1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label রাজশ্রী দে. Show all posts
Showing posts with label রাজশ্রী দে. Show all posts

Wednesday, October 2, 2024

এই তো জীবন

ছবি  : ইন্টারনেট

এই তো জীবন

রাজশ্রী দে

মালিনী সক্কাল সক্কাল পূজো দিয়ে ফিরল কালীঘাট  থেকে  |  ড্রয়িং রুমে শাশুড়ি প্রভাবতী দেবী তখন আনন্দবাজারের পাতা ওলটাচ্ছেন |তিনি বললেন ....আর কতকাল এইদিনে  মন্দিরে দৌড়োবে, সে তো রাতভর জন্মদিনের পার্টি করে বাড়ি  এসে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে |আবার বেলায় বাবু ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে যাবেন বার্থডে সেলিব্রেট  করতে |নামকরা গায়ক  নিলয়  মজুমদার মানে সেলেব্রেটির ওয়াইফ তুমি | পাত্তা তো দেয়  না তোমাকে  , সম্মানও  করে না | নিজের একটা পরিচয় বানাও মালিনী , নিজের কথা ভাবার দিন চলে এসেছে |এই যে  রান্নার লোককে কিছু করতে না দিয়ে আজকের দিনে নিজে হাতে এলাহী রান্না করে গোটা পরিবারের জন্য   ,  নিলয় তো কিছুই মুখে দেবে না |কার জন্য করো এসব বোলো  দেখি| মা সবাইকে আজকের দিনে ভালো রান্না করে খাওয়াতে পারলেই  তো আমার তৃপ্তি ,বললো মালিনী |

নিলয়  মজুমদার খ্যাতনামা গায়ক , দেশে বিদেশে স্টেজ শো করে  বেড়ায়  , বয়েস   মাত্র  চল্লিশ , যথেষ্ট হ্যান্ডসম |  অসংখ্য  মহিলা ভক্ত  তার |  পুনম  তার  গার্ল ফ্রেন্ড  ,  নিলয় আর মালিনী  নিঃসন্তান , প্রায় দশ বছর তাদের বিয়ে হয়েছে | মালিনী পুনমের কথা জেনেও পরে আছে নিলয়ের এই যৌথ পরিবারে |কারণ পরিবারের সকলে তাকে খুব ভালোবাসে আর মালিনীর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, বাবার বাড়ি  বড্ড গরীব। শুধু রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রভাবতী দেবী   তাঁর আদরের ছোট ছেলের  জন্য নির্বাচিত করে ছিলেন । আর একটা ব্যাপার  প্রভাবতী দেবীর মন ছুঁয়েছিল , স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছিল মালিনী  প্রচন্ড দারিদ্রতার মধ্যে।

প্রভাবতী  দেবী বললেন .... মালিনী এবার তুমি নিজে কিছু একটা করো | মালিনী বলল ...... মা আমি তো কিছুই জানিনা  , শুধু রান্না জানি l  প্রভাবতী  দেবী বললেন .... রান্না দিয়েই শুরু করো, টাকা আমি দেবো , পরে   টাকা  এলে তুমি আমাকে দিয়ে দিও| ইতিমধ্যে দুটো  লোক রেখেছে  মালিনী, রুমা    রান্না করতে   সাহায্য   করে আর বিভাস বাড়ি বাড়ি খাবার দিয়ে আসে| শ্বশুর বাড়ীর  একতলায়  পেছনের দিকে একটা বড় ঘরে ব্যবস্থা করা হয়েছে  রান্নার। সব রান্না মালিনী নিজে হাতে করছে । আগুনের তাপে সারাদিন রান্না করতে কষ্ট হলেও একটা আলাদা তৃপ্তি  পাচ্ছে মালিনী। প্রথমদিকে  পাড়ার  বন্ধুরা নিত খাবার , তারপর পাড়ার লোকেরা অর্ডার দিতে শুরু করল।তার রান্নার  প্রশংসা চারিদিকে ছড়িয়ে পরল। উত্তর কলকাতার এপাড়া থেকে অন্য পাড়ায় লোক অসুবিধায় পরলেই মালিনীদির রান্নাঘরে ফোন। ছোটখাটো অনুষ্ঠান বাড়িতে অর্ডার যখন আসতে শুরু করলো তখন মালিনী আরোও দুজন লোক রাখলো, মিন্টু ও পলাশকে।

 অন্যদিকে নিলয় মজুমদার বিশাল ফ্ল্যাট কিনেছে নিউটাউনে ।এই  পুরোনো উত্তর কলকাতার গলির  মধ্যে  বাপ ঠাকুরদার আমলের বাড়িতে তার লোকজন আসা খুব লজ্জার  ব্যাপার তার কাছে। মা আর মালিনীকে অবশ্য যেতে বলেছিল নিলয়  তার নতুন  ঝাঁ চক চকে ফ্ল্যাটে।   মা প্রভাবতী দেবী এককথায় নাকচ করে দিয়েছেন আর মালিনী জানিয়ে দিয়েছে.....  আমার বিজনেস ছেড়ে আমি যেতে পারব না । নিলয় আর  পুনম একসঙ্গে থাকে   নতুন  ফ্ল্যাটে l   নানা ম্যাগাজিনের মাধ্যমে কথা  আসে মালিনীর কাছে। শুধু শাশুড়ির জন্য ডিভোর্স ফাইল করছে না মালিনী । এই বাড়িতে এখনও পর্যন্ত ডিভোর্স হয় নি  কারোর ,কথাটা বলেন প্রায়ই ।  বড়ো ভাসুর , মেজো  ভাসুর, জায়েরা সবাই  বোঝায় মাকে  । হয়তো একদিন তিনি বুঝবেন , আসলে তিনি চান নিলয় ডিভোর্স  ফাইল করুক   মানে তার দিক থেকে আসুক প্রস্তাবটা।

 জীবন চলছে সময়ের  তালে তালে , মালিনীর ভাসুরদের ছেলে মেয়েরা সকলেই একে একে দেশের বাইরে   সেটেল হয়ে গেছে । তাদের বিয়েও হয়ে গেছে। তারপর   জা ভাসুররা চলে গেছে দক্ষিণ কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে। এখন এই বিশাল বাড়িতে মালিনী ,   শাশুড়ি আর চারটে কাজের লোক । ইতিমধ্যে মালিনী বড় রাস্তার ওপরে  রেস্টুরেন্ট  খুলেছে , নাম দিয়েছে মালিনীর রান্নাঘর। এখানে সব বাঙালি রান্না পাওয়া যায় । রান্নাঘরে

 বেশ কিছু লোক কাজ করে । তাছাড়া মালিনীর  পরিকল্পনা আছে একটা ক্যাফের ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়ার।  শাশুড়ি মা বিশেষ চলাফেরা করতে পারেন না এখন।  ও হ্যাঁ মালিনীর একটা  বাপের বাড়ি আছে  শ্রীরামপুরে, সেখানে এখন দাদা বৌদি  থাকেন , তাদের অবস্থাও ভালো নয়।  নিসন্তান দাদা বৌদির দায়িত্ব পালন করে মালিনী।

ওদিকে নিলয় দেশ বিদেশে গান করে বেড়ায় , বিশাল নামজাদা  শিল্পী । পুনমের পরে একে একে অনেক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জড়িয়ে ছিল নিলয়। বর্তমানে কোনো এক নবাগতা মডেল জুনের সঙ্গে  রিলেশনে আছে। পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও নিলয় এতটাই হ্যান্ডসাম যে আজও ইয়াং  জেনারেশনের  হার্ট থ্রব।  মালিনীর সঙ্গে  আজও আইনত স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা  রয়ে গেছে।তবে কোনো কন্টাক্ট  নেই।

বিশাল ফ্ল্যাটে ঠান্ডা বেড রুম, পাতলা ফিনফিনে পর্দা, ডিভানের চাদর , বালিশের কভার , দেওয়ালের  কালার, সিলিং সবেতেই আকাশী  নীলের ছোঁয়া। যেন এক স্বপ্নপুরী , নরম গদীর ভেতরে ঢুকে গান শুনতে শুনতে নিলয় ঘুমিয়ে পড়ল। আজ জুন গেছে মুম্বাই মডেলিংয়ের কাজে। বাড়িতে দুজন কাজের লোক ছাড়া আর কেউ নেই। ভোর রাতে স্বপ্ন দেখল  নিলয়........   মা ঠাকুর দালানে বসে ফুলের মালা   গাঁথছেন  আর ছোট্ট নিলয় বসে আছে মায়ের  কোল  ঘেঁসে , বাবা দালানের চেয়ারে বসে আছেন , বলছেন .....  তোমার আদরের ছেলে  কি মা   ন্যাওটা হয়েছে । মা খুব হাসছেন। ধীরে ধীরে  সব কিছু কেমন  মিলিয়ে গেল।  কত বছর পরে মা বাবাকে একসঙ্গে দেখল নিলয়।  চোখ খুলল, চারিদিকে নীল মায়াবী আলো, খুব যেতে ইচ্ছে করল মায়ের কাছে। কতদিন যাওয়া হয়নি , মায়ের কোলে মাথা  রাখা হয়নি। কতবার চেয়েছে মাকে কিছু দিতে, মা নেন নি। একমাত্র মালিনিকে আশ্রয় করে বেঁচে আছেন মা। কোনো ছেলের কাছ থেকে কিছু নেন না তিনি। মালিনীর জীবনটা শেষ করে দিয়েছে সে,  নতুন করে জীবন তৈরি করার পথটাও খুলে দেয়নি  বাড়ির  আভিজাত্যের  কথা ভেবে। আজ অনুতাপ হয় নিলয়ের। একদিন সময় করে  বাড়িতে যেতে হবে মায়ের কাছে।

