1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label সন্দীপ ঘোষ. Show all posts
Showing posts with label সন্দীপ ঘোষ. Show all posts

Sunday, September 21, 2025

আমার মা-মা দুগ্গা

ছবি : ইন্টারনেট

আমার মা-মা দুগ্গা

সন্দীপ ঘোষ

এই ছেলেটা মন্দিরেতে

কেন রে তুই একা একা                          আসিস চলে?

দুই হাত জোড় করে তুই

কী এত ভাবিস মগ্ন ধ্যানে                        নিষ্ঠা বলে? 

হাপুস নয়নে কেঁদে কেঁদে

ছেলেটা জানায় করছি দিদি                    মায়ের সেবা

মা যে আমার বড়ই দুখী

আমায় নিয়ে বড়ই ব্যকুল                        জানে কেবা।

জগৎজননী মা দুগ্গা আমায় বলে,

মুছে ফেল মনে আছে যত কালো

যা ঘরে তুই দেখবি কত মায়ের আলো    মুক্ত আকাশ

কাশের বনে চামর দোলে

মণ্ডপে ঢাক কাঁসর বাজে

স্বপ্নে আমার মা, মা দুগ্গাই তাঁর                দেখি প্রকাশ।

...(সমাপ্ত)...


Wednesday, October 2, 2024

মেধার হালহকিকত্ : একটি আলোচনা

ছবি : ইন্টারনেট

 মেধার হালহকিকত্ : একটি আলোচনা

 সন্দীপ ঘোষ

বুদ্ধি আর স্মৃতি পরস্পর সম্পৃক্ত | আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা যেন বা বলা যায় একে অন্যের পরিপূরক | তো এরাই আবার স্বতন্ত্র পদক্ষেপে পরস্পর নির্ভরশীল | একে অন্যকে ছাড়া চলতে পারে না অর্থাত্ এরকম না ঘটলে মেধা বলা যায় না, অন্ততঃ আমার তাই মনে হয় | সমছন্দে সমলয়ে এগোলেই আমরা তাদের বৌদ্ধিক ও সুদীপ্ত প্রকাশ দেখতে পাই | যে মানুষের মধ্যে তারা বাস করে প্রকট রূপে প্রকাশিত হয় তাকে বলি মেধাবী | উচ্চমেধা, নিম্নমেধা অনেকে ব'লে থাকেন | আমার ক্ষুদ্ৰমস্তিস্ক বলে, মেধাবীর কোনো ভাগ নেই | মানে কম মেধাবী , বেশি মেধাবী এরকম বলা যায় কি ? আমার তো মনে হয় এরকমভাবে দেখা বা ভাবা হয় না | তবে হ্যাঁ ,বুদ্ধ্যাঙ্কের তারতম্য হতে পারে, যদিও সেটা থাকে পিঠোপিঠি | আর একটা কথা- ভালো বুদ্ধি আছে স্মৃতিশক্তি দুর্বল, এরকম হলে ঘোর বিপদ | মানে বুদ্ধিটা তেমন সুবিধা করে উঠতে পারবে না | আবার বুদ্ধি কম যার বিশ্লেষণী ক্ষমতা নেই অথচ মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী, তাকে আমরা মেধাবী বলি না | বিশ্লেষণ ভিত্তিক বিষয়ের ক্ষেত্রে সে হোঁচট খেতে খেতে মুখ থুবড়ে পড়বে  | তার মানে সে বার বার অবনতির পথটাই দেখবে | অনেকের মতে  শুধুমাত্র স্মৃতি নির্ভর পড়াশোনায় নব্বই শতাংশ মার্কস পাওয়াটা শিক্ষা পরিকাঠামো থেকে অর্জিত | শিক্ষা ব্যবস্থার দায়  আছে ঠিকই কিন্তু আমি বলব নব্বই শতাংশ মার্কসটা স্মৃতি দিয়ে পাওয়া যায় না | বুদ্ধি শক্তিশালী না হলে এই মার্কসটা আসবেই না | যদি তা হয় তাহলে ধরে নিতে হবে মার্কস-এর জন্যই তার পড়াশোনা | এটা একটা ব্যাতিক্রমী ঘটনা | তবে মেধার একটা নিজস্ব জগত্ আছে | সেখানে জোর করে কেউ ঢুকলে দিশা হারিয়ে সংকীর্ণ মেধার পরিচিতি পায় | যা কখনোই কাম্য নয় এবং তা পড়ুয়ার আগামীতে পথ চলার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে | মানে একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, বর্তমান শিক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে বলছি, বেশকিছু ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিকে ৫০ শতাংশ নাম্বার পেয়ে দুম করে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়ে যাচ্ছে | তারপর একসময় পিছিয়ে পড়ছে ক্লাসে বিজ্ঞানের সঙ্গে যুঝতে না পেরে | শুধু ৫০ শতাংশ কেন, হোঁচট খাচ্ছে ৬০%-৮০% পাওয়া ছাত্রছাত্রীরাও  | এরা মাধ্যমিকে যে মানের ছাত্রছাত্রী ছিল উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখায় সেই মান ধরে রাখা দুর অস্ত্  উল্টে তাদের মান ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে | তাহলে তৈরি হচ্ছে না ভবিষ্যতের প্রশ্নচিহ্ন ?

     বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা প্রশ্ন বার বার ঘুরে ফিরে আসে সেটা হলো 'গভীরতা' | এই গভীরতা বোধে শিক্ষাকে ভালোবেসে জ্ঞান অর্জন করে কতজন? প্রতিবছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী এম এ, এম এস সি  পাশ আউট হচ্ছে , তাদের মধ্যে কতজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা দেখাতে পারে ? ওপর ওপর বা ভাষা ভাষা পড়াশোনার রীতিটার বড্ড বাড়ন্ত হয়েছে | তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী' প্রবাদটির প্রাসঙ্গিকতা | কোনো কোয়ালিটি তৈরি হচ্ছে না, হচ্ছে ভুরিভুরি-ঝুড়িঝুড়ি কোয়ালিফিকেশন | নিজেকে মনোগ্রাহী করে তুলছে আত্মম্ভরিতার পোশাকে | যাইহোক এসবই কিন্তু ঘটে চলেছে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক ব্যবস্থার দাক্ষিণ্যে |

    প্রতিবছর বোর্ড, কাউন্সিল,সিবিএসই ও আইসিএসই পরীক্ষায় কিম্বা জয়েন্ট বা নিট পরীক্ষায়  ৯৫%-১০০% পাওয়া মেধাসম্পন্ন এত এত পড়ুয়া  আমরা টিভিতে ,খবরের কাগজে দেখতে পাচ্ছি ,পরবর্তীকালে সেই মেধার অবস্থান কী হচ্ছে ? তারা কোথায় যাচ্ছে? অর্থাত্ কে কোথায় কী পড়ছে ? কোথায় কোন পদে রয়েছে ? দেশের উন্নয়নে তাদেরকে কতটা কাজে লাগানো হচ্ছে ? কিম্বা তারা চাকরির আকালের ভিড়ে  হারিয়ে যাচ্ছে না তো ? এই প্রশ্ন অনেকের | পরবর্তীকালে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যত নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা |

      আর একটা শব্দ এই আলোচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ , সেটা হলো 'প্রতিভা' | ঈশ্বর প্রদত্ত ব'লে এই শব্দটিকে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভক্তি করি এবং অবশ্যই খুব ভালোবাসি | প্রতিভার সংশ্লিষ্ট বিষয়টিকে ভালো না বাসলে প্রতিভা সদর্থক হয় না | কোনো না কোনো প্রতিভা নিয়েই মানুষ পৃথিবীতে আসে | এক একজন মানুষ এক এক রকম কিম্বা বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে পৃথিবীতে জন্মায় | শুধু প্রতিভা থাকলেই তো হয় না, প্রকাশটাই আসল কথা | তার কারণ মানুষ প্রকাশটাই দেখবে | এই প্রকাশের পথটাই যে বড় কঠিন | তাই এক্ষেত্রে বুদ্ধি ও বিচক্ষণতাই শেষ কথা | একজন শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটবে যদি সে সবরকম অনুকুল পরিবেশ পায় | তাই এটাই শিশুটির যথাৰ্থ দাবী হয়ে উঠুক পরিবার, সমাজ ও দেশের কাছে | মেধার সঙ্গে প্রতিভা শব্দটিও জুড়ে আছে | আমরা বলে থাকি উমুক ছেলেটি বা মেয়েটি পড়াশুনায় ভীষণ ট্যালেন্টেড | যে অনায়াসে খুব সচ্ছন্দ এবং দ্রুততার সঙ্গে মস্তিস্কে ধারণ ও তার প্রয়োগ ঘটাতে পারে, এটি একটি দিক | আর অন্যটি- এই প্রতিভার মধ্যেই রয়েছে উদ্ভাবনী শক্তির বহুবিধ ব্যাতিক্রমী সত্তা | যেমন - সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, ক্রীড়া সহ আরো অনেক কিছু |পড়ুয়ার মধ্যে যদি বুদ্ধি, স্মৃতি ও প্রতিভা এই তিন বিশেষণ একত্রে বাস করে তাহলে তার মেধা অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে । 

    দেশ ও দশের কল্যানার্থে বা মঙ্গলার্থে সুশিক্ষা বা জ্ঞানকে প্রয়োগ করতে পারলে মেধার পরিচয় আমরা পেতে পারি | আর মেধা এখন ছুটছে অর্থের  পিছনে | অর্থাত্ কীভাবে দামি পদটা দখল করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত ও বিলাসিতায় ভরিয়ে রাখা যায় | পরিষেবা দেওয়ার মানসিকতা কতটা আছে সেবিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠে আসে | তাই বলতেই হয় মেধা শুধু অর্থের প্রাচুর্য্যের সঙ্গে ওঠবস্ করে চলেছে | মেধার কাজ শুধু মেধাবীকে সুখসমৃদ্ধি ও বিলাসিতায় ডুবিয়ে রাখা নয়, দেশ ও দেশের মানুষের হিতসাধন করা | তা তো হচ্ছে না | মৃত্যু হচ্ছে মেধার সারবত্তার |

     একটি স্বশাসিত সংস্থা গড়ে তার অধীনে দেশের নানা বিভাগের সমস্ত মেধাবীদের নিয়ে আসা দরকার | সাধারণ মানুষ মেধাবীর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারবে | তাছাড়া শুধু চাকরিমুখী শিক্ষাই নয় মানবিক মুল্যবোধের শিক্ষাও খুব যত্নের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থায় লালন করা অত্যন্ত জরুরী | এই ব্যবস্থার যারা নিয়ামক, যারা ক্ষমতার অলিন্দে বসে রয়েছেন, তারাই শিক্ষার যথাৰ্থ সংস্কার করে মেধার ভবিষ্যত্ নিশ্চিন্তে ছাড়তে পারে মেধাবীদের হাতে |

...(সমাপ্ত)...

