1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label সুমিত্রা পাল. Show all posts
Showing posts with label সুমিত্রা পাল. Show all posts

Wednesday, October 2, 2024

পট পরিবর্তন

 

ছবি : ইন্টারনেট

পট পরিবর্তন

সুমিত্রা পাল

       শাশুড়ি ঠাকরুন রোগে আক্রান্ত থাকেন বছরভর। ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার, কখনো বাতের ব্যথা তো কখনো পেটের গণ্ডগোল। বিছানায় শুয়ে বসে কুকিয়ে ককিয়ে দিনগুলি কাটে তার।

     শ্বশুরমশাই ঠিক তার উল্টো। প্রচণ্ড এনার্জিটিক। সারাক্ষণ কিছু না কিছু করেই চলেছেন। পাপাইকে স্কুলে দিয়ে আসা-নিয়ে আসা, রোজ বিকেলে পার্কে ঘুরতে যাওয়া, বাগানে বিভিন্ন মরশুমি ফুলের গাছ লাগানো সেইসঙ্গে তাদের সঠিক পরিচর্যা, কখনো উত্তরার সঙ্গে রান্নায় হাত লাগানো… প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর বাহাত্তর বছরের এক যুবক যেন।

     প্রতিমাসে উত্তরা শাশুড়িমাকে চেক আপ করিয়ে আনে। সেদিন শ্বশুরমশাইকে সামনে পেয়ে বলল

-‘চলুন বাবা, আপনারও একটা থরো চেক আপ করিয়ে আনি’!

-‘আরে আমি একেবারে ফিট এন্ড ফাইন। আমার এসবের দরকার নেই। তুমি বরং তোমার শাশুড়ি মায়েরটা করিয়ে আনোগে যাও’। জবাব দিয়েই পালাতে চাইলেন শ্বশুরমশাই।

কিন্তু নাছোড়বান্দা উত্তরা। বলে

-‘আপনারও তো মাঝে মাঝে মাথা ঘোরায়, কানে ঝি ঝি পোকার আওয়াজ শোনেন। এই বয়সে মাঝে মাঝে চেক আপ করিয়ে নিলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় বাবা’।

কী মনে করে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন শ্বশুরমশাই।

     কয়েকদিন পর রিপোর্ট নিতে উত্তরা এসেছে হাসপাতালে। রিপোর্ট পড়ে তার পায়ের নীচের মাটি যেন সরে গেল। শাশুড়ির সবকিছু নরম্যাল। শ্বশুরমশাই লিউক্যোমিয়ায় আক্রান্ত। লাস্ট স্টেজ। খুব বেশি হলে তিন-চার মাস তার জীবনের আয়ু।

...(সমাপ্ত)...

Saturday, October 21, 2023

মা

ছবি  : ইন্টারনেট 

মা

সুমিত্রা পাল

ক্লাশ ফোর-এ মাকে হারিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় বোবা হয়ে গিয়েছিল যেন তৃণা। তারই মধ্যে ঠাম্মি-র অনুরোধ-উপরোধে বাবা আবার বিয়ে করেছেন। নতুন মা, তার কাছে  সৎমা। তার দু’চোখের বিষ।

দু’চোখে দেখতে পারে না তৃণা সৎমা-কে। তার সবসময় মনে হয়, মায়ের মৃত্যুর পর তিনি যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। সবাই তাকে ভালোবাসলেও তৃণা একটি একটি করে, দীর্ঘ বারোটি বছর ধরে তার প্রতি ঘৃণা-ই পোষণ করে এসেছে। তিনি কাছে টানতে চাইলেও সে সবসময় মুখ ফিরিয়ে থেকেছে। দূরে সরে থেকেছে। মায়ের জায়গাটুকু সে কিছুতেই তাকে দিতে পারে না!  

কিছুদিন আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। ডাক্তার-বদ্যি, ওষুধ-পথ্যি সব চলছে।  কিন্তু কিছুতেই শরীর ভালো হচ্ছে না। শেষে ডাক্তার যেদিন জানান, তার দুটি কিডনি-ই অকেজো। অবিলম্বে একটি কিডনির প্রয়োজন। যথাশীঘ্র ব্যবস্থা না হলে এই মেয়েকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।  

সেদিন সে দেখেছিল বাবার মুখটা কেমন যেন শুকনো হয়ে গেছে। সে জানে, কিডনি জোগাড় করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। বাবার এত আর্থিক সঙ্গতিও নেই যে কিনে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট এর ব্যবস্থা করবেন। সেদিন প্রথমে তার খুব কান্না পেয়েছিল। পরক্ষণেই মনে হয়েছিল- ভালোই হয়েছে। এবার সে নিজের মায়ের কাছে চলে যেতে পারবে। এই সংসারে থাকার এইটুকু ইচ্ছে তার নেই।  

