1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label মৌসুমী ঘোষ. Show all posts
Showing posts with label মৌসুমী ঘোষ. Show all posts

Wednesday, October 6, 2021

অন্তরের কমলিনী

ছবি : ইন্টারনেট 

অন্তরের কমলিনী

মৌসুমী ঘোষ


জীবনে জ্ঞান হওয়া থেকে যে স্বপ্নটা মনের মধ্যে সব থেকে বেশীবার উঁকি দিয়েছে তা হলো কাশ্মীর ভ্রমণ। ভারতের ভূ -স্বর্গ দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সারাজীবন ধরে বয়ে বেরিয়েছি । এখন বয়েস সাতষট্টি আজ সেই স্বপ্নের ট্রেন ধরার সৌভাগ্যো হলো। আমি রুদ্র প্রসাদ রায় , রিটায়ার্ড ব্যাংক অফিসার । দুই বছর হলো স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে । একমাত্র ছেলে প্রতিষ্ঠিত। বয়েস বাড়লেও অসুখ বিসুখে খুব বেশী কাবু করতে পারেনি  আমাকে।

আর এই বয়েসে একা একা ঘুরতে যাওয়ারও একটা মজা আছে।তাই মনের জোর সাথে করেই জম্মু- তাওয়া তে চেপে বসেছি । গন্তব্য জম্মু ও কাশ্মীর । লোয়ারবার্থ জানালার পাশে কম্পার্টমেন্টের যে পাশে আড়াআড়ি সিট থাকে এবং দুটো জানলা থাকে সেদিকের সিট পেয়েছিলাম এবং এই সিটটা আমার খুব প্রিয়।বেশ লম্বা করে পা ছড়িয়ে বসা যায়, জানালাটাও একার দখলে থাকে আর পুরো কম্পার্টমেন্টটা দেখা যায় ।। 

দুটো স্টেশন পরেই একসাথে তিনজন মহিলা উঠলো ঠিক আমার সামনের তিনটে বার্থে । মাঝবয়সী ই হবে । তিনজন ই প্রায় সমবয়সী । অনেকদিন পর স্টেশন থেকে একটা পত্রিকা কিনেছি, সেটাতেই মনোযোগ দেবার চেষ্টা করছি । কিন্তূ তিনজন মিলে এতো কথা বলছে যে আমার মাথা ধরে যাচ্চে। ওঠার সময় একঝলক দেখেছি , শীতকাল সবার ই মুখের বেশীরভাগ অংশ ঢাকা । আমার নিজের ও মাফলার দিয়ে ঢাকা । এটা পরিস্কার বুঝতে পারলাম যে পুরো রাস্তাটাই এদের অত্যাচার সহ্য করতে হবে ।কারণ গন্তব্য সবার একই । 

সন্ধের পর কম্পার্টমেন্টের দরজা বন্ধ হওয়ার দরুন বেশ গরম অনুভব হতে লাগল । মাফলারটা খুলে ব্যগে ঢোকালাম। হটাৎ দেখলাম উল্টো দিকের তিনজন মহিলার মধ্য একজন বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । একটু পরে নিজের মুখের চাদরটা সরিয়ে এগিয়ে এসে জিগ্গেষ করলো,

" আপনাকে ভীষণ চেনা লাগছে ,কোথায় থাকেন?

আপনি কী কখনো জলঙ্গী তে ছিলেন ? "ট্রেনের আবছা আলোয় জলঙ্গী র কথা বলাতে আমিও একটু খেয়াল করে দেখতেই ভদ্র মহিলাকে চিনতে পারলাম । 

" ক.. ম.. লিনী ! কেমন আছো ?" কতদিন পর দেখছি। 

নাহ ! সেই আগের মত বুকের ভিতর কোনো শিহরন আজ আর হচ্ছে না । বরং ভালো লাগছে,

এটা ভেবে যে ও আমাকে দেখে চিনতে পেরেছে।

সেই কতদিন আগে দেখেছি ওকে, প্রায় চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলো । 

শেষ দেখা হয়েছিল জলঙ্গীর চরে, মিত্রদের আমবাগানে । তখন আমি সাতাশ, কমলিনীর

বছর বাইশ হবে। চাকরির পরীক্ষার জন্যে প্রিপারেশন নিচ্ছি , সারাদিন টিউশনি করি। একটু সময় পেলেই ছুটে যাই কমলিনীর কাছে। সপ্তাহের কোনো একটা দিন সময় বের করতাম দুজনেই । তবে যোগাযোগ করা মাঝে মাঝেই দু: সাধ্য হয়ে উঠতো।তখন এতো মোবাইল এর রমরমা ছিলনা তাই সব সপ্তাহ না হলেও দশ দিনে একবার কিংবা পনেরো দিনে একবার দেখা হতই । 

সেদিন ছিল দোল । কমলিনী সকালেই ডেকে পাঠিয়েছিল জলঙ্গীর চরে, "পড়ি মরি করে ছুটে

গিয়েছিলাম, গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে দু মুঠো আবীর মাখিয়ে দিয়েছিল দুই গালে। আমিও লাল

আবীরে ভরিয়ে দিয়েছিলাম ওর দুই গাল । লজ্জায় আরো লাল হয়ে গিয়েছিল । তারপরই কাঁদতে কাঁদতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বুকের ওপর "। বলেছিল, "কালকে আমাকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ। চলো আমরা পালিয়ে যাই।পাত্র, বাবার বন্ধুর ছেলে। তাই বাবা এ বিয়েতে আপত্তি করবে না। আমার বিয়ে দিয়ে দেবে।" 

জলঙ্গীর চরকে সাক্ষী রেখে সেদিন আমরা দুজন পালিয়ে যাওয়ার সত্যিই প্ল্যান করেছিলাম । পরেরদিন বেলা বারোটায় ছিল ট্রেন। স্টেশনে দেখা হবে বলে কথা ছিল । কিন্তূ বাড়ি ফেরার পর মা ভাইভা পরীক্ষার লেটার ধরিয়ে দিয়েছিল বলেছিল, "কাল ভোরের ট্রেনেই তোকে কোলকাতা যেতে হবে "। একদিকে চাকরি অন্যদিকে প্রেমিকার কথা রাখা সে এক ভয়ংকর দোটানা । সারারাত ভাবার পর চাকরির পরীক্ষার ইন্টারভিউ প্রাধান্য পেয়েছিল। ভোরেই কোলকাতার ট্রেন ধরেছিলাম । 

পরের দিন খোঁজ নিয়ে জেনে ছিলাম কমলিনীর বাবা জেনে গিয়েছেন আমাদের সম্পর্কের কথা , পালানোর কথা । তাই আর রিস্ক নেয় নি । বন্ধুর ছেলের সথেই কমলিনীর বিয়ের সব ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছেন । কমলিনীর সাথে দেখা করার কোনো সুযোগ আর হয় নি। ওর বাবা পনেরো দিনের মধ্যেই ওর বিয়ে দিয়েছিলেন। বন্ধুর বাড়ির ছাদ থেকে লুকিয়ে দেখে ছিলাম কমলিনীর  কনকাঞ্জলি । 

আমার ইন্টারভিউ ,চাকরি এসব কোনো কথাই আর ওকে নিজের মুখে বলা হয় নি। কিংবা সব জেনেও ওর পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব হয় নি । মোটকথা আমার আর কমলিনীর প্রেম ওখানেই সমাপ্তি ঘোষনা করেছিল । তারপর আমার ব্যাঙ্কের চাকরি ,ট্রান্সফার , প্রমোশন এসবের মাঝে কমলিনী চাপা পড়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো বৃষ্টির দুপুরে কিংবা দোলের দিন কমলিনী আসতো আমার স্মৃতিতে । ভীষণ মনখারাপে, ভীষণ আনন্দে , চরম একাকীত্বে তুমুল ভাবে কমলিনী ছুঁয়েছিল অনেক বছর । 

