1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label তুষার ভট্টাচাৰ্য. Show all posts
Showing posts with label তুষার ভট্টাচাৰ্য. Show all posts

Sunday, September 21, 2025

রোদ্দুরের কলম

 

ছবি : ইন্টারনেট

রোদ্দুরের কলম

 তুষার ভট্টাচাৰ্য

পুবালি ভোর রোদ্দুরের স্বপ্নীল তুলি, কলম দিয়ে

 আমি ঠিক এই মুহূর্তে

মুছে দিতে চাই -

 দেশজুড়ে জেগে ওঠা

সমস্ত ধর্মীয় গোঁড়ামি, বিদ্বেষ,

 হিংসা,  আর বিভেদের  পাঁচিল ;

টাপুর টুপুর বৃষ্টি জলে ভেজা এই দেশের নরম মাটি তৃণঘাসে

দু'হাতে করে  নীরবে ছড়িয়ে দিতে চাই

সম্প্রীতির অক্ষর বীজ  ;

ধর্মান্ধদের রক্তাক্ত অস্ত্র মাখা   হাতে

পরিয়ে দিতে চাই   ভালবাসার রাখি  ;

ধস্ত, বিপন্ন এই দেশের উদার আকাশে

বাতাসে আবার নিশ্চয়ই

ধ্বনিত হবে অমল বন্ধুতার জয়গান  ;

ভোরের আলোর  পাখিরা  নীরবে

শোনাবে - 'সবার উপর মানুষ সত্য ' গান l

...(সমাপ্ত)...



Wednesday, October 2, 2024

স্বপ্ন সহচরী

ছবি : ইন্টারনেট

স্বপ্ন সহচরী

তুষার ভট্টাচাৰ্য

নিঝুম রাত্তিরে ঝরা শিশিরের কান্না জলের ভিতরে

যার অভিমানী ম্লান মুখ ভেসে ওঠে

তাকে আমি চিনি  ;

সে ছিল অমল কৈশোরের

রূপকথা স্বপ্ন সহচরী  ;

তাকে আমি আজও  নীরবে খুঁজি

মায়া মৃদঙ্গ জোছনায়

ওই দীঘল আকাশ দিগন্ত রেখায় l

...(সমাপ্ত)...

Saturday, October 21, 2023

বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ প্রসঙ্গ

ছবি : ইন্টারনেট

বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ প্রসঙ্গ 

তুষার ভট্টাচাৰ্য 

১৯৪৭ সালে  ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর   (বাংলা এবং পাঞ্জাবকে খণ্ডিত করে ) দেশভাগের  করুণ কাহিনী বাংলা সাহিত্যে খুব   বেশি উঠে  আসেনি l হঠাৎ করে  দেশভাগের কারণে তৎকালীন পূর্ব বাংলা থেকে প্রায় এককোটি বাঙালি ছিন্নমূল   উদ্বাস্তু ( হিন্দু ) নিজেদের অনিচ্ছাসত্বেও ভিটে মাটির মায়াত্যাগ করে এপারের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন l তাঁদের নাম দেওয়া হয়েছিল  -বাঙাল,  রিফিউজি,জার্মান পার্টি, সমুন্দির পুত, সার্কাসের জন্তু  প্রভৃতি ব্যাঙ্গার্থক শব্দে বিশেষিত করে l সেই সময়ে স্থানীয় মানুষরা ভীষণ অনুকম্পার চোখে দেখতেন পূর্ববঙ্গ থেকে আগত   উদ্বাস্তুদের l  এবং বিরূপ মনোভাবও  পোষণ করতেন l এইরকম মনোভাবের উল্লেখ পাওয়া যায়  ' রিফিউজিরা এমনিতেই বড় নোংরা, এক ঘরে গাদাগাদি করে থাকে, শোওয়ার ঘরে উনুন জ্বেলে রান্না করে  ( অর্জুন উপন্যাস - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ) l ' বাঙাল নাকি তুই? কী ভাষা হাউ মাউ খাঁউ  ( মাধব ও তার পারিপাশ্বিক ( শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ) l 

এই প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে  সর্বস্ব হারানো  বাঙালি উদ্বাস্তু মানুষদের জীবনের দুঃখ, যন্ত্রনা, বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের কথা তুলে ধরে বাংলা  ভাষায় কোনও ক্লাসিক উপন্যাস কিংবা নাটক  আজ পর্যন্ত লেখা হয়নি l যদিও  সেই সময়ের বাঙালি উদ্বাস্তু জীবনের মর্মান্তিক করুণ আখ্যান কিছুটা  তুলে ধরেছেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাঙালি  লেখক l অমলেন্দু চক্রবর্তী তাঁর অধিরথ সূতোপুত্র নামক গল্পে  উদ্বাস্তু জীবনের দুঃখের আখ্যান তুলে ধরেছেন অনায়াস নৈপুণ্যে   - গল্পের নায়ক সনাতন নিজের বুকের রক্ত দিয়ে লেখে -  'বুঝিয়াছি আমার স্বদেশ নাই l স্বদেশহীন মানুষের স্থান এই মর্তভূমি কি করিয়া হইতে পারে l ' শেষে  এই বোধ তাঁকে আত্মহত্যার পথে নিয়ে যায় l

অমলেন্দু চক্রবর্তীর আরেকটি গল্প' ইচ্ছামতী বহমান' গল্পেও চিত্রিত হয়েছে গল্পের নায়িকা মৃন্ময়ীর দেশভাগের যন্ত্রণা lকথা  সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ' উপায় ' গল্পেও উদ্বাস্তু জীবনের  চরম দুঃখের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে l মানিকের ' সুবালা ' নামক গল্পে উদ্বাস্তু সুবলার স্বামীকে যখন পুলিশ ছিনতাইয়ের অপরাধে ধরে নিয়ে যায় তখন ধৃত স্বামী সুবলাকে বলে  - ভিখ মাইগো না l আমাগো অপরাধ নাই, ভিখ মাইগা অপরাধী সাইজো না l তার চেয়ে মরণ ভাল lএই কথা শুনে সুবলা শপথের ভঙ্গিতে বলে  - 'এত বড় পৃথিবীতে মাথা গোঁজনের ঠাঁই আদায় কইরা নিমু l'

এই প্রসঙ্গেইলেখক   নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'মর্যাদা ' গল্পটির কথা উল্লেখ করতে হয় l গল্পের নায়ক দরিদ্র পন্ডিত মশাই দেশ ভাগের ফলে ভিটে মাটি সব হারিয়েছেন কিন্তু নিজের আত্ম মর্যাদা হারাননি l মাঝে মাঝে দেশের কথা মনে পড়লে ছাত্রদের দুঃখ করে বলেন - আছি রে ভালোই আছি l শুধু বুড়ো বয়েসে দেশের জন্যে একটু কষ্ট হয়, আর তো কখনও পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারব না l

বাংলা সাহিত্যের বিপ্রতীপে,বিশ্ব সাহিত্য ক্ষেত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়   কিন্তু প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উদ্বাস্তু মানুষদের জীবন যন্ত্রনাকে তুলে ধরে রচিত হয়েছে অনেক মানবিক উপন্যাস ছোট গল্প, নাটক প্রভৃতি l  জার্মানি দু'ভাগে ভাগ হয়ে যাবার সময়কালকে পটভূমি ধরে  আমেরিকান  সাহিত্যিক জন স্টেইনবেক লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ' দ্য গ্রেভস অব ৱ্যাথ l যাতে লেখা হয়েছে জার্মানির উদ্বাস্তু মানুষদের জীবনের করুণ কাহিনী l পার্ল বাকের ' দ্য রিফিউজিস ' উপন্যাসেও রয়েছে উদ্বাস্তু মানুষদের বাসভূমি হারানোর বেদনার্ত কাহিনী l এরিখ মারিয়া রেমার্কের' দ্য নাইট ইন লিসবন ' উপন্যাসে হিটলার শাসিত নাৎসীদের অত্যাচারের ফলে দেশত্যাগের করুণ চিত্র আখ্যায়িত হয়েছে l

