ্যে কথা বোলোনা মিনার মা | আট বাড়ি কাজ করো তুমি | দিনদিন কাজ বাড়িয়েই যাচ্ছ | সামাল দিতে পারছোনা, তবুও |
 
মিনার মা--- দেখো বৌদি, পিন করি কতা বোলোনি | মাগনায় তো তোমরা আমারে কেউ মাইনে দাওনা |  আমার ক্ষ্যামতা থাকলি আট কেন ষোলো বাড়িতে কাজ করবো | তুমরা কি আমারে মাইনে বেশি দিবা? তা য্যাকন দিবা না ত্যাকন অত কতা কেন? তুমাদের না পুষায় অন্য লোক দেকে নাও | মিনার মা অত কতা শুনতি রাজি না, এই আমি পস্কের করে বলে দিলাম | গতর থাকতি আবার কাজের অভাব?
 
মনিকা— আঃ—মা তোমার অত কথা বলার দরকার কি? একটু চুপ করে থাকতে পারোনা! দেখছো, আমি কথা বলছি | মায়ের কথায় কিছু মনে কোরোনা মিনার মা | মায়ের বয়স হয়েছে, মাথার ঠিক নেই | (গলায় মধু ঢেলে) মিনার মা তোমার জন্য লুচি আলুরদম রেখে দিয়েছি, আগে খেয়ে নাও তারপরে কাজে হাত দাও |
 
মিনার মা— ও তুমি একন রেকে দাও বৌদি, যাবার সময় একটা টিফিন বাটি করে দিয়ে দিও, ছেলের জন্যি নে যাবো | ছেলেডা নুচি খেতি খুপ ভালবাসে | দুটো রসোগোল্লাও দিয়ে দিওখন | মাসিমা কি আর খালি হাতে মেয়ের বাড়ি এয়েচে? নিশ্চয় বড় হাঁড়ি নিয়ে এয়েচে | মেসোমশাইয়ের তো আবার নজর খুপ উঁচু | (কোমরে কাপড় জড়াতে জড়াতে) আমি যাই, আগে ঘরগুলো পস্কের করেনি | 
 
প্রতিভা—(চাপা গলায়) দেখলি মিনু তোর এই মিনার মা কেমন ধড়িবাজ | কেমন কায়দা করে মিষ্টির কথাটা বলল! আর তুই আমার নামে বানিয়ে বানিয়ে কতগুলো কথা বললি ওকে | মা বুড়ো হয়ে গিয়েছে, মাথার ঠিক নেই | নিজের মাকে কাজের লোকের সামনে ছোট করতে তোর একটুও বাঁধলো না মনি? মিনার মা আমার সম্পর্কে কি ভাবলো বলত?
 
মিনার মা— (চলে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়াবে) আমারে কিছু বলচ মাসিমা?
মনিকা— (নকল হাসি হেসে) না, না কিছু বলছে না, মা বলছিল মিনার মা খুব পরিষ্কার কাজ করে | থালা-বাসন এমন ঝকঝক করে যে মুখ দেখা যায় | বলছি তোমার ছেলে এখন কেমন আছে গো? সেদিন বলছিলে পেটের ব্যথায় রাতে ঘুমোতে পারেনি |
 
মিনার মা— ভালো আছে বৌদি, ভালো আছে | তুমাদের আশিব্বাদে একন ভালো আচে | আর বোলোনি, ওই নেতুর পাল্লায় পড়ে তেঁতুল গুলা জল, ওই ফুচকা গো, তাই খেয়ে এমন হয়িচিল | ছেলি খেতি চায়নি তাও নেতু জোর করি—কি বলবা বলো, পাড়ার ছেলে কিছু বলাও যায়না | সবার সাথে সদ্ভাব রেকে চলতি হয়! তবে আমিও নেতুর মাকে ছেড়ি দিই নি | চাড্ডি কতা শুনিয়ে দিইচি | বলে কিনা—আমার ছেলের দোষ! ও- মা-গো- উনার নেতু একেবারে ধুয়া তুলসীপাতা! সেসব কতা বলতি গেলি সাতকাহন | যাই আমি কাজ সেরেনি, দেরী হলি উদিকি পাবলোর মা খচে বোম হয়ে যাবিনি | (চলে যাবে)
প্রতিভা— মনি আজ কি রান্না করবি, চল আমি গিয়ে সব্জিগুলো কেটে দিইগে |
তিতির—দিদুন আমিও মাকে হেল্প করবো |
প্রতিভা—তুমিও করবে? সোনা আমার | চল, চল আমরা সবাই যাই |
 
(সবাই মঞ্চ থেকে চলে যাবে)
 
