1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts
Showing posts with label ধারাবাহিক. Show all posts

Saturday, October 21, 2023

চিকিৎসকের রোজনামচা ( পর্ব ২ ) : আপনজন

আপনজন

ডাঃ সৌভিক ব্যানার্জী

"আমার বেলা যে যায় সাঁঝ-বেলাতে,

তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে।"

      রবি ঠাকুরের গানের সুরে গলা মিলিয়ে আজ সকাল থেকেই মনে মনে গুনগুনিয়ে উঠছি। এখন বসে আছি বোলপুর ট্যুরিস্ট লজের খাওয়ার ঘরে। গরম গরম ফুলকো লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে সকালের খাবার খেয়ে এখন গরম চায়ে চুমুক দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছি। আমি তিনদিনের ছুটি কাটাতে বোলপুরে এসেছি। বোলপুর আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা, যে কারণে ছুটি কাটাতে মাঝেমধ্যেই আমি এখানে আসি। আসলে দুর্গাপূজার সময়ে আমার কাজের ছুটি আমি পাই না। কারণ টা খুব স্পষ্ট, আমি একজন পেশায় চিকিৎসক। পেশার তাগিদে আমায় সারাদিন অসংখ্য মানুষের ও তাদের জীবনের সাথে ওঠাবসা করতে হয়। তাদের জীবনের না পাওয়ার গল্প, সুখ দুঃখের গল্পের অংশীদার হতে হয়। কিন্তু কিছু কিছু গল্প মনে দাগ কেটে যায়, মাঝে মাঝে চমকেও উঠি। তাই ভাবলাম সেই গল্পগুলো আপনাদেরকেও শোনাই। তবে বলাই বাহুল্য গল্পকারের পরিচয় সঠিক হলেও গল্পের স্থান কাল পাত্র কিন্তু পরিবর্তিত থাকবে। সেটা কিন্তু আমার পেশাগত কারণেই কারণ ডাক্তারি পাশ করার সময় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম যে সকল রোগীদের পরিচয় গোপন রাখবো। তাই সুরার পাত্রে লিকার চা ঢেলে গল্প শোনানোর পালা শুরু করলাম। এটা আমার দ্বিতীয় গল্প। অমাবস্যার রাত্রির ওই ঘটনাটার পর আমি একবার হেমন্ত সুইটস এর পাশ দিয়ে এসেছিলাম কিন্তু জানিনা কেন আর মন্দিরবাড়ির দিকে যেতে পারিনি। হয়তো নিজের উপর খুব রাগ আর দু:খ মিলিয়ে একটা কিরকম অনুভূতি হয়েছিলো। আজ ষষ্ঠী, মায়ের বোধন। মা দুর্গার কাছে প্রতিবারের মতো আমার প্রার্থনা থাকে এটাই যে সবাইকে সুস্থ রাখো। কিন্তু এবার তার সাথে সাথে আমি এটাও চাইবো যে মানুষের মনকে কুসংস্কার মুক্ত করো।

      তিনদিন ছুটি কাটিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আমার মা তার বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘুরতে গেছে। কাজের লোকটাও আসবে না। তাই মিঠুন কে বললাম এই পূজার কটা দিন আমার সাথে থেকে যেতে, "তোর বঊদিও নেই রে, বাপের বাড়ি গেছে। একসাথেই খাওয়া দাওয়া করবো। আর তুইই বা কি করবি বাড়ি গিয়ে। তার থেকে আমার সাথে থেকে যা।" মিঠুন তো খুব খুশি। ষষ্ঠীর রাত্রে বাড়ি ঢুকতে অনেকটা দেরী হয়ে গেছিলো। তাই সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠতেই দূর থেকে শুনতে পেলাম ঢাকের আওয়াজ আর মাইকে পুরুতমশাইয়ের মন্ত্রের উচ্চারণ। মিঠুন দেখলাম অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। "স্যার চা খাবেন তো? বানিয়ে রেখেছি। আমি যাই চেম্বার টা খুলি। পরিষ্কার করতে হবে, তিনদিন খুলিনি। নোংরা হয়ে থাকবে। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। পেশেন্টরাও আসবে। ম্যানাজ করি। স্যার আমি বেরোলাম আপনি আসুন" এই বলে মিঠুন বেরিয়ে গেলো। আমি ফ্রেশ হয়ে চা খেতে বসলাম আমার বারান্দায়। আরামকেদারায় বসে মোবাইলে শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই চিরাচরিত অমর হয়ে থাকা মহিষাসুরমর্দিনী চালালাম। সত্যি এই জিনিস পুরানো হওয়ার নয়। চা যে কখন শেষ হয়ে গেলো খেয়াল নেই। মন যেন আর উঠতেই চাইছে না এতটাই বিভোর হয়ে গেছিলাম। হঠাৎ করে মোবাইল টা সশব্দে বেজে উঠল। ফোনের ওপাশ থেকে একটা ভারী পুরুষ কন্ঠস্বর, "ডাক্তারবাবু বলছেন?" আমি সম্মতি দেওয়ার পর উনি বললেন, "নমস্কার স্যার, আমি পাতিপুকুর থেকে বলছি। আমার একজন পেশেন্ট আছে, জ্বর এসেছে, আপনি একটু যদি দেখে যান বাড়ি এসে খুব ভালো হয়।" আমি বললাম "চেম্বারে নিয়ে আসুন না, খুব ভালো হয়। পূজার সময়ে হোমকলটা,,, আসলে বুঝতেই পারছেন। চেম্বারে নিয়ে আসুন।" ভদ্রলোক আচ্ছা বলে ফোনটা কেটে দিলেন আর আমিও আলস্যি ঝেড়ে চেম্বারে বেরোনোর জন্য তৈরি হতে গেলাম।

      সপ্তমীর দুপুরে আমি আর মিঠুন মাংস ভাত খেলাম, অবশ্যই শীতলা মাসির দোকান থেকে আনিয়ে "মাংসটা ভালোই রেঁধেছে মাসি কি বল মিঠুন।" বড় একটা মুরগীর ঠ্যাং চিবোতে চিবোতে মিঠুন উত্তর দিলো "একঘর"। খাওয়া দাওয়া সেরে উঠে দেখলাম দুপুর তিনটে গড়িয়ে যায়। "চল মিঠুন বেরোই।" ও কথা প্রসঙ্গে বলা হয়নি, আজ আমরা এখন 3D সিনেমা দেখতে যাবো। আমি আগে দেখেছি 3D সিনেমা কিন্তু মিঠুনের কাছে এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা, তাই স্বাভাবিকভাবেই ও খুব উত্তেজিত। খাওয়া সেরে চেম্বার থেকে বেরিয়েই দেখি একজন ভদ্রলোক বয়স ওই আনুমানিক ষাট থেকে পয়ষট্টি হবে, পরনে একটা সাদা পাজামা আর গায়ে একটা সিল্কের পাতলা ফিনফিনে পাঞ্জাবি যেটার বাঁ দিকের কাঁধের কাছে অল্প ছেঁড়া, বাইরে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো বেদিটার উপরে বসে আছেন। আমাকে দেখেই হাত দুটো জড়ো করে এগিয়ে এলেন, "নমস্কার ডাক্তারবাবু, আমার নাম কেষ্ট দাস। আমি থাকি পাতিপুকুরে। আমিই আপনাকে সকালে ফোন করেছিলাম। আপনি কি মনে করতে পারছেন?" বুঝলাম, ইনিই আমাকে ফোন করেছিলেন হোমকলের জন্য। মিঠুন দেখলাম চেম্বার বন্ধ করে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিনেমা দেখতে যাওয়ার অনিশ্চয়তাটা নিশ্চয়ই ওর মধ্যেও কাজ করছে। "আপনার তো পেশেন্ট নিয়ে আসার কথা ছিলো। আনলেন না?" আমার প্রশ্নের জবাবে ভদ্রলোক বললেন "আসলে ডাক্তারবাবু পূজার সময় তো, কোনো গাড়ি ঘোড়া পেলাম না, আপনি যদি একটু কষ্ট করে যান। আমি খুব উপকৃত হই। খুবই জ্বর আসছে। আপনি খাচ্ছিলেন বলে আপনাদেরকে আর বিরক্ত করিনি, বাইরেই বসেছিলাম। আপনি যদি একটা বার দেখে আসেন।" আমার সামনে করজোড়ে বয়ঃজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোককে ওই ভাবে মিনতি করতে দেখে আমার খুব মায়া হলো। । মানুষটা নিশ্চয়ই বিপদে পরেছেন নাহলে আমায় এভাবে অনুরোধ করতেন না, "মিঠুন তোকে হলে নামিয়ে দিয়ে আসছি। আমি এদিকটা সামলাই। আমি নাহয় একটু পর থেকে দেখবো। চল, তোর জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা থেকে তোকে বঞ্চিত করবো না। কেষ্টবাবু আপনি এগোন, আমি আসছি। পাতিপুকুরের কোথায় যাবো? ঠিকানা টা?" ভদ্রলোকের চোখেমুখে যে একটা খুশির ঝলক সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম, "আপনি মাছের বাজার টা চেনেন তো? ওখানে এসে আমায় একটা ফোন করবেন। আমি আপনাকে নিয়ে যাবো। আপনার ফোনে একটা মিস কল করে দিয়েছি। " আমি 'ঠিক আছে' বলে মিঠুন কে নিয়ে এগোতে যাবো হঠাৎ সেই সময় কেষ্টবাবু বলে উঠলেন "ও হ্যাঁ ডাক্তার বাবু, ধন্যবাদ। "

     পাতিপুকুরের মাছের বাজারে এসে ফোনটা বের করতে যাবো এমন সময় পেছন থেকে ডাক, "আসুন স্যার, এইদিকে", ওমা দেখি কেষ্টবাবু সেখানে আগের থেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমায় দেখে সম্ভবত উনি এগিয়ে এসে আমায় ডেকে নিয়ে গেলেন। উনি সাইকেলে করে সামনে সামনে যাচ্ছেন আর তার পেছনে আমি স্কুটি নিয়ে চলতে লাগলাম। একটা চওড়া রাস্তার ধার ধরে আমরা এভাবে এগিয়ে গিয়ে একটা দুধের দোকানের পাশ দিয়ে বেঁকে গেলাম। সামনে একটা লোহার জংধরা আধখোলা গেট যার দুদিকের মাটিতে ঘাস আর মাঝখানটা লোক চলাচলের কারনে ঘাস উঠে গেছে। স্কুটিটা নিয়ে অতিকষ্টে এঁকেবেঁকে ঢুকলাম। ভিতরে পুরানো দিনের সার সার কোয়ার্টার যার দেওয়াল খসে গিয়ে সিমেন্ট বেরিয়ে গেছে, রংতো কিছু বোঝাই যায় না আর পাইপের গায়ে প্রচুর শ্যাওলা। কিছু কিছু জায়গায় পাইপের অংশ দিয়ে ফোটা ফোটা জল পড়ছে, "সবতো অনেক পুরানো দিনের বাড়ি নাকি কেষ্টদা, কিছু কিছু জায়গা দেখে তো মনে হচ্ছে এখুনি বুঝি ভেংগে না পড়ে যায়", কেষ্টবাবু মুখ ঘুড়িয়ে বললেন " হ্যাঁ স্যার অনেক পুরানো, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধুকছে, তবে ইয়ে স্যার আপনি কেষ্টদা বলাতে খুব খুশি হলাম, এই পূজার দিনে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরী হলো, নিন স্যার এসে গেছি। আপনি বাইকটা এখানে রেখে দিন। আসুন ভেতরে, একটা তলা কষ্ট করে একটু উঠতে হবে।" আমিও স্কুটিটা রেখে কেষ্টদার পেছনে পেছনে উঠে গেলাম উপরে। পুরাতন দিনের মোটা মোটা দেওয়াল, খিড়কি দেওয়া জানালা আর উপরে মাকড়সার জাল যেটা কিছু কিছু জায়গায় ঝুলের মতো ঝুলছে। "প্রতিমা, ডাক্তারবাবু এসেছেন, মামণি কে বলো উঠে বসতে, আসুন ডাক্তারবাবু", এই বলে কেষ্টদা আমার ব্যাগটা নিয়ে নিলেন। আমিও জুতো খুলে এগোতে যেতেই একজন ভদ্রমহিলা হাত জড়ো করে বললেন "আসুন ডাক্তারবাবু, এদিকে" বুঝলাম ইনার নামই প্রতিমা। আর আমার পেশেন্ট খাটের উপর বসে আছেন। পরনে একটা সাদা নাইটি, খুবই সাধারণ মানের জীবনযাপনের কারনে চুল উস্কোখুস্কো তবে গায়ের রঙ দুধের মতো ফরসা। ঠোঁটের নিচে খাবার লেগে আছে সাদা রঙের, মনে হয় সবেমাত্র খাওয়া শেষ হয়েছে তাই মুখটা মোছা হয়নি আর বয়স আনুমানিক ষাটের গোড়ায়। আমি এগিয়ে গেলাম উনার দিকে "নমস্কার আমি ডাঃ সৌভিক ব্যানার্জী, আপনার কি অসুবিধে বলুন, ধীরেসুস্থে বলুন আর প্রতিমাদি, উনার মুখটা মুছিয়ে দিন, খাবার লেগে আছে।" "দেখুন তো কবে মরব" এই বলে ভদ্রমহিলা আমার দিকে তার ডান হাতটা এগিয়ে দিলেন। আমি পালস দেখার জন্য সামনের দিকে ঝুঁকে বসলাম, "আপনি এরকম কথা কেন বলছেন, সামান্য জ্বর হয়েছে, আমি ওষুধ দিচ্ছি সেরে যাবেন। সর্দি কাশি জ্বর, তেমন গুরুতর কিছু নয়।" কেষ্টদা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, "ওর কথায় কিছু মনে করবেন না ডাক্তারবাবু, ও ওই রকম কথা প্রায়ই বলে থাকে। মামণি, উনি নিজের পূজার প্রোগ্রাম ছেড়ে এসেছেন তোমায় চিকিৎসা করবেন বলে। এরকম কথা বলতে আছে কি?" কেষ্টদার প্রশ্নের উত্তরে উনি মাথা নামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, "তুমি কি আর বুঝবে আগুনের জ্বালা, বাদ দাও।" অকস্মাৎ এরকম কথায় আমি হতচকিত হয়ে কেষ্টদার দিকে তাকালাম। কেষ্টদা দেখলাম মাথা নামিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি অগত্যা পেশেন্ট দেখার কাজে মনোনিবেশ করলাম। প্রেসস্ক্রিপশন করার জন্য পেশেন্টের নাম টা জানার দরকার ছিলো। কেষ্টদা নেই তাই অগত্যা প্রতিমাদিকেই জিজ্ঞেস করলাম কারণ মামণি যে উনার নাম নয় সেটা আগেই বুঝে গিয়েছিলাম। হঠাৎ করে ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, "ও আমার নাম জানেনা, আমিই বলছি। আমার নাম কৃষ্ণকলি দত্ত রায়।"