Saturday, October 21, 2023

সুখদুঃখের স্বপ্নকথা

ছবি : ইন্টারনেট


সুখদুঃখের স্বপ্নকথা

সন্দীপ ঘোষ

গ্রাম দেবরাজপুর | বর্ধিষ্ণু এই গ্রামটির একেবারে দক্ষিণে পাশাপাশি বাস করে প্রাণেশ, বিনয়, সুহাসরা | সবার স্বপ্ন একটাই বড় হয়ে সাবলম্বী হবে | বাবা-মায়ের সাধ পূরণ করবে | যাঃ মনে ভাবলেই সবসময় সবার ক্ষেত্রে সেটা হয় নাকি ? আজ এটা উপলব্ধি করেছে প্রাণেশ | মাস ছয়েক হলো সে শিক্ষকতার পদে নিযুক্ত হয়েছে |  শীতের হাড়কাঁপানো ইনিংস শেষের দিকে | জানলা খুলেই বসেছিল | অস্বস্তি শুরু হলো… কারণ পশ্চিমের  জানলা দিয়ে মাঝে মাঝে  ঘরে ঢুকছে শীতল বাতাস | জানলা বন্ধ করে দেয় প্রাণেশ | দুপুরবেলা একলা ঘরে সে | মনে পড়ে যায় ছেলেবেলা-কিশোরবেলার স্মৃতি |  নাড়িয়ে দিয়ে যায় মনকে |

         বন্ধুদের সঙ্গে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হৈ-হুল্লোড় মজার আনন্দটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করত প্রাণেশ | পড়াশুনা করত খুব ভালোবেসে | শুধু তাই নয় যে কোনো খেলার ক্ষেত্রেও ঐ একইরকম উন্মাদনার শিহরণ অনুভব করত দেহের প্রতিটি কোষে,মনের রেখায় | জীবনে চলার পথে হয়ে উঠেছিল এক ছুটন্ত ঘোড়া | তাই প্রানবন্ত মন নিয়ে বন্ধুদের প্রাণোচ্ছল  সাহচর্য প্রত্যাশাই স্বভাবিক | সত্যি বলতে কি বিনয়- সুহাসদের মধ্যে এই অনুভুতিটা সমমাত্রায় কোনোদিন খুঁজে পায় নি সে | অথচ অর্থনৈতিক সচ্ছলতা কোনো অংশে কম নয় বিনয়-সুহাসদের |

            চাষীবাসী মানুষ প্রানেশের বাবা ও মা খুবই আন্তরিক প্রবণ, স্নেহশীল মনের মানুষ | ছেলের জন্য তাদের সবটুকু নিঃস্বার্থ ভাবে দিয়ে গেছেন | ছেলেও যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল, ভালোবাসা প্রবণ | তাই প্রকৃতির নিয়মের মতই সে আন্তরিকভাবে দায়বদ্ধ তার মা-বাবার প্রতি | নিখাদ ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একটি সংসার | সপ্ন দেখেছিল প্রানেশ |

আজ বাস্তবায়িত হয়েছে |

     বিনয়ের মা এসেছিল প্রাণেশদের বাড়িতে | ছেলেকে নিয়ে তার একরাশ ক্ষোভ, মান-অভিমান আর নানান কথা বলে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যায় |  বাড়িতে বিনয়ের বাবা অসুস্থ | অনেক পরিশ্রম করে নিজেকে তিলতিল করে গড়ে তোলা মাস ছয়েক আগে নিযুক্ত সরকারী অফিসের আধিকারিক বিনয় কিছুদিন আগে বাড়িতে এসে বাবার চিকিত্সার বন্দোবস্ত করে আবার ফিরে যায় কর্মস্থল মেদিনীপুরে |

        আর খোঁজ নেয় নি বিনয় | এই দায়সারা গোছের মানসিকতা মেনে নিতে পারে না তার মা - বাবা | সত্যিই তো কোন্ বাবা মা নেবে এই আচরণ ? শিক্ষিত ছেলে | এত কষ্ট করে মানুষ করেছে আজকে এই দিন দেখবে বলে ? প্রাণেশ বোঝে এই আচরণের অর্থ | ছোটবেলায় প্রায়ই কাঁদত বিনয় তার কাছে এসে | বলত, মা-বাবা খালি ঝগড়া করে | তার কথা একদম ভাবে না | তার বাবা অফিস থেকে ফিরে নিত্যদিন চিত্কার চেঁচামেচি শুরু করে দিত | খাবার দিতে মিনিট পাঁচেক দেরি হলেই রাগে খাবার খেত না | রান্নার স্বাদ মনের মত না হলে সেই খাবার ছুড়ে ফেলে দিত | তার মায়ের সাথে ভীষণ ঝগড়াঝাটি করত | হাতও তুলত | শিক্ষিত এই মানুষটি কেন করত এসব ছোট্ট বিনয় বুঝত না | তিনটে মানুষ কারো সাথে কারো আন্তরিক বাক্যালাপ ছিল না | বিনয়ের মনের বিকাশের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পারিবারিক তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ভরা জীবন কী সাংঘাতিক পর্যায়ে যেতে পারে তা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ চ্যটার্জ্জীর কাছে জেনেছে প্রাণেশ | তবুও বিনয় অনেক বেটার জায়গায় আছে | প্রাণেশ বোঝায়  বিনয়কে | বিনয় জানায় তার প্রাণরস প্রায় শুকিয়ে কাঠ | অবশিষ্ট যেটুকু আছে চেষ্টা করছে বাবা মা কে ভালো রাখার | নির্লিপ্ত বিনয়  আবার এসে চিকিত্সা করিয়ে ভালো করে তোলে | ভালোবাসার বন্ধনহারা বিনয় | কে বোঝে ? সমাজ কিন্তু আঙ্গুলটা বিনয়ের দিকেই তোলে |

         অন্যদিকে সুহাস বাড়ির খুবই আদুরে ছেলে | তার বাবাও সরকারী কর্মচারী |  এই পরিবারে রয়েছে অহমিকার বাতাবরণ | তাদের প্রত্যেকের মনের গভীরে সুপ্ত অবস্থায় পরষ্পরের প্রতি আন্তরিকতার অভাব রয়েছে |  আগে নিজেরটা বোঝে পরে অন্যের কথা চিন্তা করে | নির্ভেজাল খাঁটি ভালোবাসার জায়গাটার ভীষণ অভাব রয়েছে এই পরিবারে আবিস্কার করে প্রাণেশ | সুহাসের একজন দিদি আছে | নাম সোহিনী | বাবা-মায়ের স্নেহ-আদর-ভালোবাসা ভাগ্যে নেই মেয়ে হওয়ার সুবাদে | সে পড়তে চায় | চায় সাবলম্বী হতে | কিন্তু মেয়ে যে ! শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে | কী হবে পড়ে ? যথারীতি তার বিয়েও হয়ে যায় | সুহাস অনেক বড় হবে | বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখবে | এই ভাবনার জগতে সে একটু একটু করে বড় হয়ে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত , ব্যাঙ্ক ম্যানেজার পদে কর্মরত | সুহাস আজ প্রতিষ্ঠিত হলেও ইটকাঠ পাথরে পরিণত হয়েছে | মা-বাবার প্রতি যে আবেগ শ্রদ্ধা ভালোবাসার জায়গা সেটা তার শিশু বয়েস থেকে তার মা-বাবা নিঃস্বার্থ-নিখাদ ভালোবাসা ছেলের অন্তরে রোপন করতে পারেনি | বিস্তর একটা ফাঁক থেকে গেছে মনে করে প্রাণেশ | বর্তমানে বিয়ে করে শহরে সেটেলড্ সুহাস | মা-বাবার পরিচর্যা করে তার সেই অবহেলিত দিদি সোহিনী | শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে নিয়মিত দেখে যায় |

         প্রাণেশ ভাবে জীবন বড়ই বিচিত্ৰ | কেবলমাত্র সত্যিকারের বা খাঁটি ভালোবাসার অভাব এক একটা পরিবারকে কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায় ! তাই স্বপ্নগুলো ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে অন্তঃপুরে প্রবেশ করতে পারে না | প্রাণেশ দু'হাত কপালে ঠেকায় ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে | মাতৃ-পিতৃসুখের পরম সুখানুভূতি অনুভব করে | কারণ শ্রেষ্ঠ সম্পদই হলো মা-বাবার ভালোবাসা |

...(সমাপ্ত)...

Monday, July 24, 2023

অজানা পথের বাঁক

ছবি : ইন্টারনেট

অজানা পথের বাঁক

সন্দীপ ঘোষ

বাবা আজ সকালে বেরিয়েছে | প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে দুধ নিয়ে ফেরার পথে সামনের বটগাছটার দিকে তাকিয়ে এগারো বছরের তিয়াসা আর তার ভাই সাত বছরের রাকেশের চোখ একেবারে ছানাবড়া ! তা তো হওয়ারই কথা | পানু গাছে উঠছে কেন ? ছোট ছোট ডাল ধরে গাছটার দেহের খাঁজে খাঁজে পা রেখে একটু একটু করে উপরের দিকে উঠছে সে | আর উঠছেই বা কী করে ! বিস্ফারিত নেত্রে একমনে দেখে চলেছে ওরা দু'ভাই বোনে | বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে রাকেশ উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানতে চায় ;

-----" দিদি,পানু ওভাবে গাছে উঠছে কেন রে ? "

-----" আমিও তো তাই ভাবছি |"

কয়েকটা মুহূৰ্ত , তারপর কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে বলে তিয়াসা ;

-----" পানু-- এই-ই-পানু , গাছে উঠছিস কেন ? পড়ে যাবিতো !"

