1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label শাশ্বতী মুন্সী. Show all posts
Showing posts with label শাশ্বতী মুন্সী. Show all posts

Sunday, April 17, 2022

শিকল ভেঙে স্বাধীন

ছবি : ইন্টারনেট 

 শিকল ভেঙে স্বাধীন

শাশ্বতী মুন্সী

  ছুটির ঘন্টা পড়তে চকিত হয়ে উঠল বান্টি। বেঞ্চে রাখা খোলা বক্সে পেন পেন্সিল ঢুকিয়ে, খাতা বই গুছিয়ে নেয়। বোতল নেড়ে জলের পরিমান বুঝে নিল। ব্যাগের চেন টেনে কাঁধে নিয়ে বেঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে এল। অন্য ছাত্রদের ভিড় ঠেলে দ্রুত পায়ে ক্লাসের বাইরে যায়। ছুট লাগায় মেন গেটের দিকে। দারোয়ানের নজর এড়িয়ে গেটের পাশের অপেক্ষাকৃত সরু গলি ধরে দৌড়তে লাগল।

  মোবাইল ঘড়ির অ্যালার্মের শব্দ ঘুমের দফারফা ঘটাতে ওস্তাদ। রোজ সক্কাল বেলায় ওস্তাদের উৎপাতে শান্তির ঘুম জোটে না বান্টির কপালে। ভোরের আলিস্যি ছেড়ে ঝটপট বিছানায় ছাড়তে হয়। শনি, রবি ছুটির দিনে নিয়মের হেরফের হয় না।

 ক্র্যা.. ক্র্যা.. ক্র্যা...

 কর্কশ শব্দ রোমিতাকে টেনে আনল রান্নাঘর থেকে। ছেলের গায়ে এক ঠেলা মেরে বলল,

-" তোর ঘুম ভাঙাতে কি ঢাক ঢোলের ব্যবস্থা করব?"

যান্ত্রিক সতর্কতায় যা হল না, মায়ের শাসানির তিক্ত বচনে তা হতে বাধ্য। নিমেষে ঘুম উধাও। ঝটিতি খাট থেকে নেমে বাথরুম গেল। মুখ চোখ ধুয়ে বেরোতে জগিং এর পোশাক নিয়ে রোমিতা দাঁড়িয়ে। সেগুলো পরে বাবার সঙ্গে নিচে গেল বান্টি। আবাসনের উল্টোদিকের পার্কের মাঝের পুকুর ধরে দশ পাক দৌড়তে হবে। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের সঙ্গে তিমিরও জগিং করতে করতে পুরো পার্ক চক্কর দেয়। তবে নজর থাকে ছেলের ওপর। এক পাক কম হওয়ার জো নেই। পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট পরে ঘেমে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। একঘেয়ে ব্রেকফাস্টে মুখ ব্যাজার! বাটিতে চামচ নাড়তে নাড়তে বলল,

-" ছুটির দিনে লুচি তরকারি, বা এগ চাউমিন করে দিতে পারো তো ?"

হটপটে তিমিরের লাঞ্চ প্যাক করছিল রোমিতা। রাগী গলায় বললে,

-" সকালবেলা অয়েলি খাবার খাইয়ে লিভারের বার'টা বাজাই আর কি.. যা দেব চুপচাপ খাবি।"

 বান্টি বুঝল প্ৰিয় খাবার খেতে চাওয়ার বায়না করা যেন অপরাধের সামিল.. অগত্যা দুধে ভেজা কলা কর্ণফ্লেকসই গলা দিয়ে নামাতে লাগল।

   ক্লাস সিক্স এর ছাত্র বান্টির দৈনন্দিন জীবন প্রবাহ ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সামনে তালে বহমান। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ার চাপ তো আছেই। তদুপরি এক্সট্রা এক্টিভিটিস'এ পারদর্শী হওয়ার জন্য মায়ের প্রবল চেষ্টা। পাঠ্য বিষয়ের টিউশন ছাড়াও সাতটি দিনরাতের সময় বিভাজিত হয়েছে সাঁতার, জিমন্যাস্টিক, আবৃত্তি, ড্রয়িং, গিটার, ক্যারাটে। রুটিনে বাঁধা ছকে আবদ্ধ বান্টির দৈনন্দিন কাজকর্ম। একেক সময় মনে হয়, সে যেন রেসের মাঠের ঘোড়া। শ্রান্তিহীন ভঙ্গিতে অবিরাম দৌড়ে যেতে হবে। ক্লান্ত দেহে ছোটার গতি কমালে বকুনির সাথে পিটুনি ফ্রি! মাপা সময়ের নির্দিষ্ট কাজের বাইরে ওর নিজস্ব কোনও স্পেস নেই।

  সারাদিন স্কুলে ইংরেজিতে কথোপকথন করে  ওর বালক মনে চায় ঘরের পরিবেশে মাতৃভাষায় কথা বলতে। কিন্তু অভ্যাস ভাঙার নিষেধে সেই আরামটুকু পায় না।

  দোতলায় ফ্ল্যাটে একটি গুজারাটি পরিবার থাকে। দুজন খুদে সদস্য আছে। ভাইবোনে কত মজা করে, খেলে, গান চালিয়ে নাচে। বান্টির খুব ইচ্ছে হয় ওদের ঘরে গিয়ে খেলতে। গুজরাটি ভাষা বোঝে না, তবে হিন্দিটা খারাপ বলে না। কিন্তু ভিনভাষীদের সঙ্গে মেশাতেও মায়ের বারণ। এমনকি জন্মদিনের নিমন্ত্রণ পড়া বা অন্য কোনও ক্লাসের মিথ্যে অজুহাতে কাটিয়ে দেয়।

 সি ব্লকের পিঙ্কি ওর স্কুলে পড়ে। এক বছরের সিনিয়র। পড়াশোনায় ভালো। দারুন গানের গলা। ইংলিশ সঙ্গে বাংলাতে মেধাবী। অপর্ণা কাকিমা অন্য স্কুলের বাংলার টিচার। স্থানীয় লাইব্রেরিতে মেয়ের আলাদা কার্ড করে দিয়েছে। বলেন, নিজের ভাষার সাহিত্য পড়তে, বুঝতে না জানলে বাঙালি জাতিকেই অবমাননা করা হয়। আবাসনে বসবাসের সূত্রে আলাপ আছে রোমিতার সঙ্গে। একদিন বলেছিলেন,

-" সপ্তাহের দুটো দিন বান্টিকে আমার কাছে পাঠিও। ওকে শিশু সাহিত্য পড়াব।"

 সাড়ে নয়'শ স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের একটা ঘরের দেওয়াল জোড়া আলমারিতে শুধু বই বই। ঢুকলে নতুন পুরোনো বইয়ের গন্ধ বান্টির চিত্তে নেশা জাগায়। সহজ, চলতি বাংলা নিয়ে মিসেস গুপ্তর এত বাড়াবাড়ি মোটেই পছন্দ নয় রোমিতার। ওঁর লাইব্রেরি দেখে বাংলা বই পড়ার দিকে ছেলে উৎসাহী হচ্ছে বুঝে, রুক্ষ স্বরে ধমক দিয়ে বলেছিল,

-" ওসব বেমক্কা আবদারকে প্রশ্রয় দিই না। অবাধ্য হয়েছিস কি বাড়ির সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ঘুচে সোজা বোডিং-এ পাঠাব..."

  উল্টে জবাব দিতে বান্টির জিভের ডগায় এসেছিল,

-" হ্যাঁ হ্যাঁ, সেখানেই পাঠিয়ে দাও.. তোমাদের মর্জির পুতুল হয়ে বাঁচার যন্ত্রনা থেকে রেহাই পাব..!"

 কিন্তু বোডিং জায়গাটা কেমন, শাসন বারণের কড়াকড়ি কতোটা, সে সম্বন্ধে কিছুই জানে না বান্টি। তাই মুখ ফস্কে বেরতে চাওয়া কথাটা সুরুৎ করে গিলে নিয়েছিল।

  মায়ের অনাগ্রহে অন্যের ছেলেকে সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর ব্যাপারটা পুনরুচ্চারিত করেননি।  তবু গতবার বান্টির জন্মদিনের নিমন্ত্রণে বাক্স ভরা ক্যাডবেরি, ড্রয়িং বুকস, রং পেন্সিল সেট এর সঙ্গে উপহার দিয়েছিল ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায় এবং নারায়ণ দেবনাথের দুটি বই।

 বছর ঘুরতে চলল সেই বই দুটো হাতে পায়নি বান্টি। তবে নিশ্চিত মা ওর নাগালের বাইরে সরিয়ে রেখেছে।

  সব কিছুতে অন্যদের হারিয়ে সেরা হওয়ার লক্ষ্যে আর সে দৌড়বে না। পরাধীনতার বেড়ি ভাঙা উদ্যমে মা বাবার ইচ্ছে অনিচ্ছের দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে বেরিয়ে পড়েছে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

...(সমাপ্ত)...


Wednesday, January 12, 2022

পরমেশ্বর

 

ছবি  : ইন্টারনেট 

পরমেশ্বর

শাশ্বতী মুন্সী

  প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় খাটে শোয়া কিশোরী মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মুখে আঁচল চেপে কাঁদছে বিশাখা। দু'দিন ধরে জ্বরে ভুগতে থাকা রোগাটে শরীর যেন বিছানায় নেতিয়ে পড়েছে। তাপমাত্রা ১০২-১০৪ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে! প্যারাসিটামল খাইয়ে এবং ক্রমাগত জলপটি দিয়েও অবস্থার হেরফের হচ্ছে না হওয়ায় আশঙ্কার মেঘ ঘনাচ্ছে তার মনে।

 বাইরে থেকে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে একটু থমকে দাঁড়ায় সঞ্জীব। উদ্বিগ্ন স্বরে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল,

 -" মিতুর জ্বর কি আরো বাড়ল? "

 -" হ্যাঁ, গা পুড়ে যাচ্ছে.. আগে তবু একটু আধটু সাড়া দিচ্ছিল, এখন যে তাও দিচ্ছে না.. দুদিন পেটে সলিড কিছু পড়েনি, তাই হরলিক্স করে এনে খাওয়াতে গিয়েই দেখি.."

   বিশাখার কথা মাঝপথে থেমে গেল, খাটে বসে বোনের কপালে, গায়ে স্পর্শ করতে যেন গরম চাটুতে হাত দেওয়ার মতো ছ্যাঁকা লাগল সঞ্জীবের! বোনের শারীরিক অবস্থার অবনতি তার মনকেও শঙ্কান্বিত করে তুলেছে! তাই এতক্ষন হন্যে হয়ে ডাক্তার খোঁজ করছিল, কিন্তু সংক্রমণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকার বেশিরভাগ ডাক্তাররের চেম্বারে তালা ঝুলছে। কেউ কেউ আবার দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যা কয়েকজন মাত্র রোগী দেখছেন। অনেক অনুনয় সত্ত্বেও তাঁরা কেউ রোগী দেখতে বাড়ি আসতে রাজি হননি। উপরন্তু পরিস্থিতি এমন যে সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে! বিশেষত, মিতুর জ্বরের লক্ষণ ভাইরাস জনিত রোগের প্রাথমিক উপসর্গ কিনা, সে ব্যাপার নিশ্চিত না জেনে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ভোগান্তির শেষ থাকবে না..

  স্ত্রীর সজল চোখের দৃশ্যত ছোঁয়ায় সঞ্জীবের চোখজোড়া চিকচিক করে উঠল। মা-বাবা মারা যাওয়ার পরে বোনই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন. তাই বোনকে এভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তার বুকের ভেতর যে কষ্টে উথাল পাথাল করছে..সস্নেহে মিতুর মাথায় হাত বুলিয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হল, যে কোনো উপায়ে তোকে সুস্থ করে তুলব..