(পঞ্চম দৃশ্য)
 
(ড্রয়িংরুম-- ঘেমে নেয়ে সুমন বাজার থেকে দুটো ব্যাগ নিয়ে ফিরবে)
 
সুমন— মনিকা—মনিকা—ও মাই ডার্লিং—দেখো আজ তোমার ফেভারিট জিনিস এনেছি |
 
প্রতিভা— (এক গ্লাস নুন চিনির জল এনে) বোসো বাবা বোসো, ফ্যানের তলায় বসে খানিক জিরিয়ে আগে এই নুন চিনির সরবতটা খেয়ে নাও বাবা | ইস্ একেবারে ঘেমেনেয়ে গেছে ছেলেটা! বাইরে যা রোদ্দুর! (আঁচল দিয়ে সুমনের মুখ মুছিয়ে দেবে)
 
মনিকা— মা! ও কি করছো? তোমার আঁচল দিয়ে ওর মুখ মুছিয়ে দিচ্ছো কেন? সরো, সরো আগে আমাকে  মাটনের প্যাকেটটা নিতে দাও, ধুয়ে দই দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখি | (ব্যাগ ঘাঁটবে, ফুলের মালা পাবে) এসব কি এনেছ সুমন? মাটন কই? ও মা মাগো! তোমার জামাইয়ের কান্ড দেখো, পাঠালাম মাটন আনতে, উনি সকালেই গোড়ের মালা নিয়ে হাজির |
সুমন—কি যা-তা- বলছো মনি? আমি মালা আনতে যাবো কেন? আমি কি বিয়ে করতে যাচ্ছি যে মালা টোপর কিনে আনবো?
মনিকা--- ও মাগো আমার কি হবে গো? এ তো সত্যি সত্যি টোপর নিয়ে এসেছে ---(কান্না)
সুমন—  (জিভ কেটে) ও হো-হো- দারুণ ভুল হয়ে গেছে | মনি, মনি প্লিজ আমার কথাটা শোন একবার—
 ( বিয়ের বেনারসি পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে রিমলি মঞ্চে আসবে, সঙ্গে ওর বন্ধু মিঠাই)
মিঠাই— সুমনদা মালা টোপর তুমি নিয়ে এসেছো?
প্রতিভা—  এই মেয়ে, তুমি কে? তোমার সঙ্গে এই মেয়েটাই বা কে? মুখটা অমন করে ঢেকে রেখেছে কেন? মালা টোপর মানে?
 
মিঠাই— ও রিমলি, আমার বন্ধু | আসলে আজকে ওর বিয়ে তো তাই লজ্জা পাচ্ছে |
 
মনিকা--- বিয়ে? একেবারে বিয়েতে পৌঁছে গেছো? ও বাবা গো, আমার কি হবে গো—ওরে তিতির রে, তোর বাবা বিয়ে করছে রে!
 
মিঠাই—আপনি ভুল বুঝছেন বৌদি, রিমলির বিয়ে ঠিকই, তবে বিয়েটা---
 
মনিকা—বিয়েটা--- বলো থামলে কেন? বিয়েটা? (রিমলির মুখের ঘোমটা সরিয়ে দেবে) কা-র কা—র সঙ্গে বিয়ে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না | তোমার বিয়ে, টোপর মালা আমাদের বাড়ি | এই রিমলি ঠিক করে বলো কার সঙ্গে বিয়ে?
 
রিমলি— (তোতলাবে) ব—ব—ব—লছি বৌদি, ব---ব---ব--- লছি | স—স---স----স---
 
মনিকা--- (কাঁদবে) ও মাগো আমার এ কি সর্বনাশ হল গো! শুনলে মা, তুমি শুনলে সুমন আবার বিয়ে করছে | এই যে সারাক্ষণ জামাইয়ের সুখ্যাতি করো, দেখলে তো তোমার জামাইয়ের পেটে পেটে কি শয়তানি বুদ্ধি! তিতির রে তোর বাবার আবার বিয়ে | ও মা—গো---
 