তারপর কবেই যেন কমলিনী লুকিয়ে পড়েছিলো আমার স্ত্রী, সুলগ্না নামের আয়নার পিছনে । সংসার, সন্তান , ব্যস্ততার চাপে পিষ্ট হয়েছিল কমলিনী। সুলগ্নার প্রতি কর্তব্যর কোনো ত্রুটি করিনি । চেষ্টা করেছি আন্তরিকতার বন্ধনে বাঁধার । তবে জীবনের প্রথম ভালবাসা যে ভুলতে পারিনি সেটা বুঝেছিলাম আমার নাতনী হওয়ার পর।কারণ আমার নাতনীর নাম রেখেছি কমলিনী।

ও জন্মাবার পর যখন নাম ঠিক করা হচ্ছিল তখন আমার মুখ ফসকে এই নামটাই বেরিয়েছিল ।

সবেমাত্র দুই বছরে পড়েছে । যদিও সুলগ্না কখনো কমলিনীকেই দেখে যেতে পারেনি । 

কমলিনী বলেছিল , "আমি ভালো আছি রুদ্র দা"।

" তুমি কেমন আছো? চুল গুলো তো সবই পাকিয়ে ফেলেছ ।তবে চেহারার খুব একটা পরিবর্তন হয় নি"। অল্প সময় পরেই, কমলিনী আমার পাশে

এসে বসায় দুজনের স্মৃতিচারনায় জমে উঠেছিল আমাদের যাত্রাপথ। একসময় জলঙ্গীর চরে

বসে দুইজন স্বপ্ন দেখেছিলাম একসাথে আসমুদ্রহিমাচল ঘুরবো । আজ বুঝি সেই স্বপ্ন পূরণের দিন। মাঝখানে শুধু বদলে যাওয়া চল্লিশবছর । 

আজ আর কোনো অনুভূতিই সেভাবে বোধ হয় না। নতুন কোনো স্বপ্নও দেখি না। প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির হিসেবের খাতাটায় হালখাতা করা হয় না নতুন করে । জম্মু কাশ্মীর ঘুরলাম ওদের সাথে । তিন থেকে চারজন হয়ে একসাথে ঘুরতে সবারই ভালো লেগেছিল । 

কমলিনীরা তিনজন মিলে একটা কোচিং সেন্টার পরিচালনা করে । কিছু সমাজসেবার কাজও করে আর বছরে একবার ঘুরতে যায় একসাথে ।

কমলিনীর একটি মেয়ে, বিদেশে থাকে ।

বছর পাঁচেক হলো কমলিনীর স্বামী মারা গেছে।একাকীত্ব যাতে গ্রাস করতে না পারে। সেই জন্যে সবাই সবার মত আনন্দ করে কাজ করে।

কমলিনীর মেয়ের একটি ছেলে আছে ওকে কমলিনী রুদ্র বলে ডাকে । 

কমলিনী বলেছিল , " জীবনে এই একটি নাম ই বোধহয় সবথেকে বেশী আমার মুখে উচ্চারিত হয়েছে। " দুজনের নাতি নাতনির নাম শুনে খুব হেসেছিলাম । এক অসীম শান্তিও পেয়েছিলাম। দুজনে এটা ভেবে যে, কেউ কাউকে আপন করে পায়নি ঠিকই কিন্তূ কেউ কাউকে ভুলতেও পারিনি । দুজনেই দুজনার মনের কোণে কোথাও না কোথাও আজও আছি । 

কমলিনী আমাকে অফার দিয়েছে ওদের সাথে কাজ করার জন্যে । আমি কমলিনীর অফার সাদরে গ্রহণ করেছি । আজ কোনো বাঁধা নেই,ধরা পড়ার ভয় নেই , পরীক্ষার ইন্টারভিউ এর টেনশন নেই । শুধু আছে একে অপরের জন্যে

শুভ কামনা ।

mghoshsrp94@gmail.com
কলকাতা 

Tuesday, January 26, 2021

তিন ইয়ার ও পরীনীতা

 

ছবি  : ইন্টারনেট 

তিন ইয়ার ও পরীনীতা 
মৌসুমী ঘোষ

      সদ্য পঞ্চাশ পেরনো অন্তরঙ্গ তিন বন্ধু । তিনজনেই জীবনে সফল । একসময় কলেজে সবাই বলতো থ্রী মাসকেটিয়ার্স সেই কলেজ জীবনের বন্দ্ধুত্ব এখনো একই রকম আছে। ভিন্ন পেশা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি, তিনজনের সম্পর্কে ।

অর্জুন গোয়েঙ্কা একজন নামকরা ব্যবসায়ী।
দেবাদিত্য গাঙ্গুলী শহরের বিখ্যাত ডাক্তার আর
কর্পোরেট জগতের সফল কর্মী বোধীসত্ত বোস ।
অর্জুন এবং দেবাদিত্যর বন্দ্ধুত্ব নার্শারী থেকে আর
বোধিসত্তর সাথে পরিচয় কলেজে । তিনজনেরই
ডিপার্টমেন্ট সায়ন্স ছিল । থার্ড ইয়ারে উঠে দেবাদিত্য ডাক্তারি পড়তে চলে গেলেও যোগাযোগ অটুট ছিলো ।
কখোনো সপ্তাহে একদিন কখোনো মাসে একদিন তিনজন একত্রিত হতই । পড়াশুনার সময় টাতে
এভাবেই যোগাযোগ রাখত । তারপর কিছুদিন সেই ভাবে নিয়ম করে বসা নাহলেও যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি । তবে সবসময় সবাই উপস্থিত না থাকলেও অন্য দুইজন একত্রিত হয়েছে ।

পড়াশুনা শেষ করে অর্জুন পৈতৃক ব্যবসায়ে ঢুকেছিল। দেবাদিত্য এম ডি করে এখন নার্সিংহোম, চেম্বার নিয়ে ব্যস্ত । আর বোধিসত্ত কোম্পানীর চাকরি নিয়ে এরাজ্য থেকে আর একরাজ্য কখোনো বা বিদেশ । তবে বিগত পাঁচবছর যাবত ও পুনেতে ছিল। সবে ছয়
মাস হলো কলকাতায় ফিরে এসেছে । ফিরেই আবার তিন বন্ধু প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে একত্রিত হয় ।

অর্জুন আর দেবাদিত্য সংসারী, অর্জুনের ছেলে
ম্যানেজমেন্ট পড়ছে , মেয়ে সবে কলেজ । দেবাদিত্যর একটি ই ছেলে ডাক্তারি পড়ছে দিল্লিতে। আর বোধিসত্ত বিয়েই করেনি। অন্য দুই বন্ধুর অনেক অনুরোধ সত্তেও রাজি হয় নি কিছুতেই । আত্মীয় পরিজন সে ভাবে ওর কেউ নেই । বাবা, মা দুজনেই গত হয়েছে অনেক বছর আগে ।

এবার কোলকাতায় ফেরার পর থেকে দুই বন্ধু আদাজল খেয়ে লেগেছে বোধিসত্তর বিয়ে দেবার জন্য । আজকাল ওরা বোধির নতুন ফ্ল্যাটেই একত্রিত হয় খুব আড্ডা চলে তিনজনের । অনেক
দিন আগে এরকম ই এক আড্ডায় বোধি বলেছিল
পরী নামের একটা মেয়েকে ও ভালবাসে । ভালো নাম পরীনীতা । সে ওদের গ্রামের বাড়ির প্রতিবেশী ছিল । যখন পরী ইলেভেনে পড়ে তখন ওরা বেনারস চলে যায়। কারণ ওর বাবার ট্রান্সফার হয়ে ছিল ।পরী ও বোধী কে ভালবাসত । বছর দুয়েকের ছোট ছিল। ক্লাস আলাদা হলেও স্কুল এক ই ছিল। তাই একসাথে স্কুলে যাওয়া , টিউশনি পড়তে যাওয়া, দুজনে সবসময় খুনসুটি করার মধ্যেই কবে দুজনের মন বিনিময় হয়ে গেছে নিজেরাও বুঝতে পারেনি । পরী চলে যাওয়ার পর বোধী বুঝেছিল অন্য কাউকে ভালবাসা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। পরী ও বেনারস থেকে চিঠিতে জানিয়ে ছিল একই কথা ।