 আলগোছে চোখের কোনা মুছে উঠে দাঁড়াল সঞ্জীব।

 " যেরকম জলপটি দিচ্ছিলে, দিতে থাকো.. আমি  ডাক্তারের খোঁজে বেরোলাম.. " স্ত্রীকে বলে ডান দিকের দেওয়ালে পাশাপাশি টাঙানো বাবা-মায়ের ছবি প্রণাম করে বেরিয়ে গেল সে।

কথায় বলে, মন থেকে কারোর জন্য আরোগ্য কামনা করলে ঈশ্বরও বুঝি তখন সদয় হন।

    স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে ছোট্ট পরিবার সঞ্জীবের। বাবা-মায়ের অবর্তমানে মিতু তার সবচেয়ে কাছের আপনজন। অভিভাবকহীন বোনের প্রতি যাবতীয় কর্তব্য করতে একজন দায়িত্বশীল দাদার ভূমিকা পালনে অবিচল রয়েছে সে। বিয়ের পরেও সেই অবস্থানের এতটুকু নড়চড় হয়নি। বরং নিজের পছন্দে আনা জীবনসঙ্গিনীর হৃদয়ে মিতুর প্রতি মমত্ববোধ, ওকে আগলে রাখার স্নেহময়ী স্বভাব সাংসারিক শান্তি দিয়েছে সঞ্জীবের মনে।

  একটি বেসরকারি ব্যাংকে তিন বছর কর্মজীবন কাটানোর পরে এই প্রথমবার বদলির অর্ডার আসে সঞ্জীবের। ওই ব্যাংকের নীলগঞ্জ শাখায় জয়েন করেছে মাস দুয়েক আগে। আধা-গ্রাম, আধা-মফঃস্বল এই নতুন জায়গায় এসে তেমন চেনা পরিচিতি হয়নি, এর মধ্যে বোনের অসুস্থতা ঘোরতর সমস্যায় ফেলেছে তাকে।

   মে মাসের মধ্যাহ্নের সূর্যকিরণ যেন অগ্নি বর্ষণ করছে ধরিত্রীর ওপরে। প্রখর রোদের তপ্ত আবহাওয়ার উপুর্যপরি লকডাউনে জারি হওয়া নিষেধের দরুন পথচলতি মানুষের দেখা পাওয়া দুষ্কর। শুধু তালাবন্ধ দোকানের চাতালে গুটি কয়েক কুকুর বসে রয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে কতদূরে চলে এসেছে খেয়াল নেই সঞ্জীবের। হঠাৎ ওর সন্ধানী চোখ জনশুন্য রাস্তায় এক স্থানীয় লোকের দেখা পায়। দ্রুত হেঁটে লোকটির কাছে গিয়ে সংক্ষেপে ডাক্তার খোঁজের কারণ জানাতে সে বলে,

-" আরে দাদা, এই অঞ্চলের ধন্বন্তরি ডাক্তারবাবু থাকতে আপনার বোন বিনা চিকিৎসায় কষ্ট পাচ্ছে..!"

 -" ধন্বন্তরি", সঞ্জীব বিস্মিত!

 -" হ্যাঁ, উনি যে একালের সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি মশাই.. ওনার চিকিৎসায় সুফল পায়নি এমন রোগী এ তল্লাটে পাবেন না.."

  লোকটির আপ্তবাক্যে খানিকটা বিশ্বাসের সঞ্চার হল সঞ্জীবের মনে।

 এরপর কথা না বাড়িয়ে হতবাক সঞ্জীবকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তার বাবুর ঠিকানার পথে রওনা দেয় লোকটি। আধ ঘন্টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে যায় তারা। একতলা বাড়ির মাঝ দালানে পাতা বেঞ্চে বসা লোকজনের ভিড় বুঝিয়ে দিলো ওরা সবাই রোগী। এবং দালান সংলগ্ন ঘরটি ডাক্তার পরমব্রত চৌধুরীর চেম্বার। সঞ্জীবকে বাইরে দাঁড়াতে বলে লোকটি ভেতরে যায় ডাক্তার বাবুর সঙ্গে কথা বলতে। ক্ষণকাল পরে দরজার পর্দা ফাঁক করে হাতের ইশারায় ওকে ঢুকতে বললে, একবুক আশা নিয়ে চেম্বার ঢোকে সে। দ্যাখে, আয়তকার টেবিলের ওপ্রান্তে চেয়ারে বসে আছেন সুঠাম দেহে, পরিচ্ছন্ন বেশভূষার, কাঁচা পাকা চুলের সৌম্যদর্শন এক ব্যক্তি, যার পরিচয় আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইনি অঞ্চলের ধন্বন্তরি-নামা ডাক্তারবাবু।

  ধীর, স্থির ভাবে চিন্তাগ্রস্ত সঞ্জীবের মুখে রোগীর অবস্থা সম্বন্ধে জেনে আর এক মুহূর্ত নষ্ট করা সমীচীন মনে করেন না তিনি। বাইরে অপেক্ষারত রোগীদের কাছে বিনীত ভাবে কিছুক্ষণ সময় চেয়ে নিয়ে সঞ্জীবের সাথে বেরিয়ে পড়লেন।

    পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনে কৃত MD ডিগ্রিধারী ডক্টর চৌধুরীর কর্মজীবনের শুরুটা হয়েছিল কলকাতার হাসপাতালে। কিন্তু পরে বাবার স্বপ্নপূরণ করতে এবং সদিচ্ছায় গ্রামের দুস্থ, অসহায়,গরিব মানুষদের সুষ্ঠ চিকিৎসা ব্যবস্থা সহজলভ্য করার সংকল্পে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকের কর্মভার গ্রহণ করেন। প্রথম ৫-৬ বছর সরকারের অধীনে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার পরে সিদ্ধান্ত নিলেন নিজস্ব হাসপাতাল খুলবেন। এই সাধু উদ্যোগে পাশে পেয়েছিলেন এলাকার সহৃদয় এক ব্যক্তিকে।বাবার সঞ্চিত অর্থে এবং স্ব-উপার্জনের মিলিত মূলধনে কুড়িটি শয্যার হাসপাতাল খুলে বসেন ওই ব্যক্তির অব্যবহৃত বাড়িতে। শহর থেকে কিনে আনেন ডাক্তারির প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। খান আটেক মোটামুটি শিক্ষিতা তথা আগ্রহী গ্রাম্য মেয়েকে নার্সিং এর প্রশিক্ষণ দিয়ে নিযুক্ত করেন সেবিকা পদে। সাধারণ মানুষের জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করতে উদ্যমী এবং দরদী মনোভাবাপন্ন চিকিৎসা প্রদানকারী ডাক্তারবাবু অল্প দিনেই এলাকাবাসীর হৃদয়ে ধন্বন্তরি-সম ঈশ্বররর আসনে অধিষ্ঠিত হন। স্বনামধন্য এই মানুষটি লোকমুখে ভূষিত হয়ে যান " পরমেশ্বর " অভিধায়।

  বিগত ৩২ বছর ধরে অঞ্চলের বাসিন্দাদের চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে আসছেন নিরলস। এমনকি সংকটজনক পরিস্থিতিতে পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে রোজ অন্তত ২০০ জন রোগী দেখে চলেছেন দিনে-রাতে।

  ভাড়া বাড়িতে সঞ্জীবের বোন মিতুলকে দেখে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল প্রৌঢ় ডাক্তারবাবুর কপালে।অভিজ্ঞ চোখে রোগীর অবস্থা ভালো না বুঝে তড়িঘড়ি হাসপাতালে ভর্তি করে নেন। তারপর থেকে টানা পাঁচ দিনের অক্লান্ত শ্রুশুষায় রোগীর দৈহিক অবস্থা সুস্থতার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। শঙ্কার  মেঘ কেটে স্বস্তির হাসি ফোটে সঞ্জীব-বিশাখার মুখে। কেননা মিতুলের জ্বর জনিত লক্ষণের ভয়কে দূর করে নেগেটিভ আসে টেস্টের রিপোর্ট.. 

  গোটা সপ্তাহ হাসপাতালে কাটিয়ে মিতু খানিকটা সুস্থ হয়। বোনকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার আগে কৃতজ্ঞ স্বরে ডাক্তারবাবুকে ধন্যবাদ জানাতে ভোলে না সঞ্জীব-বিশাখা। সেই সঙ্গে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে পা ছুঁয়ে প্রণাম জানায় বাস্তবের মাটিতে চাক্ষুষ করা রুপোলি পর্দার " অগ্নিশ্বর "কে।

সমাপ্ত

                        

উত্তরপাড়া
saswati.munshi1987@gmail.com
                                                                     

Wednesday, October 6, 2021

সম্প্রীতির বন্ধন

ছবি : ইন্টারনেট 

সম্প্রীতির বন্ধন

শাশ্বতী মুন্সী


  সাপ্তাহিক রুটিনে বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন শেষের সময়সীমা নির্ধারণ করা আছে বিকেল ৪টে অবধি | সোম থেকে শুক্রবার এই রুটিনের আওতায় পড়ে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা |

 ছুটির পরে স্কুলের বাতসে কলরবের রেশ ছড়িয়ে  ছাত্রছাত্রীর দল বাড়ি চলে গেছে | অন্যান্য শুক্রবার এই সময় শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার পথ ধরেন কিন্তু আজকে তাঁদের আরো কিছুক্ষন থাকতে হবে | বিশেষ ব্যাপারে আলোচনার জন্য প্রধান শিক্ষক মিটিং ডেকেছেন |

  স্কুল বিল্ডিং এর দোতলার নির্দিষ্ট ঘরে সহ-প্রধান শিক্ষিকা এবং সব শিক্ষক-শিক্ষিকা জড়ো হতে সন্দীপ চক্রবর্তী বলতে আরম্ভ করলেন,

 -" লেখাপড়ার পাশাপাশি স্কুলে হাতের কাজও  শেখানো হয় | এবারে ঠিক করেছি সব শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের রুটিনে কর্মশিক্ষার পিরিয়ডে নতুন কিছু শেখাতে হবে, পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণীর রুটিনে সপ্তাহে দুটো দিন কর্মশিক্ষার পিরিয়ড থাকে, সেই সঙ্গে এক্সট্রা ১টা পিরিয়ড যোগ করে দেবো, আর দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর রুটিনে একটু রদবদল করে অন্তত ২টো পিরিয়ড রাখতে হবে, ঐদিন তাদের স্থায়ী রুটিন বহির্ভুত কর্মশিক্ষার পিরিয়ড থাকবে | এই পিরিয়ড গুলোতে রাখী তৈরী শেখানো হবে | ল্যাপটপে রাখীর বিভিন্ন ছবি এবং তৈরীর পদ্ধতি দেখিয়ে হাতে কলমে ওদের শেখানোর দায়িত্ব আপনাদের..শেখার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসে বসেই রাখী বানাতে হবে এবং বাড়িতেও যত পারে বেশি সংখ্যক রাখি বানানো আবশ্যিক..কারণ ওদের হাতে তৈরী রাখী একে অন্যকে পরিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনেই রাখী উৎসব পালন করা হবে..

 এবার বলুন আপনাদের কী মতামত..

 বিজ্ঞানের শিক্ষক বরুন চট্টরাজ বলেন,

-" এ তো ভীষণ ভালো উদ্যোগ, বরাবর তো দোকানে কেনা রাখী দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা উৎসব পালন করে থাকে, এবারে নিজেদের বানানো রাখী বন্ধু-বান্ধব সহ বিদ্যালয়ের সকল দাদা-দিদি ভাই বোনেদের পরানোর সুযোগ পাবে.."