কাঁদো কাঁদো হয়ে উত্তর দেয় পানু ;

-----" আমিও ইস্কুলে যাব, বই পড়ব, আমাকে ঢুকতে দেইনি ক্যানে ? আমি গাছে বসেই পড়া শুনব, শিকব |"

      পানুরা গরীব | ওদের এই গ্রামে বাড়ি নয় | পূবের কোন এক গাঁয়ে বাড়ি, শুনেছে রাকেশ-তিয়াশা | শীতের শুরুতে পানুর বাবা নীরু কালিন্দী সঙ্গে পানু আর ওর মাকে নিয়ে এসেছে এই গাঁয়ে (খেজুর গুড়) মহল করবার জন্য |  গুড়ের সময় চলে গেলেও ওরা আর নিজের  গাঁয়ে ফিরে যায়নি | এই গ্রামের লোকের পরামর্শে তাদের ক্ষেতে- খামারে কাজ নিয়ে খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির কুঁড়েঘর বানিয়ে বেশ দিব্যি আছে | তবে পানুর বাবা পানুকে স্কুলে ভর্তি করার চেষ্টা যে করেনি তা নয় | আসলে পানুর তো  জন্ম শংসাপত্রই নেই, তাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনোময়বাবু ফিরিয়ে দিয়েছেন | তারপর পানুও হাল ছাড়েনি, অনেক বায়না করেছে , বাবা-মা কেউই কাণে তোলেনি পানুর বায়না | পানুর জন্মের পর নিজের অজ্ঞতার কারণে নীরু কালিন্দী ছেলের জন্মের তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করায়নি | ইতিমধ্যে সাত বছর অতিক্রান্ত  এখন আর চেষ্টা করেও পানুর জন্ম শংসাপত্র জোগাড় করে উঠতে পারেনি নীরু | 

পানু গাছের ডালে বসেই চেঁচিয়ে কেঁদে বলতে থাকে ;

-----" আমি পড়ব-আমি পড়ব- আমি পড়ব | ইখানে বসেই লেকাপড়া শিকব | তুই ইস্কুলে ককন যাবি রাকেশ ?"

-----" সে তো অনেক দেরী, বাড়ি যাই , সকালের পড়া করতে হবে,  স্নান করব, খাবার খাব, তারপরে ইস্কুলে যাব , নারে দিদি ?" 

-----"হ্যাঁ তাই তো--- তুই নেমে আয় পানু, ভাইয়ের সাথে স্কুলে যাবি, স্কুলে বসেই পড়বি |"

-----" ইস্কুলে ত  ডুকতে দেইনি মাস্টার, আইজকে দিবেক ?"

পানুর এই প্রশ্নে দু'ভাইবোনেই খানিক ধন্দে পড়ে যায় | নিজেকে সামলে নিয়ে আন্তরিকতা ও সহানুভূতির মাত্রাকে উচ্চে তুলে আত্মপ্রত্যয়ী জবাব তিয়াসার ;

-----" নিশ্চই দেবে, আজকে তুই স্কুলে যাবি - ই - যাবি | ভাইয়ের সাথে পড়বি, কেমন ? তুই নেমে আয় ভাই !"

বুকের ভেতরটা এক বুক আশায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল পানুর | স্কুলের প্রাচীর লাগোয়া বট গাছ থেকে সে অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে সাবধানে নেমে আসে |

তিয়াসা চিন্তায় ডুবে যায় | পানুকে দেখানো স্বপ্ন সে সত্যি করতে পারবে তো ! মা-বাবা কী তার কথা শুনবে ! আজ কিছুদিন হল তার ভিতরে একটা চাপা অভিমান ক্রমশঃ ঘুরপাক খাচ্ছে | সব ব্যাপারে ভাইয়ের গুরুত্ব থাকলেও তার উপরে বাবা-মা কেমন যেন উদাসীন | তবুও ভাইকে সে খুব-খুব ভালোবাসে | সমাজের পুত্র-কন্যার বৈষম্যের বীজটা হয়ত সে উপলব্ধি করতে পেরেছে | তবে বাবা-মা যে তার কথা গ্রাহ্য করবে না, তা ধরে নিয়েই বাড়ি ফেরার পথে রাকেশকে বলে;

-----" ভাই, পানু স্কুলে যাক, লেখাপড়া করুক--- তুই কি চাস ? মানে তোর কি তাতে ভালো লাগবে ?"

-----" হ্যাঁরে দিদি, আমি সে কথাই ভাবছি, পানু স্কুলে গেলে আমার খুব ভালো লাগবে |"

-----" আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে জানিস ভাই ?"

-----" কি রে সেটা ?"

----" তাহলে শোন্ , বাড়ি ফিরেই মাকে পানুর কথা বলবি |"

কী বলতে হবে ভাইকে সব বুঝিয়ে বলে দেয় তিয়াসা |

আজকের পানুর ঘটনার কথা রাকেশ তার মাকে প্রথমে জানায়, তারপর জানতে চায়;

-----" পানু কেন স্কুলে যায় না মা ! ও স্কুলে গেলে ওকে কেন বের করে দেয় , আমার খুব কষ্ট হয় মা | বাবা কে বলোনা  পানুকে যেন আমাদের স্কুলে নিয়ে নেয় |"

পানুর কথা শুনে রাকেশের মা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন;

-----" তোর বাবা একটু পরেই ফিরবে, বলব |"

ভাইবোনের আনন্দ আর ধরে না ! যথা সময়ে বাবা ফিরে সব শুনলেন, তারপর বললেন; 

-----" ঠিক আছে মনোময়বাবুকে আমি অনুরোধ করব | আসলে কী জান, সরকারী নিয়মে সব বাচ্চাকেই ভর্তি নিতে হবে | কিন্তু তারপরেও আমরা মাষ্টারমশাইরা ইতস্তত বোধ করি |  ভর্তিছাড়া আমরা কোন ছেলে বা মেয়েকে স্কুলে নিতে পারিনা, বিশেষ করে যেখানে মিড-ডে-মিলের একটা বিষয় রয়েছে | বলে দেখি, আজকের দিনটার জন্য যদি বিবেচনা করেন-------"

ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে রাকেশ, তিয়াসাও পাশের ঘর থেকে উঁকি দিয়ে এতক্ষণ সব শুনছিল, সেও মুখে হাত চাপা দিয়ে সরে যায় | সম্ভবত, কেঁদে ফেলেছে | রাকেশের বাবা অশোকবাবু থেমে যান | | রাকেশের মা পাশের ঘর থেকে বলে ওঠেন;

-----" শুধু আজকের জন্য কেন ? পানুর বার্থ সার্টিফিকেট জোগাড় করে বরাবরের জন্য স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করা যায় না ?"

------" দেখি কী করা যায় !" 

তিয়াসা নিশ্চিত, বাবা যখন বলেছে ভাল কিছুতো একটা হবেই | রাকেশও তাই মনে করে | ওদের মনের দ্বন্দ্ব কেটে গেছে |

শিক্ষকতার সম্পৰ্ক ছাড়াও মনোময়বাবুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও রয়েছে | ফোনে পানুর ভর্তিসহ সব কথা সারলেন মনোময় বাবুর সঙ্গে | তারপর ছেলেকে ডেকে বললেন;

--------" আজ থেকেই পানু স্কুলে যাবে | কীরে তুই খুশি তো ? ওর জন্মের সার্টিফিকেটের জন্য ওখানের স্থানীয় প্রশাসনিক কার্য্যালয়ে লোক পাঠানো হবে | পানুকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে যাবি | যা রেডি হয়ে নে | স্কুলের সময় হয়ে আসছে আমাকেও বেরোতে হবে |"

যারপরনাই খুশি দু'ভাইবোনে | কারো ভালো করতে পারার মধ্যে যে এত আনন্দ লুকিয়ে আছে , দু'ভাইবোনে এই প্রথম আবিষ্কার করল | কিন্তু জীবনের গতিপথ যে বড়ই জটিল ! তাইতো হঠাত্ কোনো এক বাধা এসে দুটি অপরিণত মনের সুখানুভূতিকে এক লহমায় মুচড়ে দিয়ে যায় | রাকেশদের ক্ষেতে কাজ করে আদিবাসী যুবক লুসা পানুর স্কুলে যাওয়ার কথা শুনে বলে;

-----" না অরা নাই, দ্যাশের গর(ঘর) গ্যাচে, পানর ঠাগ্মা(ঠাকুমা) মরেচে,সেই লিগে (জন্য) |"সকাল থেকে মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলার মাঝে মেঘাচ্ছন্ন পূবের আকাশটা আরো ঘন কালো মেঘে ছেয়ে যায় | 

....সমাপ্ত...