সেই বছর ই বোধীরাও কলকাতায় চলে আসে। তখন এতো ফোনের ও রমরমা ছিল না । তারপর হঠাৎ করেই ওর বাবা মারা যাওয়া, পড়াশুনার চাপ, চাকরির জন্য চেষ্টা , সংসারের নানা টানাপোড়েনে একসময় যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায় । এখন, ও যে শহরেই যায় সেখানেই পরী কে খোঁজে ভাবে যদি দেখা হয ! দেখা হলেও কি চিনতে পারবে ? একে অপরকে ? সেইবার সরস্বতী পুজোর সময় পরী প্রথম শাড়ী পড়েছিল । মাথায় একপাশে হলুদ ফুল কাঁধ পর্যন্ত চুল টা ছাড়া, কানে ঝুমকো ,কপালে কারুকাজ করা টিপ, দেখতে দারুন লাগছিল । তখন ও ক্লাস টেন, আমি বারো ক্লাস । সদ্য গোঁফ ওঠা মুখটা ঘসে দিয়েছিলাম ওর মুখে , সেকি লজ্জা মেয়ের ! ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল , আমার দিকে আর তাকাতেই পারছিল না । বোধী বলেছিল, পরী খুব ডাকাবুকো আর ডেসপ্যারেট ছিল কারুর কথা সহ্য করতো না । বলতো, আমি জার্নালিজম পড়ব ।

দুই বন্ধু মিলে এবার জোরাজুরি করছে বিয়ে তোকে করতেই হবে । মেয়ে আমরা দেখে দেবো । বোধী বলে এই বয়েসে আর ঝামেলা করিস না তো বেশ আছি । বন্ধুরা বলে , তোর ফ্ল্যাটে চাট ছাড়া মদ খেতে রোজ রোজ ভাল লাগে না । আর তাছাড়া বুড়ো বয়েসে কে দেখবে বলতো তোকে ।
এবার বিয়েটা তোকে করতেই হবে বোধী , আমরা
কোনো আপিত্তি শুনব না । পুরনো প্রেম অনেক দিন বাঁচিয়েছ আর দরকার নেই ।


সেদিন ও তিনজনে একসঙ্গে বসে আড্ডা চলছিল ।
হটাৎ দেবাদিত্যর ফোন বেজে ওঠে । দেবাদিত্য দেখল শ্রীনীতার ফোন । শ্রীনীতা জার্নালিস্ট । বছর পাঁচেক আগে পরিচয় । ওর নার্সিংহোমের জমি নিয়ে প্রমোটারের সাথে গণ্ডগোলের খবরটা শ্রীনীতা প্রকাশ্যে এনেছিল । সেই সময় ওর সাথে পরিচয় । আর সেই পরিচয় এখন বন্দ্ধুত্বে পরিণত।
দেবাদিত্য আর অর্জুন মাঝে মাঝে শ্রীনীতার ফ্ল্যাটে যায় , শ্রীনীতাই ডাকে। তাছাড়া ওর সাথে গল্প করতে ওদের ও ভালো লাগে কারণ শ্রীনীতা খুব এনার্জেটিক , পসিটিভ, আর সাহসী একটা মেয়ে , বয়স ! বোঝা যায় না , তবে ওদের থেকে কমই হবে , বিয়ে থা করেনি । বয়স্ক এক কাজের মহিলা কে নিয়ে ফ্ল্যাটে একাই থাকে । দু- একবার ওরা আড্ডার ছলে জিগ্গেস করেছে বিয়ের ব্যাপারে শ্রীনিতা এড়িয়ে গিয়ে বলেছে, সবাই কে জীবনে একি কাজ করতে হবে এমন কোনো মানে নেই ।
আর বিশেষ কোনো কথা হয়নি এব্যপারে । একটা সফিস্টিকেট সম্পর্ক একে অপরকে শ্রদ্ধা করে সেখানে বেশী কথা জিজ্ঞাসা সা করাও যায় না ।

শ্রীনিতার সাথে কথাবলা শেষ হলে দেবাদিত্য
জানালো আগামী বুধবার আমাদের নিমন্ত্রণ ডিনারে। শ্রীনীতা চার মাস পর দেশে ফিরেছে
ইউরোপ ট্যুর থেকে ,আর ঐ দিন সরস্বতী পুজোও আছে । আমি ও বলে দিলাম আমরা এবার থ্রীমাসকেটিয়ার্স ই যাব। অর্জুন বলল বোধী ঐ দিন ফাঁকা রাখিস তিনজন একসাথে যাবো । শ্রীনীতা খিচুড়ি টা ব্যাপক রাঁধে । বোধী রাজী
হয়ে যায় ।

বুধবার সন্ধেবেলা তিনমূর্তি হাজির শ্রীনীতার ফ্ল্যাটে। কলিং বেল বাজতেই কাজের মাসি
এসে দরজা খুলে বসার অনুরোধ করে গেছে ।
শ্রীনীতা ও কিচেন থেকে চিৎকার করে বলেছে
তোমরা বোসো আমি কফি নিয়ে এক্ষুনি আসছি ।

মাঘ মাসের মার্জিত ঠান্ডা, সবে সন্ধে, হাল্কা বাতাস
আঠারো তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে গোটা কলকাতা শহরকে মনে হচ্চে লক্ষ লক্ষ জোনাকি দিয়ে সাজানো হয়েছে । দেবাদিত্য, অর্জুন আর বোধী তিনজনেই ব্যালকনির সোফা তে বসে বাইরের দৃশ্যে মশগুল । প্রায় দুহাজার স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট, বসার ঘরটি সুন্দর করে সাজানো হয়েছে , ঠাকুর ঘর থেকে ধূপের গন্ধ ম ম করছে,
খুব মধুর সুরে বাজছে রবীন্দ্র সঙ্গীত--একটুকু ছোঁয়া লাগে .... ।

শান্তিময় পরিবেশ , সকলের মেজাজ টাও বেশ ফুরফুরে । অর্জুন বলল, বোধী, শ্রীনীতা খুব রুচিশীল আর সত্যি কথা বলতে পিছপা হয় না। আর ওর মনটা ও খুব ভালো । পরিচয় হলে দেখবি কেমন আন্তরিক মানুষ ও । এমন ভালো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । বলতে বলতে শ্রীনীতা
কে দেখা যাচ্চে কফির ট্রে হাতে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে । তিনজনেই তাকিয়ে আছে সেদিকে , বোধী দেখছে অবাক হয়ে , প...রী ! !
সেই চেনা ছোট্ট মেয়েটা ! সেই সাজ ! হলুদ শাড়ী
খোঁপায় হলুদ ফুল, মুখে মিষ্টি একটা হাসি, প্রাণবন্ত, যৌবনের গোধূলী বেলাতেও এতো লাবণ্য , মাখনের মত ত্বক এখনো পুরুষকুলকে
কুপোকাত করতে পারে ।কিন্তূ একটু ও এনার্জি কমেনি । একই এনার্জি নিয়ে কফির ট্রে টা টেবিলে রেখেই বলল, " আমি নিজে হাতে তোমাদের জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে এলাম । কেমন আছো তোমরা বলো। তারপর বোধীর দিকে তাকিয়ে বললো , এই বুঝি আমার নতুন বন্ধু । হাই ! বলে হাত টা বাড়িয়ে দিয়েছে শ্রীনীতা । বোধী ও হাত টা বাড়িয়েছে হ্যান্ড শেক করার জন্যে । হাতে হাত মিলেছে কিন্তু বোধীর মুখের দিকে তাকিয়েই আছে শ্রীনীতা উল্টো দিকে বোধীর ও একি অবস্থা ।

মুখটা ভীষণ চেনা লাগছে, টিকালো নাক ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি, মোটা গোঁফ, টান টান নির্মেদ চেহারা , প্রশ্ন খোঁজা দুটো চোখ , রিমলেস চশমা, ঐ চোখ আমার খুব চেনা । স..তু ..দা .!! তুমি
সতুদা ? আই মিন তুমি রঘুদেব পুরের বোধীসত্ত বোস ? এতদিন পর ! কোথায় ছিলে ! কত, খুঁজেছি ! তেত্রিশ বছর পর তোমায় দেখছি ।
একসময় হন্যে হয়ে তোমার ঠিকানা খুঁজেছি ।
এবার বোধী শ্রীনীতা কে থামিয়ে বলল, "আরে দাঁড়া আস্তে , এতো প্রশ্নের উত্তর একসাথে কি করে দেবো । আর সব এই মুহূর্তেই শুনে নেবে" ?