প্যালেস্টাইনের লেখক গাজি ডানিয়াল তাঁর 'তিরিশ লাখের একজন' গল্পের শুরুতেই  লিখেছেন  - আজ আমার নিজের দেশ বলতে কিছু নেই l ইজাজ হামমদ নামের একজন প্যালেস্টাইনের কবি তাঁর 'রাতের জেরুজালেমবাসী ' কবিতায় লিখেছেন  - হে রাত্রি তুমি বল কেন ছাড়তে হল আমার সেই ছোট্ট ঘর l কবি  মহমুদ দারবিশ ' একজন নির্বাসিতের চিঠি ' শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন  - রেস্তোরায় কাজ করি, এঁটো ডিস ধুই /আমার দুঃখী মুখে ঝুলিয়ে রাখি কৃত্তিম হাসি l

 অন্যদিকে ভারতের হিন্দি ভাষার বিশিষ্ট  সাহিত্যিক যশপাল লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত গল্প 'ঝুঠা সচ' l এই মানবিক গল্পটির পটভূমি হল লাহোর থেকে অমৃতসরে উদ্বাস্তু হয়ে চলে  আসার মর্মান্তিক কাহিনী l

উর্দু লেখক রাজিন্দর সিং বেদি দেশবিভাগের করুণ আখ্যান তুলে ধরেছেন তাঁর লাজবন্তী গল্পে l সাদাত হাসান মান্টো লিখেছেন ' নিয়তি'  নামের গল্প l যার পরতে পরতে রয়েছে  দেশ ভাগের কারণে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়ে যাওয়া  জীবনের বেদনার কাহিনী l পাঞ্জাবী সাহিত্যিক গুরুমুখ সিং মুসাফিরের খসমা গল্পেও রয়েছে উদ্বাস্তু মানুষের করুণ  আত্মকথন l বলা ভাল দেশভাগ নিয়ে হিন্দি, উর্দু ভাষায় অনেক মানবিক গল্প, উপন্যাস লেখা হয়েছে l

কিন্তু দেখা যাচ্ছে দেশভাগের সুদীর্ঘ   ৭৫ বছর পেরিয়ে যাওয়া  সত্বেও পূর্ববঙ্গের  (অধুনা বাংলাদেশ ) ছিন্নমূল উদ্বাস্তু প্রায় এক কোটির বেশি  মানুষের জীবনের  করুণ স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস নির্ভর করে  আজ পর্যন্ত তেমন ভাবে বাংলা ভাষায় খুব বেশি  উপন্যাস, , নাটক বা কবিতা লেখা হয়নি l

যদিও কেন দেশভাগ হল, কাদের জন্য হল, সেই সব রাজনৈতিক হঠকারিতা, ক্ষমতার চক্রান্ত প্রভৃতি উল্লেখ করে লেখা হতে পারত সেই সময়ের বাস্তব ঘটনা সমন্বয়ের দলিল হিসেবে কোনও  মানবিক উপন্যাস বা ছোটগল্পের আখ্যানলিপি কিংবা নাট্য সাহিত্য l

আসলে বাঙালি সাহিত্যিকরা  ১৯৪৭এর দেশ ভাগের অপরিসীম যন্ত্রণা, প্রত্যাশা, প্রাপ্তি, স্বপ্ন, এবং স্বপ্নভঙ্গের চালচিত্র নিয়ে  সম্ভবত  তেমন করে লেখার কোনও আগ্রহই

দেখাননি lতাঁদের নির্লিপ্ততার জন্য বাংলা ভাষায় রচিত হয়নি কোনও দেশ ভাগের বেদনার আখ্যান l

অথচ সাহিত্য হচ্ছে সমাজের দর্পণ l এব্যাপারে কবি নাজিম হিকমত বলেছেন  - ' সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে মানুষের জীবন প্রতিফলিত হয় l সেই শিল্পের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে সাংঘাত আর প্রেরণা, জয় ও পরাজয় আর জীবনের প্রতি অফুরান ভালবাসা l খুঁজে পাওয়া যাবে একজন মানুষের জীবনের সব'কটি দিক l

সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে কোনও মিথ্যা ধারণা দেয় না l ' ( গ্রন্থ সূত্র :বাংলা উপন্যাসে উদ্বাস্তু জীবন - ড: তাপস ভট্টাচাৰ্য l প্রকাশক - পুস্তক বিপনী l কলকাতা ) l

 বাংলা সাহিত্যে দেশ ভাগ এবং ছিন্নমূল উদ্বাস্তু জীবনের বঞ্চনা, অবহেলা, বেঁচে থাকার লড়াই প্রভৃতি নিয়ে তেমন করে কোনও সাহসী উপন্যাস কিংবা ছোট গল্প লেখা হয়নি l এছাড়া লেখা হয়নি কোনও কাল জয়ী নাটক কিংবা কবিতা l

যদিও তৎকালীন পূর্ববঙ্গ  থেকে কয়েকজন মুষ্টিমেয় ঔপন্যাসিক দেশভাগের নির্মম যন্ত্রণা নিয়ে কিছু উপন্যাস বা গল্প লিখেছেন l এব্যাপারে সর্বাগ্রে নাম উল্লেখ করতে হবে সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের l তাঁর লেখা - নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান, মানুষের ঘরবাড়ি, মৃন্ময়ী, আবাদ প্রভৃতি উপন্যাসে উদ্বাস্তু জীবনের করুণ কাহিনী ফুটে উঠেছে l  'নীলকণ্ঠ পাখির  খোঁজে ' উপন্যাসে অতীন  বন্দ্যোপাধ্যায়   

এক জায়গায় লিখেছেন     -

জেঠিমার এই মুখ দেখলে সোনা চোখের জল রাখতে পারে না l মা না খেয়ে শীতের কাঁথায় শুয়ে থাকলে তার পড়াশুনা করতে ভাল লাগে না...... l বাবার চোখ মুখের দিকে তাকানো যায় না .......   l অন্নহীন এই সংসারে সোনার নিজেকে বাড়তি লোক মনে হয় l

সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের  - অর্জুন উপন্যাসের এক জায়গায় উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অর্জুন বলছে  - লজ্জা পেয়েছিলাম আমি সতেরো বছর বয়েসে, কলকাতায় এসে l আমার দাদা তখন পাগল হয়ে রাস্তায় ঘোরে, দুবেলা মা আমাদের ভাত রেঁধে দিতে পারে না বলে বিরলে কাঁদে  l

 শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের - মাধব ও তার পারিপার্শ্বিক, প্রফুল্ল রায়ের - নোনা জল মিঠে মাটি, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর - নিশ্চিন্তিপুরের মানুষ, অমিয়ভূষণ মজুমদারের - নির্বাস, অমলেন্দু চক্রবর্তীর - গোষ্ঠবিহারীর জীবনযাপন, জরাসন্ধের -  মানস কন্যা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের - বিপাশা, দুলালেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের - ওরা আজও উদ্বাস্তু, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের - দূরভাষিণী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের - বকুলতলা পি এল ক্যাম্প, বল্মীক, অরণ্যদণ্ডক, প্রবোধ কুমার সান্যালের - হাসুবানু, বনফুলের - পঞ্চপর্ব, ত্রিবর্ণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের - সার্বজনীন, শক্তিপদ রাজগুরুর - তবু বিহঙ্গ, সোনা ফসলের পালা, মেঘে ঢাকা তারা, শঙ্করের - স্থানীয় সংবাদ, শঙ্কর বসুর - শৈশব, সমরেশ বসুর - সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা, সরোজ কুমার রায়চৌধুরীর - নীল আগুন, লোকনাথ ভট্টাচাৰ্য'র - দু'একটি ঘর, দু'একটি স্বর  প্রভৃতি উপন্যাসেও দেশভাগ জনিত বাঙালি ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের জীবনের মর্মন্তুদ কাহিনী চিত্রিত  হয়েছেl