Friday, January 13, 2023

ক্ষণিকের বর্ষণ

ছবি : ইন্টারনেট 

ক্ষণিকের বর্ষণ

সন্দীপ ঘোষ

কালো মেঘে ছেয়ে ঘনীভূত  আকাশ,

নিদ্রাদেবী তন্দ্রালু চোখ সরিয়ে দিয়েছিলেন বোকাবাক্স থেকে ,

তাই খেয়ালের অবকাশ ছিল না |

হঠাত্ মেঘের গর্জন, বজ্রবিদ্যুতের চমকানি,

চকিতে বড় বড় ফোঁটা দিয়ে শুরু হল বর্ষণ,

বর্ষিত হল নিবিড়তার স্পর্শে আন্তরিক আবেদনে, 

দিনশেষে সাবলীল তন্দ্রাচ্ছন্ন ক্লান্তিতে |

এক লহমায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল

উজাড় করা ভালোবাসার নিবেদন ,

কখনো ঝিরঝিরে ,কখনও বা মুষলধারে বৃষ্টি |

বৃষ্টির ধারাবারি জমেছে বিস্মৃত না হওয়া অতীতের ভাঁজে ভাঁজ |

চোখের কোণ গড়িয়ে সিক্ত হল স্মৃতির অধ্যায় |

এখন আর গর্জন নেই, বর্ষণ নেই, 

শুধু নীলিমায় নীল শান্ত আকাশে নক্ষত্রের বন্যা |


...(সমাপ্ত)...

Sunday, September 25, 2022

পবিত্ৰ ভালোবাসা : ভালো থাকা-রাখার একমাত্ৰ মাধ্যম

ছবি : ইন্টারনেট

পবিত্ৰ ভালোবাসা : ভালো থাকা-রাখার একমাত্ৰ মাধ্যম

সন্দীপ ঘোষ

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের অবহেলা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে শারীরিক অত্যাচার জনিত খবর প্রায়শ'ই সংবাদের শিরোনামে উঠে আসে | ঘটনাগুলো খুবই দুঃখজনক বেদনাদায়ক | কোনো কোনো ঘটনা আবার এমন মর্মান্তিক যে হৃদয় মোচড় দিয়ে ওঠে | যারা এই ধরনের অমানবিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত , তাদেরকে ধিক্কার | তবুও এধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে | শুধু আইন আদালত দিয়ে কি দমন করা সম্ভব ? সমাজ যেটা চোখে দ্যাখে কিম্বা শোনে তাই দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ অন্তে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় | তাতে ভূল বোঝাবুঝির পারদ বেড়ে গিয়ে অশান্তি চরমে ওঠে | সমস্যা গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে | সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠে আসা স্বাভাবিক নয় কি ?

        যাইহোক সে প্রশ্নে যাচ্ছি না |  যথাযোগ্য স্থানে আমার প্রণাম , বিনম্র শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে বলি যে , যে ঘটনা গুলো ঘটছে তার পিছনে যে অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখিনা | আমরা বলে থাকি মা-বাবার প্রতি এরকম ঘটনা কখনো কাম্য নয় | জ্ঞানের থলি থেকে কিছু কিছু উপহার দিয়ে দায় সারি | আর সেইসঙ্গে অভিযুক্ত সন্তানকে দুষতে থাকি | শহুরে শিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত সমাজের কিয়দ্ অংশে মা-বাবা বনাম সন্তানের দ্বন্দ্বের চিত্র দেখতে পাওয়া যায় | তাহলে কি মানবিক মূল্যবোধগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ? উপায় কি ? বিশ্বায়নের যুগে গ্রাম্যসমাজ এখনও পিছিয়ে | কুসংস্কারমুক্ত হতে পারেনি তারা | যদিও গ্রাম্যসমাজের ব্যপ্তি বিশাল | তার সবটার কথা বলছি না | বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সমাজের একটা বৃহদ্ অংশে কুসংস্কারের প্রয়োগ বেশি লক্ষ্য করা যায় | অশিক্ষা, অজ্ঞানতাকে দায়ী করা হয়ে থাকে | যেমন কিছু ঘটনা উল্লেখ করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে | এখনও প্রতিবেশি- আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে মিষ্টি বিতরণ করা হয়ে থাকে বাড়িতে  পুত্র সন্তান জন্মালে | মিষ্টি বিতরণ খুবই আনন্দের খবর কিন্তু পুত্ৰ-কন্যা বৈষম্যকে ঘিরে কেন ? কন্যার বেলায় নয় কেন ? এটাকে আমার সংকীর্ণ মানসিকতা বলেই বোধ হয় | এই সংকীর্ণ পরিসরে বড় হওয়া পুত্রসন্তানটি আগামীদিনে  সংকীর্ণ মানসিকতার ধারক-বাহক হয়ে উঠবে না কে বলতে পারে ! কারণ এই বোধটা তার কাছে স্বাভাবিক | মেয়েদেরকে শুধু মেয়ে বলেই ভাবতে শিখবে , মানুষ বলে ভাবতে পারবে না | সুতরাং তার দ্বারা কোনো অনিষ্ট হলে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যাইহোক না কেন , বিচারে তার শাস্তি হয় | শাস্তি পাওয়ায় সে হয়ত বুঝবে তার অন্যায় হয়েছে | কিন্তু মানুষ যে কোনোদিন ভাবতে পারেনি, শুধু মেয়ে বলেই ভেবে এসেছে এটা সে কখনো বুঝতে পারবে কি ? আবার সব  মা-বাবাই চান তাদের সন্তান মানুষের মত মানুষ হোক | কিন্তু চাইলেই যে হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই | কারণ আমরা সন্তানদের মধ্যে আমাদের আন্তরিকতা, স্নেহ ভালোবাসা, একশো শতাংশ উজাড় করে দিতে পারিনা | চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কোনো না কোনো সময়ে মনের গভীর সুপ্ত বাসনা বোধ স্বার্থের স্বরূপকে বিকশিত করে | আর স্বার্থ মানেই একটি অলিখিত অনুভূতিহীন মনের দূরত্ব তৈরী হয়ে যায় সন্তানের সঙ্গে | অর্থাত্ এইরকম যে সন্তান বড় হোক কিম্বা ছোট, সে  যদি কোন অন্যায় করে তাকে প্রশয় না দিয়ে তারই স্বার্থে করা উচিত খুবই তীক্ষ্ণ শাসন  | অথচ সেই শাসনের ভিতরে থাকবে আন্তরিকতা, স্নেহ,মায়া, মমতা ও ভালোবাসার প্রাণের আলোর  মেলবন্ধনে নিবিষ্ট পথনির্দেশিকা | তাহলে সেই শাসন সন্তানের বুক স্পর্শ করে তার চেতনার উদ্রেক ঘটাবে | আবার আমরা সন্তানকে শাসন করতে গিয়ে কখনও কখনও ভুল শাসন করে ফেলি | যদি সন্তানের কাছে এই ভূলটা সাবলীলভাবে স্বীকার করে নিতে পারি, তাহলে সন্তানের অন্তরে সহজ বোধের দ্বার উন্মুক্ত হবে | বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আমরা তা পারিনা | দিনের পর দিন বা একটানা চলতে থাকলে একটা সময় সংঘাত অনিবার্য রূপে প্রকট হয়ে উঠে | সন্তানকে দেশ ও দশের একজন করে গড়ে তোলার মানসিকতাই আমাদের নেই | মা-বাবা হিসেবে আমরা শুধু বুঝি নিজের স্বার্থটা | সন্তানের সাফল্যে অন্তরে মাত্রাছাড়া অহংকার | চোখে দেখে বোঝার উপায় নেই | তবে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকলে অন্ধকারের হদিশ পাওয়া যায় |

         আমাদের কামনা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বয়সে সন্তান বিশেষ করে পুত্র সন্তান আমাদের দেখভাল করবে , আমরা ভাল থাকব | সন্তানকে মানুষ করতে হবে | নিজ স্বার্থ চরিতার্থে অন্তঃস্থলে গভীর এক সুপ্ত বাসনার সত্ত্বা তৈরী হয় | আমৃত্যূ এই মোহ সুস্থ থাকার পথকে কাঁটার মতো বিঁধে চলে | বলাইবাহুল্য যে এই মায়ামোহ-র পর্দা সুখের আলোকে আটকে দেয় | আমরা বুঝতেও পারিনা | সুতরাং বলা যেতে পারে এটি একটি মারাত্মক স্বার্থচিন্তা | এর কুপ্রভাব নিষ্পাপ সন্তানের উপর পড়ে | আগেই বলেছি এগুলো একদিনে ঘটেনা | এছাড়াও আমরা যেটা পারি না, সন্তানের জন্ম থেকে শৈশব, কৈশোরে স্নেহ-ভালোবাসা-মমত্ববোধ যে প্রকৃতির থাকে যুবক বয়সে কোথা দিয়ে যেন সেই প্রকৃতির ওপর শুষ্কতা গ্রাস করে | অর্থাত্ অবাঞ্ছিত এক ভাবনা ঘাটি গেড়ে বসে | সন্তান আর ছোটটি নেই বড় হয়ে গেছে | প্রতিষ্ঠিত হয়েছে | এবার বিয়ে দিলেই আমাদের দায় সম্পূর্ণ | কেউ আমার সঙ্গে একমত হবেন কিনা জানিনা তবে আমি মনে করি এখান থেকেই  সাংসারিক সংঘাতের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়ে যায়