     পেশেন্ট দেখে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম। কেষ্টদা কোথায় গেলেন জানিনা। আমি সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়েই দেখি কেষ্টদা ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে আছেন। মুখ নিচের দিকে, চোখের দৃষ্টি অন্যমনষ্ক। আমায় দেখেই হালকা গলায় বলে উঠলেন, "হয়ে গেছে আপনার, কি বুঝলেন ডাক্তারবাবু?" "খুব সাধারণ ফ্লু, জ্বর টা তাড়াতাড়িই কমে যাবে তবে গা হাত পা ব্যাথা আর মাথার ভার টা আস্তে আস্তে কমবে। দিন পাঁচেকের ওষুধ দিয়েছি, তার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবেন উনি", এইবলে আমিও অবচেতন কন্ঠে হঠাৎ বলে উঠলাম, " কি ব্যাপার আপনি আমায় কিছু মনে না করতে বলে নিজেই মান অভিমান করে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন?" এই কথাটা বলার পরেই নিজের উপর ধিতকার দিয়ে উঠলাম এই ভেবে যে এই কথাটা বলা উচিৎ হলো না। আমি তো চিকিৎসক, চিকিৎসা করে পারিশ্রমিক নিয়ে চলে যাবো। আমার কারোর ব্যাক্তিগত ব্যাপারে কথা বলা উচিৎ নয়। আমি জানিও না এই কেষ্টদা, প্রতিমাদি এবং আমার পেশেন্ট, এদের মধ্যে সম্পর্ক কি? কিছু না জেনে কথাটা বলে খুব অন্যায় করে ফেলেছি। ভাবছি কেষ্টদা কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেন আর ঠিক তখনই "আপনি কি চা খেতে ভালোবাসেন ডাক্তারবাবু? তাহলে আসুন আপনাকে পল্টুর দোকানে স্পেশাল চা খাওয়াই", কেষ্টদার এই কথায় আমি উনার মুখের দিকে তাকিয়ে অনুভূতি বোঝার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। কিন্তু এইটুকু বুঝলাম যে ভদ্রলোকের মনে কোথাও একটা চাপা কষ্ট আছে যেটা মুখের চোয়ালের দৃঢ়তা আর চোখের চাউনির ভাজে লুকানো থাকে। আমি আর একমুহূর্ত কথা না বাড়িয়ে কেষ্টদাকে অনুসরণ করলাম। পুরো রাস্তাটা কেষ্টদা আর একটাও কথা বললেন না। আমি ভাবছি যে লোকটা এত কথা বলছিলেন আসার সময় সেই লোকটা আমার পেশেন্টের একটা কথায় এত প্রতিক্রিয়া কেন দিচ্ছেন? আর কৃষ্ণকলি ম্যাডাম কেনই বা ওরকম কথা বললেন, সেটাও ধোঁয়া আমার কাছে। কোনো কিছুই বুঝতে না পেরে কেষ্টদার পিছনে চলতে লাগলাম। যদিও আমার এসবের ভিতর ঢোকাটা উচিৎ নয় কিন্তু কেষ্টদার চোখের অনুশোচনা আমায় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আজ পেশেন্ট দেখতে আসা কিন্তু কেষ্টদার একান্ত অনুরোধে আর এখন সিনেমা হল না গিয়ে চায়ের দোকান যাওয়া, সেটাও ওই লোকটার চোখের অনুভূতির তাড়নাতেই। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে লোহার গেটটা পেরিয়ে গেলাম। যাঃ, তাড়াহুড়োতে স্কুটার টা নিতে ভুলে গেছি। আবার এতটা পথ আসতে হবে যদিও খুব বেশি দূর নয়। কোয়ার্টারের পরিধির বাইরেই চায়ের দোকান। কেষ্টদা আমায় একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বললেন, " ডাক্তারবাবু বসুন, আমি চা নিয়ে আসছি। বিস্কুট খাবেন তো?"

     এখন বেঞ্চে বসে আছি চায়ের কাপ হাতে। কেষ্টদা আমার জন্য বাদাম বিস্কুট এনে দিয়েছেন। "বলুন দাদা, আপনি কি কিছু বলবেন। আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি কিছু একটা বলতে চান। আপনি নির্ভাবনায় বলে ফেলুন।" আমার কথা শুনে কেষ্টদা বাইরের একটা দোকানের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, "ওই যে দোকানটা দেখছেন ডাক্তারবাবু, বাইরে কিছু ওভেন আর গ্যাস সিলিন্ডার পড়ে আছে, ওটা আমার দোকান। আসলে বাবার দোকান, আমি পৈতৃক সূত্রে পেয়েছি। বাবার সময়ে দোকানে চাল ছিলো না। আমি উপরটা ঢেলেছি, আয়তনেও একটু বাড়িয়েছি। হাতের কাজ বাবার থেকেই শেখা। কলির বাবা মানে আপনার পেশেন্টের বাবা আর আমার বাবা খুব ভালো বন্ধু ছিলো। তখন নক্সাল আন্দোলন চলছে। কলির বাবা ছিলেন ডাকসাইটে নেতা, এখানকার কাউন্সিলার। কলির বাবারা দুই ভাই, বড় ভাই কাউন্সিলার আর ছোট ভাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। কলির মা ছোটবেলাতেই মারা যান, তখন বোধহয় কলির দুই কি তিন মাস বয়স হবে। কলির কাকিমা মানে ছোটো ভাইয়ের বঊ কলির ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। কাকিমা ছিলেন নিঃসন্তান, জরায়ুতে কি একটা সমস্যা ছিলো, আপনাদের ডাক্তারি ভাষা তো অত পরিষ্কার বুঝিনা তবে সমস্যা কিছু একটা ছিলো যেটা আমার বাবার মুখে শোনা" এই বলে কেষ্টদা পাঞ্জাবীর পকেট থেকে বিড়ি বের করে মুখে দিতেই আমি বলে উঠলাম, "কেষ্টদা বিড়িটা আমার সামনে যদি না খান,,, " সাথে সাথে কেষ্টদা জিভ কেটে নিজের ভুল হয়েছে স্বীকার করলেন। "ঠিক আছে, ঠিক আছে, আপনি এগিয়ে যান। কৃষ্ণকলি ম্যাডামের কাকিমার কাছে বেড়ে ওঠা টা না হয় বুঝলাম কিন্তু উনার বাবার সাথে আপনার বাবার বন্ধুত্বটা কি আগে থেকেই ছিলো নাকি পরে হলো,,," আমায় থামিয়ে দিয়ে কেষ্টদা বলে উঠলেন, "বলছি বলছি। তা তখন কলি মনে হয় ক্লাস সেভেনে পড়ে। কলির বাবা তখন পার্টির বড় নেতা। হঠাৎ খবর আসে শিয়ালদহ তে ছবিঘর সিনেমার ওখানে একটা আক্সিডেন্ট হয়েছে, একজন ভদ্রলোক গুরুতর ভাবে আহত, এন-আর-এসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আইডেনটিটি কার্ড থেকে জানা গেছে নাম নারায়ণ দত্ত রায়।" আমি বলে উঠলাম, "কলির বাবা?" কেষ্টদা মুচকি হেসে বললেন, "নাঃ, কলির কাকা। কলির বাবার নাম মহাদেব দত্ত রায়। নারায়ণকাকার ছিলো ও নেগেটিভ ব্লাডগ্রূপ। সে ব্লাড তো কোথাও পাওয়া যায় না। মহাদেবজ্যাঠা প্রচুর চেষ্টা করে এক বোতল জোগাড় করলেন কিন্তু লাগবে তিন বোতল রক্ত। প্রাণাধিক প্রিয় ভাই এর জীবন বাঁচানোর জন্য মহাদেবজ্যাঠা পাগলপারা হয়ে গেছিলেন। আমার বাবা সেই সময় এন-আর-এসে গেছিলেন আমায় নিয়ে কুকুর কামড়ের ইনজেকশন দেওয়াতে। জ্যাঠাকে দেখে বাবা এগিয়ে যান কি হয়েছে জানতে। বাবার সামনে মহাদেবজ্যাঠা হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন এবং সবটা বলেন। বাবা শুনে বলেন আরে আমি থাকতে আপনি কেন কাঁদছেন। বাবার ছিলো ও নেগেটিভ ব্লাড। ব্যাস, আর পায় কে। আমার বাবা রক্তদান করেছিলেন। শুধু বলেছিলেন আমার ছেলেটাকে বাড়ি তে পৌছে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দিতে। আমার তো তখন বুঝলেন মশাই, পেটে ইঞ্জেকশন নিয়ে বিশাল ব্যাথা। জ্যাঠা আমার বাবা কে তখন বললেন, তোমার ছেলে আজ আমার বাড়িতেই থাকবে, খাবে। তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে থাকো। আর আজ তুমি আর আমি একসাথে খাবো। তুমি আমার ভাইকে জীবন দিয়েছো, এই ঋণ ভোলার নয়। তুমি জীবিকা কি করো আমি জানি, তাতে তুমি ইতঃস্তত বোধ কোরোনা। তোমার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক।" মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম এই গল্প, মাঝে বিঘ্ন ঘটালো মোবাইল। মিঠুনের ফোন, "স্যার আপনি কোথায়? কতক্ষণ ধরে পেশেন্ট দেখছেন? সিনেমার যে হাফটাইম হয়ে গেলো। কখন আসবেন?" আমি শুধু বললাম "আসবো।"

     আরও এককাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে এলেন কেষ্টদা, সাথে আবারও বাদাম বিস্কুট। বিস্কুটটা ডুবিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা আপনি বলছেন মহাদেববাবু কাউন্সিলার। কিন্তু উনি রক্ত যোগাড় করতে গিয়ে এত হিমসিম খেলেন কেন?" চায়ে চুমুক দিয়ে আস্তে আস্তে হেটে কেষ্টদা আমার পাশে এসে বসলেন, "যে সময়ের কথা বললাম তখনো জ্যাঠা কাউন্সিলার হননি। পার্টির বড় নেতা ছিলেন। কিন্তু মজার কথা কি জানেন আমার বাবা কোনোদিন কোনো সুবিধা নেননি জ্যাঠার কাছ থেকে। নিলে আজ আমার ওইটুকু পুচকে দোকান থাকতো না। ওদের মধ্যে একটা অদ্ভূত সম্পর্ক ছিলো। সেটা বন্ধুত্ব নাকি কৃতজ্ঞতা সূচক আমি জানিনা। জ্যাঠার আপনজন ছিলেন আমার বাবা।" সন্ধ্যে নেমে আসতেই চারিদিকে রাস্তার আলো জ্বলে উঠল। কেষ্টদা দূরে তাকিয়ে রইলেন। সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে আকাশে যেরকম লাল ছটা ছড়িয়ে পড়ে সেইরকম এই গল্পের ছটা আমার মনে ছড়াতে লাগলো। "বুঝলাম কেষ্টদা, এই সম্পর্কের খাতিরেই আপনি এদের দেখভাল করেন। খুব ভালো লাগলো দাদা, আজকালকার দিনে কেউ সম্পর্কের দাম দেয় না। আপনি সত্যিই,,, " আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই কেষ্টদা দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলেন, "নাঃ"। সন্ধ্যে এখন অনেকটাই গাঢ়, চারিদিকে ঝকঝকে আলো জ্বলে উঠেছে। সবাই ঠাকুর দেখতে বেড়িয়ে পড়েছে। সপ্তমীর রাত, আজ থেকে বাঙালীর পূজা পরিক্রমা শুরু। এইসব কিছুর মাঝে একটা ষাট পয়ষট্টি বছরের লোকের ফেলে আসা কাহিনী শুনে চলেছি যার মধ্যে অনেক টানাপোড়েন লুকিয়ে আছে সেটা বেশ বুঝতে পারছি। "বাবা হঠাৎ করেই মারা যান", কেষ্টদা কাহিনী বলতে শুরু করলেন, "তারপর থেকে এই দোকানটার ভার আমার উপরে পড়ল। আমার পড়াশোনা বেশি নয়। বাপের কাছে হাতের কাজ শিখে গিয়েছিলাম খুব তাড়াতাড়ি। বাবা বলতেন, তুই আমার থেকেও ভালো কাজ জানিস। হয়তো কিছু দেখেছিলেন, তাই বুঝেছিলেন। কলির বাবা আমার দোকানে রোজ রাত্রি বেলায় বাড়ি ফেরার পথে আসতেন। বাবার ছবির দিকে চেয়ে খানিকক্ষণ সময় বসে থাকতেন চুপ করে। তারপর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জ্যাঠা চলে যেতেন। রোজ একই ঘটনা। আমি বুঝতাম কিছু একটা কষ্ট হয় যেটা উনি ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। নিখাদ বন্ধুত্ব বলতে যা বোঝায় তারই উদাহরণ ছিলো ওই দুজন। কোনো চাওয়া পাওয়া ছিলোনা, স্বার্থ ছিলো না। তখন জ্যাঠা কাউন্সিলার হয়ে গেছেন, হতে শত ব্যস্ততা, শয়ে শয়ে লোক জ্যাঠার সাথে রাতদিন ওঠাবসা, তবুও দিনের শেষে জ্যাঠা আসতেন আমার দোকানে। মাটির ভাড়ে এক কাপ চা নিয়ে চুপ করে বসে থাকতেন। আমায় খুব ভালোবাসতেন। বাবা চলে যাওয়ার পর আমার খাওয়াদাওয়ার ঠিকানা ছিলো এই বাড়ি। আমায় রোজ রাত্রে এসে জিজ্ঞেস করতেন আমি খেয়েছি কিনা, কাজ কেমন চলছে, এইসব। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যেতেন।" কেষ্টদার কাছে কাহিনী শুনতে শুনতে কখন সময় পেরিয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। একটা অটো হঠাৎ খুব জোরে হর্ণ বাজিয়ে রাস্তা দিয়ে চলে গেলো। গল্পের মাঝে বিরতি ঘটিয়ে দিতেই পল্টুর কাছে আর এক কাপ চা খাওয়ার ফরমান জারি হয়ে গেলো কেষ্টদার।