দেবাদিত্য আর অর্জুনের অবস্থা কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
একটু পরেই অবশ্য সব পরিস্কার হয়ে গেলো ওদের কাছে । আর এও বুঝতে পারলো যে শ্রীনীতা ই বোধীর সেই পরী ।

বোধী বলল , আমি ও তো তোকে কত খুঁজেছি । তুই বা এতো দিন কোথায় ছিলি ? আর পরীনীতা
থেকে কিভাবে শ্রীনীতা হয়ে গেলি সেটাও বুঝতে
পারছি না ! হারানো ধন খুঁজে পেয়ে উভয়ের ই চোখের কোনে জোয়ার । শ্রীনীতার ভীষণ ইচ্ছা করছে বোধীকে জড়িয়ে ধরে বুকের ওপর মাথা রাখতে । মনে হচ্চে বুকের ওপর ঘুঁষি মেরে জিজ্ঞেস করে, আমায় ভুলে এতো দিন থাকতে পারলে ? দুই হাত আলগা করে বাড়িয়ে দিয়েছে বোধী, শ্রীনীতাও লজ্জা ভেঙে সঁপে দিয়েছে বোধীর
বাহু বন্ধনে । চিবুক বেয়ে জলের ধারা নেমে আসছে দুজনের । সেই চিরন্তন প্রেম , শরীর কে
উহ্য রেখে মনের অনুভূতিতে মিশে থাকা দুটি হৃদয়
একাকার হয়ে যাচ্চে , ঠিক বংশীধারী আর রাধার প্রেমের মত । পরম সুখের এক মুহূর্ত ।

একটু বাদে দেবাদিত্য আর অর্জুনেরব হাততালি র আওয়াজে দুজনের সম্বিত ফেরে । দেবাদিত্য বলে তোমরা বোসো , আমি কমলা মাসিকে কফি আনতে বলেছি । সবাই কফি খেতে খেতে শুনব তোমাদের ঠিকানা হারানোর গল্প ।

শ্রীনীতা সোফাতে বসেছে, পাশে বোধী , শ্রীনীতার
হাতটা বোধীর হাতের মধ্যে । শ্রীনীতা বলতে শুরু করল , " বাবার সাথে বেনারস আসার পরের বছরই স্ট্রোকে মা শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিল।কলেজ পাশ করা মাত্রই বাবা, মা দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পরলো আমার বিয়ে নিয়ে । আমি কিছুতেই রাজী
হলাম না ।

আমি মাস্টার্স করবো জার্নালিজম পড়ব , আমার চোখে তখন স্বপ্ন । আর সতু দা ছাড়া আর কাউকে আমি বিয়ে করবো না ।একথাও বলেছিলাম বাবাকে । বাবা বলল , ঠিক আছে তাকে খবর দে আমি তার সাথেই তোর বিয়ে দেবো । পুরো ক্ষেপে উঠলো । আমি ছুটলাম রঘুদেব পুরে , কিন্তূ তোমাদের কোলকাতার ঠিকানা কেউ দিতে পারলো না । হতাশ হয়ে বেনারস ফিরে গেলাম । ওখানে গিয়ে দেখলাম বাবা এফিডেভিট করে আমার নাম শ্রীনীতা করে দিয়েছে । কেনো বাবা এরকম করলো জানতে পারিনি কারণ বেনারস ফেরার পরের দিনই বাবা স্নান করতে গিয়ে গঙ্গার ঘাটে পড়ে মারা যায় । অসুস্থ মা কে নিয়ে শুরু হয় আমার একার পথ চলা । মাস্টার্স কমপ্লিট করেই ওখানে একটা চাকরি করি কয়েক বছর । তারপর মা ও একদিন মারা গেলো । আমি একদম একা হয়ে গেলাম ।ট্রান্সফার নিয়ে ফিরে এলাম কলকাতা শহরে ।

বিগত প্রায় বিশ বছর ধরে তোমাকে খুঁজে চলেছি এই শহরে । অবশেষে আজ সেই মূহুর্ত উপস্থিত ।
বোধী বলল, যে বছর তোমরা চলে গেলে সেই বছরই আমরাও কোলকাতায় চলে এলাম বাড়ি ভাড়া নিয়ে । এসে কলেজে ভর্তি হলাম সে খবর তোমায় দিযেছি । আর সেটাই তোমাকে লেখা আমার শেষ চিঠি । তারপর ই আর যোগাযোগ করতে পারিনি ।কারণ , বাবা এখানে যে প্রেসে কাজ করতো সেখানে মিথ্যা চুরির দায়ে বাবাকে জেলে পাঠায় মালিক । তিনদিন জেল থাকার পর বাড়ি ফিরে বাবা আত্মহত্যা করে । অথেই জলে পড়ি আমি আর মা । গ্রামের সম্পত্তি বিক্রি করে আমার পড়াশুনা শেষ করি, কয়েক বার বাড়ি পাল্টাতে হয়েছে নানা কারনে ।

তারপর চাকরি পেলাম , কয়েক বছর ধরে শুধুই ছুটে চললাম, শহর থেকে শহর , দেশ বিদেশ , এর মধ্যে মা ও গত হলো। এই দুই বন্ধু না থাকলে আমি হয়তো পাগল ই হয়ে যেতাম । তারপর যখন থামলাম দেখলাম তেত্রিশ বছর পেরিয়ে এসেছি ।এর মাঝে যেখানে গিয়েছি তোমাকেই খুঁজেছি। নিজের করে পাবো বলে নয় , একবার চোখের দেখা দেখব বলে । কিন্তূ কখোনো ভাবিনি তুমি আমার জন্যে আজও অপেক্ষা করে আছো ।

পাস থেকে অর্জুন বলে ওঠে, পরীনীতাই যে শ্রীনীতা ,আর আমাদের বোধীই যে তোমার সতুদা
যদি জানতাম তাহলে আরো পাঁচ বছর আগেই তোমাদের চারহাত এক করতে পারতাম আমরা ।
দেবাদিত্য বোধী কে বলল ,আমরা এবার উঠি ,
তুই আজ শ্রীনীতার কাছে থেকে যা , যেভাবে
হাত ধরেছিস তা তো আর ছাড়বি না, এতো বছর পর আমরা আর কাবাব মে হাড্ডি হবো না ।

সেদিন বসন্ত পঞ্চমী র রাত প্রায় বিগতযৌবণা
দুজন নরনারীর পবিত্র ভালবাসার কাছে হার মেনেছিল । ভোরের বাঁকা চাঁদ সাক্ষী হলো এক
নি:স্বার্থ, স্নিগ্ধ , মধুর মিলনের ।।
mghoshsrp94@gmail.com
কলকাতা