          জন্ম হওয়ার পর দুধের শিশু বা সদ্যোজাত শিশু সন্তানটির প্রতি যে গভীর অনুভুতি অন্তরে বিরাজ করে সেটা আমরা অন্তরে ধরে রাখতে পারি না সন্তানটির পরিণত বয়সে | সন্তান যতই ধারেভারে বড় হোক না কেন সে তো সন্তান | ব্যক্তিত্বের ভারসাম্য বজায় রেখে অন্তরের আবেগিক স্নেহভরা প্রাণোচ্ছল অনুভুতি দিয়ে আচরণ করা যেতেই পারে | কিন্তু দেখা যায় যে বার্ধক্যে পৌঁছে দীর্ঘদিনের লালিত স্বার্থ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে | তাই ছেলে- বৌমার প্রতি সজাগ মানসিকতা থেকে একটি অভিমান বোধ তৈরী হয় | জ্ঞানে বা অজ্ঞানে হোক সংসারে কোনপ্রকার অপছন্দের ঘটনা বা অনিয়ম ঘটলেই দোষারোপ বর্ষিত হতে থাকে সন্তানের উপর বিশেষতঃ বৌমার উপরে | যদি বলা হয় সন্তানতো ভূল হয়ে গেছে |  ক্ষমা করে দিলেই তো মিটে যায় | না ক্ষমা নয়,  আমরা বলি যে ছেলে- বৌমা শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত ,অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছি এই প্রতিদান পাব বলে ! আবারও বলছি দীর্ঘ সময় ধরে ঘটে চলা সংসারে একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি বা নতুন কোন ঘটনার সন্মুখীন হলে সাংসারিক অশান্তি প্রকটরূপে দেখা দেয় যা কখনো কাম্য নয় | মূল কথা হচ্ছে গোড়াতেই গন্ডগোল | সংসারের প্রতিটি সদস্যের একে অন্যের প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসার অভাব সাংসারিক-পারিবারিক সম্পর্ককে ভিখিরি বানিয়ে দেয় | আজ যা আমরা নিত্যনৈমিত্তিক চাক্ষুস করে চলেছি | এখন তো বেশিরভাগ মানুষ (পারিবারিক গন্ডীতে) নিজেকেই আগে বোঝে | অর্থের মানদন্ডে নিজেকে জাহির করে | জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই 'টাকা ছাড়া জীবনে কিছু নেই' এই দুরারোগ্য মানসিক ব্যাধি সমগ্র জীবনের ওপর রেখাপাত করে |  ফলে সুক্ষ্ম অনুভূতির জায়গা শুকিয়ে গিয়ে পরিস্থিতিকে অশান্ত করে তোলে | কখনও কখনও অপরাধের ঘটনা প্রত্যক্ষ করি |

অপরাধের সাজা আইন দেবে | এতে অপরাধী একদিন মুক্তি পাবে বা হয়ত পাবেনা | সেটা আইন-আদালত, বিচার্য বিষয় | কিন্তু  'অপরাধ' মুক্তি পাবে কি ? অপরাধ নিয়ে কেউ আসে না পৃথিবীতে | পারিপার্শ্বিক, পারিবারিক,সামাজিক অবস্থার আবহে  জন্মের পর কোনো শিশু বেড়ে ওঠে |  সেই সময়কাল প্রতিটি জীবনের ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ | প্রতিটি শিশুর সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে পরম আন্তরিকতা স্নেহভালোবাসায় যদি ভরিয়ে তুলতে পারে বাবা-মা সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা তাহলে সেই শিশুটির পর্যাপ্ত মানসিক বিকাশ তৈরী হবে | সর্বোপরি পরিবারটিকে হতে হবে অহংকারমুক্ত, নিঃস্বার্থ নিষ্কাম কর্মযুক্ত আন্তরিক,সহানুভূতিশীল | অর্থাত্ আত্মকেন্দ্রিকতা ও আমিত্ব মুক্ত পারিবারিক পরিবেশ |  জীবনে ঝড়ঝঞ্ঝার মতো বাধাবিপত্তি আসতেই পারে | সেগুলোকে তাত্ক্ষণিক ভাবে সন্তানকে মোকাবিলা করার শক্তিটুকু সংগ্রহ করার সুযোগ দিতে সুস্থ পারিবারিক পরিবেশের কোনো বিকল্প হয় না | এক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন উঠে আসা স্বাভাবিক যে, তাহলে কি সন্তান শাসনমুক্ত থাকবে ? না না তা কেন ! ছেলেমেয়েরা বড়হোক বা ছোট, শাসনের গন্ডির মধ্যে অবশ্যই থাকবে তবে সে শাসন হবে নিঃস্বার্থ, আন্তরিকতাপূর্ণ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ | যা সন্তানের হৃদয় স্পর্শ করবে এবং তার ঠিক-ভুল বিচারবোধ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে মা-বাবার শাসনকে সন্মান জানিয়ে | এক অটুট মেলবন্ধন তৈরী হবে যা জীবনের পরবর্তী প্রতিটি পর্যায়ে পারস্পরিক সুসম্পর্কের চেতনালব্ধ পথকে প্রশস্ত করবে |

...(সমাপ্ত)...


Monday, August 15, 2022

আত্মীয়তা

ছবি : ইন্টারনেট
আত্মীয়তা 
সন্দীপ ঘোষ 

-------"কবে যাচ্ছ দিদির বাড়ী ?" করণিক স্বামী শান্তনু জানতে চায় |
-------" বিয়ের আগের দিন" | খুব নীচু গলায় জানায় হাইস্কুলের শিক্ষিকা স্ত্রী অন্তরা |
-------" কেন বিয়ের দিন গেলে ওদের কি অসুবিধে হবে শুনি ?"
-------" লোকে কত নিন্দেমন্দ করবে, বলবে মিতুলের একটা মাত্র মাসী , বিয়ের দিনেই আসতে হোল !"
--------" যা-ব্বাবা, লোকে নিন্দেমন্দ করবে ! নাকি তোমার মনে উত্ফুল্লের ফোয়ারা ছুটছে | আমিতো বেশ বুঝতে পারছি, তোমার মনপ্রাণ দিদির বাড়িতে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছো, এখন ফাঁকফোঁকর খুঁজছো দেহটাকে পাঠানোর | "
------" না -না তা কেন হবে ! তুমিও চলো না, রাতুলকে নিয়ে আমরা সবাই যাব |" নিজের দিদির ছেলের বিয়ে |  আগে না গেলে কেমন দেখায় তুমিই বলো না ?"  
ওদের একমাত্ৰ  ছেলে রাতুল ক্লাস সেভেনে পড়ে |
-------" বা-বা-বা, নিজেরটা বেশ বোঝোতো  | আমার দিদির ছেলের বিয়ে হলে যেতে না , তাই তো ?"
---------" ওহ্ --- আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল তো  |  আমি কি তাই বলেছি নাকি ? তোমাকেও তো যেতে বলেছে | আর তুমি তো না বলেছো | প্রয়োজনে দু'টো দিন ছুটিও নেওয়া যেতে পারে ! ওরা বার বার করে যেতে বলেছে , না গেলে চলে ! লোকাচার বলেও একটা কথা আছে | এটা তো মানবে নাকি ?"
------"ও--------ও ! এতক্ষণে বুঝলাম, শুধু লোকাচার করতে বোনপো'র বিয়েতে যেতে হবে ! শোনো, ঐ দিন আমার  গুরুত্বপূর্ণ অডিটের কাজ আছে |"
------ "এত বেশী বেশী কেন ভাবো বলতো ? সহজ করে ভাবা যায় না ?" 
------" সহজ না জটিল, সেটা তো ক্রমশঃ প্রকাশ্য ! তোমার আর তর সইছে না দেখছি, এক কাজ কর বিয়ের আগের দিন নয়, তুমি বরং কালই চলে যাও |  তোমার যা ফুর্তির তেজ ! অন্তরটায় যদি একটু আন্তরিকতা থাকত……"
--------" তার মানে তুমি ভালো, আর আমি খারাপ !"
-------" যাক, বুঝেছো তাহলে ! তা কি গিফট দিচ্ছ ? "
-------  "সোনার আংটি  |"
------- " দাম কত ?"
------- "দশ হাজার |"
-------" মা---ত্র দ-শ হা-জা-র ! 
-------" কেন,বেশি হয়ে গেল নাকি ?"
চুপ করে যায় শান্তনু | বিয়ের আগের দিন অন্তরা ছেলেকে নিয়ে বিয়ে বাড়িতে চলে যায় |
           প্রীতিভোজের অনুষ্ঠানে গিয়ে সন্ধ্যেবেলা পৌঁছয় শান্তনু | অন্তরা তাকে নতুন বৌয়ের কাছে নিয়ে যায় | শান্তনু পকেট থেকে বের করে পঞ্চাশ হাজারের একটি সোনার হার | দেখে চমকে ওঠে অন্তরা | তাত্ক্ষণিক বোবা বাকরুদ্ধ হয়ে যায় সে -- ক্ষণিকের স্তব্ধতা কাটিয়ে  স্বামীর কথায় নতুন বৌয়ের গলায় হার পরিয়ে দেয় | নিজের কেনা দশহাজারি  আংটিটা আর বের করার সাহস হয়নি অন্তরা'র | লোকে দেখে ফেলবে যে !
...(সমাপ্ত)...

Sunday, April 17, 2022

বিয়োগ

ছবি  : ইন্টারনেট 

বিয়োগ     

সন্দীপ ঘোষ

লালুর যখন পাঁচ বছর বয়স, দুরের নলকূপ থেকে জল আনতে গিয়ে  গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে হিটস্ট্রোকে মারা যায় তার মা | সেদিন কড়া রোদের জন্যই ছেলেকে নিয়ে যায়নি মা বন্দনা | ওদের বাড়িতে নলকূপ কিম্বা কুয়ো কোনটাই নেই | স্নানের জন্য আশেপাশে কোন পুকুরও নেই | এক কিমির বেশি দুরে জমির আল বেয়ে পৌঁছতে হয় জমির মাঝে অবস্থিত পুকুরে | আর মাত্র বিঘা কয়েক জমিই  তাদের সংসারের মূল চালিকাশক্তি | কখনো-সখনো নুন আনতে পান্তা ফুরনোর মতো অবস্থা হয় | সেখানে নিজস্ব নলকূপ বা কুয়ো মানে তো বিলাসিতা |

   যাইহোক ছোট্টলালুর কচিমনে এইসব জটিল ভাবনা না আসাই স্বাভাবিক | মা মা গন্ধে ভরে থাকত ছোট্ট একচিলতে ঘরটা | মা যখন অন্য কাজে বা রান্না ঘরে ব্যস্ত থাকত  তখন সেই গন্ধের আমেজ নিয়ে নানাপ্রকার খেলায় মেতে থাকত | দুপুরে কড়া রোদ আর প্রচন্ড গরম | ঘন কালো মেঘ করে উঠত কালবৈশাখীর ঝড় | সেই ঝড়ে আম পড়ত, আর সমস্ত বাচ্চারা আম কুড়োনের নেশায় ছুট লাগাত গ্রামের আমবাগানে | ছেলেকে নিয়ে যেতে চাইত না বন্দনা | তা ছেলে শুনবে কেন ? কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পেছন পেছন ছুটত আম কুড়োতে | শেষে মনে হোত কালবৈশাখী যেন কিছু আম পেড়ে দেবার জন্যই এসেছিল | বৃষ্টি হত না | যদি বা হত, কয়েক ফোঁটা প'ড়ে গরমকে আরো অসহিষ্ণু করে তুলত |