      "জ্যাঠার হঠাৎ করেই ব্রেন স্ট্রোক হল কয়েক মাস পর। বাঁচানো গেলো না।", কেষ্টদার এই কথায় চা খাওয়া থামিয়ে আমি মুখ তুলে চাইলাম। আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে কেষ্টদা বললেন, " আপনজনের টান একেই বলে ডাক্তারবাবু বুঝলেন। কলি তো এদিকে পিতৃহারা, শোকটা খুব গভীরে লাগল। আমি তো যখন আসতাম খেতে এই বাড়িতে কলিকে দেখতাম চুপ করে মনমরা হয়ে বসে থাকতে। আমি কলির সাথে হাসাহাসি করার চেষ্টা করতাম। এই কোয়ার্টার এর ভেতরে টগর গাছ ছিলো অনেকগুলো। টগরফুল নিয়ে যেতাম কলির জন্য। টগরফুল খুব ভালোবাসতো কলি।" আমি কেষ্টদাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "টগরফুল কেন?" কেষ্টদা পাশে এসে বসল আমার, "সকালে চান করে বাবা মায়ের ছবিতে টগর ফুল দিয়ে কলির দিন শুরু হতো। কলির মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পরেই মহাদেব জ্যাঠা মারা যান। নারায়ণ কাকা আর কাকিমা ছিলেন ভীষণ সজ্জন ব্যক্তি। কলির কোনো অভাব রাখতেন না। নিজের মেয়ের মতো দেখাশুনা করতেন। আর আমাকেও খুব খাতিরযত্ন করতেন। প্রতি বছর নববর্ষের সময় আর দুর্গাপূজার সময় জামাপ্যান্ট দিতেন। দোকানটাও তখন ভালোই চলছিল। সেদিন কাকিমার খুব জ্বর। যথারীতি আমি গেছিলাম দুপুরে দোকান বন্ধ করে। গিয়ে তো দেখি এই অবস্থা। আমি তো আমাদের তখন দেখতেন দূর্গা ডাক্তার, তাকে খবর দিয়ে এলাম। ঘরে নারায়ণকাকা বা কলি কেউই নেই। একজন স্কুলে আর একজন কলেজে, ফেরেন নি। দূর্গা ডাক্তার সব দেখে টেখে ওষুধ দিলেন। কাকিমা আঁচলের খুঁট থেকে টাকা দিলেন, ওষুধ এনে দিলাম। তারপর বুঝলেন মশাই অনেক বিকেল করে দুপুরের খাবার খেলাম সেদিন। কাকিমার সে কি বকা, আমার খাবার ঠান্ডা হয়ে গেছিলো বলে। বলে কিনা শুনুন, আমি দুপুরের খাবার খেয়ে কেন ডাক্তার ডাকতে যাইনি। বলেন তো এ কখনও হয়। তারপর কাকিমা বললেন, এক কাপ চা আর এক গ্লাস দুধ গরম করে দিতে। আসলে কাকু আর কলির ফেরার সময় হয়ে গেছিলো। বার্ণার জ্বালাতে গিয়ে দেখি জ্বলছে না। বার্ণারের যে নবটা থাকে নিচে কালো মতন, সেটা ঠিক করে ঘুরছেনা। জ্যাম হয়ে গেছে। কাকিমা কে বললাম বার্নারের সুইচটা খারাপ হয়ে গেছে। ঠিক করতে হবে। তা কাকিমা বললেন আমায় করে দিসখন পরে। সেদিনের চা টা বুঝলেন খুব প্রশংসা পেয়েছিল। কলিও খুব প্রশংসা করেছিল আমার। কাকিমাকে যত্নআত্তি করেছিলাম বলে। আমি তো ভীষণ খুশি জানেন ডাক্তারবাবু। আমার কলি আমার প্রশংসা করেছে, আমি যে কি খুশি।" কেষ্টদাকে তখনই থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "আমার কলি? মানে, কেষ্টদা?" কেষ্টদা চুপ, আমি চুপ, তাকিয়ে আছি কেষ্টদার দিকে। "কুকুরের কামড়ের ইঞ্জেকশন নিয়ে যেদিন প্রথম কলিদের বাড়ি গেছিলাম সেদিন কলি আমায় খাবার বেড়ে দিয়েছিল, আমার সাথে সারা দুপুর গল্প করেছিল। তার পর থেকে শুরু হয় আমাদের বন্ধুত্ব। কলিদের স্কুলে হাতের কাজের ক্লাস হতো। যেটা ভালো হত আমায় দিয়ে যেতো। টগর ফুল ভালো লাগত বলে আমি ওর জন্য টগর ফুলের গাছ বসাতাম। এই কোয়ার্টারের যত টগর গাছ আমার বসানো। কলির বাবা মারা যাওয়ার পর আমিই ওকে কত সান্ত্বনা দিয়েছি। সারা দিন কাজের শেষে রাত্রে গল্প করে যেতাম। ওর মেয়েলি খেলার সঙ্গী ছিলাম আমি।


এই খেলা বন্ধুত্বের গন্ডী পেরিয়ে ভালোলাগায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আমি কোনোদিন আমার এই ভালোলাগা কলিকে বলিনি। আমি জানি এর কোনো পরিণতি নেই তাই আমি আমার অনুভূতিকে কখনো বন্ধুত্বের মধ্যে ঢোকাইনি। কলি শুধু আমার মনেই কলি, আমার অনুভূতিতে কলি, বাইরের জগতের সামনে এমনকি তার সামনেও আমি তাকে তার বাড়ির নাম মামণি বলেই ডাকি। এটাও আর একটা আপনজনের গল্প বুঝলেন ডাক্তারবাবু।

             "স্যার সিনেমা শেষ, কি করব?" মিঠুনের ফোনের জবাবে আমি বললাম, "ওই মলেই ঘোরাঘুরি কর, আমি যাচ্ছি একটু পর" ফিরে এলাম কেষ্টদার কাছে। কেষ্টদা বললেন "আপনি বেরোবেন? চলুন তাহলে?" "গল্পটা অসমাপ্ত থেকে গেলোনা কেষ্টদা? দুই বন্ধুর মাঝে আজ অভিমান ঢুকে গেলো কি করে? আজ কৃষ্ণকলি ম্যাডামের একটা কথায় আপনি দরজার বাইরে চলে গেলেন। এত বছরের সম্পর্ক একটা ঠুনকো কথায় অভিমান জমিয়ে ফেলল? আপনি যখন জানতেন যে এই ভালোলাগা বা ভালোবাসা যাই বলেন তার কোনো পরিণতি নেই সেখানে আপনাদের মাঝে অভিমান চলে এল কিকরে?" আমার প্রশ্নে কিছুটা পিছিয়ে এসে কেষ্টদা বললেন, "আপনি চলুন, স্কুটার নেবেন তো? যেতে যেতে সব বলছি।" কেষ্টদার সাথে ফিরতে লাগলাম সেই একই পথ ধরে খুবই মন্থর গতিতে। "আচ্ছা ডাক্তারবাবু, ধরুন আপনি একজনকে দেখে বললেন তোমার পায়ে ঘা হয়েছে, চিকিৎসা করিও। সেও আপনাকে হ্যাঁ করাবো বলে আশ্বাসবাণী দেয়। এরপর সেও আর আপনাকে কিছু বলে না আর আপনিও কাজের চাপে ভুলে গেলেন। একদিন জানতে পারলেন ওই ঘা ক্যান্সার হয়ে তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, আপনার কেমন লাগবে?" চলতে চলতে থেমে গেলাম আমি সটান কেষ্টদার দিকে তাকিয়ে। কেষ্টদাও আমার দিকে তাকিয়ে, তার চোখের কোলে আলতো জলের রেখা অন্ধকারেও সুস্পষ্ট। তার হাতের কাছে কোয়ার্টারের লোহার গেট, সেটা ধরে বললেন, "আমি যেদিন বার্নারের নবটা খারাপ পেয়েছিলাম সেদিনই যদি পাল্টে দিতাম তাহলে হয়তো আজ পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারতো, কাকিমাকে হারাতাম না। কাকিমা পুরো সংসারটাকে বেঁধে রেখেছিলেন। আমার দোষে আমি আমার কাকিমাকে হারিয়েছি। আমার দোষে একটা সংসার ভেসে গেছে, আমার দোষে কলি আজ মানসিক রোগের ওষুধ খায়। একশ শতাংশ বার্ণ ছিলো কাকিমার। হাসপাতালে পৌঁছানো মাত্র কাকিমা মারা যান। ডাক্তারেরা কিছু করার সুযোগ পায়নি। কাকিমার চলে যাওয়াতে কাকু খুব ভেঙ্গে পরেন। কলিকে বড় বড় সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো হয়। এখনো কলি সেই ওষুধ খায়। কাকু চাকরি থাকতে থাকতেই মারা যান। এমনিতেই একটা এক্সিডেন্টের পর কাকু একটু থড়বড়ে হয়ে গেছিলেন। সেই থেকে কলিকে আমি দেখভাল করে চলেছি। পয়সার কোনো অভাব নেই ওর কিন্তু সেটা ছাড়া ওর সব কিছুরই অভাব। কলির বিয়ের সম্বন্ধ আমি কত করেছি কিন্তু সবই ও নাকচ করেছে। ওদের বাড়ির জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সবই আমি করি হাসিমুখে। কোনো কিছুর কোনো অভাব রাখিনি কিন্তু এসবের মাঝে আমাদের বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে গেছে জানেন তো। কলি আমায় মনে মনে নিশ্চয়ই অপরাধী মনে করে। আসলে কলি কেন আমি সত্যিই আমার কাছে অপরাধী। বহুবছর আয়নায় মুখ দেখলে ঘেন্না করতো। দোকান বন্ধ রেখে দিনের পর দিন মাছের বাজারে মাছ কাটতে যেতাম। গ্যাসের কাজ করতে পারতাম না। কিন্তু মাছের বাজারে মন টিকল না। আর পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ এই জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতেও পারতাম না। আমি ছাড়া এদের দেখভাল করার কেউ ছিলো না,,," একনিঃশ্বাসে বলে গেলেন কেষ্টদা।

      একটা মানুষের বিবেকের দংশন যে কি মারাত্মক সেটা সেদিন বুঝতে পারলাম। হাটতে হাটতে এগিয়ে গেলাম স্কুটারের দিকে। কেষ্টদা আমার পিছনে আসতে লাগলেন, "আজকালকার যুগেও গান্ধর্ব মতে বিয়ে হয় ডাক্তারবাবু। যেমন আমি কলিকে করেছি। কিন্তু বিয়ের মালাটা আমিই গেঁথেছি আর আমিই ছিঁড়েছি। কলির কাছে আমি একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তি যে কারোর ভালো করতে জানেনা, যে কারোর কিছু হয়ে ওঠার যোগ্যতা রাখে না। কিন্তু এটা আমার অভিযোগ নয়, এটা আমার শাস্তি আমি মাথা পেতে নিয়েছি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশের মতো। রাস্তার ধূলো রাস্তাতেই ভালো। মাছের কাজ ছেড়ে ফিরে এলাম আমার নিজের কাজে, গ্যাসের কাজে। কিন্তু আমি আর ওই বাড়িতে খেতে যেতে পারতাম না। কাকিমার মুখটা, কাকিমার কথাগুলো আমি ভুলতে পারিনি জানেন ডাক্তারবাবু। তারপর থেকে আমি আমার দোকানেই খাওয়া শোয়ার জায়গা করেছি। এই দোকানটাই আমার কাছে মন্দির মসজিদ চার্চ সব। সারাজীবন অবিবাহিত থেকে গেলাম একটা মেয়েকে ভালোবেসে। কলিও জানিনা কেন আর কোনোদিন বিয়ে করলো না। এই জীবনে অনেক কিছু পেলাম ডাক্তারবাবু। এই যে আপনি ধৈর্য্য ধরে এতক্ষন আমার গল্পটা শুনলেন, এটা কি আমার কম পাওনা বলুন। এই শরীরটা চিতায় পুড়ে যাবে একদিন কিন্তু গল্পটা রয়ে যাবে আপনাদের মাঝে। এই সেরেছে, দেখেছেন আপনার সাথে কথা বলতে বলতে আপনার দেওয়া ওষুধগুলো আনা হয়নি কলির জন্য। যাই আমি ডাক্তারবাবু, মেয়েটা জ্বরে কষ্ট পাচ্ছে।" কেষ্টদা হনহন করে হেটে এগিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার পর আমি স্কুটারটার চাবি ঢুকিয়ে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে এলাম। এই গল্পটার শেষ যে কি তা আমার জানা নেই, তবে এরকম ভালোবাসা সবার প্রাপ্য হয়না। এরকম আপনজন ভাগ্য করে মানুষ পায়। সুখে থাক কেষ্ট আর কলির মতো মানুষেরা, পূর্ণতা পাক তাদের ভালোবাসা, এর চেয়ে বেশি আর কিছু চাওয়ার নেই আমার। দূরে একটা পানের গুমটি থেকে রেডিওর গান টা ভেষে আসছে, সেটা শুনে থেমে গেলাম আমি,

"যে জন প্রেমের ভাব জানেনা

তার সঙ্গে নাই লেনা দেনা,

খাঁটি সোনা ছাড়িয়া যে নেয়

নকল সোনা,

সে যন সোনা চেনেনা।।"

...(সমাপ্ত)...