সুমন--- মনি কি হচ্ছে এসব? থামো, থামো বলছি | সিন ক্রিয়েট কোরোনা |
 
তিতির--- (হাততালি দেবে) কি মজা! কি মজা! বাবার বিয়ে! কি মজা! ও মা বাবার বিয়ে দেখবো |
মনিকা--- (ঠাস করে মেয়ের গালে চড় মারবে) বাবার বিয়ে দেখবে? করাচ্ছি বিয়ে! (সুমনের কলার চেপে ধরবে)
সান্টু— (হাতে ব্যাগ নিয়ে ঢুকবে) সুমনদা, কি কেলো মাইরি! --- এ কি বৌদি সুমনদাকে মারছেন কেন? কি করেছে সুমনদা?
মনিকা— কি করেছে? যা করেছে তা ভালই করেছে | (টোপর মালা হাতে নিয়ে) তোমার সুমনদা মাটন না এনে এগুলো এনেছে | তিনি বিয়ে করবেন ওই রিমলিকে | তা, তুমি কি বরযাত্রী?
মিঠাই -- না—না এসব কি বলছেন বৌদি? আপনি বুঝতে ভুল করছেন? রিমলির বিয়ে স—স—স—
রিমলি—আ—আ--- আমিও তা---তা---তাই বলছি, আমার বিয়ে স---- স---- স----
সান্টু--- সান্টুর সাথে | আমার সাথে রিমলির বিয়ে | মিঠাই তুমিও রিমলির সাথে থেকে তোতলা হয়ে গেলে?
মনিকা—  ম—ম—ম----মানে?
সুমন— মানে আবার কি? ব্যাগ বদল হয়ে গেছে | সান্টু আমার বাইকে উঠেছিল, ওকে মন্দিরে নামিয়ে দিয়ে আসার সময় ব্যাগ পাল্টে যায় | আর না বুঝে, না জেনে যত্ত সব উল্টো পাল্টা ব্লেম |
প্রতিভা—আমিও তো তাই—ই বলছি, সুমন আমার অমন ছেলেই নয় |
সান্টু--- আপনি থামুন মাসিমা, আমি বুঝিয়ে বলছি |                       
সুমনদা আমাকে মন্দিরে নামিয়ে চলে যাবার সময় আমিই ভুল করে অন্য ব্যাগ নামিয়ে নিয়েছিলাম | সুমনদা চলে যেতেই খেয়াল হলেও কিছু করার ছিলনা | সুমনদা বোধ হয় ফোনটা বাড়িতে ফেলে গেছে, ফোনেও যখন পেলাম না তখন মিঠাইকে ফোন করে বলি রিমলিকে নিয়ে আসার সময় যেন সুমনদার কাছ থেকে মালা টোপর নিয়ে আসে | মাইরি বৌদি, আপনি পারেনও বটে! টোপর আর মালা দেখেই ধরে নিলেন সুমনদা বিয়ে করছে | মিঠাইয়ের ফোন পেয়ে না এলে তো বিরাট কিচাইন হয়ে যেত | নিন আপনার ব্যাগ নিন বৌদি |
রিমলি—আ---মি ---ও---তো তাই বলছি | ব-ব-ব—দি পা-আ-ত্তাই দিচ্ছেনা |
সান্টু--- (রিমলির হাত ধরে) এবার থেকে আর তোমায় কোনো কথা বলতে হবেনা রিমু ডার্লিং, সব কথা আমিই বলবো | চলো মিঠাই, কুইক | (তিনজন চলে যাবে)