Wednesday, October 21, 2020

প্রিয় পহেলগাঁ ও প্রেয়সী পাটনিটপ


ছবি : লেখকের তোলা 
মৌসুমী ঘোষ 

    ছোটোবেলা থেকে বাবার মুখে গল্প শুনে কাশ্মীর দেখা শুরু । শৈশব থেকে লালিত স্বপ্ন পূরণে বার বার বাঁধা হচ্ছিল সময় , রাজনৈতিক অস্থিরতা, তার সাথে নিরাপত্তার অভাব বোধ ।অবশেষে সব বাঁধা অতিক্রম করে , 2014 এর মার্চে বেরিয়ে পড়লাম ভূ-স্বর্গ দেখার উদ্দেশ্যে । প্রথমে জম্মু ,সেখান থেকে পাটনীটপ হয়ে পহেল গাঁ এবং ওখান থেকে শ্রীনগর, এই রকম ছিল আমাদের ট্যুর প্ল্যান । আজ মূলত পাটনীটপ আর পহেলগাঁ এর কথাই বলবো। প্রথমদিন বৈষ্ণূমাতার দর্শন সেরে, কাটরা থেকে গাড়ী নিলাম আগামী সাত দিনের জন্যে । দুপুর বারোটা নাগাদ রওনা দিলাম পাটনীটপের উদ্দেশ্যে । জম্মু থেকে এর দূরত্ব একশো বারো কিলোমিটার । ঘন্টা পাঁচেকের এই দূরত্ব পেরিয়ে বিকেল সারে পাঁচটা নাগাদ পৌছালাম এখানে । এখানকার উচ্চতা 6640 ফুট । এখানে জম্মু কাশ্মীরের ট্যুরিজমের বাংলো তে ছিলাম।পাইন আর ঝাউবনের, ঢেউ খেলানো সবুজের কার্পেট পাতানো উপত্যকা এই পাটনী টপ ।

শ্রীনগর ও পহেলগাঁ থেকে সৌন্দর্যর আতিশায্য এর কিছু কম নয় । হাল্কা ঠান্ডার আমেজ, ঝিরি ঝিরি হাওয়া ,খুব কম জনবসতি ঘেরা নিরিবিলি , মন উদাস করা জায়গা এই পাটনীটপ। যতদূর চোখ যায় পাহাড়ের গায়ে বরফ পড়ে আছে । মাঝে মাঝে সবুজের ছোঁয়া ।ঠিক ক্যালেন্ডারে দেখা ছবির মত । এক কথায় অনবদ্য । কাশ্মীর ভ্রমণের প্রথম এই ভিউ পয়েন্ট দেখে আমি তো আনন্দে মশগুল হয়ে গেলাম । বলে রাখি, ওখানে 'পাকিস্তানি সন্দেশ' নামে একটা মিষ্টি খেয়েছিলাম কড়া পাকের, মন্দ লাগেনি । দু একটা নতুন নতুন মিষ্টি ও টেস্ট করেছিলাম । পাহাড়ী এলাকা, তাড়া তাড়ি সন্ধ্যা নেমে এলো । অল্প অল্প বৃষ্টি ও শুরু হলো । সুতরাং হোটেল বন্দী হলাম সবাই । পরের দিন সকালে পাটনীটপের সাইডসিন, নান্থা টপের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। রাতেই টের পেয়ে- ছিলাম বরফ পড়ছে অল্প অল্প কিন্তু নান্থায় পৌঁছে দেখলাম যেন বরফের উপত্যকা । প্রচন্ড হাওয়া আর অল্প রোদের আলোয় মনে হচ্চে উপত্যকা যেন রুপোর চাদরে মোড়া । ওখানে আমরা স্লেজ গাড়ি চড়লাম , মানুষে টানা । ঘন্টাদুয়েক এখানে বরফের নিয়ে মজা করে পহেলগাঁ এর দিকে চললাম । পাটনীটপ থেকে পহেলগাঁ র দূরত্ব 187 কিলোমিটার। চেনাব বা চন্দ্রভাগা নদী কে সাথে করে এগিয়ে চললাম চিরবসন্তের গাঁ দেখতে । পথে পেলাম জওহর টানেল এবং বানিহাল । জওহর টানেলের উচ্চতা 7250 ফুট । টানেল পার হতেই শুরু হলো কাশ্মীরের সব অসাধারণ সব ভিউ পয়েন্ট । 

ছবি : লেখকের তোলা 

আমাদের ড্রাইভার মোহন সিং দেখিয়ে চলেছে বিভিন্ন পাহাড়ী গ্রাম , শুটিং স্পট। আর প্রতিটি বাঁকে ই প্রকৃতির চমক । একপাশে ভয়ানক খাদ , অন্যপাশে বৈচিত্রে ভরপুর । সব মিলিয়ে এই যাত্রাপথ মানস পটে এক নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি পথ । প্রায় তিরিশ বছর আগে দেখা যে কাশ্মীরের বর্ণনা বাবার মুখে শুনেছি তার সাথে মেলানোর চেষ্টা করছি ঠিক সেইসময় মোহন সিং হটাৎ গাড়ির ব্রেক কষে দাড়িয়ে পড়ল । আর এগোনো যাবে না । কারণ সামনে গাড়ির লম্বা লাইন । খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সামনে ধ্বস নামছে।একের পর এক পাথরের নেমে আসছে সঙ্গে আরো ছোটো ছোটো পাথর গড়িয়ে পড়ছে একটা বড় এলাকা নিয়ে।কেউ জানে না কখন বন্ধ হবে । মিলিটারি রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে । প্রায় সারেপাঁচ ঘন্টা পর ধ্বস বন্ধ হল। তারপর রাস্তা পরিস্কার করে মিলিটারি গাড়ি ছাড়ার পারমিশন দিল । এতো সুন্দর প্রকৃতি আবার নির্মম ও বটে । কখন যে কি হবে কেউ জানে না । বিগত কয়েকঘন্টা প্রচন্ড টেনশনে কেটেছে । সামনে এগোনো যাচ্চে না , পিছনে ফেরা যাবে না। কাছের জল, খাবার সব শেষ । অজানা জায়গা , দোকানপাট নেই, নেই কোনো শৌচাগার । একপাশে নদীখাদ, অন্যপাশে পাহাড়ের অশনি সঙ্কেত । দিনশেষ হয়ে অন্ধকার্ নেমেছে , ঠান্ডার প্রকোপ ও মারাত্মক । ভয়ে, চিন্তায় গলা শুকিয়ে কাঠ ।ভয়ংকর এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেয়ে পহেলগাঁ যখন পৌঁছালাম তখন রাত তিনটে । খালি পেট আর পথের ক্লান্তি নিয়েও ষ্ট্রীট লাইটে তখন যা দেখলাম মনে হলো এর নামই বোধহয় স্বর্গ ।চারদিকে দুধ সাদা তার মধ্যে মেঘেদের দল বেঁধে ঘোরাঘুরি।মোহময়ীএক দৃশ্য।এখানে আমরা জম্মু এন্ড কাশ্মীর ট্যুরিজমের 'হাট' এ ছিলাম । দুটো ঘর , ডাইনিং, রান্নাঘর আর বারান্দা নিয়ে একটা ' হাট '। এখানেই পেলাম ইচ্ছে লেপ, এই নাম টা আমি দিয়েছি । কারণ এটা কারেন্টের মাধ্যমে ইচ্ছে মত গরম করা যায়। প্রবল ঠান্ডা তে ভীষণ আরামদায়ক ।ঐ লেপে শরীর দিতেই ঘুম । 

ছবি : লেখকের তোলা 

সকালে চোখ খুলেই কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখি বরফে ঢেকে আছে চারপাশ । হাটের সামনেই প্রায় দুই তিন ফুট করে উঁচু বরফ জমে রয়েছে । বরফের ওপর সকালের রোদ এসে পড়ায় অপূর্ব সুন্দর দেখতে লাগছে । বাইরে পা রাখতেই ঠান্ডা সুঁচ ফোটাচ্ছে । চারপাশে বরফ মাঝখানে মাঝখানে রাস্তা দারুন মনকাড়া এক দৃশ্য । ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে পড়লাম, ঘোড়ার পিঠে করে বৈশারন বা মিনি সুইৎসারল্যান্ড দেখতে । সবজান্তা এই ঘোড়া হেলিয়ে দুলিয়ে বরফের মাঝখান দিয়ে নিয়ে চলল , বেশ অন্যরকম লাগছিল । পাহাড়ী ঝাউ , পাইন গাছের মিশেলে বৈশারন এক অনন্য সুন্দর বুগিয়াল । সবুজের মাঝে বরফের আস্তরনে, ছবির মত লাগছিল । পরের সাইডসিন ছিল ডেবীয়ান । কাশ্মীরের রাজা এখানে একসাথে বাঘ ও হরিণকে মেরেছিল তাই এই জায়গাটি কাশ্মীরী দের মৃগয়াক্ষেত্র বলে পরিচিতি পায়, এরকম গল্প ই কথিত আছে ।। 