চিকিৎসকের রোজনামচা (১) : অমানিশার অমানুষ

Monday, July 24, 2023

চিকিৎসকের রোজনামচা (১) : অমানিশার অমানুষ


 

অমানিশার অমানুষ

ডাঃ সৌভিক ব্যানার্জী

গল্পটা শুরু করার আগে নিজের একটা ভূমিকা না দিলে রোজনামচার বিশেষত্বটা ঠিক বোঝানো যাবে না। হয়তো অনেকেই বুঝেছেন আমার জীবিকাটা ঠিক কি। হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন, আমি পেশায় একজন চিকিৎসক। পেশার তাগিদে আমায় সারাদিন অসংখ্য মানুষের ও তাদের জীবনের সাথে ওঠাবসা করতে হয়। তাদের জীবনের না পাওয়ার গল্প, সুখ দুঃখের গল্পের অংশীদার হতে হয়। কিন্তু কিছু কিছু গল্প মনে দাগ কেটে যায়, মাঝে মাঝে চমকেও উঠি। তাই ভাবলাম সেই গল্পগুলো আপনাদেরকেও শোনাই। তবে বলাই বাহুল্য গল্পকারের পরিচয় সঠিক হলেও গল্পের স্থান কাল পাত্র কিন্তু পরিবর্তিত থাকবে। সেটা কিন্তু আমার পেশাগত কারণেই কারণ ডাক্তারি পাশ করার সময় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম যে সকল রোগীদের পরিচয় গোপন রাখবো। তাই সুরার পাত্রে লিকার চা ঢেলে গল্প শোনানোর পালা শুরু করলাম।

চেম্বারে আসার সময় যথারীতি স্কুটার টা স্টার্ট নিচ্ছিলো না। সেল্ফ মেরে মেরে হতোদ্যম হয়ে শেষমেশ কিক দিয়ে স্টার্ট হলো আমার পক্ষীরাজ।  আজ চেম্বার সেরে ফেরার পথে একবার গ্যারেজে যেতেই হবে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছু দূর যেতেই দেখি বাপরে বাপ বাজারে কি ভিড়। আর যতো ভিড় ওই ফলের দোকানে। কি ব্যাপার! আমার মা ও দেখি ফলের দোকানে। আমায় দেখেই হঠাৎ হাত টা বাড়ালো। " দশটা টাকা দে তো, খুচরো ফুরিয়ে গেছে।" তারপর ফলওয়ালার দিকে তাকিয়ে "ওরে আমার ফলগুলো অন্যদের সাথে মেশাস না।" সে না হয় দিচ্ছি কিন্তু ফল মিষ্টি কেনার আয়োজন টা কেন সেটাই বুঝছিনা। যাই হোক মানিব্যাগ খুলে টাকাটা বের করতে না করতেই ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে "স্যার তাড়াতাড়ি আসুন, অনেকগুলো জমে গেছে, চেল্লামেল্লি করছে।" আসছি বলে ফোনটা কেটে স্কুটার স্টার্ট দিলাম।

চেম্বারে ঢুকে এসিটা চালিয়ে মিঠুন কে বললাম "হ্যাঁ রে এসিটাও চালিয়ে রাখিস নি। এক এক করে রোগী পাঠা।" যা: মা কে জিজ্ঞেসই করা হলোনা যে আজকের আয়োজন টা কেন। যাক গে বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেব। "ডাক্তার বাবু আসতে পারি"... রোজকার মতো চেম্বারে রোগী দেখা শুরু করলাম। প্রায় দুঘন্টা পরে মনটা হঠাৎ চা চা করে উঠলো। মিঠুনকে চা আনতে পাঠাই, "এই নে টাকা, সবার জন্য চা নিয়ে আয়, আর আমার টায় চিনি ছাড়া"। মিঠুন চা নিয়ে আসার পর চা খেতে খেতে মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ টা খুললাম। বন্ধুদের গ্রুপে একটা পোস্ট করতে যাবো এমন সময় মিঠুন ঘরে ঢুকে এলো, " স্যার একটা হোমকল আছে, কি বলবো?" চা খেতে খেতে আড় চোখে তাকালাম, "কি হয়েছে কিছু জানিয়েছেন?" "না স্যার, বাড়ির লোককে পাঠিয়ে দিই ভেতরে আপনি কথা বলে নিন" সম্মতি পেয়ে মিঠুন চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতেই আমি আমার চেয়ার ঘুরিয়ে বসলাম। দেখেছেন কথা বলতে বলতে মিঠুনের পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি। মিঠুন আমার অ্যাসিসটেন্ট, আমার সব পেশেন্টদের নাম লেখা থেকে শুরু করে খোঁজ খবর নেওয়া সব কাজই করে। আর রোগীর পরিবারও ওকে বেশ পছন্দ করে। "ভিতরে আসতে পারি" খুব ভারী গলায় একজন পুরুষ কন্ঠস্বর।

সাদা পাঞ্জাবী পাজামা পরা লম্বা একজন ভদ্রলোক, কপালে লম্বা লাল তিলক, গলায় রুদ্রাক্ষমালা, হাতে অনেকগুলো লাল সুতা, একমুখ দাড়ি, মাথায় ঝাকড়া চুলের বাহার মানে একজন সাধক পুরুষ বলতে যেরকম টা বোঝায় ঠিক সেরকম। আমি আসতে বলায় উনি চেম্বারের ভিতর এসে একটা চেয়ার টেনে আমার টেবিলে হাত রেখে শিরদাঁড়া সোজা করে আমার চোখে চোখ রেখে বলতে শুরু করলেন, "আমার মা খুব অসুস্থ ডাক্তারবাবু। আপনাকে একবার দেখতে যেতে হবে। চেম্বারে নিয়ে আসার মতো পরিস্থিতি নেই।" পরিস্থিতিটা কতোটা জটিল সেটা সম্পূর্ণ বুঝতে না পারলেও একটা আন্দাজ করতে পারছি। "আপনার মায়ের বয়স কতো?" আমি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করায় উনি বললেন "এই ধরে নিন আসির উপরে। সঠিক বয়সটা আমি সত্যি বলতে কি জানিনা।" বুঝলাম, এখন বাইরে আর কয়েকজন রোগী বসে আছেন তাই উনাকে বললাম "চেম্বার শেষ করে যাচ্ছি। আপনি ঠিকানা টা লিখে দিয়ে যান মিঠুনের কাছে সাথে আপনার ফোন নাম্বারটা।" ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বললেন "অনেক ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু। আমি ঠিকানা এবং ফোন নাম্বার লিখে দিয়ে যাচ্ছি, আপনি শুধু আসার আগে একটু জানিয়ে দেবেন যে আপনি আসছেন। আমি নিচে নেমে আসবো। আমার বাড়ি হেমন্ত মিষ্টির দোকানের গলিতে।" আমি হেমন্ত মিষ্টির দোকানটা আগে থেকেই চিনতাম। ওখানকার জলভরা তালশাঁস,,,  উমমম, ভাবলেই জিভে জল আসে। "হেমন্ত মিষ্টির দোকান মানে কি বরানগরের হেমন্ত সুইটস?" ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করাতেই উনি সম্মতিসূচক হাসি দিলেন। "আমি চলে যাবো, নিশ্চিন্ত হয়ে যান। জায়গাটা আমার চেনা, শুধু আপনার ফোন নাম্বার লিখে দিয়ে যান, আমি ওখানে গিয়ে ফোন করে দেব। আপনি নিচে নেমে আসবেন তখন।" ধন্যবাদ জানিয়ে ভদ্রলোক চলে গেলেন। আর আমি আবার বাকি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

চেম্বার শেষ করতে করতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। আমি চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম আর মিঠুন সাইকেল নিয়ে আমায় টাটা করে চলে গেলো ওর বাড়ির দিকে। আমি স্কুটার টা নিয়ে ঘুরে গেলাম বরানগরের দিকে, গন্তব্য হেমন্ত সুইটস। নির্দিষ্ট গন্তব্যে এসে ফোন করলাম ভদ্রলোককে। "ডাক্তারবাবু এগিয়ে আসুন সোজা। দেখুন মায়ের মন্দিরের উল্টোদিকের বাড়িটা।" আমি একটু সামনের দিকে এগিয়ে এলাম। দেখলাম এক বড়ো মন্দির আর তার ভিতরে শ্মশানকালী। মন্দিরে অসম্ভব ভিড় আর তার সামনে অজস্র মানুষ কেউ ধূপ হাতে বা কেউ মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। লাল জবায় মোড়া পুরো মন্দির প্রাংগন আর চারিদিকে ধূপের ধোঁয়া। অদ্ভুত এক মায়াবী পরিবেশ। "ডাক্তারবাবু এদিকে আসুন, উপরে তাকান,, এই যে। একতলায়।" উল্টো দিকে তাকিয়ে দেখি এক বিশাল দালানবাড়ী। আমি স্কুটারটা ভিতরে ঢুকিয়ে দাঁড় করালাম। চেম্বারের ব্যাগটা নিয়ে উঠলাম উপরে। "ডাক্তারবাবু এই যে এদিকে আসুন।" আমি সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে  বেঁকে গেলাম। একটা পুরোনো দিনের বাড়ি, বিশাল দালান, জানালায় খিড়কি আর বিশাল উঁচু উঁচু ঘর, কড়িকাঠের ছাদ। একটা বড় ঘরে একটা পালংক আর তাতে একজন শীর্ণকায় বয়স্ক মহিলা শুয়ে আছেন, পাশে অক্সিজেনের সিলিন্ডার, নেবুলাইজার মেশিন, একজন সিস্টার আমায় দাঁড়িয়ে উঠে সম্মান জানিয়ে বললেন "আসুন স্যার।" আমি এগিয়ে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে পাশে বসলাম পালংকের যেখানে রোগী শুয়ে আছেন। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করায় ভদ্রলোক বলে উঠলেন "আমার মা শয্যাশায়ী দীর্ঘ তিন বছর। মাথায় রক্ত জমে গেছিলো। ডাক্তারবাবুরা তখন বলেছিলেন আর বেশিদিন নয় কিন্তু মায়ের ইচ্ছায় এখনো আছেন উনি। রোজ মৃত্যুঞ্জয়ী জবা মাথায় ঠেকানো হয়। এই কয়েক দিন হলো খুব জ্বর। আজ কৌশিকী অমাবস্যা। মন্দিরে পূজাপাঠ করবো কিন্তু মায়ের শরীরের যা অবস্থা এখনো নামতে পারিনি।" মাসিমার শীর্ণকায় শরীর, নাকে অক্সিজেনের নল এবং খাবার যাওয়ার রাইলস টিউব, ক্যাথেটার করা আছে প্রস্রাবের জন্য যাতে প্রস্রাব জমে নাই আর চেতনা নাই বললেই চলে, চোখ বোজা শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসের ওঠানামা লক্ষ্যণীয় পাঁজরে। আমি আমার সবরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ভদ্রলোককে বললাম "অসুখ টা কিন্তু গুরুতর। ব্লাড প্রেসার খুব কম, পালস্ খুব স্লো, দেহে অক্সিজেনের মাত্রা ৭০%, গায়ে অসম্ভব তাপ। ডাক্তারী ভাষায় আমরা বলি উনার সেপ্টিসিমিয়া হচ্ছে যেটার কারণ কোনোখানে লুকানো একটা ইনফেকশন। " ভদ্রলোক সবটা খুব মন দিয়ে শুনলেন। তারপর খুব চিন্তাস্বরে আমায় বললেন "তাহলে কি করা যায় বলুন তো।" আমি উনাকে মাসিমাকে হসপিটালে ভর্তির পরামর্শ দিলাম। উনি হঠাৎ আমার দিকে চেয়ে বললেন "হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যাবে সেটা কোনো অসুবিধের নয় কিন্তু আজ রাত্রে তো কোনোভাবেই সেটা সম্ভব না। আজ কৌশিকী অমাবস্যা, মাকালীর পূজা ছেড়ে দিয়ে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। আগামীকাল সকাল ১১টায় অমাবস্যা ছেড়ে যাবে। তারপর মা কে ভর্তি করা যাবে।" এই বক্তব্য শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলাম রোগীর দিকে। আমার স্যার আমায় বলতেন অচৈতন্য রোগীর যন্ত্রণা অনুভব করে চিকিৎসা করবে। আমি রোগীর যন্ত্রণার আগে রোগীর পরিবারের মানসিকতা দেখে খুব যন্ত্রণাক্লিষ্ট। হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ থাকার পর আমি বললাম "আপনি বুঝতে পারছেন না দাদা, মাসিমাতো আজ থেকে নয় বহূদিন ধরে রোগে শয্যাশায়ী। কিন্তু আপনি আজ আমায় ডাকলেন কেন, কারণ আপনিও জানেন মাসিমার হালটা রোজকার দিনের মতো নয়। সকাল থেকে প্রস্রাব হয়নি, অক্সিজেন কমে গেছে, প্রেসার পালস্ দুটোই কম, উনার শারীরিক হালটা ক্রমশ খারাপতর হতে লেগেছে। আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন বাড়ি কখনওই হাসপাতালে রূপান্তরিত হতে পারে না। উনার আধুনিক চিকিৎসার সাহায্য দরকার এবং সেটা খুব তাড়াতাড়ি।" ভদ্রলোক আবারও চুপ, যাক আমি আস্বস্ত হলাম যে উনি হয়ত বুঝতে পেরেছেন। চিকিৎসার সঠিক দিশায় এবার মাসিমাকে আনা যাবে। কিন্তু ঠিক তখনই আমায় ভদ্রলোক বললেন "কি মনে হচ্ছে, কাল সকাল ১১টা পর্যন্ত টানা যাবে? অমাবস্যা চলাকালীন আমি মা কে ভর্তিও করাবো না আর গায়ে ছুঁচও ফোটাতে দেবো না। তাতে যদি উনি মারাও যান তাতেও কোনো দু:খ নেই। যদি মায়ের আত্মা উঠতেই হয় অমাবস্যার রাত্রে তাহলে আমার বাড়ি থেকেই উঠুক, জয় মা,,, মা গো।"

কাল অনেক রাত্রে বাড়ি ফিরেছি। হোম কল টা করে সোজা চলে গেছিলাম কুটিঘাটে। এক কাপ চা নিয়ে গঙ্গা  নদীর দিকে চেয়ে চুপ করে বসেছিলাম। আমার পাশে একটা কালো কুকুর বিস্কুট খাওয়ার লোভে লেজ নাড়িয়ে আমার দিকে চেয়েছিল। অমাবস্যার রাত্রি আর যাই হোক কুকুরের খিদে মেটাতে পারেনি। শুধু মানুষের মনের ভিতর কুসংস্কার টা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কলকাতার মতো একটা এত্ত বড় শহরে এখনো এই ধরনের মানুষ বাস করেন সেটা না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। স্বাধীনতার ৭৫বছর পেরিয়ে গেলো কিন্তু এখনো মানুষের মনের জরা কাটলোনা। এখনো মৃত্যুঞ্জয়ী ফুল, ঝাড়ফুঁক, অমাবস্যার মতো অপবিজ্ঞাপনে বিশ্বাস করে মানুষ। ভেন্টিলেশন থেকে বেরিয়ে এসে মানুষকে নতুন জীবন দেওয়া হলেও মানুষের সংস্কারকে অপবিজ্ঞানের রোগ থেকে বের করা যায় নি। আমি জানিনা শেষমেশ মাসিমা ইহলোকের মায়ার বাঁধনে আটকে পড়লেন কিনা, কিন্তু আমি তান্ত্রিক মহল থেকে একরাশ হতাশাজনক মন নিয়ে বেড়িয়ে পরেছিলাম। কথায় বলে মা গঙ্গা  সকল দু:খ, গ্লানি ধুয়ে দেয়। তাই কুটিঘাটের গংগায় দীর্ঘ সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফিরতেই মা বললো "প্রসাদ রাখা আছে তাকের উপর, আজ অমাবস্যার পূজা ছিলো, খেয়ে নিস।" মায়ের দিকে কটমট করে চেয়ে আমি বললাম "প্রসাদ আমি খাবো না, তুমি খেয়ে নাও।" শুনেই মা চেল্লাতে শুরু করলো, "মায়ের প্রসাদ খাবি না, তোর কি স্পর্ধা, জানিস কত মানত  করি তোর জন্য মায়ের কাছে। দিনদিন অমানুষ হয়ে যাচ্ছে।" আমি মনে মনে আমার মা কে বললাম, ঠিকই বলেছো মা, আমি অমানিশার অমানুষ।

...(সমাপ্ত)...