 --" হ্যাঁ, এছাড়া সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ বাড়বে.. ", বললেন ইতিহাসের শিক্ষিকা অনিমা গুহ |

 ওনাদের কথার সুরে নিজেদের মত মিশিয়ে বাকি শিক্ষক-শিক্ষিকারা এমন কর্মসূচিতে যোগদানের সম্মত হন |

  সোমবার বিদ্যালয় পাঠ্যক্রম শুরু হবার পরে ফোর্থ ক্লাস স্টাফ হরেনকে দিয়ে প্রতিটা শ্রেণীর বিভাগীয় কক্ষে উক্ত বিষয়ের নোটিস পাঠিয়ে দিলেন সন্দীপবাবু | নতুন কর্মসূচির ব্যাপারটা বিস্তারে ক্লাস টিচাররা বুঝিয়ে দিতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উদ্দীপনা দেখা দেয় |

  জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে এই অভিনব কর্মসূচির প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে | চলবে মাস খানেকের একটু বেশি সময় ধরে | এখন বিদ্যালয়ের একটা ঘর আপাতভাবে রাখী তৈরী কারখানা | ঘরের মাঝে টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুঁতি, পাঠ, খড়, জরি, ঝিনুক, ধান স্পঞ্জ, প্লাস্টিকের ফুল, আঠা, রঙিন কাগজ ইত্যাদি রাখী তৈরীর বিভিন্ন উপকরণ | আর সেগুলো নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে | স্পেশাল পিরিয়ডের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দেখানো পদ্ধতিতে নিজেদের হাতে রাখী বানাতে পারছে, এতেই খুব খুশি পড়ুয়ার দল |

 দোকানে রকমারি রাখী অভাব নেই | দিন দিন রাখীর জৌলুস, নকশার বৈচিত্র বাড়ছে | আর অনলাইনে তো রাখীর হাজারও সম্ভার | এসবের মাঝেও নিজেদের হাতে রাখী বানানো একেবারে অন্য স্বাদের ব্যাপার, তা মেনেছে ছাত্রছাত্রীরা | স্কুলের এমন উদ্যোগে রাখী বন্ধন ঘিরে আগ্রহ-চেষ্টার কমতি নেই সপ্তম, দশম, নবম, এমনকি পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সঙ্গীতা, অমল, রুহিনা, সঞ্জীব, জাহির, মারিয়ম, মকবুল, নাজিমাদের |

  অগণিত হাতের সম্মিলিত চেষ্টায় তৈরী হল বহু সংখ্যক রাখী |

  চলতি বছরে শ্রাবনী পূর্ণিমার তিথি পড়েছে ১২ই আগস্ট | সকাল ১০টার মধ্যে সব শিক্ষক-শিক্ষিকা সহ সকল শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত হয়েছে বিদ্যালয়ে | বাউন্ডারি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা স্কুল কম্পাউন্ডের বাম দিকে সিমেন্ট নির্মিত স্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাখী বন্ধন উৎসব প্রচলনের সংক্ষিপ্ত পৌরাণিক ব্যাখ্যা-সহ ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্বন্ধে বক্তব্য রাখতে প্রধান শিক্ষক মহাশয় বললেন,

 পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে মেতে উঠেছিল বাংলা | এদিকে ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে ভাগ করে বিদ্রোহের গতি রুদ্ধ করে দেওয়া | তাই পাশ হয়ে গিয়েছিল বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব | এক ধর্মের মানুষ ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে যার হাতে রাখী পরিয়ে দিয়েছিলেন, তার ধর্ম আলাদা | হাতে হাত রেখে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল এই প্রতীকী প্রতিবাদ | কবির ডাকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সারা বাংলা এক হয়েছিল সেদিন | সেসময় থেকে বাংলায় রাখী উৎসব হয়ে উঠল সর্বসাধারণের | সেই ধারা এখনও অব্যাহত |

 জানো তোমরা, আজ রাখী পূর্ণিমার দিন কেন বিদ্যালয়ে খুলে রেখেছি? কারণ একালের প্রজন্ম যাতে সেই ধারার বহমানতা বজায় রাখতে পারে |

  তারপর সঙ্গীত শিক্ষিকা রিতা কুন্ডুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হল বিখ্যাত সেই রবীন্দ্রসঙ্গীত...


   " বাংলার মাটি বাংলার জল

     বাংলার বায়ু বাংলার ফল

     পূণ্য হউক পূণ্য হউক

     পূণ্য হউক হে ভগবান.."


  সম্পূর্ণ গানটি শেষ হতে একটা বড়ো বাক্সে একত্রিত রাখা সুন্দর রাখীগুলো দাদা, দিদি, ভাইবোন, বন্ধু বান্ধবদের হাতে পরিয়ে দিল সকল ছাত্রছাত্রীরা | বাদ গেলেন না শিক্ষক-শিক্ষিকারা | অনুষ্ঠানের শেষ দিকে সবার মধ্যে মিষ্টির প্যাকেট বিতরণ করা হল |

 রবি ঠাকুর প্রচলিত প্রথার অনুসারী হয়ে সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির নজির স্থাপন হল অভিনব পন্থায় |


                            সমাপ্ত


saswati.munshi1987@gmail.com
উত্তরপাড়া

Thursday, July 1, 2021

যোজনগন্ধা

ছবি : ইন্টারনেট 

যোজনগন্ধা

শাশ্বতী মুন্সী

    " নাহ.. ব্রাহ্মণ বংশ ছাড়া অন্য জাতের মেয়েকে পুত্রবধূ রূপে কিছুতেই স্বীকার করবেন না! অন্ধ সংস্কারাছন্ন মানুষ দুটোকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে নতুন যুগের আলোয় আনতে ব্যর্থ হলাম "--- হতাশার স্বরে বললো প্রিয়ম |

ব্রাহ্মণ বংশে না জন্মানোতে তার অপরাধটা কোথায় ? আজ আর এই প্রশ্ন তুলে গুরুজনদের প্রতি অশ্রদ্ধার অনুপাত বাড়ানোকে সঙ্গত মনে করে নি শ্রমণা |

" ওনারা যা চাইছেন তাতে রাজি হয়ে যাও, বাবা মায়ের অমতে বিয়ে করে আমরা হয়তো সুখী হতে পারবো না.. "

" মানে! কি বলতে চাইছো তুমি? "

সূর্যাস্তের নরম কমলা আলো যেন নদীর জলে  আবির ঢেলে দিচ্ছে | বালিয়াড়িতে হাঁটুর উপর মুখ রেখে বসে মৃদু স্বরে শ্রমণা বলে,

" সব প্রেমের সম্পর্ক বিয়ে তে পরিণতি পায় না, আমাদেরটা নাহয় তেমনই হলো..!"

" আমায় একটা অন্য মেয়ের সাথে আজীবন বিয়ের বন্ধনের অভিনয় করতে বলছো.. তুমি কি সত্যি ভালো বেসেছো আমায়? "--- শ্রমণার দু কাঁধ ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে ব্যথিত কণ্ঠে বলে প্রিয়ম |

 "সাড়ে চার বছরের বেশি মেলামেশা করে তোমার মনে এই প্রশ্ন জাগছে? "

 " জাগাটা কি খুব অস্বাভাবিক? "

 " হ্যাঁ, কারণ আমার বাবা প্রেমের বিয়ের বিপক্ষে জেনেও আমাদের সম্পর্ককে মাঝপথে থামিয়ে দিই নি.. তোমায় ভীষণ ভাবে ভালো বেসেছি বলেই ছেড়ে যেতে পারি নি.. "

" তাহলে কেন বেঁধে রাখছো না জোর করে? "

 পছন্দের জীবন সঙ্গিনীর দূরে চলে যাবার সমূহ সম্ভাবনায় অবুঝ হচ্ছে প্রিয়ম |

 " আমার ভালোবাসা যে শর্তহীন প্রিয়ম.. বাবা মায়ের থেকে ছেলেকে আলাদা করার অভিশাপ নিয়ে সুখের ঘর বাঁধতে পারবো না আমি.. "--- দৃপ্ত স্বরে বলে |

" আমাদের বাবা মায়ের চাওয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলছো এবং বাধ্য মেয়ের মতো অভিভাবকদের পছন্দ বিয়ে করবে তুমি!"

সজল নয়নে কিয়ৎক্ষণ প্রিয়মের মুখপানে তাকিয়ে থাকে | মন বলে, কবেই তো স্বামীর জায়গায় তোমাকে বসিয়েছি! কিন্তু মুখ বললো, ভবিষ্যতই বলবে সেকথা..

  সন্ধ্যে গাঢ় হয়ে আসছে, আবির মুছে নদীর জলে কালি মিশে যায় | শ্রমণা তাড়া দেয়,

  চলো ওঠা যাক, এরপরে খেয়া বন্ধ হয়ে যাবে |


--------

       ইতিহাসে মাস্টার্স করে বি.এড পাস করার পরে স্কুল সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা দিয়ে বারাসাতের একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় চাকরি করছে শ্রমণা | নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হবার দরুন নিজের পায়ে দাঁড়ানোই তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল | বাবার একার উপার্জনে সংসার চালানোর দায়িত্ব থেকে সানন্দে অব্যাহতি দিতে কাঁধে নিয়েছে আর্থিক দায়ভার |

 স্বাবলম্বী হবার পরে শ্রমণার বাবা-মা চেয়েছিলেন মেয়েকে সংসারী করতে | দু'একটা সম্বন্ধ দেখেও  ছিলেন | কিন্তু মেয়েকে সে কথা জানাতে শ্রমণার স্পষ্ট জবাব,

 বিয়ে, বর, সন্তান... এই সরলরেখায় জীবন কাটাবো না আমি | তবে একটা বাচ্চা চাই, যাকে সিঙ্গেল মাদার হিসেবে লালন পালন করবো, ওর গলায় আধো আধো  মা ডাক অন্য রকমের পূর্ণতা দেবে আমায়.. অনন্য সেই আনন্দ!

 ভারতীয় সমাজে একলা মায়ের জীবন যাপন এখনো তেমন চলতি প্রথা নয় | তাই মেয়ের এ হেনো মনোভাবে বাবা তপেনবাবু ও মা প্রমীলা দেবী স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন! বিয়ে না করে মা হবি?

 দু'জোড়া কুঞ্চিত ভ্রু'র দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

 " এতে অবাক হবার কিছু নেই মা..বৈবাহিক সম্পর্ক না গিয়ে মাতৃত্বের স্বাদ পেতে বিদেশে এর প্রচলন হয়েছে বহু দিন | এমনকি রয়েছে 'সিঙ্গেল মম'স ক্লাবও | গত ২০ বছর হৈ হৈ করে বেড়েছে একক মায়ের সংখ্যা | এখন তা এ দেশেও সম্ভব | ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতাও তৈরী হচ্ছে..  |

 "তাহলে তুই কি সন্তান দত্তক নিতে চাস? "--- প্রশ্ন করলেন তপেন বাবু |

" না, নিজের গর্ভজাত সন্তানের মা হবো আর সেটাও এখন সম্ভব |

এবার যুগপৎ চমকিত ও বিস্মিত হলেন তাঁরা |

 কৃত্রিম উপায়ে গর্ভধারণের প্রক্রিয়ার ব্যাপারটা বিস্তারে জানাতে রাগত স্বরভঙ্গিতে প্রমীলাদেবী বলেন,

" চেনা নেই, জানা নেই একজন অপরিচিত পুরুষের বাচ্চাকে জন্ম দিয়ে মা হবি তুই? "---

 "বিয়ে করে মা হতে গেলে যে সেই পুরুষটির আদ্যোপান্ত চিনে জেনে থাকি আমরা, এমন তো নয় বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বামী নামক পুরুষটি আমাদের কাছে অনেকাংশে অপরিচিত থাকে.. আর এক্ষেত্রে আমি কার ঔরসজাত সন্তানের মা হচ্ছি সেটা জানাটা বেআইনি এবং জানতে চাইও না..আমার গর্ভজাত সন্তান হবে একান্ত আমার, যার ওপর আর কারো অধিকার থাকবে না...