এছাড়াও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের -জাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের - আত্মপ্রকাশ, জ্যোতির্ময়ী দেবীর - এপার গঙ্গা, ওপার গঙ্গা প্রভৃতি উপন্যাসেও উদ্বাস্তু জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এবং চরিত্রের নিপুন আলেখ্য প্রকাশিত হয়েছে l 

বাংলা উপন্যাসে দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু প্রসঙ্গ কিছুটা উঠে এলেও, বাংলা কবিতায় খুব বেশি উদ্বাস্তু  জীবনের কথা চিত্রিত হয় নি l

যদিও কবি বিষ্ণু দে'র ' জল দাও ' কবিতায় ( ১৯৪০)কবি লিখেছেন -

' এখানে - ওখানে দেখ দেশছাড়া লোক ছায়ায় হাঁপায় l পার্কের ধারের শানে পথে পথে গাড়ি বারান্দায় l

ভাবে ওরা কী যে ভাবে l

 ছেড়ে খোঁজে দেশ l

এইখানে কেউ বরিশালে কেউ বা ঢাকায় l '


বিষ্ণু দে তাঁর ' গান ' শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন  -

মন চাই জ্ঞানে কাজে আপিসে

বাজারের কলে মিলে

দপ্তরেচত্বরে উল্লাসে সংকটে

গান চাই

প্রাণ চাই, গান চাই

শেয়ালদার বাস্তুহারা শেডে l

অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত  - 'উদ্বাস্তু '(১৩৭২)শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন -


জলা জংলার দেশ, দেখবার আছে কী!

আসল জিনিস দেখবি ওপারে

আমাদের নিজের দেশে, নতুন দেশে,

নতুন দেশের নতুন জিনিস -মানুষ নয়,

জিনিস সে জিনিসের নাম কী?

নতুন জিনিসের নতুন নাম উদ্বাস্তু l 


কবি মণীন্দ্র রায় 'চিঠি 'কবিতায় লিখেছেন  -

'পাবনায় বাড়ি তার উদ্বাস্তু রমণী

সেই বাড়ি

এত টুকু হতে যারে চিনি

আর সেই ঘর পুব দুয়ারী

সিঁদুরে আমের সেই চারা

সবই আজ পরের অধীনে '


মণীন্দ্র রায়ের ' নকসি কাঁথার কাহিনী' কবিতাতেও  রয়েছে উদ্বাস্তু জীবনের অপরিসীম লাঞ্ছনার করুণ চিত্র  -

'কে দেখেছে জীবনের অপচয় বেশি তার চেয়ে?

কে সয়েছে এত গ্লানি রানাঘাটে, ক্যাম্পে ক্যাম্পে, পথে

উড়িষ্যার তেপান্তরে, জনহীন দ্বীপান্তরে আর হাওড়ার স্টেশনে?

অচল পয়সার মতো পরিত্যক্ত  ------

-----তবু বার বার

কে এমন ফিরে আসে, ঘর বাঁধে, কার এত আশা?

দারিদ্রের কাঁটাগাছে দুরন্ত স্বপ্নের রাঙাফুল

ফোটাতে কে জানে '


কবি দীনেশ দাশ তাঁর 'পনেরই আগস্ট ' কবিতায় লিখেছেন  -

এখন তো শাঁখের করাতে

দিনগুলি কেটে যায় করাতের দাঁতে

সীমানার দাগে দাগে জমাট রক্তের দাগ

কালনেমী করে লঙ্কাভাগ l 


বিশিষ্ট কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর 'স্বপ্নে দেখা ঘরদুয়ার'

কবিতায় লিখেছেন  ফেলে আসা  দেশের বাড়ির কথা -

পুকুর, মড়াই, সবজি বাগান,

জংলা ডুরে শাড়ি

তার মানেই তো বাড়ি l

তার মানেই তো প্রাণের মধ্যে প্রাণ,

নিকিয়ে নেওয়া উঠোনখানি

রোদ্দুরে টানটান l


কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস লিখেছেন  -

তোমরা বিচার কর ভাই

কেন আমি দেশছাড়া,

আত্মীয় স্বজন হারা

কেন সে জনমভূমি

দেখিতে না পাই l



বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি শামসুর রাহমান তাঁর ' যাবার মুহূর্তে ' শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন -


নিজের নিবাস থেকে যাবার মুহূর্তে

কেন যে বার বার মনে পড়ে তার

রেকাবিতে রাখা কিছু ফুল

স্টেনলেস চায়ের চামচ, তালা,

ছাইদানি, দরজার কড়া

যারা জানবে না কোনদিন,

কোথায় সে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এমন ?

বাংলা সাহিত্যের আরেকটি ধারা নাট্য সাহিত্যেও খুব বেশি বাঙালি উদ্বাস্তু জীবনের আখ্যান কাহিনী প্রতিফলিত হয়নি l নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের -     এই স্বাধীনতায়, সলিল সেনের -নতুন ইহুদি, বিজন ভট্টাচাৰ্য'র - গোত্রান্তর, দিগিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের - বাস্তু ভিটা, মন্মথ রায়ের - ভাঙাগড়া, ঋত্বিক ঘটকের  -দলিল প্রভৃতি নাটকে বাঙালি উদ্বাস্তু জীবনের অন্তহীন  সমস্যা, ব্যর্থতা, হতাশার করুণ আলেখ্য চিত্রিত হয়েছে l 

বস্তুতপক্ষে দেখা যাচ্ছে যে ১৯৪৭সাল বা তার পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত  ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের জীবনালেখ্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যের কোনও ধারাতেই তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য কালজয়ী উপন্যাস, ছোট গল্প কিংবা কবিতা আদৌ লেখা হয় নি l

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে উদ্বাস্তু জীবনের সমস্যা, বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথাও তেমন করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন নি কোনও বাঙালি  লেখক, কবি নাট্যকার  l

মানুষ কেন উদ্বাস্তু হয়, কাদের দোষে উদ্বাস্তু হয়, কীভাবে শাসক শ্রেণীর নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য উদ্বাস্তু হতে হয় সাধারণ ছাপোষা মানুষকে, সেইসব বাস্তুহারা ছিন্নমূল মানুষের জীবনের ব্যাথা, বেদনা, ক্ষোভ, যন্ত্রণা, পুনর্বাসনের জন্য নিরন্তর লড়াই প্রভৃতি ব্যাপার নিয়ে সম্ভবত  এপারের বাঙালি লেখকরা দেশ ভাগ পরবর্তী সময়ে খুব বেশি সজাগ ছিলেন না l দেশভাগ নিয়ে সজাগ এবং সচেতন থাকলে নিশ্চয়ই ধ্রুপদী, চিরায়ত উপন্যাস, গল্প, কবিতা কিংবা নাটক লেখা হত l

এব্যাপারে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্য যথেষ্ট প্রণিধানযোগ্য l সুনীল লিখেছেন  - দেশভাগ নিয়ে কোনও সার্থক উপন্যাস লেখা যায় না, কেন না সেরকম লেখা আর একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে উসকে দিতে পারে ( রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা,১৩মার্চ ১৯৮৮ )l

...(সমাপ্ত)...