Friday, January 13, 2023

ষড়রিপু (৬ ) : কাম অথবা

 

ছবি : দিব্যেন্দু গড়াই 

কাম অথবা 

দিব্যেন্দু গড়াই 


“সেই আমাকে অধিক পায়

যে আমাকে কামের চুলায়

কাঠের মত পুড়িয়ে দেয়। 

সেই আমাকে অধিক পায়

যে আমাকে নাড়ায় না

যে আমাকে স্বাধীন রাখে

সে আমাকে হারায় না। ”

বিয়ের ছ'বছর যেতে না যেতেই সঙ্গীতা আর পল্লবের ছোট্ট সংসারে ঢুকেছিল সন্দেহের বিষ। প্রথমে দু-এক ফোঁটা, তারপর গ্যালন গ্যালন। অথচ বিষে জর্জরিত হওয়ার কথা ছিল না। বরং উল্টোটাই হওয়ার কথা ছিল। বিয়ের আগে পাঁচ বছরের প্রেম। পল্লব কলেজে আর সঙ্গীতা স্কুলে। একটি কোচিং সেন্টারে দেখা হয়েছিল দু-জনের। সঙ্গীতা স্টুডেন্ট আর পল্লব টীচার। উচ্চমাধ্যমিকের ইংলিশ ব্যাচে স্টুডেন্টের সংখ্যা ছিল কম, ছাত্রীর সংখ্যা আরও কম। মোটে দুই। সঙ্গীতা আর মোহনা। মোহময়ী মোহনাকে ছেড়ে সাধাসিধা সঙ্গীতাকে ভালো লেগেছিল পল্লবের। হয়ত নিজেও সে একটু মুখচোরা বলে। তারপর আর কি, চাকরির পরীক্ষা দিয়ে বারবার অকৃতকার্য হয়ে পাকাপাকি ভাবে টিউশনকেই ভবিষ্যতের পাথেয় করে নিয়েছিল পল্লব। আর প্রেমের পাঁচ বছর পূর্তিতে সঙ্গীতার সাথে গিয়েছিল ছাদনাতলায়। দুজনের ঘরকন্না চলছিল যেমন চলে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়িতে। পল্লবের মা-বাবা মারা গিয়েছিল আগেই। তাই ছোট্ট সংসারে সঙ্গীতার ব্যস্ত হওয়ার মত কাজ কিছুই ছিল না। প্রায় সারাদিন তিন-চারটে কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে বেড়ানোয় পল্লবও সময় পেত না তেমন বৌ-কে সময় দেওয়ার। দুজনের মধ্যে ধীরে ধীরে  তৈরী হচ্ছিল ফাঁক। আর সেই ফাঁক দিয়েই অনুপ্রবেশ ঘটল তমালের। পল্লব যে কটি কোচিং সেন্টারে পড়াত, তার একটির মালিক ছিল তমাল হালদার। বাবার ছিল শাড়ির ব্যবসা, ছেলেকে চেয়েছিল উকিল করতে। বাপের সে আশায় জল ঢেলে, কোচিং সেন্টার খুলে বসেছিল তমাল। 

প্রথম প্রথম কোচিং-এর অনুষ্ঠানে দেখা-সাক্ষাৎ  হত। আস্তে আস্তে পল্লবের উপস্থিতিতে বাড়িতে অনুপ্রবেশ। কিছুকাল পরে পল্লবের অনুপস্থিতি সঙ্গীতা আর তমালের সাক্ষাৎ এর সময় হয়ে দাঁড়ালো। আদ্যপ্রান্ত গৃহবধু সঙ্গীতার প্রাথমিকভাবে অনিচ্ছা থাকলেও শেষ অব্দি তমালের কাছে আত্মসমর্পণ করল। বিয়ের চার-পাঁচ’বছর পড়েও সন্তান না হওয়ার সঙ্গীতা ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল মানসিক ভাবে। এদিকে পল্লবের সময় নেই। সুযোগসন্ধানী তমাল সেই সুযোগটাই নিল।

ষড়রিপুর প্রথমটি বেজায় আঠালো। একবার এর ফাঁদে পড়লে আর নিস্তার নেই। তখন আর স্থান-কাল-পাত্র কিছুই খেয়াল থাকে না। আর ঐ বেখেয়ালি অবস্থার চরম মুহূর্তে ওরা ধরা পড়ে গেল পল্লবের কাছে। 

সেদিন খুব তাড়া ছিল পল্লবের। কাশিমবাজার স্টেশনের কাছে একটা ব্যাচ পড়িয়ে যাওয়ার কথা ছিল খাগড়ায় আরেকটা কোচিং এ। আগের স্টুডেন্টরা দেরী করে আসায় পড়ানো শেষ  করতে এতটাই দেরী হয়ে গেল যে তড়িঘড়ি বাইক চালাতে গিয়েই বিপত্তি। খাগড়ার সোনাপট্টির সরু গলিতে সাইকেল রিক্সার সাথে মুখোমুখি ধাক্কায় রাস্তায় ছিটকে পড়েছিল পল্লব। ডান হাটুঁটা বেজায় ফুলে গেছিল। ভাগ্যিস রিক্সা বা ওর বাইকের তেমন ক্ষতি হয়নি। পরের কোচিং ক্যানসেল করে কোনরকমে বাড়ি ফিরেছিল পল্লব। ঘড়িতে তখন দুপুর দেড়টা। কলিং বেল বাজানোর অনেক পরে দরজা খুলেছিল সঙ্গীতা। চেহারার অবিন্যস্ত ভাব ঢেকেঢুকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল। তার সাথে বসার ঘরে তমাল’কে দেখে মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল পল্লবের। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তমালের ওপর সর্বশক্তি দিয়ে। কিছুক্ষণ ধরে চলল তুমুল মারপিট। যার পরিণতি ঘটল একজনের মৃত্যুতে। 

যথারীতি পুলিশ এল। গ্রেপ্তার করা হল। আইন-আদালত সবকিছুই চলল নিজের মত। আর এইসময় বহরমপুর সংশোধনাগারে মনোবিদ বিশাখা বসু রায় সংস্পর্শে এসেছিল সঙ্গীতার। আত্মরক্ষার কারণে সঙ্গীতার হাতে মৃত্যু হয়েছিল পল্লবের। দাম্পত্য কলহের জেরে বউয়ের গায়ে হাত তোলা ছিল পল্লবের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যপার। সেদিনও মারধোর খাচ্ছিল সঙ্গীতা। কিন্তু অন্যদিনের থেকে সেদিনটা ছিল আলাদা। সেদিন  রুখে দাঁড়িয়েছিল সঙ্গীতা। মেটালের ফুলদানি দিয়ে আঘাত করেছিল নিরুপায় হয়ে। জানে মেরে দেওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিল না সেটা বলাই বাহুল্য, তবে দুর্ঘটনার ওপর ভগবান ছাড়া কারও হাত থাকে না। তাই পল্লবের নিষ্প্রাণ দেহ দেখে থানায় ফোন করেছিল সঙ্গীতা নিজেই। পাড়া-প্রতিবেশীকেও খবর দিয়েছিল। 

তমালের কোন চিহ্ন ছিলনা সে সময়। তাই বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কথা তদন্তে উঠে এলেও জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া তমাল’কে কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। আর আদালতেও শেষমেষ সঙ্গীতা নিরপরাধ প্রমাণিত হয়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার দিন তমাল এসেছিল সঙ্গীতাকে সাথে করে নিয়ে যেতে। শুধু সঙ্গীতা নয়। ওর কোলে সঙ্গীতার কন্যাসন্তানও ছিল। তিন মাস বয়স। জেল থেকে ছাড়া পাবার পরেও কোন এক অজানা কারণে বিশাখা বসু রায়ের সাথে যোগাযোগ রয়ে গেছিল সঙ্গীতার। তাই তমালের সাথে সংসারী জীবনে মেতে থাকার সময় সবকথা খুলে বলেছিল সঙ্গীতা। 

সেই দুর্ঘটনার কিছু দিন আগেই সঙ্গীতা জানতে পেরেছিল তার দেহে বাসা বেঁধেছে তার আর তমালের ভ্রূণ। তমালের সঙ্গ ভালো লাগতে শুরু করেছিল ওর। তমালের মধ্যেও পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিল। ওর প্রতি যত্নবান হয়ে উঠছিল তমাল। শুধু শয্যায় নয়, শয্যার বাইরেও ওকে স্পেস দিতে শুরু করেছিল তমাল। পল্লবকে ডিভোর্স দিয়ে তমালের সাথে নতুন করে সংসার পাতার প্ল্যান নিয়েও আলোচনা করেছিল দুজনে। আর এর মধ্যেই সেই দুর্ঘটনা। তমাল পল্লবের আক্রোশের চাপে ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়ছে দেখে সঙ্গীতা টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিয়েছিল মেটালের ফুলদানি। তারপর পিছন থেকে পল্লবের মাথা লক্ষ্য করে দু-ঘা। তমাল’কে দ্রুত সরিয়ে দিয়ে নিজে ধাতস্থ হয়ে পুলিশ, প্রতিবেশী সবাইকে খবর দিয়েছিল। এরপরের ঘটনা তো পুলিশ-আদালত সবাই জানে। 

প্রথম রিপু না সন্তানস্নেহ, কার মধ্যে ফেলবে এই ঘটনাকে মনোবিদ বিশাখা বসু রায় তা আজও ঠিক করে উঠতে পারেনি।

...(সমাপ্ত)...




Thursday, April 1, 2021

ক্যাপ্টেন ভেড়ি

 (ধারাবাহিক রহস্য কাহিনী )

ছবি : ইন্টারনেট
তরুণ চক্রবর্তী

পূর্ব কথন -   ক্যাপ্টেন ভেড়িতে সম্প্রতি এক অজ্ঞাত পরিচয় মহিলা খুন হয় । অঞ্চলটা পরমা আইল্যান্ড থানার মধ্যে পরে । পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী মহিলাকে শ্বাসরোধ করে  খুন করা হয়েছে । থানার বড়বাবু দিবাকর , সেকেন্ড অফিসার নকুরকে দায়িত্ব দেয় ইনভেস্টিগেসানের জন্য । দিবাকর ও নকুর বড়বাবুর ঘরে জরুরী কথা বলছিল , এইসময় হঠাত ঘরে ঢোকে প্রাক্তন সিভিক ভলেন্টিয়ার সতু ওরফে সত্যবান চৌধুরী ।সতু দিবাকরকে জানায় ঘটনার সময় ও ওখানে ছিল। দিবাকর সতুর কাছে সব শুনে সতুকেই খুনী বলে সন্দেহ করে এবং সতুকে চাপে ফেলে দেয় । 


(শেষাংশ)
————-
(পাঁচ )

 বাড়ি ফিরে ক্লান্ত সতু তার এক ঘরের কামরার ,ছোট্ট বিছানায় শরীর ছেড়ে দিল।শরীর ,মন কোনটাই আর পারছে না।একে কোন বাঁধা রোজগার নেই , তারপর বড়বাবুর এই হুমকি সতুকে পুরো বিধ্বস্ত করে দিয়েছে । সতু থাকে ব্যারাকের মতো একটা বস্তিতে । কমন বাথরুম । সতুর দেশ জঙ্গল মহলে । বাড়ির সবাই ওখানেই থাকে । ওই শুধু পেটের তাগিদে কোলকাতার এই বস্তিতে । ঘরে শুধু ছোট বিছানা । আর কিছু বই । সবই বাংলা গোয়েন্দা উপন্যাস । বিশেষ করে ব্যোমকেশ । সতুর প্রিয় গোয়েন্দা । গ্রাজুয়্যাট সতুর খুব ইচ্ছে ছিল বড় গোয়েন্দা হবে ।তার বদলে কিছুদিনের জন্য জুটেছিল সিভিক পুলিশের চাকরী । তাও এখন নেই । এরপর বড়বাবু যা বললো , গোয়েন্দা থেকে না অপরাধী বনে যায় । 
 ক্লান্ত সতুর চোখের সামনে হটাত সেই লোকটার হাঁটার ভঙ্গিটা ভেসে উঠল । সতু স্পষ্ট মনে করতে পারলো , লোকটা বাঁ  পাটা একটু টেনে টেনে হাঁটছিল । তার মানে বাঁ পায়ে জোর কম আছে । তার মানে …। 
 দিবাকরের মোবাইলের স্ক্রিনে সতুর নামটা ফুটে উঠল। যা সেভ করা আছে ‘ বাঞ্চোত সতু ‘ বলে । তার সাথে … হুর হুর দাবাং , দাবাং ……রিং টোন তো আছেই । 
— বল । 
— স্যার , একটা কথা জিগ্যেস করার ছিল । ক্রাইম সিন থেকে কোন ফুট প্রিন্ট নেওয়া হয়েছে ? সতু জিগ্যেস করে । 
— কি জানতে চাস বলত । আমি তো এখন  পুরো ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে বসে নেই । রামের বোতল নিয়ে বসে আছি । তুই বরঞ্চ তোর প্রশ্নগুলো একসাথে করে রাখ । আমি উত্তর গুলো বার করে রাখব । কালকে থানায় এসে আমার সাথে কথা বলে নিস । এখন আমাকে রাম খেতে দে । 
— ঠিক আছে স্যার । সতু লাইন কেটে দেয় । 

(ছয় ) 

  পরমা আইল্যান্ড থানায়,  বড়বাবুর ঘরে,  দিবাকরের  সামনে সতু বসেছিল । সকাল দশটা । থানার ব্যস্ততা সবে শুরু হয়েছে । 
— বল তোর কি কি তথ্য দরকার । ওখানে অনেক ফুটপ্রিন্ট পাওয়া গেছে । শুধু একজোড়া ফুটপ্রিন্ট দেখে মনে হচ্ছে লোকটার বা পায়ে জোর কম আছে । কিন্তু তোর হটাত এই প্রশ্ন মনে এলো কেন ? দিবাকর সতুর দিকে তাকায় । 
— আসলে স্যার লোকটা  বাঁ পাটা একটু টেনে টেনে হাঁটছিল । তাই মনে হোল । 
— বাঃ ! তুই তো দেখছিস পুরো গোয়েন্দা হয়ে উঠছিস । 
সতু লজ্জা পায় । 
— তুই তো ওই অঞ্চলেই তোলাবাজি করিস । লোকটাকে একদম চিনতে পারিসনি ? সত্যি কথা বলতো ? 
— না স্যার ।তখন মাথায় আসেনি ,  তবে এখন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে । সতু বলে । 
— সে কিরে ? কে ? 
জবাবে সতু যার নাম করে , দিবাকরের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয় । দিবাকর উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে আসে । তারপর সতুর সাথে তলিয়ে যায় গভীর আলোচনায় । 
 