বিয়ের পরে নিলয় এরকম ছিল না। হাসিখুশি প্রানবন্ত, মালিনীকে নিয়ে বেড়িয়ে পরত লং ড্রাইভে,  কখনও    ডায়মন্ড হারবার , মন্দরমনি,  শঙ্করপুর, বককালি। আর  বাড়ির সকলে মিলে যাওয়া হত বছরে দুবার করে দেশভ্রমনে। কিন্তু সাফল্যের  সিঁড়ি চড়তে চড়তে সম্পূর্ণ  পাল্টে গেল  নিলয়। আর তখন মালীনিকে ভালো লাগত না । অসহ্য একঘেঁয়ে আটপৌড়ে  লাগত মালিনীকে।

মালিনী ভাবছে ....  মা পাশে না থাকলে কি দুর্দশাই না হত  আমার। আজ কোথায় ভেসে  যেতাম।  এত বড় সাফল্য  আমার  জীবনে এসেছে মায়ের হাত ধরেই। মায়ের সব  টাকা মিটিয়ে দিয়েছি অনেক বছর আগেই। কিন্তু  আমি  সেই দুর্দিনের  ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। আজ মা  শয্যাশায়ী তবু তো আছেন।  রুমার ডাকে বাস্তবে ফিরে এল মালিনী। দেখল শনিবারের উইক  এন্ড বলে রেস্টুরেন্টের সব টেবিল ভর্তি।

 কিছুদিন থেকে নিলয়ের গলায়  অসহ্য যন্ত্রণা।   বড় নামকরা  ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল বন্ধু বিশালের সঙ্গে। অনেক টেস্ট হল , অবশেষে জানা গেল গলায় ক্যান্সার হয়েছে নিলয়ের। দেশ বিদেশের সব  প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করল নিলয়ের সেক্রেটারি জুলিয়া।  জুন সুযোগ বুঝে পাড়ি দিয়েছে নিউইয়র্কে।  নিলয় মুম্বাইয়ে ট্রিটমেন্ট করছে, সঙ্গে যাচ্ছে বন্ধু বিশাল। সেক্রেটারি, দুজন কাজের লোক সব ছাড়িয়ে দিয়েছে নিলয়। এখন  ফ্ল্যাটে শুধু থাকে  পুরোনো  কেয়ারটেকার  রঘু। ডাক্তাররা আশ্বাস  দিয়েছেন ভালো হয়ে যাওয়ার।

মালিনী বন্ধু  রমির কাছ থেকে  খবর পেয়েছে নিলয়ের  ক্যান্সার হয়েছে।  বুকের ভেতরের জমাট পাথর ভেঙে কান্না হয়ে  ঝরে পরে নি। গলায় কাছে  জমে আছে বহু বহু বছরের কান্নারা।একদিন সব বন্ধুরা  এসেছিল মালিনীর সঙ্গে দেখা করতে ।  ওরা বলেছে......মন  শক্ত কর, একদম ভেঙে পরবি না। মালিনি কোনো উত্তর দিতে পারে নি সেদিন বন্ধুদের।

 সক্কাল সক্কাল বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ । এত সকালে কে এল ভাবতে ভাবতে  মালিনী  উঠোন পেরিয়ে দরজার হুড়কো খুলে দেখে সামনে নিলয় দাঁড়িয়ে। ভূত দেখার মত চমকে ওঠে সে। কি চেহারা হয়েছে নিলয়ের ,  খুব রোগা হয়ে গেছে, চোখের  তলায় কালি,  কেমোথেরাপির জন্য সব চুল উঠে গেছে। সরে দাঁড়ায় মালিনী, ড্রাইভারকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকল নিলয় প্রায় একযুগ পরে। প্রথমেই মায়ের ঘরে গেল। মা  বসে

আছেন বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে, আয়া মুখে যত্ন করে  ক্রিম লাগিয়ে দিচ্ছে। নিলয় এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল, মা .... মা করে ডাকল। প্রভাবতী দেবী বললেন......... মালিনী কে  ছেলেটা আমায় মা বলে ডাকছে, চিনতে পারছি না তো। আমার তো কোনো ছেলে নেই। তুইই আমার একমাত্র মেয়ে। অবাক মালিনী , অনেক চেষ্টা করল সে,  বার বার বোঝালো  কিন্তু মা তার আদরের ছোট ছেলেকে চিনতেই পারলেন না। নিলয় উদভ্রান্ত,   চোখে জল নিয়ে বলল.......  মালিনী আমায় ক্ষমা করে দাও , আমি আবার ফিরে আসতে  চাই।

মালিনী বলল........   আমি যদি এত বছর বাইরে ফুর্তি  করে তোমার কাছে ফিরে আসতাম , তুমি কি করতে?? নিলয় বলল ........ মেনে নিতে পারতাম না । মালিনী  ধীরে ধীরে বলল....... আমার পক্ষেও তোমাকে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তুমি এবার এসো...........

গল্পের শেষে এটা বলা দরকার, প্রভাবতী দেবী অনেক বছর আগেই তাঁর  বাড়ি , সম্পত্তি  সবকিছু মালিনীর নামে উইল করে দিয়েছেন।

 ...(সমাপ্ত)...




Saturday, October 21, 2023

তু লাল পাহাড়ীর দেশে যা

ছবি : ইন্টারনেট 

 তু লাল পাহাড়ীর দেশে যা

রাজশ্রী দে 

দত্ত বাড়িতে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে , দুদিন পরে তাদের বড় মেয়ের মিষ্টির বিয়ে  |দত্তদের  অবস্থা বর্তমানে সাধারণ| তবে এককালে ছিল বিশাল  , তবে  খারাপ হয়ে গেলেও বনেদিয়ানার  কিছু  লেশ এখনও  আছে | তা প্রকাশ  পায়  বিশেষত বাড়ির  কর্তাদের কথাবার্তায়  ,আচার আচরণে |মিষ্টি অবশ্য   বাড়ির সব প্রথা ভেঙে তার ক্লাসমেট  নীলকে  বিয়ে করছে বাড়ির অমতে |নীল একটা প্রাইভেট  কোম্পানিতে জব করে  , এখানেই বাড়ির সকলের অমত | তাঁরা চায় মেয়ের  অন্য কোথাও ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার , প্রফেসর  অথবা   কোনো মাল্টিন্যাশনাল  কোম্পানির  চাকুরীরত কারো   সঙ্গে  বিয়ে হোক | কিন্তু মিষ্টির জেদের কাছে হার মেনেছে সবাই| যাইহোক এবার বিয়ে বাড়ির অন্দর মহলে ঢুকে পরি ........

 মিষ্টি দত্ত বাড়ির বড় ছেলে সুধীর দত্তের একমাত্র মেয়ে , মেজো ও সেজো ভাইয়ের দুটি করে ছেলে l

এক  এক করে সব দূরের আত্মীয়রা চলে  এসেছে | মিষ্টির মামাবাড়ি জলপাইগুড়িতে, সেখান থেকে এসেছে দুই মামার পরিবার | তারপর   মাসি পিসিরাও এসে পরেছে প্রথম বাড়ির মেয়ের বিয়েতে |  মিষ্টি ওরফে রঞ্জাবতী  পড়াশোনায় দারুন ভালো , ও ফিজিক্স নিয়ে MSC  করেছে | এখন  ইচ্ছে  WBCS পরীক্ষা  দেওয়ার | নীল  কথা দিয়েছে বিয়ের পরে মিষ্টির যতদূর ইচ্ছে  পড়তে পারে ,  যা  ইচ্ছে  করতে পারে | এইজন্যই নীলকে  আরও বেশি করে ভালোবাসে মিষ্টি ...........

 আশীর্বাদ , গায়ে হলুদ  একে একে সব হয়ে গেল , অবশেষে বিয়ে | প্রচুর আত্মীয় , বন্ধু , অফিস কলিগরা এসেছে বরযাত্রী | নীল খুব মিশুকে তাই খুব মজা করেই বিয়ে হল| তাদের শুভ দৃষ্টি , মালাবদলের সময় এত মজা হল যে সকলে উপভোগ করল বিয়েটা | 

তারপরে  বাসর ঘরে নীল একাই জমিয়ে রাখল একটার পর একটা গান গেয়ে | মিষ্টি  শ্রোতা  সে অত কথা বলতে পারে না তবে শুনতে ভালোবাসে| বন্ধুরা ভাবে কেমন করে   মিষ্টির মত মেধাবী শান্ত মেয়ে নীলের মত অতি সাধারণ , প্রাণবন্ত ছেলেকে    ভালোবাসল ,  অবশ্য সবই ভালোবাসার ম্যাজিক ........

বিয়ের পরে  শ্বশুরবাড়ির ছোট্ট পরিসরে মানিয়ে নিয়েছে মিষ্টি | ছোট্ট  ফ্ল্যাটের দেড় তলায় পেয়েছে একটা  পড়ার ঘর  যা তার একান্ত আপন  |  শাশুড়ি  আর নীলকে নিয়ে সংসার , একমাত্র ননদ থাকে মুম্বাইয়ে | বিয়ের সময়  ননদের পরিবার সহ আত্মীয় স্বজন এসেছিল  কিন্তু চলে যাওয়ার পরে আজ বাড়ি ফাঁকা| নীল অফিস  গেল অনেক দিন পরে , বই নিয়ে  পড়তে  বসে গেছে মিষ্টি| কিছুক্ষন পরে  শাশুড়িমা রান্নাঘরে গেলে তাকেও যেতে হবে,  এর নামই সংসার , অদ্ভুত .........