ছবি : লেখকের তোলা 

আসার পথে পেলাম লুকানো এক ঝর্না । যার জল ওপরে বরফ হয়ে গেছে কিন্তু নীচে কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলেছে । প্রচুর বরফ পড়ার কারনে আমরা পহেলগাঁ এর সব সাইডসিন করতে পারিনি। অনেক রাস্তাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । একটু মন খারাপ হলেও এক অদ্ভুত ভাললাগা সঙ্গে করে ক্যামেরাতে প্রচুর ছবি নিয়ে হাট এ ফিরে রাজমা চাউল আর ঘি দিয়ে লাঞ্চ সেরে নিলাম । 

সুন্দরী রানীর মত চির বসন্তের দেশ পহেলগাঁ ছেড়ে আসতে মন চাইছিল না ।মনে হচ্ছিল আরো দেখি , আরো উপভোগ করি নির্মল সুন্দর প্রকৃতির মাধুর্য্য। কিন্তূ উপায় নেই, ভাললাগার এক মোহ নিয়ে গাড়ীতে উঠে বসলাম শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে আর পহেলগাঁ কে স্মৃতির আঁচলে বেঁধে রাখলাম চিরকাল , চিরদিনের জন্য ।

mghoshsrp94@gmail.com
কলকাতা




Friday, May 1, 2020

রংবদল

                                                                                          ... মৌসুমী ঘোষ


         কটা চিঠি পেলাম বইএর তাক  গোছাতে গিয়ে চিঠি ই বটে তবে চিঠি না বলে একে প্রেমপত্র বলাই ভাল হাতের লেখা ও আমার এই খানিকটা আগে আমি চিঠিটা আবিষ্কার করেছি অল্প কিছুদিনআগে ও এইসব নিয়ে অনেক কিছু আমি ভাবতাম কিন্তু এখন আর এসব নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবি না কারণ একটা রাজনৈতিক দলের আঞ্চলিক কমিটির নাম্বার ওয়ান নেতা হিসাবে আমি গর্বিত প্রচুর লোকজন এখন আমার চারপাশে ঘোরাঘুরি করে হটাৎ করে একটা  সুযোগ এসে গেলো লোকাল নেতার অকাল মৃত্যু আমাকে সেই সুযোগ এনে দিল না হলে পার্টির নিয়মের আওতায় আমার উত্থান হতে আর ও অনেক সময় লাগত যাইহোক ভাগ্যের চাকাটা  ঘুরে গেলো আর আমি হয়ে গেলাম একেবারে প্রথম সারির নেতা
    যে আমি একদিন পার্টির লোকদের সাথে সাথে ঘুরেছি, মিথ্যে তোষামেদের গান গেয়েছি সেই আমি আজ মানুষকে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতির খেলায় মত্ত হয়ে আছি আর প্রাপ্তির আশায় মানুষ গুলো আমার সামনে কেমন নুব্জে পড়ে তার ফায়দা নিতে আমি কোনোভাবেই কার্পণ্য করি না
 আজ যে চিঠি টা পেলাম সেটা লেখা, যখন আমি CESC তে বেগার খাটি একদিন অফিস আওয়ারে কোনো একটা দরকারে মেয়েটা এসেছিলআমি কাউন্টারের ফাঁকা দিয়ে ওর হেঁটে আসা দেখছিলাম আর দেখতে দেখতে এতটা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে কখন ও একেবারে কাউন্টারের সামনে চলে এসেছে খেয়ালই করিনি, ওকে দেখে যে কি ভাবছিলাম তা আজ কেন সারা জীবন ধরে সাধনা করলেও বলতে পারব না তবে ও অফিস থেকে বেরনোর পরই ওর পিছু পিছু আমি ও বেরিয়ে আসি দেখতে পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কিছু বলবেন ?
থতমত খেয়ে বলেছিলাম আপনার না- না-নামটা যদি বলেন-- আমার নাম মোহিনী সেনগুপ্তকোথায়  থাকেন ? মুচকি হেসে বলেছিল, কাছেই এই তিন আমতলাতে ,হসপিটাল মোড়ে এরপর আমি আর কিছু বলতে পারিনি সামনে থেকে সরে গিয়ে একটু দুর থেকে ওকে লক্ষ্য করছিলামএকটু পরে বাস এলে ও চলে গেলো আর আমি হারিয়ে গেলাম ঐ তন্নী শ্রীময়ীর আগুনঝরানো রূপের মহিমাতে যৌবনের একেবারে শুরুতেই
ভাললাগা থেকে ভালবাসার উন্নীত স্তরে এগোতে থাকলাম মনে হলো এমন নারী আমি প্রথম
দেখছি -- সুমুখশ্রী,ফর্সা, সদ্য কিশোরীঅনুচ্চ বুক,লাবন্যমাখা শরীর,প্রশ্ন খোঁজা চঞ্চল দুটি চোখসারাদিন সেই মুখই চোখের সামনে ভাসছিল
ঠিক করলাম পরের দিনই তিন আমতলা তে গিয়ে  খোঁজ নেবো আর একবার যদি দেখা পাই নিশ্চয় মনের কথা সব বলে আসবো যদি মুখে না  বলতে পারি তাই একটা চিঠি ও লিখেছিলাম সেই চিঠিই এই চিঠি চিঠিতে লেখা ছিল --তোমার জন্য বাঁচতে পারি অনন্তকাল, অপেক্ষা করতে পারি অনাদিকাল, তোমার আমার মিলনের জন্য যে কোনো পূর্ণিমাই হতে পারে রাস তুল্য আমার সব ভালবাসা তোমায় দিয়ে সর্বস্বান্ত হতে চাই
নিরবিচ্ছন্ন এক উপলব্ধি ছুঁয়ে আছে সারাক্ষণ, সে তুমি ছাড়া আর কেউ নয়
   পরের দিনই বেরিয়ে পড়লাম এক বন্ধুর স্কুটারে চেপে মোহিনী সেনগুপ্তের খোঁজে মোহিনী তোমাকে আমার চাই , তোমাকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব খুঁজে খুঁজে চলে গেলাম ওদের বাড়ির গলির মুখে আগে থেকে খবর নিয়েছিলাম ঐ সময় টিউশনি থেকে বাড়ি  ফেরে সব কিছু একদম ঠিকঠাকই ছিল জানেন, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ডেকেছিলাম এসেওছিলো, বলেছিলাম একান্ত আপন করে  পেতে চাই তোমাকে, তোমার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করতেও রাজি সব কথা শোনার পর
খুব শান্ত ভাবে বলেছিল, শুধু আপনি কেনো আর কোনো পুরুষের কথাতেই আমি রাজি  হতে পারব না, কারণ আগামী মাসেই আমার বিয়ে , সব পাকাপাকি হয়ে গেছে খবর নিয়ে জেনে ছিলাম ছেলেটা সরকারি চাকরি করে শুধুমাত্র সরকারি চাকরির জন্য ছেলেটা মোহিনীকে পাবে এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়েছিলো মোহিনী  এমন একটা মেয়ে যাকে দেখলেই যেকোনো ছেলের বুকে হিমবাহের মত বরফ গলা জলের স্রোত বয়ে যাবে আবার রুমহিটারের মতো উষ্ণতা অনুভূত হবে শরীরের  মাপ ও যথাযথ, যেখানে যেমন হওয়া উচিৎ , যেন দাবানলের ছোবল ও পাশে থাকলে গরীব থেকে বড়লোক , শিক্ষিত
থেকে অশিক্ষিত যে কোনো  ছেলেই ঘটাতে পারে রাশি রাশি  বিপ্লব যে কোনো  পুরুষ  তার গন্তব্য কে পরাহত করে ছুটে আসতে পারে ওর হৃদয়
বৃত্তে
   যৌবনে ভালবাসার দরজা খোলার আগেই হয়ে গেলো বলো হরি হরিবোল তারপর আর কখনো আমি আর মোহিনীর খবর রাখিনি রাখার সময়ও পায় নি পার্টির কাজের দায়িত্ব আর সাংসারিক কর্তব্য পালনের মধ্যেই মনের চোরাবালিতে ঢেকে গিয়েছিল মোহিনী কিন্তু গতকাল একটা খবর পাওয়ার পর থেকেই মনটা কেমন যেন উচাটন করছে কাকতালীয় কিনা জানিনা আজই আবার এই চিঠি আমার হাতে এসে পড়েছে খবর যেটা পেলাম মোহিনী সেনগুপ্ত আমার বিরোধী পক্ষের হয়ে ভোটে দাড়াচ্ছে
    ওর বিবাহিত জীবন নাকি সুখের হয় নি, বছর দুয়েকের মধ্যেই ডিভোর্স হয়ে যায় তারপরে আবার পড়াশুনা শুরু করে ওকালতি পাশ করে এখন রাজনীতিতে পা রাখার চেষ্টা করছে মাথার ওপর  অনেক মান্যি গন্যি লোকের হাত ও আছে ভগবানের কি  খেলা দেখুন যার কর কমলিকায়  ছিল আমার সর্বস্ব আজ সেই আমার প্রতিদ্বন্দী কিছু করার নেই মানুষের জীবনবৃত্ত কোথায়  কি লিখে রাখে আমরা কেও জানতেও পারি না রাজনীতি তে আসারপর বুঝেছি আমি না চাইলেও আমার মধ্যে নানা রকমের দুষ্টু বুদ্ধির খেলা চলতে থাকে , কোনো সৌন্দর্যর প্রয়োগ সেখানে থাকে না কিন্তু এক্ষেত্রে আমাকে একটু ভাবতে হচ্ছে চিঠিটা হাতে আসার পর মনের মধ্যে পুরনো প্রেমটাও কেমন যেন চাড়া দিয়ে উঠেছে কিভাবে যে সবদিক সামলাব সেটা নিয়ে সূক্ষ্ম ভাবে
বিচার করতে হচ্ছে কারণ যদি একবারও মোহিনী আমার সামনে এসে  দাঁড়ায় আমার পক্ষে ওকে হারানোর জন্য যত কৌশলই প্রয়োগের চেষ্টা করি না কেনো সব ধুয়ে মুছে ভেসে যাবে
     কিন্তু পার্টির জন্যে ,আমার ভবিষ্যত উত্তরণের জন্যে ওকে হারাতেই হবে আর তার জন্যে যা যা করার আমাকে করতেই হবে আবার ও একবার মুখোমুখি আমি ও সে শুধু