 কিন্তু, সেই সৎ মা তা হতে দিল কই! তাকে একরকম মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন  তিনি, নিজের একটি কিডনি দান করে। শুধু তাই নয়, নিজের অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি যেভাবে তৃণা-র সেবাযত্ন করেছেন তা নিজের মায়েরও অধিক।     

এমনটাও যে ঘটতে পারে তা তৃণার ভাবনারও অতীত। যতবার ভাবছে, ততবার তার  বুক জুড়ে এক কান্নানদী ঢেউ ভেঙে যাচ্ছে। একরাশ অপরাধবোধে সে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।

দীর্ঘবছর ধরে যে বিরূপ মনোভাব পোষণ করে এসেছে, তা যেন আজ সুদে-আসলে তার কাছে হিসাব চাইছে। এই মুহূর্তে তার সামনে কী করে যাবে, তাকে কীভাবে মুখ দেখাবে, তাকে কী বলবে, ভেবে ভেবে সে সঙ্কুচিত হচ্ছিল, মরমে মরে যাচ্ছিল। আর অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসা এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ, এক গভীর আবেগ, বারে বারে তার চোখের কোণদুটিকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল।         

কাছে যেতে পারছে না সে, কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, সৎমা বলে অবহেলা করা সেই মহীয়সী নারীর ভাষাহীন ভালোবাসার নীরব আর্তি- বারোবছরে একবারও তো মা বলে ডাকলি না। জন্ম দিইনি, কিন্তু আমি যে তোর মা।  

...(সমাপ্ত)...

Wednesday, October 6, 2021

সুগন্ধি-আঁচল



ছবি : ইন্টারনেট 


সুগন্ধি-আঁচল

সুমিত্রা পাল

হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল, তার কথা। বছর তিনেক আগে, দুর্গাপুরে, তার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল আমার। সেদিন হালকা বৃষ্টিতে ভেজা ছিল সারা শিল্পাঞ্চল। সন্ধ্যার পর মাছ কিনতে মাম্ড়া বাজারে প্রবেশের জন্য ছোট গলিটায় ঢুকতেই একরাশ তাজা, মিষ্টি সুগন্ধ ঝাঁপিয়ে পড়ল  আমার উপর। বড্ড চেনা এই গন্ধটা পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিলাম আমি।  

মনে হচ্ছিল আমার মা যেন আমার সমস্ত শরীরে, আমার সমস্ত চেতনায় তাঁর সুগন্ধি-আঁচল বিছিয়ে দিয়েছেন। ভীষণভাবে নস্ট্যালজিক আর আবেগতাড়িত হয়ে ইতি উতি তাকাতেই নজরে পড়েছিল সাদা আর গোলাপি বর্ণের, ঈষৎ নিচের দিকে ঝুঁকে থাকা, ফুলে ফুলে ভরা মাধবীলতা গাছটির দিকে। থোকা থোকা ফুলে এমনভাবে ছেয়ে আছে গাছটা যে পাতাগুলিও ঢাকা পড়ে গেছে। এই ফুল আমার মায়ের বড্ড প্রিয়। সেই ছেলেবেলা থেকে মায়ের আঁচলে সবসময় এই ফুলের সুগন্ধ পেয়ে এসেছি।

আসলে, মা ছিলেন আমার সবচাইতে প্রিয় বন্ধু, আমার সবচাইতে কাছের মানুষ। কিন্তু তিনি এই  পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে, এই জায়গাটুকু আমার কাছে হয়ে ছিল রিক্ত আর শূন্য । সেদিন, সেইমুহূর্তে মাধবীলতা গাছটিকে দেখে মনে হয়েছিল- আমার মা যেন দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর আঁচল বিছিয়ে।    

আর আমি! চারদিকের পরিবেশ, পরিস্থিতি ভুলে এগিয়ে গিয়েছিলাম গাছটির দিকে। জড়িয়ে  ধরেছিলাম ফুল-লতা-পাতা সহ গাছটিকে। হাওয়ায় দুলে দুলে ওঠা গাছটি আমার সর্বাঙ্গে বিছিয়ে দিয়েছিল এক স্পর্শ উপচার।  টের পেয়েছিলাম সেই স্পর্শ মায়েরই স্পর্শের মতো কোমল আর স্নিগ্ধ। সেই থেকে সেই গাছ হয়ে উঠেছিল আমার পরম বন্ধু। যখন তখন, যে কোন ছুতোয়,  ছুটে গেছি মাম্ড়া  বাজারে। দাঁড়িয়েছি সেই গাছটিকে স্পর্শ করে। জানিয়েছি তাকে কত অব্যক্ত কথা। ঢেলে দিয়েছি কত ব্যথাভার। হাওয়ায় দুলে দুলে প্রতিবার সে আমায় দিয়েছে আশ্বাস- এই তো আছি আমি।

আজ তিনমাস হল ছেড়ে এসেছি দুর্গাপুর।

মাধবীলতা গাছটি মা হয়ে আজও আমাকে তার সুগন্ধি আঁচলে জড়িয়ে রেখেছে।

sumitrapal29@gmail.com
কলকাতা