 ফ্ল্যাটের লোন , বিয়ের খরচ সামলে নীল  আর মিষ্টির   হনিমুনে  যাওয়া হল না | অবশ্য সেজন্য মিষ্টির মন খারাপ  নেই | বিয়েতে যে সব টাকা গিফট হিসেবে পেয়েছিল তা দিয়ে কলেজ স্ট্রিট থেকে  প্রচুর বই কিনে নিয়ে এসেছে মিষ্টি  | এসব দেখে মিষ্টির শাশুড়ি বললেন ....... "এত টাকা খরচ করে  এসব বই কেনার কি খুব দরকার ছিল |  বুঝতেই তো পারছো নীলের  একার রোজগারে সংসার  চালানো , তুমি তো আর ছোট্ট অবুজ মেয়ে নও " |মিষ্টি নিরুত্তর , এন্ট্রান্স পরীক্ষার  বই কেনার জন্য  যে কথা শুনতে হবে মিষ্টি স্বপ্নেও ভাবে নি| কারণ   তাদের বাড়িতে আজও রয়েছে বিশাল লাইব্রেরি , বহু পুরোনো বইয়ের সংগ্রহ এখনও| প্রতিটি বইয়ের যত্ন নেন মিষ্টির বাবা আর নতুন কাকা | নতুন কাকা হলেন মিষ্টির বাবার খুড়তোতো ভাই , তিনি অসাধারণ  পান্ডিত্যের অধিকারী | কলকাতার এক নামকরা কলেজের  পলিটিকালসায়েন্সের   প্রফেসর |  যে পরিবারে বইয়ের মূল্য নেই সেখানে কেমন করে মিষ্টি এসে পরল , অবাক কান্ড | এখানে কেউ নতুন বইয়ের গন্ধ শোঁকে না .......

বিয়ের পর আর বিয়ের আগের মধ্যে প্রচুর পার্থক্য|   অফিস  থেকে ক্লান্ত নীল বাড়ি  আসে ,  তখন গভীর মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করে মিষ্টি তার দেড় তলার  ঘরে  | ডিনার টেবিলে দুজনের দেখা হয় তখন কিছুটা গল্প  |আর  প্রিন্সেপ ঘাট , নিউ মার্কেট , রবীন্দ্র সদনের প্রোগ্রাম , নন্দনে বাংলা সিনেমা দেখতে যাওয়ার  কথা  বলে না নীল |ছুটির দিনগুলো বাড়িতেই কেটে যায় | নীল  মায়ের সঙ্গে ছুটি কাটাতে ভালোবাসে  ,সন্ধ্যের দিকে বেরিয়ে যায় পাড়ার ক্লাবে ,  রাত করে আসে | আকাশ দেখতে   পায় না মিষ্টি  বহুদিন  | এ বাড়িতে কোনো বারান্দা নেই , একতলা ফ্ল্যাটবাড়ি  ,   দম  আটকানো পরিবেশ |  নীলের সব আনন্দ বাড়ির বাইরে, বাড়িতে মায়ের মতোই  গম্ভীর |এই নীল বড়ই   অচেনা , এক মুখোশধারী .........

 পরীক্ষার দিন বাবার সঙ্গে গেল মিষ্টি , নীলের অফিসে খুব কাজের চাপ  |তাছাড়া নীলের  মা চান না শুধু শুধু  ছেলে অফিস কামাই করুক | মিষ্টি  শ্বশুর বাড়িতে বলে গেছে পরীক্ষা দিয়ে  ওবাড়িতে চলে যাবে , থাকবে কিছুদিন  সেখানে |   কতদিন মায়ের কাছে যাওয়া হয় নি l বাড়িতে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল |ভাইরা একসঙ্গে ঘিরে ধরলো দিদিকে |মা কাকিমারা  হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল মিষ্টিকে গল্প করার  জন্য|   মায়ের কাছে রাতে শুয়েছে মিষ্টি , বাবা এতক্ষন ধরে গল্প করে  পাশের ঘরে গেলেন ঘুমোতে | মা মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে জানতে চাইলেন .......  তোমার শাশুড়িমা ভালো ব্যবহার করেন তো ?  মা জানেন মিষ্টি নিন্দে করার মেয়ে  নয় , তবু মায়ের মন|  মিষ্টি  বলে ..... ওরা খুব ভালো মা| মা মেয়ের মুখ দেখে  বুঝতে পারেন মিষ্টি ভালো  নেই , ওর  শরীর অনেক ভেঙে গেছে ,  রাত জেগে পড়ার দরুন চোখের তলায় কালি  পরেছে |  রোজ রাতে মিষ্টি চলে যায় ছাদে , প্রাণভরে   আকাশ দেখে | আজ জোৎস্নার রাত ,চাঁদের আলো যেন  চুঁইয়ে চুঁইয়ে  পরছে  আকাশ থেকে |মনে পরে নীলের কথা,  নীল অবশ্য অফিস  থেকে  বাড়ির ল্যান্ড  ফোনে  কথা বলে মিষ্টির সঙ্গে|  

নীল এসেছে মিষ্টিকে নিতে , দিনগুলো কিভাবে আনন্দের মধ্যে ফুরিয়ে গেল |নীল  এসেছে   কিন্তু কোনো ভালো লাগার অনুভূতি লাগছে না কেন মিষ্টির মনে , ভারাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে কেন মন|  সকলকে প্রণাম করে হলুদ ট্যাক্সিতে  উঠে পরল মিষ্টি নীল |মা চোখে জল  নিয়ে কপালে দু হাত ঠেকিয়ে বললেন ........ দূর্গা , দূর্গা ,  মন জেনে গেল   তাঁর মেয়ে  ভালো নেই ..........

অবশেষে  একেক ধাপ পেরিয়ে WBCS  পাস  করল মিষ্টি , বিশাল ভালো রেজাল্ট করে হল এক্সিকিউটিভ  অফিসার  | নীল অভিনন্দন জানালো তার  ছোটবেলার  সহপাঠীকে |  বাড়ির সকলে খুব খুশি কিন্তু নীলের মায়ের  এক কথা ....

...... আমার বাবু  ইচ্ছে করলেই ভালো রেজাল্ট করতে পারত ,  এই মেয়ের সঙ্গে  ঘুরতে গিয়ে পড়াশোনা করল না | মিষ্টির  আনন্দে কেউ যেন শুকনো বিবর্ণ পাতা ছড়িয়ে দিল |সে তো অনেক চেষ্টা করেছিল নীলের  জন্য কিন্তু  অধ্যাবসায় ছিল না  , উপরন্তু কলেজে রাজনীতিতে ভয়ঙ্কর ভাবে জড়িয়ে ছিল নীল| মিষ্টির  কথা ভেবেও কোনোদিন সেভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে  চায় নি | তবুও মিষ্টি  নীলের পাশেই ছিল,  এই হয়ত প্রকৃত ভালোবাসা , আজ তার সাফল্যে  কিছুটা হলেও বিবর্নতার ছোঁয়া লাগল..........

 প্রথম পোস্টিং পুরুলিয়াতে ,  নীল অফিসের ব্যস্ততার জন্য মিষ্টির সঙ্গে যেতে পারবে না | মিষ্টি বলল..... "বিয়ের পরে তো আমরা কোথাও বেড়াতে যাই নি, চলো মা ও যাবে আমাদের সঙ্গে "|কিন্তু নীল  জানালো ..... "আমার অফিসের প্রচন্ড কাজের  প্রেসার , তুমি  তো করবে সরকারি  চাকরি , প্রাইভেট  কোম্পানিতে জব করা কত কঠিন তুমি  বুঝবে না"| আশ্চর্য মিষ্টি ,  এই নীল বড় অচেনা তার কাছে |অবশেষে মা বাবার সঙ্গে মিষ্টি   কলকাতা ছেড়ে   রওনা দিল লাল মাটির দেশে |নীল  আর মিষ্টি একই আকাশের তলায় মনে মনে অনেকটা দূরে চলে গেল........

মিষ্টি ব্যস্ত  অফিস নিয়ে ,  একটা বিশাল রাজনৈতিক প্রেসার তো আছেই l তাছাড়া চলছে মাওবাদীদের চোখ রাঙানি  l  মা বাবা চলে গেছেন  এখন একা  মিষ্টি তবে কোয়াটারে কাজের লোক আছে দুজন lএই কয়েকদিনের মধ্যেই সে আদিবাসী মেয়েদের উন্নয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে lওখানকার মানুষজনও  সমীহ করে চলছে  এই শান্ত  বিচক্ষণ অফিসারটিকে l মহিলারা আসছে ছুটির দিনে ,   শাড়ীর কোঁচড়ে  পলাশ ফুল নিয়ে , কেউ  আনে গুড় বারন  করা স্বত্তেও |এসবের মধ্যেই তারা  দিয়ে  যায় তাদের ভালোবাসা | নীল এসেছিল একবার দুদিনের জন্য , দুজনে হাতে হাত রেখে ঘুরেছিল পুরুলিয়া | গিয়েছিল অযোধ্যা পাহাড় ,  বড়ন্তি , গড়পঞ্চকোট , শাল পিয়ালের বন | জামাই  এসেছে বলে গ্রামবাসী সাঁওতালি ও ছৌ নাচ করল , মিষ্টির  খোঁপায় গুঁজে দিল পলাশ  | নীল আরও গম্ভীর হয়ে গেছে ,  নীলের হাসিমুখ দেখার আকুলতা  আজও  মিষ্টির মনে  |যাওয়ার আগে কথায়  কথায়  মিষ্টিকে  আঘাত দিয়ে গেল নীল,  বলল....... তুমি খুব চালাক, নিজের  ক্যারিয়ার ঠিক  গুছিয়ে নিলে , আমিই শালা বোকা থেকে গেলাম | মিষ্টি  হিংসে দেখল নীলের মধ্যে যা কোনোদিন আশা করেনি l বসন্তে যেন এক তপ্ত আগুন ছড়িয়ে দিয়ে চলে গেল নীল .........