Monday, July 24, 2023

আকাশ গঙ্গায়

ছবি : ইন্টারনেট

আকাশ গঙ্গায় 

তুষার ভট্টাচাৰ্য 

কোনও কিছু লিখি না আমি আর 

শুধু ভাবি -

 রাত্তির মৃত তারাগুলি কীভাবে

 ঝরে পড়ে   আকাশ গঙ্গায় 

শ্মশানের চুল্লিতে কী ভাবে

জীবনের অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি 

পুড়ে  খাক হয়ে  যায়

ডানায় অশ্রু মেখে পাখিরা 

 ওই  গহন মেঘের  দেশে

 কীভাবে হারিয়ে যায় ;


দুঃখের হিমঘরে বসে

 চারপাশের   বিষণ্ণ জীবনের কথা

 লিখি না আর ;

ভোরবেলা শুধু চেয়ে দেখি -

পুবালি রোদ্দুর

আল্পনা আঁকে মাটির উঠোনের

 আয়নায় ;

 হেমন্তের জোড়া শালিক নীরবে 

উড়ে এসে

 চুপি   চুপি বসে লেবু ডালে 

শিশুরা খিলখিল করে হেসে ওঠে

দুই হাত তুলে মায়ের কোলে l

...(সমাপ্ত)...

Saturday, April 15, 2023

ধূসর পাণ্ডুলিপি'র কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু বিষয়ক কিছু জিজ্ঞাসা

ছবি : ইন্টারনেট


ধূসর পাণ্ডুলিপি'র কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু বিষয়ক কিছু জিজ্ঞাসা

তুষার ভট্টাচাৰ্য 

রবীন্দ্রত্তোর যুগের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম, আত্মপ্রচার বিমুখ, নির্জনতা বিলাসী কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু নিয়ে, তাঁর মৃত্যুর ৬৭ বছর পরেও কবির প্ৰিয় অনুরাগী পাঠকদের  মনে অনন্ত জিজ্ঞাসা রয়ে গেছে l

            এব্যাপারে ' পূর্বাশা ' পত্রিকার সম্পাদক  কবি সঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য লিখেছেন  - আমার মনে হয় জীবনানন্দ ঠিক ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যাননি l যদিও এ কথাটাই বলা হয়ে থাকে, তথাপি আমার ধারণা তিনি আত্মহত্যা করেছেন l

             বিশিষ্ট   কবি সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্যের মন্তব্য উল্লেখ করে , কবি জীবনানন্দ দাশের  ছাত্র কবি অরবিন্দ গুহ তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন  - সেসব ঘটনা খুব সুখের নয় l

কবি পত্নী লাবণ্য দাশের সঙ্গে প্রতিদিন জীবনানন্দের একটা মানসিক দ্বন্দ্বর কথা, কবি অরবিন্দ গুহ  অকপটে ব্যক্ত করেছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি  একথাও জানিয়েছেন যে জীবনানন্দ পারিবারিক জীবনে অসহনীয়  দাম্পত্যের  টানাপোড়েনের হাত থেকে মুক্তি খুঁজছিলেন l

                      একথা ঠিকই যে কবি পত্নী লাবণ্য দাশের (ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী,১৩৩৭ বঙ্গাব্দের স্নাতক)  সঙ্গে কবির বিবাহিত জীবন একদমই সুখকর হয় নি lপ্রাত্যহিক জীবন যাপনে যিনি  প্রতিনিয়ত দু'দন্ড শান্তি কামনা করতেন, সেই নিরিবিলি শান্তি তিনি কোনওদিনই খুঁজে পাননি কবি জীবনানন্দ দাশ l প্রায়শই বাড়িতে দাম্পত্য কলহ লেগে থাকতো l সম্ভবত কবির অপরিমেয় আর্থিক অনটনের জন্যই  l

                    'ধূসর পাণ্ডুলিপি'র কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুকে হয়তো কিছুটা  তরান্বিত করেছিল বেকারত্বের দুর্বিসহ জ্বালা, নিদারুণ আর্থিক কষ্টের জন্যও lতাঁর লেখা গল্প, উপন্যাসের বিভিন্ন জায়গায় নায়কের বক্তব্যে, যেন পরতে পরতে  কবির আত্মজীবনের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে বারংবার l

তিনি  লিখেছেন - ' ছ'বছর ধরে নানারকম চেষ্টা ও ব্যর্থতার পর অভিজ্ঞতা জমে গিয়েছে অনেক l অপার দারিদ্রতার ভিতরে, যক্ষার, মৃত্যুর সঞ্চার সে টের পাচ্ছে l'অসীম বেকারত্বের থেকে মুক্তির জন্য কবি  কোনও না কোনও সময়ে আসামে, মাদ্রাজে  ( অধুনা চেন্নাই ) গিয়েছিলেন l বাসের পারমিটের জন্য রাইটার্স বিল্ডিংএ গিয়েছিলেন পর্যন্ত l ইন্সুরেনসের এজেন্ট হবারও বাসনা পোষণ করেছিলেন l১৯৫২ - ৫৩ সালে অসম্ভব মানসিক দৌর্বল্যে ভুগছিলেন কবি l ১৯৫৩র মে মাসে কবি অনুরক্ত জলপাইগুড়িতে বসবাসকারী সুরজিৎ দাশগুপ্তকে একটি চিঠিতে লিখেছেন  - শরীর বড় অসুস্থ, কোনো কাজই করতে পারছি না l

                              ১৯৫৪ সালের ৪সেপ্টেম্বর ' পূর্বাশা ' পত্রিকার সম্পাদক কবি সঞ্জয় ভট্টাচাৰ্যকে ব্যক্তিগত চিঠিতে লিখেছেন  - অনেকদিন থেকে আমার শরীর বিশেষ অসুস্থ....... l এই প্রেক্ষিতে ,সঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য লিখেছেন  - মৃত্যুর পূর্বাভাষ ছিল সেই চিঠিতে l সেই সময়ে 'বেকার ' কবি জীবনানন্দ  মনের মতো একটি কাজ পেলে হয়তো আরও কিছুদিন নিশ্চিন্তে জীবন কাটাতে পারতেন l লেখালেখিতে আরও মনোনিবেশ করতে পারতেন l

      একদিকে বেকারত্বের জ্বালা যন্ত্রণা , অন্যদিকে একের পর এক সাহিত্য - সমালোচকদের সমালোচনা কবিকে শরবিদ্ধ করেছে, মানসিকভাবে ক্ষত বিক্ষত করেছে প্রতিনিয়ত l

কবি সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার, (১৩৩৬ বঙ্গাব্দে  ) জীবনানন্দের 'বোধ 'কবিতার সমালোচনা করে লেখেন  - কুঁজ গলগন্ড, নষ্ট শসা, পচা চাল কুমড়ার আড়ম্বরের মধ্যে ভাষার শ্বাসরোধ হয়ে এসেছে l

'শনিবারের চিঠি'র সম্পাদক সজনীকান্ত দাস, অত্যন্ত কুতসিৎভাবে জীবনানন্দ দাশকে  প্রতিনিয়ত আক্রমণ করেছেন l