চাষীবাসী মানুষ লালুর বাবা পরিমল | তার মাথায় হাত !! সব্জি  লাগিয়েছে ক্ষেতে , কিন্তু গরম আর খরার জন্য জলের অভাবে সব্জি নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে | তার হাহাকার লেগেছে জলের জন্য | প্রতিবেশি বনিকদের কাছে পাম্পের জল চেয়েছিল | ইলেকট্রিকের দামও দেবে বলেছিল | তবুও দেয় নি | লালুর বাবা তো গরীব, কি জানি কোত্থেকে টাকা দেবে এই ভয়ে ওরা জল দিতে চায় নি | তাই কালবৈশাখীর ঘন কুচকুচে কালো মেঘ দেখে পরিমলের খুব আনন্দ হয়েছিল | এক দৌড়ে বাড়ি এসেছিল ক্ষেত থেকে | বাড়ি ফিরে মা-ছেলেকে দেখতে না পেয়ে মাথায় ভীষণ রাগ উঠেছিল পরিমলের | আসলে ওদেরও দিতে চেয়েছিল এই আনন্দের ভাগ | কিছুক্ষণ পরেই ফিরেছিল মা-ছেলে, সঙ্গে এক ঝুড়ি কাঁচা আম | কমতে শুরু করেছিল ঝড়ের গতি | কিন্তু শান্ত পরিমল  হঠাত্ কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল | আছড়ে দিয়েছিল দড়ির খাট আর আমের ঝুড়িটাকে | তারপর রাগের ঝাঁজ ছাড়তে ছাড়তে বলেছিল; -----"ছেলেকে লিয়ে ঝড়ের মইধ্যে আম খেতে গেইছলে ? আম খেলেই হবেক আর ঘরে কোন কাজ নাই ?" ছোট্ট লালু ফ্যাল ফ্যাল করে দেখতে থাকে একবার বাবা, একবার মাকে | তার আমকুড়ানোর আনন্দটা ভিতর থেকে কেউ যেন চিমটে দিয়ে টেনে বের করে নেয় | তার মা বন্দনা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে সমানে কাঁদতে থাকে | আকাশে মেঘ কেটে গিয়ে গোধুলীবেলার বিকেল যেন আরোও সুন্দর করে সেজে উঠল | মনের ইচ্ছে, আশা সবসময় তো পূরণ হয় না | পরিমলের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্ৰম নয় | তার রাগের পারদ চড়চড়িয়ে বেড়ে চলেছে | স্বামীর অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে কান্না থামিয়ে নম্রভাবে বন্দনা বলেছে ; ------ "কাইলকে আমগুলা বাজারে লিয়ে যাবে, দেইখবে ভালো দাম পাবে | শুভার মা বইলছিল কাঁচা আমের দাম এখন পায় চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা কেজি |" কথাটা যে মন্দ বলেনি বউ, বাজারে গিয়ে বুঝতে পারে পরিমল | দশকেজি আমের পুরোটাই বিক্রি ক'রে ,সেই পয়সা থেকে বনিকদের বিদ্যুতের দাম দিয়ে সব্জিক্ষেতে সেচের কাজ সম্পন্ন করেছিল | গরমে অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ক্রমশঃ শরীর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল পরিমলের |

      বন্দনার চাপে একপ্রকার বাধ্য হয়ে ডাক্তার দেখায় পরিমল । প্রখর রোদে কাজ করতে বারণ করেছিলেন  ডাক্তারবাবু। কিন্তু গরমের প্রাবল্য থাকলেও কাজ না করলে খাবার জুটবে কি করে ! লালুকে বড় করে তুলবে কিভাবে ! মাথার যন্ত্রণা সহ ঘর্মাক্ত - ক্লান্ত শরীরে চাষের কাজে সময় দিতেই হয় | যাইহোক বর্ষার আগমনে নিজেকে সামলে নিয়েছিল । তবে সেবারের গরমে যে বউটাকে হারাতে হবে স্বপ্নেও ভাবেনি সে ।

    লালু জানে-- মা ঐ নীল আকাশের দেশে ঘুমিয়ে আছে । ঘুম ভাঙলেই কাছে আসবে, তার সঙ্গে কথা বলবে , নতুন নতুন গল্প বলবে । আর নিয়ে যাবে আমবাগানে । জীবন মৃত্যুর জটিল চক্রব্যুহ তার শিশুমনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি । দিন একটু একটু করে এগোতেই মায়ের অনুপস্থিতির কারণ উপলব্ধি করেছিল । মায়ের গন্ধ মায়ের স্পর্শের অভাবে হঠাৎ হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠতো ছোট্ট লালু । ও চোখের সামনে ছবির মতো দেখতে পায় মাতৃ আনন্দের সুখের মুহূৰ্ত | ------"মা, ওমা তালগাছে ঐ হাড়িগুলা টাঙ্গানো কেনে মা ?" মা এর আন্তরিক সরল উত্তর ; ------ "এখন ত গরমের সময় বাবা, তাই মহল মোক্তার চাচা তালরসের জন্যি হাড়িগুলা টেঙ্গেচে | তারপরে রসের হাড়িগুলা  পেড়ে বড় ডেকে করে ফুটিয়ে  তালপাটালি বানাবেক |" পরেরদিন লালু তার বাবার সঙ্গে গিয়েছিল মহল মোক্তার চাচার বাড়ি | তালপাটালি, তালের গুড়, তালের রস খেয়ে এসেছে | মায়ের জন্য আনতে ভোলেনি সে | বাবাকে বলেছিল কচি গলায় মিষ্টি সুরে ; ---- "বাবা-বাবা মায়ের জন্যি লিতে হবেক কিন্তু |" ও!! সে যে কি আনন্দ !! সেই সব ঘটনা লালুর স্মৃতির পাতায় আজও অঙ্কিত |

      আজ আট বছরের লালু | অনেকটাই জ্ঞান হয়েছে তার | মায়ের বিয়োগব্যাথা পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি | মনে হলেই অদৃশ্য এক চাবুক যেন তার সারাশরীরে বসিয়ে যায় | মায়ের অভাব তার পড়াশোনাতেও থাবা বসিয়েছে | মায়ের শুনে শুনে দশ-এর ঘর অব্দি ঝরঝরে নামতা মুখস্ত করে ফেলেছিল | বাবার তো সকাল হলেই দুমুঠো অন্নের চিন্তা | পড়াশোনাটা অল্প জানলেও ছেলেকে নিয়ে বসার তেমন ফুরসত্ মেলেনা | গ্রামেরই বেকার  ছেলে জয়দেব স্নাতক হওয়ার পর গ্রামেরই প্রাইমারী পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনায় সাহায্য করে | বিনিময় অতি যত্সামান্য অর্থে | মা বন্দনা চলে যাবার পর ওখানেই পড়াশোনার ঠাই হয়েছে লালুর |

            এবারে বসন্ত এখনও বিদায় নেয় নি | ভরা বসন্তেও রোদের যে তাপ তাতে অস্বস্তি বেড়েছে সকলের | বাদ যায়নি লালু ও বিশেষ করে লালু'র বাবা | গরম সহ্য করতেই পারে না | বসন্তের বিদায়বেলায় এল সেই সুসংবাদ | লালুর মামা এসেছে লালুদের নিতে | মামা বাড়ির গ্রামে যে গাজন পরব | পরদিন সকালবেলা মামার হাত ধরে লালু পাড়ি দিল মামার বাড়ি গাজন পরবের আনন্দ নিতে | বাবাকেও নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল সে | ক্ষেতের কিছু কাজ পড়ে আছে , সেগুলো তো না সারলেই নয় | পরিমল নববর্ষের দিন যাওয়ার কথা বলে শান্ত করে লালুকে | গাজন উত্সব আর হৈ-হুল্লোড়ে মেতে বেশ কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিল লালু  তার মামাতো ভাইবোনেদের সঙ্গে | তবুও কোথায় যেন একটা, এক এক সময় কি যেন নেই--- মনটাকে ব্যাকুল করে তোলে | আর তার পরমুহূর্তেই মায়ের ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে | ছোট্ট ছেলেটা ঝরঝর করে কাঁদে  আড়ালে | মাঝে মঝে এই চাপা কষ্টটা যেন ভেতরটাকে মুচড়ে দেয় |

ভীষণ কড়া রোদ উপেক্ষা করে তাকে নিতে আসে তার বাবা | মামাবাড়ির প্রচুর আনন্দ , মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে খেলাধুলা করে যে আনন্দ , এসবই তার কাছে ম্লান | মায়ের কোল, মায়ের আদর, সবটাজুড়ে যে জগত্ তার ছিল, আজ মায়ের অভাবে মনটা সর্বক্ষণ খাঁ খাঁ করতে থাকে |