 একবছর  কেটে গেল, আবার বসন্ত ,  প্রকৃতি  সেজে উঠেছে l এরকম এক দিনে  অফিসে বসেই  মিষ্টি   হাতে পেল একটা বড় রেজেস্ট্রি খাম,  ডিভোর্স পেপার  পাঠিয়েছে নীল  l   আকাশে অস্তমিত সূর্য ,মিষ্টি লাল পলাশ  বিছানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে  চলেছে ধীরে ধীরে ,  কাছের আদিবাসী গ্রাম থেকে ভেসে আসছে গান .......

  পিণ্ডাড়ে পলাশের বন/ পালাবে পালাবে মন

...(সমাপ্ত)...

Monday, July 24, 2023

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারে নি

ছবি : ইন্টারনেট

 অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারে নি 

 রাজশ্রী দে 

পশ্চিমঘাট পর্বত মালায়  সূর্য  সবে উঁকি দিচ্ছে , রু এক কাপ কফি হাতে   টেরাসের   দোলনায়  এসে বসল l  লাল  আবির ছড়ানো  আকাশ , এক ঝাঁক  সবুজ টিয়া উড়ে গেল l  আজ অফ  ডে , হসপিটালে  যেতে হবে না lগরম কফিতে চুমুক দিতে মন চলে যায় অতীতের ফেলে আসা দিনগুলোতে ! 

  ১৯৮৬ সাল  জয়েন্টে  দুর্দান্ত রেজাল্ট করে রু  পোশাকি নাম  রঞ্জাবতী  চান্স পেল  কলকাতা মেডিকেল কলেজে , ছোট থেকেই ডাক্তারি পড়ার  ইচ্ছে  তার l হবে নাই বা কেন বাবা  সমুদ্র ও  মা  মেঘমালা দুজনেই তো কলকাতার বুকে নামকরা  কার্ডিওলজিস্ট l  কলেজের প্রথমদিন আলাপ হয়েছিল অনেকের সঙ্গে , তবে তাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে  আর কথা বলা হয় নি l ওর নাম   অমল কান্তি দাসl গাড়িতে আসতে  আসতে হেসেছিল রু আপন মনে ,  ও নাকি এসেছে মালদা থেকে, তবে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র !   ব্যাপক পড়াশোনায় l

 কলেজে কয়েকদিনের মধ্যেই  তারা একটা গ্রুপ তৈরি  করল, সেখানে অমল কান্তি ও রয়ে  গেল l  আজও মনে আছে  ফ্রেশার ওয়েলকামে সিনিয়ররা ওর নাম শুনে বলেছিল নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর  "অমল কান্তি "  কবিতা  পাঠ করতে l অসাধারণ  আবৃতি করে  সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল অমল lঅসম্ভব পড়ার  প্রেসার  তারমধ্যে প্রাকটিক্যাল , সব মিলিয়ে  ঘেঁটে  ঘ হয়ে গিয়েছিলাম সকলেlবছরের পর বছর কেটেছে , কখন ক্যান্টিনের   আড্ডায় , আবার হসপিটালের করিডোরে দেখা হয়েছে অমল কান্তির সঙ্গে  l ধীরে ধীরে কখন  যে  তাকে ভালোবেসে ফেলেছি নিজেও জানি  না l বিশেষত  পূজোর  ছুটির  সময়  ও বাড়ি গেলে  বুঝতাম এক অদ্ভুত কষ্ট , এক বিশাল    শূন্যতা l

তারপর MBBS  পাস করে  হাউস সার্জেন হলাম , আমাদের  ডিউটি আওয়ার্স ছিল অনেকক্ষেত্রে  একই  সময় l ভালোবাসা হয়েছিল  মনে  মনে , অমল যে আমায় ভালোবাসে তার সুবাস পেয়েছিলাম  l ওরা কলকাতায়   ফ্ল্যাট কিনল ,  একসময়  ওর মা বাবার সঙ্গে আলাপও হল  l আমার  ড্যাডি , মামনির  সঙ্গে  অমলের  পরিচয়  অনেকদিনের , কারণ আমাদের বাড়িতেই হত বন্ধুদের আড্ডা !  উত্তর  কলকাতায়  লাল  রঙের ,সবুজ  খড়খড়ি দেওয়া জানলা  ,বিরাট গাড়ি বারান্দাওয়ালা  বাড়ি আমাদের  l অমল ওর বক্স  ক্যামেরায় সুন্দর  ফটো তুলত, ভালো  কবিতা লিখত আর অদ্ভুত সব ছবি আঁকত l  রুকে শিখিয়েছিল বাংলা গল্পের বই পড়তে ,  প্রথম উপহার দিয়েছিল সমরেশ মজুমদারের "উত্তরাধিকার "lচিনিয়ে ছিল  প্রকৃতিকে , সময় পেলেই প্রিন্সেপ ঘাটে  গঙ্গার  ধারে   গিয়ে বসত  দুজনে ,   জলের  ঝলাৎ ঝলাৎ  শব্দ রু ভালোবাসে  l তাছাড়া পড়াশোনায় প্রচুর  সাহায্য করত অমল l  নিজেদের গাড়ি নিয়েও বেরিয়ে পরত কলকাতা  শহর  ছাড়িয়ে কখনও  কোলাঘাট কখনও   ডায়মন্ড হারবারের  দিকে ,  সঙ্গী অবশ্যই মা বাবা বোন lমাকে অসম্ভব ভালোবাসে অমল,  মনে হয়  কখনই  মায়ের কথার অবাধ্য হত না l তবে লুকিয়ে প্যাকেটের পর প্যাকেট  সিগারেটে  খেতে অমল কান্তির জুড়ি মেলা ভার l

  দু বাড়িতে বিয়ের কথা  হয়ে গেল, MD  করার পর  সেটল হলেই বিয়ে , বন্ধুরা খুব আনন্দিত  l আমি পুনেতে চান্স  পেয়ে চলে এলাম ,  আর অমল কলকাতায়  থেকে গেল, ও পেল ওখানকার  এক হসপিটালে l যোগাযোগ রাখার একমাত্র মাধ্যম টেলিফোন ,  অতিরিক্ত  ব্যস্ততার  জন্য সেই সামান্য  কথা  বলার সময়টুকু আর দুজনের  কাছে রইলো না একটা সময় l

 অবশেষে দুজনেই কলকাতায়  সেটল   হলাম ,  সামনের ফাল্গুনেই বিয়ে , রু বিয়ের বাজার করতে ব্যস্ত  মামনির সঙ্গে  lএদিকে অমল  মা , বাবা , বোনের সঙ্গে   হসপিটাল সামলে বেরোচ্ছে, কখনও  নিউ মার্কেট , কখনও   কলেজ  স্ট্রিটের  মোহিনী মোহন কাঞ্জিলালে , কখনও    গড়িয়াহাটে lঅমলের  পছন্দ অনুযায়ী  ময়ূরকন্ঠী রঙের বেনারসি কেনা হল  বৌভাতে রু পরবে  বলে l  নিমন্ত্রিতদের  কার্ড দেওয়া   সমাপ্ত  , বিয়ের বাজার  কমপ্লিট ,  ক্যাটারিংকে আগাম  টাকা  দেওয়া হল l বাড়িতে বিশাল প্যান্ডেল শুরু  হয়েছে  ,বিয়ে  হবে   ছাদে , পাশের লনে  হবে ভোজন পর্ব  l বাড়িতে  আত্মীয়স্বজন  আসা শুরু হয়ে গেছে  যথারীতি  l  বন্ধুরা আসছে দূর দূরান্ত থেকে ,   কত দিনের স্বপ্ন   সার্থক হতে চলেছে l 

 ঠিক বিয়ের দিন  চারেক  আগে  ভোর বেলায় একটা ফোন এল অমলের বাড়ি থেকে , ওর মা  জানালো এখানে বিয়ে দিতে আমরা অপরাগ কারণ রুয়ের সঙ্গে অমলের      কুষ্ঠি মিলছে না ,  কিছুই  করার নেই আমাদের l বিয়ে ভাঙলো আমার , মা ভক্ত  অমল মেরুদন্ড সোজা করে বিয়ে করতে আসতে  পারেনি l  ড্যাডি  শয্যাশায়ী হয়েছিল সারাজীবনের মত  l অ্যাডভোকেট বড়মামা বাতাসে আস্ফালন করছিলেন ওদের নামে কেস করার  জন্য, আর  আমি  লাল   বেনারসীতে কাঁচি চালিয়ে যাচ্ছিলাম এলোপাথাড়ি l প্যান্ডেলের  রঙিন কাপড়  খোলা শুরু হয়ে গিয়েছিল, প্রেমের বিয়ের   একি  কান্ড বলতে বলতে আত্মীয়রা এক এক করে বিয়ে  বাড়ি থেকে প্রস্থান করেছিল l মামনি আমাকে  বুকের কাছে টেনে নিয়ে হাহাকার করেছিলেন ,  আমি কাঁদি  নি কারণ তখনও  অমলকান্তির  জন্য অপেক্ষা  করেছিলাম l