 বিয়ে ব্যাপারটাতে মেয়ের যথেষ্ট আপত্তি বুঝে জোর করেন নি ওনারা | এবং ' মা ' ডাক শোনার প্রবল ইচ্ছার পথে বাধা দেওয়ার যুৎসই কারণ না পেয়ে একপ্রকার সায় দিয়েছিলেন | বলা ভালো কর্মরতা, সুউপায়ী মেয়ের অটল জেদের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন |

  তাদের অন্তিম সাক্ষাতের দিনটি ছিল প্রিয়মের জীবনের পরম সুখপ্রাপ্তির | তারপর দুজনের যোগাযোগের সব রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়েছে শ্রমণার  তরফ থেকে | বন্ধ করে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার একাউন্ট, এমনকি বদলেছে মোবাইল নাম্বার ও হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার | প্ৰিয়তম মানুষটির ত্রিসীমানা থেকে নিজে সরে এসেছে বিশ মণ ভারী পাথর বুকে চেপে | যোগাযোগের ক্ষীণ সূত্র যে তার মনকে দুর্বল করে দিতে পারে..

 শ্রমণার সাথে সম্পর্কের কথা বাড়িতে প্রথমবার জানাতে একবাক্যে নাকচ করে দিয়েছিলেন ওর বাবা-মা | নিরুপায় প্রিয়ম তখন বলেছিল,

 " দুই বাড়ির ভিন্ন মত যখন আমাদের একসাথে থাকার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে, তখন একটাই পথ খোলা আছে, পালিয়ে বিয়ে করে আলাদা সংসার করবো.. "

 " পালিয়ে বিয়ে! আর তোমার চাকরি? "--- স্বরে প্রশ্নবোধক ভঙ্গিমা |

 " ওটা কোনো ব্যাপার নয়, আমার যা কোয়ালিফিকেশন তাতে জব ইন্টারভিউ দিয়ে ভিনরাজ্যে চাকরি পেতে অসুবিধা হবে না, বরং স্যালারি এখানের চেয়ে বেশি হতে পারে.. "

" হুম, তা বুঝলাম কিন্তু কষ্ট করে লেখাপড়া শিখে নিজের যোগ্যতায় পাওয়া সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা ছেড়ে তোমার সাথে যাই কি করে বলো! তাছাড়া আমরা দুজনেই বাবা মায়ে দের একমাত্র সন্তান, বয়স কালে ওনাদের দেখভাল করাও যে অন্যতম কর্তব্য..

 মূলত এই দুটি কারণে প্রিয়মের প্রস্তাবে রাজি হয়ে সুখের নীড় গড়তে মনের সম্মতি পায় নি সে |

  দেশের সর্বোচ্চ আদালত একক মাতৃত্বকে সম্মান দেয় অথচ অবিবাহিত একলা মাকে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা একটু দূরে ঠেলে রাখে | তাকে ঘিরে তৈরী হয় আশেপাশের লোকের কল্পনা প্রসূত ধ্যান ধারণা | যদিও লোকের কটূক্তি, অশালীন মন্তব্যের পরোয়া কোনোদিন করে না শ্রমণা | অকারণ পলায়ন প্রবৃত্তি তার স্বভাব বিরুদ্ধ | কিন্তু সামাজিকতার ভদ্র মুখোশধারী লোকের বাঁকা চাহনির ব্যাঙ্গাত্মক প্রশ্ন যাতে, আগত সন্তানের শিশু মনে নানা জিজ্ঞাসা উঁকি দিতে না পারে,  তাই এখানকার ভাড়া বাড়ির বাস উঠিয়ে সপরিবারে উত্তরবঙ্গে চলে যায় সে |

 সরকারি চাকরিতে কোনো না কোনো সময়ে বদলির অর্ডার আসবেই | ব্যক্তিগত তাগিদে নির্দেশ আসার আগেই বদলি নিয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বেষ্টিত পরিচিত মহল ছেড়ে কোচবিহারের একটি স্কুলে শিক্ষকতার কাজে জয়েন করে | এবং স্কুল কোয়ার্টারে বসবাস করতে লাগে | সন্তান জন্ম দেওয়া ইস্তক বড় করা অবধি কোনো অবাঞ্ছিত পরিবেশে না রাখতে বদ্ধপরিকর শ্রমণার মাতৃসত্তা |

--------

 " দ্যাখ মনা( শ্রমণার ডাকনাম), রজনীগন্ধা ফুলের গাছে বড় হয়েছে কিন্তু এখনো ফুল ধরলো না? "

 কোয়ার্টার সংলগ্ন জমিতে বাগান করেছে প্রমীলাদেবী | নানা রকম ফুল ও কিচেন সবজির | পরিচর্যার দায়িত্ব সকালে তপেনবাবুর এবং বিকেলে তাঁর |

 বিশেষ অনুরোধে একতলা সেপারেট কোয়ার্টার পেয়েছে শ্রমণা | আগাম মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছে এখন | বাগান লাগোয়া বারান্দায় বেতের সোফায় বসে নিষ্পলক আনমনা দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল রজনীগন্ধার | মায়ের কথায় চকিতে ভাবনা অতীতমুখী হলো | মনের পর্দায় ভেসে উঠলো স্বপ্নাবেশ মাখা এক দৃশ্য...

   প্রেমপর্ব চলাকালীন খড়দার একটি পার্কে প্রায়শ দেখা করতো তারা | তেমন একটি শীতের দুপুরে পলাশ গাছের নিচে ঘাসের গালিচায় বসে প্রেমালাপে মগ্ন প্রণয়ী যুগলে | গাছগাছালি ঘেরা পরিবেশে  ভালোলাগার অনলস মুহূর্ত যাপন করতো সুখের আবর্তে | শ্রমণার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ওর ডানহাতের কোমল তালু দুই করতলবদ্ধ করেছিল | রঙিন চোখে ভবিষ্যত স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে প্রিয়ম বলেছিল,

 " আমাদের সন্তান সে ছেলে হোক বা মেয়ে তার এমন  নাম দেবো, যা সচরাচর শোনা যায় না, বেশ ইউনিক টাইপের..

 " তাই বুঝি! তা সেরকম নাম কিছু ভেবেছো? "--- সলজ্জ হাসি শ্রমণার ওষ্ঠদ্বয়ে |

" হুম, ভেবেছি বৈকি.. মেয়ে হলে যোজনগন্ধা আর ছেলে হলে দুত্যিমান "---  উৎসুক স্বরে বলে |

 " বাহ্..নাম দুটো তো ভারী সুন্দর.. "

 " অবশ্য মেয়ের নাম নির্বাচনের পশ্চাতে তোমার পছন্দের যোগসূত্র আছে.. চোখে-মুখে দুষ্টুমির আভাস |

 শ্রমণার প্রশ্নসূচক চাহনির প্রত্যুত্তরে বলে,

 " মিলন ঋতুর শেষে পুরুষ হরিনের পেটের কাছ নাভি থেকে সুগন্ধি গ্রন্থিটি খসে পড়ে যায় | আমাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা.. মিলনের পরে আমাদের ভালোবাসার ফসল রূপে ভূমিষ্ঠ হওয়া নবজাতিকার গায়ের সুমিষ্ট আতর গন্ধ 'কস্তুরী 'র মতো যোজন দূর থেকে পাবো আমি... সে পৃথিবীর যেখানেই থাকি.. কেননা, বহু গুণসম্পন্ন প্রাণীজ সুগন্ধির ঘ্রাণ প্রকৃত অর্থেই যোজনগন্ধা | সর্বোপরি তোমার সবচেয়ে পছন্দের ফুলের নামের অন্তমিল থাকবে ওর নামে..."

   বিচ্ছেদের মাস দেড়েক আগে রজনীগন্ধা ফুলের একটি চারাগাছ শ্রমণার জন্মদিনে উপহার  দিয়েছিলো প্রিয়ম | সেই গাছটির হাল্কা সবুজ শরীর বেড়ে উঠে বাগানের শোভা বর্ধন করছে |

 শিক্ষিত, সংস্কারমুক্ত, আধুনিক মনস্ক প্রিয়মের বাবা-মা কিন্তু প্রাচীন পন্থী মনোভাবে বিশ্বাসী | বংশমর্যাদার অপলকা ধ্বজা তাঁরা এ যুগেও মহাদর্পে ওড়ায় | মা কুন্তলা দেবীর বদ্ধমূল ধারণা, বেজাতের মেয়ের রক্তের সাথে ব্রাহ্মণ বংশের রক্ত মিশলে রক্তের শুদ্ধতা থাকবে না, বংশ অধোগামী হবে | প্রিয়মের বাবা অখিলবাবুও একই ধারণা পোষণ করেন | কায়স্থের মেয়ের গর্ভের সন্তান চ্যাটার্জী বাড়ির বংশগৌরবকে কালিমা লিপ্ত করবে, জীবিতকালে তা কখনোই হতে দেবেন না |

   বিয়ের পরপরই কোম্পানির প্রজেক্টের কাজে তিন বছরের জন্য সস্ত্রীক বিদেশে পাড়ি দিয়েছে প্রিয়ম | বিয়ের দু'বছর পেরিয়েও সন্তান আসে নি তাদের | ওদিকে নাতির মুখ দেখার তীব্র বাসনাজনিত মায়ের বারংবার তাগাদা বিড়ম্বনায় ফেলেছে | প্রিয়মের সমস্ত টেস্ট রিপোর্ট নরমাল | কিন্তু সমস্যা আছে আসল জায়গায় | মা-বাবার পছন্দের ব্রাহ্মণকন্যার জরায়ু সন্তানধারণে অক্ষম | তাতে অবশ্য বিশাখাকে দোষ দেয় না | বংশ গরিমার ঠুনকো অহংবোধ হয়তো আজীবন পিতৃত্বের স্বাদ অনুধাবনে বঞ্চিত রাখবে তাকে |

--------

   সেদিন এপারে ফেরার সময় নৌকার ছই-য়ের ভেতর বসে প্রেয়সীর শেষ ইচ্ছাপূরণের অঙ্গীকার করেছিল প্রিয়ম | চিরবিরহের বেদনাতুর দুটি হৃদয় তৃপ্তি খুঁজে নিয়েছিল পরস্পরের শরীরী অবগাহনে | অজান্তেই প্রেয়সীর গর্ভে রোপন করেছিল নিজের বীজ | মিলন রাতের সেই চিহ্ন শ্রমণার ভবিষ্যত জীবনের গতিপথকে প্রচলিত প্রথার বিপরীতে ঘুরিয়ে দেয় | সিঙ্গেল মাদারের কথা জানাতে গিয়ে এটুকু সত্য গোপন করেছিল বাবা মায়ের কাছে |

 ছোট্ট শিশুর আগমনে পরিবারে খুশির বাতাবরণ | নতুন সদস্যকে নিয়ে সারাদিন কেটে যায় শ্রমণার বাবা-মায়ের | চিন্তনে এসেছে বিস্তর পরিবর্তন | সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে মেয়ের মাথায় হাত রেখে অকুন্ঠ আশীর্বাদ করে তপেনবাবু বলেছেন,

  তোর সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে ঘোলাটে কাঁচের চশমা পাল্টে জীবনকে দেখতে শিখলাম ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গিতে | গর্ভজাত সন্তানকে একার অভিভাবকত্বে মানুষ করায় নেই অস্বচ্ছতা, ভ্রষ্টাচারিতা, আছে নির্ভীক মননের লড়াকু প্রবণতা |

 বছর দুয়েক আগে শ্রমণা জন্ম দেয় একটি ফুটফুটে বাচ্চার | কোলে আসে কাঙ্খিত কন্যা সন্তান | নাম রেখেছে " যোজনগন্ধা " | ওকে ঘিরে তৈরী হয়েছে নিজস্ব এক দুনিয়া |

 সবচেয়ে আশ্চর্য্যের ব্যাপার সেদিনই প্রথম রজনীগন্ধার গাছে ফুল ফোটে!