  (সাত) 

 দিন সাতেক পরে । 
 দিবাকর তার ঘরে সবাইকে ডেকেছে । জরুরী মীটিং । সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দিবাকরের জন্য । 
 কিছুক্ষণের মধ্যেই দিবাকর ঢুকল । সবাই অবাক হয়ে দেখল দিবাকরের সাথে সাথে ঢুকছে সতু । 
 দিবাকর তার চেয়ারে বসার পরে সবাই নিজের নিজের জায়গায় বসে । দিবাকর সতুকে তার পাশের চেয়ারে বসায় । সবার ভ্রু একটু কুঁচকে ওঠে । বিশেষ করে নকুর আর সনাতনের । 
  দিবাকর তার বক্তব্য শুরু করে । 
 — আমরা সবাই জানি কিছুদিন আগে ক্যাপ্টেন ভেড়িতে একটা হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে । একজন মহিলাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে শ্বাসরুদ্ধ করে খুন করা হয় ।পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে মহিলা প্রেগন্যান্ট ছিল ।  কেসটা খুব জটিল  । কারন ঘটনাস্থল সি .সি  ক্যামেরার কভারেজে ছিলনা । ফলে অপরাধীর চেহারা সম্বন্ধে আমাদের কোন ধারনা ছিলনা । এসব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীদের একটা বিরাট ভূমিকা থাকে । এখানে সেরকম কেউ এগিয়ে আসেনি । একমাত্র সতু ছাড়া । কিন্তু সেও কুয়াশার মধ্যে , মাফলারে মুখ ঢাকা অপরাধীকে চিনতে পারেনি । এমন কি ভিক্টিমকে আইডেন্টিফাই করার জন্যও কেউ এগিয়ে আসেনি । তবু এতো অসুবিধার মধ্যেও , সতু, হাঁ সতুর সাহায্যে আমরা অপরাধীকে সনাক্ত করতে পেরেছি । শুধু গ্রেপ্তার করা বাকি । 
  ঘরে পিন পরলেও শোনা যাবে এরকম নৈঃশব্দ্য । 
 দিবাকর আবার শুরু করে । 
—   সতু অপরাধীকে চিনতে না পারলেও তার হাঁটাটা খেয়াল করেছিল । একটু বাঁ পা টেনে হাঁটে । ঘটনাস্থলে সেরককম কয়েক জোড়া ফুট প্রিন্টও পাওয়া যায় । কিন্তু শুধু এটুকু সূত্র দিয়ে তো আর অপরাধী ধরা  যায়না । আর অপরাধের জায়গায় কোন ফিঙ্গার প্রিন্টও পাওয়া যায়নি । তবে সতু আর আমার মাথায় একজনের কথা আসে যে আমাদের দুজনেরই পরিচিত । এমনকি আপনাদেরও । 
 ঘরে যেন নি:শব্দ বজ্রপাত হোল । 
— আমরা তার মোবাইল নাম্বার জানতাম । ঘটনার দিনের কল ডিটেলস্ আর টাওয়ার লোকেশান জোগাড় করলাম । কিন্তু টাওয়ার লোকেশান ঘটনাস্থলের সাথে মিললো না। কিন্তু কল লিস্টে দেখা গেল ,একটা নাম্বারে অনেকবার কল গেছে আর এসেছে । আর ওই নাম্বারটার ওই দিন  কিছু সময়ের জন্য লোকেশান  ছিল , অপরাধ যেখানে ঘটেছে সেখানে । রাত নটার পর থেকে অবশ্য নাম্বারটা সুইচড্ অফ ছিল । তার মানে অপরাধী , খুনটা করে মোবাইলটা সুইচড অফ করে দেয় । আর সতুর কথা আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী সময়টাও মিলে যায় । কিন্তু আমরা অবাক  ও হতাশ হই যখন দেখি সন্দেহভাজন অপরাধী আর ভিক্টিমের ফোন নাম্বার একই ব্যক্তির নামে । ভিক্টিমকে  সনাক্ত করার শেষ আশাও বরবাদ । যেহেতু সন্দেহ ভাজন লোকটি আমাদের পরিচিত , আমরা সরাসরি ওকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারছিলাম না । কিন্তু আমরা গোপনে খবর নিয়ে জেনেছিলাম , ব্যাক্তিটি মোবাইলটি ঘরে রেখে , ওই সময়ে বাইরে ছিল । নিজের অ্যালিবাই প্রমাণ করার জন্য ।  
   দিবাকর একটু থামল। সামনে রাখা গ্লাস থেকে একটু জল খেল । তারপর আবার শুরু করলো । 
— আমাদের কাছে তখন বড় হয়ে দাঁড়ালো সেই ব্যক্তির সাথে ভিক্টিমের সম্পর্ক প্রমাণ করা । তাহলে অন্তত আমরা যে ঠিকপথে এগোচ্ছি সেটা বোঝা যাবে । আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে , কিছুদিন আগে , সার্ভিস বুকে  ব্লাড গ্রুপ লিখতে হবে বলে আপনাদের সবার কাছ থেকে ব্লাড নিয়েছিলাম ।সেই ব্লাড থেকে আমরা খুন হয়ে যাওয়া মহিলার ভ্রূণের ডি .এন. এ টেস্ট করাই । আমাদের সন্দেহভাজন ব্যাক্তির সাথে ম্যাচ করে যায় । আমরা নিশ্চিন্ত হই আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি । কিন্তু আমাদের এখনো তিনটে বড় কাজ বাকি , আইনের কাছে অপরাধ প্রমাণ করে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য । এক,  ভিক্টিমের আইডেন্টিফিকেশন ; দুই ,মোডাস অপারেন্ডি; তিন, অপরাধের মোটিভ  । আর সত্যি কথা বলতে নকুর বা সনাতন নয় , এ ব্যাপারে আমাদের একমাত্র হেল্প করতে পারে জনার্দন । কিরে জনার্দন , তাইতো ? 
  জনার্দন তখন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে । হাত জোড় করে দিবাকরের উদ্দেশে বলতে শুরু করেছে … 
— আমাকে ফাঁসিতে চড়ান বড়বাবু । আমি আর পারছিলাম  না । রোসির পেটে বাচ্চাটা আসার পরেই ও চাপ দিতে শুরু করে বিয়ে করার জন্য । বলুন তো স্যার, দেশে আমার বালবাচ্চা আছে।  ওরকম বললেই বাঁধা বাবু থেকে হাসব্যান্ড হওয়া যায় । তাই ওকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলাম । ঘটনার দিন ফোন করে ওকে ক্যাপ্টেন ভেড়িতে ডেকে আনলাম । ঘুমের ওষুধ আগেই কিনে রেখেছিলাম । গল্প করতে করতে মাঝখানে উঠে গিয়ে চা- পানি আনতে গিয়ে চায়ের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলাম । রোসি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো । তারপর জায়গাটা একদম ফাঁকা হতেই , গ্লাভস  পড়ে রোসির গলাটা টিপে ধরলাম । কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে যায় । সংসার বাঁচানোর জন্য এছাড়া আমার কি করার ছিল বলুন স্যার ? 
— সংসার কি বাঁচল ? দিবাকর জিগ্যস করে । 
 জনার্দন  মাথা নিচু করে । 
 দিবাকর নকুরের দিকে ইশারা করে , নকুর , জনার্দনের হাতে হাতকড়ি পড়িয়ে নিয়ে যায় থানা হাজতের দিকে । 

(আট) 

দিবাকরের ঘর এখন ফাঁকা । শুধু সাতু আর দিবাকর বসে আছে । 
— তুই তো কামাল করে দিলি । আমি ডি. সি ( ডি .ডি ) কে বলেছি তোকে গোয়েন্দা দপ্তরে একটা পাকা কাজ দেওয়ার জন্য । উনি সব শুনে খুব ইমপ্রেসড্ । মনে হয় কাজটা হয়ে যাবে । দিবাকর বলে । 
— তাহলে এখন আমি যাই ?  সতু জিগ্যেস করে । 
— হ্যাঁ । সাবধানে যাস । 
সতু থানা থেকে বেড়িয়ে আসে । থুড়ি , সতু নয় , সত্যসন্ধানী সত্যবান চৌধুরী । 
(সমাপ্ত)   
tchak1961@gmail.com
কলকাতা 

পূর্ব কথন ১ 

পূর্ব কথন ২  


Wednesday, October 21, 2020

ব‍্যোম - পুনরাবির্ভাব

 

ছবি : লেখকের 
                                                        দিব‍্যেন্দু গড়াই

স্থান- বিশদিঘি, ঈশ্বরীগঞ্জ

কাল- ব্লু-আওয়ার, ১৩ই অক্টোবর, ২০৩০

পাত্র- দুইজন। একজন কিশোর। বয়স সতেরো। গায়ে ট্রাকস্যুট। আরেকজনের বয়স খানিকটা বেশী। কুড়ি থেকে বাইশের মধ্যে। তার নিম্নাঙ্গে অন্তর্বাস ছাড়া কিছুই নেই। সেটাও ভিজে সপসপ করছে। ঠান্ডায় কাঁপছে ছেলেটি। 

-‘তোমাকে বেশ চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কে বলতো তুমি?’ কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করে ছেলেটি। 

-‘তুমি কে?’ 

-‘আমি ফিরোজ। আর তুমি?’

-‘মাণিক সর্দার।’

-‘মাণিক সর্দার। মানে...  তুমি... তুই কি শঙ্করের ভাইপো?’

-‘হ্যাঁ। তুমি.. মানে... আপনি কাকা’কে চেনেন?’ দারুণ অবাক হয় মাণিক। 

-‘চিনি মানে, আমরা হলাম এক বৃন্তে দুইটি কুসুম। প্রাণের বন্ধু রে আমরা। কিন্তু একটা কথা বল, তুই হঠাৎ এত বড় হয়ে গেলি কি করে?’

*****

কিছুক্ষণ আগের ঘটনা...

রাতের ঘন অন্ধকার কিছুটা ফিকে হয়েছে। ভোরের আলো ফুটতে দেরী আছে খানিকটা। রাত আর ভোরের এই মধ্যবর্তী সময়ে চারিদিকটা অপার্থিব সুন্দর নীল রঙে ভরে যায়। বেশ লাগে মাণিকের এই ব্লু-আওয়ার। তার মনে হয় আকাশের ঐ অদ্ভুত নীল রঙ চুঁইয়ে পড়ে গা-মাথা ভিজিয়ে দিচ্ছে। ভিজতে ভিজতে এইসময় রোজ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়ে সে। সাইকেল চালিয়ে এক একদিন এক এক দিকে চলে যায়। আজ যেমন নৈর্ঋত দিকের পালা। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ-ঈশান-অগ্নির পর আজ নৈর্ঋত দিক। মস্ত দিঘি রয়েছে এ দিকটায়। এদিকের রাস্তায় এখন লোকজন বেশ কম থাকে। মৃদু আলোকিত পাকা রাস্তায় সাইকেল চালাতে চালাতে বেশ শীত করছিল মাণিকের। দিঘির যত কাছে যাচ্ছিল ক্রমশঃ বাড়ছিল ঠান্ডার পরিমাণ। বাঁধানো দিঘির পাড়ে যখন সাইকেল থামাল তখন পুবের আকাশের নীল রঙে মিশে গেছে লাল। আর সেই লালচে আভায় দিঘির শান্ত, কালো জলে মৃদু আলোড়ন দেখে একটু থমকে দাঁড়াল মাণিক। নিস্তব্ধ, নিদ্রিত, ধীর-স্থির প্রকৃতির মাঝে কিছুটা বেমানান সেই আলোড়নের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মাণিক। নিজের কানে নিজের দ্রুত হৃদস্পন্দন শুনতে পারছিল। ক্ষণিকের বিরতি… আর তারপরেই জল থেকে উঠে এল একটি মুখ। ধীরে ধীরে ছেলেটির জলে ভেজা দেহ প্রকট হল… বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল মাণিক। 

****

“আইনস্টাইন-রসেন ব্রীজ আসলে একটা ওয়ার্মহোল। একটি চতুর্মাত্রিক টানেল যা মহাবিশ্বের দুটি ত্রিমাত্রিক বিন্দুকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করে। হতে পারে সে বিন্দু দুটি পৃথক দুই জগৎ, হতে পারে সে দুটি ভিন্ন দুই সময়। মানে বর্তমান সময়ের সাপেক্ষে অতীত বা ভবিষ্যৎকাল। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের সাথে তাত্ত্বিক ভাবে এই ওয়ার্মহোলের জোরালো সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু সত্যিই এর অস্তিত্ব আছে কিনা, তার প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।”