বিয়েটা  হয় নি  , চলে আসি পুনেতে , আদিত্য বিড়লা হসপিটালে  জয়েন করি l বহু বছর অতিক্রান্ত ,  একটা মেয়েকে   দত্তক নিয়েছি  আমি, নাম রেখেছি  দূর্গা l দূর্গা এখন  কুড়ি বছরের ,  ফ্যাশন নিয়ে   পড়ছে ,   দূর্গা  আমার শক্তি , আমার অবলম্বন l

 শুনেছি  মায়ের পছন্দ মত সুন্দরী , গৃহকর্মে  নিপুনা , লক্ষীমন্ত এক মেয়েকে বিয়ে করতে   বাধ্য হয়েছে অমলকান্তি  lতার আগে নাকি নিজের কষ্ট ভোলার জন্য ড্রাগের নেশাও  করেছে  l কিন্তু এখন সে  জমিয়ে  প্র্যাকটিস ও সংসার করছে l

  মেয়ে দূর্গা এসে দাঁড়িয়েছে মায়ের পাশে , কতক্ষন থেকে তোমাকে ডাকছি মা , কোথায় চলে যাও  মাঝে  মাঝে  l রু বাস্তবের মাটিতে ফিরল, মেয়ের জন্য নিপুণ  হাতে  পোহা  বানালো l  কেন যে  এরকম হয় আজকাল , সময় পেলেই  মন চলে যায় সুদূর  অতীতে l  

  পুনেতে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে , গণেশ পূজোর  পরে  হয়তো বন্ধ  হবে lডিনার   সেরে , টিভিতে নিউজ দেখতে বসলো রু  কলকাতার খবর ,  আর কলকাতা টানে না , বাবা মা গত হয়েছেন , বাড়িটা  কেয়ারটেকারের  কাছে পরে আছে lআশ্চর্য দুর্গাও যেতে চায়  না  ,হয়তো মায়ের যন্ত্রনা  কিছুটা  বুঝতে পারে  lবাইরে  ঝম ঝম করে বৃষ্টি পরছে , পাশের ফরেস্ট থেকে যেন ভেসে আসছে গাছেদের কান্না , মাঝে মধ্যে ময়ূরের কর্কশ ডাক l দূর্গা মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে আছে , মায়ের গায়ের গন্ধ নিয়ে ঘুমোতে   এক অদ্ভুত ভালো  লাগা মিশে থাকে l

  গভীর রাত , একটানা বৃষ্টির  শব্দ , রু যেন আজও  শুনতে  পায়............দূর থেকে ভেসে আসছে অমলের  কণ্ঠস্বর........

...(সমাপ্ত)...

Saturday, April 15, 2023

নিরুদ্দেশ

ছবি  : ইন্টারনেট 

নিরুদ্দেশ

রাজশ্রী দে

বোম্বে মেল ছুটে চলেছে হাওড়ার দিকে। রাতের অন্ধকারে ট্রেনের গমগম আওয়াজ , যাত্রীরা সব শুয়ে পরেছে। কেউ কেউ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কেউ অবিরাম নাক ডেকে চলেছে।নাক ডাকার আওয়াজে অনেকেই বিরক্ত, ঘুমের ব‍্যাঘাত ঘটছে।

সেন পরিবারের সকলে এই ট্রেনের যাত্রী। মি.সেন,মিসেস সেন., দুই ছেলে ,  দুই বৌমা।সকলে ঘুমিয়ে পরেছেন ট্রেনের দুলুনিতে। একজনের চোখে শুধু ঘুম নেই, তিনি হলেন মিসেস সেন।  তিনি বার বার বাথরুমে যাচ্ছেন, আর সিটে এসে বসছেন, লোয়ার বার্থ ,কষ্ট হচ্ছে বসতে। সামনের লোয়ারে শুয়ে আছেন মি.সেন, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তিনি। ট্রেনের গতি কমে আসছে, ট্রেন একটা স্টেশনে ঢুকলো। মিসেস সেন তাঁর  ভ‍্যানিটি ব‍্যাগটা নিয়ে ধীরে ধীরে কামরার দরজায় এসে দাঁড়ালেন, তারপর  নেমে গেলেন স্টেশনে।

ট্রেন ছেড়ে দিল,  আলো ঝলমলে স্টেশন ছাড়িয়ে  অন্ধকারের মধ্যে ছুটতে লাগল।ভোর হলে ছোট ছেলে ওপরের ব‍্যাঙ্ক থেকে নেমে দেখলো মা সিটে নেই। ভাবলো হয়তো বাথরুমে গেছেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ও মিসেস সেন এলেন না। ছেলে বাথরুমের কাছে গিয়ে দেখলো এখন ও সবাই ঘুমিয়ে আছে। তাই দুটো বাথরুমই  ফাঁকা।  তাহলে মা গেল কোথায়। কোনরকমে বার্থে এসে সবাইকে  জাগালো।মি সেন অবাক  তার সঙ্গে ভীত, মিসেস সেন ওরফে অনুপমা দেবী খুব শান্ত প্রকৃতির ,  কোথায় যাবেন তিনি কেউ বুঝতে পারছে না। ছেলে বৌমারা ট্রেনের মধ্যে  খুঁজতে শুরু করল। এখন সবাই প্রায় ঘুম থেকে উঠে পরেছে, সবাই যে যার মতো পরামর্শ দিচ্ছে। একটা স্টেশনে ট্রেন থামলো, পুলিশ কে জানানো হলো। কয়েক ঘন্টা ট্রেন থামিয়ে তোলপাড় করে খোঁজা হল, কিন্তু কোন হদিশ পাওয়া গেল না।স্টেশন মাস্টার খুব সাহায্য করলেন, রাতে যে সব স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়েছিল সেখানে ও খবর নেওয়া শুরু হল। 

আগের দিন বোম্বে মেলে ওঠার পর গল্প করতে করতে ফিরছিলেন সেন পরিবার। গল্পের বিষয় বস্তু ছিল মিসেস সেনকে নিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে ক‍্যান্সারে ভুগছেন মিসেস সেন। সেজন্য বার বার তারা সপরিবারে আসে মুম্বাইয়ে,  দুজন বয়স্ক মানুষকে একা ছাড়া যায় না। ছেলেরাই আসে প্রতিবার , মাঝে মাঝে বৌমারা ও আসে। এজন্য বিপুল পরিমাণে টাকা খরচ হচ্ছে মি .সেন জানালেন। এক বৌমা বলল প্রচণ্ড ধকল হয় মুম্বাই  আসতে । ছেলেরা জানালো অফিস থেকে ছুটি পেতেও তাদের কতো প্রবলেম হয়। আর ছোট বৌমা বলল মায়ের রাজকীয় অসুখ, কতদিন এরকম করে ভুগবেন তার ঠিক নেই। নীরবে শুনে গেলেন মিসেস সেন, তার তো কিছু বলার নেই। এই কঠিন অসুখ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে এজন্য তো একমাত্র তিনিই দায়ী।পরিবারের সবাই অভিযোগ জানাবে এটাই তো স্বাভাবিক।

ট্রেন অনেক ঘন্টা লেট করে অবশেষে হাওড়ায় পৌঁছলো। দুই বৌমাকে নিয়ে কলকাতা ফিরলেন মি .সেন।ছেলেরা মায়ের সন্ধানে বেড়িয়ে পরেছে , তারা আর হাওড়া অবধি আসে নি।

অনেক বছর কেটে গেছে মিসেস সেনের আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। খবরের  কাগজ , টিভি কোন কিছুই বাদ রাখে নি পরিবার, কিন্তু তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। তিনি হারিয়ে গেছেন। নিজের থেকে হারিয়ে গেলে তাকে আর পাওয়া যায় না। সংসারে যাদের জন্য তিনি বছরের পর বছর নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন আজ সেই সবকিছুর প্রতিদান  পেলেন। মিসেস সেন বুঝে গেলেন এ পৃথিবীতে কেউ কারোর নয়। তাই হারিয়ে গেলেন তিনি............

...(সমাপ্ত)...