 স্বহস্তে গাঁথা অদর্শনের প্রাচীরের ওপারে থাকা মানুষটির অদ্যাবধি কোনো খোঁজ রাখে নি শ্রমণা | কিন্তু চোখের আড়াল করলেও সর্বাঙ্গ জুড়ে অনুভূত হয় প্রিয়মের অবাধ উপস্থিতি | মোবাইলের  সিক্রেট ফাইলে সযত্নে রক্ষিত একত্রে মধুর সময় যাপনের অ্যালবাম বন্দি ছবিগুলোই ওর বিগত জীবনের মূল্যবান স্মৃতি-সম্বল |

 বাৎসল্যে সিঞ্চিত মাতৃহৃদয়ের অন্তঃস্থলে চোরাস্রোতের ঘূর্ণিতে অহরহ ঘুরপাক খায় শুধু একটি প্রশ্ন ---

  " সার্থকনামা হবে কি মেয়ের পিতৃদত্ত নামকরণ? "

saswati.munshi1987@gmail.com
হুগলী

Wednesday, March 31, 2021

ডিম নারকেল ভাপা

 

ছবি:শাশ্বতী মুন্সী

ডিম নারকেল ভাপা

শাশ্বতী মুন্সী


উপকরণ -- ৪টি ডিম,আধমালা নারকেল, ৪ টেবিল চামচ পোস্ত,২ টেবিল চামচ সাদা সর্ষে, ৫০ গ্রাম টকদই,ছ'সাতটা  কাঁচালঙ্কা,সর্ষের তেল প্রয়োজন মতো,নুন,চিনি স্বাদমতো  |

প্রণালী -- ডিম সেদ্ধ করে আধখানা করে কেটে রাখুন | পোস্ত, সর্ষে, নারকেল কোরা, তিনটে কাঁচালঙ্কা একসাথে মিক্সিতে পেস্ট করে নিতে হবে | এবার ওতে সামান্য হলুদ গুঁড়ো, নুন, চিনি,টক দই,কিছুটা সর্ষের তেল দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে রাখতে হবে | এরপর একটি মাঝারি মাপের টিফিন কৌটোয় বাটা মশলার মিশ্রণ ঢেলে ওর মধ্যে সেদ্ধ ডিমের টুকরোগুলো রেখে মশলার সাথে মাখিয়ে আরো দু 'তিন টেবিল চামচ সর্ষের তেল দিন | এখন তিন 'চারটি চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে কৌটোর ঢাকনা বন্ধ করুন | এবার ৫ মিনিট বেশি আঁচে ভাপিয়ে নেবার পরে ১০ মিনিট কম আঁচে ভাপিয়ে নিলেই তৈরী হয়ে যাবে ডিম নারকেল ভাপা |

saswati.munshi1987@gmail.com
হুগলী

স্মরণে শ্রীপঞ্চমী

 

ছবি  : ইন্টারনেট 
স্মরণে শ্রীপঞ্চমী
শাশ্বতী মুন্সী




 --- কি তাহলে তোরা রাজি তো?

 --- হ্যাঁ দিদিমনি, আমরা সবাই রাজি |

 --- ঠিক আছে, তাহলে এই বছর শিক্ষাঙ্গনে প্রথম সরস্বতী পুজো হওয়া শুরু হলো. প্রত্যেক বছর এই দিনটিতে বিদ্যার দেবীর পুজো করবো আমরা..,যদি তোরা সবাই মন দিয়ে লেখাপড়া করিস...

 --- হ্যাঁ. আ.. আ.. আ.. আ... সমস্বরে বলে উঠলো ঘরভর্তি পড়ুয়ার দল |

  শীতঋতুর অবসানে বসন্তের শুভ আগমন বার্তা ধ্বনিত হয় সরস্বতী পুজোর দিন থেকে | বসন্ত পঞ্চমী হিসেবে পরিচিত এই দিনটি স্কুল কলেজ থেকে গৃহস্থ বাড়ি - সর্বত্র দেখা যায় চেনা ছবি | আপামর বাঙালী মেতে ওঠে বাগ্দেবীর আরাধনায় | তবে কোথাও কোথাও বিসদৃশ ছবি দেখা যায় বৈকি | যেখানকার বাসিন্দাদের বসন্তের আমেজে সরস্বতী পুজো করা তো দুরস্ত,লেখাপড়ার সাথেই  যাদের যোজন দূরত্ব | তেমনই একটি জায়গা হলো শ্যামনগরের পদ্মপুকুর এলাকা লাগোয়া বস্তিপাড়া | চারপাশের অভিজাত,ভদ্র,শিক্ষিত পরিমণ্ডলে যা একেবারেই বেমানান | অনেক গুলো বছর ধরে শিক্ষার সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের মতো বসবাস করে আসছে বস্তিপাড়ার বাসিন্দারা |

    সর্বক্ষণ চেঁচামেচি,খিস্তিখেউর,আর উচ্চগ্রামে চলা ঝগড়ার পঙ্কিল পরিবেশের বস্তিপাড়াকে এলাকার উঁচুতলার বাবুরা এড়িয়ে চলতেন | কিন্তু হতদরিদ্র শ্রেণীর মানুষগুলোর সংসর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের ছেলেমেয়ের শিক্ষাগত উন্নতির কথা ভাবতে পারেন নি ভারতীদেবী | কেননা তিনি যে শিক্ষক বাবার মেয়ে | নৈতিক,মানবিক,সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক গড়ার কারিগর বাবার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে বড়ো হয়ে উঠেছিলেন আশৈশব থেকে | ফলত ভূপেনবাবুর (ভারতীদেবীর বাবা) মতাদর্শে প্রাণিত তার শিক্ষানুরাগী সত্তা কখন যেন দীক্ষিত হয়ে গেছিল " সকলের জন্য শিক্ষা " - এই মন্ত্রে | বাবা নয় বরং একজন শিক্ষকের কাছে নিয়েছিলেন জীবনদর্শনের দীক্ষা | কাকচক্ষু জলের মতো স্বচ্ছ ও মেঘমুক্ত আকাশের তারার মতো স্পষ্ট ছিল তার জীবনদর্শন |

 শিক্ষা,সম্মান,অর্থ,আভিজাত্যে উচ্চ-মধ্যবিত্তের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছিল পদ্মপুকুর এলাকার দত্তবাড়ি | এই বাড়ির কর্ত্রী ভারতীদেবী আদতে একজন গৃহবধূ | শিক্ষাগত যোগ্যতার ঝুলিতে মাস্টার ডিগ্রি থাকলেও সাংসারিক কর্মপ্রবাহে জীবন যাপনে স্বচ্ছন্দবোধ করতেন তিনি | তবে শিক্ষার্থী থাকাকালীন স্কুলজীবন থেকে আশেপাশের গরিব দুঃস্থ পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদানে নিবৃত্ত ছিলেন,বিনা বেতনে | বিবাহ পরবর্তী জীবনে শুধু নিজ সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্ব স্বস্কন্ধে নিয়েছিলেন | কিন্তু " প্রতিটা শিশুর আছে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার " এই আপ্তবাক্যটি তাঁর চিন্তনকে সুস্থির থাকতে দেয় নি | এমন কিছুর সন্ধানে ছিলেন যেখানে দীক্ষামন্ত্রের যথাযথ প্রয়োগ করলে তা কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারবে |

    দত্তবাড়ির সীমানার ওপ্রান্তে দুপাশে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বস্তির ঘিঞ্জি ঘরগুলোতে বাস করে অসংখ্য দিনমজুরের পরিবার | লেখাপড়া যাদের কাছে বিলাসিতার নামান্তর | আর্থ সামাজিক অবিচার ব্যাবস্থার দরুন এইসব অতি দরিদ্র এবং  অবহেলিত গোষ্ঠীর পরিবারের শিশুরা যেমন  সহজে পায় না প্রাথমিক স্কুল,তেমনি না পায় লিখতে ও পড়তে পারার সুযোগ | সুতরাং বংশানুক্রমিক ভাবে দরিদ্র বাবা মায়ের সন্তানেরা দারিদ্র্যচক্রের মধ্যে আটকে যায় | সারাদিন তো বটে এমনকি রাতের বেশিরভাগ সময় বস্তির মধ্যবর্তী রাস্তায় ধুলোবালি মেখে খেলে কাটায় তারা | যাতায়াতের পথে ওদের শৈশব-বাল্যের মূল্যবান দিনগুলোকে এভাবে নষ্ট হতে দেখে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ভারতীদেবী একদিন পৌঁছে গেছিলেন বস্তির প্রত্যেকটা দরজায় |

  ঘরের পরিবেশে শিক্ষার অপ্রতুল পরিস্থিতিতে শিশুদের বেড়ে ওঠা | এরকম বিরুদ্ধ পরিবেশ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে শিশুর কাছে প্রকৃত শিক্ষক হতে পারাটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জ ছিল! লেখাপড়ার গুরুত্ব কি,জীবনে স্বাবলম্বী হবার জন্য তা কতোটা জরুরি,শিক্ষার কোনো বয়স হয় না -- এসব কথা বোঝানোতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল তাঁকে | বলা ভালো প্রথমে কেউই তেমন আগ্রহ দেখায় নি | কিন্তু ভারতীদেবীর সহৃদয়তা এবং আন্তরিক আহ্বানে অল্পদিনেই মিলেছিল আশাতীত সাড়া |

   নিজের বাড়িতে খুলে বসেছিলেন অবৈতনিক শিক্ষাঙ্গন | জাত-ধর্মের ভেদাভেদ না রেখে সকলের জন্য অবারিত করেন শিক্ষাঙ্গনের দ্বার | প্রাথমিক শিক্ষার অঙ্গনে কচি কাঁচা কোমল সুকুমারমতি শিশুদের নাড়াচাড়া করতে করতে তাদের মনের ভেতরে প্রবেশ করার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় পেয়েছেন অমলিন আনন্দ | শিশু থেকে কিশোর -- সব বয়সের ছেলেমেয়েদের হাতে ধরে অক্ষর পরিচয় করানো এবং বাংলা,ইংরেজি,অঙ্কি,ইতিহাস, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয় পড়ানোর দায়িত্ব নেন স্বইচ্ছায় |

  একবছরের মধ্যে বাড়ির পশ্চিমদিকের অব্যবহৃত বড়ো ঘরখানি রূপান্তরিত হয়েছিল ছাত্রছাত্রীদের স্থায়ী শ্রেণীকক্ষে |  সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সপ্তাহে ছ'দিন রুটিন মাফিক পঠন পাঠন চলে সেখানে | বাগান সংলগ্ন শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ  ওদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে লেগেছিলো | রফিক,জামাল,নন্টে,হাবুল,নাজিমা,বুল্টি,ইকবাল,ঝুনি,রুকু,আসিমা,সাজিদা  -- নানা বয়সী পড়ুয়াদের জন্য ছিল সমান শিক্ষা |

  অবশ্য এই সাধু উদ্যোগে পাশে পেয়েছিলেন স্বামী পরেশ(দত্ত) বাবু এবং পুত্রকন্যা রিন্টু ও রিম্পিকে | ওদের পূর্ণ সমর্থনে শিক্ষাদানের এমন মহৎ কর্মকাণ্ডে অবতীর্ণ হতে পেরেছেন |