অনলাইন ক্লাসে ফিজিক্সের এক প্রফেসরের লেকচার শুনতে খুব ভালো লাগে মাণিকের। বাংলা- ইংলিশ দুটো ভাষায় সমান দক্ষ সেই বাঙালি প্রফেসর থাকেন উত্তরাখন্ডে। নাম উত্তীয় বাসু। সামনাসামনি আলাপ না থাকলেও ওনার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয় মাণিকের। তাঁকে নিজের হাতে তৈরী দূর্গাপ্রতিমা দেখিয়েছে। দেখে উনি খুব খুশি। উনি আরও খুশি হয়েছেন এটা জেনে যে ফিজিক্সের সাথে সাথে ও লোকশিল্প’র মত বিষয় কে গ্র্যাজুয়েশানের সিলেবাসে রেখেছে। আসলে মৃৎশিল্পীর সংসারে ছোট থেকে বড় হয়েছে ও। বাবা-মা’র সাথে ছোট থেকেই মাটির পুতুল তৈরীতে হাত লাগাত ছোট্ট বাপান। মাটির প্রতি সেই টান, সেই ভালোবাসায় ওকে প্রতিমা-নির্মাণ শিল্পে নিয়ে এসেছে। ঠাকুরদা মাটি ভালোবাসত খুব। না, মৃৎশিল্পী ছিল না, তবে মাটির বুকে সোনার ফসল ফলাতে জুড়ি ছিল না অবনী সর্দারের।  শেষে সেই মাটির বুকেই পেতেছিল অন্তিম শয্যা। মাথার ওপরে ছিল ভোরের নীলাকাশ। লালন সাঁইয়ের গান শুনতে শুনতে চোখ বুজেছিল ঠাকুর্দা। তখন মাণিকের কতই বা বয়স! ছয়-সাত হবে। ঐ ঘটনার বছর দেড়েকের মাথায় আরেক দুর্ঘটনা নেমে এসেছিল ওদের পরিবারে। মাণিকের বাবা বিমল সর্দার এক ঝড়জলের সন্ধ্যায় দুখনী নদীর বুকে প্রায় ডুবতে বসেছিল। বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছিল সেবার। তারপর থেকেই দেবদ্বিজে ভক্তির আধিক্য ঘটেছিল বাবা-মা দুজনারই। এমনিতেই ঠাকুর্দা হরিনাম সংকীর্তনে খোল বাজাত। সেটাই ছিল তাঁর পেশা। সে নিজেকে শ্রীহরির চরণে সমর্পণ করেছিল। আর মা-বাবা দুজনায় ভক্ত হয়ে উঠেছিল কালিঠাকুরের। বাড়িতে কালিপুজো শুরু হয়েছিল সেই দুর্ঘটনার পর থেকে। প্রতিমা তৈরি হত বাড়িতেই। মৃৎশিল্পী নিমাই’য়ের পাশে পাশে ঘুরঘুর করত মাণিক। কাঠামো তৈরী, মাটির প্রলেপ দেওয়া, ছাঁচে ফেলে মুখ তৈরি, হাতের আঙুল বানানো, রঙ করা, চোখ আঁকা... একটু একটু করে শিখে নিয়েছিল মাণিক। বছর ছয়েক আগে বিজয়া-দশমীর দিন যখন পড়ে গিয়ে নিমাইয়ের কোমর ভাঙল, সে বছর মাণিক নিজেই কালিঠাকুর  তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। নিমাইও প্রশংসা করেছিল সেই প্রতিমার।

মুর্তি গড়ার সাথে সাথে পড়াশোনাতেও মন ছিল মাণিকের। ক্লাস এইট থেকে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো, বিশেষ করে ফিজিক্স আর ম্যাথেমেটিক্স নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতে কোন অসুবিধে হত না। কোভিড-পরবর্তী পরিবর্তিত দুনিয়ায় তখন ডিসট্যান্ট এডুকেশন স্বাভাবিক ঘটনা। বছর দুয়েক ধরে চলা করোনা ভাইরাসের তান্ডব ভ্যাক্সিন এসেও দমাতে পারেনি। শেষ অব্দি প্রকৃতির আপন নিয়মেই কোভিড মিলিয়ে গেছে বিশ্ব থেকে। কোভিড প্যানডেমিকে ওয়াক ফর্ম হোম, ডিসট্যান্ট এডুকেশন, অনলাইন বিজনেসের চক্করে মানুষের হাতে সময়ও বেড়েছে অনেকটা। পৃথিবীর বুকে করোনার আগমনের দশ বছর কেটে গেছে। এখনও প্রয়োজন ছাড়া অধিকাংশ লোক বাড়ির বাইরে বেরোয় না, বেরোলেও সিংহভাগ মানুষের মুখে থাকে মাস্ক আর হাতে স্যানিটাইজারের বোতল।

*****

সেদিন ঊষালগ্নে ফিরোজ ওরফে মাসার সাথে আলাপ হওয়ার পর থেকে মাণিকের জীবন পাল্টে গেছে। সায়েন্স-ফিকশনের গল্প, সিনেমা, ওয়েবসিরিজের পোকা মাণিক স্বচক্ষে যে ঘটনার সাক্ষী হয়েছে তা প্রথম প্রথম বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু যখন ওর কাকা শঙ্কর দূর থেকেই প্রাণের বন্ধু মাসা’কে চিনতে পেরে ছিল, বলেছিল স্বয়ং ভগবান সামনে এসে বললেও বিশ্বাস করবে না এ মাসা নয়, অন্য কেউ...  তখন মাণিকের মন থেকে অবসান ঘটেছিল সব সন্দেহের। ৩২বছর বয়সী শঙ্কর সর্দারের সাথে ২২ বছর বয়সী রক্তমাংসের মাসার আবার সাক্ষাৎ ঘটেছিল সেদিন। দীর্ঘ দশ বছর আগে খুব ভোরবেলায় যে জায়গা থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছিল, ঠিক সেই  বিশদিঘি থেকেই পুনরাবির্ভাব ঘটল মাসার। তবে পৃথিবীর বয়স দশ বছর বাড়লেও মাসার বয়স একই রয়ে গেছে। এক বছরও বাড়েনি।

কোথায় ছিল সে দশ’টা বছর? বিশদিঘিতে কি সত্যিই রয়েছে ওয়ার্মহোল? যার মধ্যে দিয়ে প্রায় আলোর গতিবেগে টাইম ট্রাভেল করে ভবিষ্যতের করোনামুক্ত পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে মাসা? নিছক দূর্ঘটনা না ঘটলে, মাসা সেদিন শঙ্করের বারণ সত্ত্বেও বিশদিঘির জলে না নামলে আদৌ কি এমন কিছু ঘটত? নাকি রহস্য অন্যকিছুতে লুকিয়ে আছে? প্রশ্ন অফুরন্ত। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানবজাতি নিশ্চয় উত্তরগুলো পাবে একদিন। আর সেই উত্তর জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বিজ্ঞানের ওপর। মাণিকের মাথায় তখন ঘুরছিল প্রফেসর উত্তীয় বাসুর কথাগুলো… 

“চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারকা

কোথা হতে সব সৃষ্ট,

শূণ্য হইতে আসিয়াছে এ

নিরন্তর মহাবিশ্ব।”

শূণ্য তথা ব্যোমে’র ক্ষমতা অসীম। মহাবিশ্বের অধিকাংশ স্থানেই কিচ্ছুটি নেই। বেবাক ফাঁকা। আর সেই শূণ্যস্থানের সূক্ষ্মস্তরে প্রতিনিয়ত ঘটে চলে ভর ও শক্তির অস্থিরতা। বিজ্ঞানের ভাষায় ‘কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন’। হুবহু এক কিন্তু বিপরীত চার্জবিশিষ্ট কণা ও প্রতিকণা তৈরী হওয়ার সাথে সাথে তারা পরস্পরের সংস্পর্শে এসে ধ্বংস হয়ে যায়। ভর থেকে শক্তির রূপান্তর ঘটে, যা আবার মিশে যায় ঐ শূণ্যে। হয়ত এই মহাশূণ্যে এই সৌরজগতের যমজ অথচ বিপরীতধর্মী কোন জগত আছে।  সূর্য, বুধ, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুনের মত সেখানে আরেকটা পৃথিবীও রয়েছে। আর সেই পৃথিবীর বুকে প্রতিটি জীবের মত হুবহু জীব বিরাজ করছে। যদিও তারা আমাদের পৃথিবীর জীবজগতের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। মহাশূণ্যের নিয়মানুযায়ী যদি কখনো এই বিপরীতধর্মী কণা ও প্রতিকণা (ম্যাটার ও অ্যান্টিম্যাটার) পরস্পরের সন্মুখে আসে তাহলে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। পরে থাকবে শূণ্য বা ব্যোম।”

dibyendugarai.dg@gmail.com
কলকাতা 


এই ধারাবাহিকের 

দ্বিতীয় গল্প - অপ:বিশ(বিষ) দিঘি
তৃতীয় গল্প - তেজ-সর্বগ্রাসী
চতুর্থ গল্প  - মরুৎ - সুখের বাতাস

বিষবৃক্ষ

 (ধারাবাহিক রহস্য কাহিনী )



ছবি : ইন্টারনেট

শঙ্খ চৌধুরী ও চিরঞ্জিত ঘোষ

আগে যা ঘটেছে : উত্তরবঙ্গের  চিলাপাতার জঙ্গলে পুলিশ একটি ক্ষতবিক্ষত লাশ পায়। ময়নাতদন্ত পর বেওয়ারিশ লাশটার সৎকার করে দেয় তারা। পরে খবর কাগজের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে যে কলকাতার  নামী হীরক ব্যাবসায়ী ‘সরকার এন্ড সন্স' পরিবারের  জৈষ্ঠ পুত্র শান্তনু সরকারের লাশ ওটি। কেসের তদন্ত ভার এসে পড়ে ইন্সপেক্টর রুদ্রর উপর। যেহেতু এটি হাই প্রোফাইল কেস তাই ইন্সপেক্টর রুদ্র পুলিশের বড় কর্তাদের আদেশ অসুসারে  দুজন শখের গোয়েন্দা হিমাংশু ও অর্ঘ্যর সাহায্য চায়। কথামতো তারা জঙ্গলের গভীরে ঘটনা স্থলে তদন্ত করতে যায়। সেখানে তারা ফরেস্ট অফিসারদের থেকে  জঙ্গলের কিছু পশুর অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর জানতে পারে। পশুগুলির দেহাবশেষগুলির ময়না তদন্তের কথা বলে তারা কলকাতা যাবে বলে মনস্থির করে।

          ফগহর্ন এর তীব্র আওয়াজ করে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ এইসবে বালি ব্রীজের দিকে এগিয়ে গেলো। অর্ঘ অনেকক্ষন ধরে  সিগারেটের ধোঁয়ার রিং বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু আজ গঙ্গার যা হাওয়া! সে আর হিমাংশু এখন গঙ্গার ঘাটে বসে আছে। তারা হাসপাতালে সুপার সাহেবের হাতেপায়ে ধরে দিন দশেকের ছুটি বাগিয়েছে। কোলকাতায় এলে  তারা হিমাংশুর বালির বাড়িতে আস্তানা গাড়ে। গঙ্গার ধারে হিমাংশুদের পৈতৃক বাড়ি। তার বাবা এখানকার একজন নামকরা ডাক্তার। এখন অবশ্য বয়সের ভারে প্র্যাক্টিস ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকদিন পর ছেলে বাড়ি ফিরেছে দেখে হিমাংশুর মায়ের সেকি আপ্যায়ন। আজ তারা দুপুরের ভুঁড়িভোজ সেরে গঙ্গার হওয়া খেতে বেরিয়ে পড়েছে। "এরপর কি করবে ভেবেছো?", অর্ঘর উদ্দেশে হিমাংশু জিজ্ঞেস করলো। "বিকেলে চা আর চিংড়ির চপ, আর রাতে মাটন। আহা গেলোবার জেঠিমার হাতের মাটন কষা এখনো আমার মুখে লেগে রোয়েছে" অর্ঘ্য বললো।"আরে ধুর, আমি কেসটার কোথা বলছি। ওর বিষয়ে কিছু এগোলে?" সিগারেটের শেষ অংশটা গঙ্গায় নিক্ষেপ করে হিমাংশু বললো।"ও তাই বলো!" আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে অর্ঘ্য বলে চললো " রুদ্র ফোন করেছিল । ও জানালো যে আমাদের আসার খবর ও  পাকড়াশী কে দিয়ে দিয়েছে। কাল থেকে কাজে লেগে পড়তে হবে।" "সৌরভ পাকড়াশী? লালবাজার ক্রাইম ব্রাঞ্চ?" হিমাংশুর এই প্রশ্নের উত্তরে অর্ঘ্য শুধু "হু" বলে একটি রবীন্দ্রনাথের গানের কলি গুণগুন করতে লাগলো।