Friday, January 13, 2023

লড়াই

ছবি  : ইন্টারনেট 


লড়াই 

রাজশ্রী দে 


এক্কেবারে ছোটবেলা থেকে বেঁচে থাকার লড়াই অম্বালিকার আর তার মা অয়ন্তিকার। মামার বাড়ির তিন তলার একটা ঘরে আশ্রয় পেয়েছে মা মেয়ে, বাবা চলে গেছেন সেই কোনকালে , বাড়ি ঘর করে যেতে পারেন নি, গ্ৰামের একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, তার সঙ্গে রাজনীতি , দেশের কাজ। বাবা চলে যাওয়ার পর  মামারা দয়া করে আশ্রয় দিয়েছেন এই বাড়িতে, তাই এই শহরে খানিকটা নিরাপদে আছে  তারা।

নর্থ বেঙ্গল থেকে ক্লাস সিক্সে এসে স্কুলে ভর্তি হয়েছে  সে , প্রথমে   তাদের থাকা নিয়ে প্রচণ্ড অশান্তি হতো মামাবাড়িতে, কেউই চাইতো না তারা এবাড়িতে থাকে।কিন্তু কোন উপায় ছিল না কোথাও যাওয়ার,  শেষ  পর্যন্ত আশ্রয় পেল ছাদের  ছোট্ট ঘরে, সেখানেই মা মেয়ের  থাকার  ব্যবস্থা হলো ।কি সুন্দরভাবে সাজিয়ে রেখেছে মা ঘরটা, ছাদে বসে পড়াশোনা করে  অম্বালিকা। রাত্রিবেলায় লন্ঠনের আলোয়  ছাদে মাদুর পেতে বসে  সে আর মা সকাল বেলায়  বেড়িয়ে যে খবরের কাগজ কিনে আনে , তাতে একের পর এক দরখাস্ত করে যায় চাকরির।  এদিকে তাদের টাকা পয়সাও কমে আসছে । মামাতো ভাই বোনেরা ছাদে এলে দেখা করে যায়,  সবাই অপেক্ষায় আছে সেই সুদিনের যখন তারা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে ।কিন্তু মায়ের চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত  তাদের সেই পথ বন্ধ।

অবশেষে ডালহৌসির এক অফিসে  অম্বালিকার মায়ের চাকরি হয়ে গেল।মা মেয়ে আনন্দে ভাসছে। আজ রাতে মাথার ওপর অজস্র তারা আর চাঁদ , মনে হয় পূর্ণিমা, ছাদময়  আলো, আর টবে লাগানো বেল যুঁইয়ের সুবাস যেন তাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।মা আজ রাতে রান্না করলো খিচুড়ি আর ডিম ভাজা।পরের দিন  অয়ন্তিকা দুই দাদাকে জানালেন তার চাকরি পাওয়ার কথা আর তার সঙ্গে সঙ্গে একমাস পর বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দাদারা সুর পাল্টালেন, বললেন এই  শহরে তোরা আর কোথায় যাবি, এই বাড়িতেই থাক, কলকাতা তো নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা  করে ছোট মেয়েকে নিয়ে থেকে গেল অয়ন্তিকা বাবার বাড়ির তিনতলায়  ছাদের ঘরটাতে।

সকাল সাড়ে আটটায় মা বেড়িয়ে যায় , তারপর অম্বালিকা সাড়ে দশটা নাগাদ বেড়িয়ে পরে স্কুলের পথে, কাছেই স্কুল, ফিরে আসে পাঁচটায়, মা আসতে আসতে সন্ধ্যে সাতটা সাড়ে সাতটা বেজে যায়। স্কুল থেকে ফেরার পর মুড়ি চানাচুর, কোনদিন পাউরুটি , বিস্কুট খেয়ে নেয়  সে ।মামাবাড়ির লোকেদের আন্তরিকতার বড় অভাব,তারা তাই বড্ড একা,তবে স্কুলে কিছু বন্ধু হয়েছে। 

 অয়ন্তিকা একমনে অফিস করে, খুব গম্ভীর থাকতে হয় বাইরে, অফিস ছুটি হতেই দৌড়াতে দৌড়াতে  ভীড় বাসে  ওঠে কোনরকমে, তারপর বাস স্টপেজে  নেমে কিছু কেনাকাটা করে  বাড়ি ফেরে । মেয়ের জন্য চিন্তায় অস্থির থাকে সারাদিন , বিশেষত সন্ধ‍্যে হয়ে গেলে। অন্ধকারে ছাদের ঘরটাতে একা লণ্ঠন জ্বালিয়ে পড়তে বসে  মেয়েটা, কোনোরকমে সিঁড়ি হাতড়ে হাতড়ে ওপরে  ওঠে  অয়ন্তিকা। সিঁড়িতে ও ছাদের ঘরে কোন ইলেকট্রিক  আলোর ব‍্যবস্থা নেই।আর কয়েক মাসের মধ্যে  অন্য বাড়ি  ভাড়া নেবে মনস্থ করেছে  সে।

 কয়েকমাস পরে পাড়ার মধ্যে  একটা সুন্দর ছিমছাম বাড়ি দেখে চলে  গেল মা মেয়ে , দাদা বৌদিরা আর আপত্তি করেননি। পাড়ারই এক কাকিমা  সেই ছোটবেলা থেকে চেনে , তারই বাড়িতে  ভাড়া গেল, তিনি একা মানুষ থাকেন দোতলায়, একজন দেখাশোনা করার লোক আছে তার কাছে। তাদের  পেয়ে খুব খুশি হলেন কাকিমা আর অম্বালিকা তো বারান্দায় গিয়ে বসে থাকছে  সর্বক্ষণ , তবে ছাদ , খোলা আকাশ মিস করছে খুব।

এভাবে দিন কাটতে লাগলো, অফিস আর মেয়ের পাশে থাকা , অম্বালিকার মাধ্যমিক , উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলো , রেজাল্ট হলো দূর্দান্ত। তারপর ইকনোমিক্সে অর্নাস নিয়ে ভর্তি হলো নামকরা কলেজে। খুব ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু তাকে খুব তাড়াতাড়ি স্বাবলম্বী হয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে , বাসস্থানের ব‍্যবস্থা করতে হবে। মায়ের সরকারি চাকরি নয়। মা যেমন  নিজের কথা চিন্তা না করে   তাকে মানুষ করেছে নিস্বার্থভাবে , তা  ভুলে গেলে চলবে না।

কলেজের বন্ধুরা মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতে যায় , কফি হাউসে আড্ডা দেয়। তারও ইচ্ছে করে যেতে কিন্তু মায়ের কাছে  টাকা চাইতে বড্ড সংকোচ হয়,  বাড়ি  ভাড়া আর খেতেই মায়ের বেতন শেষ হয়ে যায়। এরমধ্যে বন্ধু বাসবদত্তা দুটো টিউশন যোগাড় করে দিয়েছে , ওর কাকাতো ভাই বোনকে পড়ানোর জন্য। সন্ধ‍্যের দিকে সপ্তাহে তিন দিন পড়ানো সবে শুরু করেছে। অনেক বন্ধুই টিউশন্ করছে।মা আপত্তি  করে শুধু বলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে।

এখন মাঝে মধ্যে ছুটির দিনে বেড়াতে  যায় সে মায়ের সঙ্গে, একদিন বেলুড় মঠ, দক্ষিণেশ্বর , আদ‍্যাপীঠ  যাওয়া হয়েছিল, অবশ্য বাড়ির সবাই মিলে গাড়ি ভাড়া করে। এভাবে দিন এগিয়ে চলে, অর্নাস কমপ্লিট হয়,  একদিকে ব‍্যাঙ্কিং পরীক্ষার জন্য তৈরি  অন্যদিকে স্টুডেন্ট পড়ানো। এখন বাড়িতে এসেই পড়ে সবাই।

একটার পর একটা পরীক্ষা  আর আশায় দিন  গোনা , হঠাৎ করেই সুখবর এলো, অম্বলিকা আর  তার ক্লাসমেট সুশোভন একই ব‍্যাঙ্কে চাকরি  পেয়ে গেছে । মা এতো খুশি হলো বলার কথা নয়, বাড়ির সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানো হলো, প্রাণভরে আর্শীবাদ করলো বাড়ির বড়োরা। সুশোভন আর  সে ভাগ্যক্রমে একই ব্রাঞ্চে পেল।

সুশোভনের বাড়ি মেদিনীপুরে,ও ছুটির দিনে বাড়ি চলে যেত। সুশোভন যে  অম্বলিকাকে পছন্দ করে সবাই জানতো কিন্তু কোনদিনই সে এবিষয়ে আমল দিই নি।একসঙ্গে কাজ করার জন্য বন্ধুত্ব আগের থেকে অনেক বেশি দৃঢ় হয়েছে এখন। অফিস থেকে বেড়োনোর পর একসঙ্গে অনেকটা রাস্তা হেঁটে বাসে  ওঠে , তখন নানা ধরণের কথা হয়।এখন একমাত্র লক্ষ্য  মাথার ওপরে একটা ছাদ। মা আর সে অনেক কষ্ট করেছে এখন একটা বাসস্থানের খুব দরকার  তাদের।মা হয়তো আর কয়েক বছর চাকরি করতে পারবে।

সুশোভনদের অবস্থা সচ্ছল, মেদিনীপুরে , বাড়ি ,জমি জমা, তার ওপরে একটাই ছেলে, দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। তাই অভাব কাকে বলে সে জানে না।অবশ্য সে যে  অম্বালিকাকে ভালোবাসে তা এখনও পর্যন্ত বলে উঠতে পারে নি। অম্বালিকার  ব‍্যক্তিত্বের কাছে ঠিক গুছিয়ে  কথা বলতে পারে না সুশোভন। তিন বছর চাকরি করার পর দুকামরার ফ্ল্যাট কিনলো অম্বালিকা, মাও সাহায্য করলো, একদিন ছোট করে পূজো দিয়ে প্রবেশ করলো ঘরে। আর কেউ তাদের অবহেলা করতে পারবে না,মাথা উঁচু করে বাঁচবে তারা ।