 স্ত্রীয়ের মহানুভবতা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন পরেশবাবু | তাই সোৎসাহে এক কক্ষবিশিষ্ট এই  শিক্ষাঙ্গনের নাম রাখলেন  " ভারতীয়ালয় " |

   বস্তিবাসীর প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের মধ্যে  লেখাপড়া শেখার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ পরিলক্ষিত করেন ভারতীদেবী | তা দেখে বিদ্যার দেবীর আরাধনা করার ভাবনা আসে মনে |  ইতিপূর্বে বাড়িতে সরস্বতী পূজো করেন নি কোনোবার | তাই এ ব্যাপার ছেলেমেয়ের মনোভাব জানাটা জরুরি মনে করলেন | সেইমতো ওদের ঘরে গিয়ে "এবছর সরস্বতী পুজো করলে করলে কেমন হয় রে রিন্টু রিম্পি? " --- খাটে বসে কথাটি বললেন তিনি |

সন্ধ্যেবেলা নিজেদের পড়ার ঘরের চেয়ার টেবিলে বসে দুই ভাইবোন পড়ছিল | এ হেন কথায় চকিতে মায়ের দিকে ঘুরলো দুজনে | পড়া থামিয়ে খুশিতে টগবগ করে উঠে ওনার দু'দিকে বসে পরলো | তারপর উৎসকু কণ্ঠে রিম্পি বললো,

 --- পূজো করবে মা! তাহলে তো খুব ভালো হবে, আমার কত্ত বন্ধুর বাড়িতে পূজো হয় ওরা স্কুল এবং বাড়ি - দু জায়গাতেই আনন্দ করতে পারে,কিন্তু আমি আর দাদা শুধু স্কুলের পূজোতে যা আনন্দ করতে পারি সকালটুকু...

বোনের কথার রেশ ধরে রিন্টু বললো,

 --- হ্যাঁ মা,বাড়িতে পূজো হওয়ার মতো আনন্দ আর কিছুতে হয় না,তাছাড়া তোমার ছাত্রছাত্রীরাও পূজো দেখতে আসবে,আনন্দে সামিল হবে...

ছেলেমেয়ের উৎসাহে খুশি হলেন তিনি | বললেন,

 --- পূজো তো করবোই,তবে বাড়িতে নয়...

 --- বাড়িতে নয়!তাহলে কোথায় করবে মা,একসাথে জিজ্ঞেস করলো দুটিতে |

 --- বাড়ির সামনে বাগানের পাশে যে ফাঁকা জমি আছে,ওখানে প্যান্ডেল করে মণ্ডপ বানিয়ে পূজোর ব্যবস্থা হবে...আমি চাই বস্তির সকলে দর্শনার্থী হয়ে নয় পূজোর আয়োজকের অন্যতম অংশ হোক,কেননা বাড়ির ভেতর পূজো করলে ওরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পুজোতে যোগদান করতে পারবে না,আর নিজেদের পূজোও ভাবতে পারবে না...ওদের সবাইকার অংশগ্রহণে বিদ্যার দেবীর আরাধনার হয়ে উঠবে সর্বজনীন উৎসব...

মায়ের মনের প্রসারতায় মুগ্ধ হলো রিন্টু রিম্পি! দু'পাশ থেকে দুজনে ভারতীদেবীকে জড়িয়ে ধরেএকসাথে বললো,

 --- তুমি কত বড় মনের মানুষ মা... আনন্দ যে সকলের সাথে ভাগ করে নিতে হয়,তা কি সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলে...

সন্তানদের স্নেহের আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে ভারতীদেবী স্মিত হেসে বললেন,

 --- আনন্দ ভাগ করে নেবার শিক্ষা আমি কার কাছে পেয়েছি জানিস?..তোদের দাদুর থেকে

তারপর যেন খানিক গল্প বলার মতো বলতে লাগলেন,

 এই যে তোরা সরস্বতী পূজোয় সেজেগুজে স্কুলে যাস,আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে খাওয়া দাওয়া করিস,আমাদের সময় কিন্তু স্কুলের পূজোতে যাওয়ার তেমন একটা চল ছিল না,

 --- কেন মা,তোমাদের ছোটবেলায় কি স্কুলে পূজো হতো না?, সরল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো বছর এগারোর রিম্পি |

মেয়ের সরলতায় সহাস্যে ভারতীদেবী বলে উঠলেন,

 --- ওরে পাগলী মেয়ে,পূজো কেন হবে না... ছোট বড়ো সব স্কুলেই বছরের এই বিশেষ দিনটিতে বিদ্যার দেবীর পুজোআচ্চা করে ছাত্রছাত্রীসহ বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতির প্রার্থনা জানানো হয় মা সরস্বতীর চরণে,আর আমাদের স্কুলেও বড়ো করে পূজো হতো,এখন যেমন অনেক স্কুলে প্যাকেট সিস্টেম হয়েছে,তখন কিন্তু বসিয়ে খাওয়ানোর রীতি ছিল প্রায় সব স্কুলে... আর একটা বন্ধুদের সাথে লাইন দিয়ে বেঞ্চে বসে খিচুড়ি খাওয়ার মজাই আলাদা... তবে আমি কিন্তু মাত্র একবারই সেই মজা উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছিলাম... স্কুলের শেষ বছরের পূজোয়...

অবুঝের মতো মায়ের মুখের দিকে মিনিট কয়েক তাকিয়ে রইলো দুজনে একসাথে বললো,

 --- দাদু দিদুন কি তোমায় স্কুলে যেতে দিতো না মা?

ছেলেমেয়ের মুখের ভাবখানা দেখে মনে মনে একচোট হেসে নিলেন,তারপর খাটে পা মুড়ে বসে ওদেরকে সামনে বসিয়ে বললেন,

 --- শোন, আমার বাবা মা কক্ষনো স্কুলে যেতে বারণ করেন নি,বরং আমারই তো যেতে ইচ্ছে করতো না...

 --- সেকি গো মা...সরস্বতী পূজোয় তোমার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করতো না!,সমস্বরে কথাটা এমন ভাবে বললো তারা যেন পূজো স্কুলে যেতে ইচ্ছে না করাটা প্রায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার |

 ---  যেতে ইচ্ছে করবে কি করে!আমাদের তো বাড়িতেই পূজো হতো,যখন আমরা তিন ভাইবোন লেখাপড়া শুরু করেছি,সেই তবে থেকে বাড়িতে সরস্বতী পূজো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাবা | তাছাড়া শুধু বাড়ির পূজো নয় এর সাথে আরো দু' দুটো পূজোর আনন্দ করতাম আমরা |

 মায়ের কথা শুনে বিস্ময়ে চোখ গোল গোল হয়ে গেছে দুজনের! জিজ্ঞাসু কণ্ঠে রিন্টু বললো,

 --- বলো না মা,আর দুটো পূজো কাদের বাড়িতে হতো?

 --- তখন পাড়ার সব ঘরেই লক্ষ্মী পূজোর মতো সরস্বতী পূজোও হতো,কিন্তু তোদের দুই মামার কৈশোরে মানে ওই ১৪-১৫ বছর বয়স থেকে আমাদের পাড়াতেই দুটো আলাদা জায়গায় পূজো শুরু করেছিল বন্ধুদের সাথে মিলে,আর সেই পূজোর প্রতিমা কে বানাতো জানিস? তোদের বড়মামা... পূজোর সমস্ত জোগাড় করতাম আমি,তোদের দিদুন আর আমার বান্ধবী সবিতা...

 মায়ের ছোটবেলায় সরস্বতী পূজোর দিনের কথা বেশি করে জানাতে আগ্রহী দুই ভাইবোনে ওনার কাছ ঘেঁষে সরে আসলো | তারপর,

 --- আরো কি কি করতে বলো না মা,বলে উঠলো সমস্বরে |

 সন্তানদের উৎসুকতা উস্কে দিলো তাঁর কিশোরীবেলার স্মৃতি | তারপর স্মৃতির সরনী বেয়ে পিছনে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলেন,

   জানিস,বাড়ির পূজো এবং তোদের মামাদের দুটো পূজোতে খুব আনন্দ করতাম আমরা | বাবা প্রতি বছর নতুন শাড়ি কিনে দিতেন,দুপুরে মায়ের রান্না করা খিচুড়ি ভোগ খেতাম সকলে মিলে... দাদা ও ভাইয়ের বন্ধুরাও খেত আমাদের সাথে..তবে রাতের আয়োজন হতো এলাহী,তোদের দাদুর ইচ্ছা মতো পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েদের নেমন্তন্ন থাকতো আমাদের বাড়িতে.. বেগুনি,কড়াইশুঁটির কচুরি,আলুরদম, চাটনি,পায়েস... দরাজ হাতে খাওয়ানো হতো...

বছরের এই বিশেষ দিনটি নতুনত্বের অনুভূতি নিয়ে বারবার ফিরে আসতো ভারতীদেবীর মেয়েবেলায় |

                         --------------

   ইংরাজি নববর্ষে সরস্বতী পূজো পড়েছে জানুয়ারির শেষের দিকে | বাপেরবাড়িতে পুজো করার অভিজ্ঞতালব্ধ ভারতীদেবী পূজার্চনার আয়োজনে যথেষ্ট করিৎকর্মা | বিয়ের পরে এটা যেহেতু তাঁর প্রথম পূজো,সেহেতু মনস্থ করলেন বিদ্যার দেবীর উৎসবকে সর্বজনীন ভাবে পালন করার | তাই এব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনার জন্য ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকসহ বস্তির অন্যান্য বাসিন্দাদের এক রবিবারের সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে ডেকে পাঠালেন | পড়ানোর ঘরে সকলে জড়ো হলে পরিকল্পনা মতো প্যান্ডেল তৈরী করা,মণ্ডপ সাজানো,প্রতিমা আনা,বাজার করা,আল্পনা দেওয়া,ইত্যাদি পুজোর আনুষঙ্গিক কাজগুলো মহিলা ও পুরুষদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে বললেন,

 --- তোমাদের কারো কোনো অসুবিধা নেই তো... থাকলে নিঃসংকোচে এখুনি বলতে পারো,

সকলে গলা মিলিয়ে বলে উঠলো,

 ---  আপনি যখন মাথার ওপরে আছেন তাহলে আর মোদের কিসের অসুবিধা...

 --- তবে কোনো পূজোর জোগাড় জন্তি আগে কখনো করি নি..,শুধু একটু দেখিয়ে দেবেন কিভাবে করতে হয়,মোরা হাতে হাত মিলিয়ে সব কাজ করে দেবো,বললো নন্টের মা খেন্তি |

 --- আচ্ছা আচ্ছা,সেসব আমি শিখিয়ে দেবো'খন..

তারপর যেন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতেই ভুলে যাচ্ছিলেন এমন ভাবে বললেন,

 --- ওহো তোমাদের তো আসল কথা বলা হয় নি,শোনো সরস্বতী পূজোর দিন দুপুরে ও রাতে দু' বেলা সকলের এখানে নেমন্তন্ন রইলো, রান্নার ঠাকুর দিয়ে খাওয়া দাওযার বন্দোবস্ত করবো...ঐদিন মেয়ে-বৌদের রান্না থেকে ছুটি, সারাদিন রাত শুধু উৎসবের আনন্দে কাটাবে তোমরা..

ভারতীদেবীর কথায় সকলে বিস্মিত হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো!হতদরিদ্র মানুষগুলোর কাছে এমন নেমন্তন্ন পাওয়া শুধু অভাবনীয় নয় অবিশ্বাস্য বটে... তা বলে ওরা তো আর হ্যাংলা নয় যে দু বেলা পেটপুরে খেতে পাবার লোভে চকচক করে উঠবে অগণিত চোখজোড়া.. তাই মুখমণ্ডলে অবাক হবার ছাপ ফুটে উঠলো সকলের...