এমনকী পঞ্চাশের দশকের  বিখ্যাত 

'কবিতা 'পত্রিকায় ( আশ্বিন সংখ্যা, ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ  ) সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু  তির্যক ভঙ্গীতে লেখেন  - জীবনানন্দ দাশ কী লিখছেন আজকাল? আমাদের এই নির্জনতম স্বভাবের কবি, প্রকৃতির কবি তিনি , তাছাড়া কিছুই নন  - হয়তো কেন নিশ্চয়ই কিন্তু পাছে কেউ বলে তিনি এস্কেপিষ্ট কুখ্যাত আইভরি টাওয়ারের নির্লজ্জ অধিবাসী, সেই জন্য ইতিহাসের চেতনাকে তাঁর সাম্প্রতিক রচনার বিষয়ীভূত করে তিনি এইটেই প্রমাণ করবার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন যে তিনি পিছিয়ে পড়েননি l করুণ দৃশ্য এবং শোচনীয় l হুজুগের হুঙ্কারে তিনি আত্মপ্রত্যয় হারিয়েছেন l মনের অচেতনে তাঁর এই কথাই কাজ করেছে যে আমি যদি এখনও মাকড়শার জাল, ঘাস আর শিশিরের কথা লিখি, তবে আর কি তাঁর পাঠক জুটবে? শুধু কবিতার মাঝে মাঝে রোম  - বার্লিন দেখলে লোকে একথা অন্তত ভাববে যে লোকটা নিতান্তই মরে যায়নি l আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে নির্জন, সবচেয়ে স্বতন্ত্র l বাংলা কাব্যের প্রধান ঐতিহ্য থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন এবং গেল দশ বছরের যে সব আন্দোলনের ভাঙাগড়া আমাদের কাব্যজগতে চলেছে তাতেও কোনো অংশ তিনি গ্রহণ করেননি l

          প্রগতি শিবিরের কবি সাংবাদিক সমর সেন, পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও নিরন্তর আক্রমণ করেছেন জীবনানন্দকে l সুভাষ মুখোপাধ্যায়  'পরিচয়  ' পত্রিকার  ( শ্রাবণ সংখ্যা ১৩৬০ বঙ্গাব্দে ) আলোচনায় লেখেন  - সময়হীনতার শাদা কাপড় দিয়ে সময়ের আপাদমস্তক তিনি ঢেকে দেন l কালের কাছ থেকে হরণ করে নেন গতি l মানুষের প্রতি নিদারুণ বিদ্বেষে, পৃথিবীর প্রতি উদ্ধত অবজ্ঞায় তিনি পলায়ন করেন প্রকৃতির নির্জন বানপ্রস্থে l তাঁর কল্পনার স্বাধীনতা মানুষের হাতের শৃঙ্খলকে চিরস্থায়ী করে l

'ধানকানা' উপন্যাস খ্যাত সাহিত্যিক ননী ভৌমিক জীবনানন্দের সমালোচনা করে লিখেছেন  - জীবন ও সমাজের অস্বীকৃতিরই আর একটি মুখোশ হলেন  - জীবনানন্দ l তিনি সমাজ সচেতন কবি হলে হতে পারতেন রবীন্দ্রত্তোর  যুগের একজন মহৎ কবি l তার অভাবে তিনি হয়ে গেলেন একজন ব্যর্থ কবি l

             সাহিত্যজগতের চারপাশে নিরন্তর বিরূপ সমালোচনায় ক্লান্ত, কবি জীবনানন্দ ১৯৫৩ সালের মে মাসে কবির একান্ত  অনুরাগী সুরজিৎ দাশগুপ্তকে লেখেন  -

এদেশে বড়ো সমালোচক আজকাল নেই- ই একরকম l আমার কবিতা সম্বন্ধে চারদিকে এত অস্পষ্ট ধারণা যে আমি নিজে এবিষয়ে একটি বড়ো প্রবন্ধ লিখবো ভাবছিলুম l

                প্রতিদিনের পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, লেখার বিরূপ সমালোচনা সহ্য করতে না পেরেই সম্ভবত ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যার একটু পরে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্ৰিয় পার্কের কাছে বালিগঞ্জমুখী একটি চলন্ত ট্রামের ধাক্কায় ( সম্ভবত তিনি আনমনা ছিলেন  কিংবা মরণ ঝাঁপ দিয়েছিলেন ) কবি জীবনানন্দ দাশ গুরুতর আহত হন l ২২ অক্টোবর, শুক্রবার রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয় l

                  তাঁর অনুরাগী কবি নরেশ গুহ লিখেছেন  - পরদিন সকালে রাসবিহারী এভিনিউ l নীরবে তাঁর দেহ কেওড়াতলা শ্মশানঘাটে নিয়ে গেলাম আমরা l তাঁকে চিনতেন, জানতেন, ভালবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন, তাঁরা এসেছিলেন l ছিল একটি শোকযাত্রীর দল l তরুণ কবিরা ছিলেন l নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় গিয়েছিলেন শ্মশানে l সুদূর বজবজ থেকে ছুটে এসেছিলেন  সুভাষ মুখোপাধ্যায় l

কবি সঞ্জয় ভট্টাচাৰ্য লিখেছেন  - সজনীকান্ত দাশ শেষকৃত্য পর্যন্ত যে আন্তরিক সহযোগিতা দেখিয়েছেন এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তর চোখে মুখে যে বিমূঢ় ভাব দেখেছি শেষ দু'দিন, তা আমার মনে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে l

মৃত্যুকে কিভাবে দেখেছিলেন জীবনানন্দ -  'নিশান্ত  পাখি ওড়ার l মানুষ খুঁজুক শ্রেয় সুখ, মৃত্যু থাক তার আয়তনের বাইরে l '

শেষপর্যন্ত রূপসী বাংলার নির্জনতা বিলাসী প্রচারবিমুখ কবির মৃত্যুর ৬৯ বছর পরেও ( জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯, মৃত্যু -২২ অক্টোবর  ১৯৫৪ ), তাঁর অনুরাগী পাঠকদের মনে কিছু প্রশ্ন এবং জিজ্ঞাসা আজও  রয়েই গেছে l

...(সমাপ্ত)...

Friday, January 13, 2023

তিন্নির জন্য

ছবি  : ইন্টারনেট 

তিন্নির জন্য

তুষার ভট্টাচাৰ্য 


আজ সকাল থেকেই মণিময়বাবুর মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে l আর সুধা কেঁদেই চলেছে l খুবই দুঃখজনক ঘটনা l কিন্তু মেনে নিতে হবে l জীবনে সবকিছুই তো মেনে নিতে হয় l মানিয়ে নিতে হয় l এটাই নাকি জীবন l

আজ সকালেই একমাত্র পুত্রবধূ পরমা, নাতনি তিন্নিকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে l

মণিময় বাবুর একমাত্র পুত্র  তনুশ্যাম  কলেজের অধ্যাপক l পরমারও একই পেশা l ভালবেসে দুজনের বিয়ে l কিন্তু ইদানীং  রোজ দুজনের ঝগড়া, খোটা খুটি লেগেই রয়েছে  l মাঝে মধ্যেই পরমা রাগ করে তিন্নিকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায় l ব্যাপারটা এই পর্যন্ত থেমে ছিল l কিন্তু গতকাল রাত্তিরে পরমা সুধাকে জানিয়ে দিয়েছে  -আগামীমাসে ওরা নাকি ডিভোর্স করবে l

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মণিময় বাবু রাত্তিরে সুধার মুখে এই কথা শুনে বেশ আশ্চর্য হন l কী দিনকাল পড়ল l কথায় কথায় ডিভোর্স l ভালবাসার শিকড়ের মায়াটান বলে এখন আর কিছু নেই l

মুশকিলটা হচ্ছে, আদরের নাতনি তিন্নি পর হয়ে যাবে এটা কিছুতে  ভাবতেই পারেন না মণিময় বাবু l আদরের নাতনিটা দাদু আর ঠাকুমা বলতে অজ্ঞান l ও চলে যাবে ভাবতেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল মণিময়বাবুর l