         পরদিন সকালে তারা পুলিশ জীপ করে সরকার বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। সাথে ইন্সপেক্টর সৌরভ পাকড়াশী। আগের কটা জটিল কেসের সুবাদে ইন্সপেক্টর সৌরভ তাদের পূর্ব পরিচিত। সে কলকাতা ক্রাইম ব্রাঞ্চএর একজন ব্রিলিয়ান্ট অফিসার। পথে কিছু  সৌজন্যতামূলক কথার পর সে কেসের বিষয়ে কিছু তথ্য দিলো। যা জানা গেলো যে বিভিন্ন মহল থেকে পুলিশের ওপর খুব চাপ পড়ছে দ্রুত কেসটাকে কিনারা করার জন্য। কিন্তু এখনো খুব বেশি এগোতে পারেনি তারা। বাড়ির লোক আর মৃতক সান্তনুর বন্ধুবান্ধব ও ব্যবসার লোকজনদের জেরা করে খুব বেশি লাভ হয়নি। তবে ব্যবসায়িক ঈর্শাই যে এই অপমৃত্যুর কারণ তা পুলিশ প্রায় নিশ্চিত। এই কথা সেই কথা হতে হতে তারা পৌঁছে গেল সরকার ভিলা'। তোরণ যুক্ত প্রকান্ড ফাটক পেরিয়ে পুলিশ এর গাড়ি পৌঁছলো গাড়ি বারান্দার নীচে। বাড়ি তো নয়, এ যেন কলকাতার বুকে এক প্রাসাদ। বাড়িটা উঁচু প্রাচীর আর ফল ফুলের বড়ো বাগান দিয়ে ঘেরা। চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক গুলো  ছোট বড়ো ফোয়ারা আর শ্বেত পাথরের নারী মূর্তি।একটা সুইমিং পুলএর কিছুটা অংশ গাড়ি থেকেই দেখা যাচ্ছিল। যত্র তত্র লাগানো আছে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা আর  বাড়ির প্রাঙ্গনে বেশকতক সশস্ত্র প্রাইভেট সিকিউরিটি গার্ড। গাড়ি থামতেই বাড়ির থেকে তাদের দিকে এগিয়ে এলেন  এক ভদ্রলোক। তিনি ইন্সপেক্টর সৌরভএর সাথে করমর্দন সারলেন। সৌরভ হিমাংশু আর অর্ঘ্যর পরিচয় দিলো আর এখানে আসার অভিপ্রায় জানালো। আমরা ডাক্তার শুনে উনি খুব অবাক হলেন। সেটাই স্বাভাবিক। ইনি মিস্টার উমানাথ ঘোষাল, সরকারদের খাস ম্যানেজার। বয়স প্রায় ষাট। বয়েসের ছাপ পড়লেও চোখ দুটো যেন তার অফুরন্ত অভিজ্ঞতার কাহিনী বলছে। তিনি তাদের বেশ সহাস্য অবর্থনা করছেন বটে কিন্তু কীসের যেন এক চিন্তার বলিরেখা তার চেহারায় স্পষ্ট। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে তো হিমাংশু আর অর্ঘ্যর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। যেখানে তাকায়ে সেখানেই প্রাচুর্য আর আভিজাত্যর ছাপ। দামি শ্বেত পাথরের ফরাস, ছাদে বিশাল ঝাড়বাতি, দামি সব আসবাবপত্র, আরো কত কি। এরা যে জাত ধনী তা ভালোই বোঝা যায়। ঘোষাল বাবু তাদের নিয়ে বৈঠকখানায় বসলেন। এই ঘরটা বেশ প্রসস্থ আর একই ভাবে সুসজ্জিত। ঘরের এক প্রান্তে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বইয়ের থাকে সারি সারি বিভিন্ন ধরণের বই সাজানো। ' এই বইগুলো কে পড়ে? এ তো দেখছি বিভিন্ন বিষয়ের বই', হিমাংশু জিজ্ঞেস করলো। ' আগে এই বইয়ের বহর ছিলোনা এই ঘরে। এবাড়িতে বই পড়ার শখ বা সময় কারও নেই। এত বড় ব্যবসা সামলাতে গিয়েই সবাই আমরা হিমশিম খাই। তবে বই পড়ার শক বড় ম্যাডামের, মনে মিস্টার স্বপন সরকারের স্ত্রী। তিনিই এই বই এর সংগ্রহ তৈরি করেছেন। ওনার তো একটা আস্ত লাইব্রেরি আছে এই বাড়িতে, যেখানে এরচেও তিন-চার গুন বেশি বই আছে ' বলে চললেন ঘোষাল বাবু,'কিন্তু এখন একা হাতে ব্যবসার সব কাজ সামলে উনি আর নিজের প্রিয় লাইব্রেরীতে যাওয়ার সময় পাননা।' কথা হতে হতেই দুজন বেয়ারা চা আর জলখাবার দিয়ে গেল। 'সান্তুনু বাবুর মৃত্যুর বিষয়ে আপনার কি মত?',চায়ের পেয়ালা হাতে নিতেনিতে ঘোষাল বাবুকে প্রশ্ন করলো অর্ঘ্য। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘোষাল বাবু বললেন,' দেখুন আপনাদের থেকে কিছুই লুকোবনা। সন্তু মনে সান্তুনু কে ছোটবেলা থেকে কোলে পিঠে মানুষ করেছি, ব্যবসা শিখিয়েছি। নিজে সংসার করিনি তাই তাকে পুত্র স্নেহে দেখতাম। তার মা  মারা যাবার পর তার সব দায়িত্বই কর্তা মশাই আমাকে দিয়ে ব্যবসায় মন দিলেন।' 'তার মানে  ইন্দ্রানী দেবী স্বপন বাবুর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী?', ঘোষাল বাবুকে বাঁধা দিয়ে হিমাংশু জিজ্ঞেস করলো। 'হা তাই। ইন্দ্রানী ম্যাডামের সাথে স্যার এর পরিচয় হয় আমাদের গুজরাত এর মাইনিং ইনস্টিটিউটে। সেখানে ম্যাডাম বিদেশ থেকে গবেষণা শেষকরে এসে শিক্ষকতা করছিলেন। তাদের সন্তান রণধীর এখন দুন স্কুলের ছাত্র। এই ঝামেলা মধ্যে তাকে আর বাড়ি আনা হয়নি। শান্তনু  যেমন ভালো ছাত্র ছিল,তেমনি ছিল তার ভালো ব্যবহার। খুব তাড়াতাড়ি পারিবারিক ব্যবসাটাকে বুঝে ফেলেছিলো। কর্তার শরীরটাও ভালো যাচ্ছিলনা। তাই শান্তনু  একাই সব সামলাচ্ছিলো। তার পর কর্তার স্ট্রোক হলো। তখন থেকেই যেন কার নজর লাগলো এই পরিবারে।' এই বলে থামলেন ঘোষাল বাবু। অর্ঘ্য আর হিমাংশু একে অপরের দিকে আড় চোখে একবার তাকালো।


sankha.chowdhury799@gmail.com/
chiranjit.dr@gmail.com
কলকাতা 


Tuesday, October 20, 2020

ক্যাপ্টেন ভেড়ি

(ধারাবাহিক রহস্য কাহিনী )

ছবি : ইন্টারনেট
                                                             তরুণ চক্রবর্তী

পূর্ব কথন -   ক্যাপ্টেন ভেড়িতে সম্প্রতি এক অজ্ঞাত পরিচয় মহিলা খুন হয় । অঞ্চলটা পরমা আইল্যান্ড থানার মধ্যে পরে । পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী মহিলাকে শ্বাসরোধ করে  খুন করা হয়েছে । থানার বড়বাবু দিবাকর , সেকেন্ড অফিসার নকুরকে দায়িত্ব দেয় ইনভেস্টিগেসানের জন্য । দিবাকর ও নকুর বড়বাবুর ঘরে জরুরী কথা বলছিল , এইসময় হঠাত ঘরে ঢোকে প্রাক্তন সিভিক ভলেন্টিয়ার সতু ওরফে সত্যবান চৌধুরী ।

———  
( চার ) 
——— 
     সতুকে এইভাবে হঠাত দেখে দিবাকর ও নকুর দুজনেই যারপরনাই চমকিত ।
-- কি ব্যপার সতু , হঠাত কি মনে করে । দিবাকরই  জিগ্যেস করে । 
--আজ্ঞে স্যার , একটা জরুরী কথা ছিল । সতু সংশয়ের দৃষ্টিতে নকুরের দিকে তাকায় । দিবাকর বরাভয়ের ভঙ্গিতে সতুকে বলে , 
--তুই  নিশ্চিন্তে নকুরের সামনে সব কথা বলতে পারিস  । ওকে তো তুই  চিনিস । বোস , বোস  ,অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে আছিস । দিবাকর সতুকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে । সতু বসার পরে দিবাকর সামনে রাখা জলের গ্লাস তার দিকে বাড়িয়ে দেয় । সতু জলটা  ঢক ঢক করে খেয়ে নিয়ে একটু ধাতস্ত হয় । দিবাকর ও নকুর দুজনেই বুঝতে পারে সতু খুব উত্তেজিত হয়ে আছে । ওরা অপেক্ষা করে সতু  নিজের  থেকে কখন কথা শুরু  করবে তার জন্য । 
--স্যার , কেসটা কিছু এগোল ? সতু জিজ্ঞেস করে । 
--কোন কেসটার কথা বলছিস ? নকুরের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে  দিবাকর জিজ্ঞেস করে ।চোখে বিস্ময় ।
--ওই যে স্যার , ক্যাপ্টেন ভেড়ির মার্ডার কেসটা । সতুকে বেশ উত্তেজিত লাগছিল । 
--তুই জানলি কি করে ? আর তোর এতো কৌতুহলই বা কেন ? তুই তো এখন থানার স্টাফ ও নয় । তাহলে ? দিবাকর মোক্ষম প্রশ্ন করেন ।এরপরে সতু যে কথাটা বলে তার জন্য নকুর আর দিবাকর , কেউই  প্রস্তুত ছিল না ।  
--স্যার লাশটা তো প্রথম আমিই দেখি । 
     ঘরময় অপার স্তব্ধতা । পিন পরলেও শোনা যাবে । দিবাকর চোখ বুজে কিছু একটা ভেবে নিলেন । তারপর সতুর দিকে  তাকিয়ে বললেন , 
--পুরো ব্যপারটা গুছিয়ে বল । যেখানে  দরকার হবে , আমি প্রশ্ন করবো । ঠিকঠাক উত্তর দিবি । সতু সম্মতির মাথা নাড়ে । তারপর গড় গড় করে বলে যায় ও কি দেখেছিল , কি ঘটেছিল ।
-- তুই যখন রাত্রেই দেখলি , তখনই এলি না কেন ? এখন তো তুইই প্রাইম সাস্পেক্ট হয়ে গেলি । 
--কি বলবো স্যার , খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম । ভেবেছিলাম এক , হয়ে গেল আরেক । মাথা কাজ করছিলো না স্যার । খুব ঘাবড়ে গেছিলাম । 
--ছেলেটাকে একদম দেখতে পাসনি ? ঠিক করে ভেবে দেখ । যদি মনে করতে পারিস , তাহলে কেস কিন্তু আর্ধেক সল্ভড্ । আর্টিস্টকে দিয়ে ছবি আঁকাব , থানায় থানায় দিয়ে দেব , সোর্সদের লাগিয়ে দেব , ব্যাটা যদি মায়ের গর্ভেও থাকে , সেখান থেকে বার করে আনব । তুই শুধু ভালো করে একবার ভেবে দেখ । সতু গুম হয়ে যায় । কি করে বোঝায় , অত কুয়াশার মধ্যে , জ্যাকেট , মাফলার পরা ছেলেটার মুখ একদম দেখতে পায়নি । 
   দিবাকর বুঝতে পারে সতু সত্যি কথাই বলছে । শালা , কি অদ্ভুত সিচুয়েসান। খুনিকে দেখা গেছে , আবার দেখা যায়নি । খুন করে একজন মানুষ চোখের সামনে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল । দিবাকরের নিজেরই হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিলো । হতাশ দিবাকর নকুরকে তিন কাপ চায়ের অর্ডার দিতে বলল । 
    চা খেতে খেতে দিবাকর আবার সতুকে নিয়ে পড়লো ।
-- মেয়েটাকে তো দেখেছিস । চেনা মনে হয়েছে ? 
--না স্যার , তবে লাইন এর মেয়ে । আর আপনি তো জানেন , মেয়েছেলের দোষ আমার নেই । সতু বলে । 
--সে তো জানি ।এ থানায় সে দোষ তো একমাত্র জনার্দনের আছে । সেও তো চেনে না বলল । কি যে করি । দিবাকর হতাশায় ঘাড় নাড়ে । 
--সতু এতক্ষণ দিবাকরের কথা মন দিয়ে শুনছিল । কোন কথা বলেনি । দিবাকরের কথা শেষ হতেই সতু বলল , 
--বিশ্বাস করুন স্যার , কোন ধস্তাধস্তি , চিৎকার চেঁচামেচি কিচ্ছু শুনিনি । লোকটা মনে হয় মেয়েটাকে কোন ঘুমের ওষুধ টোশুধ দিয়েছিল । 
দিবাকর সতুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল , 
--আমরাও তো তাই ভাবছি । এখন ভিসেরা রিপোর্ট এর জন্য অপেক্ষা করা ছারা কিছু করার নেই । 
এই সময় সনাতন এসে ঢুকল । লম্বা স্যালুটে মেরে বলল , 
--ফরেনসিক থেকে ফোন এসেছিল । বলেছে ঘটনাস্থলে কোন ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া যায়নি । 
--লাও ঠ্যালা । শেষ আশাটাও গেল । নকুর , ক্রাইম  সিন থেকে কর্ডন আর গার্ড তুলে নেও । ওসবের আর দরকার নেই । আর , যেহেতু এখনো কেউ বডি আইডেন্টিফাই করেনি , আন-ক্লেইম্ড বডি হিসেবে মর্গে পাঠিয়ে দাও। চোদ্দদিন দেখে  ডিস্পোস করে দিও । 
--ইয়েস স্যার , বলে নকুর বিদায় নেয় । ঘরে তখন শুধু সতু আর দিবাকর। দিবাকরই প্রথম মুখ খুলল , 
--দেখ সতু , তুই যে আমার এলাকায় তোলাবাজি করিস আমি জানি । এ থানার সাথে তোর পুরনো সম্পর্কের জেরে আমি কিছু বলিনা । এই এলাকায় খুন খারাবি হয় , ঠিক কথা । কিন্তু সেগুলো সবই রাজনীতি বা এলাকা নিয়ে দলাদলির জন্য । কোন সাধারণ মানুষ , আমি থানায় আসার পর খুন হয়নি । আমি দায়িত্ব নিয়েছি , নিজের হাতে কেসটা সল্ভ্ করবো। এবং তাড়াতাড়ি । নাহলে যত দেরি হবে ডিপার্টমেন্টে আমার অবস্থা ঢিলে হবে । মিডিয়াও হইচই শুরু করবে । সবে তো কালকের ঘটনা । মিডিয়া তো এখনো সেরকম গন্ধই পায়নি । তুই কিন্তু কিছু চেপে যাস না । যদি দেখি তুইও এর মধ্যে ইনভল্ভড্ , তাহলে আমিও কিন্তু ছেরে কথা বলবনা । ফর্সা দিবাকরের রাম খাওয়া গাল উত্তেজনায় আরও লাল লাগছিল ।   
সতু বুঝতে পারছিল , দিবাকরের তার ওপর পুরনো রাগ এখনো যায়নি । তা বলে দিবাকর যে ঠারে ঠোরে তাকেই দোষী ঠাওরাবে এতোটাও ভাবেনি । 
--আপনি কি আমাকেই  খুনি ভাবছেন ? সতু সরাসরি দিবাকরকে জিজ্ঞেস করে । 
--না , সে কথা এখনি বলছিনা । তবে মাথায় রাখছি ।যদি অপরাধী ধরা না পড়ে , তুই তো আছিস ।দিবাকরের মুখে ক্রুর হাসি । 
--মানে ? 
--এতদিন থানায় কাজ করেছিস , এটার মানে জানিস না । অপরাধী ধরা না পরলে , কি করে অপরাধী বানাতে হয় , আমার ভালোই জানা আছে । তার চেয়ে ভালো করবি , খুনিকে ধরতে সাহায্য করলে । যা লেগে পর ।   
সতু ঠিক বুঝতে পারেনা , এটা অনুরোধ , আদেশ না হুমকি । দিবাকরের ঘর থেকে বেড়িয়ে আসার সময় , জনার্দনের সাথে দেখা । 
--কি সতুদা ভালো আছো ? 
 সতু বিমর্ষ বদনে ঘাড় নাড়ে । জনার্দন ঠিক বুঝতে পারে না , ভালো না খারাপ । ও থানার লম্বা করিডর দিয়ে অফিস ঘরের দিকে চলে যায় । সতু পেছন থেকে জনার্দনের চলে যাওয়া দেখে । 
 থানা থেকে বেরোলেই বাইপাস । বাইপাসের ওপারে , হাইরাইসের মাথায় সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। সূর্যের আরেক নাম দিবাকর । কথাটা মনে আসতেই সতুর মুখে হাল্কা বিদ্রূপের হাসি খেলে যায় । বাড়িতে যাওয়ার জন্য অটোতে ওঠার সময় , সতুর পেছন থেকে দেখা জনার্দনের হাঁটার ভঙ্গিটার কথা মনে আসে । দুতিন দিনের মধ্যে এরকম ভাবেই যেন কাকে হেঁটে যেতে দেখেছে । ভঙ্গিটা যেন খুব চেনা । ক্লান্ত , বিধ্যস্ত সতু ঠিক মনে করতে পারেনা । অটো, যাত্রী বোঝাই হয়ে সতুকে নিয়ে এগিয়ে চলে সতুর বাড়ির দিকে ।