মিনিট কয়েকের বাকরুদ্ধ নীরবতার পর দুটি ছাত্রছাত্রীর অভিভাবক চপলা ও ফতেমা বললো,

 --- আজ্ঞে দিদিমণি,আমরা এতো জনা থাকতে রান্নার ঠাকুর কেন লাগবে! এই বস্তির মেয়ে-বৌরা মিলে হাতে হাত লাগিয়ে সব রান্না করে নিতে পারবো |

 --- আহা.. তোমরা বুঝছো না আমার কথাটা.. আমি চাইছি একটা দিনের জন্য তোমাদের রান্নার কাজ থেকে ছুটি দিতে,আর তাছাড়া অতোগুলো লোকের রান্না করাও যে চাট্টি খানি কথা নয়,সেটা ভেবে দেখেছো কি..?

এবার বুল্টির মা সনকা বেশ জোর দিয়ে বললো,

 --- রাঁধুনে বামুনরা তিন চারজন জোগাড়ে নিয়ে কাজবাড়িতে কত শত মানুষের খাবার রাঁধতে পারে যখন,তাহলে এতোগুলান মেয়েমানুষেরা একসাথে নিচ্চয় সব রান্না করি দিতে পারবো |

  ওর কথায় সায় দিয়ে ঘরে উপস্থিত মেয়ে বৌদের কণ্ঠ থেকে একযোগে হ্যাঁসূচক শব্দ বের হলো |

 ব্যাস এরপর ভারতীদেবীর দ্বিমত প্রকাশের জায়গা থাকে না | তাই হাসিমুখে তিনি বললেন,

 --- ঠিক আছে,তোমরা যেমন চাইছো তেমনটি হবে | আরো একটা কথা আছে তা হলো,পূজোর এবং খাওয়া দাওযার যাবতীয় খরচ কিন্তু আমি দেবো.. কি এতে তোমাদের আপত্তি নেই তো..?

ঘরের শান্ত পরিবেশ যেন সহসা মুখরিত হয়ে উঠলো প্রত্যেকের সরব কণ্ঠের টুকরো টাকরা কথার গুঞ্জনে.. কেননা এমন অচিন্তনীয় কথা শুনতে তাদের কানজোড়া যে এক্কেবারে অভ্যস্ত নয়!

 নিচু স্বরে চলা ওদের কথাবার্তায় কিছুটা আন্দাজ করতে পারছিলেন তিনি | তবু ওরা কি চায় সেটা জানার জন্য বললেন,

 --- তোমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলবে নাকি আমাকেও জানাবে?

  বস্তির এক বয়স্ক বাসিন্দা হারান গলুই বিনীত কণ্ঠে বললো,

 --- ছোট মুখে একখান বড় কথা বলচি দিদিমণি,আপনের কথায় আপত্তি আছে আমাদের..

 জিজ্ঞাসু চোখে হারানের মুখের দিকে উনি তাকালে সে বলতে লাগলো,

 --- আমরা অত্যন্ত গরিব মানুষ,মাইনে দিয়ে বাচ্চাদের ইস্কুলে পড়ানোর সাধ্যি কোথায় বলুন! আপনে দয়াপরবশ হয়ে বিনি পয়সায়  ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্চেন বলে ওদের কেউ মুখ্যু বলতি পারবে নি.... এরওপর পূজো ও মোদের খাওয়া দাওয়ার সব খরচও আপনে একা দেবেন তা কেমন করে হয় দিদিমণি!

ওনার কথার খেই ধরে হাবুলের বাবা রতন বললো,

 --- হারান জ্যাঠা ঠিক কইচেন দিদিমণি,আমরা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ,রোজগারের বেশিরভাগটাই লেগে যায় পেটের খিদে মেটানোর দু'মুঠো ভাতের যোগান দিতে... তাও যার যার সামর্থ মতো কিছু টাকা দিতে চাই |

 --- আরে এটা তো আর চাঁদা তুলে পূজো হচ্ছে না.. উপযাচক হয়ে পূজো করার কথা আমি যখন ভেবেছি,তখন তোমাদের থেকে টাকা নেওয়া যে অনৈতিক হবে রতন..

 --- না না দিদিমণি,চাঁদা তুলে তো পাড়ার অল্প বয়সী ছেলেরা পূজো করে, মোদের আর কতটুকুন সাধ্যি বলুন! তবুও লেখাপড়ার ঠাকুরের পূজোর জন্যি যতটুকু পারি দেবো,আপনে আর অমত কইরবেন না দিদিমণি,হাতজোড় করে কথাগুলো বললো রতন |

 অশিক্ষিত মানুষগুলোর আন্তরিকতা এবং সর্বসম্মত ভাবে ইচ্ছাপ্রনোদিত হয়ে পুজোয় যোগদানের আর্জিতে খুশি হলেন ভারতীদেবী | হৃষ্ট চিত্তে বললেন,

 --- তোমাদের কথাই মেনে নিলাম | দিও তবে সকলের সাধ্য মতো অল্প কিছু কিছু করে |

 লহমায় প্রত্যেকের মুখভঙ্গীতে হাসি ও স্বস্তির মিশ্র অভিব্যক্তি দেখা গেল |

                         -----------------

   সরস্বতী পূজোর দিন সাতেক আগে বাগানের পাশের ফাঁকা জমি পরিষ্কার করে প্যান্ডেল তৈরী করে দিয়েছে বস্তির ছেলে ছোকরারা | রঙিন কাগজের শিকলি এবং রং,জরি,চুমকি,সুতো দিয়ে তৈরী শোলার হস্তশিল্পে সজ্জিত হয়েছে মণ্ডপের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসজ্জা | দেবীপ্রতিমার আসনকে পুষ্পশোভামন্ডিত করে রাখা হয়েছে বাগানের হলুদ কমলা গাঁদা,ডালিয়া,গোলাপ,চন্দ্রমুখী ফুলের টব দিয়ে |

 আগামীকাল মাঘ পঞ্চমীর পুণ্য তিথি | সেকারণে আগের দিন রাতে পুজোর প্রস্তুতির শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে জোরকদমে |

 পশ্চিমের ঘরের পেছনের উঠোনে বড়ো করে আরেকটা প্যান্ডেল হয়েছে | যেখানে একদিকে রান্না হবে আর অন্যদিকে চেয়ার টেবিলে খাওয়ানো হবে | ছাত্রছাত্রীদের পড়ার ঘরে পরের দিনের দু'বেলার রান্নার জোগাড়ের জন্য সবজি কেটে,মশলা বেটে যথাসম্ভব কাজ এগিয়ে রাখছে মেয়ে বউরা | আজ রাতে বস্তির কারো উনুনে হাঁড়ি চড়বে না | ভারতীদেবীর হেঁশেলেই সব্বাইয়ের খাওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছে | সেইমতো মেয়ে বউরা দুটি দলে ভাগ হয়ে আজকের ও কালকের রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত রয়েছে | তবে ঠাকুরের ভোগ  নিজে হাতে রাঁধবেন তিনি |

  মাঘের মাঝামাঝি সময়ে বাতাসে ঠান্ডার আমেজ ভালোই অনুভূত হচ্ছে | ঘরের এককোনে আসন পেতে বসে ঠাকুরের ভোগ রান্নার উপকরণ একলাই গুছিয়ে রাখছেন ভারতীদেবী | পরনে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ির ওপর ফুলহাতা সোয়েটার  | হঠাৎ কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন তিনি | অদৃশ্য কোনো জাদুকরের জাদুকাঠির মায়াবলে সামনের দৃশ্যপট পলকে বদলে গেল অতীতে | ফেলে আসা কিশোরীবেলার স্মৃতির সমুদ্রে অবগাহন করামাত্র ভেসে আসতে লাগলো একের পরে এক দৃশ্য... যেন টাইম মেশিনে চড়ে তিনি পৌঁছে গেছেন এমনই এক সন্ধ্যা উত্তীর্ণ শীতের রাতে,যেখানে কিশোরী বয়সী ভারতীদেবী সরস্বতী পূজোর জোগাড় করছেন বান্ধবী সবিতার সাথে... পাশে ভোগের আয়োজনে ব্যস্ত রয়েছেন ওনার মা...শুনতে পাচ্ছেন দুই বান্ধবীর অস্ফুট কথাও... এবার দৃশ্য বদলে গেল পূজোর সকালে...চিরপরিচিত বাপেরবাড়ির বৈঠকখানা ঘরে আল্পনা দেওয়া ছোট জলচৌকির ওপর দেবী মূর্তি বসিয়ে পূজার্চনা চলছে... স্নান সেরে নতুন কাপড় পরে দুই বান্ধবীতে বসে আছেন প্রতিমার সম্মুখে...  শঙ্খ-ঘন্টা-কাঁসরের মিশ্রিত ধ্বনি,করজোড়ে ঠাকুর মশাইয়ের সাথে পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্রোচ্চারণ... পঞ্চপ্রদীপের আরতি,হোমের প্রজ্জ্বলিত আগুন,মায়ের রান্না করা ভোগ নিবেদন,ধূপ ধুনোর সৌগন্ধে স্বর্গীয় বাতাবরণ...পরক্ষনেই দেখলেন দৃশ্য একই রয়েছে শুধু পূজোর স্থানটি হয়ে গেছে প্যান্ডেলের ভেতর...দাদা ও ভাইয়ের বন্ধুরা মিলে করা দুটি পূজোতে তাঁরা রয়েছেন... দুপুরে বাবা মা সবিতা,দাদা ভাই ওদের বন্ধুরা একসাথে ভোগ খাচ্ছেন ঘরের দালানে বসে ---- সবাক চিত্রের ন্যায় চলমান দৃশ্যগুলি ত্রিশোর্ধ ভারতীদেবীর মনের পর্দায় প্রতিভাত হয়ে উঠলো...

    কাজ করতে করতে চপলা লক্ষ্য করছিল দিদিমণি কেমন যেন আনমনা হয়ে গেছেন | সেদ্ধ আলুর খোসা ছাড়ানো বন্ধ রেখে স্থির দৃষ্টিতে সামনের দেওয়ালের পানে তাকিয়ে রয়েছেন | নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো | কালকের দুপুরের মেনুতে বাঁধাকপির তরকারি হবে,তাই-ই কুটছিল সে | কিন্তু আর কতগুলো কুটবে তা জানার জন্য ভারতী দেবীকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে ওনার মৌন অবস্থা চোখে পড়ে চপলার | একটুক্ষণ দোনোমোনো করে মৃদু স্বরে সে ডাকলো,

 --- দিদিমণি,ও দিদিমণি.. বলতেছিলাম কি..

সময় নদীর স্রোতের বিপরীতে ভাসমান স্মৃতির ভেলায় চড়ে কিশোরীবেলার কোনো এক সরস্বতী পূজোর সোনালী দিনে চলে গেছিলেন তিনি | অতীতের যাপন করা ভূমিতে ঘুরে বেরিয়ে ফিরে আসছিলেন তখুনি মেয়েলি কণ্ঠস্বরের পরিচিত সম্বোধনে সম্বিৎ ফিরলো তাঁর | দেখলেন সব ক'টি মেয়ে বৌয়ের অবোধ্য চাহনি ধাবিত রয়েছে তাঁরই মুখমন্ডলে | বুঝলেন সরস্বতী পূজোর প্রাক পর্বের প্রস্তুতির আবহে ক্ষণিকের তরে স্মৃতি মেদুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন!এক লহমায় বর্তমানে ফিরে এসে বললেন,

 --- কেউ কি কিছু বলছিলে?