দু'সপ্তাহ কেটে গেছে  l শেষে নিরুপায় হয়েই রোববার সকালে ট্যাক্সিতে চেপে মণিময়বাবু পৌঁছলেন বউমা পরমার বাড়ি l তাকে দেখতে পেয়েই তিন্নি ছুটে এল l

মণিময়বাবু তিন্নিকে আদর করতে করতে বললেন - চল মা তোকেই নিয়ে যাবো আমাদের কাছে l

পরমা এই কথা শুনে বলল  - তিন্নি আপনাদের না দেখে সারাদিনরাত শুধু কান্না কাটি করে  l

আমিও রাগের মাথায় চলে এসেছিলাম  বাবা l আপনি আপনার ছেলেকে  একটু বুঝিয়ে বলুন  - রাত্রি বেলায় অতিরিক্ত ড্রিঙ্ক করে যেন না ফেরে l আজকাল আমাকেও  পেটাতে শুরু করেছে l

তিন্নির জন্যই ফিরছি l নইলে ডিভোর্স করে দেবই ভেবেছিলাম l এই বলে পরমা কেঁদে ওঠে l

মণিময় বাবু পরমার কথা শুনে কিছুটা বিস্মিত হন l এত অধ:পতন হয়েছে তনুশ্যামের ! ড্রিঙ্ক  করে বাড়ি ফেরে, পরমাকে মারধোর করে l এব্যাপারে সুধাকে জিজ্ঞেস করতে হবে l ও নিশ্চয়ই জানে l দোতলায় থাকে তনুশ্যাম l আর নীচের তলায় মণিময়বাবুরা l তাই রোববার ও ছুটির দিন ছাড়া তনুশ্যামের সঙ্গে দেখাও হয় না l

তনুশ্যামকে  যতটা পারবেন বোঝাবেন তিনি l   আগে তো এমন ছিল না l অন্য কোনও মহিলার পাল্লায় পড়ে নি তো? অন্যদিকে  বউমা পরমা খুব ভাল মেয়ে l তাছাড়া ওর বাবা মা এখন আর বেঁচে নেই l ও যাবে কোথায় ? এই সব ভাবতে ভাবতে মণিময়বাবুর নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় l


' ও দাদু কখন ঠাম্মির কাছে যাবো '-  তিন্নির এই প্রশ্নে মণিময়বাবু সহসা সম্বিৎ ফিরে পান l

   ট্যাক্সিতে তিন্নি আর পরমার সাথে ফেরার সময় মণিময় বাবুর মনটা হঠাৎই  অনাবিল আনন্দে ভরে গেল l পার্কে অনেকগুলি বাচ্চা ছেলে মেয়ে খেলছে l তার মনে হল ওইখানে তিন্নিকে নিয়ে নেমে  শৈশবের গোল্লা ছুট, চোর চোর খেলা খেলতে l

তিন্নিকে আবার পরমা নিয়ে যাবে না তো? এই ভাবতে ভাবতে বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলেন মণিময়বাবু l দেখলেন - দরজা খুলে সুধা দাঁড়িয়ে আছে আদরের  নাতনি তিন্নির অপেক্ষায় l

...(সমাপ্ত)...

Sunday, September 25, 2022

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

ছবি : ইন্টারনেট
যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা 
তুষার ভট্টাচাৰ্য
যেকোনও সময় যেকোনও কালেই   কবি লেখকরা অসম্ভব দূরদৃষ্টি চেতনা সম্পন্ন হয়ে থাকেন l কবি জীবনানন্দ দাশও  শুধু  দূরপনেয় তিমির বিলাসী, নির্জনতা বিলাসী   রোমান্টিক কবিই ছিলেন না ; তিনি ছিলেন তাঁর সময়কালের একজন  আদ্যপান্ত সমাজ সচেতন কবি l তাই রূপসী বাংলার  কবি   যখন উচ্চারণ করেন 'পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন '
তখন সমগ্র পৃথিবীজুড়ে সাম্প্রতিক করোনা ক্রান্তিকালের মারণ ব্যাধির প্রকোপ যেন  অদ্ভুতভাবে মিলে যায় l

কবি জীবনানন্দ দাশকে তাঁর সমকালের সমালোচকরা ( শনিবারের চিঠির সজনী কান্ত দাস, কবিতা পত্রিকার সম্পাদক তথা বিশিষ্ট কবি লেখক বুদ্ধদেব বসু, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার প্রমুখ ) নির্জনতা বিলাসী, হতাশাগ্রস্থ  কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন l
কিন্তু জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ  -ঝরা পালক (১৯২৭ সালে প্রকাশিত ), ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬ ), বনলতা সেন ( ১৯৪২), মহাপৃথিবী ( ১৯৪৪ ), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮) এবং কবির মৃত্যুর পরে প্রকাশিত -  শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪),রূপসী বাংলা (১৯৫৭), বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১), অন্যান্য কবিতা (সংকলন ) প্রভৃতি  কাব্য  গ্রন্থে কবির সমকালীন  সমাজ ও তার পারিপার্শ্বিক ভাবনার চলচিত্র নিপুনভাবে চিত্রিত হয়েছে l
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরাপালক' এ 'বিবেকানন্দ' শীর্ষক কবিতায় কবি লিখেছেন - 'মহামারী ক্রন্দন ঘুচাইলে তুমি শীতল পরশে l'
'নিখিল আমার ভাই' কবিতায়  - কীটের বুকেতে যেই ব্যথা জাগে আমি সে বেদনা পাই l
'একদিন খুঁজেছিনু যাঁরে' কবিতায় -' মৃত্যুর সুমেরু সিন্ধু অন্ধকারে বারবার উঠিতেছে কাঁদি 'l
'ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল ' কবিতায়  - 'শ্মশানের পানে উড়ে উড়ে কঙ্কালের রূপ l '
'পতিতা' কবিতায় - সে যে মন্বন্তর, মৃত্যুর দূত, অপঘাত, মহামারী l

কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'ধূসর পাণ্ডুলিপি'তেও অনেক কবিতায় তাঁর  সমাজ সচেতনতামূলক চিন্তনের সাক্ষর  পাওয়া যায় l যেমন 'অনেক আকাশ কবিতায়' রয়েছে - আলোর চুমায় এই পৃথিবীর হৃদয়ের জ্বর কমে যায় l
'ক্যাম্পে' কবিতায় - পৃথিবীর সব হিংসা ভুলে /এই ব্যথা এই প্রেম সবদিকে রয়ে গেছে l
'সুচেতনা' কবিতায় - কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে l
'জীবন' কবিতায় - আমাদের হৃদয়ের শস্য তবু মরে / জান তুমি? শিখেছ কি আমাদের ব্যর্থতার কথা ? কোন অশ্রু কোন পীড়া হতাশার গায়ে কখন জাগিয়া ওঠে /
কাশের রোগীর মতো পৃথিবীর শ্বাস, যক্ষা রোগীর মতো ধুঁকে মরে মানুষের মন l
'পিপাসার গান' কবিতায় - শুধু পীড়া, শুধু পীড়া! মুকুলে মুকুলে শুধু কীট আঘাত, দংশন চায় আজ মন l 
 'বনলতা সেন' কাব্যগ্রন্থের  'সুচেতনা' কবিতায় রয়েছে আশ্চর্য পংক্তিমালা  -
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন ;
সুচেতনা এই পথে আলো জ্বেলে এপথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে / শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলই অনন্ত সূর্যোদয় l

মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থের 'স্বপ্ন' কবিতায় সমাজ সচেতন কবি লেখেন - পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন, মানুষ রবে না আর l
আট বছর আগের একদিন কবিতায় -যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা এই জেনে অশ্বথের শাখা করেনি কি প্রতিবাদ?
'জীবনের এই স্বাদ' কবিতায়  - আমরা দু'জনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার l
সাতটি তারার তিমির কাব্যগ্রন্থের 'রাত্রি' কবিতায় কবি লিখেছেন - হাইড্রান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল l
'শ্রেষ্ঠ কবিতা' গ্রন্থের 'তবু' কবিতায় উল্লেখ রয়েছে - সে অনেক রাজনীতি রুগ্ন নীতি মারী মন্বন্তর যুদ্ধ ঋণ /আজ এই পৃথিবীর অন্ধকারে মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস কেবলই শিথিল হয়ে যায় l
'মানুষের মৃত্যু হলে'   কবিতায় - মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায় l
'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থে - তোমাদের ম্লান মুখ দেখিয়াছি /তোমাদের ক্লান্ত রক্তাক্ততা দেখিয়াছি l
রুগিরা হাঁপায় না তো, বুড়োরা কয় না কথা, থুবড়ো ব্যাথার কথা যত l
'বেলা অবেলা কালবেলা' কাব্যগ্রন্থে -
'পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে' কবিতায় -সকলেরই মৃত্যু হবে মরণ হতেছে l
'অন্যান্য কবিতা 'গ্রন্থে - মৃত্যু শীর্ষক কবিতায় কবি লিখেছেন - হাড়ের ভিতর দিয়ে যারা শীত বোধ করে মাঘ রাতে তাহারা দুপুরে বসে শহরের গ্রিলে মৃত্যু অনুভব করে l
পৃথিবী আজ কবিতায় - অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ি শব কুড়িয়ে ফিরছে অন্ধকারে l
'অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ' কবিতায় - 'অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা'
আজও সমানভাবে  প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যময়  হয়ে রয়েছে l
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশকে শুধুমাত্র নির্জনতা বিলাসী কবি হিসেবে চিহ্নিত না করে, কবির সমকালীন সমাজ সচেতনমূলক কবিতাগুলি পাঠ করলেই  তাঁকে নতুন ভাবে উপলব্ধি করতে পারা যায় অনায়াসে l
তাঁর একশো তেইশতম জন্মদিবস ( জন্ম : ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯, ৬ফাল্গুন ) পেরিয়ে যাবার পরেও কবিকে নতুনভাবে জীবনানন্দ প্রেমী পাঠকরা আবিষ্কার করবেন এটা আশা করা যায় l
...(সমাপ্ত)...

Monday, August 15, 2022

কল্লোল যুগের বিস্মৃত মণীশ ঘটক ( যুবনাশ্ব)

ছবি  : ইন্টারনেট 
কল্লোল যুগের বিস্মৃত মণীশ ঘটক  ( যুবনাশ্ব)    
তুষার ভট্টাচাৰ্য
''আরে কে ও স্যাঙাৎ যুবনাশ্ব না ? শালা তোমার আমলের আর কেউ বেঁচে নেই এই অধম ছাড়া।'' 
'মান্ধাতার বাবার আমল' স্মৃতিকথা গ্রন্থে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেছিলেন কল্লোল যুগের প্রথম মশালচি কবি মণীশ ঘটক ( যুবনাশ্ব - ১৯০২---১৯৭৯ )। একজন শক্তিশালী কবি হিসেবে, কল্লোল যুগের প্রথম সারির কবি হিসেবে পরিচিতি থাকা সত্বেও তিনি একালের বাংলা সাহিত্যের  বিশাল আঙিনায় বিস্মৃত হয়ে গেলেন ।
তাঁর কন্যা প্রখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী 'বর্তিকা' পত্রিকার একটি সংখ্যা ' মণীশ ঘটক' সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন ।
তাঁর জন্মশতবর্ষে বহরমপুরের দু'একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিল মণীশ ঘটক সংখ্যা । এরপরে মণীশ ঘটককে নিয়ে কোথাও তেমন করে প্রাসঙ্গিক আলোচনা আদৌ হয়নি । তাঁর উপরে প্রচারের আলোও তেমন করে আর পড়েনি ।
                     লেখকদের প্রসঙ্গে  একদা রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সি গোর্কি বলেছিলেন -  'লেখক হচ্ছেন তাঁর দেশের ও শ্রেণীর ভাবপ্রবণ মুখপাত্র । তাঁদের চোখ, কান ও হৃদয় তিনি । লেখক হচ্ছেন তাঁর সমকালের কণ্ঠস্বর'।
                               কল্লোল যুগের কবি মণীশ ঘটককে বিচার করতে গেলে দেখা যায় যে, তাঁর সমস্ত কবিতা, উপন্যাস, স্মৃতি কথা এবং আত্মজীবনীতে সমকালীন সময়ের অর্থাৎ কালের কণ্ঠস্বর , উচ্চারণের একটি ঝোঁক লক্ষ্য করা যায় ।তিনি তাঁর সময়কে ,পারিপার্শ্বিককে অবহেলা করতে পারেননি।যদিও তিনি আদ্যন্ত রোম্যান্টিক মেজাজের ছিলেন ।কিন্তু তাঁর কবিতায় যখন ধ্বনিত হয় -
   'চোখ বুজলে সব দেখতে পাওয়ার
    ক্ষমতা কেড়ে নিও না ;
    বন্ধ চোখের পাতার তলায়
    মনের দরজা যেন খোলা থাকে।'
এখানে কবির আর্তি, সামগ্রিকভাবে সমস্ত মানুষের আর্তি হিসেবে পরিগণিত হয় ।এখানে তিনি রোম্যান্টিক মেজাজের কবি নন, তিনি সাধারণ মানুষের কবি হয়ে ওঠেন এক লহমায় । যে ক'জন সাহসী যুবক লেখক, কবির দল আজ থেকে কয়েক দশক আগে , গতানুগতিকতার গন্ডীর বাইরে গিয়ে ভিন্নতর মূল্যবোধের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য রবীন্দ্রনাথ থেকে অন্যতর প্রবাহে বাংলা সাহিত্যকে বইয়ে দিতে এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন মণীশ ঘটক ।
                                 গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথার মধ্যে দিয়ে তিনি গদ্য সাহিত্যে যেমন নিজস্বতা বা স্বাতন্ত্রের পরিচয় দিয়েছেন, ঠিক তেমনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ও পরবর্তী বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের মূল্যবোধের বহুমুখী অবক্ষয় বা ভাঙনের প্রেক্ষিতে কাব্যসাহিত্যেও তিনি একটি স্বতন্ত্র সুর বা কণ্ঠস্বরের পরিচয় স্পষ্ট করে রেখে গেছেন । বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের সাহিত্য বিলাসকে ,তিনি একেবারে মাটির কাছাকাছি পৌঁছে দেবার যে প্রয়াস সমগ্র লেখনীর মাধ্যমে নিয়েছিলেন, ত্রিশের দশকে , তা পটল ডাঙার পাঁচালীর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় ।পরবর্তী জীবনেও সেই ধারা অব্যাহত তাঁর সমস্ত লেখায় ফুটে উঠেছে ।
                    বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের নীচতা ,ক্ষুদ্রতা, ভীরুতা, লোভ, খর্বতা যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আবিল পরিবেশে সমস্ত মানবিক মূল্যবোধ , মননকে ভিতর থেকে কুরে কুরে ধ্বংস করছিল তখনই মণীশ ঘটক তাঁর নির্মোহ ঋজুতার সঙ্গে অপ্রিয় সত্যভাষণের মাধ্যমে সেগুলিকে উন্মোচিত করে দিচ্ছিলেন এবং নির্মম ব্যঙ্গের কশাঘাতে পিউরিটান  মানসিকতা স্বর্বস্ব বাঙালি মধ্যবিত্তের ছোট হয়ে আসা মনের গন্ডীকে ভেঙে চুরমার করে দিতে বরাবর  সচেষ্ট ছিলেন  তিনি ।
               যদিও কবি মণীশ ঘটক কখনও জীবনের প্রতি আশাবাদ হারাননি ।তাঁর কবিতায় ( একটি বিশাল গাছ, অকুণ্ঠ প্রেম, আগুন ওদের প্রাণ, দুঃখী দরিদ্র দুর্বল, রক্তবীজ, বাঘের ছানা, যা ইচ্ছে তাই, অনর্গল রক্তপাত, যদ্দিন না, আত্ম সমীক্ষা, কী করেছ যাও বলে, যুবনাশ্ব না ? ) প্রেম, প্রকৃতি এবং জীবনের প্রতি অকুণ্ঠ আশা, প্রত্যয় ফুটে উঠেছে বিভিন্ন চিত্রকল্প এবং রূপকের আড়ালে ।

   দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সচেতন মননের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর বিভিন্ন কবিতায় ।১৯৬৭ সালে তিনি শাসকদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লিখলেন 'জন্মাষ্টমী' কবিতা । গদি সর্বস্বতার মোহের বিরুদ্ধে তাঁর সতর্ক উচ্চারণ  - ' যুদ্ধ হোক যুদ্ধ হোক',  ভন্ড সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার  লেখনী - 'স্বাধীনতা', 'পাপীকেও ঘৃণা করো', 'দোস্ত তাদের জাগাও', 'এদের চিনে রাখো' , 'ঘোড়সওয়ার' , 'গৃহ নেই' , 'এসেছে লগ্ন' প্রভৃতি কবিতার মধ্যে দিয়ে একজন সমাজ সচেতন কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে তাঁর একটি আলাদা স্বতন্ত্ররূপ প্রকাশ পেয়েছে ।
বস্তুত, দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের আর্থ- সামাজিক টানাপোড়েনের পটভূমিকায় বাংলা সাহিত্যে কল্লোল যুগের সূচনা । কল্লোল যুগের অধিকাংশ লেখকই ছিলেন অত্যন্ত সমাজ সচেতন ।কল্লোল যুগের লেখকদের  লেখনীতে রোম্যান্টিকতার অনাবশ্যক বিলাস ছিলনা। তাই তাঁদের লেখায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে।ত্তর বাঙালি সমাজের সার্বিক অবক্ষয়ের চালচিত্রই নিপুন কলমে  ফুটে উঠেছে ।
           মণীশ ঘটক কল্লোল যুগের প্রথম মশালচি  হিসেবে তাঁর লেখার টানটা ছিল নিচুতলার মানুষের জীবনের বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার দিকে ।তাঁর 'পটলডাঙার পাঁচালীর' সচেতন সাহিত্যায়ন সমগ্র বাংলা কথাসাহিত্যে নিসন্দেহে পথিকৃৎ এর ভূমিকা নিয়েছে ।
               মণীশ ঘটকের গল্প, উপন্যাস, স্মৃতি কথায় ছড়িয়ে আছে তিনটি ভিন্নমুখী ধারা ।একদিকে পটলডাঙা - কলকাতার ভিখারী গুন্ডা, বস্তিবাসীদের আন্ডার ওয়ার্ল্ড,যার ছবি তিনি এঁকেছেন অবক্ষয়ী জীবনের প্রতি সমমর্মী দুঃখবোধ থেকে ।
এর বিপরীতে কলকাতার বাঙালি অভিজাত সমাজের ছবি তিনি তুলে ধরেছেন যেখানে মানবিকতার লেশ মাত্র নেই ।আছে শুধু অর্থের আস্ফালন ।ত্রিশ- চল্লিশের দশকে বাঙালি অভিজাত ধনী সমাজের দেশজ সংস্কৃতির মূল প্রবাহ ও মূল্যবোধ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে করতে একধরনের কৃত্তিমতার খোলসে নিজেদের গন্ডীবদ্ধ ও অবরুদ্ধ করার প্রক্রিয়াকে তীব্র ব্যঙ্গ, বিদ্রূপে কশাঘাত করেছেন মণীশ ঘটক ।
তাঁর স্মৃতিমূলক আত্ম জৈবনিক গ্রন্থ  ' মান্ধাতার বাবার আমল' এ মণীশ ঘটকের লেখার তৃতীয় ধারাটি হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনচরিত এবং তার সঙ্গে বাংলার রূপকথা, লোককথার আবেগ উদ্ভাসিত যন্ত্রণার বাস্তব আখ্যানপর্ব ।
'কনখল' উপন্যাসটি এই তৃতীয় ধারার উজ্জ্বল নিদর্শন, এই উপন্যাসে লোক সমাজের অন্তর্নিহিত জীবনীশক্তি যা প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার কথা বলে, যাতে মানুষের জীবনের শুদ্ধতার এক অপরিসীম আলোক সন্ধান রয়েছে, যা কিনা মেকি নাগরিক জীবনের সম্পূর্ণ বাইরে এসে, বাল্যজীবনের নির্মল কোমলতার স্মৃতিবিলাসের কাব্যিক মেজাজে 'কনখল ' উপন্যাস  হয়ে উঠেছে লোকায়ত জীবনের এক অপূর্ব আখ্যানপর্ব । যেখানে মানুষ কখনও মনুষ্যত্ব হারায় না । এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই  বেঁচে থাকার কথা বলে ।
            প্রসঙ্গত, মণীশ ঘটকের সমস্ত লেখনীতেই ছিল তারুণ্যের স্পর্ধা ও দীপ্তির মাধুর্য । সমকালের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়ে ছিল তাঁর কবিতায়, স্মৃতিকথায় ।ছদ্মনাম যুবনাশ্বর লেখনী ছিল ব্যঙ্গ বিদ্রূপে ভরা ,সমাজের বিভিন্ন অবক্ষয়, কৃত্তিম উন্নাসিকতা, মেকি অনুশাসন প্রভৃতির বিরুদ্ধে তীব্র কশাঘাত ।
                              অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় , বর্তমানকালের বাংলা সাহিত্যের পাঠকরা কবি লেখক মণীশ ঘটকের নাম তেমন করে জানেন না । তিনি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় অনালোচিতই থেকে গেলেন ।কল্লোল যুগে যাঁরা অগ্রণী কবি সাহিত্যিক  ছিলেন, তাঁদের কারও থেকে মণীশ ঘটকের প্রতিভা কম ছিল না ।আসলে তিনি তেমন করে প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার পাননি । এই আধুনিক প্রচারসর্বস্ব যুগে তেমনভাবে  প্রচার না পেলে  সাহিত্যের পাঠকরা জানবেন কীভাবে কল্লোল যুগের শক্তিমান কবি মণীশ ঘটকের লেখালেখির অন্তর্লীন জগতের কথা !
বাংলা সাহিত্যে কত প্রতিভাবান কবি, সাহিত্যিক সামান্য প্রচারের আলো না পেয়ে হারিয়ে গিয়েছে তার হিসেব আর কে রাখে । 
গ্রন্থ সূত্র : শিলালিপি  (কাব্য গ্রন্থ ),পটল ডাঙার পাঁচালী ( গল্প গ্রন্থ ),কনখল ( উপন্যাস ), বিদূষীবাক ( কাব্য গ্রন্থ ),নামায়ন  ( কবিতা গ্রন্থ ),যুবনাশ্বের নেরুদা ( অনুবাদ গ্রন্থ ),এক চক্রা ( কবিতা গ্রন্থ ) এবং মান্ধাতার বাবার আমল ( স্মৃতি কথা )।
...(সমাপ্ত)...