কিছুদিন পর  এক রোববার সুশোভন  তাকে ইনভাইট করলো লাঞ্চে,  সেদিন ও আর বাড়ি  যায়নি, যারপরনাই অবাক হল সে যাইহোক মাকে বলেই  রওনা দিল নিউমার্কেটের উদ্দেশ্য, সুশোভন থাকবে মেট্রো সিনেমা হলের সামনে। বাস থেকে নেমে কিছুটা হেঁটে গিয়ে দেখে সুশোভন দাঁড়িয়ে আছে, বেশ সাজগোজ করে,  অম্বলিকাও এসেছে  তার প্রিয় মেরুন রঙের একটা তাঁতের শাড়ি পরে ,কানে দুল , গলায় মায়ের একটা সোনার সরু হার , কপালে একটা ছোট্ট টিপ। দুজনের সাজ দেখে মনে মনে হাসি পাচ্ছে, কি জানি কি জন্যে এই লাঞ্চ পার্টি। সুশোভন খানিকটা অপ্রস্তুত,  তার পরে একটু ঘোরাঘুরি করল তারা নিউ মার্কেট চত্বরে।ডিসেম্বরের সকাল, তাই চারিদিকে উৎসবের মেজাজ, তারা রিজেন্টে গিয়ে বসল, অর্ডার দেওয়া হলো  চিকেন বিরিয়ানি। ইতস্তত করছে সুশোভন, তার পর জানতে চাইলো ওকে ভালবাসি কিনা। ও  দীর্ঘদিন ধরে ভালোবাসে ,এখন বিয়ে করতে চায় তাও জানাল। সময় চাইলাম, কারণ সত্যিই  অম্বলিকা জানে না সুশোভনকে ভালোবাসে কিনা , সারা জীবন যেভাবে কেটেছে, শৈশব ,যৌবন, সেখানে ভালোবাসাকে অনুভব করার মতো পরিস্থিতি ছিল না, ভালোবাসার রঙ কি তাও জনে না সে। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে এতটা রাস্তা লড়াই করতে করতে অনেক কষ্টে একটু সুখের মুখ দেখেছে।

বাড়িতে এসে রাত্রিবেলা মাকে জানাল , মা আন্দাজ করেই ছিলেন , আনন্দে  তাকে জড়িয়ে ধরলেন মা।মা বলল দেখিস বিয়ের পর আস্তে আস্তে ভালোবাসা হয়ে যাবে, তুই ওকে ফিরিয়ে দিস না।কয়েক বার সুশোভনকে ব‍্যাঙ্কে দেখেছে মা, অপছন্দ হওয়ার কোন কারণই নেই।ভদ্র সভ‍্য শান্ত স্বভাবের সুশোভন অফিসে , বন্ধু মহলে সকলের প্রিয়। সারা রাত মনের সঙ্গে যুদ্ধ করল সে, কিছুতেই বুঝতে পারছে না ভালোবাসে কিনা। বিয়ে হয়ে গেলেও মাকে একা বাড়িতে রেখে দূরে সরে থাকা  তার পক্ষে অসম্ভব। তাকে ভালোবেসে বিয়ে করতে হলে , মাও থাকবে তাদের সঙ্গে।অনেক ভেবে চিন্তে তাই ঠিক করল 

সে।

পরের দিন একটু দেরিতেই অফিসে  পৌঁছলো,  আড়চোখে দেখল একমনে কাজ করে যাচ্ছে সুশোভন। অম্বলিকাও মনোযোগ দিল কাজে, এতো কাজ জমে ছিল যে টিফিন পিরিয়ডেও  বাইরে যেতে পারল না।অফিস ছুটি হওয়ার পর সব মিটিয়ে বেড়োতে বেড়োতে দেরী হয়ে গেছে, ততক্ষণে সুশোভন বেড়িয়ে গেছে ।  কি হলো বুঝল না সে, রোজ একসঙ্গে বাড়ি  ফেরে । কি জানি  কেমন মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরল অম্বলিকা।সেই রাতটা অস্বস্তিতে কাটাল।পরের দিন অফিসে গিয়ে দেখল আসেনি সুশোভন। সাধারণত ও এ্যাবসেন্ট করে না, তাহলে কি বাড়ি চলে গেলো।পরের দিন ও যথারীতি এলো না দেখে  এক অফিস কলিগ সুপ্রতীককে জিঞ্জেস করে জানল জ্বর হয়েছিল বলে বাড়ি চলে গেছে, ওরা একই মেসবাড়িতে থাকে।

প্রায় দশ বারো দিন পর অফিসে দেখা হলো, তার পর টিফিনের সময় একসঙ্গে বেড়িয়ে তারা বসল একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে। সুশোভন বারবার বলছে আমি দুঃখিত, বাড়ি যাওয়ার সময় বলে যেতে পারিনি, তবে তোমার কথা বাবা মাকে বলেছি। এবার তোমার মতামত বলো। কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা,  অম্বলিকা জানালো বিয়েতে মত আছে, কিন্তু  তার মা  তাদের সঙ্গে থাকবে।বাড়ি তো আছেই, তাই ভাড়া নেওয়ার কোন প্রশ্ন নেই কলকাতা শহরে। সুশোভন খুব খুশি হলো, ওদের ঠিকানা দিল মাকে যোগাযোগ করার জন্য।

কয়েক দিনের মধ্যে মা চিঠি দিলেন ওদের বাড়িতে, কলকাতায় আসার জন্য। আর তারা দুজনে তখন শুধু ঘুরে  বেড়াচ্ছে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়, কখনও প্রিয় বইয়ের সন্ধানে কলেজ স্টিটের বই পাড়ায়, কখনও ভিক্টোরিয়া,  কখনও ময়দানের সবুজ মাঠে নীল আকাশের নীচে, কখনও প্রিন্সেপ ঘাটে প্রকৃতির মাঝে।কলেজের বন্ধুরা  সবাই আনন্দিত, একবার সবাই মিলে যাওয়া হলো অনীতার  বাড়িতে।গল্পগুজব আনন্দের মধ্যে কেটে গেল দিনটা।

এক শুভ দিন দেখে সুশোভন , ওর মা বাবা আত্মীয় স্বজন মিলে দেখে গেল অম্বালিকাকে। সবাই প্রশংসা করলো সুশোভনের পছন্দের।  বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল ঐ দিনে, মাত্র দুমাস বাকি।ওরা চলে যাওয়ার পর মা চিন্তায় অস্থির , কিভাবে যোগার করবে একা হাতে। বুঝিয়ে শান্ত করল মাকে, বন্ধুরা সবাই সাহায্য করবে  তাদের। 

অনেক গুলো বছর কেটে গেছে মাঝে,  তারা দার্জিলিংয়ে বেড়াতে এসেছে । ম‍্যালের কাছাকাছি  এক হোটেলে উঠেছে  মা আর  মেয়ে। সুশোভনের সঙ্গে  ভালোবাসা হয়েছিল কিন্তু বিয়েটা হয়নি শেষ পর্যন্ত। ওদের বাড়ি থেকে শর্ত দিয়েছিল বিয়ের পর মায়ের সঙ্গে  থাকা চলবে না, আর মাকে কোন অর্থনৈতিক সাহায্য করা যাবে না। আসলে মায়ের কোন দায়িত্বই নেওয়া যাবে না।প্রথমে বাধা দিলেও শেষ পর্যন্ত বাবার কথায় সমর্থন করেছিল  সুশোভন, তখন বিয়ের মাত্র কটা দিন বাকি। মা বলেছিল আমার কথা চিন্তা করিস না, বাড়ি আছে ,কিছু টাকা আছে , আমার ঠিক চলে যাবে, তুই বিয়েটা করে নে। অনেক কান্না কাটি করেও রাজি করাতে পারেনি তাকে।বন্ধুরা এসেছিল, তারা বলেছিল মনের কথা শোন অম্বা, বিয়ের পর আফশোষ করিস না। বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছিল  অম্বলিকা নিজে হাতে। 

এখন  দার্জিলিংয়ে ম‍্যালে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখছে মায়ের সঙ্গে । সূর্যোদয়ের আলোয় যেন  গলে গলে পরছে বরফ। অপরূপ সাজে সেজেছে প্রকৃতি, , এখন শীতের শুরু ,সবে পূজো শেষ হয়েছে,একবর্ণ মেঘ নেই আকাশে, তাই ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা।ঠাণ্ডা বাতাস , অম্বলিকা শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে মায়ের শীর্ণ হাতটাকে..............

...(সমাপ্ত)...