        বেলার দিকে রোদের তাপ বেড়ে যাবে , তাই লালু ও তার বাবা ভোর পাঁচটার বাস ধরে বেরিয়ে পড়েছে বাড়ির উদ্দেশ্যে | এত ভোরেও বসার কোনো সিট নেই | বাসে খুব ভীড় আর তেমনি ভ্যাপসা গরম | ভিড়ের চাপে একপ্রকার পেষাই হওয়ার অবস্থা | লালু সিটের রড শক্ত করে চেপে ধরে উপরের দিকে তাকায় | দেখে বাবা কেমন যেন করছে | অনুভূতিটা তার কচিমনে বিদ্যুত তরঙ্গের মতো হৃদয়ে পৌঁছে মনটাকে ব্যকুল করে তোলে | যে সিটের পাশে ওরা দাঁড়িয়েছিল ঐ সিটের জানলার পাশে বসা ভদ্রলোক লালুর বাবা পরিমলকে বলে ওঠেন ; -------" মনে হচ্ছে আপনার শরীর অসুস্থ, আপনি এই সিটে বসুন | আমি পরের স্টপেজে নামব |" ভদ্রলোক সিট ছেড়ে উঠে পড়েন | পরিমলকে জানলার পাশে বসিয়ে দেন | পরিমল ছেলেকে কোলে বসার জন্য হাত ধরে টানতেই , লালু কেঁদে ওঠে | কাঁদতে কাঁদতে বলে ; ------" ও বাবা-- তুমি একাই বসিয়, তুমার শরীর খারাপ, আমি দাড়ায় যেতে পারব |" অগত্যা পরিমল সিটে হেলান  দিয়ে শরীরটাকে এলিয়ে দেয় | সকালের ঠান্ডা হাওয়ায় পরিমলের দেহ-মন চাঙা হয়েছে অনেকটা | পাশের জন সিট ছাড়তেই ছেলেকে কাছে বসিয়ে নেয় | কিন্তু এই সুখ তাদের সইল না বেশিক্ষণ | কিছুদুর যাওয়ার পর বাস খারাপ হয়ে যায় |

       বাস সারাই হতে হতে ঘন্টা দুই-আড়াই লেগে গেল | তারপর বাস যখন ওদের স্টপেজে নামিয়ে দিয়ে গেল তখন ঘড়ির কাটা প্রায়  দশটা ছুঁই ছুঁই | রোদঝলমলে পরিস্কার আকাশ | রোদের তাপ চড়চড়িয়ে বেড়ে চলেছে | স্টপেজ থেকে ওদের বাড়ি হাঁটাপথ প্রায় চার কিলোমিটারেরও বেশি | কিছুটা হাঁটার পর পরিমল আবার অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে | এইভাবে কিছুদর চলার পর বাবা-ছেলে  বিশ্রাম নেবার জন্য বসে পড়ে  রাস্তার ধারে থাকা বটগাছের নীচে | লালুর মামীর দেওয়া দু'বোতল জলের কিছুটা ছিল, পুরোটাই শেষ করে ফেলে বাবা-ছেলে | তারপর গামছা মেলে শুয়ে পড়ে পরিমল | বেশ খানিকক্ষণ কেটে যায় | পরিমলের শারীরিক অবস্থার ক্রমশঃ অবনতির দিকে | ছোট্ট লালু বাবাকে ডাকে | কি যেন বলতে চায় পরিমল, পারছে না জড়িয়ে যাচ্ছে | বাবার গোঙানি ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারে না লালু | বাস থেকে নেমে আসার পথে যদিবা দু'একজন লোকের দেখা মিলেছিল, এখন এই তপ্তরোদে পথঘাট একেবারে জনশুন্য | কি করবে লালু ! ছোট্ট লালু অসহায় | একবার বাবার কাছে যায়, আবার অস্থির হয়ে রাস্তার এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে কেউ আসছে কিনা ! তীব্র ব্যাকুল হয়ে ওঠে, এরপর কেঁদে ওঠে হাউ হাউ করে | বাবা বাবা বলে চিত্কার করে ডাকতে থাকে | পরিমল ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলের ডাকে সাড়া দেবার চেষ্টা করে | কিন্তু ব্যৰ্থ হয় | মুখটা হা করে পরিমল, হয়ত কিছু বলতে চায় | লালু মাথা ঝুঁকিয়ে বুঝবার চেষ্টা করে | অতিকষ্টে বাবার মুখে উচ্চারিত "জ---অ----অ----অ---ল"  শব্দটি শুনে সঙ্গে সঙ্গে জলের বোতল দুটোকে তুলে ধরে | নাহ ! কোনটাতেই তো জল নেই | লালু জলের জন্য ছটপট করতে থাকে | দেখতে পায় প্রায় এক কিমি দুরে জমিতে জলসেচের জন্য পাম্পমেশিনে  করে জল তোলা হচ্ছে | লালু দৌড়ে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই জল নিয়ে ফিরে আসে | ততক্ষণে পরিমল জলের কষ্ট থেকে নিজেকে মুক্ত করে ছেলেকে ছেড়ে অন্যলোকে পাড়ি দিয়েছে |" ----- "ও-বাবা,বাবা গো বাবা জল লিয়াইচি ,এই লাউ জল খাও |"  বাবার কোন আওয়াজ না পেয়ে লালু আরও অস্থির হয়ে ওঠে | ----- " ঘুমি গ্যালে ? জল খাবেনি ?" ছোট্ট দু'হাতে সযত্নে ধরা জলের বোতল তুলে বলে; এই ত জলের বতুল , লাউ জল খাও |" চির ঘুমের দেশ থেকে তার বাবার আর যে কোন ফেরার পথ নেই , সদ্য অনাথ লালুর কচি মনে জাগতে জাগতে হয়ত অনেকটা সময় পার হয়ে যাবে |

...(সমাপ্ত)...


Wednesday, January 12, 2022

ভাঙাগড়া

ছবি  : ইন্টারনেট 

 ভাঙাগড়া

 সন্দীপ ঘোষ


দক্ষিণের ব্যালকনির একপাশে একটি চেয়ার নিয়ে গিয়ে বসলেন সত্তরোর্ধ বিধবা মণিমালা  | বিগত পাঁচ বছর ধরে একাই এই বাড়িটিতে বাস করছেন |  তবে মাঝে মাঝে এসে থাকে বোনঝি রূপা | প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের বাড়ি | প্রতিটি দেওয়াল, পিলারে ভালোবাসার চিহ্ন খুঁজে পান মণিমালা  | কোথাও ফেটে যাওয়া নেই, কিম্বা পলেস্তারা খসে পড়া নেই, নেই রড বেরিয়ে ভেঙে  যাওয়া ছাদের অংশ | বাড়িটি অনেক খরচ ক'রে প্রাণঢালা ভালোবাসায় এই দোতলা বাড়িটি গড়ে তুলেছেন অধ্যাপক স্বামী সীতাংশু সামন্ত | স্ত্রী মণিমালা আপত্তি করেছেন, শোনেন নি | শুধু বলতেন ;

------ 'গঠনমূলক কোনো কাজে অপার ভালোবাসা প্রয়োজন, আর ভালোবাসলে খরচ তো একটু হবেই তাই না ! এই যেমন, তোমায় আমি খুব ভালোবাসি, আর তোমায় আমার ঘরের লক্ষ্মী করার জন্য বিয়ের আগে বেশ খরচ করেছি | তবেই না লক্ষ্মী এসেছে আমার ঘরে |'

------ 'থাক থাক, অনেক হয়েছে আর আদিখ্যেতা করতে হবে না |' আদুরে গলায় জানিয়েছেন মণিমালা | এসব অনেক আগের কথা |

     ছেলেমেয়ে দুটো প্রতিষ্ঠিত, সংসারী- যে যার নিজের কর্মস্থলে থাকে | ওদের বাবা বেঁচে থাকতে প্রায়ই দেখতে আসত | বাড়িটা যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠত | হৈ-হট্টগোল, চিত্কার-চেঁচামেচি, নাতি-নাতনিদের আবদার----- এসবের মাঝে কখন যে দিন পার হয়ে যেত বুঝতেই পারতেন না মণিমালা  | স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে এখন আর কেউ তেমন ভাবে আসেনা | এলেও সেই প্রাণের ফোয়ারা নেই | জীবনটাকে যেন মনে হয় শুকিয়ে যাওয়া কাঠের মতো একটা বস্তু | হয়ত, ওদের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার জায়গায় কোথাও খামতি ছিল, নিঃস্বার্থ স্নেহ-ভালোবাসার জায়গাটা আত্মস্বার্থে ডুবেছিল | তাই হয়ত সন্তানদের প্রতি মাতৃত্বের যে নাড়ীর টান, ওদের হৃদয়ে অনুভূতির সঞ্চার ঘটায়নি | সীতাংশু বার বার বলতেন;

-----  "ছেলে-মেয়েরা বড় হচ্ছে তো ওদের সুখ-দুঃখ,ভালো-মন্দের দিকটা আমাদের খেয়াল রাখা ভীষণ দরকার |"

না সে সব তোয়াক্কা করেন নি মণিমালা , আত্মীয়স্বজন, পার্টি, নানা- অনুষ্ঠানে নিজেকে ব্যস্ত রেখে সারাটাদিন পার করে দিতেন |  এসব ভাবতে ভাবতে দু'চোখের কোন চিক্ চিক্ করে ওঠে তাঁর |


       বিকেল গড়িয়ে গোধূলীর পূর্ব মুহূর্তে 'মাসি-মাসি' ডাকে চোখ মুছতে মুছতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান মণিমালা |

--------"রূপা, তোর হয়ে গেছে মা ? চলে যাচ্ছিস ?"

--------" হ্যাঁ মাসি, আজকে দুধওয়ালা আসেনি | রুটি-তড়কা বানিয়েছি, টেবিলে রাখা আছে খেয়ে নিও |"


রূপা মণিমালার ছোটবোন বনমালার মেয়ে | রূপার বাবা জীবিত , তবে মা মারা যান রূপার বিয়ের ঠিক দু'বছরের মাথায় | রূপাদের পরিবারে কোনোদিনই স্বচ্ছলতা ছিল না | আর  একপ্রকার অভাবের কারণেই তার পড়াশুনা আটকে যায় | শুধু তাই নয় গ্রাম থেকে স্কুলের দূরত্ব বেশি হওয়ায়  এবং যোগাযোগ তেমন না থাকায়  স্কুলের গন্ডি পেরোয় নি সে | কয়েক বিঘা জমিতে চাষ আবাদ করে রূপা'র মা-বাবার সংসার টেনেটুনে চলে যেত | ধীরে ধীরে রূপাও বিয়ের বয়স পার করে ফেলে | হন্যে হয়ে পাত্র খোঁজাখুজি শুরু করে রূপার বাবা | কিন্তু না ! কিন্তু সবক্ষেত্রেই রূপার উপযুক্ত পাত্র পেলেও বরপণ হিসেবে মোটাটাকা দাবী করে বসে পাত্রপক্ষ | অভাবে বিয়ে আটকে যায় | কিন্তু সেই সময় পাশে এসে দাঁড়ান রূপার মেসোমশাই সীতাংশু | তিনি তার ছেলেবেলার বন্ধু 'অখিলেশ পাল'-এর ছোট ছেলে 'তপন'-এর সঙ্গে রূপার বিবাহের বন্দোবস্ত করেন | কিন্তু এতে একেবারে সন্মতি ছিল না মণিমালার | তার শুধু এক কথা ;

------ ওরা ওদেরটা বুঝুক না ! তোমার এত কিসের দায় ?"