পরিবেশ পরিস্থিতির বদল  আমার হৃদয়ের  ভালবাসা আজ প্রতিদন্দ্বী হয়ে উপস্তিত আমার সম্মুখে

mghoshsrp94@gmail.com
কলকাতা 

Wednesday, January 1, 2020

পরিণতি


        
                                             ...মৌসুমী ঘোষ


          মুম্বাই শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপিকা ইন্দিরাদেবী । সাইকলজিতে মাষ্টার ডিগ্রী, কলেজে যথেষ্ট সুনাম ছিল একজন শিক্ষিকা হিসাবে । গত ছয় মাস আগে তিনি অবসর নিয়েছেন । বর্তমানে দুই ছেলেকে নিয়ে সুখেই আছেন । তবে বড় ছেলে শুভ্রর কথা মনে করে মাঝে মধ্যেই একটু অন্যমনস্ক হয়ে যান । অকালেই সবাইকে ছেড়ে চলে গেল ছেলেটা । তবু অন্য দুই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার কাজ শুরু করেন ।
            খুব শক্ত মনের মানুষ ইন্দিরাদেবী । মাত্র ২৪ বছর বয়সে, পছন্দের মানুষের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা । বাড়ির সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করে (বর্তমানে) মুম্বাইতে পাড়ি দেওয়া । তারপর কয়েকটা বছর স্বামীর সাথে খুব আনন্দেই কেটেছিল । বিয়ের তিন বছরের মধ্যেই কলেজের চাকরী, যমজ দুই সন্তানের জন্ম, বড় সখ করে ওর বাবা নাম রেখেছিল শুভ্র আর অভ্র । তারও দুই বছর পর ছোটো ছেলে অঙ্কিতের জন্ম হয় । এই কয়েকটা বছ্র যে কেমন স্বপ্নের মতো কেটে গিয়েছিল বুঝতেই পারেননি তিনি ।
        কিন্তু ভাগ্য বড়ই নিষ্ঠুর, স্বামীর সাথে সুখের সংসারে মাত্র আট বছর পূরণ হতে না হতেই একদিন বাড়ী ফেরার সময় রাস্তায় গাড়ী দুর্ঘটনায় মারা গেলেন তিনি । নিজে পেশায় সাধারণ ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সত্ত্বেও ছেলেদেরকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষের মত মানুষ করে তোলার স্বপ্ন দেখতেন ।সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই তিনি চলে গেলেন । ইন্দিরাদেবীর বয়স তখন কত হবে, তেত্রিশ ছুঁই ছুঁই । অত অল্প বয়সেও তিন তিনটে শিশুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না । তিনটে শিশু তারই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত । জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে নিজের আত্মসন্মান বজায় রেখে ছেলেদের মানুষ করার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন অবিচল । অকালবৈধব্য,ছত্রছায়াহীন একটা মেয়ের একা পথচলা, মুম্বাইয়ের মতো শহরে খুব একটা নিরাপদ ছিল না । তবু নিজের লক্ষ্যে তিনি ছিলেন বদ্ধ পরিকর, বাবার অভাব কোনোদিন ছেলেদেরকে বুঝতে দেননি, সব সুখ দুঃখের বাহক তিনি একাই ।
        আস্তে আস্তে ছেলেরা বড় হয়ে উঠল, বড় দুজন কলেজে পড়ছে, ছোটোটাও মাধ্যমিক দেবে । তিনজনই পড়াশোনায় বেশ ভালো । তবে বড় ছেলের একটু সংসারের দিকে লক্ষ্য বেশী । আর তাই কলেজে ঢুকেই চাকরীর চেষ্টা করতে থাকে । এদিক ওদিক দরখাস্ত করতে করতে চাকরি একটা জুটেও যায় । গুজরাটের ভুজ শহরে একটা বোর্ডিং স্কুলে পড়ানোর চাকরি । এই সুযোগ শুভ্র হাতছাড়া করেনি । মাকে বলেছিল, ওখানে থেকেই চাকরীর সাথে সাথে পড়াশুনাও করতে পারবে । মায়ের সকল আপত্তি অগ্রাহ্য করেই চলে গিয়েছিল গুজরাটে । কিন্তু সেখান থেকে বাড়ীতে আর ফেরা হয়নি শুভ্রর । ১৯৯৮ সালের ভুমিক্মপে ভুজ শহরের সাথে ধ্বংসস্তূপের তলায় তলিয়ে গিয়েছিল ২২ বছরের সরল, সদা হাস্যময় শুভ্র, চিরকালের মতো মা ও দুই ভাইকে ছেড়ে বিদায় নিয়েছিল সে ।
 দুঃস্বপ্নের মধ্যে কয়েকটা দিন কেটেছিল ইন্দিরাদেবীর । তবু নিজের মনকে বুঝিয়েছিলেন, তিনি শুধু একা নন, হাজার হাজার মায়ের কোল খালি হয়ে গিয়েছে । স্বামীর মৃত্যুশোক ভুলে সবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলেন আবার একটা ঝড় সব শেষ করে দিয়ে গেল । এই জীবনের উপর দিয়ে এত ঝড়, তুফান সহ্য করেও নিজের মনকে শক্ত করে তৈরী করেছিলেন অন্য দুই ছেলের জন্য । ওদেরকে স্বপ্ন দেখাতেন জীবনে বড় হওয়ার আর তাই আজ ওরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত । মেজ ছেলে অভ্র বিদেশে যাবে রিসার্চ করতে । ছোট ছেলে অঙ্কিত বড় হার্ট স্পেশালিষ্ট, শহরের সবথেকে বড় হাসপাতালে চাকরী করে ।এখন আর কোনো কষ্ট নেই ইন্দিরাদেবীর । এবার ছেলেদের বিয়ে দেবেন ভাবছেন ।
            কিন্তু ভাগ্য যার প্রতি বিরূপ তার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় । রোজকার মতো সেদিনও ইন্দিরাদেবী সন্ধ্যাবেলা টিভিতে খবর দেখছিলেন । হঠাৎ একটা খবর শুনে তিনি বাক‌্হীন হয়ে যান । খবরটা ছিল মুম্বাইয়ে মাটুঙ্গা রেলস্টেশনে ৬টা ২৩-এর লোকাল ট্রেনে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে । ইন্দিরাদেবীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে । অভ্র আর অঙ্কিত তো ঐ ট্রেনেই বাড়ী ফেরে । ইন্দিরাদেবীর হাত পা কাঁপতে থাকে, মাথার ভিতর সবকিছু বিবর্ণ হয়ে যায় । এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ শুনে তিনি কোনোরকমে দরজা খুলে অভ্রকে দেখে আশ্বস্ত হন । কিন্তু অঙ্কিত কোথায় ? সে তো ফেরেনি । অজানা আশঙ্কায় শুরু হয় মা ছেলের অপেক্ষার পালা । কয়েককঘন্টা কেটে গেলেও অঙ্কিত ফেরে না। খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় অঙ্কিত ঐ ট্রেনেই বাড়ী ফিরছিল ।  