 --- আমি বলছিলাম দিদিমণি,কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হতিছিল কিছু যেন ভাবতি ছিলেন,খানিক দ্বিধা জড়িত স্বরে বললো চপলা |

 --- হুম ভাবছিলাম বৈকি,তোমাদের সহযোগিতায় সরস্বতী পূজো করতে নেমে আমার মেয়েবেলার এমন এক পূজোর দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো

 --- বিদ্যের ঠাকুরের পূজো আপনে ছোটবেলায় করেছিলেন দিদিমণি!, চোখের তারায় বিস্ময় ফুটিয়ে বললো ফারিদা ও জবা |

 ক্ষণিক আগের মুহূর্তগুলির বর্ণনা বিশদে না দিয়ে সংক্ষেপে বললেন,

 --- হ্যাঁ আমাদের বাড়িতে পূজো হতো,মায়ের সাথে পূজোর উপাচার সামগ্রী কেনাকাটা থেকে জোগাড় যন্ত করা সবই করতাম... পূজোআচ্চার দিকে আমার আগ্রহ দেখে থাকায় কোন পূজোয় কি কি উপকরণ লাগে,একেকটি পূজোর আচার বিধি কেমন হয় ইত্যাদি মায়ের কাছে শিখে নিয়েছিলাম..

 --- লেখাপড়া ছাড়াও কতকিছু জানেন আপনে,সেই জন্যি পূজোর ব্যাপার স্যাপার কেমন সোন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন,অবাক ও উৎফুল্ল  মেশা গলায় বললো তারা |

স্মিত হাসলেন ভারতী দেবী | তারপর একটু আসছি বলে উঠে গেলেন | মিনিট তিনেক পরে দুটো বড়ো বিগ সপার হাতে নিয়ে ঘরে এসে বললেন,

 তোমাদের সকলের জন্য হলুদ রঙের শাড়ি,জামা,ফতুয়া,পাঞ্জাবী কিনেছি | কাল নতুন পোশাক পরে পূজোর অঞ্জলি দেবে...

 বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়া ওদের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন,

 --- ভেবো না যে শুধু তোমাদের জন্য নতুন জামা কাপড় কিনেছি,আমরা চারজনও কাল নতুন পোশাক পরে অঞ্জলি দেবো... আর এসব কেনার টাকা তোমাদের দাদাবাবু দিয়েছেন |

                          ---------------

  বাঙালীর বারোমাসে তেরো পার্বন | প্রত্যেক ঋতুতে চক্রাকারে আবর্তন করেই চলা কিছু না কিছু ব্রত পূজো পার্বনের অন্তর্ভুক্ত হয় |  তেমনই বিদায়ী শীত আর আগত বসন্তের সন্ধিক্ষণে পালিত হওয়া সরস্বতী পূজো হলো বসন্তের প্রথম উৎসব তথা অন্যতম পার্বন | কিন্তু নিম্নবিত্ত এই বস্তিবাসীরা দেবদেবীর পূজো কেন্দ্রিক উৎসব বলতে মূলত দুর্গোৎসবকেই বুঝে এসেছিলো | সরস্বতী পূজোর আনন্দোৎসব থেকে এযাবৎকাল বঞ্চিত ছিল ওরা | তবে এবছর ভারতীদেবীর বদান্যতায় আরেক উৎসবের সামিল হবার সৌভাগ্য হলো তাদের |

   মণ্ডপের ভেতরে বড়ো চৌকির উপর রাখা আছে কাঠের পিঁড়ি | যেটাতে সালমার হাতে অঙ্কিত  খড়িমাটির আল্পনার বেষ্টনীতে অধিষ্ঠিত রয়েছেন শ্বেতপদ্মাসনা বীণাপানির কাঠামোর মূর্তি | পঞ্চমী তিথি পড়ে গেছে ভোররাতে | বস্তির মেয়ে-বউরা সক্কাল সক্কাল উঠে পড়েছে | স্নান সেরে নতুন শাড়ি পরে সদলবলে  হাজির হয়েছে পূজা প্রাঙ্গনে | আজকে ভারতী দেবী পূজোর জোগাড়ের কাজে হাত লাগান নি,বরং উনি যেভাবে বলেছেন সেইভাবে মেয়ে-বউরা মিলে পূজোর উপাচার সামগ্রী দিয়ে গোছগাছ করে ফেলেছে |

   যথাসময়ে এসে পড়লেন পুরোহিত মশাই | আমের মুকুল,যবের শিষ,অভ্র,আবির, হলুদ গাঁদা দোয়াত,কলম,ফুল,শ্বেত চন্দন,পুস্তক ইত্যাদি অর্ঘ্য উপাচারে শুরু হয়ে গেল বাগেশ্বরীর আরাধনা | শাস্ত্রমতে পূজাপাঠের অনুষঙ্গে মুহুর্মুহ বেজে উঠছে  শঙ্খ-কাঁসরের মিশ্রধ্বনি | বস্তির বাসিন্দারা নতুন পোশাক পরে উপস্থিত রয়েছে পূজো প্রাঙ্গনের অন্দরে | রয়েছেন পরেশবাবুসহ রিন্টু,রিম্পি | ধূপ ধুনো ফুল চন্দনের সুবাসে বিরাজ করছে স্বর্গের পবিত্রতা | উৎসবের আমেজে গা ভাসানোর খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে সকলে |

 একটুক্ষণ পরে ভারতীদেবীকে উদ্দেশ্য করে পুরোহিত মশাই বললেন,

 --- এবার পুষ্পাঞ্জলি হবে,যারা যারা দেবেন এগিয়ে আসুন..

প্রত্যুত্তরে উনি বললেন,

 --- এখানে উপস্থিত সবাই অঞ্জলি দেবে ঠাকুর মশাই,

 --- ও,তা বেশ... তাহলে পুষ্পপাত্র থেকে সবাইকে ফুল দিয়ে দিন,তারপর আমার সাথে পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র মনে মনে বলবেন...

 সমবেত কণ্ঠে উচ্চারিত হতে লাগলো,

   "ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে,কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।

 বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে,ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে॥

 নমঃ ভদ্রকালৈ নমো নিতং সরস্বতৈ নমো নমঃ।

 বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্হানেভ্য এব চ॥

 এস স-চন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বতৈ নমঃ॥"

 

  দেবী সরস্বতীর ঐশ্বরিক প্রভা এবং প্রার্থিত বিদ্যে,বুদ্ধি,জ্ঞানের বন্দনায় হাতের মুঠোয় হলুদ গাঁদা,দোপাটি ফুলের লাল সাদা পাপড়ি,বেলপাতা কুচি নিয়ে মুদিত নয়নে অঞ্জলি দেওয়া বহু চেনা প্রায় মুখস্থ হয়ে যাওয়া মন্ত্রোচ্চারণ ভারতীদেবীকে শৈশব-কৈশোরের সুখস্মৃতির নস্ট্যালজিয়ার আবেশে ভরিয়ে দিলো |

   তিনবার পুস্পাঞ্জলির মন্ত্র পাঠ করার পরে পুরোহিত মশাই বললেন,

 এখন আমার মন্ত্রপাঠ শুনে শুনে আপনারা দুই হাত জোর করে নত মস্তকে সরস্বতীর প্রণাম মন্ত্র বলতে থাকুন,

   " নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে |

     বিশ্বরূপে বিশালক্ষ্মী বিদ্যাংদেহি নমহস্তুতে ||

     ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে,কুচযুগশোভিত

     মুক্তাহারে |

     বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে,ভগবতী ভারতী দেবী

     নমহস্তুতে ||"

   এরপর ঘন্টাধ্বনি সহযোগে পঞ্চপ্রদীপের আরতি,ঘি-বেলপাতা-বেলকাঠ দিয়ে হোম প্রভৃতি পূজা বিধি অনুযায়ী বাগ্দেবীর আরাধনা সম্পন্ন হলো |

 পুরোহিত মশাই প্রস্থান করার কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুরকে নিবেদন করা ফলপ্রসাদ সকলকে বিতরণ করে দিলেন ভারতীদেবী | তারপর  মেয়ে-বউরা চলে গেল বাগানের পেছনদিকের প্যান্ডেলে | দুপুরের খাবার তৈরীর কাজে একজোট হয়ে লেগে পড়লো তারা |

 এবছর রিন্টু রিম্পি স্কুলে যায় নি | আর যাবেই বা কেন! সরস্বতী পূজোর উৎসব যে তাদের বাড়ির বাগানে পালিত হচ্ছে... তাই উৎসবের আনন্দের আতিশয্যে একটা বছর স্কুলের ঠাকুর নাই বা দেখলো... ক্ষতি তো কিছু নেই! অঞ্জলি দিয়ে,প্রসাদ খেয়ে দুই ভাইবোনে মায়ের ছাত্রছাত্রীদের সাথে হৈ হুল্লোড়ে মেতে,হাসি মজার অনাবিল স্রোতে ভেসে মুখরিত করে তুললো পূজা প্রাঙ্গনের মিঠে রোদমাখা পরিবেশ |

  রন্ধন বিষয়ে বস্তির মেয়েরা বেশ কর্মঠ | তাদের প্রভূত তৎপরতায় বেলা ১টার কিছু আগেই তৈরী হয়ে গেল মধ্যাহ্ন ভোজনের পদগুলি,যথা --  সবজি খিচুড়ি,বেগুনি,বাঁধাকপির তরকারি,টোম্যাটো খেঁজুর আমসত্বের চাটনি,পাঁপড় ও পায়েস | রান্নার দায়িত্ব শেষ ওদের | এখন ছেলে যুবকদের পালা, খাবার পরিবেশনের | পূজো সংক্রান্ত কাজকর্মের দায়িত্ব মহিলা পুরুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার মিটিঙে ভারতীদেবী পূর্বেই যেমনটি বলে দিয়েছিলেন |

  নারী পুরুষ নির্বিশেষে পূজোয় অংশগ্রহণের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন ভারতীদেবী | সারাদিনের ঘটমান দৃশ্যাবলীর সাথে নিজের কিশোরীবেলার সরস্বতী পূজোর দিনগুলোর সাদৃশ্য তাঁকে বারংবার নস্ট্যালজিক করে তুলছিল...

 সেই ভোর থেকে পূজোর জোগাড়,এতোগুলো লোকের রান্না করার ঝক্কি সামলেও ক্লান্তির চিহ্নটুকুও ফুটে ওঠে নি কারো চোখে মুখে | বরং দ্বিগুন কর্মোৎসাহে রাতের মেনুতে থাকা ফুলকপির পকোড়া,কড়াইশুঁটির কচুরি,আলুরদম বানিয়ে ফেলেছিল মহিলাকুল,আর শেষপাতে 'ভারতীয়ালয়ে'র শিক্ষয়িত্রীর হাতে তৈরী রসালো বোঁদে | উচ্চ-নীচের শ্রেণীবিভাজন মুছে দু'বেলা সকলের সাথে বসে খাওয়া দাওয়া করার মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন |

   ভারতীদেবীর অমায়িকতায় বস্তিবাসীর  রোজকার একঘেঁয়ে জীবনে ঘটলো অনাকাঙ্খিত অথচ আনন্দজনক ছন্দপতন | উৎসবময় নির্মল খুশিতে ভরা একটি দিনের প্রাপ্তি ওদের মনে চিরটাকাল অমূল্য হয়ে থাকবে |

  দুই পক্ষের সম্মিলিত সহযোগিতায় সর্বাঙ্গীন সুন্দর ভাবে বন্ধিত হলো উৎসবের মূল সুর --সম্প্রীতির বন্ধন |


                            সমাপ্ত

saswati.munshi1987@gmail.com
হুগলী