ষষ্ঠ দৃশ্য

(সুমন আর মনিকার শোবার ঘর) (মনিকা লুচির প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে, সুমন মুখ গোমড়া করে চেয়ারে বসে আছে )
সুমন— বিরক্ত কোরোনা মনিকা, আমি খাবোনা | আমার খিদে নেই |
মনিকা—মনিকা! তুমি আমায় মনিকা বলে ডাকছো? আমি তো ক্ষমা চাইলাম, বললাম আমার ভুল হয়ে গেছে | এমন ভুল আর কক্ষনো হবেনা | প্লিজ খেয়ে নাও সোনা, তুমি খাওনি বলে আমিও তো এতক্ষণ না খেয়ে আছি | (একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে প্লেট থেকে খাইয়ে দিতে যাবে এই সময় দরজা খুলে ঢুকবে মিনার মা, পিছন পিছন সান্টু, রিমলি, মিঠাই, প্রতিভা, মিলন, তিতির)
সান্টু— আমাদের বাঁচাও সুমনদা, রিমলি বাড়ি থেকে পালিয়েছে সেটা ওর বাড়ির লোক জেনে গেছে | মন্দিরের পুরোহিতকে কিডন্যাপ করেছে রিমলির বাবা | আমাদের বিয়ের কি হবে? এরপরে একবার যদি রিমলির খোঁজ পায় তাহলে আর কোনোদিন আমি ওকে পাবোনা | প্লিজ বৌদি, যেভাবে হোক আমাদের বাঁচান |
মনিকা--- আমি মানে আমরা কি করবো? তোমাদের জন্য আমার সংসার ভাঙতে বসেছে | পুলিস জানতে পারলে তোমাদের সাথে আমাদেরও থানায় নিয়ে যাবে | কে জানে এতক্ষণ হয়তো জেনেই গেছে |
সান্টু--- থানায় নিলেই হল? আমরা দু’জনেই অ্যাডাল্ট | ইয়ার্কি নাকি?
মিলন—তা তোমরা দু’জনেই যখন অ্যাডাল্ট রেজিস্ট্রি করোনি কেন? তাহলে এসব ঝামেলা হতনা | পুলিস তোমাদের চুলের ডগাও ছুঁতে পারতো না |
প্রতিভা--- আমি এটাই বুঝতে পারছিনা, তোমরা আমার জামাইকে এর মধ্যে জড়াচ্ছ কেন? প্রেম করার সময় কি তাকে বলে প্রেম করেছিলে?
রিমলি—না, না আ---আ--- মি এর আগে কো—কো—ক---
সান্টু—চুপ করনা ডার্লিং, তোমাকে আর কোঁকোর- কোঁ করতে হবেনা |
রিমলি--  তু—তু—তুমি আমায় মোরগ বললে? এই বিয়ে ক্যান—ক্যা---ক্যানসেল | চল মিঠাই বা—বা—বাড়ি চল | (মিঠাইয়ের হাত ধরে টানবে)
সান্টু--- (রিমলির হাত ধরে) রিমলি—রিমলি, আমার ইমলি সোনা ফুচকা তেঁতুল জল, অত রাগ করতে নেই সোনা | তোমার বাবা আমাদের ধরতে পারলে কচুকাটা করবে | এখন ভাবো পুরুত কি করে পাবো |
মনিকা—বেরিয়ে যাও—এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও | তোমাদের জন্য আমার বিয়ে ভেঙে যেতে বসেছে, আর আমার সামনে রোমান্টিক সিন হচ্ছে?
প্রতিভা--- একদম ঠিক বলেছিস মনি | বের করে দে এদের | আমার জামাই-মেয়ের সংসার ভেঙে তাদের চোখের সামনে সোহাগ হচ্ছে?
সান্টু—(হাতের মুঠি পাকিয়ে) দেখুন মাসিমা, এখন মটকা গরম হয়ে আছে, এর মধ্যে উল্টো-পাল্টা কমেন্ট করবেন না | রিমলি এখানে থাকলো, আমি সুমনদার বাইক নিয়ে বেরোচ্ছি পুরুত আনতে |
মিলন--- (ধুতি পরে পইতে গলায় দিয়ে আসবে) কোথায় চললে? বাইরে বেরোলেই পুলিস খপ করে ধরবে | বোসো এখানে, মনি দুটো আসন পেতে দে | এই মিলন সান্যাল থাকতে বিয়ে হবেনা মানে? বিয়ে আমি দেবো | তোমার ওই মন্দিরের পুরুতের বদলে মন্ত্রটা ঢের ভালো জানি | মনির মা, হাঁ করে দাঁড়িয়ে না থেকে উলু দাও |
প্রতিভা—দেখ মনি, তোর বাবার কান্ড দেখ | বুড়োর ভীমরতি হয়েছে |
মিনার মা--- তুমি চুপ করো তো মাসিমা, দেকচ দু- দুটো জেবন নিয়ে টানাটানি চলচে! কে বাঁচে, কে মরে তার ঠিক নেই | একন অত কতা ভাবার সময় আছে নাকি? মেসোমশাই ভালো কাজই করচে | ও বৌদি হাঁ করে দেকচ কি? সিন্দুরের কৌটোডা নিয়ে এসো দিকি |
তিতির—ও মা বাবার বিয়ে কখন হবে? আমি বাবার বিয়ে দেখবো |
মিলন--- বাবার বিয়ে দেখতে নেই সোনা | কাকার বিয়ে দেখো | আজ তুমি হলে ‘নিতকনে’ | যাও বাবার কোলে চড়ে কাকার বিয়ে দেখো | কি হল সান্টু, আরে স্ট্যাচু হয়ে গেলে নাকি? মালা পরাও রিমলিকে | এই যে মেয়ে, মিঠাই হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছো কেন? মিঠাই পরে খাবে, আগে বিয়েটা হোক | (সব কুশীলব মঞ্চে থাকবে, মালা বদল হবে রিমলি আর সান্টুর) (মিনার মা উলু দেবে, প্রতিভা শাঁখ বাজাবে) (মনিকাও হাসিমুখে সুমনের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলবে)
মিলন — (মন্ত্র উচ্চারণ করবে) “যদিদং হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম”)
...(সমাপ্ত)...