            অভ্র মাকে ভরসা দিয়ে প্রতিবেশীদের কাছে রেখে অঙ্কিতের খোঁজে ছুটে যায় । থানা, পুলিশ, হাসপাতাল অনেক খোঁজাখুঁজির পর নিহতদের তালিকায় অঙ্কিতের নাম খুঁজে পায় । কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে অভ্র । কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বাড়ী ফেরে অভ্র । অভ্র ভাবে মাকে খবরটা এখনি দেবে না কিন্তু অভ্রর মুখ দেখে ইন্দিরাদেবীর বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না যে, কী ঘটনা ঘটেছে । অভ্র কিছু বলার আগেই ইন্দিরাদেবী মেঝেতে পড়ে যান । প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় মাথায় । সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে । সকালবেলা ডাক্তারবাবু এসে অভ্রকে বলেন ইন্দিরাদেবী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন । পুরানো সবকথা তিনি ভুলে গেছেন । শুধু মনে আছে ৬টা ২৩-এর ট্রেনে তার ছেলেরা বাড়ী আসবে ।
          অভ্র একেবারে একা হয়ে যায় । সবথেকে কাছের মানুষরা এভাবে হারিয়ে যাবে কোনোদিন ভাবতেও পারেনি সে । শুভ্রর কথাও খুব মনে পড়ছিল । এসব দুঃশ্চিন্তার মধ্যেই রাতটা কেটে যায়। মায়ের যা হবার তাতো হয়েছেই । এখন অঙ্কিতের দেহ খোঁজ করতে যেতে হবে । কোথায় পাবে কে জানে । এই সব ভাবতে ভাবতে হাসপাতাল থেকে নিচে নামছে ঠিক সেই সময় অভ্রর সেলফোনটা বেজে ওঠে । খবরটা শুনে অভ্র আনন্দে কেঁদে ফেলে । থানা থেকে বড়বাবু ফোন করে বলে আপনার ভাই বেঁচে আছে । উনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন । নিহতদের তালিকায় যে নামটা ‘অঙ্কিতা’ হওয়ার কথা ছিল সেটা ‘অঙ্কিত’ হয়ে গেছে । আর তাতেই যত সব বিড়ম্বনা । বড়বাবু বলেন যে উনি এখন ভাল আছেন । ওনার বন্ধুরাই দেখভাল করছেন । অভ্র উদ্ভ্রান্তের  মতো ছুটে যায় অঙ্কিতের সাথে দেখা করতে । সারা শরীরে পোড়ার চিহ্ন । মুখটা কালো হয়ে গেছে চেনার উপায় নেই । সবথেকে বেশী ক্ষতি হয়েছে ওর হাতটার । যাইহোক ও যে প্রাণে বেঁচে আছে তাই-ই অনেক ।
      কিন্তু এত বড় সুসংবাদটা কাকে শোনাবে অভ্ । এই খবরে যে সবথেকে আনন্দিত হতো, সে এইসব অনুভূতির ঊর্দ্ধে চলে গেছে । একদিকে মা অন্যদিকে ভাই, কাকে ছেড়ে কার কথা ভাববে অভ্র ।
            একটা একটা করে পনেরটা দিন পার হয়ে গেছে । অঙ্কিত কিছুটা সুস্থ হলেও ইন্দিরাদেবীর বিশেষ কোনো পরিবর্তন নেই। মানসিক অ্যাসাইলাম এখন তার ঠিকানা । সারাদিন আসাইলামের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন কখন তার ছেলেরা ফিরে আসবে সেই আশায় । যে মাকে সারা জীবন জীবনের সাথে লড়াই করতে দেখেছে, আজ সেই মায়ের অবস্থা দেখে কান্নায় বুক ফেটে যায় অভ্রর । যে ভাই সারাজীবন মানুষের প্রাণ বাঁচানোর শপথ নিয়েছিল ভগবান তার হাতের তিনটে আঙ্গুল কেড়ে নিয়েছেন । নিজের বিদেশ যাবার স্বপ্ন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে । অভ্র ভেবেই পায় না, তাদের পরিবারের এই পরিণতির জন্য কে দায়ী ? তাদের ভাগ্য, প্রকৃতি, না আমাদের এই সমাজ ?
            প্রায় একমাস পর অঙ্কিতের হাসপাতাল থেকে ছুটি হয়ে যায়। কিন্তু ওর হাতটা পুরোপুরি সারে নি । ডাক্তাররা জানায় অঙ্কিতের হাতের চিকিৎসার জন্য তাদের আর কিছু করার নেই । তবে বিদেশে গেলে হয়তো কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে । অভ্র ঠিক করে অঙ্কিতকে বিদেশে পাঠাবে । কিন্তু মনের মধ্যে একটা ভয়, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা অভ্রকে ঘিরে ধরে। অভ্র ভাবে – যদি অঙ্কিতের প্লেনটা ভেঙ্গে পড়ে ভারতমহাসাগরে, যদি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মতো সন্ত্রাসের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায় চিকিৎসাধীন হাসপাতালটি, কিংবা কোনো সুনামি যদি ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় । তাহলে সে তো একদম একা হয়ে যাবে, এক্কেবারে একা ।
            এইসব ভাবতে ভাবতে দুই ভাই পৌঁছে যায় মায়ের আসাইলামে । অঙ্কিত কক্ষনো এতদিন মাকে ছেড়ে থাকেনি ওর মনের ভিতর খুব আনন্দ, কিন্তু অভ্র জানে মাকে দেখলে ওর সব আনন্দ নিমেষের মধ্যে উধাও হয়ে যাবে । দুই ভাই মায়ের কাছে যায়, অঙ্কিত মাকে প্রণাম করে, ইন্দিরাদেবী আশীর্বাদ করে বলেন “ দীর্ঘজীবী হও ” কিন্তু চিনতে পারে না । শুধু অঙ্কিতের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে আর দুচোখ দিয়ে নেমে আসে অফুরন্ত জলস্রোত।


mghoshsrp94@gmail.com
কলকাতা