Wednesday, March 31, 2021

মাতৃত্ব

 

ছবি  : ইন্টারনেট 
মাতৃত্ব
রাজশ্রী দে

শীতের সকাল , এক কাপ কফি নিয়ে  ব‍্যালকনিতে বসেছে বিপাশা। আজ রোববার , ছুটির দিন, সুন্দর সকালের আরামটুকু উপভোগ করছে বিপাশা। পাঁচতলার এই ফ্ল্যাটের ব‍্যালকনিটা বড্ডো প্রিয় বিপাশার। প্রানভরে আকাশ দেখা যায়।  আজ আকাশ ঝকঝকে নীল, নীচে চোখ গেলে দেখা যায়  সবুজ গালিচা পাতা লন, তার পাশে পাশে কতরকমের ফুলের গাছ। মনের মতো করে সাজিয়েছে এই দুকামরার ফ্ল্যাটটাকে বিপাশা।  আজকের দিনটা একটা বিশেষ দিন, বিপাশা আর অরীনের বিয়ের দিন। তাই পুরোনো কথাগুলো মোড়ক খুলে বেড়িয়ে আসছে।মুম্বাইয়ে এম.বি.এ পড়তে গিয়ে আলাপ অরীনের সঙ্গে। তারপর দুজনেই সেটেলড্ হওয়ার পর বিয়ে। মা  থাকতেন কলকাতায়,  বাবা বিপাশার ছোটবেলাতেই মারা যান।বিপাশার ছোটবেলাটা কেটেছে মা, দাদু , ঠাম্মার সঙ্গে।

অরীন দীর্ঘদিন মুম্বাইয়ে, প্রবাসী বাঙালি ওরা। বেশ ধূমধাম করে বিয়ে হয়েছিল তাদের।

মুম্বাইয়ে  ভালোই কাটছিল  বিপাশার ,  শ্বশুর, শাশুড়িকে নিয়ে তাদের চারজনের সংসার।অমায়িক শ্বশুর শাশুড়ি ।  বিয়ের ঠিক তিন বছর পর হঠাৎ করেই অরীন সেটেলড্ হতে  চাইলো দেশের বাইরে।অরীনের কথা শুনে মনে হলো ও অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছে। তখন বিপাশা প্রেগনেন্ট। তাছাড়া বিপাশার মত নেই দেশ ছেড়ে যাওয়ার।  একটা ম‍্যাল্টিন‍্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদে আছে বিপাশা। কোনমতেই  সব দায়িত্ব ছেড়ে কোনদিনই বিপাশা বিদেশে সেটেলড্ করতে পারবে না, জানিয়ে দেয় অরীনকে।শ্বশুর , শাশুড়ি, মাকে ছেড়ে কেমন করে যাবে বিপাশা।

তার কিছুদিন পর  অরীন চলে যায় কানাডা। মেয়ে হিয়া হওয়ার এক বছর পর ডির্ভোস হয় তাদের।ডির্ভোস হয়ে যাওয়ার পর কলকাতায় ট্রান্সফার হয়ে যায় বিপাশার। কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে মেয়েকে নিয়ে চলে আসে বিপাশা। কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলে । মাঝেমধ্যে মুম্বাইয়ে মেয়েকে নিয়ে  যায়  শ্বশুর বাড়িতে। বিপাশার মা আজ আর নেই। কলকাতার সেই বাড়ি ও বিক্রি করে দিয়েছে বিপাশা।

হিয়ার এখন চার বছর বয়স, সবসময় বকবক করেই চলেছে। আজ স্কুল ছুটি বলে এখনও অঘোরে ঘুমোচ্ছে। একটু পরেই শান্তি মাসী আসবে কাজ করতে, সেই সব করে।রান্না থেকে শুরু করে  হিয়ার  দেখাশোনা, রাতে বাড়ি ফিরে যায়। বিপাশা  ট্যুরে গেলে হিয়াকে  নিয়ে রাতে থেকে যায়  শান্তি মাসী।

বিপাশা এক কথায় সিঙ্গল মাদার। এখন ও পর্যন্ত  সবকিছু ঠিকঠাক সামলে চলেছে।  কিন্তু মানুষের কৌতহলের  শেষ নেই। সামনের ফ্ল্যাটের মিসেস গুরসুরকারের অসীম আগ্ৰহ হিয়ার বাবাকে নিয়ে। কোথায় থাকে , কেন আসে না মেয়ের কাছে এই সব আর কি। ছুটির দিনে কমপ্লেক্সের  মধ্যে পার্কে নিয়ে  যায় বিপাশা হিয়াকে , সেখানেও সেদিন মিসেস সেন আর মিসেস ধর গল্প করতে করতে বললেন হিয়া কি মিস্ করে  ওর বাবা কে , ডিভোর্স হয়ে গেলেও মেয়ের কাছে তো আসা উচিত। বিপাশা বুঝিয়ে পারে না যে হিয়া তার বাবাকে কোনদিন  দেখেইনি তাই বাবাকে মিস্ করার কোন প্রশ্নই আসছে  না। হিয়ার কাছে বিপাশাই সব , একসঙ্গে বাবা মায়ের দায়িত্ব পালন করে চলেছে।

 কলকাতায় এসে স্কুল লাইফের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, সকলে পাশে আছে বিপাশার। বন্ধুরা  আছে বলেই এই প্রতিকূলতার মধ্যে ও এগিয়ে চলেছে বিপাশা। বন্ধুর মতো আজ ও পাশে আছেন শ্বশুর শাশুড়ি দূরে থেকেও। তারা ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না। ডিভোর্সের কয়েক মাসের মধ্যে অরীন ওর ছোটবেলার বান্ধবীকে বিয়ে করেছে শুনেছে বিপাশা। আগে কষ্ট হতো খুব এখন আর কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। কষ্টগুলো জমাট বেঁধে মনের কোন এক জায়গায় লুকিয়ে আছে। আজকের দিনে সেগুলো ঝাঁপি খুলে বেড়িয়ে পরে। আজকে যে বিপাশার বিয়ের দিন ছিল।

 কখন গুটি গুটি পায়ে ব‍্যালকনিতে এসেছে হিয়া, মেয়ের ডাকে চমক ভাঙলো বিপাশার।পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরলো মেয়েকে। কিছুক্ষণ আদর করার পর ব‍্যস্ত হয়ে পরল মেয়েকে নিয়ে। ইতিমধ্যে শান্তি মাসীও চলে এসেছে, ব্রেকফাস্ট রেডি করছে। ল‍্যাপটপ্ নিয়ে বসলো  বিপাশা, অফিসের কিছু কাজ করে নিয়ে মেয়েকে পড়াতে  বসতে হবে।

আজ  বিপাশা অফিস ছুটি নিয়েছে। হিয়ার স্কুলের পেরেন্টস্ টিচার মিটিং আছে।  শান্তি মাসী মেয়েকে  রেডি করে দিয়েছে। তাড়াতাড়ি মা ও মেয়ে রওনা হলো স্কুলের  উদ্দেশ্য।  হিয়ার স্কুলের বন্ধুদের মায়েদের সঙ্গে বেশী বন্ধুত্ব নেই বিপাশার। সকলের ওর পার্সোনাল লাইফ সম্বন্ধে অসীম কৌতহল। তাই হিয়ার স্কুলে আসতে ও একদম মন চায় না বিপাশার। যাইহোক টিচারের সঙ্গে কথা বলে ক্লাসরুম থেকে বেড়তেই বৃষ্টির মা বাবার সঙ্গে দেখা। বৃষ্টির মা মধুরা সকলের সামনে প্রশ্ন করে বসলো এবারও হিয়ার বাবা আসে নি।  বৃষ্টির বাবা বললেন ডির্ভোস তো অনেকেরই হয়  তবু মেয়ের কথা ভেবে একবার অন্তত ওর বাবার একবার স্কুলে আসা উচিত। কি উত্তর দেবে বিপাশা বুঝতে পারে না। মেয়েকে কোনরকমে টানতে টানতে নিয়ে এসে গাড়িতে  ওঠে। আজকে আর ড্রাইভ করতে মন চায় না। মনে হয় অনেক দূরে চলে যায় যেখানে তাকে প্রশ্ন করার কেউ থাকবে না। অরীন যেন তার জীবন থেকে চলে গিয়েও চলে যায় নি। অতিষ্ট করে তুলেছে বিপাশার জীবন। অরীন যদি মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখে সেজন্য তো বিপাশা দায়ী নয়। এত বড় অপরাধ করেও অরীন কেমন স্বাধীন ভাবে জীবন কাটাচ্ছে।

সামার ভ‍্যাকেশন্ হিয়ার, তাই বিপাশা মেয়ে আর শান্তি মাসীকে নিয়ে বেড়াতে এসেছে মন্দারমনিতে।হোটেলের সামনেই সমুদ্র।অনবরত ঢেউয়ের আনাগোনা দেখছে বিপাশা ব‍্যালকনি থেকে। ছোট্ট হিয়া সমুদ্র দেখে খুব খুশি।শান্তি মাসী এই প্রথম সমুদ্র দেখে অবাক। তারা সবসময় বীচে সময় কাটাচ্ছে।

ভোরবেলায় একা একা বেড়িয়ে পরে বিপাশা, সমুদ্র সৈকতে সূর্যোদয় দেখে।তার পর জলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলে যায়। এখন নির্জনতাকেই ভালো লাগে বিপাশার।কলকাতার ভীড় আর তাকে নিয়ে অযথা কৌতূহলে হাঁপিয়ে উঠেছিল বিপাশা। আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারতো সে কিন্তু মেয়ের কথা ভেবে আর ওসব চিন্তা করেনি। তাছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করতে বড্ডো ভয় হয় বিপাশার। এই তো বেশ আছে মেয়ের সঙ্গে।মেয়েকে সুন্দরভাবে  মানুষ করছে বিপাশা যেন বাবা অরীনের মত না হয় হিয়া।তার পরিচয় সে সিঙ্গল মাদার। গর্বিত বিপাশা, একসঙ্গে সবকিছু সামলে চলার জন্য। তার হিয়াকে  সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে।হিয়াকে সুন্দর মানসিকতার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে বিপাশা।এই সমাজ মুখে বড় বড় কথা বললেও, আধুনিক হলেও  সম্পূর্ণভাবে আজ ও এগিয়ে যেতে পারে নি।বিপাশা সমুদ্রের ঢেউয়ের আনাগোনা দেখতে দেখতে ভাবে আলো ঝলমলে ভবিষ্যতের কথা…..

rajasreedey30@gmail.com