সীতাংশু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, তারপর শান্ত গলায় স্মিতহাস্যে বলেন;

-------" সকল মানবজাতির এই ধরাধামে একটাই তো কাজ, প্রকৃতি ও তার জীবকুলের সেবা করা | এটা তো আমার একটা ক্ষুদ্ৰ প্রচেষ্টা মাত্র | আর এমন সুযোগ হাতছাড়া করা কি চলে ? কী বলো ?" 

------- "অনেকদিন ধরে দেখে আসছি তোমার সবকিছুতেই কীরকম যেন একটা  বাড়াবাড়ি ! ভাল্ লাগে না আমার | বন্ধ করো এসব |" অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে একনাগাড়ে কথাগলো বলে ফেলেন মণিমালা | তবে মণিমালা ভালোমতই বোঝেন তার এই নিষেধাজ্ঞা কোনোদিন ধোপে টিকে নি আর আজও টিকবে না | বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল রূপার, পেশায় অনলাইন বিজনেসম্যান তপনের সঙ্গে | তার কী উপহার দেওয়া হবে এই নিয়েও মণিমালা ও সীতাংশু'র মধ্য একপ্রস্থ ঠান্ডা লড়াই হয় | কিছুতেই কোনো দামী বস্তু প্রেজেন্ট করতে চান না মণিমালা | সীতাংশু ঠিক তার বিপরীত | শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত অমীমাংসিত থেকে যায় | আর সেইসময় সস্ত্রীক দু'জনেই ছিলেন বাড়িতে | বিয়ের ঠিক আগেরদিন রাত্রে দু'জনের কারোমুখে কোনো কথা নেই | ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা কিম্বা আড়চোখে দেখা ইত্যাদি কান্ডকারখানা নিঃশব্দে- নীরবে করে চলেছেন | সীতাংশু মুচকি হাসি হেসে শুয়ে পড়লেন চুপচাপ | তিনি তার স্ত্রীকে বেশ বোঝেন | মণিমালার ধৈর্য্য আর কতক্ষণ ! সীতাংশুই ঠিক-- মণিমালা আর চুপচাপ থাকতে না পেরে গলাটা একটু ভারী করে বললেন; ------" কই বললে না তো কি ঠিক করলে ?"

সীতাংশু যা ভেবেছিলেন , ঠিক তাই ঘটল, উঠে বসে বললেন নির্লিপ্ত ভাবে ;

-------" কী বলতো,  কি ঠিক করতে হবে ?"

তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন মণিমালা | ঝাঁঝিয়ে বললেন ;

-------"ন্যাকামো হচ্ছে না ! রূপার বিয়ের প্রেজেন্টেশন নিয়ে কথা বলছি |"

------" ওহ্ হো , এই দ্যাখো , আমি না সত্যিই ভূলে গেছি | আচ্ছা বেশ বেশ, তা তুমি কি ঠিক করেছো তাই বলোনা শুনি |"

--------" আমি একটা শাড়ি কিনেছি , রূপাকে দেব |"

মনে মনে ভাবলেন-- শুধু একটা শাড়ি ! অবশ্য এর থেকে আর বেশি কী--বা আশা করা যায় মণিমালার কাছে |

--------" কত দাম ?"

স্ত্রীর চটজলদি জবাব;

---------" বারশো টাকা |"

--------"বারো'শ্----শ টাকা !" বিস্মিত হন সীতাংশু ! এটা তিনি একদমই আশা করেন নি | তারপর ধীর গলায় আরো বলেন;

------- "মনে করো, রূপা তোমার আর একটা  মেয়ে | তার প্রতি তোমার একটা দায়িত্ব আছে | অবশ্য দায়িত্ববোধ অন্তরেরই মূল্যবান এক রত্ন | দামী রত্ন কি আর সহজে মেলে , কি বলো ?" 

মণিমালা ইলেকট্রিক শক্ খাওয়ার মতো আঘাতটা পেয়ে নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না | গর্জে ওঠে বললেন ;

-------" তা যাও না, রূপাদের বাড়িতেই যাও | তোমার যত রকমের সেন্টিমেন্ট আছে দেখাবে | তোমার অনেক নাম হবে, সুনাম হবে লোকে তোমাকে ধন্য ধন্য করবে | আরো কত কি হবে !"

--------"না, বলছিলাম যে, বোনঝির বিয়ে বলে কথা, সামান্য বারো'শ টাকার শাড়িতে কি হবে ? এর থেকে আরো ভালো কিছু দেওয়া যেতে পারে |"

না সেদিন আর কোনো কথা হয়নি | যে যার শুয়ে পড়েন |


রূপার বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দু'জনেই | সীতাংশু'র হাতে ওটা কি ? অনেকক্ষণ থেকে দেখছেন আর ভাবছেন | জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছে না | কিন্তু জানতে তো হবেই | কিছুক্ষণ উসখুস করার পর জানতে চাওয়ার আগেই সীতাংশু বলেন;

-------" চলো মণি, রূপার হাতে গিফট্ দিয়ে আসি |" হাত ধরে টেনে নিয়ে যান রূপার ঘরে | বিয়ের পিঁড়িতে বসার ঠিক কিছুক্ষণ আগের ঘটনা | ছোট্ট প্যাকিং করা দুটিবক্স দেখিয়ে বলেন ;

------"এটাতে আছে সোনার কানের দুল, আর এটাতে আছে গলার হার, নে মা, এগুলো তোর জন্য |"

মণিমালা সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়ে, আর চোখের ভাষা দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন | রূপার দৃষ্টি এড়ায়নি | সঙ্গে সঙ্গে সে বলে ; 

-------"থাক না মেসোমশাই |"

-------" না মা, এ তো তোকে নিতেই হবে | এ তো তোর মাসী-মেসোমশায়ের আশীর্বাদ |"

প্রণাম করে রূপা | সে তার বান্ধবীদের সামনে বিচলিত বোধ করে | মনে মনে কষ্ট পায় | কোথা থেকে যেন একটা অভিমানের পাহাড় তার মাথার উপরে চেপে বসে |


মৃত্যুর আগে মেসোমশাইকে  কথা দিয়েছে , মাসীর খেয়াল সে রাখবে |  মেসোমশায়ের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় খুব নিষ্ঠাভরে তার কর্তব্য  করে চলেছে | মণিমালা আজ উপলব্ধি করতে পেরেছেন | মেয়েটা অভিমানী মনে তার অন্তরের দূরত্বটাকে সামলে চলেছে |


    সদরগেটে একতা ঠুং করে আওয়াজ হতেই রূপা বলে;

-------"ঐ, বাহাদুরকাকা এলো বোধ হয় |"

বাড়ির পাহাদার হিসেবে এই বাহাদুরকে নিয়োগ করেছেন সীতাংশুবাবু | খুব ভালোমানুষ, বিশ্বস্ত | প্রৌঢ়ত্বের চৌকাঠ অনেক আগেই অতিক্রম করেছেন | পৌঁছেছেন বার্ধ্যক্যের প্রবেশদ্বারে | ভিতরে যাওয়া শুধুমাত্র খানিকটা সময়ের অপেক্ষা | কেউ কেউ তাকে  ডাকে বাহাদুরকাকা  বলে |   অনেকদিন হোল এই বাড়ির একজন সদস্য হয়ে উঠেছেন তিনি | প্রতিদিন এই সময়ে তার আগমন ঘটে | বাড়িটিকে বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন | খুব সমীহ করেন মণিমালাকে | মণিমালা লক্ষ্য করতেন তার স্বামীর প্রতি যেরূপ ঐকান্তিক একাত্বতা আছে অর্থাত্ শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-আন্তরিকতার মাত্রা যতটা উঁচু মানের, তাঁর প্রতি দূরত্ব যেন ঠিক ততটাই | না- না তিনি মহিলা বলে নন | মণিমালা মনে মনে নিজেকেই দায়ী করেন | তাঁর ব্যৰ্থতা তাঁর আন্তরিকতার অভাব, প্রাধান্য শুধু আত্মকেন্দ্রিকতায় |


সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে রূপার মেয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী তিয়াসা-- "ও দিদা , ও দিদা" বলে উঠে এসে মণিমালাকে জড়িয়ে ধরে | মনের সমস্ত মলিনতা একনিমেষে উধাও হয়ে যায় তাঁর | পরমসুখ অনুভব করেন | আর ভুল করেন নি তিনি | তিয়াসার শিশু বয়স থেকেই অপার স্নেহ-ভালোবাসা- আন্তরিকতায় ভরিয়ে রেখেছেন | তিয়াসার পাঁচবছরের বড় দাদা 'সুজন' এই বাড়িতে বার বার এলেও  মা রূপার সঙ্গে প্রয়োজন সেরে ফিরে যায় | কখনও না ডাকলে নিজে থেকে কাছে এসেছে, মনে করতে পারেন না মণিমালা | সুজনের ক্ষেত্রে এই ঘটনা তার শিশু বয়স থেকেই | সুজনকেও স্নেহ করেন, খুব ভালোবাসেন | কিন্তু তিয়াসার ক্ষেত্রে মা-মেয়ের সম্পর্কের গভীরতাকে মনে করিয়ে দেয় |


                                 **সমাপ্ত**

                 

sghoshkabi@gmail.com

বাঁকুড়া